Sunday, July 29, 2012

স্মৃতির পাতায় হুমায়ুন ও তাঁরই অতি প্রিয়জনেরা



আমি লেখক হুমায়ুন আহমেদের দারুন ভক্ত। হুমায়ুন আহমেদের লেখা বই, যে কোন আর্টিক্যাল নজরে পড়লেই শত ব্যস্ততার মাঝেও এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি। কিনতু,  ঠিক কখন থেকে  হুমায়ুন আহমেদের লেখা বই পড়তে শুরু করেছি, এখন আর তা মনে পড়েনা। তবে কৈশোরেতো অবশ্যই না। খুব ছোটবেলা থেকেই মা’কে দেখেছি অবসরে গল্পের বইয়ের মাঝে ডুবে থাকতে। একটি কাঠের আলমিরা ভর্তি ছিল মায়ের সংগ্রহ। সেই সংগ্রহে মহাশ্বেতা দেবী, আশাপূর্ণা দেবী, সৈয়দ মুজতবা আলী, বুদ্ধদেব বসু, গজেন্দ্র নারায়ন মিত্র থেকে শুরু করে মানিক, শরত, নজরুল, রবীন্দ্রসহ আরও অনেকের ভারী ভারী উপন্যাসের বই শোভা পেলেও নীহার রঞ্জন, নিমাই, হুমায়ুনের বই শোভা পেতনা। 

যেহেতু মায়ের সংগ্রহে হূমায়ুন আহমেদের কোন বই ছিলনা, তাই কৈশোরে হুমায়ুন আহমেদ নামের কোন লেখককে আমরা জানতামনা। উনার নাম প্রথম জেনেছি বিটিভিতে প্রচারিত ‘এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকটি ‘৮৫সালের শুরুর দিকেই প্রথম প্রচারিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে বসে ধারাবাহিকটি দেখতাম। আমি তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। ঐ বছরেরই মাঝামাঝি সময়ে আমার বিয়ে হয়। হুমায়ুন ম্যাজিকের শুরু ‘এইসব দিনরাত্রি’ থেকেই।  ছোট্ট একটি ঘটনা মনে পড়ছে, আমার বিয়ের পরদিন ছিল ‘এইসব দিনরাত্রির’ একটি এপিসোড। বাপের বাড়ী ছেড়ে স্বামীর বাড়ীতে এসেও অঝোরে কেঁদেছিলাম। কান্নাকাটির মধ্যেও  ‘এইসব দিনরাত্রির’  নতুন এপিসোডের কথা ঠিকই মনে ছিল। নতুন বাড়ীতে এসেই টিভি দেখতে চাইলে অনেকেই চোখ গোল গোল করে ‘নতুন বউয়ের’ দিকে তাকাবে, সেই ভয়ও মনের মধ্যে ছিল। তারপরেও লজ্জার মাথা খেয়ে  একফাঁকে স্বামীকে বলেই ফেলেছিলাম, “ আজকে এইসব দিনরাত্রির নতুন পর্ব দেখাবে। আমি সেটা দেখতে চাই”। আমি আজও জানিনা নতুন বউয়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে আমার স্বামীর কি অনুভূতি হয়েছিল। তবে উনি হাসিমুখে আমার জন্য নাটক দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এ  সবই আজ স্মৃতি।

হুমায়ুন আহমেদ আজ আমাদের মাঝে নেই। আমার কতই না ভাগ্য, এই সাহিত্য সম্রাটকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।   লেখক হুমায়ুনকে দেখিনি,  দেখেছি পরিবার পরিজন আঁকড়ে থাকা হুমায়ুনকে, পরিবারন্তঃপ্রান হুমায়ুনের খুব কাছের মানুষগুলোকে, যারা তাদের হুমায়ুনকে নিয়ে গর্বিত ছিল, যারা এই মানুষটিকে ঘিরে বেড়ে উঠেছিল।  অনেক বছর পর পত্রিকার পাতায় নোভা, শীলা, তাদের দাদী, গুলতেকীন আহমেদের কথা ছাপা হচ্ছে,  প্রতিদিন নামগুলো  পড়ি আর তাদের সাথে ফেলে আসা দিনের কিছু স্মৃতি নিয়ে চুপচাপ নাড়াচাড়া করি।  সময়ের সাথে সাথে কত কিছু বদলে যায়। হুমায়ুন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের  খুব ঘনিষ্ঠ  স্বজনদের সাথে যে অন্তরংগ  মুহূর্তগুলো কেটেছিল, সেগুলোই চোখের সামনে ইদানিং ভেসে বেড়ায়।

আমার স্বামীকে বিয়ের পর থেকেই আমি উত্তম কুমার ডাকি। সে বেশ কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আহমেদের সহকর্মী ছিলেন। তাছাড়া দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রির ছাত্র ছিলেন বলে বয়সের কিছুটা ব্যবধান থাকা সত্বেও তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। উত্তম  হুমায়ুন আহমেদকে ‘ভাই’ সম্বোধণ করতেন। ’৮৫ সালে উত্তমেরর সাথে যখন আমার বিয়ে হয়, হুমায়ুন আহমেদ তখনও ব্যস্ত হয়ে উঠেননি। বন্ধুবান্ধবকে সময় দিতে পেরেছেন। তবে ব্যস্ত না হলেও জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। বিয়ের আগে থেকেই আমি হুমায়ুন আহমেদের লেখার ভক্ত। আমার পরম সৌভাগ্য যে আমাদের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রখানি হুমায়ুন ভাই করে দিয়েছিলেন। ্পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ততা থাকায় আমাদের বিয়েতে উনি উপস্থিত হতে পারেননি, তবে লাল টুকটুকে এক শার্ট পড়ে বৌভাত অনুষ্ঠানে এসেছিলেন, একা। তাই শুধু হুমায়ুন ভাইয়ের সাথেই পরিচয় হয়।পর্যায়ক্রমে খালাম্মা (মিসেস আয়েশা ফয়েজ), গুলতেকীন ভাবী, তিন মেয়ে নোভা, শীলা, বিপাশা, হুমায়ুন ভাইয়ের ছোট বোন শিখু আপার সাথেও পরিচয় হয়েছিল। হুমায়ুন ভাইয়ের ফ্যামিলির প্রতিটি সদস্যকে আমার ভালো লেগেছে। মানুষকে তারা এত আপন করে নিতে পারে, যারাই তাদের কাছাকাছি এসেছে তারাই ভাল বলতে পারবে।

শিখু আপার সাথেঃ

বিয়ের পরে ‘হানিমুন’ করতে আমরা কক্সবাজার গিয়েছিলাম, ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে চিটাগাং, চিটাগাং থেকে ‘মুড়ির টিন’ বাসে করে কক্সবাজার যাওয়ার পথে এক জায়গায় গাড়ী থেমেছিল। সেখানে আরেকটি জীপ গাড়ীও থেমে ছিল। হঠাৎ করেই জীপ গাড়ী থেকে চোখে কালো গগলস পড়া এক মেজর সাহেব নেমে এসে আমাদের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “  দাদা, আপনাকে আমার স্ত্রী গাড়ী থেকে দেখতে পেয়ে আমাকে পাঠিয়েছে।  আমি মেজর ‘অমুক’ এবং আমার স্ত্রী শিখু, আমার শাশুড়ী আম্মাসহ সকলেই গাড়ীতে আছে। আমরাও কক্সবাজার যাচ্ছি। বাস থেকে নেমে আসেন, চলেন আমাদের সাথেই, একই রেস্ট হাউজে উঠবেন”।

পথ চলতে শিখু আপাদের সাথে দেখা হওয়ায় উত্তম খুব খুশী। তখনই জানতে পারলাম শিখু আপা হচ্ছেন হুমায়ুন আহমেদের ছোটবোন। যেহেতু আমাদের হোটেল আগে থেকেই বুকিং দেয়া ছিল তাই উনাদের সাথে সমুদ্র সৈকতে দেখা হবে বলে শিখু আপার বরকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কক্সবাজার গিয়ে পরদিনই শিখু আপাদের সাথে দেখা করেছি উনাদের রেস্ট হাউজে গিয়ে। তাঁদের মা মিসেস আয়েশা ফয়েজকে নিয়ে যখনই কোন লেখা পড়ি, আমার চোখে ভেসে উঠে ২৭ বছর আগের স্মৃতি। কক্সবাজারের সেই রেস্ট হাউজে যাওয়ার পরেই শিখু আপা বড় বোনের মত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। এক মুহূর্তেই শিখু আপাকে আমার ভালো লেগে গেল। দারুন প্রানবন্ত এক মেয়ে। চুপ করে থাকতেই জানেনা। মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, “ আম্মা এই হচ্ছে দাদাভাইয়ের বন্ধু জীবেন’দার বউ। উনারা এসেছে হানিমুনে। কালকে জীপে বসে যাদেরকে দেখেছিলাম, এরাই তারা”। উত্তম ‘খালাম্মা কেমন আছেন’ বলে পায়ে হাত ছুঁয়ে উনাকে প্রনাম করতেই আমিও তাঁকে অনুসরন করলাম। খালাম্মা খুবই আপনার জনের মতই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে উনার পাশে বসালেন। খালাম্মাকে দেখে আমার বুকটা ভাললাগায় ভরে গেল। পান খেয়ে ঠোঁট দুটো লাল টুকটুকে হয়েছিল, পরনে তাঁতের শাড়ী, মাথায় আধাআধি ঘোমটা টানা মানুষটিকে দেখেই নিরহংকারী সম্ভ্রান্ত পরিবারের গিন্নীমা লাগছিলো। আমরা একসাথে অনেক ছবি তুললাম।

চা-টা খাওয়ার পরে একসাথে বীচে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই শিখু আপাই খেয়াল করলো যে আমি সিল্কের শাড়ী পড়ে রওনা হয়েছি। শিখু আপা আর উনার স্বামী শুরু থেকেই আমাকে পিচ্চী একটা মেয়ে ভেবে আদুরে ভঙ্গীতে কথা বলে যাচ্ছিলেন। শাড়ী পড়ে সমুদ্রস্নানে যাচ্ছি বলে শিখু আপা বলেই ফেললো, “ বৌদি তুমি কী পাগল হয়েছো, শাড়ী পড়ে সমুদ্রে নামতেই পারবেনা। তোমাকে সালোয়ার কামিজ পড়ে নামতে হবে”। আমি পড়ে গেছি মহা ফাঁপড়ে। আমাদের হিন্দু ঘরের মেয়েরা বিয়ের পরে শাড়ী পড়েই অভ্যস্ত, সালোয়ার কামিজ পড়ার কথা চিন্তাই করা যেতোনা। কিনতু  নিজের দূর্বলতা  প্রকাশ পেয়ে যায় ভয়ে আমি বলেছিলাম, “ আপা, আমার সালোয়ার কামিজ আছে, কিনতু সাথে করে নিয়ে আসিনি। হোটেলেই পড়ে আছে। আমি আজকে না হয় শাড়ী পড়েই যাই, কালকে সালোয়ার কামিজ পড়ে আসবো”। শিখু আপা তা মানতে রাজী নন। বললেন, “ এমনিতেই এক পিচ্চী মেয়ে, তার উপর শাড়ী পেঁচিয়ে পানিতে নামলেই ঢেউয়ের ধাক্কায় কোথায় চলে যাবে! আমার দাদাটার কী হবে”! বলেই সাথে সাথে সমস্যার সমাধান করে দিলেন।

তাদের সকলের ছোটবোন মনির সালোয়ার কামিজ আমাকে পড়তে হবে। মনি তাদের সকলের ছোট। খালাম্মার পাশেই বসা ছিল হাসিমাখা মুখে। ওর সাথে আমি কথা বলে চলেছি অথচ মনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে শুধুই মিটিমিটি হাসছিলো।  আমি তখনও জানতে পারিনি যে মনি বাক প্রতিবন্ধী। তবে কথা না বলতে পারলেও মনি আমাদের সকল কথা বুঝতে পারছিল। ওর একসেট সালোয়ার কামিজ (লাল টুকটুকে) আমাকে পড়তে দিয়ে শিখু আপা নিজেও লাল কালো চেকের সালোয়ার কামিজ পড়ে তৈরী হয়ে নিল। এ সমস্ত প্রস্তুতির ফাঁকে খালাম্মা আমাকে পরম মমতায় পাশে বসিয়ে অনেক গল্প করতে লাগলেন। আমি কী পড়ছি, বাবা মা’কে ছেড়ে কেমন লাগছে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন। মনিকে একবারের জন্যও কাছছাড়া করছিলেননা। সেদিন শিখু আপাদের সাথে উনার এক মামা মামীও এসেছিলেন। পারিবারিক সফর যেমন হয়, তেমনই এক সফর ছিল ওটা। শিখু আপার বাচ্চা আর মামীর ছোট বাচ্চা, এই দুটি ফুটফুটে শিশুকে নিয়েই আমরা সদলবলে বীচে গেছিলাম। শিখু আপার ছোট্ট টুকটুকী মেয়েটা আজকে নিশ্চয়ই ৩০ বছরের তরুণী, আর সেই মামার মেয়েটাও নিশ্চয়ই এতদিনে সংসার সাজিয়ে বসেছে।

সৈকতে গিয়ে সমুদ্রের গর্জন আর বিশালত্ব দেখে আমি খুব ঘাবড়ে গেছিলাম। শিখু আপার স্বামী (দুলাভাইয়ের নামটা কি শহীদ ছিল কিনা আজ আর মনে পড়ছেনা) শিখু আপাকে নিয়ে অনেকটা দূর চলে গেছেন, আমার স্বামী ক্যামেরা হাতে শুধু বউয়ের ছবি তুলতে ব্যস্ত, মামা মামীকে নিয়ে ব্যস্ত, মনি সমুদ্রের জলে পা ডোবায় আবার তুলে ফেলে, দুই শিশু সৈকতের বালিতে বসে ঝিনুক কুড়াচ্ছিল, আর আমি হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে থেকে ভয় ও ভালো লাগায় দুলছিলাম। শিখু আপাই হঠাত করে খেয়াল করেছিল, নতুন বৌদি ভয়ে সমুদ্রে নামছেনা। তার স্বামীকে পাঠিয়ে দিল আমাকে যেন টেনে নিয়ে যায় তার কাছে। দুলা ভাই আর্মির মেজর, সাহসী হওয়ারই কথা, আমার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে শিখু আপার কাছে নিয়ে যেতেই সবাই মিলে শুরু হয়ে গেল হৈ হৈ করে জল ছোঁড়াছুঁড়ির খেলা।

এরপরে আমরা সকলেই যে যার কর্মস্থলে ফিরে এসেছি। তাঁদের সাথে আরও কয়েকবারই দেখা হয়েছিল।  আমরা তখন ছিলাম সাভারে, গনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোয়ার্টারে। এখন গনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের হালচাল কেমন তা আমি জানিনা। কিনতু ’৮৫ সালের দিকে ওখানের পরিবেশ ছিল ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েমের এক ব্যর্থ পরিহাস। আমার স্বামী একটা ডিভিশানের ম্যানেজার ছিলেন। ‘ম্যানেজার’ শব্দটি যতই গালভরা হোক না কেনো, আমাদের কোয়ার্টারের হাল ছিল খুবই করুণ। ঘরগুলো ছিল অনেকটাই ভাঙ্গাচোরা ধরনের। ঘরের মেঝে্য এখানে ফাটল, ওখানে ফাটল, কাছেই ছিল গরুর আস্তাবল, সেখান থেকে গোবরের গন্ধ আসত। এমন ছিল যে ওখানে যে সন্ধ্যায় গুলতেকীন ভাবী, শিখু আপাসহ ১২/১৪ জনের একদল গিয়ে হাজির হলেন, আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছিলাম। খুব লজ্জা লাগছিল গুলতেকীন ভাবী, শিখু আপার কাছে বাসস্থানের দৈণ্যতা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায়। উত্তমকে অবশ্য এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখিনি। সে সবার জন্য ক্যান্টিন থেকে তেলেভাজা আনায় ব্যস্ত হয়ে গেল। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম চা বানাতে। দুই জনের সংসারে অতগুলো কাপ ডিশ কোথায় পাব? শিখু আপা বা গুলতেকীন ভাবী এতো ভালো যে আমার অসহায়ত্ব টের পেয়ে নিজেরাই হাতে হাতে করেই কাপে, গ্লাসে চা ঢেলে খেয়ে নিলেন।

শিখু আপাকে সদা  উৎফুল্ল মুডে থাকতে দেখতাম। আরেকদিন, কক্সবাজার থেকে ফেরার কয়েকমাস পরে শিখু আপা আর দুলাভাই এসে হাজির আমাদের সাভারের বাসায়। হানিমুনে গিয়ে উনাদের সাথে  তোলা ছবিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই শিখু আপা বললো, “ বৌদি, তুমি মনে হয় জান যে তোমার হাসি খুব সুন্দর, তাই সব সময় হেসে হেসে ছবি তোল”। আমি তখনও মানুষের কথায় হাসি ঠাট্টা বা কৌতুকের অংশটুকু আলাদা করতে শিখিনি। একটু ভড়কে গিয়ে বললাম, “ আমি ছোটবেলাতে একেবারেই হাসতাম না বলে আমার বাবা আমাকে তেঁতুলের ঘটি ডাকতো। বাবা যেনো আমাকে আর তেঁতুলের ঘটি না ডাকতে পারে সেজন্য আমি আয়নাতে দেখে দেখে হাসি প্র্যাকটিস করেছি। এখন আমি সব সময়ই হাসি।”  শিখু আপা বললো, “ আল্লাহরে! এই মেয়ে পিচ্চী হলে কী হবে, কথা বলে টকর টকর”!  আজও  খুব মনে আছে সে সন্ধ্যার কথা।

শিখু আপার সাথে আরেকদিনের ঘটনা মনে পড়ে। আমরা অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরে এসেছি। ২০০০ সালের দিকে, আমরা তখন উত্তরা থাকি। উত্তম তখন নামকরা এক ঔষধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। নানা কারনেই হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে একটু দূরত্ব তৈরী হয়ে গেছে। শিখু আপাদের সাথেও যোগাযোগ ছিলনা। হঠাৎ করেই এক সকালে শিখু আপা ফোন করে,  জানতে চায়, “ বৌদি তোমরা সবাই কেমন আছো। কতদিন তোমাদের খোঁজ পাইনা। দাদা কেমন আছে”? সবাই ভালো আছি শুনে শিখু আপা ফোনে থেকেই  বড় একখানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, “ বৌদি, অনেক কষ্টে তোমাদের ফোন নাম্বার পেয়েছি। দাদাকে নিয়ে খুব খারাপ এক সংবাদ পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেছিল। একজনের কাছ থেকে  শুনেছি দাদা মারা গেছে। আমার বুকটা ধ্বক করে উঠেছে। তোমরা সবাই ভালো আছো জেনে এতো ভালো লাগছে। আমার দাদাটার হায়াৎ বেড়ে গেছে”। এত বছর পরে শিখু  আপার কাছ থেকে ফোন পেয়ে কী যে খুশী হয়েছি, শিখু আপা সেদিন তা টের পেয়েছিল কি না কে জানে। ফোনটা উত্তমের হাতেই দিয়ে শিখু আপাকে নিশ্চিন্ত করতে চাইলাম। শিখু আপা কলকল করে কথা বলছিলো। কথা বলার এক পর্যায়ে উত্তম জানতে চাইলো, “ শিখু, হুমায়ুন ভাইকে নিয়ে যেসব রিউমার চারদিকে শুনি, সেসবের কতটুকু সত্যি”। আসলে তখন হুমায়ুন ভাইকে নিয়ে নানা রকম মুখরোচক গল্প বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আমি বা উত্তম কখনও হুমায়ুন ভাইকে নিয়ে কোনরকম রসালো আলোচনায় অংশগ্রহন করিনি। এখনও হুমায়ুন ভাইয়ের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবন নিয়ে কথা উঠলে আমরা চুপ থাকি। সেদিন  শিখু আপা বলেছিল, “  দাদা, কিছুতো অবশ্যই সত্যি। আমরা খুব অশান্তিতে আছি। দাদাভাই যে কেনো এমন করছে তা আল্লাহ জানেন”। শিখু আপার সাথে আমাদের আর কথা হয়নি। কিনতু শিখু আপাকে আমার মনে থাকবে আজীবন। হুমায়ুন ভাইয়ের অনেক লেখাতেই শিখু আপার কথা পড়েছি। চমৎকার এক মানুষ। প্রানবন্ত মানুষটি তার দাদাভাইকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। দাদাভাইয়ের বন্ধু জীবেনদাদা কেও দারুন পছন্দ করতেন। আর আমাকেতো বড়বোনের মমতায় বেঁধেছিলেন। উনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।


গুলতেকীন ভাবীর সাথেঃ


গুলতেকীন ভাবীর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল উনাদের আজিমপুরের বাসায়।  পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ততা থাকায় আমাদের বিয়েতে হুমায়ুন ভাই উপস্থিত হতে পারেননি, তবে লাল টুকটুকে এক শার্ট পড়ে বৌভাত অনুষ্ঠানে এসেছিলেন, একা। ভাবীকে সাথে আনেননি কিনতু উনাদের বাসায় যাওয়ার নিমন্ত্রন করেছিলেন। বিয়ের দু’মাস পরে এক বিকেলে উত্তমেরর সাথে হুমায়ুন আহমেদের আজিমপুরের বাসায় বেড়াতে যাই।

বেল টিপেছি, দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়ানো যে সুন্দরী নারীকে দেখলাম, উনিই যে গুলতেকীন ভাবী তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনি। গুলতেকীন ভাবীর গল্প আমি উত্তমেরর মুখে অনেকবার শুনেছি। আমেরিকা থাকাকালীন ছোট্ট নোভাকে কোলে নিয়ে তরুনী গুলতেকীনের ছবি আমার স্বামীর পুরানো এলবামে এখনও জ্বলজ্বল করছে। একই ক্যামেরায় বন্দী হুমায়ুন আহমেদ, গুলতেকীন আহমেদ ও শিশু নোভার ছবি এখনও একটি সুখী পরিবারের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। ভাবী যে সুন্দরী ও স্মার্ট ছিলেন, সেই ছবিগুলো দেখেই তা আঁচ করেছিলাম। সেই ভাবীই পরম সমাদরে আমাদের ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেই ঘরে হুমায়ুন ভাই তখন বেতের সোফায় পা তুলে বসে সিগ্রেট টানছিলেন। ভাবীকে দেখার আগে ভেবেছিলাম এমন নামী দামী লেখকের স্ত্রী নিশচয়ই খুব অহংকারী হবেন। আমার মত সাধারণ এক মেয়েকে হয়তো পাত্তাই দেবেননা। কিনতু ভাবীকে সামনাসামনি দেখে একটু চমকালাম। খুব সাধারন ছাপা সূতীর শাড়ীতে ভাবীকে একটুও অহংকারী লাগছিলোনা, বরং দারুন স্নিগ্ধ ও সুন্দর লাগছিল, আমার মনে আজও সেই ছবি ভেসে উঠে। 

বিশাল ধনী পরিবারের মেয়ে হলেও উনাকে বরং লেখক স্বামীর বউ হিসেবেই বেশী মানিয়েছিল। প্রথমদিন থেকেই হুমায়ুন ভাইয়ের পারিবারিক পরিমন্ডল আমার মনে দাগ কেটে যায়। সাধারণ মধ্যবিত্তের সংসারের চারদিকে সুখ যেনো উপচে পড়ছিল। কন্যাঅন্তঃপ্রান হুমায়ুন ভাইয়ের দুই বছর বয়সী কন্যা বিপাশা বাবার চারপাশে ঘুরঘুর করছিল, মেয়ের সাথে খেলা করতে করতেই উনি আমাদের সাথে গল্প চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দারুন সংসারী বউয়ের মতই ভাবী নিজে হাতে ছোলার ডালের   হালুয়া বানিয়ে খাইয়েছিলেন। পরে  আমাকে ভেতরের ঘরে নিতেই দেখা হলো খালাম্মার সাথে। আমাকে চিনতে পেরে উনিও খুশী হলেন, হাতে ধরে উনার খাটে নিয়ে বসালেন একেবারে আপন জনের মত। ছোটবোন মনিও আমাকে দেখে চিনে ফেললো এবং যথারীতি খুশী হয়েছিল। ঐ বাড়ীর বারান্দা থেকে গোরস্তান দেখেছিলাম কিনা মনে পড়ছেনা। তবে মন উদাস করা কিছু দেখেছিলাম তা মনে পড়ছে। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম হুমায়ুন ভাইয়ের সামনে বসে কথা বলতে। মাথার মধ্যে একটা জিনিসই কাজ করছিল, এই কী সেই হুমায়ুন আহমেদ, যাঁর ‘এইসব দিনরাত্রি’ দেখার জন্য সবাই পাগল হয়ে থাকে! উনি এতো সাধারন জীবন যাপন করেন! অনেকক্ষন গল্পগুজব করার পরে আমরা চলে এলাম। খালাম্মার সাথে এরপরে আর দেখা হয়নি। তবে দুই বারের সাক্ষাতেই আমি এক দারুন সম্ভ্রান্ত নারীকে কাছে থেকে দেখে ফেলেছি।

এরপরে গুলতেকীন ভাবীকে নিয়ে হুমায়ুন ভাই এসেছিলেন ইবনে সিনহা ক্লিনিকে আমাদের প্রথম সন্তান মৌটুসীকে দেখতে। সেদিনও ভাবীর পরনে ছিল হালকা ঘিয়ে রঙের জমিনে খয়েরী ছাপা সূতী শাড়ী, খুবই সাধারন সাজ অথচ কী যে রূপসী দেখাচ্ছিল উনাকে। এই ভাবীকে শুরু থেকেই আমার ভালো লেগে যায়। খুব কম কথা বলেন, দেখেই বুঝা যেত স্বামী গরবে গরবিনী এক নারী। সে সকালে স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলেই কত মজার মজার গল্প শোনালেন এক নতুন মা’কে। উনাদের গল্প শুনে আমার শারীরিক যন্ত্রনার কথা কিছুক্ষনের জন্য ভুলে ছিলাম।

আরেক সকালে  হুমায়ুন ভাইয়ের শহীদুল্লা হলের বাড়ীতে গিয়ে হাজির হয়েছি। দরজার কড়া নাড়তেই ভাবীই দরজা খুলে দিয়ে আমাদের ভেতরে এনে বসালেন। বলেই ফেললেন, “ জীবেনদা, আপনার বন্ধু আইন জারি করেছে, কেউ এসে তাঁর খোঁজ করলে যেন বলে দেই উনি বাড়ীতে নেই। ঈদের উপন্যাস লিখছেতো, তাই এত সাবধানতা। তবে আপনার বেলায় এই নিয়ম খাটবেনা”। খবর পেয়ে হুমায়ুন ভাই এলেন, অনেকক্ষন গল্প করলেন। হুমায়ুন ভাই যখন গল্প করতেন, মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। ভাবীও পাশে বসে থাকতেন। গল্প করার ফাঁকেই ভাবী নিজহাতে চা-খাবার নিয়ে আসতেন। গল্প চলাকালীন সময়েই হুমায়ুন ভাইয়ের কাছে ভাবীকে প্রথম দেখার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলাম। বললেন, “ দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল ফুটফুটে এক পরী হেঁটে আসছে”। এটা শুনে ভাবী মিটিমিটি হাসছিলো। বিয়ের এত বছর পরেও স্বামীর মুখ থেকে এমন মধুবাক্য ক’জন স্ত্রী শুনতে পায়! এরপর হুমায়ুন ভাই বললেন, “ আর কী কী জানতে চাও, বলে ফেলো। পরে আর বলবোনা”। জানতে চাইলাম “ আপনার উপন্যাসের নায়িকাদের নাম সব সময় জরী, নীলু না-হয় রূপা হয়ে থাকে। বিশেষ করে জরী। এই জরীটা কে”? উত্তরে পাশে বসা সুন্দরীকে দেখিয়ে বললেন, “ইনিই হচ্ছেন জরী। গুলতেকীনকে আমি জরী নামে ডাকি, আমার দেয়া নাম এটা”। আর কিছু জানতে চাইনি। সুখী দম্পতীর গল্প শোনা হয়ে গেছে।



আরেক  শীতের সকালে ঢাকা থেকে সাভার ফেরার পথে আমার আবদারেই উত্তম আমাকে নিয়ে হুমায়ুন ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিল। আমার কোলে তখন দুই বছরের মৌটুসী। সেদিন হুমায়ুন ভাই খুব আড্ডার মুডে ছিলেন। বেতের সোফায় পা মুড়ে বসে গল্প শুরু করে দিলেন। আমরা গল্প করছি, এরই একফাঁকে গুলতেকীন ভাবী একখানা কমলা এনে দিলেন মৌটুসীর হাতে। মৌটুসী ছোটবেলায় কারো হাত থেকে কিছু নিতনা, মাঝে মাঝে আমি অস্বস্তিতেও পড়তাম। কিনতু সেদিন ভাবীর হাত থেকে কমলা নিয়েছিল বলে আমি খুশী হয়েছিলাম। গুলতেকীন ভাবীকে আমি খুব পছন্দ করতাম। উনার দেয়া কমলা যদি মৌটুসী না নিত আমার কাছে ব্যাপারটা অনেক বিব্রতকর মনে হতো হয়তো। ঘন্টা দুয়েক ছিলাম ঐ বাড়ীতে। হুমায়ুন ভাইয়ের সান্নিধ্যে থাকা মানেই দারুন অভিজ্ঞতা। এমন সুন্দর করে গল্প করতে পারতেন উনি যে একমনে তা শুনে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিলনা। গল্প বলার ঈন্দ্রজালে সবাইকে আটকে রাখতে পারতেন উনি।

আরেক দুপুরে উত্তম হুমায়ুন ভাইয়ের বাড়ী থেকে ফি্রেছে হাতে হুমায়ুন আহমেদের লেখা ‘নক্ষত্রের রাত’ বইটি নিয়ে। হাতে নিয়ে বইটি খুলে দেখি, “মিঠু ভাবীকে, টিঙ্কু আহমেদ”। টিঙ্কু আহমেদ কে? জানলাম গুলতেকীন ভাবীর আরেক নাম। সে দিনটি ছিল শীলার জন্মদিন। ভাবী নিজ হাতেই অনেক কিছু রান্না করেছিলেন। আস্ত ফুলকপির রোস্ট খাইয়েছিলেন উত্তমকে। আমি নতুন নতুন রান্না করতে ভালোবাসি জেনে উত্তম বাড়ী ফিরেই আমাকে বলেছিল আস্ত ফুলকপি রোস্টের কথা। এরপরে গত ২৫ বছরে কত নতুন নতুন রান্না করে উত্তমকে খাইয়েছি, কিনতু সেদিনের ফুলকপি রোস্টের গল্প এখনও মাথায় আটকে আছে। খাওয়াপর্ব শেষ হতেই ভাবী আমার জন্য ‘নক্ষত্রের রাত’ বইটি নিয়ে আসেন। ভেতরে উপহারবাণীতে নিজের নাম স্বাক্ষর করেছিলেন।   বই পেয়ে আমি খুবই খুশী হয়েছিলাম। বইয়ের ভেতর ভাবীর স্বাক্ষর দেখে আবারও একজন সফল লেখকের গর্বিতা স্ত্রীকেই যেনো খুঁজে পেলাম।   

১৯৯১-৯২ সালের কথা। আমরা তখন সাভার ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছি। আমার স্বামী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। উত্তম জানতেন আমি হুমায়ুন ভাইয়ের লেখার অন্ধভক্ত। এইজন্য সুযোগ পেলেই সে আমাকে উনার বাড়ীতে বেড়াতে নিয়ে যেতো।  হুমায়ুন ভাই এবং গুলতেকীন ভাবীও আমাদেরকে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে গুলতেকীন ভাবী বা  শিখু আপা উত্তমকে খুব পছন্দ করতেন। শেষবার ভাবীর সাথে দেখা হয় ১৯৯১-’৯২ এর দিকে। বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ুন আহমেদের ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময়’ তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এক বিকেলে জীবেন ‘অয়োময়’ নাটকের শুটিং দেখাতে নিয়ে যাবে বলতেই সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম।। ঠিক হলো প্রথমে হুমায়ুন ভাইয়ের বাড়ীতে যাব, তারপর উনার গাড়ীতে করেই টিভি স্টেশানে যাব। উনারা তখনও শহীদুল্লা হলের বাড়ীতেই থাকতেন। বিকেলে উনাদের বাড়িতে যাওয়ার পরে অনেকক্ষণ আড্ডা হলো। বেডরুমের ফ্লোরে সবাই গোল হয়ে বসে গল্প চলছিল। পাশের রুমে নোভা, শীলা আর বিপাশা হুড়োহুড়ি, লুটোপুটি করছিল। আড়ং থেকে কিনে আনা স্টাফড কুমীর ছানা দিয়ে এ ওকে পিটানি দেয় আর হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে। খেলার ফাঁকে ফাঁকেই মেয়েরা পালা করে করে একেকবার বাবার কাছে আসে, কয়েক মিনিট বাবার পাশে ঘুরঘুর করেই আবার খেলাতে ফিরে যায়। দারুন সুন্দর দৃশ্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই চায়ের ট্রে হাতে গুলতেকীন ভাবী এসে আমাদের পাশে বসলেন। সাদার উপর কালো প্রিন্টের জামা, সাদা সালোয়ার, সাদা উড়নাতে উনাকে বিষন্ন দেখাচ্ছিল। উনাকে দেখামাত্র ‘বিষন্ন সুন্দরী’ শব্দটি আমার মাথায় গেঁথে গেল। এক বছর আগেই উনাদের প্রথম পুত্র রাশেদ হুমায়ুন জন্মেই মারা যায়। সেই শোক তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ভাবী যতক্ষণ আমাদের সাথে বসেছিলেন, হুমায়ুন ভাই পুরোটা সময় ভাবীর হাঁটুতে পরম মমতায় আলতো করে চাপড় দিচ্ছিলেন। ছোট্ট এক দৃশ্য, কিনতু আমার মনে দাগ কেটে গেছে। সুখের দৃশ্য, সুখী মানুষ দেখতে কার না ভালো লাগে!

সন্ধ্যার পরে হুমায়ুন ভাই উনার লাল টুকটুকে গাড়ীতে চড়িয়ে আমাদেরকে টিভি স্টেশানে নিয়ে গেলেন। শরীর খারাপ ছিল বলে ভাবী আসেননি (এর কয়েকমাস পরেই নুহাশের জন্ম হয়)।  অনেকক্ষন  শ্যুটিং দেখলাম, দারুন অভিজ্ঞতা। বাড়ী ফেরার তাড়া ছিল, শ্যুটিং শেষ না হতেই আমরা বেরিয়ে এসেছি। হুমায়ুন ভাইয়ের গাড়ীতে করেই বাসায় চলে যাব, গাড়ীর কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে প্রয়াত অভিনেতা মোজাম্মেল হোসেনের গলা শুনে থামলাম। উত্তমেরর নাম ধরে ডাকছেন, কাছে এসে উত্তমেরর সাথে খুব নীচু স্বরে কিছু বললেন। উত্তমকে দেখলাম মাথা দোলাচ্ছিল। বাড়ী ফিরে জানলাম, “ হুমায়ুন ভাই আজকে বাড়ী ফিরবেননা। গুলতেকীন ভাবী যদি হুমায়ুন ভাইয়ের কথা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি যেনো বলি, হুমায়ুন ভাই আমার সাথেই আছে”! আমি প্রচন্ড এক ঝাঁকুনী খেলাম। কাজের ব্যস্ততায় বাইরে থাকতে হতেই পারে, কিনতু ভাবীকে মিথ্যে বলতে হবে কেনো! উত্তম বললো,“ জানিনা, মনে হয় হুমায়ুন ভাইয়ের বাইরে রাত কাটানো ভাবী পছন্দ করেননা”।

হুমায়ুন ভাই তাঁর জরীকে না জানিয়ে এমনি আরও কত রাত বাইরে কাটিয়েছেন তা আমার জানার কথা নয়। তবে ঈশ্বর সেদিন আমাদের সহায় ছিলেন, উত্তমকে মিথ্যে বলতে হয়নি। ঐ সুন্দর সন্ধ্যার পরে গুলতেকীন ভাবীর সাথে উত্তম বা আমার আর কোনদিন দেখা হয়নি। এরপর সময়ের সাথে সাথে হুমায়ুন ভাইয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন। আমরাও চলে গেছিলাম অস্ট্রেলিয়াতে তিন বছরের জন্য। দেশে ফিরে এসে আমার স্বামী শিক্ষকতা পেশায় ফিরে না গিয়ে দেশের নামকরা ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। দুই শিক্ষকই তাঁদের পুরানো পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য আরেক কর্মজগতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যে শিক্ষকতার সূত্র ধরে আমার স্বামীর সাথে হুমায়ুন আহমেদের সখ্যতা গড়ে উঠেছিল, সেই পেশা থেকে দুজনে সরে যাওয়াতে তাঁদের যোগাযোগের সূত্রটাই ছিঁড়ে যায়। 


আমাদের চোখে তো হুমায়ুন ভাই আর তাঁর ‘জরী’ ছিলেন স্বপ্নলোকের সুখী দম্পতি। সেই ‘সুখী’ দাম্পত্যের মাঝে কখন ফাটল ধরেছিল তা একমাত্র তাঁরাই বলতে পারতেন। গুলতেকীন ভাবীকে আর সামনাসামনি না দেখলেও দুইবার টিভিতে দেখেছিলাম। একবার একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে হুমায়ুন ভাইকে পাশে রেখেই ভাবীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, উনার তিন কন্যার কোন একজনকে কি কোন লেখকের সাথে বিয়ে দিবেন কিনা! ভাবী সরাসরি ‘না’ বলে দিয়েছিলেন। ভাবী সেদিন কেন ‘না’ বলেছিলেন তা আমি বুঝিনি। আমিতো ভাবীকে একজন সফল লেখকের গর্বিতি স্ত্রী হিসেবেই চিনেছিলাম। তবে কেনো উনি ‘না’ বলেছিলেন!

শেষবার ভাবীকে দেখি হুমায়ুন আহমেদের ৫০তম জন্মবার্ষিকীতে। টিভিতে ভাবীকে দেখে আমি চমকে গেছিলাম। ভাবীর সৌন্দর্য্যের যে একটা নির্মল দিক ছিল, সেদিন যেন উনার চেহারাতে তা দেখিনি। কেমন শুকিয়ে যাওয়া মুখ, ভেতর ক্ষয়ে গেলে যা হয়, তারই বহিঃপ্রকাশ দেখলাম প্রিয় গুলতেকীন ভাবীর চেহারাতে। মনটা খারাপ হয়ে গেছিল আমার।

 একান্তই আমার কথাঃ

এরপরে আমরা চলে আসি আমেরিকাতে। ্পত্র পত্রিকায় হুমায়ুন ভাইকে নিয়ে নানা কথা পড়তাম। একটা সময় হুমায়ুন ভাইয়ের লেখালেখি সম্পর্কে যতটুকু খবর ছাপা হতো, তার চেয়েও অনেক বেশী খবর ছাপা হতো হুমায়ুন আহমেদ আর শাওনকে নিয়ে। শাওনকে আমি সামনাসামনি দেখিনি। শাওন খুবই গুণী এক শিল্পী। নতুন কুঁড়িতে শাওনের নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।  নতুন কুঁড়ি চ্যাম্পিয়ন সে।  তার মত এমন এক গুনী মেয়েকে জড়িয়ে নানা রটনার  কোনটাই  আমার  বিশ্বাস হতোনা। অথচ একদিন সবই বিশ্বাস করতে হলো। সাধারন মানুষ ২০০৫ সালের এক দুপুরে সংবাদ পেল, হুমায়ুন আহমেদ ও গুলতেকীন আহমেদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং হুমায়ুন আহমেদ শাওনকে বিয়ে করেছেন। 


আজকে গুলতেকীন ভাবীর কথা খুব মনে পড়ছে। উনার সেই ব্যক্তিত্ব, সেই নির্মল চেহারার কতটুকু অবশিষ্ট আছে জানিনা। তবে ঈশ্বর গুলতেকীন ভাবী, খালাম্মা, শিখু আপা, নোভা, শীলা, বিপাশাসহ হুমায়ুন আহমেদের সেদিনের সেই প্রিয়জনদের সকল শোক সহ্য করার শক্তি যেনো দেন, সেই প্রার্থণাই করে চলেছি। শাওনের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও এই মেয়েটির উপর আমার এতটুকুও রাগ হয় না। বাবার বয়সী মানুষটিকে সে সত্যিকারের ভালোবেসেছিল এবং তাঁর জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত পরম মমতায় তাঁকে আগলে রেখেছিল। আজ মেয়েটির বড় দূর্দিন।  হুমায়ুন ভাইয়ের জীবিতাবস্থায় কেউ শাওনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে একটাও খারাপ কথা বলেনি,  অথচ   এখন মেয়েটিকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে চাইছে।  কারো মাথায় একবারের জন্যও আসছেনা, এই মেয়েটিও গুলতেকীনের মতই হুমায়ুনের প্রেমে পড়েছিল, আর সেই আবেগকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন হুমায়ুন ভাই স্বয়ং। তাহলে আজ বিচারের কাঠগড়ায় শুধু শাওন কেনো, হুমায়ুন ভাই নয় কেনো?  মেয়েটির এমন বিপদের দিনে তার জন্য আমি মমতা বোধ করছি। তার মঙ্গল হোক।  মানুষের মন সত্যি সত্যিই বিচিত্র। নাহলে  নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা না ভেবে বাচ্চা মেয়েটি  এক প্রৌঢ় হার্টের রোগীর জন্য এমন পাগল হতে পারে! ভালোবাসলে এভাবেই বাসতে হয়। গুলতেকীন ভাবীকে সামনাসামনি দেখে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, আর শাওনকে না দেখেই ভালোবেসে ফেলেছি। এই দুই রমণীই হুমায়ুন ভাইকে সত্যিকারের ভালোবেসেছিল। হুমায়ুন ভাই ভাগ্যবান, ভালোবাসার ভেতর দিয়ে যে দাম্পত্য জীবন শুরু করেছিলেন, ভালোবাসার ভেতরে থেকেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু ফেললেন।

Thursday, July 19, 2012

আরেকবার হুমায়ুন আহমেদের জন্য প্রার্থণা!

ভয়ানক দুঃসংবাদগুলো রাতের অন্ধকারেই আসে! হুমায়ুন আহমেদের কোলন ক্যান্সারের খবর যখন পেয়েছিলাম, আমি তখন আমেরিকাতে। রাত ৯টায় সবেমাত্র কাজ থেকে ফিরেছি, ঘরে ঢুকেই এমন সংবাদ শুনে মন খারাপ হয়েছিল। খুব বেশী মন খারাপ। তখনও লেখালেখির জগতে একেবারেই ্নতুন। সবেমাত্র ব্লগে লিখতে শুরু করেছি। হুমায়ুন আহমেদের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবা্দেই উনার আরোগ্য কামনা করে 'হুমায়ুন আহমেদের জন্য যত প্রার্থনা'  লিখেছিলাম। আমার সেই লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন’ দৈনিকে ছাপাও হয়েছিল। লেখাটি ছিল হুমায়ুন আহমেদের সাথে আমাদের টুকরো টুকরো স্মৃতি থেকে নেয়া। হুমায়ুন আহমেদ অসুস্থ হওয়ার সংবাদে কত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি উনাকে নিয়ে লিখেছিলেন, সে সমস্ত লেখার ভীড়ে আমার লেখাটি কোথায় হারিয়ে গেছিল।আমিও ভুলেই গেছিলাম লেখাটির কথা। ধরেই নিয়েছিলাম হুমায়ুন আহমেদ আমেরিকার উন্নত চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়েই দেশে ফিরে আসবেন। আমার সেদিনের সেই লেখাটি এখানে আবার হুবহু তুলে দিচ্ছি। লেখাটি পোস্ট করার আগে আরেকবার পড়ে দেখলাম। কোথাও কোন অসংগতি পেলামনা। কাঁচা হাতের লেখা, তারপরেও উনার রোগমুক্তির জন্য যে প্রার্থণাটুকু করেছিলাম, সেখানে কোন খাদ ছিলনা।

ব্লগে ও ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকাতে  মুদ্রিত (এডিটেড) লেখাঃ
"আজ রাতে কাজ থেকে ফিরেই শুনলাম হুমায়ুন আহমেদের অসুস্থতার খবর। খবরটা আমাকে ভীষনভাবে নাড়া দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদকে একসময় হুমায়ুন ভাই বলে ডাকতাম। হুমায়ুন আহমেদকে প্রথম চিনি ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামের ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে। এই ধারাবাহিক নাটকটি টিভি দেখার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছিল। আমার দিদিমা ডাক্তার দেখানোর জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছিলেন। তখন সকালে ‘এইসব দিনরাত্রি’র কোন একটা এপিসোড দেখানো হচ্ছিল। দিদিমার খুব ইচ্ছে ছিল এপিসোডটা শেষ করে তারপর রওনা হওয়ার। কিনতু আমার দাদুর তাড়াতাড়িতে দিদিমাকে নাটকটা না দেখেই রওনা হতে হয়েছিল। সেই ছিল আমার দিদিমার শেষযাত্রা। আমার দিদিমা ইন্ডিয়াতেই মারা যান দুই মাসের ভেতর। আমার মা কাঁদতে কাঁদতে একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকটা দেখে যাওয়ার, সেই শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ হলোনা’।

আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত হুমায়ুন আহমেদকে হুমায়ুন আহমেদ হিসেবেই চিনতাম। বিয়ে যখন ঠিক হলো তখন আমার হবু বর আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন যে আমাদের বিয়েতে হুমায়ুন আহমেদ আসবেন। তখনতো মাত্র উনার নাম হতে শুরু করেছে। তাই অত ভয়ানক ব্যস্ত তখনও হয়ে উঠেননি। আমার বর এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আহমেদের সহকর্মী বা বন্ধু ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন আমার বরের সিনিয়র ভাই। পিএইচডি শেষ করে আমার বর আমেরিকা ভ্রমনে বের হয়ে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ীতেও দুই দিন ছিলেন। এতটাই বন্ধুত্ব ছিল তখন। হুমায়ুন আহমেদের দেখাদেখি আমার বরও নাকি একটা গল্প লিখে উনাকে পড়তে দিয়েছিলেন। পড়া শেষ করে হুমায়ুন আহমেদ আমার বরকে বলেছিল আর কাউকে না দেখিয়ে পুরো স্ক্রিপটা বিছানার নীচে ঢুকিয়ে ফেলতে। আমাদের বিয়ের কার্ডটা তৈরী করা হয়েছিল হুমায়ুন আহমেদের সাহায্য নিয়ে। আমার স্বামী নিজেই একজন আর্টিস্ট (শৌখিন), তার বিয়ের কার্ড অন্য রকম হওয়ারই কথা এবং তাই হয়েওছিল। বিয়ের কার্ড এত সুন্দর হতে পারে তা না দেখলে বুঝা যাবেনা। হুমায়ুন ভাই লিখেছিলেন নাকি অন্য কাউকে কোট করেছিলেন তা এখন আর মনে নেই। উনি লিখেছিলেন, 'দুটি প্রান্ত থেকে যে কোন দুজন। বন্ধু নয়, শত্রুও নয় যে কোন দুজন, তেমনি একজন মিঠু আর অন্যজন বিনীত জীবেন।'

আমাদের বিয়ের দিন হুমায়ুন ভাই (বিয়ের পর থেকে ভাই ডাকতে শুরু করেছি) আসতে পারেননি, কোথাও ভাইবা পরীক্ষা নিতে গেছিলেন সেদিন। কিনতু বৌভাতে এসেছিলেন, চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট ‘ম্যাগডোনাল্ডস’ এ। আমার বয়স তখন অনেক কম ছিল বলে সব কিছুতেই বিস্মিত হতাম। লাল শার্ট পড়ে হুমায়ুন ভাই এসেছিলেন, এসেই আমাকে বললেন, ‘ কেমন আছো মিঠু, তোমাকেতো রাজেন্দ্রাণীর মত লাগছে’।আমি একটু হাসি ছাড়া কিছুই করিনি, কারণ আমার বিস্ময়ের সীমা ছিলোনা বলে কথা আসেনি মুখে।

এরপর নতুন অবস্থায় হুমায়ুন ভাইয়ের আজিমপুরের বাড়ীতে গিয়েছিলাম, কি সাধারন মধ্যবিত্তের সংসার। হুমায়ুন ভাইয়ের মা, গুলতেকিন ভাবী, নোভা, শীলা আর একেবারে ছোট ২ বছরের মেয়ে বিপাশা। আমার কোন জড়তা ছিলনা ওদের সাথে কথাবার্তা বলায়। দেখেছি আমাদের মত অতি সাধারণ পরিবারের চিত্র।

দেড় বছর পরে আমাদের মেয়ে মৌটুসী যখন জন্মালো, তৃতীয় দিনে হুমায়ুন ভাই আর গুলতেকিন ভাবী এসেছিলেন ক্লিনিকে, ফুল আর উনার নিজের লেখা তিনটি বই নিয়ে। নন্দিত নরকে, অচিনপুর, সৌরভ বই তিনটির প্রথম পাতায় নিজের হাতে লিখেছিলেন ‘নতুন মা-কে’। গুলতেকিন ভাবী যখন বলেছিলেন যে বাবা-মা দুজনেই সুন্দর তাই মেয়েও সুন্দর হয়েছে, হুমায়ুন ভাই বলেছিলেন যে উনার কাছে পৃথিবীর সকল নবজাতকের চেহারা একরকম মনে হয়। ঐদিন উনি তাদের মেজোমেয়ে শীলার জন্মের কথা গল্প করলেন। আমেরিকাতে মেয়ে জন্মের সাথে সাথে উনি এমন বিকট আওয়াজে আজান দিয়েছিলেন যে লেবার রুমের ডাক্তার নার্স সবাই নাকি হতভম্ব হয়ে গেছিল।

এরপর আবার গিয়েছিলাম উনার শহীদুল্লা হলের বাসায়। কয়েকবার গিয়েছিলাম। একবার উনি ঈদের উপন্যাস লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলেন বলে সবাইকে নাকি বলতে বলেছিলেন, কেউ আসলে যেন বলে উনি বাড়ী নেই। কিনতু আমাদের বেলাতে আর তা হয়নি। গুলতেকিন ভাবী আমাদেরকে পছন্দ করতেন (আমার স্বামী একজন সর্বজন প্রিয় মানুষ), তাই আনন্দের সাথে ভেতরে ঢুকিয়ে হুমায়ুন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন। গুলতেকিন ভাবী আমাকে ভেতর নিয়ে গিয়ে যখন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়ীটা দেখাচ্ছিলেন, তখনই দেখলাম, বারান্দায় একটা জলচৌকি পাতা, তার উপর উনার কাগজ কলম শোভা পাচ্ছে। আরেকদিন উনার সাথে আমরা গল্প করছি, কি একটা জিজ্ঞেস করেছিলাম উনাকে, উনি বললেন যদি কোন কৌতুহল থাকে উনাকে জিজ্ঞেস করতে। আমি জানতে চেয়েছিয়াম সব গল্পে ‘জরী’ নামটা থাকে, এটা কার নাম।উনি বলেছিলেন উনি গুলতেকিন ভাবীর নাম দিয়েছিলেন জরী। আরও অনেক মজার ঘটনা, কত গল্প শুনেছি উনার মুখে। উনার সাথে আড্ডায় বসলে উনি একাই একশ যে কোন আড্ডাকে আনন্দময় করে তুলতে।

এরপর ’৯১ সালের প্রথম দিকে আমার স্বামী আমাকে আর আমার মেয়ে মৌটুসীকে নিয়ে গেছিলেন উনার শহীদুল্লা হলের বাড়ীতে। ‘’অয়োময়’ নাটকের শ্যুটিং দেখাবে বলে। ঐ সময় দুটি ঘটনা ঘটে। হুমায়ুন ভাই ও গুলতেকিন ভাবীর প্রথম ছেলে বাচ্চাটা জন্মের পরেই মারা যায়, আবার ঠিক তখনই ভাবীর দেহে আগমন ঘটে দ্বিতীয় ছেলে নুহাশের। আরেকটা ঘটনা হলো হুমায়ুন ভাই বড়লোক হতে শুরু করেন। পাবলিশার থেকে উনাকে লাল টুকটুকে একটা গাড়ী দেয়া হয়। ঐ গাড়ীতে করেই আমাদের টিভি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় নাটকের শ্যুটিং দেখানোর জন্য। সুবর্না মোস্তফা, বিপাশা হায়াত, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূর সহ সবাইকে দেখে এত ভাল লাগছিল! সুবর্না মোস্তফার মনে পড়েনি ১৫/১৬ বছর আগে আমার স্বামী তার গৃহশিক্ষক ছিলেন। অথচ ২০০০ সালে আড়ং এ একবার দেখা হয়েছিল গোলাম মোস্তফার সাথে। গোলাম মোস্তফা কিনতু ঠিক আমার স্বামীর ডাকনাম ধরেই ডাকলেন, নিজের স্ত্রীকে মনে করিয়ে দিলেন যে এই দুলাল উনার মেয়ের শিক্ষক ছিল। আমরা আমেরিকা চলে আসার আগে হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহীদ মিনার অথবা বইমেলা থেকে ফেরার পথে। আমাদের ছোট্ট মিথীলা ছিল তার বাবার কাঁধে, আর দুই মেয়ে মৌটুসী ও মিশা ছিল আমার পাশে। হঠাৎ করেই দেখতে পেলাম হুমায়ুন ভাই আর প্রয়াত অভিনেতা মোজাম্মেল হোসেন কে খুব তাড়াতাড়ি করে ভীড় ঠেলে পার হতে। আমার স্বামী হুমায়ুন ভাই বলে ডাক দিতেই উনি থেমে ছোট মেয়েকে দেখিয়ে শুধু বললেন, ভালই চালিয়ে যাচ্ছ! আমিও কথাটা লুফে নিয়ে বললাম, আপনার পথ অনুসরন করছে! ব্যস! খুব একদফা হাসাহাসি হলো, যে যার পথে চলে গেলাম।

হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে এর পরেও আমার বরের দেখা হয়েছিল, কি একটা ডকুমেন্টারী শিক্ষামূলক ফিলম করার জন্য কোন প্রতিষ্ঠান মনে হয় আমার স্বামীকে ধরেছিল যেন হুমায়ুন ভাইকে দিয়ে স্ক্রিপ্টটা লিখিয়ে দেয়। আমার স্বামী আবার সেবামূলক কাজ খুব আনন্দের সাথে করে দেয়, তাই সাথে সাথে হুমায়ুন ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব করেছিল স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজটা করে দিতে। কি জানি কি মনে হয়েছিল হুমায়ুন ভাইয়ের, অনেক পারিশ্রমিক চেয়ে বসেছিলেন। ফলে ওটা আর করা হয়নি, আমার বরের মনেও ভীষন ধাক্কা লেগেছিল। এরপর আর কোনদিন হুমায়ুন ভাইয়ের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি।ইগোতে লেগেছে আমার বরের। তারপরেও ২০০০ সালের নভেম্বারের ১৮ তারিখে হুমায়ুন ভাইকে ফোন করে আমার বর বলেছিল, ‘হুমায়ুন ভাই আজ আমাদের বড় মেয়ের জন্মদিন, ওকে একটু আশীর্বাদ করে দিন’। হুমায়ুন ভাই আমার মেয়েটাকে আশীর্বাদ করলেন।

এরপর আমরা আমেরিকা চলে এসেছি ২০০১ সালে, কত নতুন নতুন খবর শুনতাম। মনটা খারাপ হতো, গুলতেকিন ভাবীর কথা মনে পড়তো। তাদের দুইজনের জন্যই আমার কষ্ট হতো, আমি কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি আজ পর্যন্ত। তাই যে কোন আলোচনাতে আমি বা আমার স্বামী কোন মন্তব্য করিনা। অন্যের মুখে যখন হুমায়ুন ভাইয়ে নিন্দা শুনি খুব কষ্ট পাই, আবার গুলতেকীন ভাবীর পক্ষে যখন কেউ কিছু বলে সেটাও খুব সত্যি বলে বিশ্বাস করি। মানুষের মন, কখন কোন দিকে বাঁক নেয়, কেউ বলতে পারেনা। আমি গুনী মানুষের গুনটুকুই দেখি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে যাইনা। যে যেখানে আছে, যেভাবে আছে, সুখে থাকুক ভালো থাকুক।

আমার মনটা আজ খুব বেশী খারাপ হয়ে গেছে। হুমায়ুন ভাইয়ের এই কঠিন রোগ যেন আমেরিকার ডাক্তারের কাছে পরাস্ত হয়, অনেক আশা নিয়ে হুমায়ুন ভাইকে এদেশে আনা হয়েছে, আশাপূর্ণ করে যেন হুমায়ুন ভাই হাসতে হাসতে দেশের ছেলে দেশে ফিরতে পারেন, মায়ের ছেলে যেন মায়ের কাছে ফিরতে পারেন, ছোট্ট ছোট্ট দুইটা ফুলের মত শিশুর বাবা যেন তাদের কাছে হাত ভর্তি বেলুন নিয়ে ফিরতে পারেন, এই শুভ কামনা করে যাব যতক্ষ্ণণ প্রয়োজন হয় ততক্ষণ"।


আমরা দেশে এসে দুইমাস থেকে এখন আমেরিকা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি দেশে যতদিন থেকেছি, সংবাদপত্র, টিভি থেকে শতহাত দূরে থেকেছি। খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ এর ওর মুখ থেকে শুনে নিয়েছি। হুমায়ুন ভাইয়ের আমেরিকা ফিরে যাওয়া, সেখানে দুইবার সফল অস্ত্রোপচার হওয়ার কথাও শুনেছি। আজকেই হঠাৎ করে আমার স্বামী ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এর একখানা কপি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “ হুমায়ুন ভাইয়ের অবস্থা খুবই খারাপ”। আমি খবরের হেডলাইনটুকু দেখে কাগজটি সরিয়ে রেখেছি। পড়তে চাইনি, কারন আমার মনে হয়েছে এগুলো সবই অতিরঞ্জিত খবর। হুমায়ুন আহমেদের খারাপ কিছু হতে পারেনা, উনি ক্যান্সারের রুগী, গায়ে জ্বর এলেও পত্রিকাওয়ালারা এটা নিয়ে হৈ চৈ শুরু করে দেয়। এবারও নিশ্চয়ই তাই হয়েছে। দাদার বাসা থেকে বেরিয়ে রাত সাড়ে এগারোটায় ঘরে ফিরেছি। আমেরিকাতে ফিরে যাব আর দুই দিন পরেই। মন খারাপ করে একটু চোখ বন্ধ করে শুয়েছি, মেজ মেয়ে জোরে জোরে ডাকছিল আর সমানে বলে চলছিল, “ মা, হুমায়ুন আহমেদ মারা গেছেন”। হঠাৎ করেই আমার হার্ট বিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এ এক অসহ্য অনুভূতি!

আমার মেজো মেয়ে গল্পের বই পড়েনা। বাংলা গল্পের বই পড়ার প্রশ্নই উঠেনা। তবু ওর ২১ বছরের জীবনে একমাত্র বাংলা বই সে পড়েছে, হুমায়ুন আহমেদের ‘কুটু মিয়া’। আমার এই মেয়ে আমার মতই ইমোশনাল। হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুতে সে খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। আমেরিকার মাটিতে বড় হওয়া মিশা এক মুহূর্তে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে যার সারমর্ম, ‘ আমি গল্পের বই পড়িনা। একটামাত্র বাংলা গল্পের বই পড়েছি হুমায়ুন আহমেদের ‘কুটুমিয়া’। কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে, আমার বাবা আমাকে ডাকেন ‘কুটু’ আর আমার ছোটবোন আমাকে ডাকে ‘মিয়া’।  হুমায়ুন আহমেদ এভাবেই আমার নামের মধ্যে বেঁচে থাকবেন’।
আমরা দেশে এসেছি মে মাসের শেষে। হুমায়ুন আহমেদ বোধ হয় মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসেছিলেন। আমেরিকাতে থেকেই হুমায়ুন আহমেদের দেশে ফেরার সংবাদে অত্যন্ত খুশী হয়েছিলাম। আমার স্বামী আমেরিকার অনেক গুনগান করেন, আমি সব সময় উলটো গীত গাই। কিনতু এবার আমি স্বামীর সাথে একসুরে বলেছিলাম, আমেরিকার চিকিৎসা ব্যবস্থা আসলেই অদ্ভূত রকমের ভালো। হুমায়ুন ভাই পর্যন্ত সুস্থ দেহে দেশে ফিরে যাচ্ছেন। যাই হোক আমেরিকাতে থাকতেই পত্রিকান্তরেই জেনেছিলাম যে উনারা জুনের ১২ তারিখে আমেরিকা ফিরে আসবেন। আমার বড় মেয়ের জন্মের তৃতীয় দিনে উনি গুলতেকীন ভাবীকে নিয়ে ক্লিনিকে গেছিলেন, এরপরেও কতবার বড় মেয়েকে নিয়ে উনার শহীদুল্লাহ হলের কোয়ার্টারে বেড়াতে গেছি। আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলো জুনের প্রথম সপ্তাহে। আমার একটু ইচ্ছে হচ্ছিল মেয়েকে নিয়ে ‘নুহাশ পল্লী’তে যাই। বিয়ের আগে মেয়েটা এমন একজন জ্ঞানী-গুনী মানুষের আশীর্বাদ পেলে আমার ভালো লাগতো।। কিনতু চিকিৎসকের নিষেধ ছিল রোগী যেন বেশী মানুষের কাছাকাছি না যায়। আমেরিকার চিকিৎসকের এই সাবধানবাণী মাথায় রেখে মনের ইচ্ছে মনেই রেখে দিয়েছিলাম। যাওয়া হয়নি। আমার স্বামী খুব শান্ত, ধীর স্থির মানুষ। বন্ধুর অসুস্থতার খবরে কষ্ট পেয়েছিলেন, অভিমান ভুলে বন্ধুর ভাল যে কোন সংবাদের জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন। আর আজকে মেয়ের মুখে বন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে একেবারেই চুপ হয়ে গেছেন। টিভি অন করে আরেকটিবার বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ শুনে নিশ্চিত হলেন, মেয়ে ভুল বলেনি। টিভি অফ করে ঘরের বাতিটি নিভিয়ে দিয়ে শান্ত মানুষটি আরও বেশী শান্ত হয়ে গেলেন।


আর আমি? আবার হুমায়ুন আহমেদের জন্য প্রার্থণায় বসে গেলাম। এমন একজন কিংবদন্তী লেখককে নিয়ে দু’চারটি কথা লিখতে পারছি এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কিছু নেই। উনার আত্মার শান্তি কামনা করি। ছোট্ট নিষাদ ও ছোট্ট নিনিতের মধ্যেই যেনো পরমপ্রিয়কে খুঁজে পায় মেহের আফরোজ শাওন।

হুমায়ুন আহমেদের জন্য যত প্রার্থণা (পুরানো লেখা থেকে সংগৃহীত)

আজ রাতে কাজ থেকে ফিরেই শুনলাম হুমায়ুন আহমেদের অসুস্থতার খবর। খবরটা আমাকে ভীষনভাবে নাড়া দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদকে একসময় হুমায়ুন ভাই বলে ডাকতাম। হুমায়ুন আহমেদকে প্রথম চিনি ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামের ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে। এই ধারাবাহিক নাটকটি টিভি দেখার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছিল। আমার দিদিমা ডাক্তার দেখানোর জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছিলেন। তখন সকালে ‘এইসব দিনরাত্রি’র কোন একটা এপিসোড দেখানো হচ্ছিল। দিদিমার খুব ইচ্ছে ছিল এপিসোডটা শেষ করে তারপর রওনা হওয়ার। কিনতু আমার দাদুর তাড়াতাড়িতে দিদিমাকে নাটকটা না দেখেই রওনা হতে হয়েছিল। সেই ছিল আমার দিদিমার শেষযাত্রা। আমার দিদিমা ইন্ডিয়াতেই মারা যান দুই মাসের ভেতর। আমার মা কাঁদতে কাঁদতে একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকটা দেখে যাওয়ার, সেই শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ হলোনা’।
আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত হুমায়ুন আহমেদকে হুমায়ুন আহমেদ হিসেবেই চিনতাম। বিয়ে যখন ঠিক হলো তখন আমার হবু বর আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন যে আমাদের বিয়েতে হুমায়ুন আহমেদ আসবেন। তখনতো মাত্র উনার নাম হতে শুরু করেছে। তাই অত ভয়ানক ব্যস্ত তখনও হয়ে উঠেননি। আমার বর এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আহমেদের সহকর্মী বা বন্ধু ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন আমার বরের সিনিয়র ভাই। পিএইচডি শেষ করে আমার বর আমেরিকা ভ্রমনে বের হয়ে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ীতেও দুই দিন ছিলেন। এতটাই বন্ধুত্ব ছিল তখন। হুমায়ুন আহমেদের দেখাদেখি আমার বরও নাকি একটা গল্প লিখে উনাকে পড়তে দিয়েছিলেন। পড়া শেষ করে হুমায়ুন আহমেদ আমার বরকে বলেছিল আর কাউকে না দেখিয়ে পুরো স্ক্রিপটা বিছানার নীচে ঢুকিয়ে ফেলতে। আমাদের বিয়ের কার্ডটা তৈরী করা হয়েছিল হুমায়ুন আহমেদের সাহায্য নিয়ে। আমার স্বামী নিজেই একজন আর্টিস্ট (শৌখিন), তার বিয়ের কার্ড অন্য রকম হওয়ারই কথা এবং তাই হয়েওছিল। বিয়ের কার্ড এত সুন্দর হতে পারে তা না দেখলে বুঝা যাবেনা। হুমায়ুন ভাই লিখেছিলেন নাকি অন্য কাউকে কোট করেছিলেন তা এখন আর মনে নেই। উনি লিখেছিলেন, 'দুটি প্রান্ত থেকে যে কোন দুজন। বন্ধু নয়, শত্রুও নয় যে কোন দুজন, তেমনি একজন মিঠু আর অন্যজন বিনীত জীবেন।'
আমাদের বিয়ের দিন হুমায়ুন ভাই (বিয়ের পর থেকে ভাই ডাকতে শুরু করেছি) আসতে পারেননি, কোথাও ভাইবা পরীক্ষা নিতে গেছিলেন সেদিন। কিনতু বৌভাতে এসেছিলেন, চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট ‘ম্যাগডোনাল্ডস’ এ। আমার বয়স তখন অনেক কম ছিল বলে সব কিছুতেই বিস্মিত হতাম। লাল শার্ট পড়ে হুমায়ুন ভাই এসেছিলেন, এসেই আমাকে বললেন, ‘ কেমন আছো মিঠু, তোমাকেতো রাজেন্দ্রাণীর মত লাগছে’।আমি একটু হাসি ছাড়া কিছুই করিনি, কারণ আমার বিস্ময়ের সীমা ছিলোনা বলে কথা আসেনি মুখে।
এরপর নতুন অবস্থায় হুমায়ুন ভাইয়ের আজিমপুরের বাড়ীতে গিয়েছিলাম, কি সাধারন মধ্যবিত্তের সংসার। হুমায়ুন ভাইয়ের মা, গুলতেকিন ভাবী, নোভা, শীলা আর একেবারে ছোট ২ বছরের মেয়ে বিপাশা। আমার কোন জড়তা ছিলনা ওদের সাথে কথাবার্তা বলায়। দেখেছি আমাদের মত অতি সাধারণ পরিবারের চিত্র।
দেড় বছর পরে আমাদের মেয়ে মৌটুসী যখন জন্মালো, তৃতীয় দিনে হুমায়ুন ভাই আর গুলতেকিন ভাবী এসেছিলেন ক্লিনিকে, ফুল আর উনার নিজের লেখা তিনটি বই নিয়ে। নন্দিত নরকে, অচিনপুর, সৌরভ বই তিনটির প্রথম পাতায় নিজের হাতে লিখেছিলেন ‘নতুন মা-কে’। গুলতেকিন ভাবী যখন বলেছিলেন যে বাবা-মা দুজনেই সুন্দর তাই মেয়েও সুন্দর হয়েছে, হুমায়ুন ভাই বলেছিলেন যে উনার কাছে পৃথিবীর সকল নবজাতকের চেহারা একরকম মনে হয়। ঐদিন উনি তাদের মেজোমেয়ে শীলার জন্মের কথা গল্প করলেন। আমেরিকাতে মেয়ে জন্মের সাথে সাথে উনি এমন বিকট আওয়াজে আজান দিয়েছিলেন যে লেবার রুমের ডাক্তার নার্স সবাই নাকি হতভম্ব হয়ে গেছিল।
এরপর আবার গিয়েছিলাম উনার শহীদুল্লা হলের বাসায়। কয়েকবার গিয়েছিলাম। একবার উনি ঈদের উপন্যাস লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলেন বলে সবাইকে নাকি বলতে বলেছিলেন, কেউ আসলে যেন বলে উনি বাড়ী নেই। কিনতু আমাদের বেলাতে আর তা হয়নি। গুলতেকিন ভাবী আমাদেরকে পছন্দ করতেন (আমার স্বামী একজন সর্বজন প্রিয় মানুষ), তাই আনন্দের সাথে ভেতরে ঢুকিয়ে হুমায়ুন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন। গুলতেকিন ভাবী আমাকে ভেতর নিয়ে গিয়ে যখন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়ীটা দেখাচ্ছিলেন, তখনই দেখলাম, বারান্দায় একটা জলচৌকি পাতা, তার উপর উনার কাগজ কলম শোভা পাচ্ছে। আরেকদিন উনার সাথে আমরা গল্প করছি, কি একটা জিজ্ঞেস করেছিলাম উনাকে, উনি বললেন যদি কোন কৌতুহল থাকে উনাকে জিজ্ঞেস করতে। আমি জানতে চেয়েছিয়াম সব গল্পে ‘জরী’ নামটা থাকে, এটা কার নাম।উনি বলেছিলেন উনি গুলতেকিন ভাবীর নাম দিয়েছিলেন জরী। আরও অনেক মজার ঘটনা, কত গল্প শুনেছি উনার মুখে। উনার সাথে আড্ডায় বসলে উনি একাই একশ যে কোন আড্ডাকে আনন্দময় করে তুলতে।
এরপর ’৯১ সালের প্রথম দিকে আমার স্বামী আমাকে আর আমার মেয়ে মৌটুসীকে নিয়ে গেছিলেন উনার শহীদুল্লা হলের বাড়ীতে। ‘’অয়োময়’ নাটকের শ্যুটিং দেখাবে বলে। ঐ সময় দুটি ঘটনা ঘটে। হুমায়ুন ভাই ও গুলতেকিন ভাবীর প্রথম ছেলে বাচ্চাটা জন্মের পরেই মারা যায়, আবার ঠিক তখনই ভাবীর দেহে আগমন ঘটে দ্বিতীয় ছেলে নুহাশের। আরেকটা ঘটনা হলো হুমায়ুন ভাই বড়লোক হতে শুরু করেন। পাবলিশার থেকে উনাকে লাল টুকটুকে একটা গাড়ী দেয়া হয়। ঐ গাড়ীতে করেই আমাদের টিভি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় নাটকের শ্যুটিং দেখানোর জন্য। সুবর্না মোস্তফা, বিপাশা হায়াত, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূর সহ সবাইকে দেখে এত ভাল লাগছিল! সুবর্না মোস্তফার মনে পড়েনি ১৫/১৬ বছর আগে আমার স্বামী তার গৃহশিক্ষক ছিলেন। অথচ ২০০০ সালে আড়ং এ একবার দেখা হয়েছিল গোলাম মোস্তফার সাথে। গোলাম মোস্তফা কিনতু ঠিক আমার স্বামীর ডাকনাম ধরেই ডাকলেন, নিজের স্ত্রীকে মনে করিয়ে দিলেন যে এই দুলাল উনার মেয়ের শিক্ষক ছিল। আমরা আমেরিকা চলে আসার আগে হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহীদ মিনার অথবা বইমেলা থেকে ফেরার পথে। আমাদের ছোট্ট মিথীলা ছিল তার বাবার কাঁধে, আর দুই মেয়ে মৌটুসী ও মিশা ছিল আমার পাশে। হঠাৎ করেই দেখতে পেলাম হুমায়ুন ভাই আর প্রয়াত অভিনেতা মোজাম্মেল হোসেন কে খুব তাড়াতাড়ি করে ভীড় ঠেলে পার হতে। আমার স্বামী হুমায়ুন ভাই বলে ডাক দিতেই উনি থেমে ছোট মেয়েকে দেখিয়ে শুধু বললেন, ভালই চালিয়ে যাচ্ছ! আমিও কথাটা লুফে নিয়ে বললাম, আপনার পথ অনুসরন করছে! ব্যস! খুব একদফা হাসাহাসি হলো, যে যার পথে চলে গেলাম।
হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে এর পরেও আমার বরের দেখা হয়েছিল, কি একটা ডকুমেন্টারী শিক্ষামূলক ফিলম করার জন্য কোন প্রতিষ্ঠান মনে হয় আমার স্বামীকে ধরেছিল যেন হুমায়ুন ভাইকে দিয়ে স্ক্রিপ্টটা লিখিয়ে দেয়। আমার স্বামী আবার সেবামূলক কাজ খুব আনন্দের সাথে করে দেয়, তাই সাথে সাথে হুমায়ুন ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব করেছিল স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজটা করে দিতে। কি জানি কি মনে হয়েছিল হুমায়ুন ভাইয়ের, অনেক পারিশ্রমিক চেয়ে বসেছিলেন। ফলে ওটা আর করা হয়নি, আমার বরের মনেও ভীষন ধাক্কা লেগেছিল। এরপর আর কোনদিন হুমায়ুন ভাইয়ের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি।ইগোতে লেগেছে আমার বরের। তারপরেও ২০০০ সালের নভেম্বারের ১৮ তারিখে হুমায়ুন ভাইকে ফোন করে আমার বর বলেছিল, ‘হুমায়ুন ভাই আজ আমাদের বড় মেয়ের জন্মদিন, ওকে একটু আশীর্বাদ করে দিন’। হুমায়ুন ভাই আমার মেয়েটাকে আশীর্বাদ করলেন।
এরপর আমরা আমেরিকা চলে এসেছি ২০০১ সালে, কত নতুন নতুন খবর শুনতাম। মনটা খারাপ হতো, গুলতেকিন ভাবীর কথা মনে পড়তো। তাদের দুইজনের জন্যই আমার কষ্ট হতো, আমি কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি আজ পর্যন্ত। তাই যে কোন আলোচনাতে আমি বা আমার স্বামী কোন মন্তব্য করিনা। অন্যের মুখে যখন হুমায়ুন ভাইয়ে নিন্দা শুনি খুব কষ্ট পাই, আবার গুলতেকীন ভাবীর পক্ষে যখন কেউ কিছু বলে সেটাও খুব সত্যি বলে বিশ্বাস করি। মানুষের মন, কখন কোন দিকে বাঁক নেয়, কেউ বলতে পারেনা। আমি গুনী মানুষের গুনটুকুই দেখি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে যাইনা। যে যেখানে আছে, যেভাবে আছে, সুখে থাকুক ভালো থাকুক।
আমার মনটা আজ খুব বেশী খারাপ হয়ে গেছে। হুমায়ুন ভাইয়ের এই কঠিন রোগ যেন আমেরিকার ডাক্তারের কাছে পরাস্ত হয়, অনেক আশা নিয়ে হুমায়ুন ভাইকে এদেশে আনা হয়েছে, আশাপূর্ণ করে যেন হুমায়ুন ভাই হাসতে হাসতে দেশের ছেলে দেশে ফিরতে পারেন, মায়ের ছেলে যেন মায়ের কাছে ফিরতে পারেন, ছোট্ট ছোট্ট দুইটা ফুলের মত শিশুর বাবা যেন তাদের কাছে হাত ভর্তি বেলুন নিয়ে ফিরতে পারেন, এই শুভ কামনা করে যাব যতক্ষ্ণণ প্রয়োজন হয় ততক্ষণ।

Wednesday, July 18, 2012

বিউটি পার্লার

মানুষজনকে নেমন্তন্ন খাওয়াতে  আমার খুব ভালো লাগে, তার চেয়েও বেশী ভালো লাগে কারো কাছ থেকে নেমন্তন্ন পেলে। আমাকে কেউ নেমন্তন্ন করলে আমি সেটা আনন্দের সাথে গ্রহন করি এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার আপ্রান চেষ্টা করি। প্রবাস জীবনে নিঃসঙ্গতা কাটাতে বাঙ্গালীরা প্রায়ই নানা উছিলায় একটা গেট টুগেদারের আয়োজন করে। ঐ সকল গেট টুগেদারগুলোতে, তা যতই সাধারন হোক না কেনো, সকলেই সেজেগুজে যায়।  দেশ থেকে নিয়ে আসা লেটেস্ট ডিজাইনের শাড়ী, অথবা যে কোন সুন্দর শাড়ী পরার একটা সুযোগ পেয়ে গেলে , কোন মেয়ের পক্ষেই তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না। তাছাড়া, কার শাড়ী কত বেশী দামী অথবা কার  নেকলেসটি  দেশের সবচেয়ে দামী জুয়েলার্স থেকে কেনা হয়েছে, সেগুলো দেখানোর একটা ব্যাপারও আছে, বিশেষ করে  মহিলাদের মাঝে নীরব প্রতিযোগীতা চলে । মেয়ে বা মহিলারা তো সাজেই, সাথে  পুত্র এবং স্বামীটিকেও বাঙ্গালী সাজে সাজিয়ে আনে। তবে  সকলেই সাজগোজ নিজের ঘরেই নিজ হাতেই করে। বিউটি পার্লারে যায়না। প্রবাসের গেট টুগেদারগুলোর প্রধান উপলক্ষ হচ্ছে কারো বিবাহ বার্ষিকী নয়তো বাচ্চার বার্থডে.  প্রবাসে ছেলেমেয়েরা ক্যারিয়ার নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে, বিয়ের ব্যাপারে কারোর মধ্যেই তেমন উৎসাহ দেখা যায়না। ফলে আমাদেরও আর বিয়ের নেমন্তন্ন খাওয়া হয়না। অথচ দেশে সকলেই দেদারসে বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে চলেছে! ফেসবুকে প্রতিদিনই কারো না কারো ওয়ালে সুন্দর সুন্দর বিয়ের ছবি আপলোড হতে দেখি। নিজের বিয়ের ছবি ছাড়াও অনেকেই ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবীর বিয়ের ছবিও পোস্ট করে। আমার খুব ভালো লাগে ছবিগুলো দেখতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে সকলেই  ঝলমলে সাজে সেজে আসে, নতুন ডিজাইনের শাড়ীতে, গোল্ড প্লেটেড গয়নাতে, বিউটি পার্লারের মেকাপে প্রতিটি মেয়েকে যেমন ভালো লাগে, তেমনি বলিউডের নায়কদের মত জমকালো ডিজাইনের চুড়িদার, গলায় জয়পুরী কাজের উড়নী, পায়ে আধুনিক ডিজাইনের নাগরাতে প্রতিটি ছেলেকে দেখতেও দারুন ভালো লাগে। ভালো লাগার বড় একটি কারন হচ্ছে  বিয়েবাড়ীতে আসা অতিথিদের হাস্যোজ্জ্বল, প্রানবন্ত মুখশ্রী দেখা যায়। আরেকটি ব্যাপার খুব লক্ষ্যণীয়, ছবিতে দেখে মনে হয়না আজকাল কেউ নিজ ঘরে নিজ হাতে সাজে। ছবিতেও মুখে চড়া মেকাপের ছাপ স্পষ্ট বুঝা যায়। যে মেয়েকে আমি কৃষ্ণবর্ণ দেখেছি, তাকেও যখন  ঐশ্বরিয়ার মতই ফর্সা মসৃন সাজে দেখি, মন ভালো না হয়ে উপায় আছে! আফসোসও হয়, আহারে! আমাদের তরুন বয়সটাতে 'বিউটি পার্লারের' নামই জানতে পারিনি। তখন তো আর এমন ব্যাঙের ছাতার মত অলিতে গলিতে বিউটি পার্লার গজায়নি। পার্লার গজালে মন্দ হতোনা, আমিও নিজেকে একবারের জন্য হলেও ' সুচিত্রা সেন' সাজিয়ে নিতে পারতাম! তবে আমি নিজে নিজেই সাজতে ভালোবাসি, দামী না হলেও সুন্দর কাপড়-চোপর পড়তে ভালোবাসি। কিছু সময়ের জন্য মনটা ভালো থাকে। কোন রকম মালিণ্য  মনকে স্পর্শ করতে পারেনা। ইদানিং শুনি ছেলেদের জন্যও আলাদা পার্লার আছে। সেখানে ছেলেরা যায় স্পা তে, মেয়েদের মতো ছেলেরাও ফেসিয়াল করায়। খুবই আশাব্যঞ্জক কথা। ছেলেরাও রূপ সচেতন হয়েছে।  সত্যি কথা বলতে গেলে, রূপচর্চ্চা শুধু  মেয়েদের জন্যই নয়, সকলেরই উচিৎ নিজেকে আরেকটু ভালোভাবে, সুন্দরভাবে যত্নে রাখা।

এবার দেশে এসে বেশ কয়েকখানা বিয়ের নেমন্তন্ন পেয়েছি। দুই একটা অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি নানা কারনে। সময়ের সাথে মিলছিলনা অথবা অন্য প্রোগ্রামের সাথে ম্যাচ করছিলোনা। তবে বেশীর ভাগ অনুষ্ঠানেই উপস্থিত হয়েছি।আমার নিজের মেয়ের বিয়েও দেশে আয়োজন করেছি। তবে নিজের মেয়ের বিয়েতে খুব টেনশানেই কেটে গেছে পুরোটা সময়। অনুষ্ঠান ঠিকমত সম্পন্ন হবে কিনা সে চিন্তাতেই মগ্ন ছিলাম। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের প্রতি 'কনের মা' সুলভ আচরন করতে যেয়ে কারো সাজগোজ, বিউটি পার্লারের মেকাপ, নতুন ডিজাইনের শাড়ী, পাজামা-পাঞ্জাবী, বাচ্চাদের
পোষাকের ঔজ্জ্বল্য খেয়াল করতে পারিনি। আর আমি নিজেতো টেনশানে এতটাই অস্থির ছিলাম যে নিজে সাজ করার সুযোগ পাইনি অথবা 'কনের মায়ের সাজতে নেই' ভয়ে সাজিনি। তারপরেও অবিন্যস্ত ছোট চুলেই ক্লিপ দিয়ে বেলী ফুলের মালা জড়াতে ভুলিনি। চুলে বেলী বা রজনীগন্ধার মালা প্যাঁচানোর স্টাইল কলকাতাতে প্রথম দেখেছিলাম। ছোটবেলায় বাবা মায়ের সাথে দুই বছর পর পর কলকাতা বেড়াতে যেতাম। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে বিয়েবাড়ীর যাত্রী অথবা বিয়েবাড়ী ফেরৎ সুন্দরীদের চুলে জড়ানো বেলী বা রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধে চারপাশ ম ম করতো, সেই স্টাইল এখনও ধরে রেখেছি।

বলতে চাইছিলাম বিউটি পার্লারের গুনবন্দনা। কিভাবে কালোকে সাদা বানায়, শেফালীকে মাধুরী বানায়, ধানমন্ডির 'রেখা'কে বলিউডের 'রেখা' বানিয়ে ফেলে। দুই বছর আগেই আমার এক আত্মীয় বিয়ে করেছে। বিয়েতে আমি  উপস্থিত ছিলাম। বিয়ের কনের ছবি দেখেছিলাম অনেক আগে, মিষ্টি মেয়ে। কিনতু বিয়ের আসরে গিয়ে সেই ছবিতে দেখা মেয়েকে চিনতেই পারছিলামনা। একেবারে বলিউডের নায়িকা, ঢাকার নায়িকা নয়। দু'দিন পরে বৌভাতের অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি বৌকে আরেকরকম লাগছে। পরে জেনেছি দুই অনুষ্ঠানে ভিন্ন পার্লারে সাজানো হয়েছে কনেকে। ১৪ হাজার টাকা অথবা ২০ হাজার টাকা খরচ পড়েছে একেকদিন। পার্লারে সাজার খরচেও রকমফের আছে। 'ম্যাডাম' এসে চোখে কাজলের টান দিলে অতিরিক্ত পয়সা আর ম্যাডামের এসিস্ট্যান্ট সাজালে অনেক কম খরচ। যে কনে, সে স্বপ্ন দেখে বিয়েতো একবারই হয়, নাহয় একদিন অমুক ম্যাডামের টাচ পড়লো তার সাজে।ভবিষ্যতে গাল ভরিয়ে গল্প করা যাবে বন্ধুদের সাথে।

বিয়ে বাড়ীতে সকলের সাজই কাছাকাছি ধরনের হয়ে থাকে। আগে মুখের মেকাপ আর চুলের স্টাইলই করতে যেত সবাই পার্লারে। কিনতু ইদানিং দেখি শাড়ী পড়তেও যায় বিউটি পার্লারে। আমিতো জানতাম সাধারনতঃ চুলের স্টাইল করতেই মেয়েরা পার্লারে যায়। আমার ধারনা যে কী পরিমান ভুল, সেটা খুব ভালো টের পাচ্ছি।  বিয়ে ছাড়াও বাচ্চার জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, বান্ধবীর গায়ে হলুদ, এমনকি কনে দেখার সময়ও মেয়েরা বিউটি পার্লারে চলে যায়। সেদিন  গিয়েছিলাম এক বিউটি পার্লারে। বাংলাদেশ থেকেই একটা হেয়ার স্টাইল করে নেওয়ার জন্য। পার্লারে ঢুকেই দেখি ছোট পরিসরের কক্ষটিতে বিয়ের কনে গায়েহলুদের সাজ করে বসে আছে, আর  সখীবৃন্দ ক্যাঁচোড় ম্যাচোড় করে চলেছে। সখীদের সাজ দেখে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। সাজ এত বাজে হয়েছে যে ঘরে বসে সাজলে এর চেয়েও ভালো সাজ ওরা নিজেরাই করতে পারতো।  পাশে থাকা কাজিনকে জিজ্ঞেস করলাম যে মেয়েগুলোকে অমন যাত্রার ঢঙে সাজালো কেনো? কাজিনের উত্তর, ' যে যেমন প্যাকেজ নিবে তার সাজও তেমনই হবে। ওরা হয়তো একেবারে সস্তা প্যাকেজ নিয়েছে"! তাই বলে এমন! হেয়ার স্টাইল ওখান থেকে করাইনি। বেরিয়ে অন্য দোকানে চলে গেছিলাম। অন্য দোকানে যাওয়ার কিছুক্ষন পরেই দরজা ঠেলে ঢুকলো  নাক মুখসহ  আগাগোড়া  কালো বোরকায়  আবৃত দুই জন। বোরকার ঢাকা না খুলেই একজন হেয়ার ড্রেসারকে বলছে, " ইনি আমার মামী, এনার ভুরু ঠিক করি দ্যান"। ভাগ্নীর কথা শেষ না হতেই মামী বোরকার মুখ খুলে ফেলেছে। মামীটা খুব সুন্দর দেখতে। আমি দারুন চমৎকৃত হলাম।পারিবারিক চাপে হয়তোবা মামী  নাক মুখ ঢেকেই চলাফেরা করে, কিনতু সাজগোজের প্রতি নারীর দূর্বলতাই নারীকে এখানে এনেছে।

বিয়েতে গিয়েছি, মেয়ে বা মহিলাদের দিকে তাকিয়েও থেকেছি,  সকলের  আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে মনটা ভরে গেছে। কারো কারো সাজ খুবই পরিমিত আবার কারো মুখে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মেকাপ। এক সুন্দরী মেয়েকে দেখলাম, নীল জর্জেট শাড়ীর রঙ যতটা নীল, তার চেয়েও বেশী নীল মেয়ের চোখের পাতার মেকাপের রঙ। মেয়েটির দিকে তাকানো যাচ্ছিলনা। কিন্তু সবাই খুব আনন্দ করছে দেখে এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাইনি। ছেলেদের অনেককেই দেখি আমির খান স্টাইলে দাড়ি রাখে, দারুন স্মার্ট পাঞ্জাবী গায়ে সকলকেই ভালো লাগছিলো। আমি নিজেও মনের আনন্দে সেজেগুজে বিয়ে খেয়ে এসেছি। তবে আমি কোন বিউটি পার্লারে যাইনি, নিজের মত করেই সেজেছি। কালো চামড়া সাদা করিনি, মাথার চুলে কলপ দেইনি, তারপরেও মহানন্দে কাটিয়েছি।

একবার ভেবেছি বিউটি পার্লারে গেলে মন্দ হতোনা । ইদানিং বিউটি পার্লারের খুব রমরমা, ভীড় লেগেই থাকে, যখন ইচ্ছে গেলেই সব পাওয়া যায়না। লাইন ধরে বসে থাকতে হয়। বিয়ের কনেকে সাজাতে হলে ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার মত করে বিউটিশিয়ানের এপয়েন্টমেন্টও নিতে হয়। আমার মেয়ের খুব শখ ছিল একেবারে রবীন্দ্রযুগীয় মেকাপ নেয়া। পনের দিন আগে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়েছে। বিয়ের দিন আমার মেয়ে পার্লারে গেছিল চার ঘন্টা সময় হাতে নিয়ে। চার ঘন্টা পর পার্লার থেকে বের হয়েছে রবীন্দ্র নায়িকা হয়ে।


Thursday, July 5, 2012

বালিকার চেতনা!

আজকে গিয়েছিলাম উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার দাদা থাকেন ওখানে। আমার সাথে আমার দুই মেয়ে মিশা ও মিথীলাকেও নিয়েছিলাম। মিথীলা আমার ছোট মেয়ে, বয়সে এখনও বালিকা। ওদের নিয়ে দুই বছর পর পর দেশে আসি। নানা জায়গা ঘুরে বেড়াই। আমার ছোট মেয়েটা বাংলা বলতে পারে মোটামুটি ভালই, এতোদিনে পড়তেও শিখে যেতো। অনেক ছোটবেলাতেই মিথীলার বর্ণ পরিচয় হয়ে গেছিল। তারপরে আমি নিজে চাকুরী করা শুরু করতেই ওকে নিয়ে আর বসতে পারিনি। তবে মাঝে মাঝেই হুমকী ধমকী দেই। ওকে নিজে নিজেই বাংলা বই পড়ে পড়ে বাংলা চর্চ্চা রাখতে বলি। মুখের কথা মুখেই থেকে যায়, ছোট মানুষ সে, কতটুকুই বা চর্চ্চা করতে পারে কে জানে! পরখ করে দেখার জন্য আমি ওকে কমপিউটারের সামনে ডেকে বাংলা পত্র পত্রিকা থেকে কিছু কিছু পড়ে শোনাতে বলি। একটু সময় নেয় পড়তে, তারপরেও মিথীলা পড়তে পারে, বুঝি আমার হুমকী ধমকীকে এখনও ভয় পায়। এবার বাংলাদেশে এসেই মিথীলাকে বলে দিয়েছি, " তুমি বাংলাদেশে থাকতে থাকতে যদি বাংলা গড়গড়িয়ে পড়তে না শেখো, নেক্সট টাইম তোমাকে নিয়ে আসবোনা। আমি একা একা চলে আসবো"। ওর জন্য মারাত্মক হুমকী। কারন মিথীলা বাংলাদেশে আসতে পছন্দ করে, আরও বেশী পছন্দ করে আমার সাথে ঘুরে বেড়াতে। আমার এই হুমকী শুনে ও মুখে কিছু বলেনি, ভেতরে ভেতরে একটু ঘাবড়ে গেছে।
বাংলাদেশে এবার এসে ঢাকা শহরের ট্র্যাফিক জ্যাম দেখে ভড়কে গেছি। ৩০ মিনিটের রাস্তা গাড়ীতে করে যেতেও প্রায়ই দুই আড়াই ঘন্টা লেগে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে লাগে সাড়ে চার ঘন্টা। তবুও বের হচ্ছি প্রায় প্রতিদিন। সাথে থাকে মিশা ও মিথীলা। আমি গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ঢাকার জনজীবন দেখি। আমার ভালো লাগে। কত রকমের মানুষ, একেক জনের মুখের অভিব্যক্তি একেক রকম। মিশা কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে আইপডে গান শুনে আর বাইরে চোখ রাখে কোথা দিয়ে আমড়ার ঝুড়ি নিয়ে ফেরিওয়ালা যাচ্ছে। আমড়াওয়ালা দেখলেই ওকে আমরা কিনতে হবে। ধোওয়া ধুয়ির বালাই নেই, মরিচ লবন মিশিয়ে কচকচ করে আমড়াগুলো খায় আর মাথা দুলিয়ে গান শুনে। মিথীলা এমনিতেই শান্ত স্বভাবের। ও এভাবে রাস্তার জিনিস খাবেনা। ও খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। খাবার দাবারও না ধুয়ে খায়না। তাহলে গাড়ীতে ওর সময় কিভাবে কাটে? মিথীলা আমার মতই দুই চোখ জানালার বাইরে মেলে রাখে। কি ভাবে কে জানে! মাঝে মাঝে ওকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করি, " ঐ রিক্সার গায়ে কি লেখা আছে বলতো"। মিথীলা বলে, " মায়ের দোয়া"। একটা পারলে আরেকটা জিজ্ঞেস করি। ড্রাইভার সাহেব বলে উঠে, " আন্টিতো ভালই বাংলা পারে দেখি। এত কষ্ট কইরা বাংলা শিখা কি হইব? আন্টিতো আর বাংলাদেশে আইবোনা'। আমি বলি, " কে জানে, আসতেওতো পারে। পড়ালেখা শেষ করে এখানেই বড় চাকুরী করবে, সবার সাথে আরামে আনন্দে থাকবে"। আমি এসব কথা ইচ্ছে করেই বলি। মিথীলার চোখে একটা স্বপ্ন এঁকে দিতে চাই। এই যে আমার প্রচ্ছন্ন হুমকীতে একটু হলেও ভয় পেয়ে মিথীলা বাংলা চর্চ্চা করে যাচ্ছে, এতেই আমার আনন্দ।
আজকে গাজীপুর যাওয়ার পথে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়েছি। আমাদের সামনেই ছিলো একটা অটো। মিথীলা আমাকে ডেকে অটোর গায়ে লেখা 'স্কাইলাইন' শব্দটি দেখালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, " এই যে স্কাইলাইন লেখা আছে, দন্ত্য'স কে কি এভাবেই লিখে সব জায়গাতে"? আমি বললাম যুক্তাক্ষরগুলোতে এভাবেই লিখে। আমি কিনতু যুক্তাক্ষরকে মিথীলার সাথে যুক্তাক্ষরই বলি। এসব কঠিন শব্দ নিয়ে আগে থেকেই গল্পচ্ছলে কথা বলতাম। একটু পরেই মিথীলা জিজ্ঞেস করলো, "প্রগতি মানে কি"? বলে দিলাম প্রগতি মানে উন্নতি। এরপরেই এক ধমক দিলাম, " এই মেয়ে, তুমি আর কতকাল এই একটা দুটা করে শব্দ পড়ে যাবে? গড়গড়িয়ে পড়তে না পারলে কিনতু তোমাকে নেক্সট টাইম আমি সত্যি সত্যি আনবোনা"। মিথীলা বললো, " আমি মনে মনে সব পড়ি, শুধু যে শব্দের মানে জানিনা, সেটাই তোমাকে জিজ্ঞেস করি"।
গাড়ী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে গেলো। এই প্রথম খেয়াল করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার মুখেই সম্ভবতঃ তিনকোনা টাইপের একটি স্থাপত্য শোভা পাচ্ছে যার প্রথমটিতে বংগবন্ধুর মুখচ্ছবি খোদাই করে অংকিত আছে। কিছু না ভেবেই আমি মিথীলাকে জিজ্ঞেস করলাম, " মিথীলা বলতো এটা কার ছবি"?
মিথীলার জবাবঃ "শেখ মুজিবুর রহমান"।
আমিঃ " নামের আগে বংগবন্ধু বলতে হয়। তুমি কি জানো উনি কে ছিলেন"?
মিথীলাঃ " ঐ যে ফ্রীডম ফাইটের লীডার, মানে মেইন লীডার ছিল"।
আমি ভেতরে ভেতরে খুশীতে ফুটতে শুরু করেছি। আরেক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করলাম, " আচ্ছা একটু বুঝিয়ে বলো, ধরো আমেরিকার কোন লীডারের সাথে বংগবন্ধুকে তুলনা করা যায়"?
মিথীলার চটপট উত্তরঃ মার্টিন লুথার কিং"।
মিথীলার এই উত্তর শুনে সামনে বসে থাকা মিশা ঝট করে আমার দিকে তাকালো, দুজনেই চমৎকৃত হয়েছি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমার মাথায়ও আসেনি মার্টিন লুথার কিং এর নাম। মিথীলাকে প্রশ্ন করে আমি নিজেও খুঁজছিলাম আমেরিকান লীডারের নাম, যাঁর সাথে বংগবন্ধুকে তুলনা করা যায়"।
মিথীলার জবাব আমার মাথায় আটকে আছে। সত্যিইতো, মার্টিন লুথার কিং সংগ্রাম করেছিলেন কালোদের মুক্তির জন্য আর বংগবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন বাঙ্গালীর মুক্তির জন্য। মার্টিন লুথার কিং যেমন আততায়ীর গুলীতে নিহত হয়েছিলেন, বংগবন্ধুও তেমনিভাবেই আততায়ীর গুলীতে নিহত হয়েছিলেন। মিথীলার এর চেয়ে বেশী কিছু জানার কথা নয়। দুই বছর আগে মিথীলাকে নিয়ে ৩২ নাম্বার বাড়ীতে গিয়েছিলাম। সেদিন ঐ বাড়ীতে প্রধানমন্ত্রীর আসার কথা ছিল বলে আমরা ১৫ মিনিটের বেশী সেখানে থাকতে পারিনি। ঐ ১৫ মিনিটে যতটুকু দেখার এবং যতটুকু বুঝার তা মিথীলা বুঝে নিয়েছিল। সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতাটুকু দিয়েই ও দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েছে। আমি মিথীলার মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম। বারো বছর বয়সী ছোট্ট মিথীলা, যে দুই বছর বয়স থেকেই আমেরিকাতে বড় হচ্ছে, সেই মিথীলা বাংলা পড়তে পারে, বংগবন্ধুর প্রতিকৃতি দেখে চিনতে পারে, তার চেয়েও বড় কথা, বংগবন্ধুকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে (ছোট্ট করে হলেও), এর চেয়ে বেশী আর কি চাইতে পারি আমি! মিথীলা যেখানে থাকে, তার আশেপাশে কোন বাঙ্গালী নেই, যতটুকু শিখছে তার সবটুকুই ঘরে বসে, আমার হুমকী ধামকী খেয়ে। আমিও কি একটু গর্ব বোধ করতে শুরু করেছি? না, আমি গর্ব বোধ করছিনা তবে আত্মতুষ্টি বলে একটা ব্যাপার আছে, আমি সেটুকু অনুভব করছি। নাহ! মিথীলাকে নিয়ে আসতেই হবে। যতবার বাংলাদেশে আসবো, ততবার ওকে নিয়ে আসবো। তবে হুমকী ধামকী চালিয়ে যাবো।

Tuesday, June 26, 2012

সেদিনের কলিকাতা, এদিনের কলকাতা


কলকাতা ঘুরে এলাম। কলকাতা ভ্রমণ আমার জন্য নতুন কোন ঘটনা নয়। অনেক ছোটবেলা থেকেই আমি কলকাতা যাওয়া আসা করি। বলতে গেলে কলকাতা আমার 'সেকেন্ড হোম'। কারন আমাদের পরিবারের বেশ কিছু স্বজন '৬৪ সালের  পরেই তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে 'কলিকাতা' চলে গেছিলেন। আমার বাবা মায়ের সাথে আমরা আজ অবধি স্বদেশেই আছি। আগে আমার বাবা মা আমাদেরকে নিয়ে প্রতি দুই বছরে একবার কলিকাতা যেতেন। ওখানে গিয়ে আমরা আমাদের কাকাদের বাড়ীতে উঠতাম, কাকাত ভাই-বোনদের সাথে মিলে মিশে একটি মাস মহা আনন্দে পার করে দিতাম। '৭০ সালে আমরা প্রথম গিয়েছিলাম কলিকাতা। সেবারে আমার বাবা যেতে পারেননি, আমার মা, দাদু, দিদিমা, মাসীদের সাথে গিয়েছিলাম কলিকাতা নামের বিস্ময় নগরী দেখতে। বিস্মিত হয়েছিলাম ঠিকই। বয়স খুবই কম ছিল, তারপরেও 'গড়ের মাঠে' আমার তিন বছর বয়সী ছোট ভাই লাল টুকটুকে ফুলস্লীভ গেঞ্জী পড়ে দৌড়াচ্ছিল, ঘটনাটি মনে আছে। 'শোভা বাজারের 'পরেশনাথের মন্দির' দেখতে গিয়ে আমার তের বছর বয়সী বড়দা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে গিয়ে সব গুবলেট করে ফেলেছিল, সবাই মিলে খুব হাসাহাসি করছিল, এটাও মনে আছে। আরও মনে আছে চিড়িয়াখানা, যাদুঘর দেখার টুকরো টুকরো স্মৃতি। 'ইলেকট্রিক ট্রেন' দেখার প্রাথমিক উত্তেজনা, ট্রেন স্টেশানে ঢুকার অনেক আগে থাকতেই আমার মা আমাদেরকে সাবধান করতে থাকতেন, " সবাই দূরে থাক, নাহলে ট্রেনের বাতাসে উড়ে গিয়ে ট্রেন লাইনে পড়ে যাবে"। আমরাও দূর থেকে ট্রেনের  লাইট দেখার সাথে সাথে বড়দেরকে জাপটে ধরে রাখতাম। ট্রেনে উঠা ছিল আরেকটি মজার ব্যাপার। কী যে ভীড় লেগেই থাকতো ট্রেনে! আমাদের ছোটদেরকে কেউ না কেউ কোলে তুলে নিত, তারপরেই এক ধাক্কায় ট্রেনে উঠে পড়তো। ট্রেনে একবার উঠতে পারলেই শুরু হতো নাম ধরে ডাকাডাকি," মনা উঠছে? দেখতো মানিক, চঞ্চল উঠলো কিনা", এগুলো এখনও স্পষ্ট মনে আছে।

আমার প্রথম কলিকাতা যাত্রা ১৯৭০ সালে। '৭০ সালে গিয়েছিলাম মাসখানেকের জন্য বেড়াতে, আমার মা বই পড়ে পড়ে দর্শনীয় স্থানগুলো আগেই পরিকল্পনায় রেখেছিলেন বলেই একমাসে অনেক দেখেছি। দ্বিতীয়বার কলিকাতা গেলাম ১৯৭১ সালে।  '৭১ সালে অবশ্য বেড়াতে যাইনি,  গেছিলাম শরণার্থী হয়ে! আট নয় মাসের মত ছিলাম কলিকাতাতে। অন্য রকম সময়, অন্য রকম এক কাল কাটিয়েছি তখন। অবশ্য কলিকাতার মানুষের জীবনের দৈনন্দিন অভ্যাসে তেমন কোন পরিবর্তন ছিলনা। সেই একরকম ভাবেই ঘুম থেকে উঠেই বাদুরঝোলা হয়ে ইলেকট্রিক ট্রেন চেপে কাজে যাওয়া, অথবা ঘুম থেকে  উঠেই 'ঘুঁটে' দিয়ে কয়লার উনুন জ্বালানো, সারাদিন রাস্তাঘাটে মানুষের কোলাহল, চায়ের স্টলগুলোতে কয়লার উনুনে সারাদিন চায়ের কেটলীতে চা ফুটতো, বিকেল হতেই তেলেভাজা, আলুকাবলী, ঝালমুড়ি, ঘটিগরম, আলুর চপ, বেগুনী ভাজা হতো। ছোটবেলার স্মৃতিতে এগুলোই ধরা ছিল। '৭১ সালের আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে, ঐ সময় অনেকেরই চোখ লাল হয়ে এক ধরনের ইনফেকশান হতো (কনজাংটিভাইটিস) যার নাম দেয়া হয়েছিল 'জয় বাংলা'। কারো কনজাংটিভাইটিস হলেই বলা হতো "ওর জয় বাংলা হয়েছে"।, কলিকাতার অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে মিলে আমরাও বলতে শিখেছিলাম, " জয়বাংলার লোক ঢ্যাবা ঢ্যাবা চোখ'। আমাদের মায়ের কাছে একদিন খুব বকা খেয়েছিলাম এর জন্য। তারপর থেকে আর বলতামনা। সাত আট মাসে আমরা কলকাত্তাই বাংলা শিখে গেছিলাম প্রায়। 'খেয়েচি, গিয়েছি, এলুম গেলুম' টাইপ কথা। এরপরে দেশ স্বাধীন হতেই নতুন বাংলাদেশে ফিরে এলাম।

স্বাধীনতার পরে আমার ঠাকুরমাকে দেখতে আমরা দুই বছর পর পর কলিকাতা যেতাম একমাসের শীতকালিন ছুটিতে। আমাদের আনন্দের সীমা থাকতোনা। ইলেকট্রীক ট্রেন চড়া, আলো ঝলমলে কলিকাতা নগরী দেখা, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাওয়ার মজাই ছিল আলাদা। আর আত্মীয়-স্বজনদের আদর সমাদরতো ছিলই। আমরা ছিলাম ছোট ছোট। বাংলাদেশে তখনও রকমারী খাবার দাবারের চল শুরু হয়নি। ঢাকার মিষ্টির দোকানগুলোতেও রসগোল্লা, চমচম, রাজভোগ, কালোজাম, সন্দেশ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যেতোনা। 'কমলাভোগ, ক্ষীরভোগ, মিহিদানা, তালশাঁস, শোনপাপড়ি, জলভরা সন্দেশের নাম কলিকাতাতে গিয়েই প্রথম জেনেছি। চানাচুরের কত রকম বাহার যে ছিল। ঝাল চানাচুর যেমন ছিল, নরেশ কাকুর দোকানে মিষ্টি চানাচুরও পাওয়া যেত। দেশে থাকতেই আমরা পরিকল্পনা করতাম কলিকাতাতে গিয়ে কি কি খাব! দুই একটা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে মা নিয়ে যেত, আমরাও যেতাম  তবে 'অখুশী' মনে। কারন ঐ বাড়িগুলোর মালিক ধনী হলেও চায়ের সাথে শুধুই ব্রিটানিয়া থিন এরারুট বিস্কুট খেতে দিত। আরেকটা বাড়ীতে যেতাম খুব খুশী মনে। তারা স্বচ্ছল ছিলনা কিনতু আমাদেরকে 'মহিষের দুধ' এর রসগোল্লা খাওয়াতো। মহিষের দুধ দিয়েও মিষ্টি তৈরী হয়, এটা জেনেছি কলিকাতাতে গিয়ে। মাটির ভাড়ে করে চা বিক্রী হতো, রসগোল্লা আসতো মাটির ভাঁড়ে, রসের গুড় আসতো মাটির কলসীতে করে। আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত নিয়মিতভাবেই বাবা মায়ের সাথে কলিকাতা গিয়েছি। তখনই দেখেছি, কলিকাতার মেয়েদের স্বাধীন মুক্ত জীবন। কোন মেয়েকে সাথে ভাইকে পাহারা নিয়ে কোথাও যেতে দেখিনি। কত মেয়েকেই দেখেছি রাত নয়টা দশটার পরেও টিউশানি সেরে বাড়ী ফিরতে, মেয়েদেরকে দেখেছি পুরুষদের সাথে ঠেলা ধাক্কা দিয়েই ট্রেনে উঠতে, ট্রেনের দরজায় পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদেরকেও ঝুলে দাঁড়াতে দেখেছি।রাস্তা দিয়ে একটা ছেলে ও একটা মেয়েকে পাশাপাশি হাঁটতে দেখেছি সেই কবে থেকে! এগুলো দেখতাম আর মনে মনে বিস্মিত হতাম। এগুলো দেখে দেখেই বোধ হয় আমার মা বাবা মাঝে মাঝে আমাকেও রাস্তাঘাটে একা একা চলতে দিতেন। তবে বাংলাদেশে মেয়েদের জীবন এখনও অনেকটাই প্রাচীন নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা। কলিকাতার মেয়েরা পাড়ার ছেলেদের মতই কিছুটা মাস্তান গোছের আচরনও করতো। আমার কাকার মেয়েকে আমি কী যে ভয় পেতাম। সব সময় আমাদেরকে শাসাত, " বেশী ঘাঁটাবিনা আমাকে, ঘুষি মেরে নাক উড়িয়ে দেবো" টাইপ কথা বার্তা বলে।

আমার বিয়ের পরে কলিকাতা আর তেমন করে যাওয়া হতোনা। প্রধান কারন ছিল, আমার শ্বশুরবাড়ীর কেউ কলিকাতাতে ছিলেননা। তাছাড়া ততদিনে আমার ঠাকুমাও স্বর্গবাসী হয়েছেন। আমিও দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি, কলিকাতা যাওয়ার সময় পাইনি। কিনতু তখনও কলিকাতাকে আমার সেকেন্ড হোম মনে হতো, যেখানে আমার কাকা-কাকীমা, মামা-মামী, মাসী-মেসোর মত অতি আপনার জনেরা থাকতেন।  আমার সাথে সকলের যোগাযোগ ছিল, ফলে কলিকাতা নিয়ে আমার উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি কখনও। আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা থাকতেন উত্তর কলিকাতাতে। উত্তর কলিকাতাতে সাধারনতঃ পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীদের বসবাস। খুবই জনবহুল এলাকা এই উত্তর কলিকাতা, চারিদিকেই  বাঙ্গাল টানে কলকাত্তাই কথা শোনা যায়, অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট, চারিদিকেই কয়লার উনুনের ধোঁয়া, বাড়ীর বাউন্ডারীর ওয়ালে গোবরের ঘুঁটে, রাস্তায় সাইকেলের ট্রিং ট্রিং ঘন্টি, রিক্সার প্যাঁ পোঁ, প্যাঁ পোঁ হর্ণ শুনেই আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। দক্ষিন কলিকাতা হচ্ছে বড়লোকের ঠিকানা এমনটাই জানতাম। আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা বড়লোক ছিলেননা বলেই উত্তর কলিকাতার আশে পাশে থাকতেন। দক্ষিন কলিকাতাতে রাস্তা ঘাট প্রশস্ত, বাস ট্রামের সুব্যবস্থা আছে কিনতু কোথাও কোন হ য ব র ল ভাব নেই, রিক্সার এত বেশী প্যাঁ পোঁ শোনা যায়না, এমনটা জেনেই বড় হয়েছি। উত্তর কলিকাতার ট্রেনে উঠলেই পকেট সাবধানে রাখার নির্দেশ থাকতো। যখন তখন পকেটমার হয়ে যেতো। ট্রেনের কামরায় উঠার মুখেই জমাট ভীড়, নামার মুখেও জমাট ভীড়, পকেটমার হওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। আমার বিয়ের অনেক পরে আমি আমার বরের সাথেই গিয়েছিলাম কলিকাতাতে। বেলঘরিয়াতে নেমেছি ট্রেন থেকে, সাথে ছিল নেদারল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা দামী কাঁধ ব্যাগ। আমার বরের কাছ থেকে পাওয়া এমন অমূল্য রতনটিকে কাঁধে ঝুলিয়েই বের হয়েছিলাম। ট্রেনে ভীড় ছিলনা, কিনতু দরজার কাছে বরাবরের মতই কিছু যাত্রী দাঁড়ানো ছিল। ট্রেন থেকে নামতেই হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার ব্যাগটা লম্বালম্বি করে ছুরী জাতীয় কিছু দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। বুকটা ধ্বক করে উঠতেই ব্যাগে হাত দিয়ে দেখি দুই হাজার টাকার বান্ডিলটা একেবারে ভেতরের দিকে থাকায় রক্ষা পেয়েছে। কিনতু ব্যাগটিতো নষ্ট হয়ে গেলো!

২০০১ সালে আমেরিকা যাওয়ার পর থেকে প্রতি দুই বছরে একবার করে আমি বাংলাদেশে আসি। প্রতিবারই কলিকাতাতেও যাই দিন পনেরোর জন্য হলেও। সেকেন্ড হোম বলে কথা। গিয়ে একই দৃশ্য দেখি, পরিচিত দৃশ্য দেখে খুশী হই। অতীতকে ফিরে পাই, ছেলেবেলার দিনগুলোকে ছুঁতে পারি। এরপর হঠাৎ করেই একদিন জানতে পারলাম কলিকাতাকে আর কলিকাতা বলা যাবেনা।'কলিকাতা' থেকে নগরীটির নাম হয়ে গেছে কলকাতা।   আরো অনেক কিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। আনুমানিক ছত্রিশ বা সাঁইত্রিশ বছর ধরে  বাম রাজত্ব ছিল। ব্যতিক্রম ঘটেছে এবার। এবার রাজ্য সরকারের গদীতে আছেন আমাদের সেই বহুল আলোচিত মমতা দিদি। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জী। মমতা নামের সাথে মমতা জড়িয়ে থাকারই কথা, তবে বাংলাদেশের জনগনের জন্য তাঁর মমতায় ঘাটতি আছে। মমতা দিদির ব্যবহারে তাঁর প্রতি আমাদের ভীষন রকম অভিমান হয়েছে। তিস্তা বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সে অনুষ্ঠানে দিদি আসেননি। বাংলাদেশে তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য কত ঘটা পটা হয়েছিল, সবই বিফল হয়েছিল। সেই মমতা দিদির কলকাতাতে গিয়েছিলাম এবার।

মমতা দিদির কলকাতাতে গিয়ে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি। প্রথমেই বিস্মিত হয়েছি দমদম নেতাজী সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক এয়ার্পোর্টে পৌঁছে। খুবই সাদামাটা টাইপ বিমানবন্দর,  আলো কম চারদিকে, কাস্টমস অফিসারদের ব্যবহার কেমন চোয়ারে টাইপ। আমার স্মৃতিতে দমদম এয়ারপোর্টের অন্যরকম চেহারা ছিল। সবশেষ '৭৪ সালে আমরা বিমানে চড়ে কলিকাতা গিয়েছি। এরপর থেকে বাসে চেপে গিয়েছি। সাধারন মধ্যবিত্তের পক্ষে প্লেন ভাড়াটা সাধ্যের বাইরে মনে হতো বলেই কম পয়সার বাস সার্ভিস ছিল ভরসা। এবার অবশ্য প্লেনে গিয়েছি সকলের চাপে পড়্বে। সবার ধারনা, আমেরিকাতে থেকে থেকে আমাদের শরীর খুব আরামপ্রিয় হয়ে গেছে, তাই বাস জার্নির ধকল সইতে পারবোনা। যাই হোক প্লেনে চড়ে যাওয়াতেই পরিবর্তনটুকু চোখে পড়লো। সেই আলো ঝলমলে দমদম এয়ারপোর্টের বদলে নেতাজী সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির  সে কি ম্যারম্যরে চেহারা। তুলনায়  আমাদের শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি নেক বেশী সুন্দর! কত বড়, কেমন সাজানো গোছানো আলো ঝলমলে চারদিক। কাস্টমস অফিসারদের ব্বেযবহারও ভাল। আমাদের দেশের কাস্টমস অফিসারদেরকে মিডল ইস্ট থেকে আসা যাত্রীদের সাথে একটু খারাপ ব্যবহার করতে দেখেছি যা কিনা আমার কাছে পীড়াদায়ক মনে হয়েছে।  যাই হোক দমদম বিমান বন্দর থেকে বেরিয়েই অপেক্ষারত ট্যাক্সীতে গিয়ে বসলাম। গাড়ী বেশ ভাল গতিতেই চলতে লাগলো। মনে পড়ে গেলো, ২০০৩ সালে আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে ট্যাক্সী করেই ফিরছিলাম। গাড়ী আটকা পড়ে গেলো ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যে। গরমে সিদ্ধ হচ্ছিলাম, গাড়ী নড়েনা, মেয়ের সে কী চীৎকার! ও গরম সহ্য করতেই পারেনা। তাই এবারে ছোট মেয়েকে সাথে নেইনি। অথচ রাস্তায় কোন জ্যাম নেই। অবাকতো হবোই। পরদিন সকালের ট্রেনে চড়ে বেলঘরিয়া যাচ্ছিলাম। ট্রেন একেবারেই ফাঁকা ছিল, আমি তো আবারও অবাক হলাম।যত বাড়ীতে গিয়েছিলাম, রাস্তাঘাট ছিল সাজানো গোছানো। আগের সেই চির পরিচিত ময়লা আবর্জনার স্তুপ দেখিনি কোথাও। সকাল বা বিকেল, সব সময়ই এক রকম। এবারই প্রথম কয়লার উনুন জ্বলতে দেখিনি কারো বাড়ীতে বা দোকান বা রাস্তার মোড়ে। উনুনের ধোঁয়ার সেই পরিচিত গন্ধ পাওয়া হলোনা, আদি কলিকাতাকে মিস করেছি বর্তমান কলকাতাতে থেকে। মেজো মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের সাধারন কামরায় না উঠে লেডীজ কামরায় উঠেছিলাম। এখানে অবশ্য পেয়েছি সেই পরিচিত দৃশ্য।  অফিস ফেরত টাইমে ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে উঠতে গিয়ে চিঁড়ে চ্যাপ্টা হওয়ার যোগার হয়েছিল। কথিত আছে, লেডীজ কামরাতেই পকেটমার হয়। আমার ব্যাগে ছিল দামী ক্যামেরা, বেশ কিছু টাকা। কিনতু এবার কোন অঘটন ঘটেনি, বরং এক ভদ্রমহিলা আমাকে অনেক সাহায্যই করেছে।

ছয়দিন ছিলাম কলকাতাতে, রাস্তাঘাটে  আগেকার দিনের মত মানুষের ঠেলাঠেলি ছিলনা, অটোরিক্সা লাইন ধরে দাঁড়ানো থাকে, রিক্সাও লাইনে থাকতে দেখেছি। নতুন যা দেখলাম তা হচ্ছে, ট্রেন থেকে নেমেই যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা করে অটো বা একটা করে রিক্সা এসে থামবে যাত্রীদের সামনে, আগে আসা যাত্রীটি সুযোগ পাবে রিক্সাতে উঠার। বিদেশে বেড়ে উঠা আমার মেজো মেয়ে আমাকে বললো, " মা দেখো, ইন্ডিয়া যে এগিয়ে যাচ্ছে তার মস্ত বড় প্রমান হচ্ছে এমন ডিসিপ্লিন্ড হয়ে উঠা মানুষজন। কেউ আমি আগে যাব বলে ঠেলাঠেলি করছেনা! একজন যাত্রী ভুল করেই একটা রিক্সাতে উঠতে গেছিল, আমি দেখলাম রিক্সাওয়ালাটা তাকে না নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো অন্যজনকে তুলে নিল।" আরেকটি ভালো ব্যবস্থা হয়েছে মেয়েদের জন্য, মমতা দিদি ক্ষমতায় এসে শুধুমাত্র মেয়েরদের জন্য 'লেডীজ ট্রেন' চালু করেছেন। আমি বাংলাদেশের মেয়ে, মেয়েদের জন্য বিশেষ সুবিধা পেয়ে অভ্যস্ত, তাই লেডীজ ট্রেনের আইডিয়া আমার কাছে  খুব ভাল লেগেছে। রাস্তাতে কোথাও কোন দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাফিক জ্যাম হয়নি। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে তবে রাস্তাঘাটে কোন আন্দোলন হতে দেখিনি। গত ছয়দিনে কোন মিটিং মিছিল দেখিনি। হয়তোবা জনগন অনেক বেশী সচেতন হয়েছে। তারা নিজেরাও চেষ্টা করছে দেশটাকে, দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে।  একদিনের একটি ঘটনা মনে আছে। ট্রেনে চেপে শিয়ালদহ যাচ্ছিলাম। স্টেশানে নেমেই মাইকে যাত্রী সাধারনের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছিল, " কল্যানী লাইনে কন্সট্রাকশানের কাজ চলছে, যাত্রী সাধারনের সুবিধার জন্য  কল্যানী রুটে বাড়তি বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। আপনারা অত নাম্বার প্ল্যাটফর্মের গেইট ধরে বের হলেই বাস রেডী পাবেন" জাতীয় কথা। ছয়দিনে কলকাতা চষে বেড়িয়েছি।  চারিদিকে কন্সট্রাকশানের কাজ চলছে কলকাতাকে আধুনিক নগরী বানানোর উদ্দেশ্যে। ভোটের আগে দিদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কলকাতাকে আধুনিক নগরী বানাবেন। রাস্তাঘাটে আরেকটি জিনিসের উপর নজর পড়েছে আমার। চারিদিকে মমতা দিদির ছবি সংবলিত ফেস্টুন। মমতা দিদির হাত জোড় করা বিনম্র ভঙ্গীতে তোলা ছবিটি চারিদিকে শোভা পাচ্ছে। ছবিটি দেখে আমার মনে হয়েছে, জনগনের  নেতা নেত্রীদের ভঙ্গী এমনই হওয়া উচিত।

আমার খুব কাছের মানুষ, বয়সে তরুন তরুনীদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম মমতা দিদি সমপর্কে তাদের কি ধারনা। সকলের এক কথা, দিদি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন নাকি জনগনের কথা বেশী বলতেন, যখন তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়তেন, সরকারী অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তার উপর শুয়ে পড়তেন। এখন নাকি ক্ষমতায় গিয়ে আর কিছুই করেননা। নিজের দলের লোকের জন্যই তাঁর সকল দরদ, নিজের দলের ক্যাডারদেরকেই কাজ দেন, সন্ত্রাসীও যদি তাঁর দলের হয়, তাহলে সাতখুন মাফ। পুলিশ বাহিনী নাকি দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই প্রথম শুনলাম কলকাতায় মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, এমন কথা শুনে অবশ্যই আঁতকে উঠেছি। কলকাতার মেয়েরা কত স্বাধীনভাবে চলতে পারে, নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখতাম আর এক ধরনের ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতাম। সেই কলকাতায় মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা!  বিশ্বাস হয়নি আমার। ওদের বলেছি, "ছয়টা দিন মেয়েকে নিয়ে চষে বেড়িয়েছি সারা কলকাতা, কোন রকম অসঙ্গতি চোখে পড়েনি, কেউ শিস মারেনি আমার মেয়েকে দেখে, বাসে উঠতেই অনেকেই নিজের সীটটি ছেড়ে দিয়ে আমাদের বসতে দিয়েছেন।" এগুলো বলতেই পাশ থেকে  একজন বলে উঠলো, " এরা সবকটাই সিপিএমের ক্যাডার, তাই মমতার নামে অমন দূর্নাম ছড়াচ্ছে"।

অয়ন নামে একজনকে  আমি খুব ভালোভাবে চিনি, আমেরিকাতে ছিল বেশ কয়েক বছর, পিএইচডি করতে গিয়েছিল,  সে ছিল কট্টর 'দিদিপন্থী'। সে জোর গলায় দাবী করতো, একদিন মমতা ব্যানার্জী রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় আসবে।  তাকে অনেকেই ক্ষ্যাপাত এই কারনে। আমিও মনে মনে ভাবতাম, এটা কি কখনও সম্ভব হবে নাকি! কিনতু বাস্তবে তা ঘটেছে। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে, পরিবর্তন এসেছে।  অয়নের  সাথে এবার দেখা করেছি, দেখা হতেই তার কাছে জানতে চাইলাম দিদির রাজকার্য দেখে সে কতটা সন্তুষ্ট, তার কি মূল্যায়ন! সে বললো, " এক বছর খুবই কম সময় একজনকে মূল্যায়ন করার জন্য। ভালো বা মন্দ, কোনটারই মূল্যায়ন সম্ভব নয় এত তাড়াতাড়ি"। এটা খুবই সত্যি কথা। তারপরেও আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, দিদি কাজ করছেন। বেশ আন্তরিকভাবেই কাজ করে চলেছেন। সাথে যোগ হয়েছে জনগনের ব্যক্তি সচেতনতা। যদিও আমি আমার চির পরিচিত কলিকাতাকে দেখতে পাইনি,   আমার ছেলেবেলাকে পাইনি,  অতীতের ভালোলাগাকে ছুঁতে পারিনি, তারপরেও সেদিনের কলিকাতার পুরানো খোলস ভেঙ্গে  এদিনের নতুন কলকাতাকে দেখে এলাম। আমি খুবই ইমোশনাল, অতীতকে পাইনি বলে কষ্ট লেগেছে, তারপরেও ভালো লেগেছে ভেবে যে জনগনের নেত্রী জনগনকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনি তাঁর কথা রাখার চেষ্টা করছেন। আমাদের এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের সম্পর্কে বহুল প্রচলিত একটি ধারনা আছে, " যেই যায় লংকায়, সেই হয় রাবণ"! ক্ষমতায় যাওয়ার আগে নেতা নেত্রীরা জনগনকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে থাকেন, ক্ষমতায় যেতে পারলে নিজেরাই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং তড়িঘড়ি করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, জনগনের কথা বেমালুম ভুলে যান। মনে হয় মমতা দিদি বাংলাদেশের জনগনের প্রতি অবিচার করলেও নিজ দেশের জনগনের প্রতি দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করছেন।

Saturday, June 23, 2012

মনে হয় বাবা যেন বলছে আমায়, "আয় খুকু আয়'

কয়েক বছর আগে চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ' সঙ্গীত প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানে ছোট্ট মেয়ে তুবা গেয়েছিল, " চোখ মুছে মুখ তোল, স্নেহের বাঁধন খোল, এবার তোমায় দিতে যে হয় যাবার অনুমতি-----আমি যাচ্ছি বাবা'। গানটি অনুষ্ঠানে আগত অনেককে কাঁদিয়েছিল, আমাকে এখনও কাঁদায়। তিন মিনিটের গানটিতে গীতিকার ও সুরকার বাবা আর মেয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে না কেঁদে উপায় নেই। তাই আমিও কাঁদি। কান্নার ভেতর দিয়ে বাবাকে অনুভব করি। অনুভব করি জীবনে বাবার অস্তিত্বকে, অনুভব করি জীবনের স্বপ্ন সিঁড়ি তৈরীর কারিগরটিকে।

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ফাদার’স ডে উদযাপিত হয় মহা আড়ম্বরের সাথে। যদিও আমরা বিশ্বাস করি যে বাবা বা মায়ের জন্য আলাদা কোন দিন থাকা উচিত নয়, কারন আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের সাথে বাবা মা জড়িয়ে আছে, তারপরেও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অনেকটাই মাদার’স ডের পরিপূরক হিসেবে ফাদার’স ডে পালন করা শুরু হয়েছে। মা দিবসে মায়ের জন্য যতটা আবেগ, অনুভূতি, দরদ প্রকাশ করে নানা রকম আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে, বাবা দিবসে ঠিক ততটা না হলেও উৎসব আয়োজনে তেমন একটা কমতিও থাকেনা। বাবা দিবস আয়োজনের মধ্যে দিয়েই বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। অধিকাংশ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ‘ফাদার’স ডে’ পালিত হয়ে থাকে।

আমাদের এই উপ মহাদেশে বাবা দিবস অথবা মা দিবস নামে আলাদা কিছু ছিলনা। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, বছরের প্রতিটি দিনই বাবা এবং মা’ কে ঘিরে আমাদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-কল্পনা, ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না জড়িয়ে আছে। আলাদা করে বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে বাবা বা মা’কে নিয়ে সমস্ত কর্মকান্ড, হাসি উল্লাসের কথা আমাদের ভাবনাতে ছিলনা। মা দিবস বা বাবা দিবস উৎসবের শুরুটা হয়েছে পাশ্চাত্যের দেশগুলো থেকে। সূত্রমতে ১৯১০ সালে অফিসিয়ালি ফাদার’স ডে পালিত হয় আমেরিকার ওয়াশিংটন রাজ্যের স্পোকেন শহরের ছোট্ট এক বাড়ীতে। সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক তরুণী সর্বপ্রথম ফাদার’স ডে সেলিব্রেট করে ১৯১০ সালের ১৯শে জুন। সোনোরার বিপত্নীক পিতা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট তার ছয় সন্তানকে পরম মমতায় বড় করেছিলেন। মাতৃহীন সংসারে ‘সিভিল ওয়ার ভেটেরান’ পিতা উইলিয়াম স্মার্ট একাধারে বাবা ও মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোনোরা তাদের জীবনে বাবার ভূমিকাকে গৌরবান্বিত করার লক্ষ্যেই ‘ফাদার’স ডে’ সেলিব্রেট করার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা সকলের মাঝে প্রচারের জন্য সোনোরা প্রতিটি চার্চ, বিপনন কেন্দ্র, ওয়াই এম সি এ, অফিস-কাচারীসহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় যোগাযোগ করতে থাকেন। এভাবেই এক সময় তার এই প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৯১০ সালে প্রথমবারের মত ‘ফাদার’স ডে’ উদযাপিত হয়।

এরপর ১৯১৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসে জুনের তৃতীয় রবিবারকে ফাদার’স ডে হিসেবে ঘোষণা করার জন্য বিল উথথাপণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এবং ১৯২৪ সালে তৎকালীণ প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলী ‘ফাদার’স ডে’ বিলটি সমর্থন করেন। কিনতু দুইবারই কংগ্রেস কর্তৃক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। তারপরেও পরবর্তী আরও অনেক বছর ফাদার’স ডে বিলটি নিয়ে অনেক দেন দরবার চলে। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিনডন জনসন ফাদার’স ডে বিলটি আমলে নেন এবং কংগ্রেসে আলোচনার ঘোষণা দেন। ছয় বছর পরে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বিলটি সাইন করেন এবং এরপর থেকে ফাদার’স ডে জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হয়।

ফাদার’স ডে’ উপলক্ষ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে একমাস আগে থাকতেই সাজ সাজ রব উঠে। বাবাকে উপলক্ষ্য করে কত রকমের উপহার সামগ্রী দিয়ে বিপণী বিতানগুলো সাজানো থাকে। টি শার্টের গায়ে ‘লাভ ইউ ড্যাড’, ‘মাই ড্যাড ইজ মাই হিরো’ জাতীয় কতরকম আবেগী কথামালা লেখা থাকে। আমাদের দেশেও বাবা দিবসে নিশ্চয়ই নানা রকম উপহার সামগ্রীতে বিপনী বিতানগুলো ভরে উঠে। লাখ লাখ টাকার পন্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকাতে 'ফাদার'স ডে' উপলক্ষ্যে বিলিয়ন ডলারের উপহার বিক্রী হয়ে থাকে প্রতি বছর। উপহার দেয়া ছাড়াও এই দিনটিতে 'বাবা'কে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, মুভী দেখা, ফিশিং করতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়াসহ আরও কত কিছুর আয়োজন থাকে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নিজ বাবা ছাড়াও স্টেপ ড্যাড, ফস্টার ড্যাড, গডফাদার জাতীয় বাবা সম্পর্কিত সকলকেই সম্মান জানানো হয়। মাদার'স ডে বা ফাদার'স ডে উপলক্ষ্যে আমেরিকানদের উচ্ছাস, আনন্দ, আবেগের মধ্যে কোন অভিনয় থাকেনা। ওদের উৎসব আয়োজনে থাকে আন্তরিকতার ছোঁইয়া। দেখে মন ভরে যায়। প্রবাসীদের মনকেও তা ছুঁইয়ে যায়। আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তারা আবেগাক্রান্ত হই, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে দেশে ফোন করি, পরম মমতাভরা কন্ঠে বাবাকে বলি, " হ্যাপী ফাদার'স ডে বাবা'। ফোনের অপরপ্রান্তে 'ফাদার'স ডে' কালচারে অনভ্যস্ত বাবাটিও আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠেন। কোন উপহারের প্রয়োজন পড়েনা, সন্তানের গলার আওয়াজটি পেয়েই বাবা খুশী হয়ে উঠেন, চাপা গর্বে পাড়ার দোকানে হঠাৎ দেখা প্রতিবেশীকে ডেকে হয়ত বলেন, " আজকে মেয়ে ফোন করেছিল, ফাদার'স ডে জানালো"। এইই হচ্ছে বাবা। বাবা তো এমনই হয়!


বাবা শব্দটিতে কত মাধুর্য্য, কত নির্ভরতা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মেয়ে 'মা' হতে পারে। কিনতু প্রায় প্রতিটি পুরুষ 'বাবা' হতে পারেনা। সন্তান জন্ম দিলেই একটি মেয়ে 'মা' হয়ে উঠে, কারন প্রকৃতিই তা নির্ধারণ করে দেয়। মায়ের নাড়ীর সাথে সন্তানের যোগ থাকে বলেই 'মা-সন্তানের' সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, অটুট। বাবার ক্ষেত্রে তা হয়না। সকল জন্মদাতাই পিতা বা বাবা হতে পারেনা। আর তাই পৃথিবীতে হতভাগ্য কোটি কোটি শিশু মায়ের নাম জানলেও তার 'বাবা'র পরিচয় জানেনা। কারন হতভাগ্য কোটি শিশুর জন্মদাতা বীরপুরুষেরা মনের আনন্দে অথবা খেলাচ্ছলে্‌ কখনওবা বিকৃত উল্লাসে নির্দ্বিধায় শিশুগুলোকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে, কিনতু তারা কেউ 'বাবা' হতে চায়না। তারা আনন্দ-ফূর্তি করতে রাজী আছে, যে কোন সময় অসহায় নারীকে বলাৎকার করতে প্রস্তুত থাকে, কিনতু ক্ষনিক আনন্দের ফসলটিকে ঘরে তুলতে চায়না, অনেক ক্ষেত্রেই তারা জানতেও পারেনা তাদের ক্ষনিক আনন্দের প্রাপ্তিটুকু নিয়ে অসহায় এক নারী কি বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে! রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, দেশে দেশে যুদ্ধ হয়, আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবে কিছু মানব সন্তানের জন্ম হয়, যাদেরকে বলা হয় 'যুদ্ধশিশু'। সেই সমস্ত শিশুর 'বীরাঙ্গনা মা' থাকে, 'বাবা' থাকেনা। 'পতিতালয়' নামক সমাজের আরেকটি অংশে প্রতিদিনই শিশুর জন্ম হচ্ছে, যাদের শুধু মা থাকে, বাবা থাকেনা। পশ্চিমা দেশগুলোতে মা ও শিশু থাকে, 'বাবা' থাকেনা। এইজন্যই বলা হয়, জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায়না, 'বাবা' হতে হয়। অনেক ত্যাগ তিতীক্ষা, অনেক পরিশ্রম, অনেক দায়িত্ববোধ, বিশাল হৃদয়, অকৃত্রিম ভালোবাসা, অশেষ স্নেহ জড়ানো থাকে 'বাবা' হয়ে উঠার পেছনে। এমন কঠিন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যে মানুষটি সংসারে আবির্ভূত হয়ে থাকেন, সংসারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকেন, 'সংসার নৌকা'র হালটি ধরে রাখেন, যেই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন ও স্বপ্ন দেখান, সেই মানুষটিই আমাদের 'বাবা'। সেই বাবাটিকে বছরের প্রতিটি দিনই আমাদের জীবনে প্রয়োজন, আর আমাদের প্রয়োজন একটিমাত্র দিন, যেদিনটিতে আমরা 'বাবা'দের 'বাবাত্ব'কে সম্মান করতে পারি, বাবাত্বের মহত্ততাকে নত মস্তকে স্বীকৃতি জানাতে পারি, সন্তানের কাছে বাবার যতখানি প্রাপ্য, তার কিঞ্চিৎ অংশটুকুও দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। এইজন্যই একটি বাবা দিবস দরকার, এবং 'বাবা দিবস' এর প্রয়োজন আছে।

কিশোরীবেলায় শোনা হেমন্ত মুখার্জী ও শ্রাবন্তী মজুমদারের দ্বৈতকন্ঠে গাওয়া গান, " মনে হয় বাবা যেনো বলছে আমায়, আয় খুকু আয়" এখনও আমাকে কাঁদায়। আমার সত্যি সত্যি মনে হয় আমার বাবা আমাকে পেছন থেকে ডেকেই চলেছেন, আমার যে কোন প্রয়োজনে বাবা যেনো আমাকে এখনও সাহস দিচ্ছেন, ভরসা দিচ্ছেন। মা’কে নিয়ে কত কাব্য রচিত হয়েছে, কত গীত রচিত হয়েছে বহুকাল আগে থেকে। কিন্তু বাবাকে নিয়ে তেমন করে কাব্যগাঁথা রচিত হয়নি। তাই বলে 'বাবা'রা কি থেমে আছেন! বাবা নামের জীবন নৌকার মাঝিটি কিনতু শক্ত হাতে নৌকার হালটি ধরেই আছেন। আজকের এই দিনে পৃথিবীর সকল বাবাকে সম্মান জানাই। সকল বাবার জন্যই আমাদের ভালোবাসা।

Thursday, June 14, 2012

পঁচিশ মিনিটের বাসযাত্রায়!

কলকাতা বেড়াতে এসেছি ছয় দিনের জন্য। সাথে নিয়ে এসেছি মেয়ে মিশাকে। কারন একমাত্র মিশা যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। যেমন কলকাতাতে এখন দারুণ গরম। এই গরমে কোন প্রয়োজন ছাড়া আমার অন্য মেয়েরা বাইরে বের হবেনা, কিনতু মিশা ব্যতিক্রম। তাই মিশাকে নিয়ে বেড়াতে এসেছি।

গতকাল গিয়েছিলাম জোড়াসাঁকো। আজ যাচ্ছি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও গড়ের মাঠ। সকালবেলাতে মাসীর বাড়ী থেকে রওনা দিয়েছি। মাসীর বাড়ী থেকে ২৩৭ নাম্বার বাসে চড়ে বাগুইহাটি যাওয়ার কথা। বাগুইহাটিতে থাকে আমার কাকীমা। কাকাত ভাই দীপকে তুলে নেওয়ার কথা। দীপ ডকুমেন্টারী ফিল্ম তৈরী করে। ওকে সাথে নিয়ে গেলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে বলেই ওর কাছে এসেছি। বাসে উঠেই দুটি খালি সীট পেয়েছি। যাত্রা শুভ ধরে নিয়েছি। কারন কলকাতার বাসে বাঁ ট্রেনে উঠে বসার সীট পাওয়ার কথা ভাবাই যায়না। বাসে উঠে মা আর মেয়ে বসতেই বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। দেড় মিনিট বাদেই একটি স্টপে বাস থেমেছে, এক ঝাঁক মানুষ সাথে সাথেই বাসে উঠে গেছে। আমার ঘাড়ের উপর এসে দাঁড়িয়েছে কয়েকজন। এসবই আমার চেনা দৃশ্য। হঠাৎ করেই নারীকন্ঠে এক আর্তনাদ শুনলাম, " ওরে বাবারে! দিয়েছে, দিয়েছেরে!! আমার চোখটা গেলে ফেলেছে। ও মাগো! গেলুমরে গেলুমরে! পাশ থেকে মেয়েটির স্বামী একটি রুমাল এগিয়ে দিল, " একটু গরম স্যাঁক দাওতো,   স্যাঁক দাও। ব্যথা কমে যাবে'খন।"। বউটি স্বামীর দিকে ফিরেও তাকালোনা।

আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই দেখতে পেলাম মেয়েটিকে। কম বয়সী এক বউ, একহাতে বাম চোখটিকে চেপে ধরে চেঁচিয়েই চলেছে। মেয়েটি দেখতে খারাপ না, পরনে ছিল হালকা গোলাপী রঙের সূতীর শাড়ী। খুব সুন্দর করে গুছিয়ে পড়েছে শাড়ীটিকে। দেখে মায়া লাগল। কিনতু মেয়েটি যেমন করে উঃ আঃ করছিল, আমার কাছে একটু অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছিল। ের মধ্যেই মেয়েটি ঘাড় ঘুড়িয়ে আসল কালপ্রিটের দিকে তাকিয়েই মুখ ঝামটে উঠলো, " বাসে উঠে হাতটাকে একটু সামলে চলতে পারেননা? যত্তসব বেয়াক্কেলে লোক এসে জুটেছে। আমার চোখটাকে গেলেই ফেলেছেরে! এমনিতেই গরমে আমার মাথাটা ভারী হয়ে আচে, তাঁর উপর অমন গুঁতো! উঃ আঃ " এভাবে চলছিল। লক্ষ্য করলাম 'কালপ্রিট' টি শান্তশিষ্ট, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোষাকে এক ভদ্রলোক। বউটির আক্রমনে ভদ্রলোক মুখটি আড়াল করে সরে গেলো।

পরের স্টপেজে আরও কিছু যাত্রী উঠলো। তাদের মধ্যে জীনস ও টপস পরা এক তরুনী ছিল। মেয়েটি বললো, " আমাকে একটু ভেতরে যেতে দিন।' বলেই যেই না মেয়েটি ভেতরের দিকে ঢুকতে লাগলো, সেই বউটি চেঁচিয়ে উঠলো, " একটু থামুননা, অত ঠেলা ধাক্কা করার কি হয়েচে! আমি বুঝি ব্যথায় মরে যাচ্চি"। জীনস পরা মেয়েটি জবাবে বললো, " আমিতো আগে থেকেই বলে নিয়েছি। অত চেঁচামেচি করার কি হলো। আমিতো ইনফর্ম করেছি'। ধ্যাতানি খেয়ে বউটি এই বেলা আর কিছু বললোনা।  ের মধ্যেই বউয়ের স্বামীটি বসার জন্য একটি সীট পেয়ে যেতেই বসে পড়ে বউকে ডাকলো, " ওগো, তোমার হাতের ব্যাগটা আমাকে দিয়ে দাও। শুনছো, ব্যাগটা আমাকে দাও"। বউটা এবারেও ফিরে তাকালোনা। আমার মনে হলো, আজ সকালেই বউটির সাথে তাঁর স্বামীর খুব একচোট হয়েছে। স্বামী বেচারা তাঁর কাফফারা দিয়ে চলেছে।

আমার উপর দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের চাপ বাড়ছিল। আমি আমার মেয়ের উপর ঝুঁকে পড়ছিলাম। মেয়ে আবার আমাকে ধমকাচ্ছিল, " এই গরমের মধ্যে তুমি আমার উপর হেলে পড়ছো কেন"?। বললাম, " বউটা আমার উপর পড়ছে। এমনিতেই বউটা ক্যাঁ কোঁ করছে, এখন যদি আমি ওকে সরতে বলি, আবার আমার উপর ক্ষেপে যাবে। থাক, একটুক্ষন সয়ে যাওয়া ভালো"। বলে শেষ করতেই আমার পেছনের সীট থেকে এক কর্কশ কন্ঠের চীৎকার শুনলাম। কর্কশ কন্ঠ বলছিল,"  এই তোমার কান্ডটা কি শুনি? তকন থেকে ফোন বেজে চলেচে, ফোন ধরার নাম নেই? কি করচিলে শুনি! তোমাকে বলেচিলুম ফোনে টাকা ভরতে। ভরেচিলে? কত ভরেচো শুনি! ৫০ টাকা ভরতে বলেছি, আর তুমি খচ্চর দিয়েচো তিরিস টাকা। কেনো তিরিস দিলে? শালা সয়তান কোতাকার! এই রেকে দিচ্ছি ফোন" বলেই ফোন অফ করে দিল।

আমার স্টপেজ কাছে চলে আসতেই ভাই দীপ আমাকে ফোন করে জানতে চাইলো, আমরা কোথায় আছি। আমি এখানের কিছুই চিনিনা। আরেক ভাই টুংকা বাসে তুলে দিয়ে বলেছিল, জোড়া মন্দিরের সামনে নামতে। আমি কিছু বলতে পারছিলামনা বলে দীপ জিজ্ঞেস করলো, " তোমার আশেপাশে কি দেখছো বলো"। বাসটা থেমেছিল একটি ময়লা আবর্জনার বিশাল এলাকার পাশ ঘেঁষে। আমি বললাম, "আমার পাশে ময়লা আবর্জনা দেখতে পাচ্ছি'। এটা শুনেই মিশা এক ধমক দিলো, " এটা একটা কথা হলো? ময়লা আবর্জনা দেখছি বলছো কেনো? বলো বিগ বাজার ছাড়িয়ে জোড়া মন্দিরের কাছে এসেছি"। আমি বলার আগেই বাস জোড়া মন্দিরের কছে চলে এলো, কন্ডাক্টর খুব যত্ন করে আমাদের মা মেয়েকে স্টপে নামিয়ে দিলো। বাস থেকে নেমেই পেয়ে গেলাম দীপকে। দীপের সাথে রওনা দিলাম।

Wednesday, May 30, 2012

প্রচন্ড গরম, যানজট, ধূলিবালি তবুও এ আমারই দেশ!!

আমরা যারাই প্রবাসে থাকি, দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সুখের সীমা নেই! চারিদিকে বিলাস-ব্যসনের ছড়াছড়ি, গাড়ী-বাড়ীর ঠাট-বাট, অফুরন্ত খাবার-দাবার, কোনকিছুর অভাব নেই। বাতাসে ধূলিবালি নেই, রাস্তায় যানজট নেই, বাতাসে গাড়ীর কালো ধোঁয়া নেই, রাস্তা ঘাটে পথচারী নেই, ভিখিরী নেই, চোরের উপদ্রব নেই, গরমে ঘামাচি হয়না, শীতে হাত পায়ের চামড়া ফাটেনা সবেতেই এক ধরনের নিশ্চিন্ততা! প্রবাসে রাজনীতি নেই তাই পথে ঘাটে গরম গরম বক্তৃতা বিবৃতি নেই, বিরোধী দল আছে কিনতু হরতাল নেই, সরকারী দল থাকলেও সরকারী দলের দাপট নেই, হরতাল নেই, জ্বালাও পোড়াও নেই, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশান জট নেই। বেকারত্ব আছে তবে বেকার ভাতাও আছে, কেউ না খেয়ে থাকেনা। মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে নিয়ে গেলে আগে চিকিৎসা পরে অন্যকথা, গরীব রোগীদের জন্য সরকারী অনুদান বা ফ্রী চিকিৎসাসহ সবই আছে।
প্রবাস জীবনে সবই আছে অথচ কিছুই যেনো নেই! সুখ আছে স্বস্তি আছে, শুধু শান্তি নেই। সারাটাদিন বিদেশী ভাষায় চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা, খাওয়ার সময় তিনবেলা হাত দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার বদলে ছুরী কাঁটা চামচে আওয়াজ না তুলে স্যানডুইচ, স্টেক খাওয়া, মা বাবাকে দেখতে হলেই স্কাইপে যাওয়া, বৃষ্টির দিনে বন্ধুদের সাথে চা মুড়ির আড্ডা মিস করা, রবীন্দ্র জয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের আনন্দ মিস করা--কাহাতক ভালো লাগে! আমার ভালো লাগেনা! আমার ভালো লাগেনা বলেই আমি বার বার ফিরে আসি। কষ্টের উপার্জন থেকে একটু একটু করে সঞ্চয় করি, অপেক্ষায় থাকি কখন আমার সঞ্চয় ফুলে ফেঁপে উঠবে, কখন আমি অনায়াসে প্লেনের টিকিট কাটতে পারবো! নতুন গাড়ীর বদলে পুরানো গাড়ী চালাই, সাধারন মানের বাড়ীতে থেকেই খুশী থাকি। ডায়মন্ড বসানো আংটি কিনিনা, ডলার জমাই আর দিন গুনি, মাস গুনি, এরপর বছর গুনি। দুই বছর শেষ হতেই বাক্স প্যাঁটরা গোছাতে শুরু করি। পরিবারের সকলকে নিয়ে রওনা দেই দেশের পথে।
আমি থাকি আমেরিকাতে। দেশে আসি সামারের ছুটিতে। কারন সামারেই বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। তাছাড়া এত পয়সা খরচ করে দেশে এসে দুইটা মাস অন্তঃত না থাকতে পারলে ভালো লাগেনা। দেশে আসার সময় আমাকে কয়েকবার ফ্লাইট পাল্টাতে হয়, সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। ফলে একদিনের পরিবর্তে দুই দিন লাগে দেশের মাটি স্পর্শ করতে। প্লেনের ভেতরের হিমঠান্ডা পরিবেশের মধ্যে থেকেই জানালার কাঁচে মুখ লাগিয়ে রেখে বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করতে থাকে আমার মত কিছু ক্ষ্যাপাটে বাঙ্গালী। মিডল ইস্ট থেকে আসা বাংলাদেশের ছেলেপেলেদের জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য শুনতে কি যে ভালো লাগে! দেশের টান এমনই এক জিনিস যে আকাশের উপরে থেকেই তারা প্রবাসী জীবনের কষ্টগুলোর সাথে দেশে থাকার সুখ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় মেতে উঠে। কি যে ভালো লাগে শুনতে যখন কেউ একজন বলে উঠে, " মরুভূমিতে থাইক্কা থাইক্কা আরব বেডাদের অন্তরটাও মরুভূমি হইয়া গেছে। আমরার দেশে যেই বিষ্টি হয়, তার অর্ধেকও যদি হেই দেশে হইত, তাইলেই বাঙ্গালীগো মত মনডা নরম হইত"। এমন জ্ঞানের কথা একবার বলে আর মোটা কাঁচের জানালা দিয়ে চোখ ভরে দেখার চেষ্টা করে বাংলার শোভা। জানালার মোটা কাঁচ ভেদ করে কি আর বাংলার রূপ দেখা যায়! বাংলার রূপ দেখতে হলে বাংলার মাটিতে নামতে হয়। ওদের সাথে সাথে আমিও বাংলার মাটিতে নেমে আসার অপেক্ষায় থ্যাকি।
বিমান শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথেই আমার সহযাত্রীরা বিমানের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করেই সীট বেল্ট খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে আর দেশী স্টাইলেই হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয় লাগেজ নামানোর জন্য। বিমানবালারা এগিয়ে আসেন এই যাত্রীদেরকে আবার সীটে বসিয়ে দেয়ার জন্য। তখন ছেলেপেলেদের মুখে চোখে ফুটে উঠে এক ধরনের সারল্যমাখা হতাশা সকলের আগে নামতে না পারার দুঃখে। কি যে ভালো লাগে এমন সব দৃশ্য দেখতে। প্রাণভরে আমি দেখি। এরপরে বিমানবন্দরের ভেতরে ইমিগ্রেশানের লাইনে দাঁড়ানোর যে প্রক্রিয়া থাকে সেখানে দেশী পাসপোর্ট আর বিদেশী পাসপোর্টের আলাদা লাইনের দিকে না তাকিয়ে কিছু কিছু যাত্রী বিদেশী পাসপোর্টের লাইনেই হয়ত দাঁড়িয়ে যায় তাড়াতাড়ি বের হতে পারবে আশায়। সেখানেও তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়, পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশী পাসপোর্টধারীদের লম্বা লাইনে। ওদের মুখটা করুন হয়ে উঠে, আমার মনটা খারাপ হয়। ওদের জন্য মমতা বোধ করি।
আমি আমাকে নিতে আসা গাড়ীতে উঠার সাথে সাথেই ড্রাইভার সাহেব থেকে শুরু করে সকলেই খুব সচেতন হয়ে পড়ে আমার সুখ সুবিধার কথা চিন্তা করে। যেন আমাদের গরম না লাগে, যেন আমাদের খাওয়া দাওয়াতে কোন রকম অসুবিধা না হয়! আমি খুবই বিব্রত বোধ করি আমাদের জন্য সকলকে এমন উতলা হতে দেখে। আবার ভালো লাগে যখন ভাবি এইতো আমার দেশ, এইতো আমার কৃষ্টি। এটাইতো হওয়ার কথা। বাঙ্গালী অতিথিপরায়ণ জাতি। আমাদের জীবনে অভাব আছে, দুঃখ আছে, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ আছে, কিনতু তারপরেও আমাদের সকলের হৃদয়ের গভীরে সকলের জন্য মমতা আছে, টান আছে। এই মমতাবোধই আমাদেরকে এখনও হাজার হাজার মাইল দূর থেকে, বিলাসী জীবনের মোহ থেকে বার বার টেনে নিয়ে আসে। সুখী জীবনে অভ্যস্ত আমার মেয়েরা প্রতি বছর দেশে আসতে চায় শুধুমাত্র এই ভালোবাসা, আদর, স্নেহ মমতা পাওয়ার জন্য। কি প্রচন্ড গরম এখন বাংলাদেশে, আমাদেরকে নিয়ে সকলেই তটস্থ, আমাদের আরামের জন্য সকলেই খুব চিন্তিত! আর আমরা? আমরা থোড়াই কেয়ার করছি এই গরম, ট্র্যাফিক জ্যাম, ধূলা বালি, মানুষের কোলাহল! আমরা মহা আনন্দিত এই কোলাহলের মধ্যে থেকে। যতই কষ্ট লাগুক তারপরেও একটা অনুভূতিই কাজ করে চলেছে, " দীন দুঃখিনী মা যে আমার এর বেশী তার সাধ্য নাই"। এইতো আমার দেশ, এই আমার ঠিকানা!

Saturday, May 19, 2012

দেশে যাওয়ার পথে পথে-(পর্ব ২)

আগের পর্বে আমি ২০০৬ সালের দেশযাত্রা নিয়ে অল্প-বিস্তর লিখেছি। আসলে আমি যদি ঘুণাক্ষরেও জানতাম যে জীবনের একটা পর্যায়ে আমি লেখালেখি শুরু করবো, তাহলে আরও অনেক পুংখানুপুঙ্খরূপে লিখতে পারতাম। যাই হোক ২০০৬ সালে দেশে গিয়েছিলাম পরিবারের পাঁচজন মিলেই। তারপর দেশ থেকে ফিরে এসেই খাতা কলম নিয়ে বসে গেছি, প্রথমে বছর গুনি, পরে মাস গুনি, তারপরে দিন গুনতে গুনতেই ২০০৮ সাল চলে এসেছে। ২০০৮ এ আমার স্বামী যাননি। আমি আর আমাদের তিন মেয়ে গেছিলাম দেশে। ঐ বছর আমাদের বড় মেয়ে  মৌটুসী কলেজ গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে, মেজো মেয়ে মিশা স্কুল গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে। দুই মেয়ের গ্র্যাজুয়েশান উপলক্ষে আমরা এখানে গ্র্যাজুয়েশান পার্টি করেছিলাম। ৭০ জন অতিথিকে নিমন্ত্রন করেছিলাম এবং নিজে হাতে সব রান্না করেছিলাম। ধান ভানতে শীবের গীত গাইছি, কারন অবশ্য একটা আছে। আমাদের দেশে যাওয়ার দিনটি ছিল পার্টির ঠিক পরের পরের দিন। আমিতো পার্টির আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, সাথে দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি।

এবারেও চার পাঁচ মাস আগে থাকতেই শপিং শুরু করেছিলাম। এত আগে শপিং করার একটাই কারন, আমেরিকাতে একেকটা অকেশানে 'সেইল' দেয়। আমার মত অতি সাধারন আয়ের মানুষের পক্ষে রেগুলার দামে জিনিস কেনা কঠিন। কারন আমি শুধু নিজের পরিবারের জন্য গিফট কিনিনা,  মায়ের প্রতিবেশী, মায়ের পরিচিত জন, নিজের আত্মীয় স্বজনদের কথাও মাথায় রাখি। দেশে গেলে মাঝে একবার ইন্ডিয়াতে যাওয়ার চেষ্টা করি। ফলে তাদের জন্যও ছোটখাট জিনিস কিনি। আমার ভালো লাগে প্রত্যেককে কিছু না কিছু দিতে। সেজন্যই 'সেইলে'র অপেক্ষায় থাকি। শ্যাম্পু, লোশান, সাবান এগুলোর যা ওজন হয়, আমাদের চার দ্বিগুনে আট লাগেজের প্রত্যেকটাই ওভারওয়েইট হয়ে যায়। তা সেবারও আট লাগেজের অবস্থা কাহিল দেখে আমি নিজেই কাহিল হয়ে পড়েছি। পার্টির কারনে আগের সাত দিন বিশ্রাম পাইনি, পার্টি শেষে সব গুছিয়ে, বরের জন্য রান্না করে খাবার ফ্রীজ করে দিয়ে এর ফাঁকেই লাগেজ তৈরী করা কি যে কঠিন, তা আমি সেবার টের পেয়েছিলাম।

যেদিন রওনা হলাম, আমাদের বিরাট টয়োটা ভ্যানে সবগুলো লাগেজ চাপিয়ে পাঁচজনতো গাড়ীতে উঠে বসলাম। আমার স্বামীই এবার আমাদেরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করেছে। এবার একটা মজার ব্যাপার ছিল। আমাদের সাথে আমাদের আরেক বন্ধু পিংকীও রওনা দিয়েছিল। পিঙ্কীরা  তখন আমাদের শহরে নতুন এসেছে। কলকাতার মেয়ে, আমাদের পুরো ফ্যামিলির সাথেই ওদের খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। পিঙ্কী এয়ার ইন্ডিয়া বা লুফথানজা'তে টিকেট না কেটে শুধু আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য 'এমিরেটস'এর টিকিট কেটেছে। আমরা ২০০৮ এ এমিরেটস এ গিয়েছিলাম। আমরা যার যার গাড়িতে করে বার্মিংহাম এয়ারপোর্টে পৌঁছেছি। পিঙ্কী খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিল, কারন ওর বর সব্যসাচী  খুব গুছানো মানুষ। ওর বরই ওর লাগেজ ওজন টোজন করে দিয়েছে। আমার বরও গুছানো, কিনতু আমার অবিবেচনার কাছে সকল গুছানো মানুষের হার মানতে হয়। এয়ারপোর্টে নেমেই হঠাৎ করে খেয়াল হলো আমার বড় মেয়ে মৌটুসীর হাতের ঘড়িটা কোথাও পড়ে গেছে। শুরু হলো আমার মাথা গরম হওয়ার প্রথম ধাপ। আমার চেহারার দিকে তাকিয়েই পিঙ্কী দৌড়ে গিয়ে রাস্তার উপর থেকে ভেঙ্গে যাওয়া ঘড়ি নিয়ে এসে আমাকে শান্ত হতে বললো। আমি দাঁত কিড়মিড় করেই থেমে গেলাম।

লাগেজ নিয়ে চেক ইন এ ঢুকেই মিশার ডাক পড়লো। মৌটুসী পাশেই মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে মনে একটু কষ্টও লাগছিল, কিনতু আমার তখন শিরে সংক্রান্তি। নিজের চোখেই দেখলাম পিঙ্কীর লাগেজ কি সুন্দর করে ঠিকঠাকভাবে বেল্টে চলে গেলো। আমি জানতাম আমার লাগেজ আটকাবে। মিশাকে বললাম, " মিশা , আমার ভয় লাগছে। তুই ঐ কালো ছেলেটার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়া। কালো ছেলেগুলো খুব ভালো হয়। ওরা বেশী ওজন দেখলেও কিছু বলবেনা। একটু সুন্দর করে হাসি দিয়ে কথা বলবি, দেখবি আমাদের লাগেজ ঠিকঠাক বেল্টে চলে গেছে"। আমার মিশা মেয়ে সাথে সাথে হাসতে হাসতে জোরে জোরে বলতে শুরু করলো, " এই তোমরা কি কখনও কোন মা'কে বলতে শুনেছো, মেয়েকে বলছে ফ্লার্ট করতে। আমি নাকি ঐ কালো ছেলের কাছে গিয়ে হাসি দিলেই আমার লাগেজ ক্লীয়ার করে দিবে"। ব্যস, পিঙ্কী শুরু করে দিল হাসি। হাসি সংক্রমিত হতে শুরু করলো। মিশা কালো ছেলের কাউন্টারেনা গিয়ে এক সাদা মহিলার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালো। আমার তখন বিপর্যস্ত অবস্থা। প্রতি লাগেজে পঞ্চাশ পাউন্ড এলাউ করে। আমার দ্বিতীয় লাগেজের ওজন হয়েছে আটান্ন পাউন্ড। বেল্ট থেকে ফিরে এসেছে। আরেকটার ওজন হয়েছে আটচল্লিশ পাউন্ড। এবার সাদা মহিলাটি মিশাকে বললো যে যে গুলোতে বেশী ওজন হয়েছে তার থেকে ওজন কমিয়ে কম গুলোতে ঢুকিয়ে দিতে। এমন সিগন্যাল পেয়েই আমার মাথা খুলে গেলো। আমার আট লাগেজের পাঁচটাই ছিল ওভারওয়েইট। একেকটা লাগেজ অনুমোদন পায় আর আমি অন্যটার থেকে ভারী ভারী শ্যাম্পুর বোতল, মিল্ক অব ম্যাগনেসিয়ার বোতল , লোশনের বোতল টেনে বের করে অন্যটাতে ঢুকিয়ে দেই। পিঙ্কীও আমাকে সাহায্য করছিলো। আমার তখন কেঁদে ফেলার অবস্থা। এভাবেই সবগুলো লাগেজ বেল্টে তুলে দিয়েছিলাম।

আমরা ভেতরে চলে যাওয়ার আগে আমার স্বামী আমাকে বললো, " প্রতিবার তোমার এমন হয়, এটা কেমন কথা! দেশে যাবে, কোথায় আনন্দে থাকবে তা না, সারাটা পথ টেনশান করতে করতে যাও। যাই হোক, লাগেজের ঝামেলা গেছে, এবার বাকী পথ নিশ্চিন্তমনে যেও। মেয়েদের সাথে রাগারাগি করোনা। ওরাই তোমাকে ঠিকভাবে নিয়ে যাবে"। আমার তখন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে, যে কোন কথাই শুনতে ভালো লাগছিল। মৌটুসীর এতো দামী ঘড়িটা ভেঙ্গে যাওয়ার দুঃখও ভুলে গেছিলাম। এরপর প্লেনে উঠেই আমার খুব জল পিপাসা পেয়ে গেল। বার্মিংহাম থেকে আমেরিকান এয়ারলাইনসে হিউস্টন। হিউস্টন থেকে এমিরেটসে দুবাই। আমেরিকান এয়ারলাইনসে কিচ্ছু খেতে দেয়না, এমন ছোটলোক। আড়াই ঘন্টার জার্নিতে একটা জুসের ক্যান আর ছোট্ট এক প্যাকেট চিনেবাদাম, এই হলো খাবার। আমার তখন পিপাসায় কাতর অবস্থা, দুই ঘন্টা পরে বুড়ি এয়ারহোস্টেস জুসের ক্যান দিয়ে যেতেই বাংলাতেই একটা বকা দিলাম মনে মনে। তারপর হিউস্টনে পৌঁছে পাঁচ ঘন্টার জন্য নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম। পিঙ্কী থাকাতে খুব ভালো লাগছিল। পিঙ্কী খুবই সরল মনের এক মেয়ে। দারুণ স্টাইলিস্ট, বড়লোকের বউ, কিনতু আমাদের সাথে প্রাণ খুলে মিশে যায়। আমার মেয়েরাও স্টাইল জানে, ফলে পিঙ্কী আন্টির সাথে খুব দহরম মহরম খাতির।

ওয়েইটিং চেয়ারে বসে আছি। পিঙ্কী আমার কাছে গল্প করে যাচ্ছিল আমাদের পরিচিত আরেক ফ্যামিলির দাম্পত্য অশান্তির কথা। ও কোন কুটকচালি করছিলোনা, আমার সাথে শেয়ার করছিলো ওর ফিলিংস। পিঙ্কীর একমাত্র ছেলে ঋষি আমার ছোট মেয়ে ঋষিজার সম বয়সী হওয়াতে ওরা দুজনে মিলে খেলা করছিল, বাকী দুই মেয়ের একজন একটু পর পর নানা রকম তথ্য এনে হাজির করছিল। ততক্ষনে আমার মাথা ঠান্ডা। হঠাৎ করেই দুই বুড়া যাত্রী আমাদের কাছে এসে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করছিল। আমি জানতাম মিশা ও মৌটুসী স্কুলে স্প্যানিশ পড়েছে। বিশেষ করে মিশা মাত্র স্কুল গ্র্যাজুয়েশান করে এসেছে, ওরতো জানার কথা স্প্যানিশ। অথচ মিশা কিছুই বুঝতে পারছেনা বুড়াদের কথা। আমি সাথে সাথে রেগে গেলাম, " এই মেয়ে তুমি কি শিখেছ এতদিন, এখন এক বর্ণও বুঝতে পারছোনা"। মিশা আমাকে উলটা ধমকী দিলো, " তোমার খেদমত করতে গিয়ে সব ভুলে গেছি"। মৌটুসী এগিয়ে এলো। পাঁচ বছর আগে শেখা স্প্যানিশ জ্ঞাণ দিয়েই ও পারলো বুড়ো দুটোর কথা বুঝতে। ওদেরকে মৌটুসী যতটুকু সাহায্য করার তা করলো। মিশা ততক্ষনে সবার জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসেছে দেখে ওর প্রতি আবার আমি নমণীয় হলাম।

হিউস্টন থেকে এমিরেটসে উঠেই মিশা, পিঙ্কী, মৌটুসী কাছাকাছি বসে গেলো। আমি দখল করলাম জানালার পাশের সীট। ওরা প্লেন ছাড়তেই মুভী চালিয়ে দিল, আর পকর পকর শুরু করে দিল। আমি জানালার কাঁচে মাথা রেখে আকাশের মেঘ দেখতে লাগলাম। মেঘেদের খেলা যারা বুঝতে পারে তাদের জন্য কত রকম খেলা যে অপেক্ষা করে! মাঝে মাঝে আমি মনিটরে দেখি কত ফিট উঁচুতে আছি, মাঝে মাঝে ম্যাপ দেখি, আন্দাজ করি প্লেন এখন ঠিক কোন দেশের উপর দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা একটু উঁকি দেয় আমার স্ক্রীণে, আমাকে জিজ্ঞেস করে কোন মুভী দেখতে চাই কিনা। আমি মুভী দেখিনা। বরং মেঘেদের খেলা দেখি। সুন্দরী স্মার্ট এয়ারহোস্টেস কাছে আসে খাবারের ট্রে নিয়ে, কখনও আসে ড্রিঙ্কসের ট্রে নিয়ে। আমাকে ভাবতে হয়না খাবার নিয়ে। আমার মিশা জানে আমার জন্য কোন খাবার ঠিক। আমার খাবার ও ঠিক করে দেয়। আর পিঙ্কী, মিশা, মৌটুসী তিনজনেই মোটামুটি সর্বভুক। ওরা সব সময় নতুন নতুন খাবার ট্রাই করে। সী ফুড ওদের বেশী পছন্দ। রেস্টুরেন্টে গেলেও এই তিনজনই শামুক, ঝিনুক, সী উইডস, আরও যত রকমের থলথলে ল্যাতল্যাতে খাবার আছে সেগুলো অর্ডার করে। বীফ ছাড়া ওরা সব খায়।

এমিরেটস দুবাই পৌঁছালে আমরা কয়েক ঘন্টা একসাথে থেকে ঘুরাঘুরি করি। মৌটুসী পারফিউমের দোকানে ঢুকে যায়। সেবার মৌটুসী আশি ডলার দিয়ে এক শিশি পারফিউম কিনতেই মিশা আমাকে টেনে নিয়ে গেলো দোকান গুলোতে। মিশা সব টেস্টার থেকে একটু একটু করে নিজের গায়ে স্প্রে করতে থাকলো, আমার গায়েও স্প্রে করে দিয়ে বললো, " মা দিদিসোনা একটা বোকা, আশি ডলার দিয়ে পারফিউম না কিনে আমাদের মত মাগনা পারফিউম গায়ে মেখে ডলারটা দেশে নিয়ে ভাঙ্গালে পরে ঐ টাকায় কত কিছু কিনতে পারতো। তোমার এই মেয়ে পুরা বড়লোকী মেয়ে হইছে। আর আমি হইছি বুদ্ধিমতী"। আমি হাসি মিশার পাগলামী দেখে। এইবেলা অবশ্য পিঙ্কী মৌটুসীর সাথে। যাই হোক একটা সময় পরে আমরা দুই ভাগ হয়ে গেলাম। পিঙ্কীরা ধরলো দুবাই টু কলকাতা ফ্লাইট, আমরা ধরলাম দুবাই টু ঢাকা ফ্লাইট। দুবাই টু ঢাকা ফ্লাইটে নতুন কিছু ছিলনা। একই রকম বাংলা কথা চারিদিকে, বাচ্চাদের ট্যাঁ ট্যাঁ, মাঝখানে কোন কোন ধার্মিক ব্যক্তিকে দেখলাম আসা যাওয়ার প্যাসেজের মধ্যেই নামাজ পড়তে বসে যেতে।

এবার আমি আর বাথরুমে যাওয়ার কথা মাথাতেই আনিনি। কিনতু বাংলায় একই ঘোষণা দিয়েছিল এবারও। বাথরুম পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে। এই ঘোষনা যতবার শুনি, আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এতো বছর প্রবাসে কাটিয়েও বাঙ্গালীদের কিছু কিছু খাসলত থেকেই যায়।  এবারও জানালা দিয়ে সূর্য্যোদয় দেখলাম, জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ দৃশ্যগুলোর একটি। নেপালের দিক দিয়ে যখন প্লেন বাঁক নেয়। হিমালয়ের সারি দেখে আমার চোখ আর মন ভরে যায়। আমার মেয়েরা তখনও মুভী দেখে। মাঝে মাঝে আমাকে ডিঙ্গীয়ে বাইরের দৃশ্য একটু দেখে নেয়। ঢাকার কাছাকাছি আসলেই মিশার মেকাপ বক্স ওপেন হয়ে যায়। আলতো করে গালে কপালে ফেসপাউডার বুলিয়ে নেয়, মাথার ঝাঁকড়া চুলে একটু ব্রাশ বুলিয়ে নেয়। আমাকেও একটু ফ্রেশ হতে বলে। আমি পাত্তা দেইনা। অপেক্ষায় থাকি কখন প্লেন মাটি ছোঁবে। একসময় প্লেন মাটি ছোঁয়, আমি আবারও মিশে যাই আমাদেরকে নিতে আসা স্বজনের মাঝে।