Friday, January 18, 2013

শীতের আমেরিকা!

আমেরিকাতে সময়টা এখন শীতের মাঝামাঝি।  শীতের শুরুতে এখানে ভালোই লাগে, অনেকটা বাংলাদেশের শীতের মত, আকাশ পরিষ্কার থাকে, সারাদিন রোদে ঝলমল করতে থাকে চারদিক, সন্ধ্যে এগিয়ে আসে একটু তাড়াহুড়ো করেই। মাঝে মাঝেই গায়ে শীতকাঁটা দেয়, ক্লজেট থেকে গরম কাপড়-চোপর বের হতে থাকে একটা একটা করে। শীতের তীব্রতা অনুযায়ী শীতবস্ত্রের ব্যবহার চলে। অবশ্য আমেরিকানদের মধ্যে এর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। তারা চল্লিশ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায়ও হালকা সোয়েটার পড়ে ঘুরে বেড়ায়। এখানে সর্বত্র একটি সার্বক্ষণিক সুবিধা আছে, নিজের বাড়ী, গাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, কারখানাসহ সর্বত্র তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুব্যবস্থা আছে। ফলে শীত, গ্রীষ্ম কোথা দিয়ে আসে, কোথা দিয়ে চলে যায়, তা ভালো করে আঁচ করা যায় না।

আমেরিকার স্টেটের সংখ্যা হচ্ছে পঞ্চাশ। প্রতিটি স্টেটেই শীত আসে একই সময়ে, তবে শীতের তীব্রতায় থাকে পার্থক্য। যেমন আমেরিকার উত্তর দিকের রাজ্যগুলোতে শীত মানেই তুষারপাত এবং দক্ষিণী রাজ্যগুলোতে  তুষারপাত ছাড়াই হাড়কাঁপানো শীত। রাজ্যগুলোতে তুষারপাত না হলেও বৃষ্টিপাত হয়। আর সে বৃষ্টির পানির ফোঁটাতে কী ধার, গায়ে পড়লেই মনে হয়, ঠান্ডা একেবারে হাড়ের মধ্যে গিয়ে বিঁধেছে বুঝি। দক্ষিনী রাজ্যের মানুষগুলো উত্তর রাজ্যের মানুষদের থেকে এই একটি দিকে অনেকটাই যেনো পিছিয়ে আছে। এই রাজ্যে তুষারপাতের মত  দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক শোভা নেই, পরিবর্তে আছে টর্ণেডো, হ্যারিকেনের মত বিধ্বংসী ব্যাপার -স্যাপার। অনেকটাই আমাদের বাংলাদেশের মত অবস্থা। বাংলাদেশ নাম শুনলেই যেমন ইউরোপ-আমেরিকানদের ধারণা, সাইক্লোন, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, তেমনি দক্ষিনী রাজ্য শুনলেই মনে হয়, টর্ণেডো আর হ্যারিকেনের কথা। কোন কোন বছর প্রকৃতি সদয় হলে, দক্ষিনী রাজ্যগুলোতেও এক আধদিন অল্প-স্বল্প তুষারপাত হয় বৈকি! তেমন ঘটনা ঘটলে রাজ্যবাসীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ওয়েদার ফোরকাস্ট শুনে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে, কিভাবে সামাল দেবে আসন্ন তুষারবর্ষণকে। অযথাই তিনদিন আগে থেকে শুরু হয়ে যায় খাবার-দাবার মজুদ করার কাজ,  সাথে ফ্ল্যাশ লাইট, মোমবাতি, ওয়াইন,পাণীয় জল, সফট ড্রিঙ্ক, গ্যাস সিলিন্ডার থেকে শুরু করে হেন জিনিস নেই যে কারো নজর এড়িয়ে যাবে। অফিসে, দোকানে খুব গল্প চলতে থাকে  আসন্ন তুষারপাত নিয়ে। একজন অন্যজনকে সাবধান করে দেয়, গাড়ী যেনো সাবধানে ড্রাইভ করে, রাস্তাঘাট আইসি (বরফ জমে পিচ্ছিল) হয়ে থাকার সম্ভাবণা, সাবধানে না চালালে গাড়ী স্লীপ কেটে চলে যাবে আরেক ট্র্যাকে, অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে--এমন ধরনের গল্প চলতেই থাকে।

 শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এক সপ্তাহ আগে থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস মনিটর করতে থাকে। শেষ মুহূর্তে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা চাইই চাই। তুষারপাত তো আর সাধারণ কোন ঘটনা নয়, সারা শীতকাল ধরে শুধু অন্য স্টেটের তুষার বর্ণনা শুনতে হয়, এবার নিজেদের স্টেটেও তুষার ঝরছে, হোক তা অতি সামাণ্য, না হয় শাবল দিয়ে পরিষ্কার করার প্রয়োজন হলোই না, তবুও তো আকাশ থেকে ঝরছে ওরা, কেমন পেঁজা তুলোর মত! এটুকু জমে জমে যতটুকু হয়, তাই দিয়ে না হয় ছোট ছোট স্নোম্যান বানানো যাবে, তবুও তো তুষারপাত হচ্ছে। অনেকটাই যেনো জাতে উঠার প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার মত ব্যাপার।

আমেরিকায় শীতের শুরুতেই সকল গাছের পাতা ঝরে যায়, ন্যাড়ামুন্ডি গাছগুলো ডালা-পালা ছড়িয়ে দিয়ে শূণ্যদৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পত্রবিহীন গাছগুলোর দিকে তাকালে কখনওই মনে হয় না, যে ওরা আবার পত্রফুল্লশোভিত হয়ে উঠবে। যে সকল স্টেটে তুষারপাত হয়, ঐ সকল স্টেটে গাছের ন্যাড়া শাখায়  তুষার জমে জমে  অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়! দেখে মনে হয় প্রতিটি গাছে থোকা থোকা শ্বেতশুভ্র ফুল ফুটে আছে। টিভিতে ওয়েদার চ্যানেল থাকেআবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রতি ঘন্টায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়। আমেরিকার উত্তরের রাজ্যগুলোতে তুষারপাত মানেই সুন্দরের সাথে বাড়তি কিছু পরিশ্রম যোগ হওয়া। সারারাত যখন তুষার ঝড় হয়, আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় যেনো সারা আকাশজুড়ে সাদা চাদর উড়ে বেড়াচ্ছে। তুষারঝড় থেমে গেলে উড়ন্ত চাদরগুলোই যেনো ভূমিতে, বাড়ীর ছাদে, গাছের ডালে এসে নেতিয়ে পড়ে। চাদরের পরত জমে জমে বরফের পাহাড় হয়ে যায়। তাপমাত্রা থাকে শূণ্য ডিগ্রীর অনেক নীচে, ফলে তুষার জমে বরফ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবণা থাকে। একবার বরফ হয়ে গেলে, কখনও কখনও তা বিপদজনক হয়ে দাঁড়ায়। পথ চলতি পথিক পা পিছলে পড়ে কোমড় ভাঙ্গে, দূর্ভাগ্যবশতঃ কোমড় ভাঙ্গার পর্বটি যদি কারো বাড়ীর সামনের রাস্তায় ঘটে যায়, পথচারী সেই বাড়ীর মালিকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়। নিজ বাড়ীর সামনের রাস্তা হলেও পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি বাড়ীর মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

কারণেই তুষারপাত শুরু হওয়ার আগেই মিউনিসিপ্যালিটি থেকে ট্রাকে করে সারা রাস্তায় তুষার গলানো লবন ছিটানো হয়, প্রতিটি বাড়ীর মালিকেরা নিজেদের ড্রাইভওয়ে, পথচারী চলাচলের রাস্তায় একইভাবে লবন ছড়িয়ে দেয়। লবন ছিটানো রাস্তায় তুষার পড়ে সেটা আর বরফ হয় না, তার আগেই গলে যায়। ভারী তুষারপাত হলে গৃহস্বামীকে হাতে শাবল, কোদাল নিয়ে বের হতে হয়, কোদাল দিয়ে জমে থাকা বরফের পাহাড় ভেঙ্গে রাস্তা বের করতে হয়। খুবই কঠিন ও পরিশ্রমের কাজ এটা, কিন্তু করতেই হয়। ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে জমে থাকা বরফ গলে পানি হয়ে যায়।


যতই কষ্ট হোক বরফ পরিষ্কার করতে, তারপরেও তুষারপাতের নান্দনিক দিকটিই অনেক বেশী আকর্ষণীয় মনে হয় প্রতিটি মানুষের কাছে। শীতকাল এগিয়ে এলেই সবার মাথায় প্রথম চিন্তা আসে, বছরের ক্রীসমাসটি কেমন হবে, হোয়াইট নাকি স্বাভাবিক? যে ক্রীসমাসে তুষারপাত হয়, সে ক্রীসমাসে সকলের মন আনন্দে পরিপূর্ণ থাকে। তাদের মনে হয়, স্যান্টা ক্লজ নর্থ পোল থেকে বুঝিবা তুষার নিয়ে এসেছে। তবে এ বছর শীত তেমন জোরালোভাবে আসেনি, অন্যবারের মত তুষারপাতও হয় নি। যেটুকু হয়েছে, তা অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম। আবহাওয়ার গতি প্রকৃতি হয়তো বদলে যাচ্ছে, এখন তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত বেশী হয় শীতকালে। তারপরেও যে কটা দিন তুষারপাত হয়েছে, সেটাই বা কম কি!


তুষারপাতের বর্ণনা লিখতে গিয়ে নায়াগ্রা ফলসের কথা মনে পরে গেলো। নায়াগ্রা ফলসের নাম পৃথিবীব্যাপী সকলেই জানে। সারাবছর কত লক্ষ লক্ষ পর্যটক আসে নায়াগ্রা ফলস দেখতে। নায়াগ্রা ফলস দুই দেশ থেকে দেখা যায়, আমেরিকা প্রান্ত এবং কানাডা প্রান্ত। দুই প্রান্তের মধ্যে আবার রেষারেষিও আছে, কেউ মনে করে, নায়াগ্রা ফলস আমেরিকা প্রান্ত থেকে বেশী কাছের মনে হয়, কারণ হাতের পাশ দিয়েই নায়াগ্রা বয়ে যায়, আবার কানাডাবাসী মনে করে ওদের প্রান্ত থেকে নায়াগ্রার আসল সৌন্দর্য্য দেখা যায়! সবার কথাই ঠিক, নায়াগ্রা নদী, যে যার সুবিধামত দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। সারাবছর নায়াগ্রা দেখা যায়, তবে শীতকালে যদি নায়াগ্রা ফলস দেখতে যাওয়া যায়, সেখানে গিয়ে অপূর্ব এক দৃশ্য দেখা যাবে। নায়াগ্রা ফলস যারা দেখেন নি, তাদের বুঝে নেবার সুবিধার্থে এটুকুই বলা চলে, নায়াগ্রা রিভারের জল ক্রমাগত বয়ে বয়ে একটা জায়গায় এসে সামনে চলার আর কোন পথ পায় না, পথ না পেয়ে হঠাৎ করেই যেনো নীচে পড়ে যায়। গভীর নীচে, অনেক গভীর সেই খাদ। যার তলদেশ দেখা যায় না। নায়াগ্রা নদীর নীচে পড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকেই ‘নায়াগ্রা ফলস’ এর উৎপত্তি। নায়াগ্রা নদী যেখানে এসে পড়ে যাচ্ছে, তার চারপাশে নদীর লক্ষ লক্ষ জলকনা ছিটকে পড়তে থাকে। ফলে ঐ অঞ্চলের চারপাশ নায়াগ্রার জলে ভেজা থাকে। শীতকালে তাপমাত্রা শূণ্য ডিগ্রীর নীচে নেমে যায় বলে নায়াগ্রার ছিটানো পানি চারদিকে ক্রিস্ট্যাল তৈরী করে। সূর্য্যের কিরণ পড়ে সেই আইসি ক্রিস্ট্যালগুলো থেকে রঙধনুর সাতরং বিচ্ছুরিত হয়। সে এক অপূর্ব দৃশ্য! হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করেও শত শত পর্যটক ওখানে গিয়ে ভীড় করে, এই দৃশ্য দেখার জন্য। চারদিক বরফ হয়ে গেলেও নায়াগ্রা থামে না, বয়ে চলে, চলতে চলতেই শেষ পর্যন্ত সেই অতল গভীরে ঝাঁপ দেয়।

এক সময় শীত কেটে যায়, তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তুষারপাত কমে আসতে আসতে এক সময় থেমে যায়। বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়। শীতে কুঁকড়ে থাকা মানুষ হাত-পা খুলে আড়মোড়া ভেঙ্গে নতুনভাবে দিন শুরু করে। উত্তর রাজ্যের মানুষ আগামী শীতের আগ পর্যন্ত বেশ ঝরঝরে থাকে, আর দক্ষিণ রাজ্যের মানুষ অপেক্ষা করে, সামনের শীতে যেনো আরেকটু বেশী স্নো হয়, বাচ্চাগুলো যেনো ভালো করে একখানা স্নোম্যান বানাতে পারে।

Thursday, January 17, 2013

তুষারপাত!

এ বছর আমেরিকায় শীতকালটা কেমন যেনো ম্যাড়ম্যাড়ে লাগছে। কোথাও কোন ঊচ্ছ্বাস দেখছি না। উচ্ছ্বাস মানে, শীতকালে যখন তখন আকাশ থেকে স্নো পড়বে, একটানা কয়েকদিন স্নো পড়ে বরফের পাহাড় তৈরী হবে, বাচ্চারা সেই পাহাড় ভেঙ্গে স্নোম্যান বানাবে, স্নো বল দিয়ে একে অপরের গায়ে ঢিল ছুঁরবে, হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরবে, আর পড়বি তো পড় স্নোয়ের পাহাড়ের উপরেই পড়বে। সারা গায়ে তুষারশুভ্র নরম বরফের চিহ্ন নিয়ে দুষ্টু বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে থাকবে কয়েক মুহূর্ত, তারপরেই সিদ্ধান্ত নিবে, একইভাবে কাকে ঘায়েল করা যায়! এই তো হবে আমেরিকার শীতকালের গল্প।

এ বছরের শীতে তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টি, 'কুকুর-বেড়াল' বৃষ্টি, মুষলধারে বৃষ্টি, অসহ্য রকমের বৃষ্টি, আর কিছু বলার নেই। হ্যাঁ, একেবারেই যে তুষারপাত হচ্ছে না কোথাও, সেটা সত্যি নয়। হচ্ছে, এরপরেও তুষারপাত হচ্ছে, তবে অন্যান্য বছরের মত হুলুস্থূল ধরণের তুষারপাতের কথা শুনছি না। তেমন হলে আমার স্বামীর মুখ বন্ধ থাকতো না। আমেরিকায় যে কোন কিছু ঘটলেই উনি খুব ঊচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। ফলে আমাকে আর কষ্ট করে সিএনএন, এবিসি নিউজ দেখতে হয় না। আমি দেখি চ্যানেল আই,  ইটিভি বা এনটিভি সংবাদ। অবশ্য আমার স্বামীও বাংলা চ্যানেল দেখেন, তবে বাংলাদেশের খবরে মারামারি, কাটাকাটি, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, র‍্যাব, পুলিশ, মরিচের গুঁড়ো স্প্রে, হরতাল, বিক্ষোভ, মন্ত্রী, মামলা ছাড়া আর কোন খবর থাকে না। আমার স্বামী এইসব খবরে কোন উৎসাহ পান না। শান্তিপ্রিয় মানুষ উনি, শান্তিতে থাকবেন বলেই তো প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছেন। উনার কাছে মানুষের অবিরাম কান্নার চেয়ে আকাশের কান্না অনেক বেশী স্বস্তিদায়ক মনে হয়। আমার কাছে অবশ্য দুইই সমান। মানুষ কাঁদলেও যা, প্রকৃতি কাঁদলেও তা। মানুষের দুঃখেই তো প্রকৃতি কাঁদে। এ জন্যই বোধ হয়, এবছর  শীতকালে তুষারবৃষ্টি না হয়ে আকাশের চোখ থেকে অশ্রুধারা বইছে, শুধু বাংলাদেশেই তো  নয়, সারা বিশ্বেই মানুষ হাহাকার করছে, দেশে ধর্ষণের ধুম পড়েছে, আমেরিকাতে শুটিং এর ধুম পড়েছে, প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, যেখানে সেখানে বলা নেই কওয়া নেই আততায়ী ঢুকে পড়ছে, দুড়ুম দুড়ুম গুলী চালিয়ে শিশু, নারী, নরকে মেরে ফেলছে। সবাই যখন দিল্লীর দামিনীকে নিয়ে শোকে মুহ্যমান, নিউইয়র্কের টিউব স্টেশানে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমান বাঙ্গালী ভদ্রলোককে এক স্প্যানিশ মহিলা ধাক্কা মেরে ট্রেন লাইনের উপর ফেলে দিয়ে ট্রেনের চাকায় পিষ্ট করেছে। তা এত অঘটনের মধ্যে আকাশের কী দায় পড়েছে পৃথিবীর বুকে তুষার ঝরিয়ে দৃষ্টিনন্দন ছবি তৈরী করার, তার চেয়ে এই ভালো, হাঁড়াকাঁপানো শীতের মধ্যে বৃষ্টি ঝরিয়ে শয়তান হয়ে উঠা মানুষের দাঁতে দাঁত কপাটি লাগিয়ে দিচ্ছে। উফ! একেবারে ল্যাজে গোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কাজে বের হতে গিয়ে এক গোছা গরম কাপড় তো পড়তেই হয়, তার উপর ছাতা, বর্ষাতি হাতে বহন করতে হলে, কাহাতক ভালো লাগে। শরীরের ওজন, তিন পরত পোষাকের ওজন, ছাতার ঝামেলা, সব মিলিয়ে রাগ গিয়ে পড়ে বৃষ্টির উপর। এমনতো নয় যে, ঝুম বৃষ্টিতে ঘরে বসে গরম গরম চা আর মুড়িভাজা খাবো, তেমন হলে বৃষ্টিকে স্বাগত জানাতাম। শীতকালের বৃষ্টিকে আর সহ্য করতে পারছিলাম না।

আমার মনের কোমল দিকগুলো যখন অসাড় হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ভোরে ঘরের টেলিফোন বেজে উঠেছে। আমি রাত জাগতে পারি, কিন্তু ভোরে কখনও ঘুম থেকে উঠতে পারি না। শত হল্লা চীৎকারেও ঘুম ভাঙ্গতে চায় না, এ আমার ছোটবেলার অভ্যেস। তাই ফোন রিং শুনেও গা করিনি, জানি, পরিবারের একমাত্র আর্লি রাইজার মানুষটি উঠেই ফোন ধরবে। উনিই ধরেছিলেন ফোন, কী যেনো আধো আধো কথা কানে আসছিল, ভাবছিলাম, মধ্যিরাতে ফোন এসেছে, কোন দুঃসংবাদ হতে পারে! মায়ের হঠাৎ মৃত্যুর পর আর কোন দুঃসংবাদকেই ভয় পাই না।

জিজ্ঞেস করি, কে ফোন করলো?

জবাব এলো, গুড্ডুর স্কুল থেকে কল এসেছে।

মাঝরাত্তিরে স্কুল থেকে ফোন এসেছে কেনো?

-এখন রাত্তির নেই, সকাল ছয়টা বাজে।

-কী ব্যাপার, স্কুল বন্ধ?

-নাহ! ডীলে স্কুল।

আমি আবার ঘুম দিলাম, স্কুল ডীলে হলেই কী, আর বন্ধ হলেই বা কী, আমাকে তো আর স্কুলে যেতে হচ্ছে না! দুই ঘন্টা বাদেই যথা সময়ে ঘুম ভাঙ্গলো পাশের রুমে খটর খটর শব্দ শুনে। গলা উঁচিয়ে ডাকি,

-মিথীলা, এই মিথীলা!!

-কী হয়েছে!

-তুই স্কুলে যাস নি? ডীলে মানে  কয় ঘন্টা ডিলে? কখন শুরু হবে স্কুল?

-গলায় উচ্ছ্বাস তুলে মিথীলা বলে, আজকে স্কুল বন্ধ, গোলাপ ফুলের গন্ধ। ( এই পংক্তি আমার কাছ থেকে শিখেছে)।

-একেবারে বন্ধই করে দিয়েছে! কী ব্যাপার!

-একটু একটু স্নো পড়ছে। তাই স্কুল বন্ধ, পাপার ইউনিভার্সিটিও বন্ধ। আমি এখন আবার ঘুমাতে যাব।

-ঘুমাতে যাবি মানে!

-স্কুল নেই তো কী করবো, একটু আরাম করে ঘুমাই। বারোটার সময় উঠবো।

-মাথা খারাপ! স্নো দ্যাখ, ছবি তুলে রাখ, আমার লেখার জন্য ছবি দরকার। ছবি তোলা শেষ হলে আমাদেরকে চা খাওয়া।

-মা!! তুমি বলার আগেই আমি ছবি তুলে রেখেছি, জানি তো, ঘুম থেকে উঠেই তুমি ছবি তোলার কথা বলবে। হা হা হা হা

-এবার তাহলে চা খাওয়া। ভালো কথা, স্নো পড়ছে, এই রকম একটা শট নিতে পেরেছিস?

-হি হি হি! চেষ্টা করেছি, জানিনা কেমন উঠেছে। এখন আবার তুলে দেই। এই স্নো তো অন্য সময়ের মত না, বাগানে কিছুই জমেনি, স্নোম্যান বানানো যাবে না।

-থাক, তুই এখন বড় হয়ে যাচ্ছিস, স্নোম্যান বানাতে হবে না, আসল ম্যানদের যন্ত্রণায় স্নোম্যান উধাও হয়ে গেছে।

-কী বলছো, কিছুই বুঝি না।

-থাক, এখন বুঝতে হবে না। একটু চা খাওয়া, বিছানায় বসে লেপ মুড়ি দিয়ে চা খাই, তারপরেই তো ছুটতে হবে ওয়ালমার্টে, সুখের পরে দুঃখ।

-আমাদের স্কুল বন্ধ, পাপার ইউনিভার্সিটি বন্ধ, ওয়ালমার্ট বন্ধ হলে অনেক ভালো হতো।

-হা হা হা হা!!!  এই 'ছ্যাপ' এর মত স্নো পড়ছে, তাতে দুনিয়া বন্ধ করে দিতে হবে?

-ছ্যাপ কি?

-থুতুর আরেক নাম 'ছ্যাপ'!

-মা!! তুমি কী সব উইয়ার্ড কথা বল!!

-তুই বুঝবি কি! ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে যখন ছিলাম, তখন দেখেছি সত্যিকারের তুষারপাত। বীরের বেশে আসতো তুষারঝড়! কী সুন্দর দৃশ্য! আহ! আমাদের ঘর, রাস্তার গাড়ী সব ডুবে যেতো হাঁটুর উপর বরফে। রাতের আকাশের দিকে তাকালেই মনে হতো স্টেডিয়ামে ফ্লাড লাইট জ্বলছে, পাতা ঝরা গাছের ডালে বরফের থোকা ঝুলতো, কী যে সুন্দর সেই দৃশ্য! মনে আছে, যেদিন প্রথমবার হেভী স্নো হলো, বিকেলবেলা সব বাচ্চারা রাস্তার উপর হুটোপুটি খাচ্ছিল, আমি এই প্রথম দেখলাম স্নো কী জিনিস! তোর পাপা তো কানাডাতে থাকতেই স্নো দেখেছে, সে থাকতোই স্নো এর দেশে, আমি তো দেখিনি। মিশা তোকে নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশে গেলো। তোকে কানমাথা ঢাকা গোলাপী জ্যাকেট পরিয়েছিল। তোরা যখন বাইরে খেলছিলি, আমার তখন ইচ্ছে করছিল, বাইরে গিয়ে স্নোএর  উপর গড়াগড়ি খাই। মিশা ছোট হলেও আমার মনের গোপন ইচ্ছেগুলো টের পেতো। ও ঘরে এসে আমাকে বলেছিল, পাপাকে সাথে নিয়ে বাইরে আসতে। আমি তোর পাপাকে বলেছিলাম, " চল না, আমরা স্নোএর রাস্তা হেঁটে আসি'"। তোর পাপা আমাকে নিয়ে বের হয়েছিল। তোরা ঘরের সামনে খেলছিলি, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। মিশা আমাকে ডেকে বলেছিল,

-মা, আমি আর দিদিসোনা 'কনি'কে দেখে রাখবো, তুমি বাবাকে নিয়ে অনেকদূর চলে যাও।

আমি স্নোয়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম, এর আগে কখনও হাঁটিনি তো, তোর পাপা বারবার বলছিল, সাবধানে পা ফেলতে, পড়ে যাবার ভয় আছে। আমি তো শুকনো রাস্তাতেই কতবার পড়ে যাই। আমি তোর পাপাকে বললাম,

-আমার হাতটা ধরো, এখানে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, আমি তোমার বউ, অন্যদের দিকে তাকিয়ে দেখো, এরা অনেকেই স্বামী-স্ত্রী না, কিন্তু কী সুন্দর হাত ধরাধরি করে হাঁটছে! তুমিও আমার হাত ধরো।

-হা হা হা হা! মা তুমি যে কি বলো না, পাপা কী হাত ধরেছে?

-অবশ্যই ধরেছে, আমি যা বলবো, তা মানতেই হবে, হাত ধরে তোর পাপা আমাকে অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে গেছে, কানাডার গল্প করেছে, কত মানুষ স্নোএর মধ্যে হাঁটতে গিয়ে পড়ে কোমড় ভেঙ্গেছে, হা হা হা হা! অমন সুন্দর মুহূর্তে তোর পাপার মাথায় কোমর ভাঙ্গার ভয় ঢুকেছে! হা হা হা হা!

-হি হি হি! আমার সব কথা মনে আছে মা, আমরা স্নোম্যান বানাতাম, মিয়া আমার জন্য স্লেজ গাড়ী বানিয়েছিল, আমাকে সেইটাতে বসিয়ে পাহাড়ের স্লোপ দিয়ে টেনে নামাতো, আমাদের নেইবার সারাহ আসতো আমাদের সাথে খেলতে, কিন্তু সারাহ অনেক মোটা ছিল, মিয়ার অনেক কষ্ট হতো ওকে নামাতে।

-তোর কী মনে আছে,  মিশা  আর মৌটুসী শাবল দিয়ে রাস্তার স্নো পরিষ্কার করতো! ওরা এত পছন্দ করতো স্নো পরিষ্কারের কাজ যে আমাদের নেইবারদের ঘরের সামনের রাস্তাও পরিষ্কার করে দিত। একদিন পাশের বাড়ীর মোটামোটি মিশাকে দুই ডলার দিতে চেয়েছিল। মিশা তো অবাক হয়ে গেছে, বার বার বলছিল, " না না, পয়সা দিচ্ছো কেনো, আমার কাছে খুব ভালো লাগে স্নো পরিষ্কার করতে, তাই তোমাদের রাস্তাটাও পরিষ্কার করে দিচ্ছি।" মোটি বলেছিল, " এখানে সবাই পয়সার বিনিময়ে কাজ করে। তুমি স্নো পরিষ্কার করেছো, এটা তোমার পারিশ্রমিক" বলে জোর করে মিশার হাতে ডলার গুঁজে দিয়েছিল।

-মোটি কার নাম ছিল? সারাহর মায়ের নাম?

-মোটি কারও নাম না, সারাহর মায়ের নাম ক্যারেন। আমি বলছি অন্য লেডীর কথা। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পাহাড়ের মত মোটা ছিল।

-হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমাদের পাশের বাড়ীর নেইবার, কিন্তু মা তুমি মীন হচ্ছো কেনো? মোটামোটি বলছো কেনো ওদেরকে?

-হা হা হা ! আমি মীন হচ্ছি না, বাংলাদেশের মানুষ এভাবেই কথা বলে। আমি তো তাও শুদ্ধভাবে বলেছি মোটামোটি, দেশে থাকলে বলতাম, 'মোটকা মুটকী'! শোন, সব কিছু জেনে রাখা ভালো। আমি চাই তোরা দেশে যাবি, দেশে গেলে ভালো-মন্দ সবই দেখবি, শুধু ভালোটুকু শিখলে এখনকার দুনিয়ায় চলতে পারবি না। তোরা মন্দ হইস না, কিন্তু মন্দকে চিনে রাখা ভালো, তাহলে মন্দকে এভয়েড করতে পারবি।

-মা, এবার থামো, আজকে তোমার মাথাটা একটু গন্ডগোল হয়ে গেছে ( এইসব শব্দ আমার কাছ থেকে শেখা)।

-হুম, বড়ই সুখের দিন ছিল। সেই স্নোয়ের সাথে আজকের এই স্নো কে যদি কমপ্যায়ার করি, তুইই বল, এটাকে কী 'ছ্যাপ' বলতে পারি না?

---হাহাহাহাহহা! বলো, তবে আর কোন সুন্দর ওয়ার্ড নেই?

না, আমাদের বাংলা ভাষায় শুধু সুন্দরকেই সুন্দর বলা যায়, অসুন্দর বা  কুৎসিতকে ভদ্রতার খাতিরেও সুন্দর বলা যায় না, তাহলে সুন্দরের অপমান হয়। যাহ! এবার রেডি হতে হবে আমাকে। তোরা 'ছ্যাপ' স্নো এনজয় কর, আমি কাজে বেরিয়ে যাই।


Wednesday, January 16, 2013

বেঁচে থাক বাঙ্গালী ডালে, মাছে-ভাতে!!!

বেঁচে থাক বাঙ্গালী ডালে, মাছে-ভাতে!!!

আজ ছিল আমার অফ'ডে, অর্থাৎ টিফিন বাটি হাতে নিয়ে কাজে যেতে হয়নি। এর নামই অফ'ডে। বাকী সব অন'ডে! অবশ্য অফ'ডে তে আমার বেলায় একটু বৈচিত্র্য আছে, ইচ্ছে করলে সারা সকাল ঘুমাতে পারি। ঊত্তম কুমার আর মিথীলা নিজে নিজেই রেডী হয়ে যার যার পথে চলে যায়। যাওয়ার আগে উত্তম আমার জন্য এক কাপ চা কিচেনের কাউন্টার টেবিলে রেখে যায়। যখনই আমি ঘুম থেকে উঠি, নীচে নেমে সেই ঠান্ডা চা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দুই মিনিট গরম করে নেই। খুবই বিস্বাদ লাগে সেই চা খেতে, তবুও খাই। আগে খাবার অপচয় করতে চাইতাম না বলে কাপের তলাণীটুকুও চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলতাম, ইদানিং বিস্বাদ হয়ে যাওয়া চা দুই চুমুক খেয়েই রেখে দেই। আমি কফি খাই না, চা খাই দিনে দুইবার, সেটুকুও যদি যুতমত না পাই, খাই কী করে! তবে এটা তো আর উত্তমের দোষ নয়, আমি ঘুমিয়ে থাকি বলে আমাকে ডাকে না। সোজা হিসেব।

আজকে অবশ্য ঘুম ভেঙ্গেছে বেশ দেরী করে, সকাল সাড়ে দশটায়। আমি যখনই ঘুম থেকে উঠি না কেনো, আমাকে কেউ বকবার নেই, তবুও ঘুম ভাঙ্গতে দেরী হলে ছোটবেলার মত বকা খাওয়ার ভয় লাগে। মনটা খারাপ হয়ে গেছে ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজতে দেখে। গতকালকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, আজকে অনেক কিছু রান্না করবো। তা কখন করবো? ফেসবুকে বসতে হবে না? ফেসবুকে একবার অন্তঃত একটুক্ষণের জন্য হলেও ঢুঁ মারতে হবে, নাহলে সারাদিনে মুড অফ হয়ে থাকবে। আগে মানুষের বাড়ীতে বেড়াতে যেতে কী যে ভালোবাসতাম, এখন কেউ নেমন্তন্ন করলে চিন্তায় থাকি, কখন ফিরতে পারবো। ফেসবুকে যেতে হবে, মজার কথা বলি, সেদিন আমাদের বন্ধু সব্যসাচী তার ক্রুজে ভ্রমণ করে আসার অপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিল, পাশে ছিল শুভাশীষ'দা ও রঞ্জনা বৌদি। তাদেরও ক্রুজে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। তিনজনে মিলে উত্তম কুমারকে বলছিল, তাঁর সুচিত্রাকে নিয়ে যেনো একবারের জন্য হলেও ক্রুজে যায়। উত্তম তো পারলে তখনই টিকেট বুকিং দিয়ে ফেলে! এদিকে আমার তো মনে ভয়, হায় হায়! ক্রুজে গেলে পাঁচদিনের ধাক্কা, ওয়াইফাই থাকবে তো! জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হচ্ছে, কারণ ওরা সকলেই আমার ফেসবুক নেশার কথা জানে। আড়ালে এবং সামনাসামনি একটু হাসাহাসিও করে আমাকে নিয়ে।  মরীয়া হয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ক্রুজে ওয়াইফাই আছে কিনা। জাহাজের ডেকে বসে রাতের বেলা আকাশের তারা দেখা যাবে কিনা, ল্যাপটপ সাথে নিয়ে গিয়ে লেখালেখি করা যাবে কিনা! আমার প্রশ্ন শুনে উত্তমের উৎসাহে ভাটা পড়ে গেলো, মেয়ে মিশা হেসেই ফেললো, বন্ধুরা ভরসা দিল, সবই আছে জাহাজে, শুধু গেলেই হলো। এবার আমি সায় দিলাম, যদি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারি, তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই। উত্তমকে আর সাড়াশব্দ করতে না দেখে, মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি।


অনেক প্যাঁচাল পারলাম। সাড়ে দশটায় ঘুম থেকে উঠে কম্পিউটার অন করলাম। স্ক্রীণ অন হওয়ার মুহূর্তটুকুতে নীচে নেমে চায়ের কাপ মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দুই মিনিট দিয়ে ঝাড়ু হাতে বাসি ঘর ঝাড়ু দিতে লাগলাম। দুই মিনিট শেষ, ওভেনে পিপ পিপ আওয়াজ হচ্ছে, ভেবেছিলাম দুই মিনিটেই ঘর ঝাড়ু শেষ হবে, কিন্তু বাস্তবে আরও পনের সেকেন্ড সময় বেশী লেগেছে। এক হাতে চায়ের কাপ, আরেক হাতে ঝাড়ু নিয়ে উপরে উঠে এলাম। ততক্ষণে স্ক্রীণ পুরোপুরি অন হয়ে গেছে। সকালের ঘর ঝাটপাট শেষ করেই চায়ের কাপে সুড়ুৎ করে এক চুমুক দিতেই জিভটাতে ছ্যাঁকা লাগলো। উঃ করার আগেই ফেসবুকে ঢুকে গেছি। মেসেজ বক্সে মেসেজ আছে দেখে খুশী হয়েছি। খুলে দেখি আলীম হায়দার ধ্রুব মেসেজ পাঠিয়েছে। সেই মেসেজ পাওয়ার উপর একটি লেখা " ঘুম ভেঙ্গে দেখি",সাথে সাথে লিখে ওয়ালে পোস্ট করে দিলাম।

এরপর দুইটা ঘন্টা রান্নার কথা ভুলে ফেসবুকেই বসে থাকলাম। যখন বেলা বাজে একটা, মাথায় বাজ পড়লো। উত্তম কুমারের আসার সময় হয়ে গেছে, লাঞ্চ রেডী করি নি। এক দৌড়ে নীচে গেলাম, দেখি আগের রাতের সেই ভুনা খিচুড়ী কিছু রিয়ে গেছে। সেটাই গরম করে ডাবল ডিমের ওমলেটসহ খেতে দিলাম। নিজেও খেলাম। মাথায় চিন্তা, কখন রান্না করবো, আমার যে ফেসবুক থেকে উঠতেই ইচ্ছে করছে না। আসলে আমি ফেসবুক ওপেন করে রেখে হাজারটা ওয়েব সাইট ব্রাউজ করি, তার মধ্যে ইউটিউব আছে। ইউটিউবে গিয়ে গান না শুনতে পারলে ভালো লাগে না। অনেকেই তাদের লেখা আমার ওয়ালে ট্যাগ করে, সেগুলোও পড়ি। সেসব করতে করতেই বেজে গেলো বিকেল পাঁচটা। এই রে! এবার কিচেনে ঢুকতেই হবে।


আমাদের এক অনেক বড় শুভাকাংক্ষী আছেন এখানে, উনার অনুরোধে উনাকে আমি 'ভাইয়া' না ডেকে 'দাদা' ডাকি, আমার ভাই ভাগ্য বরাবর ভালো, এই দাদাটিও আমার জন্য বিরাট বড় পাওয়া। গতকাল উনি বিশ্বভ্রমণ শেষ করে ফিরে এসেছেন, আজকে উনাকে রাতে খেতে বলেছি, অথচ বিকেল পাঁচটাতেও কিছুই রান্না করিনি। এই দাদার স্বভাবটিও আমারই মতো, খান অল্প, কিন্তু আয়োজনে ত্রুটি দেখতে পছন্দ করেন না। উনার সামনে রাশি রাশি খাবার থাকলে উনি খুশী হন, বার বার বাহ! বাহ! করতে থাকেন, অথচ প্লেটে নেন যৎসামান্য। নিজের বাড়ীতে কড়াই ভরে ভরে রান্না করেন, অতিথিকে গলা পর্যন্ত খাওয়ান। সেই দাদা আসবেন আর আমি রান্না করবো না, তা কী করে সম্ভব! শুরু করে দিলাম রান্না-বান্না।

রাত আটটায় ডিনার রেডী। রান্না করেছিলামঃ   টার্কী কিমা, তেলাপিয়া মাছের ঝুরী,  চিকেন মাখানি,  দেশী মুসুরের ডাল আর ফুলকপির ডাটা চচ্চড়ি ( সাথে বড়ি ভাজা দিয়েছি)।

দাদা প্রথম দানে একটু একটু করে চামচের আগায় খাবার তুলে নিয়েছেন, আমরা স্বাভাবিক পরিমানেই নিয়েছি। কিন্তু দাদাকে বলেছি,

" দাদা, আপনার অনারে রান্না করেছি, আপনি এই এতটুকু করে নিচ্ছেন, আবার চাইলে কিন্তু পাবেন না, আমি আর নিতে দেবো না"।

-" কী করি বলো বইন, বয়স হচ্ছে তো, অল্প অল্প খাওয়া উচিৎ, বাঁচতে হবে তো"

" আমার রান্না খেলে মরা মানুষও বেঁচে উঠে, আর আপনি ভয় পাচ্ছেন মরা-বাঁচা নিয়ে"।

" হা হা হা!! এইটা তুমি কী বললা বইন, আচ্ছা যাও, আমি দ্বিতীয়বার এসে নিয়ে যাবো"।

আমি আজকে ডাল রান্নাই করতাম না, যদি দাদা না আসতেন। সেই দাদা প্লেটে নিয়েছে এক চামচ ডাল। কেমনটা লাগে! ঠিক করেছি, কিছু বলবো না, দেখি উনি কী করেন!  উনি যা খেয়ালী মানুষ, পাখীর মত এইটুকুনী খান, কিন্তু এমন আহ! কী মজা হয়েছে, অথবা, মিঠু, বইন এইটা কী খাওয়াইলা, এতো মজা হইছে, ধরণের স্তোকবাক্য শোনান। তবে আমার রান্না যে কোন ডাল, মহাভারতের দ্রৌপদীকে অনায়াসে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো!

আমরা খাচ্ছি আর গল্প করছি। দাদার বিশ্বভ্রমণের গল্প শুনি আর কল্পনায় দেখি, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান, বাংলাদেশ!!!!! সব কিছুর পাশাপ্সহি এটাও খেয়াল করি,
দাদা দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার  টেবিলে এসেছেন, শুধু মুসুর ডাল আর তেলাপিয়ার ঝুরী নেয়ার জন্য। বেঁচে থাক বাঙ্গালী ডালে, মাছে-ভাতে!

ঘুম ভেঙ্গে দেখিঃ

একজন নবীন ও বয়সে তরুণ প্রকাশক তাঁর ম্যাগাজিনে আমাকে একটি নতুন গল্প লিখে জমা দিতে বলেছেন, গল্পের থিম বলা আছে, ( মুক্তিযুদ্ধ, বঞ্চিত নারী, অথবা বীর নারী, যুদ্ধাপরাধী, -----), শব্দসীমা ১৫০০ বলা আছে, গল্প জমা দেয়ার লাস্ট ডেটও বলা ছিল, ১৬ই জানুয়ারী।

আমি বুঝেই উঠতে পারছিলাম না, কী করে ১৫০০ শব্দের ভেতর থিম অনুযায়ী গল্প লিখবো! আমি তো 'জন্মেই লেখিকা' নই, মুখেও কথা বলি খই ভাজার মত, লিখতে গেলে লেখা শেষ না হতেই কলমের কালি ফুরিয়ে যায়!! সীমিত শব্দে থিম অনুযায়ী গল্প লেখা যে কত কঠিন আমার মত শখের লেখকের জন্য, তা কিছুটা বোধ হয় টের পেয়েছি। তবে শখের লেখক হলেও আমার মধ্যে এক ধরণের ‘শেষ না দেখে ছাড়বো না’ জাতীয় জেদ আছে, সেই জেদকে সম্বল করেই গল্প লিখতে শুরু করেছি।

কাল রাতে কাজ থেকে ফিরে লেখা শুরু করেছি, অতি কষ্টে লেখা শেষ করে দেখি ১৯৭৭ শব্দ। এই সেরেছে! কিছুদিন আগেই আরেকটি গল্প পাঠিয়েছিলাম, শব্দ সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল, ৩০০০ এর উপর, তরুণ খুব বিনয়ের সাথে জানিয়েছে, এত বড় গল্প প্রথম সংখ্যায় ছাপানো খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে! বলেছি, ঠিক আছে, থাকুক, আবার লিখবো। অনেক ভেবে ১৯৭৭ শব্দে ‘আমাদের বহ্নিশিখা’ লিখলাম। ১৯৭৭ শব্দ? এটা পাঠানো যাবে না। শুরু হলো ছাটাই পর্ব। নিজের ফ্যাক্টরী থেকে শ্রমিক ছাটাই করা যায়, কিন্তু নিজের সংসার থেকে তো সন্তানকে ছাটাই করে দেয়া যায় না। আমাকে সেই কাজটিই করতে হয়েছে। নিজের লেখার সংসার থেকে 'ডিলিট' নামক ছুরী দিয়ে কাটা শুরু করেছি।

'ডিলিট' খুব ভালো ব্র্যান্ডের ছুরী। একবার বাটনে টিপ দিলেই হলো, লেখা ভ্যানিশ! খুন-জখমের চিহ্নও থাকেনা, পুলিশ দারোগার বাবারও ক্ষমতা নেই, হারিয়ে যাওয়া লেখাকে খুঁজে পাওয়া অথবা খুনীকে গ্রেফতার করা। যাই হোক, ছাটাই করে গল্প দাঁড়িয়েছে ১৫৬৭ শব্দে। গল্পের নাম ‘ আমাদের বহ্নিশিখা’ থেকে দাঁড়ালো ‘বহ্নিশিখা’। ‘আমাদের’ শব্দটিই ছিল ছাটাইকৃত শেষ শব্দ, এর বেশী আর সম্ভব হলো না। গল্প তরুণ প্রকাশকের কাছে মেইল করে দিলাম। ক্ষমাও চাইলাম অতিরিক্ত ৬৭ শব্দকে ছাটাই করতে পারিনি বলে, এবং তাঁর উপর ওদের ভাগ্য ছেড়ে দিলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠেছি দেরী করে, মানুষ ঘুম ভেঙ্গে ঈশ্বরের নাম নেয়, আমি নেই 'ফেসবুক' এর নাম। ফেসবুক খুলতেই পেলাম সেই তরুণ প্রকাশকের মেসেজঃ

প্রিয় মিঠুদি,
অসাধারণ................ আপনার লেখাগুলোর মধ্যে সেরা লেখা এটা...
প্লিজ লেখা থামাবেন না............
কম লেখেন কিন্তু এরকম থিম ধরে ধরে লেখেন... সময় নিয়ে লেখেন..............
ভালো লেখা অল্পই যথেষ্ট...........................
দেশে এলে হোটেল প্রিন্সে চা খাওয়াবো আপনাকে, আমার খুব পছন্দের চা হোটেল প্রিন্সের চা............
ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। আমি বিমোহিত।
আপনার সুন্দর দীর্ঘ জীবন কামনা করি।
এরকম লেখা হলে কয়েক’শ শব্দ কমবেশী হলেও কোন ব্যাপার না................
চিয়ার্স..
আপনার নাম কি লিখব? রীতা রয় নাকি রীতা রয় মিঠু... নামের বানান সহ নামটা একটু কনফার্ম করেন প্লিজ....
এটা কি রিসেন্টলি লিখলেন? নাকি .. উফ.. দারুণ.............
ইতি-
ধ্রুব।
***ভাগ্যে থাকলে হয়তো বা এবারের বইমেলায় নতুন প্রকাশিত ম্যাগাজিন ‘তেজপাতা’ তে থাকবে রীতা রায় মিঠুর লেখা গল্প ‘বহ্নিশিখা’!

****ভাগ্যে থাকুক আর না-ই থাকুক, ‘বহ্নিশিখা’ সকলের সামনে প্রকাশিত হোক আর না-ই হোক, তরুণ আলীম হায়দার ধ্রুবকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, তাঁর ‘তেজপাতা’ তে আমাকে ডেকে নেয়ার জন্য। ‘তেজপাতা’ প্রকাশিত হোক, সুগন্ধ ছড়িয়ে দিক চারিদিকে!!

Monday, January 14, 2013

সারাদিন বৃষ্টি, একটি ফোন কল, খিচুড়ী আর বেগুন ভাজা!

গত দু'দিন ধরে আমার মন খারাপ। কেনো খারাপ, তার কোন নির্দিষ্ট কারণা নেই। এজন্যই 'আমার মন খারাপ' এখন আর কাউকে হতাশ করে না। মন খারাপ ব্যাপারটির সাথে আমি নিজেও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। বেশ বুঝতে পারছি, আশাপূর্ণা দেবী অথবা সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য  হতে চলেছি। হা হা হা! একটু মজা করলাম।

আমার মন নানা কারণেই খারাপ থাকে, হতে পারে, খুব বেশী সেনসিটিভ হয়ে যাচ্ছি। ছোট ছোট ব্যাপারগুলোও আমাকে খুব কাঁদায়। সত্যিই কাঁদায়।  কেউ রসিকতা করে কিছু বললেও কাঁদি, আবার সিরীয়াসলী কিছু বললেও কাঁদি। তবে আমার কান্না আমার ভেতরেই থাকে, বাইরে আনি না। কী দরকার, একে তাকে বলে, কেউ তো বুঝবেও না। তবে ইদানিং দেখছি, আকাশ বুঝতে পারে আমার মন খারাপের ব্যাপারটি। নাহলে শীতকালেও কেনো এমন বৃষ্টি হবে। যে ক'দিন আমার মন খারাপ থাকে, সে ক'দিনই অবিরাম বৃষ্টি পড়ে। আজকের বৃষ্টি ছিল ক্ষমার অযোগ্য, আমার মন অত বেশী খারাপ ছিল না যে আমার দুঃখে আকাশ ভেঙ্গে নেমে আসতে হবে।

এমন ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও কাজে যেতেই হয়েছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মুখ ব্যাদান করে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই, টিব্রেক নেই, কফিরুমে গিয়ে মন খারাপ করে মাথা নীচু করে বসে থাকি। এভাবেই চলছিল, হঠাৎ করেই আমার সহকর্মী আমার নাম ধরে ডাকতেই মুখে নকল হাসি ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করি, কী ব্যাপার!

-তোমার নাম কী রীটা মিতু?
-মানে?
-তোমার লাস্ট নেম কী মিতু?

-না, মানে, হ্যাঁ, কেনো বলো তো! তুমি কী করে জানলে আমার লাস্ট নেম মিঠু, মিঠু আমার লাস্ট নেম নয়, নিক নেম।

-তোমার একটা কল এসেছে, রীটা মিতু বলেছে। ফেসবুকে তোমার নাম রীটা রয় মিতু দেখেছি।

ওর সাথে আর কথা বাড়ালাম না, মনে মনে অবাক হয়ে গেছি, আমাকে পরিবার এবং দু'চারজন বন্ধুর বাইরে কেউ অফিসের নাম্বারে কল দেয় না। তাও আবার তারা কেউ আমার মিঠু নাম বলে না। কে হতে পারে? বুক কাঁপতে শুরু করলো। আমি খুব দ্রুত চিন্তা করতে পারি। প্রতি সেকেন্ডে একটি করে কল্পনা করার ক্ষমতা আমার আছে। পাঁচ সেকেন্ড লেগেছে রিসিভার উঠাতে। পাঁচ সেকেন্ডে আমি পাঁচ জনের নাম মনে মনে ভেবেছি, নামগুলো এখানে নাই-বা বললাম। তবে বিশ্বাস করিনি, তাদের কেউ আমাকে এখানে ফোন করবে।

-হ্যালো! হু ইজ দেয়ার?
-আপনি কী রীতা রায় মিঠু বলছেন ( ভীষণ মিষ্টি গলায়)
-বলছি
-আপনি কী প্রিয় ব্লগে লিখেন?

এটুকু শুনেই আমার ভয় লাগলো, কে জানে, আমার কোন নির্দোষ লেখায় কারো কোন ক্ষতি হয়ে গেলো কিনা। বললাম,

-হ্যাঁ, আমি প্রিয় ব্লগে লিখি।
-আন্টি, আমি প্রিয় ব্লগ পড়ি। প্রতিদিন পড়ি।  ইনফ্যাক্ট, আমি রান্নাবান্না তাড়াতাড়ি শেষ করে কম্পিউটারে গিয়ে বসি প্রিয় ব্লগে আপনার লেখা পড়ার জন্য।

-তুমি কে? কোথা থেকে কথা বলছো?

-আন্টি, আমি ক্যালিফোর্ণিয়া থেকে কল করেছি। আন্টি আমি অনেক এক্সাইটেড, কী রকম হাঁপাচ্ছি!  আমার ফেসবুক নেই, ই মেইল অ্যাডরেস নেই, আমি কতভাবে চেষ্টা করেছি, আপনাকে একটু পাওয়ার জন্য।

-কী বলো! এতো ভালো লাগে আমার লেখা! আমি তো বিশ্বাস করতে পারছি না।  তোমার নাম কী?

- আমার নাম ঐন্দ্রিলা, ক্যালিফোর্ণিয়াতে এসেছি দু'বছর আগে।

-পড়তে এসেছো?
না, হাজবেন্ডের কাছে এসেছি। আমার বয়স অনেক কম, আপনার মেয়ের বয়সী হবো।

-তোমার বয়স কম, আমি তোমার কান্ড দেখেই বুঝে ফেলেছি ( হা হা হা )। কম বয়সী না হলে এমন হুলুস্থূল কান্ড কেউ করে? এইজন্যই কম বয়সী ছেলে মেয়েদেরকে আমি খুব ভালোবাসি, তাদেরকে খুব ফিল করি। আমি ভাবতেই পারছি না, ব্লগে লেখা পড়ে কেউ এমন মরীয়া হয়ে আমাকে খুঁজে বের করে ফেলেছে। মাগো, তুমি তো জানোনা, তুমি আমার আজকের দিনটি বদলে দিয়েছো।

-আন্টি বিশ্বাস করেন, আমার ফেস বুক নেই বলে আপনাকে মেসেজও করতে পারছিলাম না। আমি আপনার লেখা প্রতিদিন পড়ি। নতুন লেখা না থাকলে পুরানো গুলো পড়ি। আমার আম্মুকে ফোন করলেই আপনার কথা বলি।

-আচ্ছা, আমি কী বলবো বুঝতেই পারছি না। তুমি আমার এই নাম্বার কোথা থেকে পেলে?

-আন্টি, সরি, আমার উচিৎ হয় নি, অফিসে ফোন করা, কিন্তু আমার আর কোন উপায় ছিল না। আমি এখানে একা থাকি,  আম্মুর জন্য খারাপ লাগে, আপনার লেখাগুলো পড়লে আম্মুকে ফিল করি।

-মাই গড! তুমি তো আজকে আমার মন ভালো করে দিলে!

-আন্টি, আজ রাতে আমার ঘুমই হবে না, এতো আনন্দ হচ্ছে, আপনি কী বুঝতে পারছেন যে আমি কেঁদে ফেলেছি, আর কী রকম হাঁপাচ্ছি দেখেন। আমি সব সময় আম্মুকে বলি, আম্মু আমি এখানে আরেকজন 'মা' পেয়েছি। আম্মু জানতে চেয়েছে আপনার কথা, বলেছি, এখনও উনার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি, তবে চেষ্টা করছি। আন্টি, এবার শোনেন, আমি কী করে আপনার নাম্বার যোগাড় করেছি।

ঐন্দ্রিলা নাম্বার যোগাড় করার কাহিণী শোনাল, আমি থ' হয়ে গেছি। এই মেয়ে কী দারুণ স্মার্ট, কী ভীষণ বুদ্ধিমতী! মেয়েটির ফেসবুক একাউন্ট নেই শুনে বলেছি,

-থাক মাগো! ফেসবুক থাকার দরকার নেই। স্বামী যেভাবে খুশী থাকে, সেভাবেই চলো। ফেসবুক অনেক জনপ্রিয় মাধ্যম হলেও, ফেসবুকের যন্ত্রণাও আছে। তুমি নতুন জীবন শুরু করেছো,  আনন্দ করো, ফেসবুক নেই বলে এমন কোন ক্ষতি হয় নি। আমি তো এখন ব্লগে রেগুলার লিখি না। তোমাকে আমার নিজের ব্লগের লিঙ্ক দিচ্ছি, ওখানে গেলে আরও অনেক বেশী লেখা পড়তে পারবে।

-সত্যি দিবেন! আচ্ছা, আমি তাই করবো। আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমার হাজব্যান্ড ফেসবুক পছন্দ করে না, তাই ফেসবুকে যেতে পারবো না। আমি প্রতিদিন খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করেই প্রিয় ব্লগে চলে যাই। আপনার লেখাগুলো খুঁজি।

-এবার আমার চোখে জল আসে। বুঝতে পারি, মেয়েটির স্বামী সারাদিন কাজে থাকে, বাড়ীতে ও একা একা থাকে, মায়ের জন্য কাঁদে। আহারে! কিছুক্ষণ আগেই আমি আমার মায়ের জন্য কাঁদছিলাম। আমি যখনই আমার মায়ের জন্য কাঁদি,  কোন না কোনভাবে  মা  আমার জন্য একরাশ আনন্দ পাঠিয়ে দেন। আজকে 'ঐন্দ্রিলা' আমার জন্য আনন্দ নিয়ে এসেছে। এ আনন্দ অন্য সব আনন্দের থেকে আলাদা। এ আনন্দ আমার স্বীকৃতি, এ আনন্দ আমার পারিশ্রমিক, এ আনন্দ আমার দুঃখের দিনে শান্তির প্রলেপ, এ আনন্দ আমার উপর আমার মা-বাবার আশীর্বাদ!

কাজের সময় এতক্ষণ আমি ফোনে থাকি না। ঐন্দ্রিলাকে অনেক ভালোবাসা জানিয়ে ফোন রেখে বেশ কিছুক্ষণ বোবা হয়েছিলাম। আমার সর্বক্ষণের প্রিয় বন্ধু রয় কে ডাকলাম, রয় জানে, আমার লেখালেখির নতুন নেশার কথা। রয় কে সব খুলে বললাম, আমার মুখের দিকে তাকিয়েই রয় বললো,

- আমাদের তরফ থেকে মেয়েটিকে থ্যাঙ্কস জানিও, ও এত কষ্ট করে নাম্বার যোগাড় করে তোমাকে কল দিয়েছে বলেই দু'দিন বাদে তোমার মুখে হাসি ফুটেছে। ব্যাপারটি সত্যিই খুব আনন্দের, তোমার অনুভূতি বুঝতে পারছি।


এরপর মন খারাপ কেটে যেতে শুরু করলো, মনে মনে ভাবছি, গত বছর এই প্রিয় ব্লগেই, এক ভদ্রলোক ( আমেরিকার কোন এক স্টেটে অধ্যাপনা করেন) আমাকে ওয়ালমার্টের চীপ এসোসিয়েট’ বলে উপহাস করেছিল, কারণ আমার লেখা উনার কাছে খুব সস্তা মনে হয়েছিল। উনার রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে আমার লেখার বিষয়বস্তুর চরম বিরোধ ছিল। ব্যাপারটি উনি সহ্য করতে পারতেন না। এই ভদ্রলোক আমার ইষ্টি গুষ্টির নাম ঠিকানা তার মন্তব্যে উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল, উনি আমার খোঁজ খবর নিয়েই মাঠে নেমেছেন। সে লেখাগুলো অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি, ভেবেছি যাক! এগুলো আর সহজে কারো নজরে আসবে না। কারণ, উনার কর্মকান্ডে আমার খারাপ লেগেছিল, একজন অধ্যাপক হয়ে কী করে এমন স্থূল ধরণের কাজ করতে পারেন! বুঝা গেলো, ঐন্দ্রিলা সেই সকল পুরানো লেখা ঘেঁটেই আমার খোঁজ বের করেছে। আরও একটি জিনিস পরিষ্কার হয়েছে, মাঝে মাঝে ‘উচ্চশিক্ষিত বয়স্ক’ দের চেয়ে একজন তরুণ গৃহীনির মানসিক গঠণ অনেক বেশী আধুনিক। কারণ সেই অধ্যাপক ভদ্রলোক ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন মন্তব্যকারী আমাকে নানাভাবে হেনস্তা করেছিল, ফলে ওখানে লেখা জমা দিতে ভয় পেতাম, কটু মন্তব্যের ভয়ে অনেক সময় লেখা জমা দিতাম না। য়ামার সাথে সাথে অন্য আরও দশজন পাঠক পড়ছে এই সকল বিশী মতব্য, লজ্জায় মরে যেতাম। এই প্রিয় ব্লগেরই আরেক তরুণ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ পাঠিতেছিল, যেনো লেখা বন্ধ না করি, প্রয়োজনে অন্য ধরণের টপিক নিয়ে লিখি। কিছুদিন পর লেখার ট্র্যাক বদলে ফেলি, অন্য ধরণের লেখা লিখি, আরও দু’চারটে ব্লগে লিখি, এখন আর কেউ কটুকাটব্য করে না। অথবা কটুকাটব্য করলেও গায়ে মাখি না। শান্তিতে লিখি। ব্লগে সকলেই আমাকে ‘দিদি’ ডাকে, আমি ভীষণ খুশী হই।



তবে আজকের খুশীর সাথে কোন খুশীরই তুলনা চলে না। আমার নিজের মেয়েরাও আমার লেখা পড়ে দেখার সময় পায় না, আর সেই কতদূরে আরেক মায়ের মেয়ে, আমার লেখায় তার দেশে ফেলে আসা মা'কে খুঁজে পায়! এ যে কী ভীষণ বড় সার্টিফিকেট আমার জন্য। আমার মনে হয়েছে, এ আমার বিরাট অর্জন, এ আমার নিজস্ব অর্জন। আমার নিজের যোগ্যতায় আমি ঐন্দ্রিলার মত মিষ্টি একটি মেয়ে পেয়েছি, নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা পেয়েছি। আজকের দিনটি সেলিব্রেট করতেই হয়।

ঔপন্যাসিকা সেলিনা হোসেন মনে করেন, লেখিকা হওয়ার পূর্ব শর্ত হচ্ছে, নিজেকে সব কিছু থেকে আলগা করে নেয়া। একেবারে একা হতে না পারলে লেখক হওয়া যায় না। কথাটির মধ্যে সত্যতা আছে, কথাটির মধ্যে নিষ্ঠুরতা আছে। আমি কথাটির সত্যতাকে মেনে নিয়েছি, কিন্তু নিষ্ঠুরতাকে মানতে পারবো না। ঘরে আমার উত্তম কুমার ও কন্যা মিথীলা আছে। ইদানিং উত্তমের খাওয়া দাওয়ায় বেশ দূর্দিন চলছে, আগের মত যুত করে রান্না করতে পারি না। খিঁচুড়ী তার পছন্দের খাবার, সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ বরং খিঁচুড়ী রান্না করবো।

বাড়ী ফিরেছি সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায়, উত্তম এর আগেই রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দিয়েছে। থাকুক রাইস কুকারের ভাত রাইস কুকারে। আমি কাঁচা মুগ শুকনো তাওয়ায় ভাজলাম, দেশ থেকে নিয়ে আসা কালোজিরে চালের প্যাকেট খুঁজে বের করে খিঁচুড়ী রান্নার আয়োজন করলাম। ওয়ালমার্ট থেকে ফেরার সময় বেগুন আর ধনে পাতা কিনে এনেছিলাম। ঘরে ছিল ফুলকপি। ব্যস! ফুলকপির বড়া, ধনে পাতার বড়া আর বেগুন ভাজা দিয়ে খিচুড়ী। সাথে শুকনো মরিচ ভাজা, আহ! অমৃত।  দোতলায় বসে থেকেই মিথীলা রান্নার গন্ধ পেয়েছে। দৌড়ে নীচে নেমে এসেছে,

-ওরে! মা আজকে বেগুন ভাজা হচ্ছে? আরে! ফুলকপি ভাজা হচ্ছে? এইজন্যই উপর থেকে সুন্দর গন্ধ পাচ্ছিলাম।

-তোর তো দুই নাকই বন্ধ হয়ে আছে, গন্ধ পেলি কীভাবে?

-না, আজকে আমি নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারছি। আজকে এত কিছু রাঁধছো কেনো? তোমার মনটা কী খুব হ্যাপী আছে?

-আমার মন আজকে হ্যাপী আছে। আজ দারুণ একটা ঘটনা ঘটেছে।

-কী হয়েছে আজকে? এওয়ার্ড পেয়েছো?

মিথীলার কথার জবাব না দিয়ে বাংলাদেশে মামাতো ভাইকে ফোন করলাম।

-হ্যালো অপু, হ্যাপী বার্থ ডে!

-থ্যাঙ্ক ইউ ফুলদিভাই। তোমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম।

-অপু শোন, আজকে মজার একটা ঘটনা ঘটেছে। তোরা তো আমার লেখালেখি নিয়ে ঠাট্টা করিস, আজ আমি তিন মেয়ের সাথে আরেকটি মেয়ে পেলাম।

-আমরা ঠাট্টা করি মানে! কী যে বলো না।

-যা বলি, সজ্ঞানে বলছি। একমাত্র বড়দাভাই আমার লেখা পড়ে, লেখার কোথাও যদি একটু সন্দেহজনক কিছু পায়, সাথে সাথে আমাকে ফোন করে, কী ব্যাপার জানতে চায়। যেমন ধর, আজকের এই ঘটনা নিয়ে আমি একটা লেখা লিখবো, সেখানে যদি কোথাও কোন 'উলটা পালটা' পায়, ফোন করে জিজ্ঞেস করবে,

-মিঠু, কী ব্যাপার? তোর মন খারাপ কেনো? তুই ঐ মেয়ের নাম লিখে দিলি, কাজটা ঠিক হয় নাই।

আমাকে তখন বলতে হবে, বড়দা, মেয়েটার নাম, ধাম আমি একটু ঘুরিয়ে দিয়েছি। এখন আমি অনেক কিছু বুঝতে পারি। আর মন খারাপের কথা জানতে চাইছো? পাত্তা দিও না, লেখক হওয়ার অবশ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যখন তখন মন খারাপ হওয়া। আমার মন যত বেশী খারাপ হবে, আমার লেখাও তত বেশী ভালো হবে। হা হা হা! ভালো থাকিস।
 

Sunday, January 13, 2013

কত রকমের মানুষ, তাদের কত রকমের গল্প (৯)

ডাক্তারের মেয়ে নাপিত, ক্যাশিয়ারের ছেলে ল'ইয়ারঃ


সেদিন ছিল শনিবার। ৫ই জানুয়ারীর সকাল দশটা বাজার সাথে সাথে ওয়ালমার্টের ঊদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। শনিবার আমাদের ফোন সার্ভিসের অফিস খোলা হয় সকাল ৯টায়। উইকএন্ড এলেই হলো, গ্রাহকের ভীড় ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়তেই থাকে। তবে আমার বেশী ভালো লাগে উইকএন্ডে কাজ করতে। উইকডে'তে সব অকাজের ছেলেমেয়েরা এসে ভীড় করে। এদের সাথে গল্প করতে ভালো লাগে না। আমার আবার গ্রাহকদের সাথে গল্প না করতে পারলে পেটের ভাত হজম হয় না। আমার পছন্দের মানুষগুলো আসে উইকএন্ডে। তা শনিবারের সকালে প্রচন্ড ভীড় ছিল। একজন গ্রাহকের সার্ভিস কন্ট্র্যাক্ট যখন সাইন করাচ্ছিলাম, তখনই একটু দূরে এক ভদ্রমহিলাকে অপেক্ষা করতে দেখেছি। আমার আরেক সহযোগী মেয়ে সেই ভদ্রমহিলাকে হেল্প করতে চেয়েছিলো, এত ভীড় বোধ তার ভালো লাগছিল না, সেজন্য বোধ হয় ভীড় পাতলা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল সে।

ভীড় কমে যেতেই ভদ্রমহিলা আমার কাউন্টারে এসে দাঁড়াতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি তাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। কেমন যেনো একটু ভীতু  এবং নমনীয় স্বরে সে বললো,

-আমি আমাদের ফোন সার্ভিস রিনিউ করতে চাই।

-বাহ! কোন সমস্যা নেই। আমি করে দিচ্ছি। তোমার আইডি দেখাও প্লীজ!

সে আইডি দিলো, আইডি মিসিসিপি স্টেটের, কিন্তু যে ফোন নাম্বার সে বলেছে, সেটা ছিল ্লুসিয়ানা স্টেটের। বুঝলাম, অন্য স্টেট থেকে মুভ করেছে। আমি মিসিসিপি থেকে পালাতে পারলে বাঁচতাম, এমন নীরস স্টেট বোধ হয় আমেরিকার আর কোথাও নেই। অথচ এই সুন্দরী মহিলা লুসিয়ানা থেকে চলে এসেছে মিসিসিপি। মহিলা হোয়াইট, তার চেহারা এবং বাচনভংগী বলে দিচ্ছে, সে বেশ বড়লোক বাড়ীর গিন্নী। তিনটি ফোন লাইন নবায়ন করতে বেশ কিছুটা সময় লাগে, তার উপর সে তিনটি আই ফোন নিচ্ছে। আরেকটু অতিরিক্ত সময় লাগবে, ফোন টিদারিং এর ব্যাপার আছে। কাজ করতে করতে জুড়ে দিলাম খেজুড়ে আলাপ। ভদ্রমহিলার নাম ডেবোরাহ!

- ডেবোরাহ, তোমরা আগে লুসিয়ানা ছিলে? মিসিসিপিতে এলে কবে? এয়ারফোর্সে চাকুরী করো?
-মিসিসিপিতে এসেছি হ্যারিকেন ক্যাটরিনার পরে। আমি হ্যারিকেন খুব ভয় পাই। এয়ারফোর্সে চাকুরী করি না, আমার স্বামীর বিজনেস আছে।
-এখানেও তো টর্ণেডো হয়, তখন কী করো?
-আসলে ক্যাটরিনার দাপটের কাছে এগুলো কিছুই না। তারপরেও টর্ণেডোও ভয় পাই। হা হা হা !
-কিন্তু তোমার স্বামীর বিজনেস করতে অসুবিধা হচ্ছে না?
-আমার স্বামী পেশায় ডাক্তার, সার্জন। এখানে ব্যাপ্টিস্ট হসপিটালে জয়েন করেছে। সেই যে ক্যাটরিনা হওয়ার পর এখানে চলে এসেছিলাম, এরপর থেকে গত ছয় বছর ধরে মিসিসিপিতেই আছি।
-আমার তো মিসিসিপিতে থাকতে ভালো লাগে না, তোমার কী এখানে ভালো লাগে?
-খারাপ লাগে না, প্লাস-মাইনাস ব্যাপার তো সব জায়গাতেই থাকে।
-তোমার স্বামী তো ডাক্তার, তাই যেখানেই যাও চাকুরী বাধাই থাকে। তুমিও কি ডাক্তার?
-না, আমি এখন হাউজ ওয়াইফ। তবে আগে যখন লুসিয়ানা ছিলাম, তখন আমি পোস্টাল সার্ভিসে চাকুরী করতাম।
-তোমার ছেলেমেয়ে আছে?
-হ্যাঁ, এক ছেলে, এক মেয়ে। বড় হয়ে গেছে। ছেলের বয়স ২৭, মেয়ে ২৩। দুজনেই পড়াশোনা করছে।
-তোমাকে দেখে মনেই হয় না, তোমার ছেলের বয়স ২৭। ওরা কেউ কি তোমাদের সাথে থাকে?

-ছেলে থাকে টেক্সাসে, মেয়ে থাকে আমাদের সাথে।
-ওরা দুজনেই তো পড়াশোনা করছে, তা ওদের মধ্যে কেউ কি বাবার প্রফেশান বেছে নিয়েছে?

ডেবোরাহ মুখটা একটু কালো করলো, বললো, না, ওরা কেউ বাবার প্রফেশান বেছে নেয় নি।  মেয়েটা  এখানের কমিউনিটি কলেজে বিউটিশিয়ান -এর কোর্স প্রায় কম্পলীট করে ফেলছে। ও এখন 'জেসি পেনী'তে চুল কাটার চাকুরী করছে। এবং সে খুব ভালো চুল কাটে। আর আমার ছেলে পড়ছে অফিস ম্যানেজমেন্ট এর উপর।

আমি মনে মনে একটুও অবাক হই নি। এখানে এটা খুবই কমন একটা ব্যাপার, ডাক্তারের ছেলে ট্রাক ড্রাইভার, প্রফেসারের মেয়ে ফাস্ট ফুডের দোকানে চাকুরী করে।  আমার খুব পরিচিত এক ডাক্তার মহিলার স্বামী পেশায় কাঠমিস্ত্রী। শুনে অবাক না হলেও মনের মধ্যে একটু অস্বস্তি হয় ঠিকই। এবার ডেবোরাহ আমাকে প্রশ্ন করলো,

-তোমার কয় ছেলেমেয়ে? তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো?

আমার তিন মেয়ে, আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের নাম শুনেছো?
-ব্যাংলাডেশ?
-হ্যাঁ বাংলাদেশ, ইন্ডিয়ার পাশেই।
-ইন্ডিয়ার নাম শুনেছি।
-ক্যালকাটার নাম শুনেছো? ক্যালকাটার পাশেই বাংলাদেশ।
-আচ্ছা! আগে জানতাম না, এখন জানলাম। তোমার কথা, তোমার পরিবারের কথা শুনে একটাই প্রশ্ন আছে আমার, তুমি এখানে কেনো?

-আমিও ঠিক জানিনা, আমি এখানে কেনো আছি! যে কারণেই এখানে আটকে থাকি না কেনো, এখানে চাকুরী করার সুবাদে আমার অনেক লাভ হয়েছে। আমেরিকানদের লাইফ স্টাইল, ধনী-দরিদ্রদের কালচারে পার্থক্য থেকে শুরু করে অনেক কিছু শিখছি।

-তাছাড়া, এখান থেকে বাড়ী ফিরে গেলে নিশ্চয়ই মাথায়  কাজের কথা থাকে না। আমার স্বামী তো হসপিটাল থেকে ফিরেও  রোগী আর ওষুধের কথাই ভাবতে থাকে। আমি যখন পোস্টাল সার্ভিসে চাকুরী করতাম, যতক্ষণ কাজে থাকতাম, ততক্ষণই কাজের কথা মাথায় থাকতো, বাড়ী ফিরতাম মুক্ত মনে।
-আচ্ছা, খুব ব্যক্তিগত প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে, তবুও প্রশ্নটি করছি। তোমার ছেলে বা মেয়ে, দুজনেই অনেক বিত্ত বৈভবের মধ্যে বড় হয়েছে, কিন্তু ওরা নিজেদের ক্যারিয়ারের ব্যাপারে তেমন একটা -------

-জানিনা, ওদের এমন কর্মকান্ডে আমি আপসেট, তবুও ওদের জীবন ওদের, ওরা যদি মনে করে মানুষের চুল কেটে জীবন পার করবে, আমি কী করতে পারি বলো!

এর মধ্যেই আমার কাজ শেষ, তিনটি আই ফোনই রেডী। ডেবোরাহ কাগজপত্রে সাইন করলো, আমিও সাইন করে তাকে ধন্যবাদসহ  বিদায় জানালাম।



এরপরেই আমি টি-ব্রেকে চলে গেলাম। ব্রেকরুমে তখন বেশ কয়েকজন এসোসিয়েট একসাথে বসে কফি খাচ্ছিল। তাদের মধ্যে ফিলিস নামের এক কালো মহিলা ছিল। ফিলিসকে আমি দারুণ পছন্দ করি। কারণ ওর কথা বলার স্টাইল আমার খুব ভালো লাগে। আমি মানুষের সাথে কথা বলতে পছন্দ করি, তবে  কারো কারো সাথে কথা বলার চেয়ে  তাদের কথা শুনতে আরও অনেক বেশী পছন্দ করি। ফিলিস হচ্ছে দ্বিতীয় দলের।  ফিলিসের মুখ থেকে আমি যতখানি শুনেছি, তার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বেড়ে গেছে। আমার মেয়েরা আমাকে প্রায়ই 'রেসিস্ট' বলে, কারণ বাড়ী ফিরেই আমি কালোদের বকতে থাকি। আমার মেয়েরা ভাবে, আমি কালোদের সহ্য করতে পারি না। ওরা এখনও বোঝে না, আমি কালোদের কান্ডকীর্তি দেখে বেশী মনঃক্ষুন্ন হই। কালোরা যেনো পণ করেই মাঠে নেমেছে যে ওরা স্কুলের গন্ডীও পেরোবে না, মেয়েরা তের-চৌদ্দ বছর বয়সেই 'মা' হয়ে যাবে, কিশোরী মা সরকারের কাছ থেকে এইড পাবে, দুই দিন পর পর বয়ফ্রেন্ড বদলাবে,  পড়ালেখার পেছনে এক পয়সাও খরচ না করে জাংক ফুড,  মাথার পরচুলা, চুলের জেল, আঙুলের নকল নখ, হাজারো রকমের গয়না বাবদ সমস্ত পয়সা খরচ করবে। আমি এগুলো সহ্যই করতে পারি না। আমার মেয়েরা আমাকে সেই আদ্যিকালের 'দাসপ্রথা'র কুফল সম্পর্কে জ্ঞানদান করে থাকে। আমি তখনই মিস ফিলিসের গল্প শুনিয়ে দেই।

ফিলিসের পুরো নাম ফিলিস জনসন। ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারের একজন বয়স্ক এসোসিয়েট, 'ক্যাশিয়ার' পজিশানে গত চব্বিশ বছর ধরে বহাল তবিয়তে চাকুরী করে যাচ্ছে। আগামী মাসেই তার বয়স ষাট পূর্ণ হবে। তার চেহারার মধ্যে  আমেরিকান ইন্ডিয়ান (রেড ইন্ডিয়ান) ছাপ আছে, কারণ তার নানী ছিল আমেরিকান ইন্ডিয়ান। তার নানীর ছিল ১৭টি ছেলেমেয়ে, আর তার মায়ের ছিল ১০টি ছেলেমেয়ে। ফিলিসের চেহারায় আমেরিকান ইন্ডিয়ান ছাপ থাকলেও তার মা ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী। মায়ের একখানা ছবি দেখিয়েছে ফিলিস, 'মেরিলিন মনরো' বলে ভ্রম হয়!  ফিলিসের বয়স যখন ১৭, তার লাং ক্যানসার ধরা পড়ে। বাম দিকের ফুসফুস পুরোটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ১৭ বছর বয়স থেকে সে একটি ফুসফুসের উপর বেঁচে আছে।  ব্র্যান্ডন নামের এক লোকের সাথে ফিলিসের বিয়ে হয়েছিল। ওদের ঘরে তিনটি ছেলেমেয়ে আছে। ছেলে সবার বড়, তারপর দুই মেয়ে। ছেলের বয়স যখন মাত্র ১২ বছর, স্বামীর সাথে ফিলিসের ডিভোর্স হয়ে যায়। সেও ২৫ বছর আগের কথা। ডিভোর্সের পরেই ফিলিস ওয়ালমার্টে চাকুরীটা নেয়। তিনটি ছেলেমেয়ের কাস্টডি ফিলিস পেয়ে যায়।

 ছেলে পাবলিক স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ে, একদিন স্কুলের টিচার ফিলিসকে ডেকে বলেন, মেধাবী ছেলেকে ম্যাথস এন্ড সায়েন্স স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। মিসিসিপিতে ম্যাথস এন্ড সায়েন্স স্কুল নামে সম্পূর্ণ সরকারী অনুদানে পরিচালিত একটি স্কুল আছে, যেখানে মিসিসিপির যে কোন প্রান্ত থেকে শুধুমাত্র 'গিফটেড চিলড্রেন' রা অ্যাপ্লাই করতে পারে। চান্স পেলে একাদশ  ও দ্বাদশ শ্রেণী, এই দু'বছর হোস্টেলে ফ্রী থাকা খাওয়া, ফ্রী স্কুলিংসহ স্পেশ্যাল কেয়ার নেয়া হয়। এবং এই স্কুল থেকে পাশ করা ছেলেমেয়েদেরকে সমীহের চোখে দেখা হয়ে থাকে। ( আমার মেজো মেয়েটি এই স্কুল থেকে আউটস্ট্যান্ডিং রেজাল্ট করেছে)। ফিলিসের ছেলেটি এই স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলো। সেই ছেলে ছিল ঐ স্কুলের প্রথম ব্যাচে গ্র্যাজুয়েট। ঐ স্কুলে ভর্তি করে দেয়ার পর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। শেষ পর্যন্ত ফিলিসের ছেলে ল'স্কুল থেকে পাশ করে ল'ইয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ছেলের বৌ অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। একটি মাত্র মেয়ে ওদের, প্রাইভেট স্কুলে পড়ে। একটি সফল ফ্যামিলি।

ফিলিসের দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে কর্পোরেট অফিসের সিনিয়র অফিসার, আর আরেক মেয়ে রেজিস্টার্ড নার্স। তাদেরও ভালো ঘরে বরে বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ের জামাইকে ফিলিস পছন্দ করে না। কারণ, জামাই নাকি খুব বেশী ডোমিনেটিং। নিজের স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে শুধুমাত্র স্বামীর প্রচন্ড ডোমিনেটিং স্বভাবের কারণে, অথচ মেয়ে কী সুন্দর মানিয়ে চলছে! এই হচ্ছে একজন সফল কালো রমণীর গল্প। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছেলেমেয়েরা ওয়ালমার্টের চাকুরী ছেড়ে দিতে বলে কিনা। জবাবে সে বলেছে, " প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ওরা আমাকে বলছে এই চাকুরী ছেড়ে দিতে। কিন্তু আমি ছাড়ছি না। গত চব্বিশ বছর ধরে আমি ওয়ালমার্টে চাকুরী করছি। আজ আমার ছেলেমেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত, সফল। তাই ওরা আমাকে চাকুরী ছেড়ে দিতে বলে। কিন্তু আমার দূর্দিনে এই ওয়ালমার্ট আমাকে চাকুরী দিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। আমার কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না, তারপরেও ওয়ালমার্ট আমাকে 'ক্যাশিয়ার' পজিশনে চাকুরী দিয়েছে, যতদিন আমার দেহে শক্তি থাকবে , আমি ওয়ালমার্টের চাকুরী করে যাব। আমার এক ফুসফুসের উপর ভরসা করে চলতে হয়, সারাজীবন ওষুধের উপর চলতে হয়, ওয়ালমার্টের হেলথ ইনসিওরেন্সের উপর আমার যত ভরসা। আমি চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ছেলে বা মেয়ের সংসারে বোঝা হতে চাই না। এই ভালো, আমি নিজের মত করে আছি, দুই চোখ ভরে দেখে গেলাম, ছেলেমেয়েদের সাফল্য, এক ফুসফুস নিয়েও আমি বেঁচে ছিলাম, ওদের সাফল্য দেখার জন্য। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!


Wednesday, January 9, 2013

এলভিস প্রিসলীঃ মিসিসিপির গৌরব



এলভিস প্রিসলীঃ মিসিসিপির গৌরব

পুরো নাম এলভিস অ্যা্রন প্রিসলি, বিশ্বে পরিচিত পপ সম্রাট, কিং অব রক এন্ড রোল, অথবা শুধুই এলভিস নামে। এলভিসের জন্ম ১৯৩৫ সালের ৮ই জানুয়ারী, মঙ্গলবার। জন্মগ্রহন করেন ইস্ট মিসিসিপির টুপেলো শহরে। মিসিসিপির গৌরব, এলভিস প্রিসলীর বাবার নাম ভার্নন প্রেসলী, মায়ের নাম গ্ল্যাডিস প্রেসলী। আমেরিকার সবচেয়ে গরীব রাজ্যটির নাম মিসিসিপি, গরীব রাজ্যে প্রায় সকলেই গরীব। এলভিসের জন্মের সময় তার বাবা-মাও গরীবই ছিলেন। অনেকটাই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মত অবস্থা ছিল তাদের। খুবই কায়ক্লেশে দিন যাপন করতেন তারা। দুই কামরার যে ছোট বাড়ীটিতে এলভিস বড় হয়েছিল, সেই ছোট বাড়ীটি এলভিসের বাবা কিনেছিলেন মাত্র ১৮০ ডলারের বিনিময়ে। টানাটানির সংসারে এলভিস ছিল বাবা মায়ের আনন্দ, বাবা মায়ের গৌরব। সেই ছোট্টবেলা থেকেই এলভিসের গলায় সুর খেলা করতো। ছেলেবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ। দামী ইন্সট্রুমেন্ট কিনে দেয়ার ক্ষমতা ছিল না বলে, বাবা খুব সস্তায় একখানি গীটার কিনে দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে এলভিসের প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। একসময় তার বাবা ও মা, দুজনেই অনুধাবন করতে পারে, মিসিসিপিতে থেকে ছেলে খুব বেশীদূর এগোতে পারবে না। এলভিসের যখন মাত্র তের বছর বয়স, সংসারের চাকা টানতে টানতে বিপর্যস্ত বাবা আরেকটু ভালো থাকার ঊদ্দেশ্যে টেনেসী রাজ্যের মেমফিস শহরে পাড়ি জমান। সেখানে এলভিসকে পাবলিক স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। স্কুলেই মিউজিক কোর্স নেয়া শুরু করে। বড় শহরে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ অনেক বেশী, এলভিসও সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। লেখাপড়ার পাশাপাশি তার গানের চর্চা চলতে থাকে। তখন থেকেই সে চার্চে, স্কুলে, এমন কি পাড়ার অনুষ্ঠানেও গান করতো।
হাই স্কুল পাশ করার পরেই তাকে রুটি রুজীর সন্ধানে বের হতে হয়। স্কুলপাশ ছেলেকে ভালো কোন কাজ কে দেবে! তাই সংসারের প্রয়োজনে এলভিস বিভিন্ন ধরণের অড জব শুরু করেন। বেশ কিছুদিন কাজ করেছিলেন সিনেমা হলে, কখনও বা ক্রাউন ইলেকট্রিক কোম্পাণীর ট্রাক চালিয়েছেন। সাথে সাথে গানের চর্চাও চালিয়েছেন।

তার গানের হাতেখড়ি হয়েছিল আঞ্চলিক ভাষায় ‘ দ্য হিলিবিলি ক্যাট’ দিয়ে। পরবর্তীতে লোক্যাল রেকর্ডিং কোম্পাণীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন ১৯৫৫ সালে। রক এন্ড রোল সঙ্গীতকে বিশ্ব দরবারে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন এলভিস প্রেসলি। তার গানের শ্রোতাদের মধ্যে নানা বয়েসীরা থাকলেও, টিন এজ ছেলেমেয়েরা ছিল প্রেসলীর গানের অন্ধ ভক্ত। বিশেষ করে মেয়েরা প্রেসলির কোমড় দুলিয়ে নাচ করাকে খুবই পছন্দ করতো। যদিও ঐ সময় টিভিতে প্রিসলির কোমড়ের নীচে থেকে দেখানো হতো না, তারপরেও কোমড় দুলানোর জন্যই প্রিসলীর ‘নিকনেম’ হয়েছিল ‘ এলভিস দ্য পেলভিস’। এত বেশী গান তিনি করেছিলেন যে মৃত্যুর আগেই তাঁর গাওয়া ‘সলো’ এবং অ্যালবাম গানের বিক্রীত সংখ্যা ছিল ৬০০ মিলিয়নের উপরে। খেলনা গীটার দিয়েই তার গানের হাতেখড়ি, এরপর থেকে শুধুই সামনের দিকে পথ চলা, রকস্টার, রক এন্ড রোল কিং, পপ সম্রাট হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি!


এলভিস শুধু সঙ্গীতেই পারদর্শী ছিলেন না, কারাটে তে ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছিলেন ১৯৬০ সালে। অভিনয়েও কোন অংশে কম ছিলেন না। ১৯৫৬ সালে ‘দ্য ডরসী ব্রাদার্স’ নামে স্টেজশো’তে এলভিস ছয়বার উপস্থিত হয়েছি্লেন। যে ৩৩টি মুভীতে উনি অভিনয় করেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৯৫৬ সালে তৈরী ছবি‘ লাভ মি টেন্ডারই’ ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো সমালোচকদের কাছ থেকে আশানুরুপ সাড়া না পেলেও বক্স অফিসে সাড়া জাগিয়েছিল। ছবিগুলো থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশী আয় হয়েছে। ষাটের দশকের সকল বিখ্যাত অভিনেতাদের সাথে অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতেন।
তার কর্মময় জীবন ছিল নানা রঙে আঁকা। গানপাগল মানুষটি ১৯৫৮ সালে মিলিটারীতে যোগ দেন। সৈনিক জীবনের শুরুতে জার্মানীতে অবস্থানের সময় চৌদ্দ বছরের প্রিসিলা ওয়াগনারের প্রেমে পড়েন এবং ১৯৬৭ সালের ১লা মে তার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরের বছর ১লা ফেব্রুয়ারী, তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান লিসা ম্যারী প্রেসলীর জন্ম হয়।
’৭০ দশকের গোড়ার দিকেই প্রেসলী পুরোদমে লাইভ কনসার্ট করা শুরু করেন। লাসভেগাস কনসার্টগুলোর সবগুলোই অগ্রিম বিক্রী হয়ে গেছে। আমেরিকার সর্বত্র চষে বেড়িয়েছেন এই পপ সম্রাট, পাঁচশ’র বেশী লাইভ কনসার্ট করেছিলেন, যে সমস্ত কনসার্টের অধিকাংশই অগ্রিম বিক্রী হয়ে গেছিল। জীবনে প্রচুর এওয়ার্ড পেয়েছেন, শুধুমাত্র গসপেল মিউজিকের জন্যই তিনবার গ্র্যামী এওয়ার্ড জিতেছিলেন।

ছয় ফিট উচ্চতার প্রিসলী দেখতে ছিলেন সুদর্শন, ছেলেবেলায় ব্লন্ডেড হেয়ার থাকলেও বড় হতে হতে মাথার চুলগুলো কালো হয়ে যায়। এলভিস সম্পর্কে আরেকটি মজার তথ্য আছে। আমেরিকায় সবার বাড়ীতেই পোষা প্রাণী আছে, বেশীর ভাগ আমেরিকানের পছন্দ কুকুর অথবা বেড়াল। এলভিসের পোষা প্রাণীটি ছিল ‘স্ক্যাটার’ নামে এক শিম্পাঞ্জী।
তার বেশ কিছু গানের এলবাম মাল্টিপ্ল্যাটিনাম সেল হয়েছে, বারোটি এলবামের দুইশ কপি বের হয়েছে।. হার্টব্রেক হোটেল, আই ওয়ান্ট ইউ আই নিড ইউ আই লাভ ইউ, হাউন্ড ডগ, ডোন্ট বী ক্রুয়েল, লাভ মী, আই বেগ অফ ইউ, জেইলহাউজ রক সহ প্রচুর এলবাম বিলবোর্ডের এক নাম্বার চার্টে সপ্তাহের পর সপ্তাহ শোভা পেতো। তাঁর কত যে অনুরাগী ছিল, তার কোন হিসেব নেই। ১৯৬৫ সালে বিটলস এসেছিল আমেরিকাতে, তারা একজন মাত্র ব্যক্তির সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, সে এলভিস প্রেসলী। প্রেসলী এবং বিটলস একসাথে একটি পুরো দিন কাটিয়েছে ক্যালিফোর্ণিয়ায় নিজের বাড়ীতে।
সকল ভালোর পেছনে খারাপও আসে, প্রেসলির বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।’৭৩ সালের ৯ই অক্টোবার, প্রিসিলার সাথে এলভিসের ডিভোর্স হয়ে যায়। স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স, পৃথিবীর সর্বত্র প্রোগ্রাম করার জন্য ছুটোছুটি, ধীরে ধীরে শরীরের ওজন বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে এলভিসকে কাবু করে ফেলে। ১৯৭৭ সালের ১৬ই অগাস্ট, মঙ্গলবার, মাত্র ৪২ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এলভিস মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পরবর্তি অটপসী রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রেসলী ড্রাগ নিত, কারণ তাঁর রক্ত কনিকায় ড্রাগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।পাওয়া গেছে।


প্রেসলীর মিসিসিপির বাড়ীটি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এই বাড়ীটিতেই একদিন জন্মেছিল এলভিস নামের ছোট শিশু, দুই কক্ষের মূল বাড়ীটিকে অক্ষত রেখেই বাকী অংশে মিউজিয়াম করা হয়েছে। বাড়ীর বাইরের বিশাল এরিয়া জুড়ে করা হয়েছে ‘এলভিস প্রেসলী পার্ক’। প্রতি বছর গড়ে পঞ্চাশ হাজার দর্শণার্থী আসে তাদের প্রিয় শিল্পীর জন্মস্থানটি দেখে যেতে। টেনেসী রাজ্যের মেমফিস শহরের বাড়ীটিতেও প্রতি বছর, প্রতি দিন প্রচুর মানুষ আসে, কারণ মিসিসিপিতে জন্ম নিলেও মৃত্যু টা হয়েছে মেমফিসে। কাকতালীয়ভাবেই তারিখ ভিন্ন হলেও প্রেসলীর জন্ম এবং মৃত্যু হয়েছে মঙ্গলবার।

ছেলেবেলায় দারিদ্রের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠা প্রিসলী জীবনে অনেক কিছু পেয়েছেন, আরও অনেক কিছুই পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সর্বনাশা মৃত্যু তাঁকে বড্ড কম বয়সে নিয়ে গেছে। মৃত্যুরই বা দোষ কি! কয়েক বছরের বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি, স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স, পৃথিবীর সর্বত্র প্রোগ্রাম করার জন্য ছুটোছুটি, ধীরে ধীরে শরীরের ওজন বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে এলভিসকে কাবু করে ফেলে। ১৯৭৭ সালের ১৬ই অগাস্ট, মঙ্গলবার, মাত্র ৪২ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এলভিস মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পরবর্তি অটপসী রিপোর্টে তাঁর রক্ত কনিকায় ড্রাগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জিনিয়াসদের জীবন খুব বেশী দীর্ঘ হয় না, মাত্র ৪২ বছর বয়সে এলভিসের মৃত্যু তা আরেকবার প্রমান করে। আবার একমাত্র জিনিয়াসরাই মরে গিয়ে নতুনভাবে সবার মাঝে ফিরে আসেন। ভক্ত অনুগ্রাহীরাই তাঁদেরকে হারিয়ে যেতে দেয় না। গুণীজন তাঁদের কর্মের মাঝেই সকলের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। এলভিস প্রেসলিও তেমনই বেঁচে আছেন সকলের মাঝে। তাঁর মৃত্যুর পরে অনেক তারকা শিল্পী তৈরী হয়েছে, তারপরেও এলভিস প্রেসলী একজনই। মৃত্যুর এত বছর পরেও এলভিসের গানের সিডির চাহিদা একই রকম আছে।


৮ই জানুয়ারী ছিল এলভিস প্রিসলীর ৭৮তম জন্মদিন! সারা বছরই তার মিসিসিপির বাড়ী ও মেমফিসের বাড়ী লোকে লোকারণ্য থাকে, আর ৮ই জানুয়ারী তাঁর জন্মদিন বলে কথা! পপ সম্রাটকে মিসিসিপির মানুষ প্রান দিয়ে ভালোবাসে, এলভিস প্রিসলী মানেই মিসিসিপি, মিসিসিপি মানেই এলভিস প্রিসলী!

Sunday, January 6, 2013

বাদাইম্যানামা!

প্রতিটি মানুষের নামের পাশে বিশেষ কোন পরিচিতি থাকে। কেউ গায়ক, কেউ নায়ক, কেউ চিত্রকর, কেউ রাঁধুনী, কেউ চোর, কেউ ডাকাত, কেউ বাটপার, কেউ ফাজিল, কেউ কিপটে, কেউ দাতা কর্ণ। আমার নামের পাশে যে বিশেষণটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তা হচ্ছে 'বাদাইম্যা'।

শুনতে খারাপ লাগেনা, তবে বাদাইম্যার সঠিক অর্থ জানা থাকলে আমার জন্য 'উপাধী' টা গ্রহণ করা অনেক সহজ হয়ে যেতো। আমার জানামতে, বাদাইম্যা শব্দটি বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অঞ্চল বিশেষের মধ্যে ঢাকা জেলা অন্যতম। ঢাকার মানুষেরাই অপরকে 'বিটকেলে উপাধী' দিতে পছন্দ করে। উপাধী দেয়ার বেলায় মন্ত্রী-মিনিষ্টার থেকে শুরু করে কাউকেই রেহাই দেয় না। এখানে আমি অন্যদেরকে নিয়ে কথা বলতে চাইছি না, আমার নামের পাশে কেনো 'বাদাইম্যা' উপাধী যোগ হলো, সেই চিন্তাতেই আমি অস্থির। উপাধী পাওয়ার উপলক্ষগুলো যদি একে একে বলি, তাহলেও বোধ হয় 'বাদাইম্যা' শব্দের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না।

আমার এক মামা ছিলেন, উনি সংসারের প্রতি কখনওই মনোযোগী ছিলেন না। ছুতোনাতায় বেড়াতে বের হয়ে যেতেন, সেই কক্সবাজার থেকে শুরু করে সন্দ্বীপ, সুন্দরবন, রাজশাহী, বগুড়া হয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে ফেলেছেন। তার এই যাযাবর মার্কা স্বভাবের কারণেই গুরুজনেরা তাকে 'বাদাইম্যা' ডাকতো। সেই থেকে আমার ধারণা হয়েছে, ঘুরে বেড়ানো মানুষদেরকে বোধ হয় বাদাইম্যা বলে।

আমার একজন খুব প্রাণের বন্ধু ছিল। তার সাথে ফোনালাপ হতো,  টেক্সটালাপ হতো। অনেকদিন তার সাথে দেখা হয় না, ফোনালাপও হয় না, টেক্সটালাপও হয় না, কারণ আমরা দুজনেই যার যার কাজ নিয়ে মহাব্যস্ত। আগে টেক্সটালাপ হলে আমি একটি কমন প্রশ্ন করতাম, " আজকে তুই কী রঙের শার্ট পড়েছিস? লাল? কালো? স্ট্রাইপ?"

সে সাথে সাথে উত্তর পাঠাতো, " কোনটাই না, আমি পড়েছি নটিকা ব্র্যান্ডের টি-শার্ট"

আমার এই বন্ধুটি ব্র্যান্ড নেমের প্রতি খুব দূর্বল। অনেকদিন বাদে সেদিন আমি তাকে মেসেজ পাঠিয়েছি,
" তুই আজকের প্রোগ্রামে কোন কালারের শার্ট পড়েছিলি?  আমার মনে হচ্ছে আজ তুই স্ট্রাইপড পুলওভার পড়েছিস"।
কোন উত্তর আসেনি, দুইদিন পর, গতরাত সাড়ে এগারোটার দিকে মেসেজ পেলাম,
" পুলওভার পড়িনি, আমি আরমানির স্যুট পড়েছিলাম, সাথে নীল শার্ট"।
কারো চিঠি বা মেসেজের উত্তর সাথে সাথে পাঠানোটা আমি ভদ্রতার অংশ হিসেবে মানি। তাই অত রাতেই আমি উত্তর দিয়েছি,

" তোর সাথে অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই, তাই আন্দাজটা মিললো না রে"

" আন্দাজটা তুই বেশী করিস, বাদাইম্যা একটা"

আমি তো থ' বনে গেছি, দুইদিন লাগলো তার একটা উত্তর পাঠাতে, আর সে-ই কিনা আমাকে ডাকে 'বাদাইম্যা'? এর আগেও সে আমাকে বহুবার 'বাদাইম্যা' সম্বোধণ করেছে, অবাক হই নি। কারণ শুধু তো আমার এই বন্ধুই নয়, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরাও আমাকে বাদাইম্যা বলে। গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক থেকে আমার মামাতো বোন বেড়াতে এসে আমাকে 'বাদাইম্যা' বলে গেছে। কী কারণ? কারণটি হচ্ছে, আমি ওকে বলেছিলাম, আমার ঘরটি ঢেলে সাজিয়ে 'ইন্দ্রপুরী' বানিয়ে দিতে। ঘর গুছানো কাজে আমার এই বোনটির জুড়ি মেলা ভার। আমি যখন ঢাকা থাকতাম, বোনটার বয়স কতই বা হবে, পনের কী ষোল  বছর, আমার বাড়ীতে বেড়াতে আসতো, আমার মেয়েদের সাথে খেলতো আর ফাঁকে ফাঁকে আমার শাড়ী গুছিয়ে দিত।

শাড়ীর প্রতি আমার দূর্বলতা আজীবনের। আমার সংগ্রহে কত শাড়ী আছে, আমি নিজেই জানিনা। দামী শাড়ী খুব কমই আছে, তবে কম দামী কিন্তু দারুণ সুন্দর সব শাড়ীতে বোঝাই হয়ে আছে তিনটি ক্লজেট। শাড়ীর প্রতি দূর্বলতা নেই এমন  বাঙ্গালী মেয়ের সংখ্যা খুবই কম। আমার এই বোনটি যদিও কম বয়সী এবং স্মার্ট, যদিও সে ওয়েস্টার্ণ ড্রেস পড়তে পছন্দ করে, তারপরেও শাড়ী দেখলেই হলো, ফট করে বলে বসবে,

"ফুলদিভাই, তোমার এই শাড়ীটা আমাকে দিয়ে দাও"

আমি বলি, " বইন, মাফ কর, প্রয়োজনে তুই আমারে নিয়ে যা, তবুও আমার শাড়ী নিস না"
সাথে সাথে আমার হাঁটুর বয়সী বোন বলে উঠে, " যাও, তোমার মত বাদাইম্যা মহিলাকে নিয়ে আমার কী হবে"?

-আরে! বলে কী! আমাকে বলে বাদাইম্যা! অ্যাই মেয়ে, আমাকে বাদাইম্যা বললি কেনো?

-তুমি হলে নাম্বার ওয়ান বাদাইম্যা। বাদাইম্যা না হলে এত এত সুন্দর সুন্দর শাড়ী কেউ এভাবে ডাম্প করে রাখে? তিনটি দিন লেগেছে তোমার ক্লজেট গুছাতে!

-তাই বলে আমি বাদাইম্যা হয়ে গেলাম? আমি যদি বাদাইম্যা হতাম, তাহলে কী আমি সেই পঞ্চাশ বছর আগের শাড়ী যত্ন করে রাখতে পারতাম?

বোনের সাথে আরও অনেক কথাই হয়েছে, ওকে দুটো নতুন শাড়ী দিয়েছি, তারপরেও সে আমাকে বাদাইম্যা বলবেই বলবে। বাদাইম্যা বলার জন্য সে আমার মা, বাবার রেফারেন্স পর্যন্ত টেনেছে। আমার মা ওর পিসী হয়, বাবা ওর পিসেমশায়। বোন সোজা বলে দিল,

আমি কী একাই তোমাকে বাদাইম্যা ডাকি, তোমার নিজের বাবা-মা পর্যন্ত তোমাকে উঠতে বসতে বাদাইম্যা ডাকে।

-বাবা মা আমাকে বাদাইম্যা ডাকে, এতটুকু বললেই চলতো, তা না,  সে আবার 'উঠতে বসতে বাদাইম্যা ডাকে' যোগ করেছে। হ্যাঁ, আমার বাবা আর মা , দুজনেই আমাকে বাদাইম্যা ডাকে। সংসারী বলতে যা বোঝানো হয়ে থাকে, আমি সে অর্থে সংসারী নই। অনেকটাই আমার মামার মত ভবঘুরে জীবন বেশী পছন্দ করি। ঘরে আমার পঞ্চাশ ইঞ্চি স্ক্রীন এলইডি টিভি নেই, মার্সিডিজ গাড়ী নেই, সুন্দর একখানি বাড়ী নেই, দামী দামী আসবাবপত্র নেই। নেই তো নেই, তার জন্য বিলাপও নেই। আমি শুধু সুযোগ খুঁজি বেড়ানোর। দেশে থেকেও অনেক বেড়িয়েছি,  আমি একা বেড়াতাম না, সাথে কিছু চেলা চামুন্ডা জুটিয়ে নিতাম। তখনই মা বলতো,

" যার তিনটা মেয়ে আছে, সে কিনা সংসারের দিকে নজর না দিয়ে তিদিং তিদিং করে ঘুরে বেড়ায়! এমন বাদাইম্যা মাইয়া আমার পেটে জন্মালো কী করে!"

ঘোরাঘুরির নেশা এতই প্রবল ছিল যে একবার, ছোট মেয়ের বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, ওকে বাড়ীর 'বুয়া'র হেফাজতে রেখে আমি স্বামীর সাথে তিন দিনের জন্য 'দুবাই' চলে গেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল, তিনদিন মায়ের অদর্শনে বাচ্চার কিছু ক্ষতি হবে না, কিন্তু 'দুবাই' বেড়ানোর এই সুযোগ আমার জীবনে আর না আসতে পারে। আরেক দিনের বাদাইম্যামির ঘটনা বলি, তখন ৯১ সাল, নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শেষ মিটিং ছিল মানিক মিয়া এভিনিউ তে। আমরা তখন সাভার থেকে ঢাকায় মুভ করেছি।  সাড়ে চার বছর ও আটমাস বয়সী দুই মেয়েকে তাদের বাবার জিম্মায় রেখে নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম টুকিটাকী বাজার করতে। ফুলার রোডের ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টার থেকে সাথে নিয়ে গেছিলাম আমার এক বৌদিকে। ছোট মেয়েটার  বেদম জ্বর দেখেই বেড়িয়েছি, নিউমার্কেটের কাজ সারছিলাম আর মাইকিং শুনছিলাম, শেখ হাসিনার মিটিঙে যাওয়ার আহবান জানিয়ে। বৌদিকে বললাম,

-চলো, কাছেই তো মানিক মিয়া এভিনিউ, শেখ হাসিনার মিটিঙ দেখে যাই।
-বাসায় তোমার বাচ্চার জ্বর, তুমি যেতে চাও মিটিঙে?
-বৌদি, বাচ্চাদের রোগ শোক লেগেই থাকবে। জ্বর হয়েছে, জ্বর সেরেও যাবে, কিন্তু শেখ হাসিনাকে তো আর সব সময় কাছে থেকে দেখতে পাবো না। চলো না, একটুক্ষণ থেকেই চলে আসবো।
-তোমার বর কিছু বলবে না?
-না, কিছু বলবে না। সে বাচ্চার যত্ন নিতে পারে। তাছাড়া, সে আমার স্বভাবের কথা জানে।

দুই ননদ-ভাজ মিলে চলে গেছিলাম মিটিঙে। আমি সরাসরি মঞ্চের কাছে চলে গেছি। ঊদ্দেশ্য ছিল, শেখ হাসিনার কাছ থেকে একটি অটোগ্রাফ নেয়া, বাড়ীতে গিয়ে বাবাকে দেখাতে হবে। আমার বাবা শেখ হাসিনার সমর্থক, অটোগ্রাফ নিয়ে গেলে খুশী হবে। অনেক লম্বা কাহিণী, তবে অটোগ্রাফ আমি পেয়েছিলাম। অটোগ্রাফ পাওয়া হতেই বৌদিকে বললাম,

এবার বাড়ী চলো, আমার মেয়ের গায়ে ১০৪ ডিগ্রী জ্বর দেখে এসেছিলাম। না জানি কী অবস্থায় আছে!

-বলো কী!! ১০৪ ডিগ্রী জ্বর অতটুকু বাচ্চার, আর তুমি কিনা শেখ হাসিনার মিটিঙ দেখতে এসেছো? আচ্ছা মিঠু, এমন বাদাইম্যা হলে কী করে? আগে যদি জানতাম, আমি কক্ষনো তোমাকে এখানে নিয়ে আসতাম না।

-আরে! চলো তো, বাদাইম্যার সাথে আসছো বলেই তো এতো বিশাল জনসমুদ্রের মধ্যেও শেখ হাসিনার কাছাকাছি যেতে পেরেছো, আবার কেমন সুন্দর অটোগ্রাফও পেয়ে গেলাম!

-শীগগীর বাড়ী চলো, এমন কাজ আর কখনও করো না।

-নাহ! এমন সুযোগ বার বার আসেওনা, কাজেই ভয় নেই।

আমার এমন বহু কাহিণী আছে যা শুনলে অনেকেই ভ্রু কুঁচকাতে পারে! অন্যদের সাথে কী কী বাদাইম্যামি করেছি, তা অন্যেরাই ভালো বলতে পারবে। মেয়েদের সাথে যত বাদাইম্যামি করেছি, তার থেকে মাত্র দুটি ঘটনার কথা বলেছি, বড় মেয়েই বা বাদ যাবে কেনো! ওর সাথেতো সবচেয়ে বেশী বাদাইম্যামি করেছি। একটা ঘটনার কথা বলিঃ

 '৯৮ সালের একেবারে শুরুর দিকের ঘটনা এটি। মাত্রই অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছি, ঢাকার উত্তরাতে একটি এপার্টমেন্টে উঠেছি। স্বামী যে কোম্পাণীতে চাকুরী পেয়েছেন, সেই কোম্পাণীর দেয়া ফ্ল্যাটে থাকি, কোম্পাণীর দেয়া পাজেরো চেপে ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াই। ঐ সময়টা ছিল আমার মত বাদাইম্যার জন্য বড়ই সুখের! '৯৮ সালের দিকে আমার বড় মেয়ের বয়স ছিল এগারো বছর, নিতান্তই বালিকা। আমার বড় মেয়েটি পেয়েছে তার বাবার স্বভাব, খুব শান্ত, ধীর-স্থির, পড়ুয়া, মনের দিক থেকে বেশ সাহসী। অনেক ছোট বয়স থেকে সে ভুত-পেত্নী, রাক্ষস-ক্ষোক্কসের গল্প পড়তে ভালোবাসতো,  আমি যখন ভুতের ভয়ে অস্থির, এই মেয়ে লাইট নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে একা  ঘুমাতো, অনেক রাত পর্যন্ত জী টিভিতে 'হরর শো' দেখতো।

একদিন আমার স্বামী অফিসিয়াল ট্যুরে উত্তরবঙ্গে গেছিল, দুই দিন ওখানেই থাকতে হয়েছে। এই দুইদিন আমি সাহসী কন্যাকে পাশে নিয়ে লাইট জ্বালিয়ে সারারাত বসে কাটিয়েছি। মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, এরপর থেকে পরিবার প্রধান যেখানেই যাবেন, আমি তার সঙ্গী হবো। এভাবে ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে থাকতে পারবো না। পরের দিন আমার স্বামী উত্তরবংগ থেকে ফিরবেন, আমাদের কারোর তখন মোবাইল ফোন ছিল না, কাজেই ট্র্যাক করতে পারছিলাম না। অফিসের গাড়ীতে গেছেন, অফিসের গাড়ীতেই ফিরবেন, আমার কোন ভূমিকা ছিল না। আমাদের পাজেরো আমাদের তত্বাবধানেই ছিল। যেদিন স্বামী বাড়ী ফিরবেন, সেই দুপুরে আমি হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, ছোট মেয়েকে ( বর্তমানে মেজো) সাথে করে আরিচাঘাটে চলে যাওয়ার। আমার ঘোরাও হবে, স্বামীকে চমকে দেয়াও যাবে। যেই কথা সেই কাজ, বড় মেয়েকে বাসায় রেখে ছোটটাকে নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম। মেয়েকে বলে গেছিলাম, কেউ এসে দরজা নক করলে যেনো দরজা না খুলে দেয়।

মহানন্দে আরিচাঘাটে পৌঁছে দেখি, আমার স্বামীকে বহনকারী ফেরীটি এসে পৌঁছে নি, জানতে পেরেছি ফেরী লেট আছে। আমার আনন্দ দেখে কে! বেশীক্ষণ বাড়ীর বাইরে থাকা যাবে। নদীর চারপাশ, মানুষজনের কোলাহল, নদীর ঘাটের মাছের বাজার দেখতে দেখতে সময় কেটে যাচ্ছিল। দেড়ঘন্টা পরে ফেরী ঘাটে লাগতেই মা-মেয়ে দুজনে মিলে মেয়ের বাপকে চমকে দিলাম। মেয়ের বাপ খুশীই হয়েছে, আমাদেরকে সাথে নিয়ে পাজেরো ছুটেছে। আমাদের সাথে আরেক ভদ্রলোকও উঠেছিলেন, ফেরীতেই পরিচয়, ভদ্রলোক ঢাকায় যাচ্ছেন, আমার উদার স্বামী উনাকে আমাদের সাথেই তুলে নিয়েছেন ঢাকা নির্দিষ্টস্থানে পৌঁছে দিবেন বলে। স্বামীর এই সিদ্ধান্তে আমি খুব খুশী হয়েছি, কারণ আরেকটু বেশী সময় রাস্তায় থাকা যাবে।

সব কিছু যদি ঘড়ির কাঁটায় চলতো, আমরা বাড়ী পৌঁছে যেতাম সন্ধ্যে ছ'টার মধ্যে। কিন্তু কোন কিছুই ঠিকমত চলে নি।  ফেরী লেট, মিরপুরে জ্যাম, আসাদ গেটে জ্যাম, সেই ভদ্রলোকের বাড়ী গ্রীন রোড, এগুলো করতে করতে গাড়ীতেই রাত বেজে গেছে নয়টা। আমি ততক্ষণে কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছি। কাঁদছিলাম আমার বড় মেয়েটির জন্য। একা এত বড় বাড়ীতে মেয়ের কোন বিপদ হয়নি তো! কারেন্ট চলে গেলে,ভুতগুলো এসে মেয়েটাকে ধরে নি তো! পাঁচতলা বিল্ডিং এ একমাত্র পরিবার ছিলাম আমরা ( ঐ সময়), নীচতালায় ড্রাইভার, কর্মচারী, কেয়ার টেকার থাকতো। যতই বাদাইম্যা হই না কেনো, মায়ের মন, মেয়ের সর্বনাশের চিন্তায় অস্থির। কত কী ঘটে যেতে পারে!  অনেকটা আধমরা অবস্থায় বাড়ী ফিরেছি রাত সাড়ে দশটায়। সারাবাড়ী ঘুটঘুটে অন্ধকার! শুনলাম জেনারেটারের তেল ফুরিয়ে গেছে, তাই জেনারেটার বন্ধ। ধরেই নিয়েছি, এতক্ষণে আমার মেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে! অন্ধকারের মধ্যেই দেয়াল হাতড়ে দোতালায় উঠে দরজায় ধুম ধুম ধাক্কা দেই আর ডাকি, মামনি, ও মামনি, দরজা খোল। মেয়ে অবাক চোখে দরজা খুলে দিয়ে আমার চেহারা দেখে আরও বেশী অবাক হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওর নাকি কোন অসুবিধে হয় নি, তিনবার কারেন্ট চলে গেছিল, রান্নাঘরের কোথায় ম্যাচ, কোথায় মোমবাতি থাকে জানে না বলে অন্ধকারের মধ্যে লিভিং রুমের সোফায় চুপ করে বসেছিল। আমি আর কিছুই শুনতে চাইছিলাম না, মেয়েকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়েছি, আমার বাদাইম্যা স্বভাব কেটে গিয়ে মাতৃত্ব ফিরে এসেছে। এই ঘটনাটি তখন বাবা বা মা'কে জানাই নি, কারণ জানালেই উনারা আমাকে একহাত নিবেন। মেয়েকে না করে দিয়েছি, কাউকেই যেনো না বলে দেয়। মেয়ে কথা রেখেছে। কয়েক মাস পরে আমি নিজেই আমার মায়ের কাছে গল্পটি করেছি।


এই কাহিণী শোনার পর থেকে মায়ের কাছে চিরস্থায়ীভাবে 'বাদাইম্যা' হয়ে গেলাম। বাবা অবশ্য এইসব ব্যাপারে নাক গলাতেন না। তারপরেও বাবাও আমাকে 'বাদাইম্যা' ডাকেন। এমনকি এখনও আমাকে কথায় কথায় বলেন,

"সারাটা জীবন পার করে দিলি বাদাম্যাগিরি কইরা!"

আমার বিরুদ্ধে বাবার দুইটি অভিযোগ আছে, প্রথম অভিযোগ,  আমি প্রচন্ড মেধাবী হওয়া সত্বেও নিজের ক্যারিয়ারকে ভুলুন্ঠিত করেছি। তা অবশ্য সত্যি, আমার একাডেমিক ডিগ্রী আছে বেশ কয়েকখানা, অথচ শখ করে চাকুরী করি ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারে। প্রথম বছর আমি ক্যাশিয়ার পজিশনে জয়েন করেছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার ভালো লাগে জিনিসপত্র বেচা কেনা করতে। প্রথম যেবার ওয়ালমার্টে জয়েন করলাম, বাবাকে ফোনে বলেছি,

" বাবা, আমি আমেরিকাতে ফেরিওয়ালীর কাজ পাইছি। ওয়ালমার্টে কাস্টমারদের কাছে মাছ-মাংস বেচি।

আমার কথা শুনে বাবার দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। বিশ্বাস করে, আবার করেও না। এরপর অবশ্য যখন ফোন সার্ভিস সেন্টারে চলে এলাম, তখনও বলেছি,

"বাবা, এইবার তোমার খুশী হওয়ার কথা। আমি যে ডিপার্টমেন্টে আছি, এখানে সারাক্ষণ শুধু ফটর ফটর ইংলিশ বলতে হয়। ভাগ্যিস তোমার কাছে ইংলিশ শিখেছিলাম"।

" রাখ তোর ইংলিশ, তোর মতো বাদাইম্যা মাইয়া যার আছে, তার কপালটা খুবই খারাপ। কত উঁচুতে উঠতে পারতি, আর এখন আমারে শুনাছ ইংলিশ ফুটানির কথা।


 বাবার দ্বিতীয় অভিযোগ, আমি মোটেও সঞ্চয়ী নই। আমার বয়সী মেয়েদের সকলেরই গাড়ী, বাড়ী, গয়না গাঁটি, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আছে, অথচ সব রকম যোগ্যতা থাকার পরেও আমার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। বাবার দুঃখ, আমার সেদিকে নজরও নেই। আমি শুধু ঘোরাঘুরিতেই পয়সা খরচ করি। অন্যেরা যেখানে দশ বছরে এক দু'বার দেশে বেড়াতে যায়, নতুন বাড়ীঘরের ছবি পাঠায়, সেখানে আমি দুই বছর পর পর পুরো পরিবার নিয়ে তিন মাসের জন্য দেশে যাই। প্লেনের টিকিট থেকে শুরু করে দেশে থাকাকালীন খরচের অঙ্ক চিন্তা করেই বাবার মাথা ঘুরায় আর আমাকে বকা দেয়,

আমার মেয়ে হয়ে তুই এমন বাদাইম্যা হইলি কেমনে? এখন পর্যন্ত দেশে তোদের একটা ফ্ল্যাট নাই, এক টুকরা জমি নাই, বিদেশেই বা কী এমন লারে লাপ্পা আছে, তাও বুঝি না। কোন সাহসে তুই এইভাবে টাকাপয়সা গুলি নষ্ট করস?

-আমার যে শুধুই তোমাদেরকে দেখতে ইচ্ছে করে! টাকা পয়সা দিয়ে কী হবে? তোমরাই যদি না থাকো, টাকা ধুইয়ে কী আমি জল খাবো? যতদিন তোমরা আছো, ততদিন তোমাদের না দেখে থাকতে পারবো না।

-তা তো বুঝলাম, কিন্তু তোর তিনটা মেয়ে আছে, ওদের ভবিষ্যত আছে, এই ব্যাপারগুলিও ভাবতে হবে।

-তা ঠিক আছে, ভাববো যখন ভাবার, তাছাড়া আমেরিকাতে কেউ না খেয়ে থাকে না, টাকা না থাকলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে পড়াশুনা করবে, পরে চাকরী করে লোন শোধ করে দিবে।  তাছাড়া আমি বাদাইম্যা বলেই আমার মেয়েগুলি ভালো হইছে, প্রত্যেকেই স্কলারশীপ পায়, এরপরেও কেনো চিন্তা করবো! একটাই জীবন, কত কিছুই দেখার বাকী থেকে যাবে!

-অবস্থা দেখছো!! মেয়েরা ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে পড়বে তবুও ও টাকা পয়সা এভাবে উড়াবে, এভাবে আলেং ফালেং করে দিন পার করবি তুই? বাদাইম্যা আর কারে কয়! এমন বাদাইম্যা হইলি কেমনে?  একটা জীবন তো সবারই, সবাই কী তোর মত এমন আওয়ারা হয়ে ঘুরে? আমার জামাই বাবাজী কী কিছুই বলে না?

-তোমার জামাই বাবাজী হাল ছেড়ে দিছে, আমি জন্ম বাদাইম্যা, সবাই আমাকে বাদাইম্যা বলে, তোমার জামাই বাবাজীই বা বাদ যাবে কেনো! মুখে না বললেও মনে মনে নিশ্চয়ই আমাকে বাদাইম্যা বলে, তবে বাদাইম্যারে সে প্রশ্রয়ও দেয়। কারণ আমি বাদাইম্যা বলেই সংসারের কুটকচাল বুঝি না, ঝগড়া-ঝাঁটি করি না, দলাদলি করি না, সরল সোজা জীবন-যাপন করি। এর চেয়ে বেশী আর কী চাই জীবনে, তুমিই বলো!

Friday, January 4, 2013

কষ্টগুলো ফিরে ফিরে আসে!

আজ সন্ধ্যায় আমাদের এক জুনিয়ার বন্ধুকে দেখতে বাড়ী থেকে মাত্র বের হয়েছি।  বন্ধু বললেও ওদের স্বামী-স্ত্রীকে ছোট ভাই-বোনের মত স্নেহ করি।  ওরাও আমাকে 'দিদি' বলে সম্বোধন করে। পনেরো দিন আগে ছোট ভাইটির একটি মাইনর অপারেশান হয়। মাইনর বলছি কারণ,  যদিও ফুল এনেসথেসিয়া ব্যবহার করেই অপারেশান হয়েছে , তারপরেও যেদিন অপারেশান হয়েছে, সেদিনই হসপিটাল থেকে ওকে  রিলিজ করে দিয়েছে। ক্রীসমাসের ছুটিতে  আমার মেয়েরা বাড়ী এসেছে, আমার কাজিন এসেছে বেড়াতে, তাই বন্ধুটিকে দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয় নি। ২৩শে ডিসেম্বার  আমার বাড়ীতে ওদের নিমন্ত্রণ ছিল, কিন্তু ছোট ভাইটি তখন ডাক্তারের নির্দেশে হাঁটাচলা বন্ধ রেখেছে। তাই নিমন্ত্রণে ওরা  আসতে পারেনি।  তবে ওদের ছোট্ট মেয়েটিকে পাঠিয়েছিল আরেক বন্ধুর সাথে।

 বিদেশে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের স্বজন, একজনের সুখেও থাকি, বিপদেও থাকি। তা আমাদের ছোটভাইসম বন্ধুটির অপারেশান হওয়ার সংবাদে একটু চিন্তিত হয়েছিলাম, তবে অপারেশান শেষে ঐদিনই সে বাড়ী ফিরে আসায় অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করেছি। নিজে ব্যস্ত ছিলাম চাকুরী আর মেয়ে-বোনকে নিয়ে। ৩১শে ডিসেম্বার ছিল আমার স্বামীর জন্মদিন,  ওরা আমার ফোনে কল করেছিল, তাদের দাদাটিকে বার্থ ডে উইশ করার জন্য। বার্থডে উইশ করেছে, আরও কিছু টুকিটাকী কথার ফাঁকে আমিও ভাইটির শরীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতেই জানলাম, আগের রাতে ওকে হসপিটালের ইমার্জেন্সীতে নিতে হয়েছিল। কারণ, ওর ক্ষতস্থানে ইনফেকশান হয়ে গেছে। জানলাম, ডাক্তার এন্টিবায়োটিক ইনজেকশান দিয়েছে। ব্যস! আবার নিশ্চিন্ত হয়ে গেলাম।

আজ গাড়ীতে বসেই ওদের ফোন করলাম। মেয়েটির ফোন অফ আছে দেখে ছোট ভাইয়ের নাম্বারে কল দিতেই সে ফোন ধরে বললো,
-আমি তো হসপিটালে আছি।
-হসপিটালে আছো মানে! সেদিন যে হসপিটাল থেকে ফিরলে!
-না মিঠু'দি, আমাকে ওরা ভর্তি করে নিয়েছে, ইনফেকশান খুব মারাত্মক হয়েছে, পরশুদিন আরেকটি অপারেশান হয়েছে।
-কী বলো! আরেকটা অপারেশান হয়েছে! আমেরিকাতেও ইনফেকশান হয়? দ্বিতীয়বার অপারেশান লাগে! তাহলে আমাদের দেশের সাথে তফাৎ রইলো কোথায়! ঠিক আছে, আমরা হসপিটালেই আসছি।


আমার এই ভাইটি খাওয়াতে ভালোবাসে, খেতেও খুব ভালোবাসে। এটা ভেবেই ওর জন্য পুডিং বানিয়েছিলাম, পুডিং এর ট্রে সহই হসপিটালে চলে গেলাম। সন্ধ্যা সাতটায় ওখানে পৌঁছে দেখি, চারদিক শুনশান নীরব। পার্কিং লটে গাড়ী পার্ক করা আছে, কিন্তু একটিও মানুষ নেই কোথাও। আমি আর আমার স্বামী গিয়েছিলাম, নীরব পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে হসপিটালের বিশাল বিল্ডিং এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার অজান্তেই কিছু একটা অস্বস্তি আমাকে ঘিরে ধরছিলো। প্রথমে বুঝতে পারিনি। শীতের সন্ধ্যায় বেশীক্ষণ বাইরে না থেকে চট করে ঢুকে গেছি হসপিটাল বিল্ডিং এর ভেতর।

বাঁপাশে রিসেপশান কাউন্টারে কেউ নেই, ছোট ভাইয়ের ফোনে কল দিয়ে জেনে নিলাম রুম নাম্বার। দোতলায় একটি রুমে ও আছে। লিফটের দরজা খুলে যেতেই দু'জনে ঢুকে গেলাম। এবার আমার কাছে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো। গত তিনটি মাস ধরে মনের ভেতর বয়ে বেড়ানো কষ্টগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইলো। গত অক্টোবার মাসের চার তারিখ সকালেই আমি ঢাকার একটি আধুনিক হাসপাতালের লিফটে উঠেছিলাম।  সময়ও মিলে যাচ্ছে, আমাদের তিন তারিখ সন্ধ্যা মানেই বাংলাদেশে চার তারিখ সকাল। আমার মা' ছিলেন ঐ হসপিটালের আইসিইউ তে।

এখানে লিফটের দরজা খুলতেই বিশাল চওড়া করিডোর, রুম নাম্বারগুলো তীর চিহ্ন দিয়ে নির্দেশিত আছে, নাম্বার ধরে ধরে এগোচ্ছি আর তিন মাস আগের স্মৃতির সাথে মেলাচ্ছি। বুকটা ভারী হয়ে আসছিল, সেদিনের সকালবেলা যেনো ফিরে এসেছে, অন্যরূপে, অন্যখানে। এখানে করিডোর জনমানব শূণ্য, বাংলাদেশে করিডোর ভর্তি রোগীর স্বজন। সকলের চোখে মুখে উৎকন্ঠা, কারো চোখে অশ্রু, কেউ তার পাশের জনের কাঁধে শোকার্ত মাথা দিয়ে দাঁরিয়ে বা বসে আছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ ক্যান্টিনে যাচ্ছে চা-কফি পান করতে, কাউকে ছুটতে হচ্ছে ব্লাড ব্যাংকে। আমি কী করেছিলাম!


ভোর সকালে প্লেন থেকে নেমেছি, সম্পর্কে দাদা হোন, উনিই আমাকে এয়ারপোর্টে আনতে গেছিলেন। আমি তখনও জানি, মা কেবিনে আছেন, আমি পৌঁছালে হয়তো উনাকে আরেকবার অপারেশানের জন্য ওটিতে নেয়া হতে পারে। দাদার গাড়ীতে উঠেই আমি প্রথম যে কথাটি বলেছিলাম,
-দাদা, এখান থেকে সরাসরি হসপিটালে চলেন। আমার স্যুটকেসসহ আমি হসপিটালে যেতে চাই। মা বোধ হয় আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আজ থেকে আমি মায়ের সাথে কেবিনেই থাকবো। কাজেই আমার স্যুটকেসটাও ওখানেই থাকবে।

-বৌদি, মাসীমাকে তো আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

-আইসিইউ তে রাখা হয়েছে কেন? কী হয়েছে মায়ের?

-উনার একটা মেজর অপারেশান হয়েছে, কালকেই হয়েছে, সেজন্যই আইসিইউ তে রাখা হয়েছে।

-তাহলে যে আমাকে বলা হয়েছিল, আমি আসার পর সিদ্ধান্ত হবে অপারেশানের ব্যাপারে! মা'কে তো তাহলে জ্ঞানে পাব না।

-আগে চলেন আমাদের বাড়ীতে, একটু ফ্রেশ হয়ে নিবেন, তারপর না হয় হসপিটালে যাবেন।

সেই থেকে শুরু। আমার হতভম্ব হওয়ার পালা, হতভম্ব হওয়ার যন্ত্রণা যে কী ভীষন কষ্টের, প্লেনের ক্লান্তিকর জার্নি কী এক আশায় কাটিয়ে দিলাম, মায়ের সাথে শেষবারের মত আরেকবার কথা বলবো, মা'কে দুইটা দিন যত্ন করবো, সারা জীবনে আমার মা কারো কাছ থেকেই সেবা নেন নি, সেই মা'কে দুইটা দিনের জন্য হলেও ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যাব, কিচ্ছু খেতে পারে না মা, আমি ড্রপার দিয়ে দিয়ে একটু একটু করে খাওয়াবো, জল জল বলে চীৎকার করে, ডাক্তারের নিষেধ আছে বলে কেউ মা'কে একটু জল দেয় না, আমি গিয়ে আঙ্গুলের ফোঁটায় মার শুকিয়ে যাওয়া জিভটা ভিজিয়ে দেবো। কত কিছু করবো, কত কিছু করবো, আমার ভাইগুলো মায়ের জন্য জীবন দিচ্ছে আর আমি মেয়ে বলেই কিছু করতে পারবো না, তাই কি হয়! ছেলে প্রসবের একই কষ্ট পেয়েই তো মা আমাকেও পৃথিবীতে এনেছেন, ঈশ্বর কি আমাকে মায়ের সেবা করার এতটুকু সুযোগও দিবেন না?

দাদা বলে চলেছেন, " জানেন তো, আপনি যদি আমাদের বাড়ী না যান, মাসীমার কাছে অপরাধী হয়ে থাকবো। কালকে আপনার শাগরেদ ( উনার মেয়ে) গেছিল দিদাকে দেখতে, দিদা ওকে বলেছে, " টুম্পা শোন, কাল সকালে তোমার মামী যখন আসবে, সরাসরি হাসপাতালে না এনে মামীকে তোমাদের বাসায় নিয়ে যাবে। হাত-পা ধুয়ে জামাকাপড় চেঞ্জ করা হলে আগে কিছু খেতে দিবে, তারপর আমার কাছে নিয়ে আসবে"।

-দাদা, মা যখন কথাগুলো বলেছিল, তখন ভাবে নি যে উনি আইসিইউতে থাকবেন। এখন তো মা দেখতেও আসবে না, জানতেও পারবে না, তার মেয়েটা এসে পৌঁছেছে। আমি এখন আর আপনাদের বাসায় যাবো না, আমাকে আমার মামার বাসায় নামিয়ে দিন। ওখানে আমার ভাই আছে, ভাইটার সাথে আগে দেখা করি। তারপর হসপিটালে যাব। অবশ্য হসপিটালে গিয়েই বা কি হবে, মা'কেই তো দেখতে পাবো না।

-না, ডাক্তারের কাছে বলে আপনার জন্য স্পেশ্যাল পারমিশান নিয়ে রেখেছি, আপনাকে আইসিইউ তে ঢুকতে দিবে।

আমি জানালার দিকে মুখ ফিরিয়েছিলাম। একটা ময়লা রঙের ট্রেন ঢাকার দিকে ছুটে যাচ্ছে, আকাশটাও কেমন ঘোলাটে রঙ ধরে আছে। মাত্র দুই মাস আগেই এই রাস্তা ধরে কতবার আসা যাওয়া করেছি, তখন মনে ছিল আনন্দ, আমার মা-বাবা, ভাই, আত্মীয়-স্বজনে ঘিরে ছিলাম, আমার মেয়ের বিয়েতে কত আনন্দ হলো, আমার মা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নাতনীর বিয়ে দিলেন, সেই মা মাত্র দুই মাসের ভেতর ইউটেরাস ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন, বড় বড় ডাক্তারের পরামর্শে কত সাহসের সাথে অপারেশান টেবিলে গিয়ে ইউটেরাস অপসারণ করিয়ে এলেন, অপারেশানের পর কত খুশী, ফোনে কতবার সেই গল্প করেছেন! আর আজ, মাত্র দুই মাসের মধ্যে মায়ের এমন করুণ পরিনতি! বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই! মায়ের সাথে শেষ কী কথা হয়েছিল আমার?

মা'কে বলেছিলাম, " মা আমি আবার আসি?"
জবাবে খুব ক্লান্তস্বরে মা বলেছিল, " কী হবে এসে? কোন লাভ তো নাই। তুই তো আর ডাক্তার না, ডাক্তারের চিকিৎসা চলছে, মাত্র দুই মাস আগেই এত টাকাপয়সা খরচ করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে গেলি!

-মা, আমার যে মন মানে না। তোমার এতো কষ্ট হইতেছে, কিছুই খেতে পারো না, তোমার জন্য ভিটামিন মিল্ক নিয়ে আসবো। এক প্যাকেট খেলেই অনেক পুষ্টি হবে শরীরে।

-মিথীলাকে একা ফেলে আসবি ওর বাবার উপরে, এটা কি ঠিক?

আমার সেই মা, সেই মা মারা যাচ্ছে? দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ছিল। পাশে বসে দাদা খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। মাস ছয়েক আগেই উনার মায়ের মৃত্যুর কথা বলছিলেন। আমার কোন কথাই কানে ঢুকছিল না, অথবা কোন কিছুতেই আমি সান্ত্বনা পাচ্ছিলাম না। আমি মায়ের একটা মাত্র মেয়ে, আমার নিজের যখন তিনটি মেয়ে হয়েছিল, এই মা আমাকে সাহস দিয়েছিলেন, বলেছিলেন  "তোর একেকটা মেয়ে একেকটা রত্ন। তোর মেয়েরাই তোর ছেলের দুঃখ ঘুচাবে।" সব মনে পড়ছে, আর দুই একদিনের ভেতর মা আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, আর কেউ থাকবে না আমাদের পাশে, যে সব সময় নীতিশিক্ষা দিয়ে যাবেন, যিনি সব সময় আমাদের সাথে শাসনের সুরে কথা বলবেন।

গাড়ী এসে পৌঁছালো মামার বাড়ী। ঘন্টা দুই বিশ্রাম নিলাম, এর মধ্যেই শুনলাম, হসপিটাল থেকে ফোন এসেছে, মায়ের জ্ঞান ফিরেছে। অবাক কান্ড, মায়ের ব্লাড প্রেসার ফল করেছে, কিডনী ফেল করেছে, পেট ওপেন করে ইন্টেসটাইন থেকে ডাক্তার প্রায় দেড় ফুট কেটে ফেলে দিয়েছে ( ক্যান্সার ছড়িয়ে গেছিল)। কাঁধের কাছে চ্যানেল তৈরী করে দুই তিনটি নল ঢুকিয়েছে প্রয়োজনে খাবার দেয়ার জন্যে। আর ইউটেরাস অপারেশানের ক্ষত তো ছিলই। এই মানুষটির জ্ঞান ফিরে এসেছে, অবাক কান্ডই বটে।

আমি আর আমার মেজোভাই গেলাম হসপিটালে। এই প্রথম লিফটে উঠেই খারাপ লাগছিল, মনে হচ্ছিল আমার সব হারিয়ে গেছে। লিফট থেকে বের হতেই দেখি একটি কক্ষের দরজা ঘিরে প্রচুর চেয়ার পাতা, সেখানে মানুষে ভর্তি। আমার বুক কাঁপছিল, মেজদা আমাকে নিয়ে সেই কক্ষের বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে রিসেপসনিস্টকে বললো, আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়ার স্পেশ্যাল পারমিশানের কথা। শুধুই আমাকে ঢুকতে দিবে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেজদার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুক মুচড়ে উঠলো। গত দুই মাস আমার মেজ ভাই আর ছোট ভাই মা'কে কোলের উপর রেখে যত্ন করেছে। আর আজ মায়ের জ্ঞান ফিরেছে অথচ সে দেখতে পাবে না মা'কে, তা-কি হয়! প্রয়োজনের সময় আমি আমার আবেগ কাজে লাগাই। রিসেপশনিস্ট ছেলেটিকে বললাম, আমি প্লেন থেকে নেমেই হসপিটালে এসেছি, মা'কে কী অবস্থায় দেখবো, হয়তো সহ্য করতে পারবো না, কাজেই আমার ভাইকেও সাথে নিয়ে যেতে চাই।

আমার চেহারার মধ্যে অনেকেই নিজের মা, বোনকে খুঁজে পায়, সেই রিসেপশনিস্ট ছেলেটিও পেয়েছিল। ঐ মুহূর্ত থেকে বাকী পাঁচদিন ছেলেটি আমাকে অনেক বেশী সাহায্য করেছিল, এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার সাথে সাথে কাঁদছিল। আমাদের ভাই বোনকে সেই ছেলেটি তার ভান্ডার খুলে দুটো অ্যাপ্রন এনে দিয়েছিল। দুই ভাই বোনে হেঁটে হেঁটে মায়ের রুমের কাছে আসতেই কাঁচের জানালার বাইরে থেকে মায়ের বিধ্বস্ত দেহটি দেখা যাচ্ছিল। আমি তো জানতাম, মা খুব অসুস্থ, মা হয়তো আর বাঁচবেন না, তারপরেও কী মা'কে এমন করুণ চেহারায় দেখবো ভেবেছিলাম! দুই ভাই বোন মায়ের শয্যা পাশে দাঁড়িয়েছি, মেজদা অনবরত চোখ মুছে চলেছে, আমি ইশারায় কাঁদতে না করে মা'কে ডাকলাম,

'মা, ও মা, মাগো! আমি আসছি।

চেতনার কোন অতল গহ্বর থেকে আমার  মা জেগে উঠলেন, আমার দিকে তাকালেন, দুই তিন সেকেন্ড, কাঁদতে শুরু করলেন। আমি কিন্তু নিজেকে শক্ত রেখেছি, একটুও কাঁদিনি, মায়ের মাথায় হাত বুলিয়েছি আর বলেছি,

" মা তুমি কাঁদো কেনো? তুমি কত সাহসী। এতবড় অপারেশানের পর তোমার সাথে সাথে জ্ঞান ফিরে এসেছে, ডাক্তার বলেছে তুমি ভালো হয়ে যাবে। এই তো আমি চলে এসেছি, আর কোন চিন্তা নেই"।

আমার কথায় মা বোধ হয় একটু ভরসা পেয়েছিলেন, কান্না থেমে গেছিল, মাথায় হাত বুলাতেই শান্ত হলেন। বেশীক্ষন ওখানে থাকতে দেয় নি। দশ মিনিট পরেই মা'কে বুঝিয়ে বলেছি, আইসিইউ তে আমাদের থাকতে দিবে না, ইনফেকশান হয়ে যেতে পারে, তাই আমরা মায়ের রুমের খুব কাছেই বাইরে বসে আছি। মা খুব খুশী হয়েছে, বাচ্চা মেয়েদের মত মাথা কাত করে আচ্ছা বলেছে।


কাকতালীয়ভাবে আজকেই আমি মায়ের শাড়ী, শাঁখা-পলা, চুড়ি গুছিয়ে রাখছিলাম, কান্নাকে সব সময় দমন করা যায় না, করা উচিৎও না। মা নেই, তাঁর কথা মনে করে কাঁদবোনা, তা কি হয়! খুব কেঁদেছি। খুব কেঁদেছি। তারপর তো সন্ধ্যাবেলা নিয়তি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। যে স্মৃতিকে মনের গহীনে চাপা দিতে চাইছি, সেই স্মৃতিই আবার নিজে থেকেই ফিরে ফিরে আসতে চাইলে আমি কী করতে পারি! আজকের কথাই ধরি না কেনো, আমি যাচ্ছিলাম ছোট ভাইটিকে ওর বাড়িতে গিয়েই দেখতে, আমি তো জানতামও না, বেচারা আবার হসপিটালে ভর্তি হয়েছে!

আমার ছোট ভাইটিকে দেখে এসেছি, খুব ভালো ছেলে। ওর কাছ থেকেই শুনলাম, ভীষন কষ্ট অপারেশানের ক্ষততে, আহারে! বলেছি, "বছরের শুরুটা বাজে হয়েছে, তোমার সারা বছর ভালো কাটবে"।


৪ঠা অক্টোবারঃ

ঢাকা এসে পৌঁছেছিলাম অক্টোবারের চার তারিখ সকালে। মিসিসিপি থেকে রওনা হয়েছিলাম আমেরিকার ২ তারিখ সকালে। মিসিসিপি এমনই এক অবস্থানে আছে, সেখান থেকে বের হতে গেলে দুই তিনবার প্লেন বদলাতে হয়। ফলে মিসিসিপি থেকে ঢাকা পৌঁছাতে প্রায় ৩২ থেকে ৩৬ ঘন্টা লেগে যায়। দেশে যাওয়ার পথে এই দীর্ঘ জার্নি ক্লান্তিকর মনে হয় না, দেশে যাচ্ছি, এটা ভাবলেই কষ্টগুলোকে কষ্ট মনে হয় না। নাহলে, দুই তিনবার প্লেন পালটানো, হ্যান্ড লাগেজ টেনে টেনে দৌড়ানো, একবার ট্রেন ধরো, আরেকবার বাস ধরো, বাঙ্গালীর লাগেজও তো ছোটখাটো হয় না, একটি মাত্র হ্যান্ড লাগেজ বহন করা যায়, সেই জায়গায় আমি মাথা প্রতি 




Wednesday, January 2, 2013

ঘুম ভেঙ্গেই সাত মিলিয়ন ডলার!!!



আমেরিকার নেভাদা রাজ্যের কারসেন সিটিতে বাস করতেন ওয়ালটার সামেসকো জুনিয়র নামে এক ভদ্রলোক। গত জুন মাসে নিজ বাড়ীতে তাঁকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। খবরে প্রকাশ, সামেসকো ওয়াল্টার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯। ব্যক্তিজীবনে সামেসকো অবিবাহিত এবং সম্পূর্ণ একাকী ছিলেন। তাঁর বাড়ীতে কোন আত্মীয়-স্বজন, বা বন্ধুবান্ধবের যাতায়াত ছিল না। আশেপাশের প্রতিবেশীদের সাথেও সামেসকো দূরত্ব বজায় রাখতেন। ফলে মৃত্যুকালে তাঁর পাশে কেউই ছিল না। জুন মাসের প্রথম দিকে সামেসকোর বাড়ীর চারপাশ থেকে দূর্গন্ধ ভেসে আসতেই প্রতিবেশীদের একজন পুলিশ কল করে। পুলিশ এসে দরজার তালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে সামেসকোকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তে জানা যায়, মে মাসের কোন এক সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃতদেহ সৎকার করার পূর্বে তাঁর নিকট আত্মীয় স্বজনের খোঁজ করতেই জানা যায়, দূরসম্পর্কের এক কাজিন ছাড়া এই পৃথিবীতে সামেসকোর আর কেউ ছিল না। কাজিন আর্লিন ম্যাগাঞ্জ থাকেন ক্যালিফোর্ণিয়ায়, একটি স্কুলে অস্থায়ীপদে শিক্ষকতা করেন। পুলিশের তত্বাবধানেই সামেসকোর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। শেষকৃত্য সম্পন্ন শেষে দেহাবশেষ শিকাগোতে তার মায়ের সমাধিস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়।
কারসেন সিটি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সামেসকোর বাড়ী-ঘর ধোয়া মোছার ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ীঘর পরিষ্কার করতে এসে ক্লীনারগণ তাঁর বাড়ীর ভেতর এবং গ্যারাজে অনেক বাক্স দেখতে পায়। বাক্সের গায়ে মার্কার দিয়ে ‘বুকস’ লেখা ছিল। কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে বাক্সের মুখ খোলা হয়, এত এত বাক্সের ভেতর কী এমন বই আছে তা পরখ করতে গিয়েই উপস্তিত সকলের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। প্রতিটি বাক্স স্বর্ণমুদ্রায় ভর্তি ছিল। অন্যের দৃষ্টি থেকে আড়াল করবার জন্য প্রতিটি বাক্সে মার্কার দিয়ে ‘বুকস’ লিখে রাখা হয়েছে। ‘বুকস’ লিখা বাক্সের পাশেই ক্যানফুডের বাক্সও রাখা ছিল। আপাতঃদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ গেরস্ত বাড়ী যেমনভাবে সাজানো থাকে, ঠিক একইভাবে সামেস্কো নিজের বাড়ীটিকে সাজিয়েছিলেন। তাঁর বাহ্যিক জীবনযাত্রা দেখে আশপাশের সকলেই তাঁকে দরিদ্র মনে করতো। উদ্ধারকৃত স্বর্ণমুদ্রার বাজারমূল্য সাত মিলিয়ণ ডলারের অনেক বেশী। কিছু কিছু মুদ্রা বহু পুরাণো, যেগুলোর গায়ে ব্রিটিশ এবং অস্ট্রিয়া নামাংকিত করা আছে, সময়কাল ১৮৭০ সাল। সাত মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের স্বর্ণমুদ্রার পরিমান এত বেশী ছিল যে, বাক্সগুলোকে ট্রাকে তুলতে হুইলকার্টের প্রয়োজন হয়েছে। স্বর্ণমুদ্রাভর্তি বাক্সগুলোকে প্রথমে ব্যাঙ্ক ভল্টে নেয়া হয়, এরপর ওগুলোকে ইস্পাত কঠিন সিন্দুক গাড়ীতে তোলা হয়।

মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি, সেই মা মারা গেছেন ১৯৯২ সা্লে শিকাগো শহরে। এরপর থেকে নেভাদা’তে তিনি ছিলেন একা, খুব হিসেবী ছিলেন, একটি পয়সা নিজের আরামের জন্য ব্যয় করেননি বলেই প্রতিবেশীদের চোখে উনি ছিলেন দুঃস্থ ও গরীব। মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ীর ভেতর স্বর্ণভান্ডার দেখে সকলেই তাঁকে ‘হাড়কেপ্পন’, ‘কঞ্জুস’ নামে অভিহিত করে। এবিসি নিউজ ডট কমে এক সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় কারসেন সিটি ক্লার্ক অ্যালান গ্রোভার বলেন, ‘মানুষটি ছিল অত্যন্ত কৃপন। তার বাড়ী এবং গ্যারাজে কার্টুন ভর্তি জিনিস রেখে দেয়া আছে। নিজেও ভোগ করেনি, কাউকেও ভোগ করতে দেয় নি।
‘লাস ভেগাস সান’ পত্রিকার বরাত দিয়ে বলা হয়, সামেসকোর ব্যাঙ্ক একাউন্টে মাত্র দুইশত ডলার পড়ে থাকলেও, স্টক মার্কেটে ছিল এক লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার ডলারের বাজার চালু শেয়ার। সিটি ক্লার্ক গ্রোভার মন্তব্য করেন, “ সামেসকোর বাড়ীর ভেতর থেকে যখন বাক্স ভর্তি ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেলো, আমার একটি কথাই মনে হয়েছে, কী লাভ হলো স্বর্ণমুদ্রা জমিয়ে রেখে! সংসার নেই, স্ত্রী, সন্তান নেই, কাদের জন্য এই কৃচ্ছসাধন? কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করার মত সদিচ্ছাও তার ছিল না। তাই তাঁর সম্পত্তি কাউকেই উইল করে দিয়ে যান নি। এত সম্পদ যার ঘরে লুটোয়, তার বাড়ীটি কিনা এত ছোট! মাত্র ১২০০ স্কয়ার ফিটের চল্লিশ বছরের পুরাণো বাড়ীতে সারাটা জীবন পার করে দিল! কোন শখ আহ্লাদের কিছুই নেই বারীর ভেতর। না ছিল কোন অ্যান্টিক, না ছিল ক্রিস্ট্যাল, না ছিল কোন জুয়েলারী! স্বর্ণখন্ড দিয়ে বাক্স ভর্তি করে একটির উপর আরেকটি সাজিয়ে রেখেছে। আহারে বেচারা”!

গ্রোভার শেষ পর্যন্ত সামেসকোর একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে কাজিন আর্লিন ম্যাগাঞ্জের খোঁজ পেয়ে যান। সামেসকোর মায়ের ফিউনারেলে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের নামের লিস্ট দেখে আর্লিনকেই একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী হিসেবে নেভাদা কোর্ট থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। নেভাদা রাজ্যের কারসন সিটি জাজ গত মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করেন, ওয়ালটার সামেসকো জুনিয়রের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওয়ারিশান হিসেবে তার কাজিন আরলিন ম্যাগাঞ্জ ছাড়া আর কারো কথা জানা যায় নি। কাজেই সামেসকোর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা আরলিনের উপর অর্শিত হলো।
আর্লিন ম্যাগাঞ্জ অবশ্য রায় ঘোষণার দিন নেভাদা এসে পৌঁছাতে পারেন নি। হঠাৎ করে এত সম্পত্তির মালিক হতে পেরে তাঁর অনুভূতি কি, তা অবশ্য জানা হয়নি।