Thursday, July 19, 2012

আরেকবার হুমায়ুন আহমেদের জন্য প্রার্থণা!

ভয়ানক দুঃসংবাদগুলো রাতের অন্ধকারেই আসে! হুমায়ুন আহমেদের কোলন ক্যান্সারের খবর যখন পেয়েছিলাম, আমি তখন আমেরিকাতে। রাত ৯টায় সবেমাত্র কাজ থেকে ফিরেছি, ঘরে ঢুকেই এমন সংবাদ শুনে মন খারাপ হয়েছিল। খুব বেশী মন খারাপ। তখনও লেখালেখির জগতে একেবারেই ্নতুন। সবেমাত্র ব্লগে লিখতে শুরু করেছি। হুমায়ুন আহমেদের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবা্দেই উনার আরোগ্য কামনা করে 'হুমায়ুন আহমেদের জন্য যত প্রার্থনা'  লিখেছিলাম। আমার সেই লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন’ দৈনিকে ছাপাও হয়েছিল। লেখাটি ছিল হুমায়ুন আহমেদের সাথে আমাদের টুকরো টুকরো স্মৃতি থেকে নেয়া। হুমায়ুন আহমেদ অসুস্থ হওয়ার সংবাদে কত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি উনাকে নিয়ে লিখেছিলেন, সে সমস্ত লেখার ভীড়ে আমার লেখাটি কোথায় হারিয়ে গেছিল।আমিও ভুলেই গেছিলাম লেখাটির কথা। ধরেই নিয়েছিলাম হুমায়ুন আহমেদ আমেরিকার উন্নত চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়েই দেশে ফিরে আসবেন। আমার সেদিনের সেই লেখাটি এখানে আবার হুবহু তুলে দিচ্ছি। লেখাটি পোস্ট করার আগে আরেকবার পড়ে দেখলাম। কোথাও কোন অসংগতি পেলামনা। কাঁচা হাতের লেখা, তারপরেও উনার রোগমুক্তির জন্য যে প্রার্থণাটুকু করেছিলাম, সেখানে কোন খাদ ছিলনা।

ব্লগে ও ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকাতে  মুদ্রিত (এডিটেড) লেখাঃ
"আজ রাতে কাজ থেকে ফিরেই শুনলাম হুমায়ুন আহমেদের অসুস্থতার খবর। খবরটা আমাকে ভীষনভাবে নাড়া দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদকে একসময় হুমায়ুন ভাই বলে ডাকতাম। হুমায়ুন আহমেদকে প্রথম চিনি ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামের ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে। এই ধারাবাহিক নাটকটি টিভি দেখার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছিল। আমার দিদিমা ডাক্তার দেখানোর জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছিলেন। তখন সকালে ‘এইসব দিনরাত্রি’র কোন একটা এপিসোড দেখানো হচ্ছিল। দিদিমার খুব ইচ্ছে ছিল এপিসোডটা শেষ করে তারপর রওনা হওয়ার। কিনতু আমার দাদুর তাড়াতাড়িতে দিদিমাকে নাটকটা না দেখেই রওনা হতে হয়েছিল। সেই ছিল আমার দিদিমার শেষযাত্রা। আমার দিদিমা ইন্ডিয়াতেই মারা যান দুই মাসের ভেতর। আমার মা কাঁদতে কাঁদতে একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকটা দেখে যাওয়ার, সেই শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ হলোনা’।

আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত হুমায়ুন আহমেদকে হুমায়ুন আহমেদ হিসেবেই চিনতাম। বিয়ে যখন ঠিক হলো তখন আমার হবু বর আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন যে আমাদের বিয়েতে হুমায়ুন আহমেদ আসবেন। তখনতো মাত্র উনার নাম হতে শুরু করেছে। তাই অত ভয়ানক ব্যস্ত তখনও হয়ে উঠেননি। আমার বর এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আহমেদের সহকর্মী বা বন্ধু ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন আমার বরের সিনিয়র ভাই। পিএইচডি শেষ করে আমার বর আমেরিকা ভ্রমনে বের হয়ে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ীতেও দুই দিন ছিলেন। এতটাই বন্ধুত্ব ছিল তখন। হুমায়ুন আহমেদের দেখাদেখি আমার বরও নাকি একটা গল্প লিখে উনাকে পড়তে দিয়েছিলেন। পড়া শেষ করে হুমায়ুন আহমেদ আমার বরকে বলেছিল আর কাউকে না দেখিয়ে পুরো স্ক্রিপটা বিছানার নীচে ঢুকিয়ে ফেলতে। আমাদের বিয়ের কার্ডটা তৈরী করা হয়েছিল হুমায়ুন আহমেদের সাহায্য নিয়ে। আমার স্বামী নিজেই একজন আর্টিস্ট (শৌখিন), তার বিয়ের কার্ড অন্য রকম হওয়ারই কথা এবং তাই হয়েওছিল। বিয়ের কার্ড এত সুন্দর হতে পারে তা না দেখলে বুঝা যাবেনা। হুমায়ুন ভাই লিখেছিলেন নাকি অন্য কাউকে কোট করেছিলেন তা এখন আর মনে নেই। উনি লিখেছিলেন, 'দুটি প্রান্ত থেকে যে কোন দুজন। বন্ধু নয়, শত্রুও নয় যে কোন দুজন, তেমনি একজন মিঠু আর অন্যজন বিনীত জীবেন।'

আমাদের বিয়ের দিন হুমায়ুন ভাই (বিয়ের পর থেকে ভাই ডাকতে শুরু করেছি) আসতে পারেননি, কোথাও ভাইবা পরীক্ষা নিতে গেছিলেন সেদিন। কিনতু বৌভাতে এসেছিলেন, চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট ‘ম্যাগডোনাল্ডস’ এ। আমার বয়স তখন অনেক কম ছিল বলে সব কিছুতেই বিস্মিত হতাম। লাল শার্ট পড়ে হুমায়ুন ভাই এসেছিলেন, এসেই আমাকে বললেন, ‘ কেমন আছো মিঠু, তোমাকেতো রাজেন্দ্রাণীর মত লাগছে’।আমি একটু হাসি ছাড়া কিছুই করিনি, কারণ আমার বিস্ময়ের সীমা ছিলোনা বলে কথা আসেনি মুখে।

এরপর নতুন অবস্থায় হুমায়ুন ভাইয়ের আজিমপুরের বাড়ীতে গিয়েছিলাম, কি সাধারন মধ্যবিত্তের সংসার। হুমায়ুন ভাইয়ের মা, গুলতেকিন ভাবী, নোভা, শীলা আর একেবারে ছোট ২ বছরের মেয়ে বিপাশা। আমার কোন জড়তা ছিলনা ওদের সাথে কথাবার্তা বলায়। দেখেছি আমাদের মত অতি সাধারণ পরিবারের চিত্র।

দেড় বছর পরে আমাদের মেয়ে মৌটুসী যখন জন্মালো, তৃতীয় দিনে হুমায়ুন ভাই আর গুলতেকিন ভাবী এসেছিলেন ক্লিনিকে, ফুল আর উনার নিজের লেখা তিনটি বই নিয়ে। নন্দিত নরকে, অচিনপুর, সৌরভ বই তিনটির প্রথম পাতায় নিজের হাতে লিখেছিলেন ‘নতুন মা-কে’। গুলতেকিন ভাবী যখন বলেছিলেন যে বাবা-মা দুজনেই সুন্দর তাই মেয়েও সুন্দর হয়েছে, হুমায়ুন ভাই বলেছিলেন যে উনার কাছে পৃথিবীর সকল নবজাতকের চেহারা একরকম মনে হয়। ঐদিন উনি তাদের মেজোমেয়ে শীলার জন্মের কথা গল্প করলেন। আমেরিকাতে মেয়ে জন্মের সাথে সাথে উনি এমন বিকট আওয়াজে আজান দিয়েছিলেন যে লেবার রুমের ডাক্তার নার্স সবাই নাকি হতভম্ব হয়ে গেছিল।

এরপর আবার গিয়েছিলাম উনার শহীদুল্লা হলের বাসায়। কয়েকবার গিয়েছিলাম। একবার উনি ঈদের উপন্যাস লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলেন বলে সবাইকে নাকি বলতে বলেছিলেন, কেউ আসলে যেন বলে উনি বাড়ী নেই। কিনতু আমাদের বেলাতে আর তা হয়নি। গুলতেকিন ভাবী আমাদেরকে পছন্দ করতেন (আমার স্বামী একজন সর্বজন প্রিয় মানুষ), তাই আনন্দের সাথে ভেতরে ঢুকিয়ে হুমায়ুন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন। গুলতেকিন ভাবী আমাকে ভেতর নিয়ে গিয়ে যখন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়ীটা দেখাচ্ছিলেন, তখনই দেখলাম, বারান্দায় একটা জলচৌকি পাতা, তার উপর উনার কাগজ কলম শোভা পাচ্ছে। আরেকদিন উনার সাথে আমরা গল্প করছি, কি একটা জিজ্ঞেস করেছিলাম উনাকে, উনি বললেন যদি কোন কৌতুহল থাকে উনাকে জিজ্ঞেস করতে। আমি জানতে চেয়েছিয়াম সব গল্পে ‘জরী’ নামটা থাকে, এটা কার নাম।উনি বলেছিলেন উনি গুলতেকিন ভাবীর নাম দিয়েছিলেন জরী। আরও অনেক মজার ঘটনা, কত গল্প শুনেছি উনার মুখে। উনার সাথে আড্ডায় বসলে উনি একাই একশ যে কোন আড্ডাকে আনন্দময় করে তুলতে।

এরপর ’৯১ সালের প্রথম দিকে আমার স্বামী আমাকে আর আমার মেয়ে মৌটুসীকে নিয়ে গেছিলেন উনার শহীদুল্লা হলের বাড়ীতে। ‘’অয়োময়’ নাটকের শ্যুটিং দেখাবে বলে। ঐ সময় দুটি ঘটনা ঘটে। হুমায়ুন ভাই ও গুলতেকিন ভাবীর প্রথম ছেলে বাচ্চাটা জন্মের পরেই মারা যায়, আবার ঠিক তখনই ভাবীর দেহে আগমন ঘটে দ্বিতীয় ছেলে নুহাশের। আরেকটা ঘটনা হলো হুমায়ুন ভাই বড়লোক হতে শুরু করেন। পাবলিশার থেকে উনাকে লাল টুকটুকে একটা গাড়ী দেয়া হয়। ঐ গাড়ীতে করেই আমাদের টিভি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় নাটকের শ্যুটিং দেখানোর জন্য। সুবর্না মোস্তফা, বিপাশা হায়াত, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূর সহ সবাইকে দেখে এত ভাল লাগছিল! সুবর্না মোস্তফার মনে পড়েনি ১৫/১৬ বছর আগে আমার স্বামী তার গৃহশিক্ষক ছিলেন। অথচ ২০০০ সালে আড়ং এ একবার দেখা হয়েছিল গোলাম মোস্তফার সাথে। গোলাম মোস্তফা কিনতু ঠিক আমার স্বামীর ডাকনাম ধরেই ডাকলেন, নিজের স্ত্রীকে মনে করিয়ে দিলেন যে এই দুলাল উনার মেয়ের শিক্ষক ছিল। আমরা আমেরিকা চলে আসার আগে হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহীদ মিনার অথবা বইমেলা থেকে ফেরার পথে। আমাদের ছোট্ট মিথীলা ছিল তার বাবার কাঁধে, আর দুই মেয়ে মৌটুসী ও মিশা ছিল আমার পাশে। হঠাৎ করেই দেখতে পেলাম হুমায়ুন ভাই আর প্রয়াত অভিনেতা মোজাম্মেল হোসেন কে খুব তাড়াতাড়ি করে ভীড় ঠেলে পার হতে। আমার স্বামী হুমায়ুন ভাই বলে ডাক দিতেই উনি থেমে ছোট মেয়েকে দেখিয়ে শুধু বললেন, ভালই চালিয়ে যাচ্ছ! আমিও কথাটা লুফে নিয়ে বললাম, আপনার পথ অনুসরন করছে! ব্যস! খুব একদফা হাসাহাসি হলো, যে যার পথে চলে গেলাম।

হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে এর পরেও আমার বরের দেখা হয়েছিল, কি একটা ডকুমেন্টারী শিক্ষামূলক ফিলম করার জন্য কোন প্রতিষ্ঠান মনে হয় আমার স্বামীকে ধরেছিল যেন হুমায়ুন ভাইকে দিয়ে স্ক্রিপ্টটা লিখিয়ে দেয়। আমার স্বামী আবার সেবামূলক কাজ খুব আনন্দের সাথে করে দেয়, তাই সাথে সাথে হুমায়ুন ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব করেছিল স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজটা করে দিতে। কি জানি কি মনে হয়েছিল হুমায়ুন ভাইয়ের, অনেক পারিশ্রমিক চেয়ে বসেছিলেন। ফলে ওটা আর করা হয়নি, আমার বরের মনেও ভীষন ধাক্কা লেগেছিল। এরপর আর কোনদিন হুমায়ুন ভাইয়ের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি।ইগোতে লেগেছে আমার বরের। তারপরেও ২০০০ সালের নভেম্বারের ১৮ তারিখে হুমায়ুন ভাইকে ফোন করে আমার বর বলেছিল, ‘হুমায়ুন ভাই আজ আমাদের বড় মেয়ের জন্মদিন, ওকে একটু আশীর্বাদ করে দিন’। হুমায়ুন ভাই আমার মেয়েটাকে আশীর্বাদ করলেন।

এরপর আমরা আমেরিকা চলে এসেছি ২০০১ সালে, কত নতুন নতুন খবর শুনতাম। মনটা খারাপ হতো, গুলতেকিন ভাবীর কথা মনে পড়তো। তাদের দুইজনের জন্যই আমার কষ্ট হতো, আমি কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি আজ পর্যন্ত। তাই যে কোন আলোচনাতে আমি বা আমার স্বামী কোন মন্তব্য করিনা। অন্যের মুখে যখন হুমায়ুন ভাইয়ে নিন্দা শুনি খুব কষ্ট পাই, আবার গুলতেকীন ভাবীর পক্ষে যখন কেউ কিছু বলে সেটাও খুব সত্যি বলে বিশ্বাস করি। মানুষের মন, কখন কোন দিকে বাঁক নেয়, কেউ বলতে পারেনা। আমি গুনী মানুষের গুনটুকুই দেখি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে যাইনা। যে যেখানে আছে, যেভাবে আছে, সুখে থাকুক ভালো থাকুক।

আমার মনটা আজ খুব বেশী খারাপ হয়ে গেছে। হুমায়ুন ভাইয়ের এই কঠিন রোগ যেন আমেরিকার ডাক্তারের কাছে পরাস্ত হয়, অনেক আশা নিয়ে হুমায়ুন ভাইকে এদেশে আনা হয়েছে, আশাপূর্ণ করে যেন হুমায়ুন ভাই হাসতে হাসতে দেশের ছেলে দেশে ফিরতে পারেন, মায়ের ছেলে যেন মায়ের কাছে ফিরতে পারেন, ছোট্ট ছোট্ট দুইটা ফুলের মত শিশুর বাবা যেন তাদের কাছে হাত ভর্তি বেলুন নিয়ে ফিরতে পারেন, এই শুভ কামনা করে যাব যতক্ষ্ণণ প্রয়োজন হয় ততক্ষণ"।


আমরা দেশে এসে দুইমাস থেকে এখন আমেরিকা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি দেশে যতদিন থেকেছি, সংবাদপত্র, টিভি থেকে শতহাত দূরে থেকেছি। খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ এর ওর মুখ থেকে শুনে নিয়েছি। হুমায়ুন ভাইয়ের আমেরিকা ফিরে যাওয়া, সেখানে দুইবার সফল অস্ত্রোপচার হওয়ার কথাও শুনেছি। আজকেই হঠাৎ করে আমার স্বামী ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এর একখানা কপি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “ হুমায়ুন ভাইয়ের অবস্থা খুবই খারাপ”। আমি খবরের হেডলাইনটুকু দেখে কাগজটি সরিয়ে রেখেছি। পড়তে চাইনি, কারন আমার মনে হয়েছে এগুলো সবই অতিরঞ্জিত খবর। হুমায়ুন আহমেদের খারাপ কিছু হতে পারেনা, উনি ক্যান্সারের রুগী, গায়ে জ্বর এলেও পত্রিকাওয়ালারা এটা নিয়ে হৈ চৈ শুরু করে দেয়। এবারও নিশ্চয়ই তাই হয়েছে। দাদার বাসা থেকে বেরিয়ে রাত সাড়ে এগারোটায় ঘরে ফিরেছি। আমেরিকাতে ফিরে যাব আর দুই দিন পরেই। মন খারাপ করে একটু চোখ বন্ধ করে শুয়েছি, মেজ মেয়ে জোরে জোরে ডাকছিল আর সমানে বলে চলছিল, “ মা, হুমায়ুন আহমেদ মারা গেছেন”। হঠাৎ করেই আমার হার্ট বিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এ এক অসহ্য অনুভূতি!

আমার মেজো মেয়ে গল্পের বই পড়েনা। বাংলা গল্পের বই পড়ার প্রশ্নই উঠেনা। তবু ওর ২১ বছরের জীবনে একমাত্র বাংলা বই সে পড়েছে, হুমায়ুন আহমেদের ‘কুটু মিয়া’। আমার এই মেয়ে আমার মতই ইমোশনাল। হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুতে সে খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। আমেরিকার মাটিতে বড় হওয়া মিশা এক মুহূর্তে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে যার সারমর্ম, ‘ আমি গল্পের বই পড়িনা। একটামাত্র বাংলা গল্পের বই পড়েছি হুমায়ুন আহমেদের ‘কুটুমিয়া’। কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে, আমার বাবা আমাকে ডাকেন ‘কুটু’ আর আমার ছোটবোন আমাকে ডাকে ‘মিয়া’।  হুমায়ুন আহমেদ এভাবেই আমার নামের মধ্যে বেঁচে থাকবেন’।
আমরা দেশে এসেছি মে মাসের শেষে। হুমায়ুন আহমেদ বোধ হয় মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসেছিলেন। আমেরিকাতে থেকেই হুমায়ুন আহমেদের দেশে ফেরার সংবাদে অত্যন্ত খুশী হয়েছিলাম। আমার স্বামী আমেরিকার অনেক গুনগান করেন, আমি সব সময় উলটো গীত গাই। কিনতু এবার আমি স্বামীর সাথে একসুরে বলেছিলাম, আমেরিকার চিকিৎসা ব্যবস্থা আসলেই অদ্ভূত রকমের ভালো। হুমায়ুন ভাই পর্যন্ত সুস্থ দেহে দেশে ফিরে যাচ্ছেন। যাই হোক আমেরিকাতে থাকতেই পত্রিকান্তরেই জেনেছিলাম যে উনারা জুনের ১২ তারিখে আমেরিকা ফিরে আসবেন। আমার বড় মেয়ের জন্মের তৃতীয় দিনে উনি গুলতেকীন ভাবীকে নিয়ে ক্লিনিকে গেছিলেন, এরপরেও কতবার বড় মেয়েকে নিয়ে উনার শহীদুল্লাহ হলের কোয়ার্টারে বেড়াতে গেছি। আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলো জুনের প্রথম সপ্তাহে। আমার একটু ইচ্ছে হচ্ছিল মেয়েকে নিয়ে ‘নুহাশ পল্লী’তে যাই। বিয়ের আগে মেয়েটা এমন একজন জ্ঞানী-গুনী মানুষের আশীর্বাদ পেলে আমার ভালো লাগতো।। কিনতু চিকিৎসকের নিষেধ ছিল রোগী যেন বেশী মানুষের কাছাকাছি না যায়। আমেরিকার চিকিৎসকের এই সাবধানবাণী মাথায় রেখে মনের ইচ্ছে মনেই রেখে দিয়েছিলাম। যাওয়া হয়নি। আমার স্বামী খুব শান্ত, ধীর স্থির মানুষ। বন্ধুর অসুস্থতার খবরে কষ্ট পেয়েছিলেন, অভিমান ভুলে বন্ধুর ভাল যে কোন সংবাদের জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন। আর আজকে মেয়ের মুখে বন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে একেবারেই চুপ হয়ে গেছেন। টিভি অন করে আরেকটিবার বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ শুনে নিশ্চিত হলেন, মেয়ে ভুল বলেনি। টিভি অফ করে ঘরের বাতিটি নিভিয়ে দিয়ে শান্ত মানুষটি আরও বেশী শান্ত হয়ে গেলেন।


আর আমি? আবার হুমায়ুন আহমেদের জন্য প্রার্থণায় বসে গেলাম। এমন একজন কিংবদন্তী লেখককে নিয়ে দু’চারটি কথা লিখতে পারছি এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কিছু নেই। উনার আত্মার শান্তি কামনা করি। ছোট্ট নিষাদ ও ছোট্ট নিনিতের মধ্যেই যেনো পরমপ্রিয়কে খুঁজে পায় মেহের আফরোজ শাওন।

হুমায়ুন আহমেদের জন্য যত প্রার্থণা (পুরানো লেখা থেকে সংগৃহীত)

আজ রাতে কাজ থেকে ফিরেই শুনলাম হুমায়ুন আহমেদের অসুস্থতার খবর। খবরটা আমাকে ভীষনভাবে নাড়া দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদকে একসময় হুমায়ুন ভাই বলে ডাকতাম। হুমায়ুন আহমেদকে প্রথম চিনি ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামের ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে। এই ধারাবাহিক নাটকটি টিভি দেখার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছিল। আমার দিদিমা ডাক্তার দেখানোর জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছিলেন। তখন সকালে ‘এইসব দিনরাত্রি’র কোন একটা এপিসোড দেখানো হচ্ছিল। দিদিমার খুব ইচ্ছে ছিল এপিসোডটা শেষ করে তারপর রওনা হওয়ার। কিনতু আমার দাদুর তাড়াতাড়িতে দিদিমাকে নাটকটা না দেখেই রওনা হতে হয়েছিল। সেই ছিল আমার দিদিমার শেষযাত্রা। আমার দিদিমা ইন্ডিয়াতেই মারা যান দুই মাসের ভেতর। আমার মা কাঁদতে কাঁদতে একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকটা দেখে যাওয়ার, সেই শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ হলোনা’।
আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত হুমায়ুন আহমেদকে হুমায়ুন আহমেদ হিসেবেই চিনতাম। বিয়ে যখন ঠিক হলো তখন আমার হবু বর আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন যে আমাদের বিয়েতে হুমায়ুন আহমেদ আসবেন। তখনতো মাত্র উনার নাম হতে শুরু করেছে। তাই অত ভয়ানক ব্যস্ত তখনও হয়ে উঠেননি। আমার বর এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আহমেদের সহকর্মী বা বন্ধু ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন আমার বরের সিনিয়র ভাই। পিএইচডি শেষ করে আমার বর আমেরিকা ভ্রমনে বের হয়ে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ীতেও দুই দিন ছিলেন। এতটাই বন্ধুত্ব ছিল তখন। হুমায়ুন আহমেদের দেখাদেখি আমার বরও নাকি একটা গল্প লিখে উনাকে পড়তে দিয়েছিলেন। পড়া শেষ করে হুমায়ুন আহমেদ আমার বরকে বলেছিল আর কাউকে না দেখিয়ে পুরো স্ক্রিপটা বিছানার নীচে ঢুকিয়ে ফেলতে। আমাদের বিয়ের কার্ডটা তৈরী করা হয়েছিল হুমায়ুন আহমেদের সাহায্য নিয়ে। আমার স্বামী নিজেই একজন আর্টিস্ট (শৌখিন), তার বিয়ের কার্ড অন্য রকম হওয়ারই কথা এবং তাই হয়েওছিল। বিয়ের কার্ড এত সুন্দর হতে পারে তা না দেখলে বুঝা যাবেনা। হুমায়ুন ভাই লিখেছিলেন নাকি অন্য কাউকে কোট করেছিলেন তা এখন আর মনে নেই। উনি লিখেছিলেন, 'দুটি প্রান্ত থেকে যে কোন দুজন। বন্ধু নয়, শত্রুও নয় যে কোন দুজন, তেমনি একজন মিঠু আর অন্যজন বিনীত জীবেন।'
আমাদের বিয়ের দিন হুমায়ুন ভাই (বিয়ের পর থেকে ভাই ডাকতে শুরু করেছি) আসতে পারেননি, কোথাও ভাইবা পরীক্ষা নিতে গেছিলেন সেদিন। কিনতু বৌভাতে এসেছিলেন, চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট ‘ম্যাগডোনাল্ডস’ এ। আমার বয়স তখন অনেক কম ছিল বলে সব কিছুতেই বিস্মিত হতাম। লাল শার্ট পড়ে হুমায়ুন ভাই এসেছিলেন, এসেই আমাকে বললেন, ‘ কেমন আছো মিঠু, তোমাকেতো রাজেন্দ্রাণীর মত লাগছে’।আমি একটু হাসি ছাড়া কিছুই করিনি, কারণ আমার বিস্ময়ের সীমা ছিলোনা বলে কথা আসেনি মুখে।
এরপর নতুন অবস্থায় হুমায়ুন ভাইয়ের আজিমপুরের বাড়ীতে গিয়েছিলাম, কি সাধারন মধ্যবিত্তের সংসার। হুমায়ুন ভাইয়ের মা, গুলতেকিন ভাবী, নোভা, শীলা আর একেবারে ছোট ২ বছরের মেয়ে বিপাশা। আমার কোন জড়তা ছিলনা ওদের সাথে কথাবার্তা বলায়। দেখেছি আমাদের মত অতি সাধারণ পরিবারের চিত্র।
দেড় বছর পরে আমাদের মেয়ে মৌটুসী যখন জন্মালো, তৃতীয় দিনে হুমায়ুন ভাই আর গুলতেকিন ভাবী এসেছিলেন ক্লিনিকে, ফুল আর উনার নিজের লেখা তিনটি বই নিয়ে। নন্দিত নরকে, অচিনপুর, সৌরভ বই তিনটির প্রথম পাতায় নিজের হাতে লিখেছিলেন ‘নতুন মা-কে’। গুলতেকিন ভাবী যখন বলেছিলেন যে বাবা-মা দুজনেই সুন্দর তাই মেয়েও সুন্দর হয়েছে, হুমায়ুন ভাই বলেছিলেন যে উনার কাছে পৃথিবীর সকল নবজাতকের চেহারা একরকম মনে হয়। ঐদিন উনি তাদের মেজোমেয়ে শীলার জন্মের কথা গল্প করলেন। আমেরিকাতে মেয়ে জন্মের সাথে সাথে উনি এমন বিকট আওয়াজে আজান দিয়েছিলেন যে লেবার রুমের ডাক্তার নার্স সবাই নাকি হতভম্ব হয়ে গেছিল।
এরপর আবার গিয়েছিলাম উনার শহীদুল্লা হলের বাসায়। কয়েকবার গিয়েছিলাম। একবার উনি ঈদের উপন্যাস লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলেন বলে সবাইকে নাকি বলতে বলেছিলেন, কেউ আসলে যেন বলে উনি বাড়ী নেই। কিনতু আমাদের বেলাতে আর তা হয়নি। গুলতেকিন ভাবী আমাদেরকে পছন্দ করতেন (আমার স্বামী একজন সর্বজন প্রিয় মানুষ), তাই আনন্দের সাথে ভেতরে ঢুকিয়ে হুমায়ুন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন। গুলতেকিন ভাবী আমাকে ভেতর নিয়ে গিয়ে যখন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়ীটা দেখাচ্ছিলেন, তখনই দেখলাম, বারান্দায় একটা জলচৌকি পাতা, তার উপর উনার কাগজ কলম শোভা পাচ্ছে। আরেকদিন উনার সাথে আমরা গল্প করছি, কি একটা জিজ্ঞেস করেছিলাম উনাকে, উনি বললেন যদি কোন কৌতুহল থাকে উনাকে জিজ্ঞেস করতে। আমি জানতে চেয়েছিয়াম সব গল্পে ‘জরী’ নামটা থাকে, এটা কার নাম।উনি বলেছিলেন উনি গুলতেকিন ভাবীর নাম দিয়েছিলেন জরী। আরও অনেক মজার ঘটনা, কত গল্প শুনেছি উনার মুখে। উনার সাথে আড্ডায় বসলে উনি একাই একশ যে কোন আড্ডাকে আনন্দময় করে তুলতে।
এরপর ’৯১ সালের প্রথম দিকে আমার স্বামী আমাকে আর আমার মেয়ে মৌটুসীকে নিয়ে গেছিলেন উনার শহীদুল্লা হলের বাড়ীতে। ‘’অয়োময়’ নাটকের শ্যুটিং দেখাবে বলে। ঐ সময় দুটি ঘটনা ঘটে। হুমায়ুন ভাই ও গুলতেকিন ভাবীর প্রথম ছেলে বাচ্চাটা জন্মের পরেই মারা যায়, আবার ঠিক তখনই ভাবীর দেহে আগমন ঘটে দ্বিতীয় ছেলে নুহাশের। আরেকটা ঘটনা হলো হুমায়ুন ভাই বড়লোক হতে শুরু করেন। পাবলিশার থেকে উনাকে লাল টুকটুকে একটা গাড়ী দেয়া হয়। ঐ গাড়ীতে করেই আমাদের টিভি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় নাটকের শ্যুটিং দেখানোর জন্য। সুবর্না মোস্তফা, বিপাশা হায়াত, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূর সহ সবাইকে দেখে এত ভাল লাগছিল! সুবর্না মোস্তফার মনে পড়েনি ১৫/১৬ বছর আগে আমার স্বামী তার গৃহশিক্ষক ছিলেন। অথচ ২০০০ সালে আড়ং এ একবার দেখা হয়েছিল গোলাম মোস্তফার সাথে। গোলাম মোস্তফা কিনতু ঠিক আমার স্বামীর ডাকনাম ধরেই ডাকলেন, নিজের স্ত্রীকে মনে করিয়ে দিলেন যে এই দুলাল উনার মেয়ের শিক্ষক ছিল। আমরা আমেরিকা চলে আসার আগে হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহীদ মিনার অথবা বইমেলা থেকে ফেরার পথে। আমাদের ছোট্ট মিথীলা ছিল তার বাবার কাঁধে, আর দুই মেয়ে মৌটুসী ও মিশা ছিল আমার পাশে। হঠাৎ করেই দেখতে পেলাম হুমায়ুন ভাই আর প্রয়াত অভিনেতা মোজাম্মেল হোসেন কে খুব তাড়াতাড়ি করে ভীড় ঠেলে পার হতে। আমার স্বামী হুমায়ুন ভাই বলে ডাক দিতেই উনি থেমে ছোট মেয়েকে দেখিয়ে শুধু বললেন, ভালই চালিয়ে যাচ্ছ! আমিও কথাটা লুফে নিয়ে বললাম, আপনার পথ অনুসরন করছে! ব্যস! খুব একদফা হাসাহাসি হলো, যে যার পথে চলে গেলাম।
হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে এর পরেও আমার বরের দেখা হয়েছিল, কি একটা ডকুমেন্টারী শিক্ষামূলক ফিলম করার জন্য কোন প্রতিষ্ঠান মনে হয় আমার স্বামীকে ধরেছিল যেন হুমায়ুন ভাইকে দিয়ে স্ক্রিপ্টটা লিখিয়ে দেয়। আমার স্বামী আবার সেবামূলক কাজ খুব আনন্দের সাথে করে দেয়, তাই সাথে সাথে হুমায়ুন ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব করেছিল স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজটা করে দিতে। কি জানি কি মনে হয়েছিল হুমায়ুন ভাইয়ের, অনেক পারিশ্রমিক চেয়ে বসেছিলেন। ফলে ওটা আর করা হয়নি, আমার বরের মনেও ভীষন ধাক্কা লেগেছিল। এরপর আর কোনদিন হুমায়ুন ভাইয়ের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি।ইগোতে লেগেছে আমার বরের। তারপরেও ২০০০ সালের নভেম্বারের ১৮ তারিখে হুমায়ুন ভাইকে ফোন করে আমার বর বলেছিল, ‘হুমায়ুন ভাই আজ আমাদের বড় মেয়ের জন্মদিন, ওকে একটু আশীর্বাদ করে দিন’। হুমায়ুন ভাই আমার মেয়েটাকে আশীর্বাদ করলেন।
এরপর আমরা আমেরিকা চলে এসেছি ২০০১ সালে, কত নতুন নতুন খবর শুনতাম। মনটা খারাপ হতো, গুলতেকিন ভাবীর কথা মনে পড়তো। তাদের দুইজনের জন্যই আমার কষ্ট হতো, আমি কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি আজ পর্যন্ত। তাই যে কোন আলোচনাতে আমি বা আমার স্বামী কোন মন্তব্য করিনা। অন্যের মুখে যখন হুমায়ুন ভাইয়ে নিন্দা শুনি খুব কষ্ট পাই, আবার গুলতেকীন ভাবীর পক্ষে যখন কেউ কিছু বলে সেটাও খুব সত্যি বলে বিশ্বাস করি। মানুষের মন, কখন কোন দিকে বাঁক নেয়, কেউ বলতে পারেনা। আমি গুনী মানুষের গুনটুকুই দেখি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে যাইনা। যে যেখানে আছে, যেভাবে আছে, সুখে থাকুক ভালো থাকুক।
আমার মনটা আজ খুব বেশী খারাপ হয়ে গেছে। হুমায়ুন ভাইয়ের এই কঠিন রোগ যেন আমেরিকার ডাক্তারের কাছে পরাস্ত হয়, অনেক আশা নিয়ে হুমায়ুন ভাইকে এদেশে আনা হয়েছে, আশাপূর্ণ করে যেন হুমায়ুন ভাই হাসতে হাসতে দেশের ছেলে দেশে ফিরতে পারেন, মায়ের ছেলে যেন মায়ের কাছে ফিরতে পারেন, ছোট্ট ছোট্ট দুইটা ফুলের মত শিশুর বাবা যেন তাদের কাছে হাত ভর্তি বেলুন নিয়ে ফিরতে পারেন, এই শুভ কামনা করে যাব যতক্ষ্ণণ প্রয়োজন হয় ততক্ষণ।

Wednesday, July 18, 2012

বিউটি পার্লার

মানুষজনকে নেমন্তন্ন খাওয়াতে  আমার খুব ভালো লাগে, তার চেয়েও বেশী ভালো লাগে কারো কাছ থেকে নেমন্তন্ন পেলে। আমাকে কেউ নেমন্তন্ন করলে আমি সেটা আনন্দের সাথে গ্রহন করি এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার আপ্রান চেষ্টা করি। প্রবাস জীবনে নিঃসঙ্গতা কাটাতে বাঙ্গালীরা প্রায়ই নানা উছিলায় একটা গেট টুগেদারের আয়োজন করে। ঐ সকল গেট টুগেদারগুলোতে, তা যতই সাধারন হোক না কেনো, সকলেই সেজেগুজে যায়।  দেশ থেকে নিয়ে আসা লেটেস্ট ডিজাইনের শাড়ী, অথবা যে কোন সুন্দর শাড়ী পরার একটা সুযোগ পেয়ে গেলে , কোন মেয়ের পক্ষেই তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না। তাছাড়া, কার শাড়ী কত বেশী দামী অথবা কার  নেকলেসটি  দেশের সবচেয়ে দামী জুয়েলার্স থেকে কেনা হয়েছে, সেগুলো দেখানোর একটা ব্যাপারও আছে, বিশেষ করে  মহিলাদের মাঝে নীরব প্রতিযোগীতা চলে । মেয়ে বা মহিলারা তো সাজেই, সাথে  পুত্র এবং স্বামীটিকেও বাঙ্গালী সাজে সাজিয়ে আনে। তবে  সকলেই সাজগোজ নিজের ঘরেই নিজ হাতেই করে। বিউটি পার্লারে যায়না। প্রবাসের গেট টুগেদারগুলোর প্রধান উপলক্ষ হচ্ছে কারো বিবাহ বার্ষিকী নয়তো বাচ্চার বার্থডে.  প্রবাসে ছেলেমেয়েরা ক্যারিয়ার নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে, বিয়ের ব্যাপারে কারোর মধ্যেই তেমন উৎসাহ দেখা যায়না। ফলে আমাদেরও আর বিয়ের নেমন্তন্ন খাওয়া হয়না। অথচ দেশে সকলেই দেদারসে বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে চলেছে! ফেসবুকে প্রতিদিনই কারো না কারো ওয়ালে সুন্দর সুন্দর বিয়ের ছবি আপলোড হতে দেখি। নিজের বিয়ের ছবি ছাড়াও অনেকেই ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবীর বিয়ের ছবিও পোস্ট করে। আমার খুব ভালো লাগে ছবিগুলো দেখতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে সকলেই  ঝলমলে সাজে সেজে আসে, নতুন ডিজাইনের শাড়ীতে, গোল্ড প্লেটেড গয়নাতে, বিউটি পার্লারের মেকাপে প্রতিটি মেয়েকে যেমন ভালো লাগে, তেমনি বলিউডের নায়কদের মত জমকালো ডিজাইনের চুড়িদার, গলায় জয়পুরী কাজের উড়নী, পায়ে আধুনিক ডিজাইনের নাগরাতে প্রতিটি ছেলেকে দেখতেও দারুন ভালো লাগে। ভালো লাগার বড় একটি কারন হচ্ছে  বিয়েবাড়ীতে আসা অতিথিদের হাস্যোজ্জ্বল, প্রানবন্ত মুখশ্রী দেখা যায়। আরেকটি ব্যাপার খুব লক্ষ্যণীয়, ছবিতে দেখে মনে হয়না আজকাল কেউ নিজ ঘরে নিজ হাতে সাজে। ছবিতেও মুখে চড়া মেকাপের ছাপ স্পষ্ট বুঝা যায়। যে মেয়েকে আমি কৃষ্ণবর্ণ দেখেছি, তাকেও যখন  ঐশ্বরিয়ার মতই ফর্সা মসৃন সাজে দেখি, মন ভালো না হয়ে উপায় আছে! আফসোসও হয়, আহারে! আমাদের তরুন বয়সটাতে 'বিউটি পার্লারের' নামই জানতে পারিনি। তখন তো আর এমন ব্যাঙের ছাতার মত অলিতে গলিতে বিউটি পার্লার গজায়নি। পার্লার গজালে মন্দ হতোনা, আমিও নিজেকে একবারের জন্য হলেও ' সুচিত্রা সেন' সাজিয়ে নিতে পারতাম! তবে আমি নিজে নিজেই সাজতে ভালোবাসি, দামী না হলেও সুন্দর কাপড়-চোপর পড়তে ভালোবাসি। কিছু সময়ের জন্য মনটা ভালো থাকে। কোন রকম মালিণ্য  মনকে স্পর্শ করতে পারেনা। ইদানিং শুনি ছেলেদের জন্যও আলাদা পার্লার আছে। সেখানে ছেলেরা যায় স্পা তে, মেয়েদের মতো ছেলেরাও ফেসিয়াল করায়। খুবই আশাব্যঞ্জক কথা। ছেলেরাও রূপ সচেতন হয়েছে।  সত্যি কথা বলতে গেলে, রূপচর্চ্চা শুধু  মেয়েদের জন্যই নয়, সকলেরই উচিৎ নিজেকে আরেকটু ভালোভাবে, সুন্দরভাবে যত্নে রাখা।

এবার দেশে এসে বেশ কয়েকখানা বিয়ের নেমন্তন্ন পেয়েছি। দুই একটা অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি নানা কারনে। সময়ের সাথে মিলছিলনা অথবা অন্য প্রোগ্রামের সাথে ম্যাচ করছিলোনা। তবে বেশীর ভাগ অনুষ্ঠানেই উপস্থিত হয়েছি।আমার নিজের মেয়ের বিয়েও দেশে আয়োজন করেছি। তবে নিজের মেয়ের বিয়েতে খুব টেনশানেই কেটে গেছে পুরোটা সময়। অনুষ্ঠান ঠিকমত সম্পন্ন হবে কিনা সে চিন্তাতেই মগ্ন ছিলাম। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের প্রতি 'কনের মা' সুলভ আচরন করতে যেয়ে কারো সাজগোজ, বিউটি পার্লারের মেকাপ, নতুন ডিজাইনের শাড়ী, পাজামা-পাঞ্জাবী, বাচ্চাদের
পোষাকের ঔজ্জ্বল্য খেয়াল করতে পারিনি। আর আমি নিজেতো টেনশানে এতটাই অস্থির ছিলাম যে নিজে সাজ করার সুযোগ পাইনি অথবা 'কনের মায়ের সাজতে নেই' ভয়ে সাজিনি। তারপরেও অবিন্যস্ত ছোট চুলেই ক্লিপ দিয়ে বেলী ফুলের মালা জড়াতে ভুলিনি। চুলে বেলী বা রজনীগন্ধার মালা প্যাঁচানোর স্টাইল কলকাতাতে প্রথম দেখেছিলাম। ছোটবেলায় বাবা মায়ের সাথে দুই বছর পর পর কলকাতা বেড়াতে যেতাম। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে বিয়েবাড়ীর যাত্রী অথবা বিয়েবাড়ী ফেরৎ সুন্দরীদের চুলে জড়ানো বেলী বা রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধে চারপাশ ম ম করতো, সেই স্টাইল এখনও ধরে রেখেছি।

বলতে চাইছিলাম বিউটি পার্লারের গুনবন্দনা। কিভাবে কালোকে সাদা বানায়, শেফালীকে মাধুরী বানায়, ধানমন্ডির 'রেখা'কে বলিউডের 'রেখা' বানিয়ে ফেলে। দুই বছর আগেই আমার এক আত্মীয় বিয়ে করেছে। বিয়েতে আমি  উপস্থিত ছিলাম। বিয়ের কনের ছবি দেখেছিলাম অনেক আগে, মিষ্টি মেয়ে। কিনতু বিয়ের আসরে গিয়ে সেই ছবিতে দেখা মেয়েকে চিনতেই পারছিলামনা। একেবারে বলিউডের নায়িকা, ঢাকার নায়িকা নয়। দু'দিন পরে বৌভাতের অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি বৌকে আরেকরকম লাগছে। পরে জেনেছি দুই অনুষ্ঠানে ভিন্ন পার্লারে সাজানো হয়েছে কনেকে। ১৪ হাজার টাকা অথবা ২০ হাজার টাকা খরচ পড়েছে একেকদিন। পার্লারে সাজার খরচেও রকমফের আছে। 'ম্যাডাম' এসে চোখে কাজলের টান দিলে অতিরিক্ত পয়সা আর ম্যাডামের এসিস্ট্যান্ট সাজালে অনেক কম খরচ। যে কনে, সে স্বপ্ন দেখে বিয়েতো একবারই হয়, নাহয় একদিন অমুক ম্যাডামের টাচ পড়লো তার সাজে।ভবিষ্যতে গাল ভরিয়ে গল্প করা যাবে বন্ধুদের সাথে।

বিয়ে বাড়ীতে সকলের সাজই কাছাকাছি ধরনের হয়ে থাকে। আগে মুখের মেকাপ আর চুলের স্টাইলই করতে যেত সবাই পার্লারে। কিনতু ইদানিং দেখি শাড়ী পড়তেও যায় বিউটি পার্লারে। আমিতো জানতাম সাধারনতঃ চুলের স্টাইল করতেই মেয়েরা পার্লারে যায়। আমার ধারনা যে কী পরিমান ভুল, সেটা খুব ভালো টের পাচ্ছি।  বিয়ে ছাড়াও বাচ্চার জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, বান্ধবীর গায়ে হলুদ, এমনকি কনে দেখার সময়ও মেয়েরা বিউটি পার্লারে চলে যায়। সেদিন  গিয়েছিলাম এক বিউটি পার্লারে। বাংলাদেশ থেকেই একটা হেয়ার স্টাইল করে নেওয়ার জন্য। পার্লারে ঢুকেই দেখি ছোট পরিসরের কক্ষটিতে বিয়ের কনে গায়েহলুদের সাজ করে বসে আছে, আর  সখীবৃন্দ ক্যাঁচোড় ম্যাচোড় করে চলেছে। সখীদের সাজ দেখে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। সাজ এত বাজে হয়েছে যে ঘরে বসে সাজলে এর চেয়েও ভালো সাজ ওরা নিজেরাই করতে পারতো।  পাশে থাকা কাজিনকে জিজ্ঞেস করলাম যে মেয়েগুলোকে অমন যাত্রার ঢঙে সাজালো কেনো? কাজিনের উত্তর, ' যে যেমন প্যাকেজ নিবে তার সাজও তেমনই হবে। ওরা হয়তো একেবারে সস্তা প্যাকেজ নিয়েছে"! তাই বলে এমন! হেয়ার স্টাইল ওখান থেকে করাইনি। বেরিয়ে অন্য দোকানে চলে গেছিলাম। অন্য দোকানে যাওয়ার কিছুক্ষন পরেই দরজা ঠেলে ঢুকলো  নাক মুখসহ  আগাগোড়া  কালো বোরকায়  আবৃত দুই জন। বোরকার ঢাকা না খুলেই একজন হেয়ার ড্রেসারকে বলছে, " ইনি আমার মামী, এনার ভুরু ঠিক করি দ্যান"। ভাগ্নীর কথা শেষ না হতেই মামী বোরকার মুখ খুলে ফেলেছে। মামীটা খুব সুন্দর দেখতে। আমি দারুন চমৎকৃত হলাম।পারিবারিক চাপে হয়তোবা মামী  নাক মুখ ঢেকেই চলাফেরা করে, কিনতু সাজগোজের প্রতি নারীর দূর্বলতাই নারীকে এখানে এনেছে।

বিয়েতে গিয়েছি, মেয়ে বা মহিলাদের দিকে তাকিয়েও থেকেছি,  সকলের  আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে মনটা ভরে গেছে। কারো কারো সাজ খুবই পরিমিত আবার কারো মুখে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মেকাপ। এক সুন্দরী মেয়েকে দেখলাম, নীল জর্জেট শাড়ীর রঙ যতটা নীল, তার চেয়েও বেশী নীল মেয়ের চোখের পাতার মেকাপের রঙ। মেয়েটির দিকে তাকানো যাচ্ছিলনা। কিন্তু সবাই খুব আনন্দ করছে দেখে এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাইনি। ছেলেদের অনেককেই দেখি আমির খান স্টাইলে দাড়ি রাখে, দারুন স্মার্ট পাঞ্জাবী গায়ে সকলকেই ভালো লাগছিলো। আমি নিজেও মনের আনন্দে সেজেগুজে বিয়ে খেয়ে এসেছি। তবে আমি কোন বিউটি পার্লারে যাইনি, নিজের মত করেই সেজেছি। কালো চামড়া সাদা করিনি, মাথার চুলে কলপ দেইনি, তারপরেও মহানন্দে কাটিয়েছি।

একবার ভেবেছি বিউটি পার্লারে গেলে মন্দ হতোনা । ইদানিং বিউটি পার্লারের খুব রমরমা, ভীড় লেগেই থাকে, যখন ইচ্ছে গেলেই সব পাওয়া যায়না। লাইন ধরে বসে থাকতে হয়। বিয়ের কনেকে সাজাতে হলে ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার মত করে বিউটিশিয়ানের এপয়েন্টমেন্টও নিতে হয়। আমার মেয়ের খুব শখ ছিল একেবারে রবীন্দ্রযুগীয় মেকাপ নেয়া। পনের দিন আগে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়েছে। বিয়ের দিন আমার মেয়ে পার্লারে গেছিল চার ঘন্টা সময় হাতে নিয়ে। চার ঘন্টা পর পার্লার থেকে বের হয়েছে রবীন্দ্র নায়িকা হয়ে।


Thursday, July 5, 2012

বালিকার চেতনা!

আজকে গিয়েছিলাম উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার দাদা থাকেন ওখানে। আমার সাথে আমার দুই মেয়ে মিশা ও মিথীলাকেও নিয়েছিলাম। মিথীলা আমার ছোট মেয়ে, বয়সে এখনও বালিকা। ওদের নিয়ে দুই বছর পর পর দেশে আসি। নানা জায়গা ঘুরে বেড়াই। আমার ছোট মেয়েটা বাংলা বলতে পারে মোটামুটি ভালই, এতোদিনে পড়তেও শিখে যেতো। অনেক ছোটবেলাতেই মিথীলার বর্ণ পরিচয় হয়ে গেছিল। তারপরে আমি নিজে চাকুরী করা শুরু করতেই ওকে নিয়ে আর বসতে পারিনি। তবে মাঝে মাঝেই হুমকী ধমকী দেই। ওকে নিজে নিজেই বাংলা বই পড়ে পড়ে বাংলা চর্চ্চা রাখতে বলি। মুখের কথা মুখেই থেকে যায়, ছোট মানুষ সে, কতটুকুই বা চর্চ্চা করতে পারে কে জানে! পরখ করে দেখার জন্য আমি ওকে কমপিউটারের সামনে ডেকে বাংলা পত্র পত্রিকা থেকে কিছু কিছু পড়ে শোনাতে বলি। একটু সময় নেয় পড়তে, তারপরেও মিথীলা পড়তে পারে, বুঝি আমার হুমকী ধমকীকে এখনও ভয় পায়। এবার বাংলাদেশে এসেই মিথীলাকে বলে দিয়েছি, " তুমি বাংলাদেশে থাকতে থাকতে যদি বাংলা গড়গড়িয়ে পড়তে না শেখো, নেক্সট টাইম তোমাকে নিয়ে আসবোনা। আমি একা একা চলে আসবো"। ওর জন্য মারাত্মক হুমকী। কারন মিথীলা বাংলাদেশে আসতে পছন্দ করে, আরও বেশী পছন্দ করে আমার সাথে ঘুরে বেড়াতে। আমার এই হুমকী শুনে ও মুখে কিছু বলেনি, ভেতরে ভেতরে একটু ঘাবড়ে গেছে।
বাংলাদেশে এবার এসে ঢাকা শহরের ট্র্যাফিক জ্যাম দেখে ভড়কে গেছি। ৩০ মিনিটের রাস্তা গাড়ীতে করে যেতেও প্রায়ই দুই আড়াই ঘন্টা লেগে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে লাগে সাড়ে চার ঘন্টা। তবুও বের হচ্ছি প্রায় প্রতিদিন। সাথে থাকে মিশা ও মিথীলা। আমি গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ঢাকার জনজীবন দেখি। আমার ভালো লাগে। কত রকমের মানুষ, একেক জনের মুখের অভিব্যক্তি একেক রকম। মিশা কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে আইপডে গান শুনে আর বাইরে চোখ রাখে কোথা দিয়ে আমড়ার ঝুড়ি নিয়ে ফেরিওয়ালা যাচ্ছে। আমড়াওয়ালা দেখলেই ওকে আমরা কিনতে হবে। ধোওয়া ধুয়ির বালাই নেই, মরিচ লবন মিশিয়ে কচকচ করে আমড়াগুলো খায় আর মাথা দুলিয়ে গান শুনে। মিথীলা এমনিতেই শান্ত স্বভাবের। ও এভাবে রাস্তার জিনিস খাবেনা। ও খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। খাবার দাবারও না ধুয়ে খায়না। তাহলে গাড়ীতে ওর সময় কিভাবে কাটে? মিথীলা আমার মতই দুই চোখ জানালার বাইরে মেলে রাখে। কি ভাবে কে জানে! মাঝে মাঝে ওকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করি, " ঐ রিক্সার গায়ে কি লেখা আছে বলতো"। মিথীলা বলে, " মায়ের দোয়া"। একটা পারলে আরেকটা জিজ্ঞেস করি। ড্রাইভার সাহেব বলে উঠে, " আন্টিতো ভালই বাংলা পারে দেখি। এত কষ্ট কইরা বাংলা শিখা কি হইব? আন্টিতো আর বাংলাদেশে আইবোনা'। আমি বলি, " কে জানে, আসতেওতো পারে। পড়ালেখা শেষ করে এখানেই বড় চাকুরী করবে, সবার সাথে আরামে আনন্দে থাকবে"। আমি এসব কথা ইচ্ছে করেই বলি। মিথীলার চোখে একটা স্বপ্ন এঁকে দিতে চাই। এই যে আমার প্রচ্ছন্ন হুমকীতে একটু হলেও ভয় পেয়ে মিথীলা বাংলা চর্চ্চা করে যাচ্ছে, এতেই আমার আনন্দ।
আজকে গাজীপুর যাওয়ার পথে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়েছি। আমাদের সামনেই ছিলো একটা অটো। মিথীলা আমাকে ডেকে অটোর গায়ে লেখা 'স্কাইলাইন' শব্দটি দেখালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, " এই যে স্কাইলাইন লেখা আছে, দন্ত্য'স কে কি এভাবেই লিখে সব জায়গাতে"? আমি বললাম যুক্তাক্ষরগুলোতে এভাবেই লিখে। আমি কিনতু যুক্তাক্ষরকে মিথীলার সাথে যুক্তাক্ষরই বলি। এসব কঠিন শব্দ নিয়ে আগে থেকেই গল্পচ্ছলে কথা বলতাম। একটু পরেই মিথীলা জিজ্ঞেস করলো, "প্রগতি মানে কি"? বলে দিলাম প্রগতি মানে উন্নতি। এরপরেই এক ধমক দিলাম, " এই মেয়ে, তুমি আর কতকাল এই একটা দুটা করে শব্দ পড়ে যাবে? গড়গড়িয়ে পড়তে না পারলে কিনতু তোমাকে নেক্সট টাইম আমি সত্যি সত্যি আনবোনা"। মিথীলা বললো, " আমি মনে মনে সব পড়ি, শুধু যে শব্দের মানে জানিনা, সেটাই তোমাকে জিজ্ঞেস করি"।
গাড়ী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে গেলো। এই প্রথম খেয়াল করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার মুখেই সম্ভবতঃ তিনকোনা টাইপের একটি স্থাপত্য শোভা পাচ্ছে যার প্রথমটিতে বংগবন্ধুর মুখচ্ছবি খোদাই করে অংকিত আছে। কিছু না ভেবেই আমি মিথীলাকে জিজ্ঞেস করলাম, " মিথীলা বলতো এটা কার ছবি"?
মিথীলার জবাবঃ "শেখ মুজিবুর রহমান"।
আমিঃ " নামের আগে বংগবন্ধু বলতে হয়। তুমি কি জানো উনি কে ছিলেন"?
মিথীলাঃ " ঐ যে ফ্রীডম ফাইটের লীডার, মানে মেইন লীডার ছিল"।
আমি ভেতরে ভেতরে খুশীতে ফুটতে শুরু করেছি। আরেক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করলাম, " আচ্ছা একটু বুঝিয়ে বলো, ধরো আমেরিকার কোন লীডারের সাথে বংগবন্ধুকে তুলনা করা যায়"?
মিথীলার চটপট উত্তরঃ মার্টিন লুথার কিং"।
মিথীলার এই উত্তর শুনে সামনে বসে থাকা মিশা ঝট করে আমার দিকে তাকালো, দুজনেই চমৎকৃত হয়েছি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমার মাথায়ও আসেনি মার্টিন লুথার কিং এর নাম। মিথীলাকে প্রশ্ন করে আমি নিজেও খুঁজছিলাম আমেরিকান লীডারের নাম, যাঁর সাথে বংগবন্ধুকে তুলনা করা যায়"।
মিথীলার জবাব আমার মাথায় আটকে আছে। সত্যিইতো, মার্টিন লুথার কিং সংগ্রাম করেছিলেন কালোদের মুক্তির জন্য আর বংগবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন বাঙ্গালীর মুক্তির জন্য। মার্টিন লুথার কিং যেমন আততায়ীর গুলীতে নিহত হয়েছিলেন, বংগবন্ধুও তেমনিভাবেই আততায়ীর গুলীতে নিহত হয়েছিলেন। মিথীলার এর চেয়ে বেশী কিছু জানার কথা নয়। দুই বছর আগে মিথীলাকে নিয়ে ৩২ নাম্বার বাড়ীতে গিয়েছিলাম। সেদিন ঐ বাড়ীতে প্রধানমন্ত্রীর আসার কথা ছিল বলে আমরা ১৫ মিনিটের বেশী সেখানে থাকতে পারিনি। ঐ ১৫ মিনিটে যতটুকু দেখার এবং যতটুকু বুঝার তা মিথীলা বুঝে নিয়েছিল। সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতাটুকু দিয়েই ও দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েছে। আমি মিথীলার মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম। বারো বছর বয়সী ছোট্ট মিথীলা, যে দুই বছর বয়স থেকেই আমেরিকাতে বড় হচ্ছে, সেই মিথীলা বাংলা পড়তে পারে, বংগবন্ধুর প্রতিকৃতি দেখে চিনতে পারে, তার চেয়েও বড় কথা, বংগবন্ধুকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে (ছোট্ট করে হলেও), এর চেয়ে বেশী আর কি চাইতে পারি আমি! মিথীলা যেখানে থাকে, তার আশেপাশে কোন বাঙ্গালী নেই, যতটুকু শিখছে তার সবটুকুই ঘরে বসে, আমার হুমকী ধামকী খেয়ে। আমিও কি একটু গর্ব বোধ করতে শুরু করেছি? না, আমি গর্ব বোধ করছিনা তবে আত্মতুষ্টি বলে একটা ব্যাপার আছে, আমি সেটুকু অনুভব করছি। নাহ! মিথীলাকে নিয়ে আসতেই হবে। যতবার বাংলাদেশে আসবো, ততবার ওকে নিয়ে আসবো। তবে হুমকী ধামকী চালিয়ে যাবো।

Tuesday, June 26, 2012

সেদিনের কলিকাতা, এদিনের কলকাতা


কলকাতা ঘুরে এলাম। কলকাতা ভ্রমণ আমার জন্য নতুন কোন ঘটনা নয়। অনেক ছোটবেলা থেকেই আমি কলকাতা যাওয়া আসা করি। বলতে গেলে কলকাতা আমার 'সেকেন্ড হোম'। কারন আমাদের পরিবারের বেশ কিছু স্বজন '৬৪ সালের  পরেই তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে 'কলিকাতা' চলে গেছিলেন। আমার বাবা মায়ের সাথে আমরা আজ অবধি স্বদেশেই আছি। আগে আমার বাবা মা আমাদেরকে নিয়ে প্রতি দুই বছরে একবার কলিকাতা যেতেন। ওখানে গিয়ে আমরা আমাদের কাকাদের বাড়ীতে উঠতাম, কাকাত ভাই-বোনদের সাথে মিলে মিশে একটি মাস মহা আনন্দে পার করে দিতাম। '৭০ সালে আমরা প্রথম গিয়েছিলাম কলিকাতা। সেবারে আমার বাবা যেতে পারেননি, আমার মা, দাদু, দিদিমা, মাসীদের সাথে গিয়েছিলাম কলিকাতা নামের বিস্ময় নগরী দেখতে। বিস্মিত হয়েছিলাম ঠিকই। বয়স খুবই কম ছিল, তারপরেও 'গড়ের মাঠে' আমার তিন বছর বয়সী ছোট ভাই লাল টুকটুকে ফুলস্লীভ গেঞ্জী পড়ে দৌড়াচ্ছিল, ঘটনাটি মনে আছে। 'শোভা বাজারের 'পরেশনাথের মন্দির' দেখতে গিয়ে আমার তের বছর বয়সী বড়দা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে গিয়ে সব গুবলেট করে ফেলেছিল, সবাই মিলে খুব হাসাহাসি করছিল, এটাও মনে আছে। আরও মনে আছে চিড়িয়াখানা, যাদুঘর দেখার টুকরো টুকরো স্মৃতি। 'ইলেকট্রিক ট্রেন' দেখার প্রাথমিক উত্তেজনা, ট্রেন স্টেশানে ঢুকার অনেক আগে থাকতেই আমার মা আমাদেরকে সাবধান করতে থাকতেন, " সবাই দূরে থাক, নাহলে ট্রেনের বাতাসে উড়ে গিয়ে ট্রেন লাইনে পড়ে যাবে"। আমরাও দূর থেকে ট্রেনের  লাইট দেখার সাথে সাথে বড়দেরকে জাপটে ধরে রাখতাম। ট্রেনে উঠা ছিল আরেকটি মজার ব্যাপার। কী যে ভীড় লেগেই থাকতো ট্রেনে! আমাদের ছোটদেরকে কেউ না কেউ কোলে তুলে নিত, তারপরেই এক ধাক্কায় ট্রেনে উঠে পড়তো। ট্রেনে একবার উঠতে পারলেই শুরু হতো নাম ধরে ডাকাডাকি," মনা উঠছে? দেখতো মানিক, চঞ্চল উঠলো কিনা", এগুলো এখনও স্পষ্ট মনে আছে।

আমার প্রথম কলিকাতা যাত্রা ১৯৭০ সালে। '৭০ সালে গিয়েছিলাম মাসখানেকের জন্য বেড়াতে, আমার মা বই পড়ে পড়ে দর্শনীয় স্থানগুলো আগেই পরিকল্পনায় রেখেছিলেন বলেই একমাসে অনেক দেখেছি। দ্বিতীয়বার কলিকাতা গেলাম ১৯৭১ সালে।  '৭১ সালে অবশ্য বেড়াতে যাইনি,  গেছিলাম শরণার্থী হয়ে! আট নয় মাসের মত ছিলাম কলিকাতাতে। অন্য রকম সময়, অন্য রকম এক কাল কাটিয়েছি তখন। অবশ্য কলিকাতার মানুষের জীবনের দৈনন্দিন অভ্যাসে তেমন কোন পরিবর্তন ছিলনা। সেই একরকম ভাবেই ঘুম থেকে উঠেই বাদুরঝোলা হয়ে ইলেকট্রিক ট্রেন চেপে কাজে যাওয়া, অথবা ঘুম থেকে  উঠেই 'ঘুঁটে' দিয়ে কয়লার উনুন জ্বালানো, সারাদিন রাস্তাঘাটে মানুষের কোলাহল, চায়ের স্টলগুলোতে কয়লার উনুনে সারাদিন চায়ের কেটলীতে চা ফুটতো, বিকেল হতেই তেলেভাজা, আলুকাবলী, ঝালমুড়ি, ঘটিগরম, আলুর চপ, বেগুনী ভাজা হতো। ছোটবেলার স্মৃতিতে এগুলোই ধরা ছিল। '৭১ সালের আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে, ঐ সময় অনেকেরই চোখ লাল হয়ে এক ধরনের ইনফেকশান হতো (কনজাংটিভাইটিস) যার নাম দেয়া হয়েছিল 'জয় বাংলা'। কারো কনজাংটিভাইটিস হলেই বলা হতো "ওর জয় বাংলা হয়েছে"।, কলিকাতার অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে মিলে আমরাও বলতে শিখেছিলাম, " জয়বাংলার লোক ঢ্যাবা ঢ্যাবা চোখ'। আমাদের মায়ের কাছে একদিন খুব বকা খেয়েছিলাম এর জন্য। তারপর থেকে আর বলতামনা। সাত আট মাসে আমরা কলকাত্তাই বাংলা শিখে গেছিলাম প্রায়। 'খেয়েচি, গিয়েছি, এলুম গেলুম' টাইপ কথা। এরপরে দেশ স্বাধীন হতেই নতুন বাংলাদেশে ফিরে এলাম।

স্বাধীনতার পরে আমার ঠাকুরমাকে দেখতে আমরা দুই বছর পর পর কলিকাতা যেতাম একমাসের শীতকালিন ছুটিতে। আমাদের আনন্দের সীমা থাকতোনা। ইলেকট্রীক ট্রেন চড়া, আলো ঝলমলে কলিকাতা নগরী দেখা, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাওয়ার মজাই ছিল আলাদা। আর আত্মীয়-স্বজনদের আদর সমাদরতো ছিলই। আমরা ছিলাম ছোট ছোট। বাংলাদেশে তখনও রকমারী খাবার দাবারের চল শুরু হয়নি। ঢাকার মিষ্টির দোকানগুলোতেও রসগোল্লা, চমচম, রাজভোগ, কালোজাম, সন্দেশ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যেতোনা। 'কমলাভোগ, ক্ষীরভোগ, মিহিদানা, তালশাঁস, শোনপাপড়ি, জলভরা সন্দেশের নাম কলিকাতাতে গিয়েই প্রথম জেনেছি। চানাচুরের কত রকম বাহার যে ছিল। ঝাল চানাচুর যেমন ছিল, নরেশ কাকুর দোকানে মিষ্টি চানাচুরও পাওয়া যেত। দেশে থাকতেই আমরা পরিকল্পনা করতাম কলিকাতাতে গিয়ে কি কি খাব! দুই একটা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে মা নিয়ে যেত, আমরাও যেতাম  তবে 'অখুশী' মনে। কারন ঐ বাড়িগুলোর মালিক ধনী হলেও চায়ের সাথে শুধুই ব্রিটানিয়া থিন এরারুট বিস্কুট খেতে দিত। আরেকটা বাড়ীতে যেতাম খুব খুশী মনে। তারা স্বচ্ছল ছিলনা কিনতু আমাদেরকে 'মহিষের দুধ' এর রসগোল্লা খাওয়াতো। মহিষের দুধ দিয়েও মিষ্টি তৈরী হয়, এটা জেনেছি কলিকাতাতে গিয়ে। মাটির ভাড়ে করে চা বিক্রী হতো, রসগোল্লা আসতো মাটির ভাঁড়ে, রসের গুড় আসতো মাটির কলসীতে করে। আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত নিয়মিতভাবেই বাবা মায়ের সাথে কলিকাতা গিয়েছি। তখনই দেখেছি, কলিকাতার মেয়েদের স্বাধীন মুক্ত জীবন। কোন মেয়েকে সাথে ভাইকে পাহারা নিয়ে কোথাও যেতে দেখিনি। কত মেয়েকেই দেখেছি রাত নয়টা দশটার পরেও টিউশানি সেরে বাড়ী ফিরতে, মেয়েদেরকে দেখেছি পুরুষদের সাথে ঠেলা ধাক্কা দিয়েই ট্রেনে উঠতে, ট্রেনের দরজায় পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদেরকেও ঝুলে দাঁড়াতে দেখেছি।রাস্তা দিয়ে একটা ছেলে ও একটা মেয়েকে পাশাপাশি হাঁটতে দেখেছি সেই কবে থেকে! এগুলো দেখতাম আর মনে মনে বিস্মিত হতাম। এগুলো দেখে দেখেই বোধ হয় আমার মা বাবা মাঝে মাঝে আমাকেও রাস্তাঘাটে একা একা চলতে দিতেন। তবে বাংলাদেশে মেয়েদের জীবন এখনও অনেকটাই প্রাচীন নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা। কলিকাতার মেয়েরা পাড়ার ছেলেদের মতই কিছুটা মাস্তান গোছের আচরনও করতো। আমার কাকার মেয়েকে আমি কী যে ভয় পেতাম। সব সময় আমাদেরকে শাসাত, " বেশী ঘাঁটাবিনা আমাকে, ঘুষি মেরে নাক উড়িয়ে দেবো" টাইপ কথা বার্তা বলে।

আমার বিয়ের পরে কলিকাতা আর তেমন করে যাওয়া হতোনা। প্রধান কারন ছিল, আমার শ্বশুরবাড়ীর কেউ কলিকাতাতে ছিলেননা। তাছাড়া ততদিনে আমার ঠাকুমাও স্বর্গবাসী হয়েছেন। আমিও দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি, কলিকাতা যাওয়ার সময় পাইনি। কিনতু তখনও কলিকাতাকে আমার সেকেন্ড হোম মনে হতো, যেখানে আমার কাকা-কাকীমা, মামা-মামী, মাসী-মেসোর মত অতি আপনার জনেরা থাকতেন।  আমার সাথে সকলের যোগাযোগ ছিল, ফলে কলিকাতা নিয়ে আমার উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি কখনও। আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা থাকতেন উত্তর কলিকাতাতে। উত্তর কলিকাতাতে সাধারনতঃ পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীদের বসবাস। খুবই জনবহুল এলাকা এই উত্তর কলিকাতা, চারিদিকেই  বাঙ্গাল টানে কলকাত্তাই কথা শোনা যায়, অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট, চারিদিকেই কয়লার উনুনের ধোঁয়া, বাড়ীর বাউন্ডারীর ওয়ালে গোবরের ঘুঁটে, রাস্তায় সাইকেলের ট্রিং ট্রিং ঘন্টি, রিক্সার প্যাঁ পোঁ, প্যাঁ পোঁ হর্ণ শুনেই আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। দক্ষিন কলিকাতা হচ্ছে বড়লোকের ঠিকানা এমনটাই জানতাম। আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা বড়লোক ছিলেননা বলেই উত্তর কলিকাতার আশে পাশে থাকতেন। দক্ষিন কলিকাতাতে রাস্তা ঘাট প্রশস্ত, বাস ট্রামের সুব্যবস্থা আছে কিনতু কোথাও কোন হ য ব র ল ভাব নেই, রিক্সার এত বেশী প্যাঁ পোঁ শোনা যায়না, এমনটা জেনেই বড় হয়েছি। উত্তর কলিকাতার ট্রেনে উঠলেই পকেট সাবধানে রাখার নির্দেশ থাকতো। যখন তখন পকেটমার হয়ে যেতো। ট্রেনের কামরায় উঠার মুখেই জমাট ভীড়, নামার মুখেও জমাট ভীড়, পকেটমার হওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। আমার বিয়ের অনেক পরে আমি আমার বরের সাথেই গিয়েছিলাম কলিকাতাতে। বেলঘরিয়াতে নেমেছি ট্রেন থেকে, সাথে ছিল নেদারল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা দামী কাঁধ ব্যাগ। আমার বরের কাছ থেকে পাওয়া এমন অমূল্য রতনটিকে কাঁধে ঝুলিয়েই বের হয়েছিলাম। ট্রেনে ভীড় ছিলনা, কিনতু দরজার কাছে বরাবরের মতই কিছু যাত্রী দাঁড়ানো ছিল। ট্রেন থেকে নামতেই হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার ব্যাগটা লম্বালম্বি করে ছুরী জাতীয় কিছু দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। বুকটা ধ্বক করে উঠতেই ব্যাগে হাত দিয়ে দেখি দুই হাজার টাকার বান্ডিলটা একেবারে ভেতরের দিকে থাকায় রক্ষা পেয়েছে। কিনতু ব্যাগটিতো নষ্ট হয়ে গেলো!

২০০১ সালে আমেরিকা যাওয়ার পর থেকে প্রতি দুই বছরে একবার করে আমি বাংলাদেশে আসি। প্রতিবারই কলিকাতাতেও যাই দিন পনেরোর জন্য হলেও। সেকেন্ড হোম বলে কথা। গিয়ে একই দৃশ্য দেখি, পরিচিত দৃশ্য দেখে খুশী হই। অতীতকে ফিরে পাই, ছেলেবেলার দিনগুলোকে ছুঁতে পারি। এরপর হঠাৎ করেই একদিন জানতে পারলাম কলিকাতাকে আর কলিকাতা বলা যাবেনা।'কলিকাতা' থেকে নগরীটির নাম হয়ে গেছে কলকাতা।   আরো অনেক কিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। আনুমানিক ছত্রিশ বা সাঁইত্রিশ বছর ধরে  বাম রাজত্ব ছিল। ব্যতিক্রম ঘটেছে এবার। এবার রাজ্য সরকারের গদীতে আছেন আমাদের সেই বহুল আলোচিত মমতা দিদি। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জী। মমতা নামের সাথে মমতা জড়িয়ে থাকারই কথা, তবে বাংলাদেশের জনগনের জন্য তাঁর মমতায় ঘাটতি আছে। মমতা দিদির ব্যবহারে তাঁর প্রতি আমাদের ভীষন রকম অভিমান হয়েছে। তিস্তা বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সে অনুষ্ঠানে দিদি আসেননি। বাংলাদেশে তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য কত ঘটা পটা হয়েছিল, সবই বিফল হয়েছিল। সেই মমতা দিদির কলকাতাতে গিয়েছিলাম এবার।

মমতা দিদির কলকাতাতে গিয়ে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি। প্রথমেই বিস্মিত হয়েছি দমদম নেতাজী সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক এয়ার্পোর্টে পৌঁছে। খুবই সাদামাটা টাইপ বিমানবন্দর,  আলো কম চারদিকে, কাস্টমস অফিসারদের ব্যবহার কেমন চোয়ারে টাইপ। আমার স্মৃতিতে দমদম এয়ারপোর্টের অন্যরকম চেহারা ছিল। সবশেষ '৭৪ সালে আমরা বিমানে চড়ে কলিকাতা গিয়েছি। এরপর থেকে বাসে চেপে গিয়েছি। সাধারন মধ্যবিত্তের পক্ষে প্লেন ভাড়াটা সাধ্যের বাইরে মনে হতো বলেই কম পয়সার বাস সার্ভিস ছিল ভরসা। এবার অবশ্য প্লেনে গিয়েছি সকলের চাপে পড়্বে। সবার ধারনা, আমেরিকাতে থেকে থেকে আমাদের শরীর খুব আরামপ্রিয় হয়ে গেছে, তাই বাস জার্নির ধকল সইতে পারবোনা। যাই হোক প্লেনে চড়ে যাওয়াতেই পরিবর্তনটুকু চোখে পড়লো। সেই আলো ঝলমলে দমদম এয়ারপোর্টের বদলে নেতাজী সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির  সে কি ম্যারম্যরে চেহারা। তুলনায়  আমাদের শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি নেক বেশী সুন্দর! কত বড়, কেমন সাজানো গোছানো আলো ঝলমলে চারদিক। কাস্টমস অফিসারদের ব্বেযবহারও ভাল। আমাদের দেশের কাস্টমস অফিসারদেরকে মিডল ইস্ট থেকে আসা যাত্রীদের সাথে একটু খারাপ ব্যবহার করতে দেখেছি যা কিনা আমার কাছে পীড়াদায়ক মনে হয়েছে।  যাই হোক দমদম বিমান বন্দর থেকে বেরিয়েই অপেক্ষারত ট্যাক্সীতে গিয়ে বসলাম। গাড়ী বেশ ভাল গতিতেই চলতে লাগলো। মনে পড়ে গেলো, ২০০৩ সালে আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে ট্যাক্সী করেই ফিরছিলাম। গাড়ী আটকা পড়ে গেলো ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যে। গরমে সিদ্ধ হচ্ছিলাম, গাড়ী নড়েনা, মেয়ের সে কী চীৎকার! ও গরম সহ্য করতেই পারেনা। তাই এবারে ছোট মেয়েকে সাথে নেইনি। অথচ রাস্তায় কোন জ্যাম নেই। অবাকতো হবোই। পরদিন সকালের ট্রেনে চড়ে বেলঘরিয়া যাচ্ছিলাম। ট্রেন একেবারেই ফাঁকা ছিল, আমি তো আবারও অবাক হলাম।যত বাড়ীতে গিয়েছিলাম, রাস্তাঘাট ছিল সাজানো গোছানো। আগের সেই চির পরিচিত ময়লা আবর্জনার স্তুপ দেখিনি কোথাও। সকাল বা বিকেল, সব সময়ই এক রকম। এবারই প্রথম কয়লার উনুন জ্বলতে দেখিনি কারো বাড়ীতে বা দোকান বা রাস্তার মোড়ে। উনুনের ধোঁয়ার সেই পরিচিত গন্ধ পাওয়া হলোনা, আদি কলিকাতাকে মিস করেছি বর্তমান কলকাতাতে থেকে। মেজো মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের সাধারন কামরায় না উঠে লেডীজ কামরায় উঠেছিলাম। এখানে অবশ্য পেয়েছি সেই পরিচিত দৃশ্য।  অফিস ফেরত টাইমে ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে উঠতে গিয়ে চিঁড়ে চ্যাপ্টা হওয়ার যোগার হয়েছিল। কথিত আছে, লেডীজ কামরাতেই পকেটমার হয়। আমার ব্যাগে ছিল দামী ক্যামেরা, বেশ কিছু টাকা। কিনতু এবার কোন অঘটন ঘটেনি, বরং এক ভদ্রমহিলা আমাকে অনেক সাহায্যই করেছে।

ছয়দিন ছিলাম কলকাতাতে, রাস্তাঘাটে  আগেকার দিনের মত মানুষের ঠেলাঠেলি ছিলনা, অটোরিক্সা লাইন ধরে দাঁড়ানো থাকে, রিক্সাও লাইনে থাকতে দেখেছি। নতুন যা দেখলাম তা হচ্ছে, ট্রেন থেকে নেমেই যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা করে অটো বা একটা করে রিক্সা এসে থামবে যাত্রীদের সামনে, আগে আসা যাত্রীটি সুযোগ পাবে রিক্সাতে উঠার। বিদেশে বেড়ে উঠা আমার মেজো মেয়ে আমাকে বললো, " মা দেখো, ইন্ডিয়া যে এগিয়ে যাচ্ছে তার মস্ত বড় প্রমান হচ্ছে এমন ডিসিপ্লিন্ড হয়ে উঠা মানুষজন। কেউ আমি আগে যাব বলে ঠেলাঠেলি করছেনা! একজন যাত্রী ভুল করেই একটা রিক্সাতে উঠতে গেছিল, আমি দেখলাম রিক্সাওয়ালাটা তাকে না নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো অন্যজনকে তুলে নিল।" আরেকটি ভালো ব্যবস্থা হয়েছে মেয়েদের জন্য, মমতা দিদি ক্ষমতায় এসে শুধুমাত্র মেয়েরদের জন্য 'লেডীজ ট্রেন' চালু করেছেন। আমি বাংলাদেশের মেয়ে, মেয়েদের জন্য বিশেষ সুবিধা পেয়ে অভ্যস্ত, তাই লেডীজ ট্রেনের আইডিয়া আমার কাছে  খুব ভাল লেগেছে। রাস্তাতে কোথাও কোন দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাফিক জ্যাম হয়নি। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে তবে রাস্তাঘাটে কোন আন্দোলন হতে দেখিনি। গত ছয়দিনে কোন মিটিং মিছিল দেখিনি। হয়তোবা জনগন অনেক বেশী সচেতন হয়েছে। তারা নিজেরাও চেষ্টা করছে দেশটাকে, দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে।  একদিনের একটি ঘটনা মনে আছে। ট্রেনে চেপে শিয়ালদহ যাচ্ছিলাম। স্টেশানে নেমেই মাইকে যাত্রী সাধারনের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছিল, " কল্যানী লাইনে কন্সট্রাকশানের কাজ চলছে, যাত্রী সাধারনের সুবিধার জন্য  কল্যানী রুটে বাড়তি বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। আপনারা অত নাম্বার প্ল্যাটফর্মের গেইট ধরে বের হলেই বাস রেডী পাবেন" জাতীয় কথা। ছয়দিনে কলকাতা চষে বেড়িয়েছি।  চারিদিকে কন্সট্রাকশানের কাজ চলছে কলকাতাকে আধুনিক নগরী বানানোর উদ্দেশ্যে। ভোটের আগে দিদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কলকাতাকে আধুনিক নগরী বানাবেন। রাস্তাঘাটে আরেকটি জিনিসের উপর নজর পড়েছে আমার। চারিদিকে মমতা দিদির ছবি সংবলিত ফেস্টুন। মমতা দিদির হাত জোড় করা বিনম্র ভঙ্গীতে তোলা ছবিটি চারিদিকে শোভা পাচ্ছে। ছবিটি দেখে আমার মনে হয়েছে, জনগনের  নেতা নেত্রীদের ভঙ্গী এমনই হওয়া উচিত।

আমার খুব কাছের মানুষ, বয়সে তরুন তরুনীদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম মমতা দিদি সমপর্কে তাদের কি ধারনা। সকলের এক কথা, দিদি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন নাকি জনগনের কথা বেশী বলতেন, যখন তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়তেন, সরকারী অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তার উপর শুয়ে পড়তেন। এখন নাকি ক্ষমতায় গিয়ে আর কিছুই করেননা। নিজের দলের লোকের জন্যই তাঁর সকল দরদ, নিজের দলের ক্যাডারদেরকেই কাজ দেন, সন্ত্রাসীও যদি তাঁর দলের হয়, তাহলে সাতখুন মাফ। পুলিশ বাহিনী নাকি দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই প্রথম শুনলাম কলকাতায় মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, এমন কথা শুনে অবশ্যই আঁতকে উঠেছি। কলকাতার মেয়েরা কত স্বাধীনভাবে চলতে পারে, নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখতাম আর এক ধরনের ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতাম। সেই কলকাতায় মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা!  বিশ্বাস হয়নি আমার। ওদের বলেছি, "ছয়টা দিন মেয়েকে নিয়ে চষে বেড়িয়েছি সারা কলকাতা, কোন রকম অসঙ্গতি চোখে পড়েনি, কেউ শিস মারেনি আমার মেয়েকে দেখে, বাসে উঠতেই অনেকেই নিজের সীটটি ছেড়ে দিয়ে আমাদের বসতে দিয়েছেন।" এগুলো বলতেই পাশ থেকে  একজন বলে উঠলো, " এরা সবকটাই সিপিএমের ক্যাডার, তাই মমতার নামে অমন দূর্নাম ছড়াচ্ছে"।

অয়ন নামে একজনকে  আমি খুব ভালোভাবে চিনি, আমেরিকাতে ছিল বেশ কয়েক বছর, পিএইচডি করতে গিয়েছিল,  সে ছিল কট্টর 'দিদিপন্থী'। সে জোর গলায় দাবী করতো, একদিন মমতা ব্যানার্জী রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় আসবে।  তাকে অনেকেই ক্ষ্যাপাত এই কারনে। আমিও মনে মনে ভাবতাম, এটা কি কখনও সম্ভব হবে নাকি! কিনতু বাস্তবে তা ঘটেছে। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে, পরিবর্তন এসেছে।  অয়নের  সাথে এবার দেখা করেছি, দেখা হতেই তার কাছে জানতে চাইলাম দিদির রাজকার্য দেখে সে কতটা সন্তুষ্ট, তার কি মূল্যায়ন! সে বললো, " এক বছর খুবই কম সময় একজনকে মূল্যায়ন করার জন্য। ভালো বা মন্দ, কোনটারই মূল্যায়ন সম্ভব নয় এত তাড়াতাড়ি"। এটা খুবই সত্যি কথা। তারপরেও আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, দিদি কাজ করছেন। বেশ আন্তরিকভাবেই কাজ করে চলেছেন। সাথে যোগ হয়েছে জনগনের ব্যক্তি সচেতনতা। যদিও আমি আমার চির পরিচিত কলিকাতাকে দেখতে পাইনি,   আমার ছেলেবেলাকে পাইনি,  অতীতের ভালোলাগাকে ছুঁতে পারিনি, তারপরেও সেদিনের কলিকাতার পুরানো খোলস ভেঙ্গে  এদিনের নতুন কলকাতাকে দেখে এলাম। আমি খুবই ইমোশনাল, অতীতকে পাইনি বলে কষ্ট লেগেছে, তারপরেও ভালো লেগেছে ভেবে যে জনগনের নেত্রী জনগনকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনি তাঁর কথা রাখার চেষ্টা করছেন। আমাদের এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের সম্পর্কে বহুল প্রচলিত একটি ধারনা আছে, " যেই যায় লংকায়, সেই হয় রাবণ"! ক্ষমতায় যাওয়ার আগে নেতা নেত্রীরা জনগনকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে থাকেন, ক্ষমতায় যেতে পারলে নিজেরাই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং তড়িঘড়ি করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, জনগনের কথা বেমালুম ভুলে যান। মনে হয় মমতা দিদি বাংলাদেশের জনগনের প্রতি অবিচার করলেও নিজ দেশের জনগনের প্রতি দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করছেন।

Saturday, June 23, 2012

মনে হয় বাবা যেন বলছে আমায়, "আয় খুকু আয়'

কয়েক বছর আগে চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ' সঙ্গীত প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানে ছোট্ট মেয়ে তুবা গেয়েছিল, " চোখ মুছে মুখ তোল, স্নেহের বাঁধন খোল, এবার তোমায় দিতে যে হয় যাবার অনুমতি-----আমি যাচ্ছি বাবা'। গানটি অনুষ্ঠানে আগত অনেককে কাঁদিয়েছিল, আমাকে এখনও কাঁদায়। তিন মিনিটের গানটিতে গীতিকার ও সুরকার বাবা আর মেয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে না কেঁদে উপায় নেই। তাই আমিও কাঁদি। কান্নার ভেতর দিয়ে বাবাকে অনুভব করি। অনুভব করি জীবনে বাবার অস্তিত্বকে, অনুভব করি জীবনের স্বপ্ন সিঁড়ি তৈরীর কারিগরটিকে।

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ফাদার’স ডে উদযাপিত হয় মহা আড়ম্বরের সাথে। যদিও আমরা বিশ্বাস করি যে বাবা বা মায়ের জন্য আলাদা কোন দিন থাকা উচিত নয়, কারন আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের সাথে বাবা মা জড়িয়ে আছে, তারপরেও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অনেকটাই মাদার’স ডের পরিপূরক হিসেবে ফাদার’স ডে পালন করা শুরু হয়েছে। মা দিবসে মায়ের জন্য যতটা আবেগ, অনুভূতি, দরদ প্রকাশ করে নানা রকম আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে, বাবা দিবসে ঠিক ততটা না হলেও উৎসব আয়োজনে তেমন একটা কমতিও থাকেনা। বাবা দিবস আয়োজনের মধ্যে দিয়েই বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। অধিকাংশ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ‘ফাদার’স ডে’ পালিত হয়ে থাকে।

আমাদের এই উপ মহাদেশে বাবা দিবস অথবা মা দিবস নামে আলাদা কিছু ছিলনা। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, বছরের প্রতিটি দিনই বাবা এবং মা’ কে ঘিরে আমাদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-কল্পনা, ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না জড়িয়ে আছে। আলাদা করে বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে বাবা বা মা’কে নিয়ে সমস্ত কর্মকান্ড, হাসি উল্লাসের কথা আমাদের ভাবনাতে ছিলনা। মা দিবস বা বাবা দিবস উৎসবের শুরুটা হয়েছে পাশ্চাত্যের দেশগুলো থেকে। সূত্রমতে ১৯১০ সালে অফিসিয়ালি ফাদার’স ডে পালিত হয় আমেরিকার ওয়াশিংটন রাজ্যের স্পোকেন শহরের ছোট্ট এক বাড়ীতে। সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক তরুণী সর্বপ্রথম ফাদার’স ডে সেলিব্রেট করে ১৯১০ সালের ১৯শে জুন। সোনোরার বিপত্নীক পিতা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট তার ছয় সন্তানকে পরম মমতায় বড় করেছিলেন। মাতৃহীন সংসারে ‘সিভিল ওয়ার ভেটেরান’ পিতা উইলিয়াম স্মার্ট একাধারে বাবা ও মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোনোরা তাদের জীবনে বাবার ভূমিকাকে গৌরবান্বিত করার লক্ষ্যেই ‘ফাদার’স ডে’ সেলিব্রেট করার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা সকলের মাঝে প্রচারের জন্য সোনোরা প্রতিটি চার্চ, বিপনন কেন্দ্র, ওয়াই এম সি এ, অফিস-কাচারীসহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় যোগাযোগ করতে থাকেন। এভাবেই এক সময় তার এই প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৯১০ সালে প্রথমবারের মত ‘ফাদার’স ডে’ উদযাপিত হয়।

এরপর ১৯১৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসে জুনের তৃতীয় রবিবারকে ফাদার’স ডে হিসেবে ঘোষণা করার জন্য বিল উথথাপণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এবং ১৯২৪ সালে তৎকালীণ প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলী ‘ফাদার’স ডে’ বিলটি সমর্থন করেন। কিনতু দুইবারই কংগ্রেস কর্তৃক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। তারপরেও পরবর্তী আরও অনেক বছর ফাদার’স ডে বিলটি নিয়ে অনেক দেন দরবার চলে। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিনডন জনসন ফাদার’স ডে বিলটি আমলে নেন এবং কংগ্রেসে আলোচনার ঘোষণা দেন। ছয় বছর পরে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বিলটি সাইন করেন এবং এরপর থেকে ফাদার’স ডে জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হয়।

ফাদার’স ডে’ উপলক্ষ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে একমাস আগে থাকতেই সাজ সাজ রব উঠে। বাবাকে উপলক্ষ্য করে কত রকমের উপহার সামগ্রী দিয়ে বিপণী বিতানগুলো সাজানো থাকে। টি শার্টের গায়ে ‘লাভ ইউ ড্যাড’, ‘মাই ড্যাড ইজ মাই হিরো’ জাতীয় কতরকম আবেগী কথামালা লেখা থাকে। আমাদের দেশেও বাবা দিবসে নিশ্চয়ই নানা রকম উপহার সামগ্রীতে বিপনী বিতানগুলো ভরে উঠে। লাখ লাখ টাকার পন্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকাতে 'ফাদার'স ডে' উপলক্ষ্যে বিলিয়ন ডলারের উপহার বিক্রী হয়ে থাকে প্রতি বছর। উপহার দেয়া ছাড়াও এই দিনটিতে 'বাবা'কে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, মুভী দেখা, ফিশিং করতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়াসহ আরও কত কিছুর আয়োজন থাকে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নিজ বাবা ছাড়াও স্টেপ ড্যাড, ফস্টার ড্যাড, গডফাদার জাতীয় বাবা সম্পর্কিত সকলকেই সম্মান জানানো হয়। মাদার'স ডে বা ফাদার'স ডে উপলক্ষ্যে আমেরিকানদের উচ্ছাস, আনন্দ, আবেগের মধ্যে কোন অভিনয় থাকেনা। ওদের উৎসব আয়োজনে থাকে আন্তরিকতার ছোঁইয়া। দেখে মন ভরে যায়। প্রবাসীদের মনকেও তা ছুঁইয়ে যায়। আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তারা আবেগাক্রান্ত হই, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে দেশে ফোন করি, পরম মমতাভরা কন্ঠে বাবাকে বলি, " হ্যাপী ফাদার'স ডে বাবা'। ফোনের অপরপ্রান্তে 'ফাদার'স ডে' কালচারে অনভ্যস্ত বাবাটিও আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠেন। কোন উপহারের প্রয়োজন পড়েনা, সন্তানের গলার আওয়াজটি পেয়েই বাবা খুশী হয়ে উঠেন, চাপা গর্বে পাড়ার দোকানে হঠাৎ দেখা প্রতিবেশীকে ডেকে হয়ত বলেন, " আজকে মেয়ে ফোন করেছিল, ফাদার'স ডে জানালো"। এইই হচ্ছে বাবা। বাবা তো এমনই হয়!


বাবা শব্দটিতে কত মাধুর্য্য, কত নির্ভরতা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মেয়ে 'মা' হতে পারে। কিনতু প্রায় প্রতিটি পুরুষ 'বাবা' হতে পারেনা। সন্তান জন্ম দিলেই একটি মেয়ে 'মা' হয়ে উঠে, কারন প্রকৃতিই তা নির্ধারণ করে দেয়। মায়ের নাড়ীর সাথে সন্তানের যোগ থাকে বলেই 'মা-সন্তানের' সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, অটুট। বাবার ক্ষেত্রে তা হয়না। সকল জন্মদাতাই পিতা বা বাবা হতে পারেনা। আর তাই পৃথিবীতে হতভাগ্য কোটি কোটি শিশু মায়ের নাম জানলেও তার 'বাবা'র পরিচয় জানেনা। কারন হতভাগ্য কোটি শিশুর জন্মদাতা বীরপুরুষেরা মনের আনন্দে অথবা খেলাচ্ছলে্‌ কখনওবা বিকৃত উল্লাসে নির্দ্বিধায় শিশুগুলোকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে, কিনতু তারা কেউ 'বাবা' হতে চায়না। তারা আনন্দ-ফূর্তি করতে রাজী আছে, যে কোন সময় অসহায় নারীকে বলাৎকার করতে প্রস্তুত থাকে, কিনতু ক্ষনিক আনন্দের ফসলটিকে ঘরে তুলতে চায়না, অনেক ক্ষেত্রেই তারা জানতেও পারেনা তাদের ক্ষনিক আনন্দের প্রাপ্তিটুকু নিয়ে অসহায় এক নারী কি বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে! রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, দেশে দেশে যুদ্ধ হয়, আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবে কিছু মানব সন্তানের জন্ম হয়, যাদেরকে বলা হয় 'যুদ্ধশিশু'। সেই সমস্ত শিশুর 'বীরাঙ্গনা মা' থাকে, 'বাবা' থাকেনা। 'পতিতালয়' নামক সমাজের আরেকটি অংশে প্রতিদিনই শিশুর জন্ম হচ্ছে, যাদের শুধু মা থাকে, বাবা থাকেনা। পশ্চিমা দেশগুলোতে মা ও শিশু থাকে, 'বাবা' থাকেনা। এইজন্যই বলা হয়, জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায়না, 'বাবা' হতে হয়। অনেক ত্যাগ তিতীক্ষা, অনেক পরিশ্রম, অনেক দায়িত্ববোধ, বিশাল হৃদয়, অকৃত্রিম ভালোবাসা, অশেষ স্নেহ জড়ানো থাকে 'বাবা' হয়ে উঠার পেছনে। এমন কঠিন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যে মানুষটি সংসারে আবির্ভূত হয়ে থাকেন, সংসারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকেন, 'সংসার নৌকা'র হালটি ধরে রাখেন, যেই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন ও স্বপ্ন দেখান, সেই মানুষটিই আমাদের 'বাবা'। সেই বাবাটিকে বছরের প্রতিটি দিনই আমাদের জীবনে প্রয়োজন, আর আমাদের প্রয়োজন একটিমাত্র দিন, যেদিনটিতে আমরা 'বাবা'দের 'বাবাত্ব'কে সম্মান করতে পারি, বাবাত্বের মহত্ততাকে নত মস্তকে স্বীকৃতি জানাতে পারি, সন্তানের কাছে বাবার যতখানি প্রাপ্য, তার কিঞ্চিৎ অংশটুকুও দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। এইজন্যই একটি বাবা দিবস দরকার, এবং 'বাবা দিবস' এর প্রয়োজন আছে।

কিশোরীবেলায় শোনা হেমন্ত মুখার্জী ও শ্রাবন্তী মজুমদারের দ্বৈতকন্ঠে গাওয়া গান, " মনে হয় বাবা যেনো বলছে আমায়, আয় খুকু আয়" এখনও আমাকে কাঁদায়। আমার সত্যি সত্যি মনে হয় আমার বাবা আমাকে পেছন থেকে ডেকেই চলেছেন, আমার যে কোন প্রয়োজনে বাবা যেনো আমাকে এখনও সাহস দিচ্ছেন, ভরসা দিচ্ছেন। মা’কে নিয়ে কত কাব্য রচিত হয়েছে, কত গীত রচিত হয়েছে বহুকাল আগে থেকে। কিন্তু বাবাকে নিয়ে তেমন করে কাব্যগাঁথা রচিত হয়নি। তাই বলে 'বাবা'রা কি থেমে আছেন! বাবা নামের জীবন নৌকার মাঝিটি কিনতু শক্ত হাতে নৌকার হালটি ধরেই আছেন। আজকের এই দিনে পৃথিবীর সকল বাবাকে সম্মান জানাই। সকল বাবার জন্যই আমাদের ভালোবাসা।

Thursday, June 14, 2012

পঁচিশ মিনিটের বাসযাত্রায়!

কলকাতা বেড়াতে এসেছি ছয় দিনের জন্য। সাথে নিয়ে এসেছি মেয়ে মিশাকে। কারন একমাত্র মিশা যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। যেমন কলকাতাতে এখন দারুণ গরম। এই গরমে কোন প্রয়োজন ছাড়া আমার অন্য মেয়েরা বাইরে বের হবেনা, কিনতু মিশা ব্যতিক্রম। তাই মিশাকে নিয়ে বেড়াতে এসেছি।

গতকাল গিয়েছিলাম জোড়াসাঁকো। আজ যাচ্ছি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও গড়ের মাঠ। সকালবেলাতে মাসীর বাড়ী থেকে রওনা দিয়েছি। মাসীর বাড়ী থেকে ২৩৭ নাম্বার বাসে চড়ে বাগুইহাটি যাওয়ার কথা। বাগুইহাটিতে থাকে আমার কাকীমা। কাকাত ভাই দীপকে তুলে নেওয়ার কথা। দীপ ডকুমেন্টারী ফিল্ম তৈরী করে। ওকে সাথে নিয়ে গেলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে বলেই ওর কাছে এসেছি। বাসে উঠেই দুটি খালি সীট পেয়েছি। যাত্রা শুভ ধরে নিয়েছি। কারন কলকাতার বাসে বাঁ ট্রেনে উঠে বসার সীট পাওয়ার কথা ভাবাই যায়না। বাসে উঠে মা আর মেয়ে বসতেই বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। দেড় মিনিট বাদেই একটি স্টপে বাস থেমেছে, এক ঝাঁক মানুষ সাথে সাথেই বাসে উঠে গেছে। আমার ঘাড়ের উপর এসে দাঁড়িয়েছে কয়েকজন। এসবই আমার চেনা দৃশ্য। হঠাৎ করেই নারীকন্ঠে এক আর্তনাদ শুনলাম, " ওরে বাবারে! দিয়েছে, দিয়েছেরে!! আমার চোখটা গেলে ফেলেছে। ও মাগো! গেলুমরে গেলুমরে! পাশ থেকে মেয়েটির স্বামী একটি রুমাল এগিয়ে দিল, " একটু গরম স্যাঁক দাওতো,   স্যাঁক দাও। ব্যথা কমে যাবে'খন।"। বউটি স্বামীর দিকে ফিরেও তাকালোনা।

আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই দেখতে পেলাম মেয়েটিকে। কম বয়সী এক বউ, একহাতে বাম চোখটিকে চেপে ধরে চেঁচিয়েই চলেছে। মেয়েটি দেখতে খারাপ না, পরনে ছিল হালকা গোলাপী রঙের সূতীর শাড়ী। খুব সুন্দর করে গুছিয়ে পড়েছে শাড়ীটিকে। দেখে মায়া লাগল। কিনতু মেয়েটি যেমন করে উঃ আঃ করছিল, আমার কাছে একটু অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছিল। ের মধ্যেই মেয়েটি ঘাড় ঘুড়িয়ে আসল কালপ্রিটের দিকে তাকিয়েই মুখ ঝামটে উঠলো, " বাসে উঠে হাতটাকে একটু সামলে চলতে পারেননা? যত্তসব বেয়াক্কেলে লোক এসে জুটেছে। আমার চোখটাকে গেলেই ফেলেছেরে! এমনিতেই গরমে আমার মাথাটা ভারী হয়ে আচে, তাঁর উপর অমন গুঁতো! উঃ আঃ " এভাবে চলছিল। লক্ষ্য করলাম 'কালপ্রিট' টি শান্তশিষ্ট, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোষাকে এক ভদ্রলোক। বউটির আক্রমনে ভদ্রলোক মুখটি আড়াল করে সরে গেলো।

পরের স্টপেজে আরও কিছু যাত্রী উঠলো। তাদের মধ্যে জীনস ও টপস পরা এক তরুনী ছিল। মেয়েটি বললো, " আমাকে একটু ভেতরে যেতে দিন।' বলেই যেই না মেয়েটি ভেতরের দিকে ঢুকতে লাগলো, সেই বউটি চেঁচিয়ে উঠলো, " একটু থামুননা, অত ঠেলা ধাক্কা করার কি হয়েচে! আমি বুঝি ব্যথায় মরে যাচ্চি"। জীনস পরা মেয়েটি জবাবে বললো, " আমিতো আগে থেকেই বলে নিয়েছি। অত চেঁচামেচি করার কি হলো। আমিতো ইনফর্ম করেছি'। ধ্যাতানি খেয়ে বউটি এই বেলা আর কিছু বললোনা।  ের মধ্যেই বউয়ের স্বামীটি বসার জন্য একটি সীট পেয়ে যেতেই বসে পড়ে বউকে ডাকলো, " ওগো, তোমার হাতের ব্যাগটা আমাকে দিয়ে দাও। শুনছো, ব্যাগটা আমাকে দাও"। বউটা এবারেও ফিরে তাকালোনা। আমার মনে হলো, আজ সকালেই বউটির সাথে তাঁর স্বামীর খুব একচোট হয়েছে। স্বামী বেচারা তাঁর কাফফারা দিয়ে চলেছে।

আমার উপর দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের চাপ বাড়ছিল। আমি আমার মেয়ের উপর ঝুঁকে পড়ছিলাম। মেয়ে আবার আমাকে ধমকাচ্ছিল, " এই গরমের মধ্যে তুমি আমার উপর হেলে পড়ছো কেন"?। বললাম, " বউটা আমার উপর পড়ছে। এমনিতেই বউটা ক্যাঁ কোঁ করছে, এখন যদি আমি ওকে সরতে বলি, আবার আমার উপর ক্ষেপে যাবে। থাক, একটুক্ষন সয়ে যাওয়া ভালো"। বলে শেষ করতেই আমার পেছনের সীট থেকে এক কর্কশ কন্ঠের চীৎকার শুনলাম। কর্কশ কন্ঠ বলছিল,"  এই তোমার কান্ডটা কি শুনি? তকন থেকে ফোন বেজে চলেচে, ফোন ধরার নাম নেই? কি করচিলে শুনি! তোমাকে বলেচিলুম ফোনে টাকা ভরতে। ভরেচিলে? কত ভরেচো শুনি! ৫০ টাকা ভরতে বলেছি, আর তুমি খচ্চর দিয়েচো তিরিস টাকা। কেনো তিরিস দিলে? শালা সয়তান কোতাকার! এই রেকে দিচ্ছি ফোন" বলেই ফোন অফ করে দিল।

আমার স্টপেজ কাছে চলে আসতেই ভাই দীপ আমাকে ফোন করে জানতে চাইলো, আমরা কোথায় আছি। আমি এখানের কিছুই চিনিনা। আরেক ভাই টুংকা বাসে তুলে দিয়ে বলেছিল, জোড়া মন্দিরের সামনে নামতে। আমি কিছু বলতে পারছিলামনা বলে দীপ জিজ্ঞেস করলো, " তোমার আশেপাশে কি দেখছো বলো"। বাসটা থেমেছিল একটি ময়লা আবর্জনার বিশাল এলাকার পাশ ঘেঁষে। আমি বললাম, "আমার পাশে ময়লা আবর্জনা দেখতে পাচ্ছি'। এটা শুনেই মিশা এক ধমক দিলো, " এটা একটা কথা হলো? ময়লা আবর্জনা দেখছি বলছো কেনো? বলো বিগ বাজার ছাড়িয়ে জোড়া মন্দিরের কাছে এসেছি"। আমি বলার আগেই বাস জোড়া মন্দিরের কছে চলে এলো, কন্ডাক্টর খুব যত্ন করে আমাদের মা মেয়েকে স্টপে নামিয়ে দিলো। বাস থেকে নেমেই পেয়ে গেলাম দীপকে। দীপের সাথে রওনা দিলাম।

Wednesday, May 30, 2012

প্রচন্ড গরম, যানজট, ধূলিবালি তবুও এ আমারই দেশ!!

আমরা যারাই প্রবাসে থাকি, দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সুখের সীমা নেই! চারিদিকে বিলাস-ব্যসনের ছড়াছড়ি, গাড়ী-বাড়ীর ঠাট-বাট, অফুরন্ত খাবার-দাবার, কোনকিছুর অভাব নেই। বাতাসে ধূলিবালি নেই, রাস্তায় যানজট নেই, বাতাসে গাড়ীর কালো ধোঁয়া নেই, রাস্তা ঘাটে পথচারী নেই, ভিখিরী নেই, চোরের উপদ্রব নেই, গরমে ঘামাচি হয়না, শীতে হাত পায়ের চামড়া ফাটেনা সবেতেই এক ধরনের নিশ্চিন্ততা! প্রবাসে রাজনীতি নেই তাই পথে ঘাটে গরম গরম বক্তৃতা বিবৃতি নেই, বিরোধী দল আছে কিনতু হরতাল নেই, সরকারী দল থাকলেও সরকারী দলের দাপট নেই, হরতাল নেই, জ্বালাও পোড়াও নেই, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশান জট নেই। বেকারত্ব আছে তবে বেকার ভাতাও আছে, কেউ না খেয়ে থাকেনা। মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে নিয়ে গেলে আগে চিকিৎসা পরে অন্যকথা, গরীব রোগীদের জন্য সরকারী অনুদান বা ফ্রী চিকিৎসাসহ সবই আছে।
প্রবাস জীবনে সবই আছে অথচ কিছুই যেনো নেই! সুখ আছে স্বস্তি আছে, শুধু শান্তি নেই। সারাটাদিন বিদেশী ভাষায় চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা, খাওয়ার সময় তিনবেলা হাত দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার বদলে ছুরী কাঁটা চামচে আওয়াজ না তুলে স্যানডুইচ, স্টেক খাওয়া, মা বাবাকে দেখতে হলেই স্কাইপে যাওয়া, বৃষ্টির দিনে বন্ধুদের সাথে চা মুড়ির আড্ডা মিস করা, রবীন্দ্র জয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের আনন্দ মিস করা--কাহাতক ভালো লাগে! আমার ভালো লাগেনা! আমার ভালো লাগেনা বলেই আমি বার বার ফিরে আসি। কষ্টের উপার্জন থেকে একটু একটু করে সঞ্চয় করি, অপেক্ষায় থাকি কখন আমার সঞ্চয় ফুলে ফেঁপে উঠবে, কখন আমি অনায়াসে প্লেনের টিকিট কাটতে পারবো! নতুন গাড়ীর বদলে পুরানো গাড়ী চালাই, সাধারন মানের বাড়ীতে থেকেই খুশী থাকি। ডায়মন্ড বসানো আংটি কিনিনা, ডলার জমাই আর দিন গুনি, মাস গুনি, এরপর বছর গুনি। দুই বছর শেষ হতেই বাক্স প্যাঁটরা গোছাতে শুরু করি। পরিবারের সকলকে নিয়ে রওনা দেই দেশের পথে।
আমি থাকি আমেরিকাতে। দেশে আসি সামারের ছুটিতে। কারন সামারেই বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। তাছাড়া এত পয়সা খরচ করে দেশে এসে দুইটা মাস অন্তঃত না থাকতে পারলে ভালো লাগেনা। দেশে আসার সময় আমাকে কয়েকবার ফ্লাইট পাল্টাতে হয়, সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। ফলে একদিনের পরিবর্তে দুই দিন লাগে দেশের মাটি স্পর্শ করতে। প্লেনের ভেতরের হিমঠান্ডা পরিবেশের মধ্যে থেকেই জানালার কাঁচে মুখ লাগিয়ে রেখে বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করতে থাকে আমার মত কিছু ক্ষ্যাপাটে বাঙ্গালী। মিডল ইস্ট থেকে আসা বাংলাদেশের ছেলেপেলেদের জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য শুনতে কি যে ভালো লাগে! দেশের টান এমনই এক জিনিস যে আকাশের উপরে থেকেই তারা প্রবাসী জীবনের কষ্টগুলোর সাথে দেশে থাকার সুখ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় মেতে উঠে। কি যে ভালো লাগে শুনতে যখন কেউ একজন বলে উঠে, " মরুভূমিতে থাইক্কা থাইক্কা আরব বেডাদের অন্তরটাও মরুভূমি হইয়া গেছে। আমরার দেশে যেই বিষ্টি হয়, তার অর্ধেকও যদি হেই দেশে হইত, তাইলেই বাঙ্গালীগো মত মনডা নরম হইত"। এমন জ্ঞানের কথা একবার বলে আর মোটা কাঁচের জানালা দিয়ে চোখ ভরে দেখার চেষ্টা করে বাংলার শোভা। জানালার মোটা কাঁচ ভেদ করে কি আর বাংলার রূপ দেখা যায়! বাংলার রূপ দেখতে হলে বাংলার মাটিতে নামতে হয়। ওদের সাথে সাথে আমিও বাংলার মাটিতে নেমে আসার অপেক্ষায় থ্যাকি।
বিমান শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথেই আমার সহযাত্রীরা বিমানের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করেই সীট বেল্ট খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে আর দেশী স্টাইলেই হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয় লাগেজ নামানোর জন্য। বিমানবালারা এগিয়ে আসেন এই যাত্রীদেরকে আবার সীটে বসিয়ে দেয়ার জন্য। তখন ছেলেপেলেদের মুখে চোখে ফুটে উঠে এক ধরনের সারল্যমাখা হতাশা সকলের আগে নামতে না পারার দুঃখে। কি যে ভালো লাগে এমন সব দৃশ্য দেখতে। প্রাণভরে আমি দেখি। এরপরে বিমানবন্দরের ভেতরে ইমিগ্রেশানের লাইনে দাঁড়ানোর যে প্রক্রিয়া থাকে সেখানে দেশী পাসপোর্ট আর বিদেশী পাসপোর্টের আলাদা লাইনের দিকে না তাকিয়ে কিছু কিছু যাত্রী বিদেশী পাসপোর্টের লাইনেই হয়ত দাঁড়িয়ে যায় তাড়াতাড়ি বের হতে পারবে আশায়। সেখানেও তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়, পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশী পাসপোর্টধারীদের লম্বা লাইনে। ওদের মুখটা করুন হয়ে উঠে, আমার মনটা খারাপ হয়। ওদের জন্য মমতা বোধ করি।
আমি আমাকে নিতে আসা গাড়ীতে উঠার সাথে সাথেই ড্রাইভার সাহেব থেকে শুরু করে সকলেই খুব সচেতন হয়ে পড়ে আমার সুখ সুবিধার কথা চিন্তা করে। যেন আমাদের গরম না লাগে, যেন আমাদের খাওয়া দাওয়াতে কোন রকম অসুবিধা না হয়! আমি খুবই বিব্রত বোধ করি আমাদের জন্য সকলকে এমন উতলা হতে দেখে। আবার ভালো লাগে যখন ভাবি এইতো আমার দেশ, এইতো আমার কৃষ্টি। এটাইতো হওয়ার কথা। বাঙ্গালী অতিথিপরায়ণ জাতি। আমাদের জীবনে অভাব আছে, দুঃখ আছে, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ আছে, কিনতু তারপরেও আমাদের সকলের হৃদয়ের গভীরে সকলের জন্য মমতা আছে, টান আছে। এই মমতাবোধই আমাদেরকে এখনও হাজার হাজার মাইল দূর থেকে, বিলাসী জীবনের মোহ থেকে বার বার টেনে নিয়ে আসে। সুখী জীবনে অভ্যস্ত আমার মেয়েরা প্রতি বছর দেশে আসতে চায় শুধুমাত্র এই ভালোবাসা, আদর, স্নেহ মমতা পাওয়ার জন্য। কি প্রচন্ড গরম এখন বাংলাদেশে, আমাদেরকে নিয়ে সকলেই তটস্থ, আমাদের আরামের জন্য সকলেই খুব চিন্তিত! আর আমরা? আমরা থোড়াই কেয়ার করছি এই গরম, ট্র্যাফিক জ্যাম, ধূলা বালি, মানুষের কোলাহল! আমরা মহা আনন্দিত এই কোলাহলের মধ্যে থেকে। যতই কষ্ট লাগুক তারপরেও একটা অনুভূতিই কাজ করে চলেছে, " দীন দুঃখিনী মা যে আমার এর বেশী তার সাধ্য নাই"। এইতো আমার দেশ, এই আমার ঠিকানা!

Saturday, May 19, 2012

দেশে যাওয়ার পথে পথে-(পর্ব ২)

আগের পর্বে আমি ২০০৬ সালের দেশযাত্রা নিয়ে অল্প-বিস্তর লিখেছি। আসলে আমি যদি ঘুণাক্ষরেও জানতাম যে জীবনের একটা পর্যায়ে আমি লেখালেখি শুরু করবো, তাহলে আরও অনেক পুংখানুপুঙ্খরূপে লিখতে পারতাম। যাই হোক ২০০৬ সালে দেশে গিয়েছিলাম পরিবারের পাঁচজন মিলেই। তারপর দেশ থেকে ফিরে এসেই খাতা কলম নিয়ে বসে গেছি, প্রথমে বছর গুনি, পরে মাস গুনি, তারপরে দিন গুনতে গুনতেই ২০০৮ সাল চলে এসেছে। ২০০৮ এ আমার স্বামী যাননি। আমি আর আমাদের তিন মেয়ে গেছিলাম দেশে। ঐ বছর আমাদের বড় মেয়ে  মৌটুসী কলেজ গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে, মেজো মেয়ে মিশা স্কুল গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে। দুই মেয়ের গ্র্যাজুয়েশান উপলক্ষে আমরা এখানে গ্র্যাজুয়েশান পার্টি করেছিলাম। ৭০ জন অতিথিকে নিমন্ত্রন করেছিলাম এবং নিজে হাতে সব রান্না করেছিলাম। ধান ভানতে শীবের গীত গাইছি, কারন অবশ্য একটা আছে। আমাদের দেশে যাওয়ার দিনটি ছিল পার্টির ঠিক পরের পরের দিন। আমিতো পার্টির আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, সাথে দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি।

এবারেও চার পাঁচ মাস আগে থাকতেই শপিং শুরু করেছিলাম। এত আগে শপিং করার একটাই কারন, আমেরিকাতে একেকটা অকেশানে 'সেইল' দেয়। আমার মত অতি সাধারন আয়ের মানুষের পক্ষে রেগুলার দামে জিনিস কেনা কঠিন। কারন আমি শুধু নিজের পরিবারের জন্য গিফট কিনিনা,  মায়ের প্রতিবেশী, মায়ের পরিচিত জন, নিজের আত্মীয় স্বজনদের কথাও মাথায় রাখি। দেশে গেলে মাঝে একবার ইন্ডিয়াতে যাওয়ার চেষ্টা করি। ফলে তাদের জন্যও ছোটখাট জিনিস কিনি। আমার ভালো লাগে প্রত্যেককে কিছু না কিছু দিতে। সেজন্যই 'সেইলে'র অপেক্ষায় থাকি। শ্যাম্পু, লোশান, সাবান এগুলোর যা ওজন হয়, আমাদের চার দ্বিগুনে আট লাগেজের প্রত্যেকটাই ওভারওয়েইট হয়ে যায়। তা সেবারও আট লাগেজের অবস্থা কাহিল দেখে আমি নিজেই কাহিল হয়ে পড়েছি। পার্টির কারনে আগের সাত দিন বিশ্রাম পাইনি, পার্টি শেষে সব গুছিয়ে, বরের জন্য রান্না করে খাবার ফ্রীজ করে দিয়ে এর ফাঁকেই লাগেজ তৈরী করা কি যে কঠিন, তা আমি সেবার টের পেয়েছিলাম।

যেদিন রওনা হলাম, আমাদের বিরাট টয়োটা ভ্যানে সবগুলো লাগেজ চাপিয়ে পাঁচজনতো গাড়ীতে উঠে বসলাম। আমার স্বামীই এবার আমাদেরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করেছে। এবার একটা মজার ব্যাপার ছিল। আমাদের সাথে আমাদের আরেক বন্ধু পিংকীও রওনা দিয়েছিল। পিঙ্কীরা  তখন আমাদের শহরে নতুন এসেছে। কলকাতার মেয়ে, আমাদের পুরো ফ্যামিলির সাথেই ওদের খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। পিঙ্কী এয়ার ইন্ডিয়া বা লুফথানজা'তে টিকেট না কেটে শুধু আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য 'এমিরেটস'এর টিকিট কেটেছে। আমরা ২০০৮ এ এমিরেটস এ গিয়েছিলাম। আমরা যার যার গাড়িতে করে বার্মিংহাম এয়ারপোর্টে পৌঁছেছি। পিঙ্কী খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিল, কারন ওর বর সব্যসাচী  খুব গুছানো মানুষ। ওর বরই ওর লাগেজ ওজন টোজন করে দিয়েছে। আমার বরও গুছানো, কিনতু আমার অবিবেচনার কাছে সকল গুছানো মানুষের হার মানতে হয়। এয়ারপোর্টে নেমেই হঠাৎ করে খেয়াল হলো আমার বড় মেয়ে মৌটুসীর হাতের ঘড়িটা কোথাও পড়ে গেছে। শুরু হলো আমার মাথা গরম হওয়ার প্রথম ধাপ। আমার চেহারার দিকে তাকিয়েই পিঙ্কী দৌড়ে গিয়ে রাস্তার উপর থেকে ভেঙ্গে যাওয়া ঘড়ি নিয়ে এসে আমাকে শান্ত হতে বললো। আমি দাঁত কিড়মিড় করেই থেমে গেলাম।

লাগেজ নিয়ে চেক ইন এ ঢুকেই মিশার ডাক পড়লো। মৌটুসী পাশেই মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে মনে একটু কষ্টও লাগছিল, কিনতু আমার তখন শিরে সংক্রান্তি। নিজের চোখেই দেখলাম পিঙ্কীর লাগেজ কি সুন্দর করে ঠিকঠাকভাবে বেল্টে চলে গেলো। আমি জানতাম আমার লাগেজ আটকাবে। মিশাকে বললাম, " মিশা , আমার ভয় লাগছে। তুই ঐ কালো ছেলেটার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়া। কালো ছেলেগুলো খুব ভালো হয়। ওরা বেশী ওজন দেখলেও কিছু বলবেনা। একটু সুন্দর করে হাসি দিয়ে কথা বলবি, দেখবি আমাদের লাগেজ ঠিকঠাক বেল্টে চলে গেছে"। আমার মিশা মেয়ে সাথে সাথে হাসতে হাসতে জোরে জোরে বলতে শুরু করলো, " এই তোমরা কি কখনও কোন মা'কে বলতে শুনেছো, মেয়েকে বলছে ফ্লার্ট করতে। আমি নাকি ঐ কালো ছেলের কাছে গিয়ে হাসি দিলেই আমার লাগেজ ক্লীয়ার করে দিবে"। ব্যস, পিঙ্কী শুরু করে দিল হাসি। হাসি সংক্রমিত হতে শুরু করলো। মিশা কালো ছেলের কাউন্টারেনা গিয়ে এক সাদা মহিলার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালো। আমার তখন বিপর্যস্ত অবস্থা। প্রতি লাগেজে পঞ্চাশ পাউন্ড এলাউ করে। আমার দ্বিতীয় লাগেজের ওজন হয়েছে আটান্ন পাউন্ড। বেল্ট থেকে ফিরে এসেছে। আরেকটার ওজন হয়েছে আটচল্লিশ পাউন্ড। এবার সাদা মহিলাটি মিশাকে বললো যে যে গুলোতে বেশী ওজন হয়েছে তার থেকে ওজন কমিয়ে কম গুলোতে ঢুকিয়ে দিতে। এমন সিগন্যাল পেয়েই আমার মাথা খুলে গেলো। আমার আট লাগেজের পাঁচটাই ছিল ওভারওয়েইট। একেকটা লাগেজ অনুমোদন পায় আর আমি অন্যটার থেকে ভারী ভারী শ্যাম্পুর বোতল, মিল্ক অব ম্যাগনেসিয়ার বোতল , লোশনের বোতল টেনে বের করে অন্যটাতে ঢুকিয়ে দেই। পিঙ্কীও আমাকে সাহায্য করছিলো। আমার তখন কেঁদে ফেলার অবস্থা। এভাবেই সবগুলো লাগেজ বেল্টে তুলে দিয়েছিলাম।

আমরা ভেতরে চলে যাওয়ার আগে আমার স্বামী আমাকে বললো, " প্রতিবার তোমার এমন হয়, এটা কেমন কথা! দেশে যাবে, কোথায় আনন্দে থাকবে তা না, সারাটা পথ টেনশান করতে করতে যাও। যাই হোক, লাগেজের ঝামেলা গেছে, এবার বাকী পথ নিশ্চিন্তমনে যেও। মেয়েদের সাথে রাগারাগি করোনা। ওরাই তোমাকে ঠিকভাবে নিয়ে যাবে"। আমার তখন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে, যে কোন কথাই শুনতে ভালো লাগছিল। মৌটুসীর এতো দামী ঘড়িটা ভেঙ্গে যাওয়ার দুঃখও ভুলে গেছিলাম। এরপর প্লেনে উঠেই আমার খুব জল পিপাসা পেয়ে গেল। বার্মিংহাম থেকে আমেরিকান এয়ারলাইনসে হিউস্টন। হিউস্টন থেকে এমিরেটসে দুবাই। আমেরিকান এয়ারলাইনসে কিচ্ছু খেতে দেয়না, এমন ছোটলোক। আড়াই ঘন্টার জার্নিতে একটা জুসের ক্যান আর ছোট্ট এক প্যাকেট চিনেবাদাম, এই হলো খাবার। আমার তখন পিপাসায় কাতর অবস্থা, দুই ঘন্টা পরে বুড়ি এয়ারহোস্টেস জুসের ক্যান দিয়ে যেতেই বাংলাতেই একটা বকা দিলাম মনে মনে। তারপর হিউস্টনে পৌঁছে পাঁচ ঘন্টার জন্য নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম। পিঙ্কী থাকাতে খুব ভালো লাগছিল। পিঙ্কী খুবই সরল মনের এক মেয়ে। দারুণ স্টাইলিস্ট, বড়লোকের বউ, কিনতু আমাদের সাথে প্রাণ খুলে মিশে যায়। আমার মেয়েরাও স্টাইল জানে, ফলে পিঙ্কী আন্টির সাথে খুব দহরম মহরম খাতির।

ওয়েইটিং চেয়ারে বসে আছি। পিঙ্কী আমার কাছে গল্প করে যাচ্ছিল আমাদের পরিচিত আরেক ফ্যামিলির দাম্পত্য অশান্তির কথা। ও কোন কুটকচালি করছিলোনা, আমার সাথে শেয়ার করছিলো ওর ফিলিংস। পিঙ্কীর একমাত্র ছেলে ঋষি আমার ছোট মেয়ে ঋষিজার সম বয়সী হওয়াতে ওরা দুজনে মিলে খেলা করছিল, বাকী দুই মেয়ের একজন একটু পর পর নানা রকম তথ্য এনে হাজির করছিল। ততক্ষনে আমার মাথা ঠান্ডা। হঠাৎ করেই দুই বুড়া যাত্রী আমাদের কাছে এসে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করছিল। আমি জানতাম মিশা ও মৌটুসী স্কুলে স্প্যানিশ পড়েছে। বিশেষ করে মিশা মাত্র স্কুল গ্র্যাজুয়েশান করে এসেছে, ওরতো জানার কথা স্প্যানিশ। অথচ মিশা কিছুই বুঝতে পারছেনা বুড়াদের কথা। আমি সাথে সাথে রেগে গেলাম, " এই মেয়ে তুমি কি শিখেছ এতদিন, এখন এক বর্ণও বুঝতে পারছোনা"। মিশা আমাকে উলটা ধমকী দিলো, " তোমার খেদমত করতে গিয়ে সব ভুলে গেছি"। মৌটুসী এগিয়ে এলো। পাঁচ বছর আগে শেখা স্প্যানিশ জ্ঞাণ দিয়েই ও পারলো বুড়ো দুটোর কথা বুঝতে। ওদেরকে মৌটুসী যতটুকু সাহায্য করার তা করলো। মিশা ততক্ষনে সবার জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসেছে দেখে ওর প্রতি আবার আমি নমণীয় হলাম।

হিউস্টন থেকে এমিরেটসে উঠেই মিশা, পিঙ্কী, মৌটুসী কাছাকাছি বসে গেলো। আমি দখল করলাম জানালার পাশের সীট। ওরা প্লেন ছাড়তেই মুভী চালিয়ে দিল, আর পকর পকর শুরু করে দিল। আমি জানালার কাঁচে মাথা রেখে আকাশের মেঘ দেখতে লাগলাম। মেঘেদের খেলা যারা বুঝতে পারে তাদের জন্য কত রকম খেলা যে অপেক্ষা করে! মাঝে মাঝে আমি মনিটরে দেখি কত ফিট উঁচুতে আছি, মাঝে মাঝে ম্যাপ দেখি, আন্দাজ করি প্লেন এখন ঠিক কোন দেশের উপর দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা একটু উঁকি দেয় আমার স্ক্রীণে, আমাকে জিজ্ঞেস করে কোন মুভী দেখতে চাই কিনা। আমি মুভী দেখিনা। বরং মেঘেদের খেলা দেখি। সুন্দরী স্মার্ট এয়ারহোস্টেস কাছে আসে খাবারের ট্রে নিয়ে, কখনও আসে ড্রিঙ্কসের ট্রে নিয়ে। আমাকে ভাবতে হয়না খাবার নিয়ে। আমার মিশা জানে আমার জন্য কোন খাবার ঠিক। আমার খাবার ও ঠিক করে দেয়। আর পিঙ্কী, মিশা, মৌটুসী তিনজনেই মোটামুটি সর্বভুক। ওরা সব সময় নতুন নতুন খাবার ট্রাই করে। সী ফুড ওদের বেশী পছন্দ। রেস্টুরেন্টে গেলেও এই তিনজনই শামুক, ঝিনুক, সী উইডস, আরও যত রকমের থলথলে ল্যাতল্যাতে খাবার আছে সেগুলো অর্ডার করে। বীফ ছাড়া ওরা সব খায়।

এমিরেটস দুবাই পৌঁছালে আমরা কয়েক ঘন্টা একসাথে থেকে ঘুরাঘুরি করি। মৌটুসী পারফিউমের দোকানে ঢুকে যায়। সেবার মৌটুসী আশি ডলার দিয়ে এক শিশি পারফিউম কিনতেই মিশা আমাকে টেনে নিয়ে গেলো দোকান গুলোতে। মিশা সব টেস্টার থেকে একটু একটু করে নিজের গায়ে স্প্রে করতে থাকলো, আমার গায়েও স্প্রে করে দিয়ে বললো, " মা দিদিসোনা একটা বোকা, আশি ডলার দিয়ে পারফিউম না কিনে আমাদের মত মাগনা পারফিউম গায়ে মেখে ডলারটা দেশে নিয়ে ভাঙ্গালে পরে ঐ টাকায় কত কিছু কিনতে পারতো। তোমার এই মেয়ে পুরা বড়লোকী মেয়ে হইছে। আর আমি হইছি বুদ্ধিমতী"। আমি হাসি মিশার পাগলামী দেখে। এইবেলা অবশ্য পিঙ্কী মৌটুসীর সাথে। যাই হোক একটা সময় পরে আমরা দুই ভাগ হয়ে গেলাম। পিঙ্কীরা ধরলো দুবাই টু কলকাতা ফ্লাইট, আমরা ধরলাম দুবাই টু ঢাকা ফ্লাইট। দুবাই টু ঢাকা ফ্লাইটে নতুন কিছু ছিলনা। একই রকম বাংলা কথা চারিদিকে, বাচ্চাদের ট্যাঁ ট্যাঁ, মাঝখানে কোন কোন ধার্মিক ব্যক্তিকে দেখলাম আসা যাওয়ার প্যাসেজের মধ্যেই নামাজ পড়তে বসে যেতে।

এবার আমি আর বাথরুমে যাওয়ার কথা মাথাতেই আনিনি। কিনতু বাংলায় একই ঘোষণা দিয়েছিল এবারও। বাথরুম পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে। এই ঘোষনা যতবার শুনি, আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এতো বছর প্রবাসে কাটিয়েও বাঙ্গালীদের কিছু কিছু খাসলত থেকেই যায়।  এবারও জানালা দিয়ে সূর্য্যোদয় দেখলাম, জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ দৃশ্যগুলোর একটি। নেপালের দিক দিয়ে যখন প্লেন বাঁক নেয়। হিমালয়ের সারি দেখে আমার চোখ আর মন ভরে যায়। আমার মেয়েরা তখনও মুভী দেখে। মাঝে মাঝে আমাকে ডিঙ্গীয়ে বাইরের দৃশ্য একটু দেখে নেয়। ঢাকার কাছাকাছি আসলেই মিশার মেকাপ বক্স ওপেন হয়ে যায়। আলতো করে গালে কপালে ফেসপাউডার বুলিয়ে নেয়, মাথার ঝাঁকড়া চুলে একটু ব্রাশ বুলিয়ে নেয়। আমাকেও একটু ফ্রেশ হতে বলে। আমি পাত্তা দেইনা। অপেক্ষায় থাকি কখন প্লেন মাটি ছোঁবে। একসময় প্লেন মাটি ছোঁয়, আমি আবারও মিশে যাই আমাদেরকে নিতে আসা স্বজনের মাঝে।

দেশে যাওয়ার পথে পথে (পর্ব-১)



আমেরিকাতে আসার পর থেকে প্রতি দুই বছরে একবার দেশে যাওয়াটা আমার রুটিন হয়ে গেছে। আমেরিকাতে এসেছিলাম ২০০১ সালে। প্রথমবার দেশে গেছিলাম ২০০৩ সালে। এরপর ২০০৬, ২০০৮, ২০১০ এ গিয়েছি। এবার ২০১২ তে আবার যাচ্ছি। বরাবরের মত এবারও আমি খুবই এক্সাইটেড। আমি খুবই হোমসিক। দেশে থাকা বাবা মা, ভাই বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব আমাকে অহর্নিশি হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রতিবার দেশ থেকে ফিরেই আবার খাতা কলম নিয়ে বসে যাই, বছর গুনি, মাস গুনি এরপর দিন গুনি। দিন গোনা শেষ হলে মুহূর্ত গুনতে শুরু করি।

দেশে যাওয়ার সময় আমি এতটাই এক্সাইটেড থাকি যে মাঝে মাঝে আমার বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। আমার সাথে থাকা মেয়েদের উপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দেই। ওরাই আমাকে নিয়ে যায়, আবার ওরাই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আমার সংসারে আমিই মেইন ভয়েস। তবে স্বৈরাচারী নই। মেয়েদেরকে শাসন করতে ভালো লাগে, তাই শাসন করি। আমি চাইলেই প্রতি বছর দেশে যেতে পারি, কিনতু ভয়ের চোটে চাইনা। কারন আমি একা একা পথ চলতে জানিনা। অনেক টাকা পয়সা নেই বলে সবাই মিলে প্রতিবছর দেশে যাওয়ার উপায় নেই। তাই কখনও সবাই মিলে, কখনও বা মেয়েদেরকে নিয়েই দেশে যাই। মেয়েদের সাথে গেলেও দেশে যাওয়ার সময় হলেই আমার চেহারা পালটে যায়। মেইন ভয়েস কেমন যেনো চুপসে যায়। কারন আছে। আনন্দের সাথে সাথে কিছুটা ভয়ও আমাকে গ্রাস করে। ছোটবেলাতে একবার হারিয়ে গেছিলাম, এরপর থেকেই আমার কেবলই মনে হতে থাকে একা চললেই আমি বোধ হয় হারিয়ে যাব, ঠিকমত প্লেনে উঠতে পারবোনা। এক টার্মিনাল থেকে আরেক টার্মিনালে যেতে পারবোনা। ভুল করে ভুল প্লেনে উঠে যাব। আমার অবশ্য মনে থাকেনা দেশে যাওয়ার পথে আমি কি কি উদ্ভট আচরন করে থাকি। দেশে যাওয়ার পরে দুইদিন দুইরাত মেয়েরা সব আত্মীয়-স্বজনদের সাথে জলসা বসায়, জলসাতে আমাকে নিয়েই সংগীত রচিত হয়। আমি বোকার মত সব শুনি আর সকলকে হেসে লুটিয়ে পড়তে দেখি।



 আমি যতবার দেশে গিয়েছি, যাত্রাপথে কতরকম মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা যদি লিখে রাখতাম কতই না ভালো হতো। অন্যের কথা কি বলবো, আমি নিজেই আমার মেয়েদেরকে হাসির খোরাক যুগিয়েছি। একেকটা কাজ করি আর মেয়েরা আমাকে নিয়ে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে।

২০০৩ সালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে করে বাংলাদেশ গেছি। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে আমরা প্লেনে না উঠে ভার্জিনিয়ার ডুলাস এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই করেছি। আমার স্বামীর এক আমেরিকান ছাত্র আমাদেরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়েছিল। ছেলেটির নাম কার্টিস আর ওর গার্ল ফ্রেন্ডের নাম ছিল নাতাশা। কার্টিস আর নাতাশাকে দেখেই আমি অবাক হয়ে গেছি। কার্টিস বিশাল মোটা আর নাতাশা একেবারেই বাঁশপাতার মত পাতলা ছিল। আমরা বাসা থেকে রওনা হয়ে তিন ঘন্টা পরেই পথের মধ্যে একটি কান্ট্রি রেস্টুরেন্টে গাড়ী থামিয়ে ভেতরে ঢুকতেই রেস্টুরেন্টটি আমার ভালো লেগে গেলো। কাঠের গুঁড়ির বেঞ্চ এবং ডাইনিং টেবিলে বসেই খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমরা কেউই ক্ষুধার্ত ছিলামনা কার্টিস আর নাতাশা ছাড়া। কিনতু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমার জন্যও খাবার অর্ডার করতে বললাম। প্লেটে বিরাট বড় মুরগীর পা দেখে আমি খুশী হয়েই খেতে শুরু করলাম। কার্টিস দুই প্লেট খেয়ে ফেলেছে দেখেই আমি বলে ফেললাম, “ এই রে! এই ছেলে এত খায় কেনো? ওর স্বাস্থ্যের যা অবস্থা”। আমার মেয়েরা বললো, “ তুমি একটু আগেই বাসা থেকে পেট ভরে খেয়ে এসে যদি এখানে ফুলপ্লেট খাবার অর্ডার দিতে পারো” বলতেই তাদের বাবা শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলো। আমি আমতা আমতা করে বলতে লাগলাম, “ রেস্টুরেন্টে নেমেছি, কিছুতো খেতে হবে। নাহলে ওরা যদি আমাদেরকে উঠিয়ে দেয়”! আমার স্বামী বললেন, “ আমাদের দেশে হলে উঠিয়ে দিত। তাছাড়া তুমি এই কাজটি অনেক বছর আগেও একবার করেছিলে”। আমার মনে পড়ে গেলো বিয়ের পরে আমাদের ঢাকার সংসার একটি ট্রাকে চাপিয়ে ঐ ট্রাকে করেই আমরা সাভার যাচ্ছিলাম। মিরপুরের কাছাকাছি আসতেই ট্রাক থামানো হলো। রেস্টুরেন্টে ঢুকে ড্রাইভারকে খাবার দিতেই আমিও খাবার অর্ডার করলাম। রেস্টুরেন্টটির নাম ছিল ‘কিছুক্ষন’। সাইনবোর্ডে একটা ছাগল ও একটি মুরগীর ছবি আঁকা ছিল। ভেতরের পরিবেশ আমার জন্য মোটেও খুব একটা আনন্দদায়ক ছিলনা। কেমন গা ঘিনঘিন করা পরিবেশ। এরমধ্যেই আমি শুধুমাত্র রেস্টুরেন্টে ঢুকেছি বলেই ভদ্রতা করে বিস্বাদ সিঙ্গারা আর চা নিয়েছিলাম। খেতে ভালো লাগছিলনা তবুও খাচ্ছিলাম দেখে আমার স্বামী (তখনও বিয়ের একমাস হয়নি) খুব নরম সুরেই বলেছিলেন, “ তোমার ওগুলো খেতে হবেনা। নিলেই খেতে হবে? ভালো না লাগলে রেখে দাও”।

২০০৬ সালে দ্বিতীয়বার পরিবারের পাঁচজন মিলে দেশে গেছি। দেশে যাওয়ার সময় একমাস আগে থেকেই হুলুস্থুল শুরু হয়ে যায়। পাঁচজন মিলে দশটি স্যুটকেস নিতে পারবো জেনে আমি পাঁচমাস আগে থেকে বাজার শুরু করি। আহামরি কিছুই কিনিনা। তবে সবার জন্য টুকিটাকী কিনে নেয়ার চেষ্টা করি। পাঁচমাসে একটু একটু করে কিনতে কিনতে দেখা যায় জিনিসের পাহাড় জমে গেছে। একবার যখন কিনেইছি তখন সবকিছু লাগেজে না আঁটানো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। আমার স্বামী ভদ্রলোক আমার এই ধরনের দৌরাত্ম্যপনা মুখ বুজে সহ্য করেন। মেয়েরা সহ্য না করে যাবে কোথায়! দশটা লাগেজ ফাটিফাটি করা অবস্থায় নিয়ে যাই এয়ারপোর্টে। আমার মেয়েরা প্রশ্ন করেনা কার জন্য এতকিছু নিয়ে যাই। ওরা জানে দেশে গিয়ে অমুক বুয়া, ওপাড়ার বিন্তি থেকে শুরু করে মায়ের স্কুলের দারোয়ান, দপ্তরীদের জন্যও কিছু না কিছু থাকে। জিনিস কেনা আমার কাজ, জিনিস স্যুটকেসে ঢুকানোও আমার কাজ কিনতু এয়ারপোর্টে পৌঁছে ওভারওয়েইট লাগেজ টানাটানি থেকে শুরু করে চেক ইন করতে গেলে মেয়ে মিশাকে আমার পাশে চাইই চাই। আমার মেজো মেয়েটি মায়ের চেয়ে অনেক বেশী পছন্দ করে তার বাবাকে। তারপরেও আমার বিপদের দিনে সেইই আমার একমাত্র সহায়। লাগেজ চেক ইন করিয়ে দিয়ে আমার দিকে একটা কৌতুক মিশ্রিত দৃষ্টি যখন হানে, আমি বুঝে যাই কি এর মানে।
সেবার আমরা গিয়েছিলাম গালফ এয়ারে, কারন টিকিট একটু সস্তায় পাওয়া গিয়েছিল। এখানেও একটা ব্যাপার আছে। আমার স্বামীর প্লেন ফোবিয়া আছে, ২০০১ এর প্লেন হাইজ্যাকিং এর পর থেকে ফোবিয়া বাড়ছে। আমি সেই জন্য মিডল ইস্ট এর এয়ারলাইন্স পছন্দ করি। স্বামীকে অভয় দেই, মিডল ইস্টের এয়ারলাইন্স কেউ হাইজ্যাক করবেনা। গালফ এয়ারে আমার কথাতেই টিকিট কেটেছিল। এয়ারলাইনস হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছেই বেগড়বাই শুরু করেছে। প্রথমে বুঝিনি। আমাদের লন্ডন টু ঢাকা ফ্লাইট ডিলে হতে দেখে আমার হুঁশ এসেছে। স্পীকারে জানানো হচ্ছিল ‘টেকনিক্যাল ত্রুটির’ জন্য দেরী হচ্ছে। আমারতো ভয় ঢুকে গেছে মনে। পাশে বসা স্বামীকে বলি, “ এই যাওনা, একটু দেখে আসোনা, কি সমস্যা হচ্ছে। চারঘন্টা অলরেডী পার হয়ে গেছে”। আমার স্বামী হাসতে হাসতে বললেন, “ যাই ঘটে থাকুক, আমিতো এর কিছুই বুঝবোনা। চুপচাপ বসে থাকো। প্লেন ঠিক হলে তোমাকে নিয়ে উড়বে”। আমি একটুক্ষন চুপ করে থেকে আবার খোঁচাই স্বামীকে। এবার আমার বর বললো, “ তুমি নিজেওতো গিয়ে দেখে আসতে পারো। তোমার মনে যা যা প্রশ্ন আছে ওদেরকে জিজ্ঞেস করে আসতে পারো”।

বুঝলাম এই দিক থেকে সাহায্য পাবোনা। অথচ টেনশান বেড়েই যাচ্ছে আমার। এয়ারলাইনস থেকে যাত্রীদের সবাইকে ম্যাঙ্গো জুস, কুকী খেতে দেয়া হচ্ছিল। বাঙ্গালীদের দোষ দেয় সবাই, ঐদিন দেখলাম প্লেনের সকল যাত্রী হুমড়ী খেয়ে পড়েছে একটু জুস পাওয়ার আশায়। আমি বাঙ্গালী ছিলাম সবার পেছনে। আমার চেহারাতে টেনশান দেখে এবার আমার মুশকিল আসান মেয়ে মিশা দুই হাতে জুসভর্তি দুই কাপ এনে বললো, “ মা, টেনশান করে কোন লাভ নাই। নাও সাইড লাইন দিয়ে ঢুকে তোমার জন্য জুস নিয়ে আসছি। আমি জানি তোমার মেয়ের এমন কীর্তিতে তুমি খুশীই হবে। তাকিয়ে দেখো লাইনের অবস্থা, তুমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলে, জুস আর পেতে না। দেখো তোমার জন্য দুই কাপ জুস এনেছি। চুপচাপ বসে বসে জুস খাও। কেউ জানেনা কি হয়েছে, জিজ্ঞেস করে এসেছি একজন এয়ারহোস্টেসকে, বলেছে টেকনিক্যাল সমস্যা”। আমি বলি, “ দেখনা চেষ্টা করে, কাউকে আবার জিজ্ঞেস কর, কত বড় সমস্যা, প্লেন আকাশে উঠেই কি ভেঙ্গে পড়বে নাকি”? মিশা বললো, “ এবার দিদিসোনাকে পাঠাও। আমি বার বার যাবো কেনো”? বড়মেয়েকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, তবুও বললাম, “ ও মামনি, আমার ভয় লাগছে। তুইতো ভালো ইংরেজী পারিস, যা না গিয়ে একটু ডিটেইলে জেনে আয়না মা, সমস্যা কতটা গুরুতর”। মেয়ের জবাব, “ তুমি নিজেওতো ইংরেজী বলতে পারো, তুমিই জিজ্ঞেস করো। তোমার ভয় পাওয়া মুখ দেখলেই ওরা সব বলে দিবে। আমি যাচ্ছিনা, কারন প্রথম কথা, আমি জানি যতক্ষণ পর্যন্ত ওরা প্লেন এর ত্রুটি সারাই না করতে পারবে প্লেন নিয়ে ওরা উড়বেনা। প্লেনে শুধু তুমি আর আমিই যাচ্ছিনা, চারশ যাত্রী যাচ্ছে, পাইলট, ক্রু যাচ্ছে, তাদের জীবনের মায়া নেই? শুধু শুধু টেনশান করে শরীর খারাপ করছো কেনো”? আমি শুধু বললাম, “ ফাজিল মেয়ে, বেশী জ্ঞাণী হয়ে গেছো। এরপরে আর একটাও কথা শুনতে চাইনা তোমার কাছ থেকে”। আমার মত আর কাউকেই এই ব্যাপারে চিন্তিত দেখলাম না। ঘুরেফিরে আবার স্বামীর কাছে যেতেই এবার স্বামী বললেন, “ শোন, সবার যা হবে আমাদেরও তা হবে। প্লেনে এমন যান্ত্রিক গোলযোগ হতেই পারে। এত দেরী হচ্ছে কারন ওরা ভাল করে খুঁজে খুঁজে দেখছে। ঠিক হলেই প্লেন ছাড়বে”।
আমি বললাম, “ আসলে আমরা মরে গেলে কোন ক্ষতি নেই। আমাদের মেয়েগুলো জীবনের কিছুই দেখলোনা, কোন কারন ছাড়াই যদি এভাবে বেঘোরে ওদের প্রাণ দিতে হয় সেটা কেমন হবে”। আমার বড় মেয়ে ফট করে বললো, “ মৃত্যু আসার আগেই তুমি মরে যাচ্ছো। নিজে টেনশান করছো আমাদেরকেও ভয় দেখাচ্ছো। তুমি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো, প্লেন ঠিক হয়ে গেলে আমরাই তোমাকে ধরাধরি করে প্লেনে বসিয়ে দেবো। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশে গিয়ে চোখ খুলবে। এর আগে না”।

আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি খুব বেশী রিএক্ট করে ফেলছি। এবার চুপ হয়ে গেলাম। তারপরেই নিজের মনকে সান্ত্বণা দিলাম, পাইলট, এয়ারহোস্টেস সকলেইতো আমাদের সাথে উঠবে। প্লেন একসিডেন্ট হলে ওরাওতো মারা যাবে। নিজের মৃত্যু কি কেউ চায়! তাহলে নিশ্চয়ই প্লেন ভালো করেই ঠিক করবে। মনে মনে এগুলো বলছিলাম, আর কারো সাথেই কথা বলছিলামনা। এক সময় মিশা আরেক কাপ জুস হাতে করে এসে বললো, “ ভালো খবর নিয়ে এসেছি। প্লেন এক্কেবারে ঠিক হয়ে গেছে। একটু পরেই ছাড়বে। তুমি ম্যাঙ্গো জুস ভালোবাসো বলে এবার আরেক কাপ নিয়ে এলাম তোমার জন্য। জুস শেষ হয়ে গেছে, এয়ারহোস্টেসের সাথে খাতির করে এক্সট্রা কাপ এনেছি তোমার জন্য। আর রাগ করে না থেকে জুসটা খাও। এখনই প্লেন ছাড়বে”। আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। প্রথমে ভেবেছিলাম মিশা আমাকে খুশী করার জন্য এমন ইতং বিতং করছে। কিনতু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যখন প্লেন ছাড়ার এনাউন্সমেন্ট শুনতে পেলাম তখন বুঝলাম মিশা সঠিক খবর নিয়ে এসেছে। এরপরে আর কোন অসুবিধা হয়নি। প্লেন ছেড়েছে ঠিকভাবেই।

প্লেনে উঠেই চারিদিকে অনেক বাঙ্গালীর ক্যাঁচর ম্যাঁচর শুনতে পেলাম। আমার কি যে ভালো লাগতে শুরু করলো। আমেরিকাতে যেখানে থাকি বাংলা কথা শুনতে পাইনা তেমন করে। এখন লন্ডনের আকাশে সিলেটি বাংলা শুনে বেশ ভালো লাগতে শুরু করলো। বাচ্চাদের ট্যাঁ ট্যাঁ শুনছিলাম। কানে তালা লাগার জোগাড়। তবু ভালো লাগছে। বাথরুমে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। মিশাকে ইন্সপেকশানে পাঠালাম। মিশা এসে দুঃসংবাদ দিল। প্লেনের বাথরুমের ছোট্ট ঘরটিতে নাকি বাচ্চাদের নোংরা ডায়াপার পড়ে আছে। এই এক সমস্যা। বাঙ্গালী পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকেই প্লেনে উঠুক না কেনো, প্লেনে উঠেই তারা এটাকে নিজের ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলে। গেলামনা আর বাথরুমে। প্লেন ঢাকার কাছাকাছি আসতেই বাংলাতে ঘোষণা শুনতে পাচ্ছিলাম, “আপনারা দয়া করে বাথরুম নোংরা করবেন না। বাচ্চাদের নোংরা ডায়াপার ডাম্প করার জন্য বাথরুমেই ট্র্যাশ ক্যান রাখা আছে। দয়া করে নোংরা ট্র্যাশ ক্যানে ট্র্যাশ করুন”।

ঢাকাতে প্লেন এর চাকা মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে আমার চেহারাতে আলো ফুটে উঠলো। ভুলে গেলাম ঘটে যাওয়া যত ঘটনা-অঘটনা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই মিশে গেলাম রিসিভ করতে আসা প্রিয়জনের মাঝখানে।

Wednesday, May 16, 2012

অনলাইনে সংবাদ পাঠের বিড়ম্বনা!

ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছেন, এটা দেশের প্রতিটি মানুষই জানে। টিভিতে, পত্রপত্রিকাতে ফলাও করে এর প্রচার চলছে। একজন হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে প্রচার চলবে, এমনটাই প্রত্যাশিত। হুমায়ুন আহমেদতো আর পাড়ার দোকানদার কেউ নন যে কোথা দিয়ে আসলো, কোথা দিয়েইবা বের হয়ে গেলো, কেউ দেখতেই পারলোনা। হুমায়ুন আহমেদ নিজের যোগ্যতাবলেই আজ এখানে এসে পৌঁছেছেন। আমি এখানে হুমায়ুননামা লিখতে চাইছিনা। কারন হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে আর দশজন যা জানে, আমি তার চেয়ে হয়তোবা একটু আধটু বেশী জানি। আমি বলছি অন্যকথা। হুমায়ুন আহমেদ এক সময় আমার স্বামীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী তথা বন্ধু ছিলেন। উনি যখন অসুস্থ হলেন, উনার সাথে দুই চারটি স্মৃতিকে জড়িয়ে একটি লেখা ব্লগে পোস্ট করেছিলাম, ‘হুমায়ুন ভাইয়ের জন্য যত প্রার্থণা’ নামে। সেই হুমায়ুন ভাই দেশে গেছেন তা টিভিতে আমার স্বামী দেখছেন। আমি ব্লগে এলোমেলো বিষয় নিয়ে লিখি তা আমার স্বামী জানেন। আজকেই বিকেলে আমি কাজ থেকে ফিরতেই উনি আমাকে বললেন, হুমায়ুন আহমেদের নতুন উপন্যাস শুরুর সাথে সাথেই এমন বিতর্ক শুরু হয়েছে যে পত্রিকাতে প্রতিদিন তা নিয়ে লেখা হচ্ছে। হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে লেখা হচ্ছে সেটা নিয়ে আমার স্বামী চিন্তিত নন, পাঠকেরা মন্তব্য করতে গিয়ে হুমায়ুন আহমেদের মেয়েদের নামে, তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনের নামে এমন সব কুরুচীপূর্ণ কথা লিখেছে যে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তে হয়। পত্রিকার সম্পাদক দায়ী থাকার কথা এমন নোংরা মন্তব্য বিনা সেন্সরে প্রকাশিত হওয়ার জন্য। অনেকের বাড়ীতেই বাবা, মা, ছেলে মেয়ে অনলাইনে একই পত্রিকা পড়ছে, তারাতো লজ্জা পায়। এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করে আমি যেনো কিছু লিখি, সেরকম একটি সাজেশানই উনি আমাকে দিয়েছেন।
যখন দেশে ছিলাম তখন বাড়ীতে দুইটার বেশী পত্রিকা রাখতামনা। বাংলা পত্রিকার আগাপাশতলা না পড়তে পারলে আমার ঘুম হতোনা। প্রথম প্রবাস জীবনে ঘরে কম্পিউটার ছিলনা বিধায় অনলাইনের ব্যাপারগুলোও ছিলনা। তাছাড়া নিজের কমপিউটার থাকলেইতো আর হলোনা, পত্র পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থাকতে হবেতো! কিনতু তখন এসবের কিছুই ছিলনা।সময়টা ছিল পঁচানব্বইয়ের দিকে। দেশ ছাড়ার আগে আমার স্বামী আমার জন্য ‘যায় যায় দিন’ নামের সাপ্তাহিকটি এক বছরের জন্য সাবস্ক্রাইব করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে থেকে সপ্তাহে দুইদিন সিডনী বেতার থেকে প্রচারিত আধাঘন্টার বাংলা অনুষ্ঠান শুনতাম আর দেশ থেকে আসা ‘যায় যায় দিনের’ দুইটি করে পৃষ্ঠা প্রতিদিন পড়তাম যেন সপ্তাহের প্রতিটিদিন বাংলা ম্যাগাজিনের সাথে অন্তঃত সম্পর্কটা অটুট থাকে। সাথে করে নিয়ে গেছিলাম কিছু ‘সানন্দা’। সানন্দা কখনওই পুরাণো হয়না। তাই এভাবেই মিলিয়ে ঝিলিয়ে আমার বাংলা পাঠের পিপাসা মিটাতাম।
২০০১ এ আমার দ্বিতীয়বারের প্রবাস জীবনের প্রথমদিকে সাথে করে নিয়ে আসা এক ট্রাঙ্ক বাংলা গল্পের বই দিয়েই বেশ ভালোভাবেই চালিয়ে নিচ্ছিলাম। তাছাড়া ২০০১ এর শেষের দিকে আমেরিকাতে এসে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের বিষাদের সাথে যোগ হয়েছিল দেশ ছেড়ে আসার আগের নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাসের দুঃসহ স্মৃতি। সব মিলিয়ে মনটা এমনিতেই কাতর হয়ে থাকতো, তাই গল্পের বইয়ের মধ্যেই ডুবে থাকতাম। দুই বছর পরেই আমার মাথায় আবার সংবাদপত্র পাঠের ভুত মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই কম্পিউটারে বসা শুরু করলাম। দেশে থাকতেই নিজেদের ঘরে কম্পিউটার ছিল এবং আমি তা কখনও ছুঁইয়েও দেখিনি। ভয় পেতাম কোন বাটন টিপতে কোন বাটন টিপে ফেলি, কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সেই ভয় আমেরিকাতে এসেও রয়ে গেছিল বলে কম্পিউটারের বিশাল রত্ন ভান্ডার আমার কাছে অধরাই থেকে গেছিল। ঘরের সদস্যদের অভয়বাণী শুনে, বিশেষ করে আমার স্বামী যখন বলেছিলেন যে কম্পিউটারে বাটন টিপলেই যে কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যাবে এমন ধারণা ত্যাগ করতে, তখন থেকে একটু একটু করে কম্পিউটারে বসা শুরু করলাম।
কমপিউটারে বসেই আমি পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। তখন এতো ওয়েব সাইট ছিলনা বা থাকলেও আমি জানতামনা। খুব সহজে সব পত্রিকা একসাথে যেনো পেতে পারি তার জন্য আমার এক ভাই আমাকে ই-মেলা ডট কম এ যেতে বলেছিল। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশ, ভারতের বাংলা পত্রিকার বিশাল সম্ভার দেখেই আমার মন ভরে গেলো। ইলেকট্রিসিটির সমস্যা নেই, হাতে প্রচুর অবসর সময়, আমাকে আর পায় কে! বাংলা পত্রিকার আদ্যোপান্ত পড়তাম এমনকি শোক সংবাদও বাদ দিতামনা। তখন পত্রিকাতে সংবাদ পাঠের নীচে পাঠকের মতামত দেয়ার অপশন ছিলনা। একেকটা সম্পাদকীয় বা খোলা কলম পড়তাম, অথবা বিশেষ কোন ফিচার পড়তাম, মাঝে মাঝে মনে হতো নিজের মতামত জানানোর উপায় থাকলে ভালো হতো। কিনতু তা আর হয়ে উঠেনি। তাছাড়া ইন্টারনেটের স্পীড এত স্লো ছিল যে পত্রিকা পড়তে পেরেই সন্তুষ্ট ছিলাম।
পরবর্তীতে আরও বেশী আধুনিক অবয়বে বেশ কিছু নতুন পত্রিকা বের হতে লাগলো। নতুন পত্রিকার সব কিছুই নতুন। নতুন ধরনের লেখা, ভিন্ন আঙ্গিকে সংবাদ পরিবেশনতো ছিলই, সাথে যোগ হয়েছে পাঠকের মতামত জানানোর জন্য স্পেস। পাঠকের মতামত পড়তেই আমার বেশী ভালো লাগতো। কারন একটি সংবাদ কার মনে কিভাবে কাজ করে, মতামত থেকে তা জানা যায়। পাঠকের মতামত পড়ে দেশের হালচাল বুঝা যায়। আমি সেইজন্যই পাঠকের মতামত অথবা কোন একটি বিষয়ের উপর পাঠক জরীপের ফলাফল খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। কখনও কখনও আমিও দুই একটা মন্তব্য করেছি। তবে মন্তব্য করতে গেলে নাম ধাম, ই-মেইল আইডি দিতে হয় বলে আমি ওখানেই মতামত দেয়ার ব্যাপারে সমাপ্তি টেনেছি। কারন এগুলো স্মার্ট মানুষদের কাজ বলেই ধরে নিয়েছি।
কিনতু গত দুই বছর ধরেই পত্রিকা পাঠের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছি। কারন বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার খুব সহজ হয়ে গেছে বলেই কিনা জানিনা, ইন্টারনেট এখন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের হাত ছাড়িয়ে রাম শ্যাম যদু মধুদের হাতে চলে গেছে। এইসব যদু মধুরা অনলাইনে মতামত দেয়ার সুযোগ পেয়ে যাহা খুশী তাহাই লিখে চলেছে। সংবাদের বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্ক নেই , অথচ তারা মতামত দেয়। মতামতে যত নোংরা ভাষা, কুৎসীত গালিগালাজ ব্যবহার করা যায় তার সবটুকুই তারা করে থাকে। মাননীয় নেতা নেত্রীদেরকে পতিতালয় ঘুরিয়ে নিয়ে আসে, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী নেত্রীকেও রেহাই দেয়না এরা। পাঠকের মতামত পড়ে প্রথমদিকে আমি হতভম্ব হয়ে যেতাম। সবাইতো আর খারাপ কথা লিখেনা, ভাল কথা খুঁজতে গিয়ে দশটা খারাপ কথা পড়তেই হতো। কেউ বাধ্য করেনি পড়তে, তবুও আমি পড়তাম অনেকটাই কৌতুহলের বশে। দেখতে চাইতাম, মানুষ কত নীচে নামতে পারে। একজন কমেন্টদাতা আরেকজন কমেন্ট দাতার মা’কে, বোনকে নিয়ে তার শয্যায় তুলছে হরহামেশা, কেউ কাউকে চোখে না দেখেও বলে দিতে পারে একজন আরেকজনের মা বোনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বর্নণা! ভাবা যায়! এরাই আবার মা দিবসে মায়ের জন্য গোলাপ হাতে ঘরে ফিরে! এরাই মা’কে নিয়ে কত গান বাঁধে। এরাই নিজের মা’কে মাথায় রেখে অন্যের মা’কে কথার আঘাতে শয্যাসঙ্গিণী করে ফেলে। এগুলো বেশী দেখা যায় রাজনৈতিক সংবাদের বেলাতে প্রযোজ্য। একজনের সাথে আরেকজনের মতের মিল না হলেই একজনের পছন্দের নেত্রীকে নিয়ে টানাটানি করছে, না হয়তো মা বোনকে নিয়ে টানাটানি করছে।
আমি ব্লগে লিখতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। আমার নিজের লেখাতেও কত গালিগালাজ শুনেছি। একেকটা লেখা ব্লগে পোস্ট করেছি, তারপরেই পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখে দুই রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ব্লগতো অনেক বেশী কাছের, ব্লগের পাঠকরা কেউ যদু মধু টাইপ নয়, এরা সবাই শিক্ষিত সমাজের মানুষ। আসল নাম গোপন রেখে ছদ্মনামে যাহা খুশী তাহা মন্তব্য করে যায়। পত্রিকার পাতায় মন্তব্য দেখে ভেবেছিলাম এরা বাপের পয়সা ধ্বংস করে ইন্টারনেটের মিসইউজ করে চলেছে। কিনতু ব্লগে ঢোকার পরে থেকে আমার ধারণা বদলেছে। এমন কদর্য ভাষাতে মতামত প্রদান দেখে একটি কথাই মনে হচ্ছে, আসলে কিছু মানুষের মধ্যে আছে রুচি, মননশীলতা, নিয়মানুবর্তিতার অভাব। এরা নিজেরা ভালো থাকেনা বলেই কাউকে ভালো থাকতে দিতে চায়না। একটি ব্লগে রীতিমত বলে দেয়া আছে, পাঠকের মন্তব্যের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। ঐ ব্লগটিতে সবচেয়ে বেশী নোংরা কথার চাষ হয়। সেখানে নোংরা ভাষা ব্যবহারকারীদের অনেকেই আবার বিদেশী ডিগ্রীপ্রাপ্ত। এইসব ডিগ্রীর নিকুচি করতে ইচ্ছে করে। আবার বিডিনিউজ২৪ এর ব্লগসহ আরও বেশ কিছু প্রগতিশীল ব্লগে পাঠকের মন্তব্য ব্লগ টিম কর্তৃক মডারেটেড হতে দেখি। লেখার সাহস ফিরে পাই।
সংবাদপত্রে সংবাদের জন্য সম্পাদক দায়ী থাকেন। অনেক খবর নাকি সেন্সরড হয়েই পত্রিকাতে ছাপা হয়। তারপরেও মাঝে মাঝেই দেখি সম্পাদক ভুল বা অসত্য সংবাদ পরিবেশিত হলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে থাকেন। তাই যদি হবে তাহলে পত্রিকার অনলাইন সংস্করনের ব্যাপারে সম্পাদক এমন নির্লিপ্ত কেনো? সব পত্রিকাতে না হলেও খুবই জনপ্রিয় কিছু পত্রিকার অনলাইন পাঠকের মন্তব্য সেন্সর করা উচিৎ বলে মনে করি এবং দাবীও করি। মেয়েরা ঘরে-বাইরে কত রকম বৈপরীত্যের ভেতর দিয়ে মানিয়ে গুনিয়ে চলছে, বাসে, ট্রামে, হাটে বাজারে, মার্কেটে, শপিং মলে কিছু অসাধু পিশাচের হাতের নোংরা স্পর্শে বিচলিত না হয়েও নিজের কাজ করে যাচ্ছে, এতেও পোষাচ্ছেনা ঐসব নপুংসকদের যারা যে কোন একটা উছিলা পেলেই মেয়ে নামের অতি নিরীহ প্রাণীটিকে লেখনীর মাধ্যমেই বলাৎকার করে চলেছে। আর অনলাইনের বদৌলতে সেইসকল মন্তব্য ছেলে বুড়ো, মা-কন্যা, বাপ-বেটা সকলেই পড়ছে। এখানেই লজ্জা বা অস্বস্তির কথা। তাই মনে হয় সবটুকু না পারলেও সম্পাদক সাহেব পাঠকের মতামত মনিটর করার জন্য একটা স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন! এতে করে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য কমলে কমতেও পারে, মা-বোনেরাও একটু সস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে।

Tuesday, May 15, 2012

সেদিনের সেই ‘রোগাভোগা’ ‘ফাঁকীবাজ’ ছোট্ট মিশা!



দুই সপ্তাহ আগেই মিশা আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল যে ও কলেজের ২০১২ সালের ‘ হল অব ফেম’ এওয়ার্ড পেয়েছে। আমি সাথে সাথেই জানতে চাইলাম ‘হল অব ফেম’ এওয়ার্ডের গুরুত্ব। হাসতে হাসতে ফোনের মাধ্যমেই মিশা আমাকে বলেছে যে এই এওয়ার্ডটাই হচ্ছে চার বছরের কলেজ জীবনের সামগ্রিক মূল্যায়ন। মোট চারজনকে দেয়া হয় এই এওয়ার্ড। চার বছরের পরীক্ষার গ্রেড, লীডারশীপনেস, আচার ব্যবহার, নিয়মানুবর্তিতা,  নানারকম সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, নাচ, গান, থিয়েটারসহ চার বছরের সামগ্রিক কার্যক্রমের মূল্যায়ন শেষে নির্বাচক মডলী সিদ্ধান্ত নিয়ে সেরা চারজন নির্বাচিত করেন। চারজনের ছবি বড় করে প্রিন্ট করে বাঁধাই করে মূল বিল্ডিং এর ভেতরের দেয়ালে টানিয়ে দেয়া হয়। ওর কাছে এমনটা জানতে চাওয়ার কারন আছে। গত মাসে আমার বড় মেয়ে মৌটুসী ডাক্তারী পাশ করার সাথে সাথেই আমি মৌটুসীর ছোটবেলা থেকে শুরু করে বড়বেলা পর্যন্ত যত ঘটনা আমার স্মৃতিতে ছিল, তা নিয়ে লিখে ব্লগে পোস্ট করে দিয়েছিলাম। মিশা সেগুলো দেখেছে আর আমার কাছে জানতে চেয়েছে ওকে নিয়ে কিছু লিখবো কিনা। আমি বলেছিলাম, যখন সময় হবে তখন দেখা যাবে। মিশার সাথে আমার সম্পর্ক যতখানি মা- মেয়ের, তার চেয়েও বেশী বন্ধুর সম্পর্ক। আমার তিনটি মেয়ে। তিন মেয়ের সাথেই আমার খুবই ভালো সম্পর্ক। তবে মিশার সাথে সম্পর্কটা টক ঝাল মিষ্টি টাইপ। মিশা এই আমাকে ভালোবেসে একেবারে দিওয়ানা হয়ে যাচ্ছে, আবার পরক্ষনেই হয়তোবা আমার উপর রেগে মেগে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই মিশা এরকম।


মিশা জন্মের পর থেকেই অসুস্থ থাকত।। প্রথম তিন মাস কিছুই বুঝতে পারিনি, কিনতু তিনমাস না যেতেই ওর কানের ইনফেকশান হয়, এবং সেই থেকে বিরতিহীন ভাবে একটার পর একটা অসুখ ওর লেগেই থাকতো। টাইফয়েড, হাম, চিকেন পক্স, স্কিনে ইনফেকশান, স্টমাকে ইনফেকশান ছাড়াও প্রতি প্নের দিন পর পর ঠান্ডা লেগে কেমন যেনো এজমার মত শ্বাসকষ্ট হতো। এক দেড় বছরের বাচ্চা ছিল সে, ডাক্তারের দেওয়া ‘এন্টিবায়োটিক’ খেতে খেতে একসময় সকল এন্টিবায়োটিকও ওর ছোট্টদেহে আর কাজ করতোনা। ওর যখন দুই বছর বয়স, তখনই ‘নেফ্রোটিক সিনড্রোম নামে কিডনীর অসুখ হয়। নেফ্রাইটিস যখন হয়েছিল, ওর ছোট্ট শরীরে প্রচুর পানি জমে গেছিল। কি ভারী হয়ে গেছিল মিশা! মিশা খুব বেশী কথা বলতে শিখেনি তখনও, যা কিছু প্রয়োজন সব ইশারাতে বলতো। ও ওর শারীরিক কষ্টের কথা বুঝিয়ে বলতে পারতোনা। আসলে রোগে শোকে মেয়েটার শরীরের ভেতরটা ঝাঁঝরা হয়ে গেছিল। তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় ওকে অনেকগুলো ইঞ্জেকশান (নাম জানিনা) দেওয়া হয়েছিল। স্টেরয়েড ট্যাবলেট ‘প্রেডনিসোলন’ দেয়া হয়েছিল। প্রেডনিসোলন হচ্ছে ‘বিষতিতা’ এক ওষুধ। সেই বিষাতিতা ওষুধ একসাথে ছয়টি খেতে দেয়া হতো ওকে। আমি ট্যাবলেটগুলোকে গুঁড়ো করে মধুর সাথে মিশিয়ে ওকে কোনরকমে খাওয়াতাম। প্রতিটি কাজ আমাকে করতে হয়েছিল। কারন মিশার বাবা মেয়েদের কষ্ট সহ্য করতে পারতোনা। সারাক্ষন মেয়েদের পাশে থাকলেও মেয়েদের কষ্টের মুহূর্তগুলোতে একটু আড়ালে থাকতেন।

যত রকমের অপ্রিয় কাজগুলো আমাকে করতে হতো বলেই মনে হয় ছোট্ট মিশা আমাকে দেখলেই একটু ভয় পেতো। স্বাভাবিকভাবেই বাবার প্রতি ওর টান বেড়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। ছোট্ট মিশাকে যখন ইঞ্জেকশানের সুঁচ ফোটানো হতো, আমি ওকে ধরে রাখতাম ঠিকই, কিনতু আমার মনে হতো সূঁচগুলো বুঝি আমার বুকে গিয়ে বিঁধছে। কান্নায় ক্লান্ত মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরে কান্না থামাতাম। আমার বুকে থেকে যে উষ্ণ পরশ ও পেয়েছে, সেই থেকেই মনে হয় আমার জন্য নিজের অন্তরেও একটু উষ্ণতা টের পায়। মিশার চার বছর বয়স পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশে ছিলাম। সেই চার বছরের পুরোটা সময় মিশাকে নিয়ে আমাদের কষ্টের সীমা ছিলনা। এরপরেই আমরা অস্ট্রেলিয়া চলে যাই। অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে মিশা সুস্থ হতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়াতে তিন বছর থেকে আবার যখন দেশে ফিরে আসি, তখন মিশা অনেক বড় হয়ে গেছে। সাত বছর বয়সী ঝলমলে মিশা। যখন মুড ভালো থাকে তখন মিশা খুব ভালো, কিনতু মুড খারাপ হলেই আমার উপর রেগে আগুন। তার বাবাকে ডেকে ডেকে বলতো, “ ও বাবাগো, এই মহিলাটাকে তুমি বিয়ে করলে কেন গো? হায়রে কপাল, এই মহিলা কেনো আমার মা হলো?” মিশার সেই ডায়ালগগুলো এখনও আমার কানে লেগে আছে।

আমার উপর মিশার রাগ হওয়ার আরেকটি কারন হচ্ছে আমি পড়ালেখা নিয়ে কথা বলতাম। মিশা খুব বুদ্ধিমতী ছিল, বই পড়ার চেয়েও ওর অনেক বেশী মনোযোগ ছিল এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটির প্রতি। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তো, প্রায়ই হোমওয়ার্ক মিস করার জন্য শাস্তি পেত। প্রথম দশ জনের মধ্যে নাম থাকলেও প্রথম বা দ্বিতীয় স্থাণ পেতোনা। আমরা কিছুই বলতামনা। ওর খুশীর উপর সব ছেড়ে দিয়েছিলাম। এত চঞ্চলতার পরেও স্কুলের প্রতিটি টিচার ওকে অনেক ভালোবাসতো। টিচারের ভালোবাসা ও অস্ট্রেলিয়াতেও পেতো, সেই ধারা এখনও ও বজায় রেখেছে। বাংলাদেশে থাকতেই স্কুলের পরীক্ষার কোন একটা পেপারে খারাপ নাম্বার পেয়ে আমাদের কাছে আর নিয়ে আসেনি খাতা। নিজে নিজে বাবার সাইন নকল করে জমা দিয়েছিল। অনেক পরে ওর কাছ থেকেই আমরা তা জেনেছি। ও আগে কেনো আমাদের জানায়নি তা জানিনা। আমরা ওদের গায়ে হাত তুলতামনা, বিশেষ করে মিশাকে পিটাইনি। তারপরেও মনে হয় মিশার ভেতরে ভেতরে খুব লজ্জা লেগেছিল কম নাম্বার পেয়ে।

মিশা আমেরিকাতে এসেও স্কুলে ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই টিচারদের নেক নজরে পড়ে গেছে প্রথম থেকেই। আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, মিশা ঘরে আমার সাথে যতই জেদ করতো না কেন, ঘরের বাইরে পা দেয়ার সাথে সাথেই ও অন্য মানুষ। বাংলাদেশে থাকতেই সব বাড়ীর কাজের মেয়ে বা কাজের বুয়াদের সাথে মিশার খাতির দেখলে যে কেউ অবাক হয়ে যেত। ওর মন খুব বেশী নরম। বড়লোকের বাচ্চাদের সাথে খেলতেও যেমন ওর জুড়ি ছিলনা, কাজের মেয়েদের সাথে গলাগলি করতেও ওর জুড়ি ছিলনা। মিশা সেই তিন বছর বয়সের সময় ঘরের জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বস্তির ছেলেমেয়েদেরকে ডেকে ডেকে গ্লাস, বাটি, পুতুল, খেলনা দিয়ে দিত। যার সব ভালো, তাকে পড়ার কথা বললেই মাথায় বাজ পড়তো। আর এই একটা জায়গাতে এসেই সে আমাকে তার শত্রু মনে করতো। মিশার ধারণা ছিল, আমি বুঝি ওর দিদিসোনাকেই ভালোবাসি, ওকে বাসিনা। কিনতু এত ছোট বয়সে ওকে বুঝাই কেমন করে, মায়ের ভালোবাসা কারো প্রতিই কম বেশী হয়না। আমি মাঝে মাঝে অনেক কষ্টও পেতাম মনে, যখন মেয়েটা তারস্বরে চেঁচাত আর বলতো, হায়রে! এই মহিলাটা কেন আমার মা হলোরে! এখন অবশ্য হাসি পায়।

ওর যখন চৌদ্দ বছর বয়স, আমরা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ছেড়ে চলে আসি মিসিসিপিতে। ততদিনে আমাদের বড়মেয়ে মৌটুসী খুবই ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হয়েছে ফুল স্কলারশীপ পেয়ে। টিন এজের মিশা মনে হয় এতে করে একটু বিপর্যস্ত বোধ করতে থাকে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে মিশার বন্ধুর সংখ্যা ছিল অগুনতি। সবাইকে ছেড়ে মিসিসিপিতে চলে আসতে ওর মনে হয় পাঁজরে গিয়ে ব্যথাটা লেগেছে। মিসিসিপিতে এসে মিশা এখানের পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুলে যায়-আসে, মুখে হাসি নেই, আনন্দ নেই। পড়ালেখাতে ফাঁকী দিলেও মিশা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে থাকতে কত যে স্পীচ কম্পিটিশান, সোশ্যাল স্টাডিজ ফেয়ারে অংশগ্রহন করেছে এবং সবগুলোতে ফার্স্ট হয়ে এসেছে। পত্রিকাতে ওদের দুই বোনের ছবিও উঠেছে। একবার স্কুলের ফুটবল খেলার সময় স্টেডিয়ামে এককভাবে আমেরিকার জাতীয় সংগীত গাওয়ার মত বিরল সৌভাগ্য ওর হয়েছে।

সেই মিশা মিসিসিপিতে এসে পনের’শ ছাত্রছাত্রীর সাথে গায়ে গা লাগিয়ে স্কুলে পড়তে গিয়ে কেঁদেকেটে অস্থির হয়েছে। একদিন বাবার কাছে কাঁদতে কাঁদতেই বলছিল ওকে যেনো ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে দুইটা দিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায়ই স্কুল থেকে বাড়ী ফিরেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত। ডাকলেও সাড়া দিতনা। আমি যে কি ভয় পেতাম। একদিন ও যখন স্কুলে ছিল, ওয়ার্ড্রোবের উপর একটা বড় সাদা কাগজ পেয়ে খুলে দেখি, মেয়ে ঈশ্বরের কাছে ওর জীবনের কষ্ট জানিয়ে চিঠি লিখেছে। এক জায়গাতে লিখেছে বন্ধুদের জন্য এতো বেশী মন খারাপ যে এই জীবন আর রাখতে চায়না। তাই প্রায়ই সে বালিশ চাপা দিয়ে দম বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার প্র্যাকটিস করে। এই পর্যন্ত পড়ে আমার মাথা ঘুরাতে শুরু করে। ওর বাবা বাড়ী ফিরলে ওর বাবাকে বললাম কথাগুলো। একদিন ওর বাবা ওকে সুন্দর করে অনেকক্ষণ বুঝিয়েছে। বাবা বুঝালে সব ঠিক, মা বুঝালে সব বেঠিক যে মেয়ের কাছে, তাকেতো বাবার বুঝাতে হবেই। আমি একদিন মিশাকে বলেছিলাম, “ তোমার কাছে কিচ্ছু চাইনা, তুমি যদি মিসিসিপির ম্যাথস এন্ড সায়েন্স স্কুলে চান্স পাও, ভবিষ্যতে আমি কোনদিন তোমাকে পড়ার কথা বলবোনা”। মিসিসিপির ম্যাথস এন্ড সায়েন্স স্কুল প্রোগ্রাম হচ্ছে ইলেভেন এন্ড টুয়েলভ গ্রেডের জন্য। সারা মিসিসিপির বেস্ট ছেলেমেয়েদের ইন্টারভিঊ করে তবেই ১১০ জনকে নেওয়া হয়। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম মিশা চান্স পাবেনা। কারন ওর এসিটি টেস্ট স্কোর খুবই কম ছিল। মিশা লিখিত পরীক্ষাতে পাশ করে মৌখিক পরীক্ষার ডাক পেয়েছে, এতেই আমরা খুশী ছিলাম। যেদিন মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে এসে বাড়ীতে ফিরে খুব কনফিডেন্টলি বললো, যে ভাইভা ভালো হয়েছে, তখন থেকেই বুকে আশা জাগতে লাগলো। কারন আমরা জানি মিশা কথা বলতে পারে খুব ভালো। স্পীচ কম্পিটিশানে প্রথম হওয়া মেয়ে ও। রেজাল্ট বের হলে দেখা গেলো মিশার অবস্থান প্রথম দশ জনের মধ্যে।

আমি চেয়েছিলাম মিশা মিসিসিপি স্কুল ফর ম্যাথস এন্ড সায়েন্স ( স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন) এ চান্স পাক, কারন আমি জানতাম এই স্কুলের এত ভাল পরিবেশে থাকলে মিশাকে নিয়ে আর ভাবতে হবেনা। আমার ধারনা সত্যি হয়েছে। এরপরে সেই মিশাকে নিয়ে আর ভাবতে হয়নি আগের মত। তবে একটা সমস্যা হচ্ছে, মিশার একদমই আত্মবিশ্বাস নেই। ও শুধু কাজ করে যায়, কাজের স্বীকৃতি পেলে ও সারা মুখে লজ্জা এনে এমন এক ভাব করে যে অন্যদের মনে হবে কোথাও কোন ভুল হয়েছে নিশ্চয়ই। এই স্কুলেও টুয়েলভ গ্রেডে ও আমাদেরকে না জানিয়ে ‘বিল গেটস’ স্কলারশীপের জন্য এপ্লাই করেছিল। দশটি এসে লিখতে হয়েছে নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর, স্কুলের পরিক্ষার গ্রেড, টিচারদের রিকমেন্ডেশান লেটারসহ আরও যাবতীয় আনুষঙ্গিক কাগজপত্রসহ এপ্লাই করার পরে দেখা গেলো সারা আমেরিকাতে এক হাজার জন নন আমেরিকান ছেলেমেয়ে এই স্কলারশীপ পেয়েছে, তাদের মধ্যে আমাদের মিশা একজন। এটা এমনই এক স্কলারশীপ, যা কিনা ও সারাজীবন মানে পিএইচডি করা পর্যন্ত পেয়ে যাবে। একই সময়ে মিশা লোকাল টিভি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত আরেকটি এসে কম্পিটিশানে ফার্স্ট হয়ে এক হাজার ডলারের চেক, টিভিতে সাক্ষাৎকার দেয়ার সুযোগ পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে ঐ স্কুল থেকেই একশ পঞ্চাশ জন স্টুডেন্ট এর মধ্যে যে সাতজন স্টুডেন্ট ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ রেজাল্ট করেছে, মিশা তাদের মধ্যে একজন।

মিসিসিপির প্রাইভেট কলেজ মিলস্যাপস কলেজে ওর নিজের ইচ্ছেয় ভর্তি হয়েছে। স্কলারশীপ পেয়েছে বিল গেটস ফাউন্ডেশান থেকে। চার বছরে ও এমন পরিচিতি লাভ করেছে কলেজে যা কিনা কেউ ধারনাও করতে পারবেনা। ঐ কলেজে বছরে একটাই কালচার‌্যাল প্রোগ্রাম হয়। মিশা প্রতিবার একঘন্টার পুরো কালচার‌্যাল অনুষ্ঠান তৈরী করা থেকে শুরু করে আমেরিকান ছেলেমেয়েদেরকে দিয়েই অনুষ্ঠানটি শেষ করেছে খুবই সফলভাবে। মিশার নাচের ভঙ্গীতে ছবি বেশ কয়েকবার নানা পত্রিকাতে ছাপা হয়েছে। আমার মিশা খুব ছোট থাকতেই টিভিতে হিন্দি গান দেখে দেখে হুবহু নায়িকাদের মত নাচ করতো। অস্ট্রেলিয়াতে থাকতে যে কোন অনুষ্ঠানে মিশার নাচ থাকতই। মিশা কোনদিন কোথাও নাচ শিখেনি, তারপরেও মিশা এমন ভাল নাচ করে যে কেউ বুঝতেই পারেনা এই মেয়ের নাচের উপর কোন শিক্ষা নেই। মিশার বাবার ছবি আঁকার হাত ছিল। আমার বড় মেয়ের ছবি আঁকার হাত ঈর্ষণীয় পর্যায়ের ভালো। আমি খুব গর্ব করতাম মৌটুসীর আর্ট নিয়ে। মিশা মনে মনে খুব রাগ হতো মনে হয় আমার আদিখ্যেতা দেখে। টুয়েলভ ক্লাসে একটা কোর্স নিয়েছিল আর্টের উপর। সেই বছর ও যে কয়টা আর্ট করেছে তার মধ্যে পাঁচটা আর্ট নানা কম্পিটিশানে ফার্স্ট হয়েছে। এরপরে মিশা আর্ট বাদ দিয়ে দিয়েছে। সে শুধু নিজেকে একবার যাচাই করে দেখতে চেয়েছিল আর্ট পারে কিনা। মিশার বাবার ফটোগ্রাফীতে হাত পাকা ছিল। মিশা এটা পেয়েছে। ওর ফটোগ্রাফী পর পর দুই বছর পুরস্কার পেয়েছে। গতবছর মিসিসিপিতেই ফটোগ্রাফীর অনলাইন কম্পিটিশান ছিল। একটাই ‘বেস্ট’ পুরস্কার ছিল। ১৫৯টি ফটোগ্রাফীর মধ্যে যেটি বেস্ট হয়েছে সেটি আমার মিশার তোলা। ‘আইপ্যাড’ পেয়েছে পুরস্কার হিসেবে।

গতবছর আমার এই মেয়ের গাড়ীকে ধাক্কা মেরেছিল আরেক গাড়ী। আমার মেয়েটার গাড়ী একেবারে দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে, ঈশ্বর আমাদের মেয়েটিকে প্রানে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এই একটা বিরাট দূর্ঘটনার পরে আমরা স্বামী স্ত্রী খুব বেশী হতভম্ব হয়ে গেছি। আমি এরপর থেকে কেমন যেনো হয়ে গেছি। শুধু ভাবি আমাদের মেয়েগুলো বেঁচে থাক। আমি আর রেজাল্ট নিয়ে ভাবিনা। আমার মিশার বয়স এখন ২১ বছর। এর মধ্যে কি ওর জীবনে বসন্ত আসেনি? হয়ত এসেছিল। হয়তো আমার মেয়ের মনে দুঃখ দিয়ে পাখী উড়ে গেছে। আমার মেয়েটার খুব খারাপ সময় গেছে কয়েকটা মাস। মেয়েকে অনেক কাঁদতে দেখেছি। আমার মিশা আমার সাথে খুব ফ্রি। ওর মনের কষ্টগুলো আমাকে ও বলে, যখন মনের ভেতর আর চেপে রাখতে পারেনা। আমি মা হিসেবে কেমন জানিনা, কিনতু আমি মেয়েদের দুঃসময়ে বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দেই। তখন মায়ের চোখ রাঙ্গানি বন্ধ থাকে। আমার মেয়েরা আমাকে খুব ভালো বুঝে। যাই হোক আমার মেয়ের সেই দুঃসময় কেটে গেছে সময়ের সাথে সাথে। ওর জীবনে অনেক ভালো ভালো বন্ধুরা এসে জুটে যায়। আবার কিছু ধুর্ত ছেলেমেয়েরাও জুটে। সবই আছে।

সেদিন মিশা দুঃখ করে বলেছে, “ মা, জানো আমি নিজেও জানতামনা এতবড় পুরস্কার পাব। এটা হচ্ছে সিক্রেট এওয়ার্ড। সবার বাবা মা এসেছে তোমরা ছাড়া। তোমাদের দেখিনি বলে আমিও বুঝেছি আমি এটা পাইনি। কিনতু আমার নাম ধরে ডাকতেই এত মানুষের সামনে আমি থতমত খেয়ে গেছিলাম”। মেয়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়েছে। ওর গ্র্যাজুয়েশান অনুষ্ঠানে গেছি। আগের দিনই দুপুরে যাওয়ার কথা ছিল। কিনতু এদিকে আমাদের ছোট মেয়ে মিথীলার একটা প্রোগ্রাম ছিল। সেটা বাদ দিয়ে যেতে পারলামনা। কিনতু আমার খুব ইচ্ছে করছিলো মিশার প্রোগ্রামে থাকতে। রাত নয়টার সময় একটা ককটেল পার্টি ছিল। ডিজে পার্টি। গিয়ে দেখি সবাই নাচছে। বাবা মা, বন্ধু বান্ধবী সবাই। আমার মিশা আমার হাত ধরে নিয়ে গেল ফ্লোরে। আমি যত বলি আমি নাচ করতে পারিনা মেয়ে তত বলে ওকে ফলো করার জন্য। কানের কাছে মুখ এনে বলে রাইট, এবার লেফট, হাত উঁচু করো, কোমড় একটু দোলাও। আমিও মেয়ের সাথে সাথে আনন্দের সাথেই নাচলাম। মেয়ে নিজের স্কলারশীপের পয়সায় বাবা মা-কে থাই রেস্টুরেন্টে ডিনার করালো। পরের দিন মেয়ে গ্র্যাজুয়েশান করে ফেললো।

মিশার জার্নি এখানেই শেষ হয়নি। মিশার স্বপ্ন ছিল এমরি ইউনিভার্সিটিতে ‘পাবলিক হেলথ’ এর উপর মাস্টার্স এন্ড পিএইচডি করার। ওর কলেজের ডীন রিকমেন্ডেশান লেটার পাঠিয়েছে। সেই লেটারের কপি মিশা আমাকে মেইল করেছে। লেটারটি পড়ে আমি অনেকক্ষন কেঁদেছি। সাফল্যের কান্না। আমরা দেশে ছিলাম রাজার হালে। আমেরিকাতে জীবন সংগ্রাম করে চলেছি। মেয়েগুলো এখনও একশতভাগ সৎ আছে। তিনজনেই তাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের এর বেশী কিছু চাওয়ার ছিলনা। যে মেয়েটির বাঁচার কথা ছিলনা, ছোটবেলাতেই কি ভয়ংকর সব অসুখ হয়েছিল, মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়ার যোগাড় হয়েছিল, সেই মেয়ে ভয়াবহ গাড়ী দূর্ঘটনায় পড়ে প্রাণে বেঁচেছে, সেই মেয়েটা আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে, ঈশ্বরতো ওর দিকে তাকাবেনই। ও এমরিতে চান্স পাবেনা তো কে পাবে! আমার মেয়েটি যে কয়টা ভালো ভালো ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করেছিল, সবগুলো থেকেই একসেপট্যান্স লেটার এসেছে। কিনতু মিশা যাবে ওর স্বপ্নের 'এমরী'তে।