Thursday, December 13, 2012

গেরস্ত সংবাদ!!



কাজ থেকে ফিরে ফেসবুক একটু চেক করে ব্লগের জন্য একটা লেখা তৈরী করছিলাম। সাথে ইউ টিউবে গান। হঠাৎ করেই ইন্টারনেট কানেকশান চলে গেলো, ল্যান্ড লাইনের ডায়াল টোন চলে গেল। এ ঘটনা নতুন কিছু না। এটা হতেই পারে এবং এমন হলে কানেকশান গুলো খুলে আবার লাগাতে হয়। কথা হচ্ছে, আমাদের কম্পিউটার আর ল্যন্ডফোনের কানেকটিং তারের চেহারা এমন আকার ধারণ করে

ছে, আমার সাধ্য নাই এগুলোকে সর্ট আউট করা। বাড়ীতে একজনই শুধু ইঞ্জিনীয়ার ( ঘরের কর্তাদেরকে ইঞ্জিনীয়ার ভাবা হয়), তাকে ডেকেও উপরে আনা যাচ্ছেনা দেখে মিথীলাকে বললাম ডেকে আনতে। মিথীলা ডাকতেই ইঞ্জিনীয়ার সাহেব মেয়েকে বললো, " আমি এসে কী করবো? তুমি হাই পোর্টের পাওয়ার কর্ড খুলে, মোডেমের পাওয়ার কর্ড খুলে-----------"। মিথীলা বলে, " পাপা কী বলছে, আমি তো কিছুই বুঝছি না"। উত্তরে বললাম, পাপাকে বলো, যা কিছু তোমাকে করতে বলছে, তার সবই আমি করেছি। কাজ হচ্ছেনা বলেই পাপাকে দরকার। মিথীলা জানে, ইন্টারনেট না থাকলে আমার মাথা গরম হয়ে যাবে, আমার মাথা গরম হওয়া মানেই ঘরে ১২ নাম্বার বিপদ সংকেত!! সে তাড়াতাড়ি নীচে গিয়ে পাপাকে কী ভুজুং ভাজুং দিয়ে উপরে নিয়ে এসেছে।

ইঞ্জিনীয়ার সাহেব উপরে এসেই বলে, আরে! তোমার এই ফোন কোম্পাণীর সব খারাপ। প্রতিদিনই তো এই ঘটনা ঘটছে।

-আমার ফোন কোম্পাণী হতে যাবে কোন দুঃখে? আমি ফোন সার্ভিসে চাকুরী করি বলে কী ফোনের যাবতীয় দায়িত্ব আমার?

-তুমিও পার! কী কাজ তোমার ইন্টারনেটে? অপেক্ষা করো আরো কিছুক্ষণ।

-দুই ঘন্টা অপেক্ষা করার পরেও আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো? তুমি একটু দেখো না, তারগুলো কোথা দিয়ে কোথায় গিয়েছে?

-আমি কী জানি! রেখে দাও এভাবেই, কাল সকালে লাইন আসবে।

-রেখে দেবো মানে! ইন্টারনেট ছাড়া বসে থাকবো?

-বাবারে! কী নেশারে! ইন্টারনেট না আসলে আমি কী করবো?

-তুমি ফোন করো ওদেরকে। ওরা টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিবে।

-তুমিই ফোন করো। তুমিই এদের কাছ থেকে লাইন নিছো, তুমিই ভালো জানো এদেরকে!

-আরে! ওরা যখন বলবে, সিম কার্ড বের করো, ঐ তারটা খুলে নাও, আমি তো এসব টেকনিক্যাল কথা বুঝবো না।

-খুব ভালো বুঝবে। তুমি না বুঝলে আমিও বুঝবো না। তার চেয়ে বরং অপেক্ষা করো, নিজে নিজেই ঠিক হবে।

মাথা আমার, ব্যথাও আমার। আমিই ফোন করলাম ফোন কোম্পাণীকে। ফোন সার্ভিসে চাকুরী করতে গিয়ে একটা উপকার হয়েছে, কায়দা করে কথা বলতে শিখে গেছি। পনের মিনিট লেগেছে আমার ফোন কানেকশান, ইন্টারনেট কানেকশান ফিরে আসতে। এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্ট, মোট তিন ডিপার্টমেন্টের এক্সপার্টের সাথে কথা বলার পর সব ঠিক হয়েছে।

এই ফাঁকে আমাদের ইঞ্জিনীয়ার সাহেব সেল ফোনে তার বন্ধুর সাথে খোশ গল্প জুড়ে দিয়েছে। ইশারায় তাকে বলি, এই কথা কম বলো, আমাদের ভাগের মিনিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে আবার উলটা ইশারায় আমাকে বকা দেয় মিনিটের হিসেব করি বলে। যদিও শেষ পর্যন্ত কথা সংক্ষেপ করে ফেলেছে ( নাহলে, মাসের শেষে যখন মিনিটে টান পড়ে, তখন দেখা যায়, উনিই আসামী)।

সার সংক্ষেপঃ সমস্ত লাইন ঠিক হওয়ার পর উনি বললেন,

-এই তো সব লাইন চলে এসেছে। আরে! কী সব কারবার এদের, দুই দিন পর পর লাইন চলে যায়! সব উলটা পালটা কাজ! তোমার পছন্দের কোম্পাণী, তুমিই সামলাও।

-লাইন চলে যায়, এটা তো ওদের দোষ না, নেটওয়ার্কে গোলমাল হতেই পারে। ওদেরকে ফোন না করলে ওরা জানবে কী করে যে আমাদের নেটওয়ার্কে সমস্যা! আর আমার পছন্দের কোম্পাণী বলেই মাসিক বিলও অনেক কম।

- বিল কম, সস্তার তিন অবস্থা! ( হাসতে হাসতে) । আর আমার তো অসুবিধা নাই, আমি কাউকে ফোন করিনা ( ভুলে গেছে, দশ মিনিট আগেই বন্ধুর সাথে খোশগল্প করার কথা), আমি ফেসবুকও করিনা, আমার ইন্টারনেটের দরকারও হয় না। তোমার এগুলি বেশী দরকার, কাজেই তুমিই ভালো বুঝবে। এই তো এখনতো পারলা, চেষ্টা না করেই আগেই একটা চিল্লাচিল্লি শুরু করে দাও।

- ভালো, আমাকে দেখে তো শিখতে পারো, কিভাবে মিষ্টি কথায় কাজ আদায় করতে হয়।

ডিসকাউন্টের ক্ষ্যাতা পুড়ি!!

ডিসকাউন্ট শব্দটি যে কোন ক্রেতার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি শব্দ। তা যে দেশেই হোক না কেনো! আমাদের দেশে সারা বছর গাউছিয়া মার্কেট, ঢাকা নিউ মার্কেট, হকার্স মার্কেটের প্রত্যেক ফ্লোরে বিশাল বড় বড় ব্যানার টাঙানো থাকে, যেখানে লেখা থাকে 'অমুক ফ্যাশান হাউজে বিরাট মূল্যহ্রাস"!  মূল্যহ্রাসে জিনিস কেনা কারো কারো নেশা, কারো বা প্রয়োজন, কিছুটা সুলভে জিনিস ক্রয় করা গেলে মন্দ কি! আমি প্রথম দলভুক্ত। কোথাও যদি মূল্যহ্রাসের খবর শুনতাম, পড়িমরি করে গিয়ে হাজির হতাম, অপ্রয়োজণীয় জিনিস কিনে এনে ঘর ভরাতাম, তবুও মনে এক ধরণের প্রশান্তি পেতাম, আমি শাড়ীটা অন্যদের তুলনায় অনেক কমদামে পেয়েছি ভেবে।

আমার স্বামী  এসব কাজে আমাকে  বাধা না দিলেও অনেক আগেই শুনিয়েছে, মূল্যহ্রাস বলে সত্যি কিছু নেই। ব্যবসায়ীরা মূলদাম অনেক বেশী দেখিয়ে মূল্যহ্রাসে যে দামের কথা লিখে, ওটাই আসলে ওদের সত্যিকারের বিক্রয়মূল্য। স্বামীর কথা বিশ্বাস না করলেও চলে, কারণ তারতো আর শাড়ীর ব্যবসা নেই, সে জানবে কী করে, কোথা দিয়ে কী হয়! তবে তার কথা ফেলে দেইনি,  কোন বাক বিতন্ডায় না গিয়ে নিজেকে সংবরণ করে নিয়েছিলাম।

আমেরিকায় এসে তো  দেখি  চারদিকেই রমরমা সেলের ব্যবসা। আমি তখনও ওয়ালমার্টে চাকুরী শুরু করিনি, তাই আমার কাছে সেলের আপডেটস থাকতো না। তবে যখন ওয়ালমার্টে চাকুরীতে ঢুকলাম, ধীরে ধীরে দেখি, ওদের সেল মানে সত্যিই সেল। দামের ট্যাগ পালটায় না। পূর্বমূল্য যেমন থাকে, সেখানেই সেল প্রাইস লাগানো হয়। সাত বছর চাকুরী করে এটা জেনেছি, এরা জাত ব্যবসায়ী। কাস্টমারকে এর টপ প্রায়োরিটি দেয়, ঠকায় না। কাজেই এখানে সেল মানে সত্যিই সেল।

সেল ছাড়াও আমাদের প্রতিটি এসোসিয়েটকে ওয়ালমার্ট ১০% ডিসকাউন্ট কার্ড দিয়েছে সারা বছর ব্যবহার করার জন্য।  গ্রোসারী বাদে যে কোন কিছু কিনলেই আমরা ১০% ডিসকাউন্ট পাই। তাছাড়া বছরে একবার ২০% ডিসকাউন্ট দেয়, যে কোন একটা আইটেমের উপর।  খুব দামী কিছু কিনতে হলে ২০% ডিসকাউন্টের জন্য অপেক্ষা করি। এবার ওয়ালমার্ট কর্তৃপক্ষ একটা আইটেমের বদলে এক ট্রলী আইটেমের উপর 'ওয়ান চান্স' ২০% ডিসকাউন্ট ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। তবে সাথে একটা সতর্কবাণীও বলে দিয়েছে, " ৬ ও ৭ ডিসেম্বার এর যে কোন একদিন তুমি প্রথম পারচেজের সময় ২০% ডিসকাউন্ট পাবে। কাজেই তোমার ডিসকাউন্ট কার্ডটি  ব্যবহার করার আগে দ্বিতীয়বার ভেবে নিও।   অসতর্কতা বশতঃ যদি কেউ একটা পানির বোতলও কেনে, ডিস্কাউন্ট কার্ড ব্যবহার করার সাথে সাথে অটোমেটিক ২০% ডিসকাউন্ট হয়ে যাবে। এক ট্রলি ভর্তি জিনিস যেখানে ২০% ডিসকাউন্টে পেতে পারতে, একটা পানির বোতলেই তা ব্যবহাত হয়ে যাবে। কাজেই সাবধান!

আমার হিসেব পাকা ছিল, কর্তাকে বলেছি বিকেলে ওয়ালমার্টে চলে আসতে, আমার এক ঘন্টা লাঞ্চ ব্রেক থাকবে, তখন দুজনে মিলে ট্রলি ভরে বাজার করবো, আর ২০% ডিসকাউন্ট পাবো। বলতে ভুলিনি, " শোন, নিজে নিজে কিছু কিনে ফেলো না, তাহলে কিন্তু প্রথম চান্সেই ডিস্কাউন্ট চলে যাবে"।  আমার পাকা হিসেবের সাথে আমার কর্তার হিসেব কখনও মিলে না। তার মতে,  ডিস্কাউন্টের ফাঁদে পা দিলে, ডাবল খরচ হয়। অপ্রয়োজণীয় জিনিস বেশী কেনা হয়। ২০ % ডিসকাউন্ট পেতে বাকী ৮০% পকেট থেকে বের হয়। আমি একেবারেই অমত করি না কর্তার হিসেবের সাথে, কারণ তার মত আমারও সাধারণ গণিতের মাথা খুব পরিষ্কার। কিন্তু ফাঁদে পা দেয়া যার স্বভাব, গণিতে পিএইচডি করা থাকলেও সে ফাঁদে পা দেবেই।

যাই হোক, টী ব্রেকে গেলাম কিছু খাবার কিনতে। আমার কিন্তু পেটে ক্ষিদে ছিল না, আমার আরেক লেখাতে আমি বলেছিলাম, আমার দৃষ্টি ক্ষিদে আছে। আমেরিকানদের অনেকেই সুযোগ পেলেই শুধু খায়, আর ওয়ালমার্টে যারা কাজ করে, তাদের খাওয়া দাওয়ায় বিরতি দেখি না। ব্রেক রুমে সবাইকে খেতে দেখলে আমারও খেতে ইচ্ছে করে। সেই ইচ্ছের চাপে পড়েই 'সুইট এন্ড সাওয়ার চিকেন' এর কয়েকখানা পিস তুলে নিলাম। চেক আউট করতে গিয়ে ২০% ডিস্কাউন্টের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অভ্যাসবশতঃ আমার ডিসকাউন্ট কার্ড ব্যবহার করতেই অটোমেটিক পদ্ধতিতে ২০% ডিস্কাউন্ট ব্যবহার করা হয়ে গেলো! চিকেনের টুকরোর মোট মূল্য ছিল দুই ডলার। ২০% ডিসকাউন্টে তার দাম পড়েছে এক ডলার ষাট সেন্টস। মাথাটা ঘুরে গেলো! ব্রেক রুমে ফিরে গিয়ে মুরগীর টুকরো মুখে দেই, কেমন যেনো বিস্বাদ লাগে! বুকটা ধড়ফড় করে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। কী ব্যাপার! হার্ট অ্যাটাক করবে না তো! এই যখন অবস্থা, স্বামীকে ফোন করে বিকেলে আসতে মানা করে দিলাম। কিন্তু স্বামীর কন্ঠস্বরে কোন তাপ উত্তাপ টের পেলাম না। এটা খারাপ লক্ষ্মণ, কোট করে রেখেছে, কোন এক আসরে সেটা ভাঙ্গবে। যাক গিয়ে, মরে তো আর যাই নি, নাহয় কিছু কিনবো না, সত্যিইতো, এইসব সেল-ফেলের ব্যাপার খুবই ভেজালের। বাজে জিনিসই সেলে দেয়, ভালো হলে তো আর সেলে দিতনা! মনকে স্বান্ত্বণা দেই, পাগল মন তো সান্ত্বণা মানে না। আবার স্বামীর শরনাপন্ন হলাম,

- আচ্ছা, কত বড় ক্ষতি হয়ে গেলো, বলোতো! আজ আমার খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, নিয়তি আমাকে টেনে নিয়ে গেছে"!

-তোমার শরীর ঠিক আছে তো! কথা শুনে তো মনে হচ্ছে, বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে তোমার! আরে! তুমি কি বুঝো না, এগুলি ওয়ালমার্টের বিজনেস পলিসি! রাখো তোমার ডিসকাউন্ট!

ফোন রেখে দিলাম। যার নুন খাই, তার গুণ গাই। ওয়ালমার্টের বদনাম সহ্য করতে পারি না। ওয়ালমার্টের দোষ কি! ভুল তো ওয়ালমার্ট করেনি। থাক, লাগবেনা আমার ডিসকাউন্ট। ডিসকাউন্টের ক্ষ্যাতা পুড়ি!

মাত্র ছয় দিন আগেই  ডিসকাউন্টের  ক্ষ্যাতা পুড়লাম,  লজ্জা থাকলে আর কখনও এ পথে পা বাড়ানোর কথা না! তবে আমি আবার পা বাড়িয়েছি।  গতকাল ব্রেকরুমে বসে চা খাচ্ছিলাম। এক টেবিল দূরে তিন চারজন কৃষ্ণাঙ্গী একসাথে বসেছে। তাদের মাঝে একজন  বিখ্যাত 'সাবওয়ে'র সাব স্যান্ডুইচ খাচ্ছিল আর চার জনে খাবার নিয়ে কথা বলছিল।  ওয়ালমার্টে 'সাবওয়ে'র একটা স্টল আছে। সাব ওয়ে স্যান্ডুইচকে সবাই খুব 'হেলদি খাবার' হিসেবে ধরে। কারণ এই স্যান্ডুইচে তেলে ভাজা কিছু ব্যবহার করা হয় না। সব বেক করা, আর ভেজটেবল থাকে ভেতরে। আমার মেয়েরাও ভালোবাসে সাবওয়ের স্যান্ডুইচ। আমার ভালো লাগে না। ওরা বলাবলি করছিল, ডিসেম্বার মাসে ওয়ালমার্ট এসোসিয়েটদের জন্য ৬ ইঞ্চি সাব স্যান্ডুইচ মাত্র দুই ডলারে দেয়া হবে।  ছয় ডলার দামের স্যান্ডুইচ মাত্র দুই ডলারে? নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওদের জিজ্ঞেস করলাম, " এটা কি কোন এক বিশেষ ধরণের স্যান্ডুইচ, নাকি যে কোন ছয় ইঞ্চি স্যান্ডুইচ"? ওরা বলল, যে কোন ছয় ইঞ্চি স্যান্ডুইচ। আমি তো বাইরের খাবার খুব একটা খাই না, আমার মেয়েরা খায়। তাই ভাবলাম, ঠিক আছে, মিথীলা  সাব স্যান্ডুইচ এত পছন্দ করে, প্রতিদিন মিথীলার জন্য নিয়ে যাব স্যান্ডুইচ। 'সাবওয়ে'কে মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম।

বাড়ী ফিরেই আমি মিথীলাকে বলেছি, পরের দিন স্কুল থেকে ফিরেই সে তার প্রিয় খাবার পাবে। মিথীলা ভদ্রতা করে অবশ্য খুব আস্তে করে ' না, থাক লাগবে না' বলেছে, আমি তা হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। বলেছি, ' কী যে বলো, দুই ডলারে দিচ্ছে যখন, পুরা ডিসেম্বার মাসে তোমার জন্য সাব স্যান্ডুইচ আনা হবে"। আজ আমার লাঞ্চ ব্রেক ছিল দুপুর দেড়টায়। আমি সরাসরি সাবওয়ে' তে ঢুকে দুইটা স্যান্ডুইচের অর্ডার দিলাম। মিথীলা ও মিথীলার পাপার জন্য। মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, স্যান্ডুইচের ভেতর কী কী ফিলিং চাই। বললাম, চিকেন দাও।

-ভেজিটেবল বা চীজ দেবো?
-অবশ্যই দিবে। এখানে যা যা আছে, তার সবই দাও একটু একটু করে।
মেয়ে দুটো স্যান্ডুইচ সাজাচ্ছিল, আমি ভাবছিলাম, এমন হেভী স্যান্ডুইচ ওরা কিভাবে দুই ডলারে দিচ্ছে! সবশেষে মেয়েটি জানতে চাইল, কোন সস দেবো?
সসের কথা বলতে সংকোচ হচ্ছিল। এমনিতেই কত কিছু দিয়েছে, আবার সস চাই কোন মুখে! অথচ আমি জানি,  মিথীলা হানি মাস্টার্ড সস, র‌্যাঞ্চ ড্রেসিং, মেয়োনিজ খুব পছন্দ করে। বলবোনা বলবো না করেও বলেই ফেললাম, দাও একটু মাস্টার্ড সস দিয়ে দাও। স্যান্ডুইচ র‌্যাপ করে আমার কাছে দিয়ে বিল করলো, দশ ডলার।

-দশ ডলার কেনো? তোমাদের দুই ডলার স্যান্ডুইচ  পুরো ডিসেম্বার মাস জুড়ে চলার কথা তো?
-সেটা অন্য ডিল। মিটবল স্যান্ডুইচ, সাথে কোক। দুই ডলার।
-আর এটা কী ডিল? রেগুলার ডিল?
-হ্যাঁ, রেগুলার ডিল।
-ঠিক আছে, দাম রাখো। তোমরা ডিস্কাউন্ট কার্ড নাও না?
-ডিসকাউন্ট কার্ড নেই, তবে অন্য স্যান্ডুইচের সাথে।
-বাপ রে!, এত রকম সকম কেন?
-আচ্ছা, তোমার থেকে ডিসকাউন্ট রাখছি, তুমি দাও আট ডলার পঁচাত্তর সেন্ট।
-ক্রেডিট কার্ড তো তোমার কাছেই দিয়েছি, যা রাখার রেখে দাও।

স্যান্ডুইচের ব্যাগ হাতে গাড়ীতে উঠলাম। একটু বোকা বনে গেছি, তবে মেয়ের জন্য, মেয়ের বাবার জন্য খাবার নিচ্ছি, দাম কোন ব্যাপার না। ব্যাপারটা হচ্ছে, সেল বা ডিস্কাউন্ট শুনলেই এখনও আমার মাথা 'আউলা' হয়ে যায়, এটা ভেবেই বিব্রত হচ্ছি। কী বোকা বনে গেলাম! কী ছাতার স্যান্ডুইচ, তাও আবার নয় ডলার! ধুস! মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো।

 গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছি বাড়ীর দিকে, উলটো দিক থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে পুলিশের গাড়ী, পরপর কয়েকটা। পুলিশ আমার কোন ক্ষতি করে নি আজ পর্যন্ত, তারপরেও পুলিশ বা পুলিশের গাড়ী দেখলেই ভয়ে আমার বুক কাঁপে। পুলিশের তাড়া দেখে ভাবছি, হয়তো কাছে পিঠে কোথাও বিরাট  অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। বাড়ী পৌঁছে আধঘন্টা সময় থেকে আবার কাজে ফিরে যাচ্ছিলাম।  কাজে ফিরে যাওয়ার সময় আমার সামনে একটি স্কুলবাস, পেছনে আমার গাড়ী। হঠাৎ করেই স্কুলবাসটি ডানদিকে ঢুকে যেতেই দেখলাম সামনের দিকে পুলিশের গাড়ী থামানো, চকরি বকরি আলো ঘুরছে। বুঝতে পারছিলাম না, কি করা উচিৎ। স্কুল বাসের পেছনে পেছনে ডানদিকে চলে গেলেই হতো, তা না করে আমি সোজা গেলাম। ঠিক যে স্টপ সাইনে আমি রাইট টার্ণ নেবো, সেই টার্নের মুখেই চার পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে, পাশে দুইটি আলো ঝলকানো গাড়ী থামানো। সবাইকে ইশারায় সামনে যেতে বলছে। আমি পড়ে গেছি বিপদে, আমার দরকার ডানে ঘোরা, আমি সামনে গিয়ে কোথায় যাবো? পেটের ভেতর মোচড়াতে লাগলো। আমি তো রাস্তা-ঘাট চিনিনা, উলটো ঘুরাণোর উপায়ও নেই। ভাবলাম, পুলিশকে বলি, আমাকে ওয়ালমার্ট যেতে হবে। আমার গাড়ী স্লো হতে দেখে দূর থেকে পুলিশটা মনে হয় আমাকে একটা বকা দিল, গাড়ী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি না বলে। পেছন থেকে অন্য গাড়ী হর্ণ বাজাতেই ভয়ের চোটে আমি আন্দাজেই সামনে ছুটিয়ে দিলাম। ডানে বা বাঁয়ে পার্ক করে যে স্বামীকে ফোন করবো, সেই উপায়ও নেই।  সামনে যেতে যেতে আন্দাজেই ডানপাশের এক রাস্তায় ঢুকে গেছি। এই রাস্তা দিয়ে আমি জীবনেও আসিনি। রাস্তা কেমন যেনো ঢালু হয়ে নীচে নেমে গেছে। কোথাও থামানোর জায়গা নেই। ঢালু দিয়ে নামতে নামতে সামনেই দেখি একটা স্টপ সাইন দেখা যাচ্ছে, সেখানে তিন জন ফায়ার ব্রিগেড কর্মি দাঁড়িয়ে গল্প করছে, পাশেই ছোট ফায়ার ব্রিগেড  ট্রাক থামানো আছে। আমি স্টপ সাইনে থেমে হাত ইশারা করে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ওরা গল্পে মশগুল, দিলাম একটা হর্ণ বাজিয়ে। আওয়াজ শুনে সবাই আমার দিকে তাকাতেই আমি হাত তুলে দেখালাম। এই হাত তুলার মানে সকলেই বুঝে, নীড হেল্প। একজন কাছে এগিয়ে আসতেই জানালার কাঁচ নামিয়ে বললাম,

-আমি এখন ওয়ালমার্টে ফিরে যাচ্ছি, রাস্তা ঘুরিয়ে দিয়েছে পুলিশ, আমি জানিনা এখান থেকে কিভাবে যেতে হয়!

ভদ্রলোক হেসে দিয়েছে, আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে, " চিন্তা নেই, সোজা যাও, ওই যে স্টপ সাইন দেখছো, ওখানে রাইট টার্ণ করবে, তারপর সোজা গিয়ে লেফট টার্ণ করলেই তোমার চেনা রাস্তায় পড়বে"।

-অনেক ধন্যবাদ। মনে হয় পারবো।

তার নিশানামত এগিয়ে দেখি সেখানেও তিন গাড়ী পুলিশ। কী অবস্থা! কোথায় কী হয়েছে কে জানে! চারপাশে তো কোন অ্যাকসিডেন্টের চিহ্নও নেই! আমার চেনা রাস্তায় পড়তেই মনটাতে শান্তি ফিরে পেলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবনে আর ডিসকাউন্ট, সেল, মূল্যহ্রাসের মত 'ফালতু' ব্যাপারে নিজেকে জড়াবো না। দুই ডলারে সাব স্যান্ডুইচের কথা শুনে যদি না নাচতাম, তাহলে লাঞ্চ ব্রেকে ওয়ালমার্টের ব্রেকরুমে বসে নিজের খাবার খেতাম আর উপন্যাসের পান্ডুলিপি এডিট করতাম। এরেই বলে পোড়া কপাল।  যত্তসব, ডিসকাউন্টের ক্ষ্যাতা পুড়ি!  মাঝখান থেকে পুলিশের বকা খেয়ে চরকী ঘুরে আসলাম!

আচ্ছা, পুলিশটা কি আমাকে সত্যি সত্যিই বকা দিয়েছিল? তার তো বকা দেয়ার কথা না, আমি বিপদগ্রস্ত পথিক, আমাকে সাহায্য না করে বকা দিবে কেন? আফসোস হচ্ছে, ভাল করে খেয়াল করে দেখলেই হতো, সত্যিই বকা দিয়ে থাকলে পুলিশের বিরুদ্ধে 'স্যু' করে দেয়া যেতো। 'স্যু' শব্দটি আমেরিকায় এসেই শিখেছি। এদেশে সকলেই সকলের বিরুদ্ধে 'স্যু' করার হুমকী দেয়। তা আমিও না হয় দিলাম একটা হুমকী! মামলায় জিতলে অনেক টাকা তো পেতাম! ঐ যে দেখো, আবার ফাও তালে খাওয়ার শখ হচ্ছে! স্বভাব যাবে কোথায়!


Tuesday, December 11, 2012

রোস্টেড টার্কী--যে স্বাদ ভুলবার নয়!!!

ছোট ছোট তিন মেয়েকে সাথে নিয়ে  আমেরিকা এসেছি ২০০১ সালের ১১ই অক্টোবার। আমার স্বামী  ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সেলেম ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার চাকুরী নিয়ে এসেছিলেন। সেলেম খুবই ছোট ইউনিভার্সিটি শহর।  জনবসতি খুবই কম। তার উপর বাঙ্গালীর কোন নাম গন্ধই ছিল না। দিন পনের সেলেম শহরে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।  মানুষের মাঝে থাকার জন্য ক্লার্ক্সবার্গ নামে অপেক্ষাকৃত জনবহুল এবং বড় শহরে আমরা বাসা ভাড়া নিয়ে চলে আসি। দেশ থেকে চাট্টি বাট্টি গুটিয়ে চলে এসেছি, মনের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিদিন তিন মেয়েকে সাথে নিয়ে ঠ্যাং ছড়িয়ে কাঁদতে বসি। এমনিতে আমি কাঁদিনা, ছিঁচকাঁদুনে বলতে যা বুঝায়, আমি তার ধারে কাছেও নই। ছোটবেলায় মা-বাবার কড়া শাসনে থেকেও কাঁদেনি যে মেয়ে, সে কিনা আমেরিকার মত এমন রাজকীয় দেশে এসে কান্নাকাটি শুরু করে দিল!

স্বামী বেচারা আমাদের নিয়ে কিছুটা ফাঁপরে পড়ে গেছে! আমেরিকা যাব, আমেরিকা যাব বলে আমিই সবচেয়ে বেশী আবদার করতাম। আমেরিকা নিয়ে আমার স্বামীর বেশ আহ্লাদীপনা থাকলেও বাংলাদেশেই সে মহাসুখে ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতো, ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল, কী করতে যে আমার কথা শুনতে গেলো! আমার কথা শুনেই তো আমেরিকার দুই একটা ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করেছিল। সেলেম ইউনিভার্সিটি থেকে তাকে  জব অফার দিয়েছেই যখন, তখন স্ত্রীর এই আকাংক্ষাটুকু পূরণ করতে অসুবিধা কোথায়! এই ভেবেই ভদ্রলোক চাকুরীটি নিয়ে ফেলে। কিন্তু তখন স্ত্রীকে আর জানায়নি, বাঙ্গালী বিবর্জিত পাহাড়ী রাজ্যে সবাইকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে একটি চাইনিজ গ্রোসারী শপ পর্যন্ত নেই। পৃথিবীর সব দেশের আনাচে কানাচে ইন্ডিয়ান প্যাটেল ব্রাদার্সের গ্রোসারী শপ থাকে, অথচ ব্যতিক্রম শুধু সেলেম, ক্লার্কসবার্গ আর ব্রীজপোর্ট নামের তিনটি শহর! আমার কান্নাকাটি বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল। বাঙ্গালী নেই ব্যাপারটি তবুও মেনে নেওয়া যেত, ঘরে প্রচুর গল্পের বই ছিল, দুই বছর বয়সী ছোট মেয়েটা ছিল, সময় কাটতে পারতো। কিন্তু সমস্যা হলো রান্না করতে গিয়ে। মাছ, ডাল, কাঁচামরিচের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জিনিসের অভাবে আমার রান্নাঘরে ঠিকমত চুলাই জ্বলতো না। শুধু চিকেনের ঝোল রাঁধতে আর কতক্ষণই বা লাগে! কাঁচামরিচ ছাড়া আমার খাওয়া হয় না, ডাল ছাড়া ছোট বাচ্চাটা খেতে পারেনা, আমার কান্নাকাটি করার রাইট আছে ঘোষণা দিয়েই আমি কাঁদতে বসতাম।

ইউনিভার্সিটিতে ডঃ ব্রুস আমার স্বামীর খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেলো। ব্রুস আর নোরা, খুবই ভাল দম্পতি।  নোরা আঞ্চলিক সংবাদপত্র অফিসে চাকুরী করতো। বন্ধুত্ব হওয়ার পরে আমার স্বামী ব্রুসকে বোধ হয় বলেছে,

" তুমি তো তোমার বউ নিয়ে ভালই আছ,  এদিকে আমার  অবস্থা কেরোসিন! ঘরে গিয়ে দেখি হাঁসের বাচ্চাদের নিয়ে হংসরাণী ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে কাঁদে। তোমাদের দেশের এত প্রশংসা আমি করেছি বৌয়ের কাছে যে এই দেশে আসার জন্য সে মরীয়া হয়ে গেছিল। আমিও বউকে খুশী করার জন্য এখানে নিয়ে এলাম। এখন পরে গেছি মহা ফাঁপরে!

-কী সমস্যা তোমার!

-আরে! আমি কী জানতাম যে তোমাদের শহরগুলোতে কোথাও কোন এশিয়ান স্টোর নেই! আমার বউ হট পেপারে ঘচ করে একটা কামড় না দিয়ে ভাত খেতে পারেনা। আর ভাতই বা কোথায় পাবে! আংকেল বিন নামের যে চালের প্যাকেট পাওয়া যায়, এতো আর আমাদের দেশের কালোজিরা চালের মত না। এগুলি হচ্ছে আমাদের দেশের ইরি চালের মত। বউ  মোটা চালের ভাত খেতে পারেনা। হয়তো বা পারতো যদি সাথে কাঁচামরিচ থাকতো।

-আহারে! তোমাদের তো খুবই কষ্ট হচ্ছে! দেখি আমার বউয়ের সাথে কথা বলে। সে তো তার চাকুরীর সুবাদে অনেক খোজ খবর রাখে। যদি কোন এশিয়ান স্টোরের খোঁজ পায় তাহলে তোমাকে নিশ্চয়ই জানাবো।


একদিন বাড়ীর কর্তা ইউনিভার্সিটিটি থেকে খুব খুশীমনে বাড়ী ফিরেছেন। আমাদের মা-মেয়েকে একসাথে পেয়ে খুবই উচ্ছ্বাসের সাথে বললেন,
-আগামী বৃহস্পতিবার তোমাদেরকে ব্রুসের বাড়ী নিয়ে যাব। ওদের বাড়ীতে আমাদের সবার নিমন্ত্রণ।
মেজোমেয়ে আনন্দ মনে চেপে রাখতে পারেনা, এক লাফ দিয়ে উঠলো, - সত্যি সত্যি, আমাদের নিমন্ত্রণ!
-হ্যাঁ, সত্যি সত্যিই নিমন্ত্রণ। টার্কী রোস্ট খাওয়াবে। ঐদিন থ্যাঙ্কস গিভিং ডে।

আমি প্রশ্ন করলাম, নেমন্তন্ন কি দুপুরে নাকি রাতে?
-তা তো জিজ্ঞেস করিনি, বলেছে থ্যাঙ্কস গিভিং ডিনার! ডিনার যখন, তখন তো রাতেই হওয়ার কথা, তবুও জিজ্ঞেস করে দেখবো। ঐদিন নাকি আস্ত টার্কী রোস্ট করা হবে। ব্রুস নিজেই নাকি রোস্ট বানাবে!

-টার্কী কোনগুলিরে বলে?

-মুরগীর মতই তবে অনেক বড়।

-আমাদের ছোটবেলায় বাড়ীওয়ালার বাড়ীতে মুরগী পালতো, কয়েকটার গলাতে কোন লোম ছিল না, আমরা বলতাম গলা ছোলা মুরগী, আবার অন্যেরা বলতো, তিতির'। ঐ রকমই নাকি?

-তা জানিনা, হবে হয়তো বা ওরকমই কিছু একটা।

-থ্যাঙ্কস গিভিং মানে কি?
-এটা এখানে একটা উৎসব। ক্রীসমাসের মতই কিছু একটা ব্যাপার হবে। আমি অবশ্য অত ইতিহাস জানিনা। যাচ্ছিই তো, ব্রুসের বৌকে জিজ্ঞেস করে দেখো। নোরা তো লেখালেখি করে, বলতে পারবে।


দু'দিন পরেই জানা গেল, নেমন্তন্নের সময় দিয়েছে বেলা বারোটা। ভেতরে ভেতরে খুবই এক্সাইটেড ফিল করছিলাম। আমেরিকা এসেছি প্রায় দুই মাস হতে চললো, একটা পরিবারের সাথেও পরিচয় হলোনা আমার, নেমন্তন্ন তো দূরের কথা। দেশে থাকলে এই দুই মাসে কতজনকে নিজের বাড়ীতে ডাকতাম, নিজেও কতজনের বাড়ীতে গিয়ে আড্ডা মেরে আসতাম! সাধের আমেরিকায় এসে বন্দী হয়ে গেছি! ব্রুসের বাড়ীতে যাওয়ার উৎসাহ বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে, আস্ত টার্কী রোস্টের কথা শুনে। আমি বরাবর মুরগীর মাংস খেতে ভালোবাসি। গত দুই মাসে মুরগীর ঝোল খেতে খেতে তিতি বরক্ত হয়ে গেছি। বৃহস্পতিবার জিভের স্বাদটা একটু বদলাবে। ওরা কী ঝাল খায়? মনে হয় খায় না! ওরা কি মাংসে আদা, রসুন, পেঁয়াজ   দেয়? নিশ্চয়ই দেয়! মরিচের গুঁড়া না থাকলে গোলমরিচের গুঁড়া তো অবশ্যই পাওয়া যাবে। ঠিক আছে, তাই সই। সবকিছু ঠিক থাকলে কাঁচামরিচের বদলে না হয় গোল মরিচের গুঁড়াই মিশিয়ে নেয়া যাবে। বাচ্চাদের মত করেই নানা রঙের ভাবনায় ডুবে ছিলাম। স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম,

-আমেরিকান সাহেবের বাড়ীতে শাড়ী পড়ে যাবো নাকি শার্ট-প্যান্ট পড়তেই হবে?

-তোমার যে ড্রেস পড়তে ভালো লাগে, সেটাই পড়বে। আমেরিকানরা পোশাক নিয়ে মাথা ঘামায় না।

-ঠিক আছে, আমি তাহলে শাড়ী পড়েই যাব। আচ্ছা, আরও অনেক মানুষ আসবে?

-তা তো জানিনা, আসলে আসতেও পারে। ওর অন্য বন্ধুদেরকে যদি বলে থাকে!

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আমাদের মা-মেয়েদের মধ্যে বেশ একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেলো। আমার স্বামীর মুড খুব ভালো আছে, কারণ গত তিন চারদিন আমি কান্নাকাটি করিনি। ব্রুসের বাড়ী আস্ত টার্কী রোস্ট খাওয়ার ভাবনায় মজেছিলাম। আমেরিকান সাহেবের বাড়ী যাচ্ছি আমি, বেছে বেছে 'লাল-সবুজে' ছাপা সিল্কের শাড়ী পড়লাম। দেশকে রিপ্রেজেন্ট করার ব্যাপার আছে তো! মেয়েদেরকে পড়ালাম বাংলাদেশী ব্লগ ছাপা জামাকাপড়। স্বামীকে পড়তে বললাম পা-জামা -পাঞ্জাবী। নভেম্ববারের শেষ, চারদিকে শীতের কনকনে বাতাস, আমাদের পোশাক নির্বাচন মোটেও ঠিক হয়নি! কিন্তু কী আর করা, ব্রুসের বৌ তো এখানের পত্রিকায় রিপোর্টার। বলা তো যায় না, আমাদেরকে নিয়ে একটা রিপোর্টও করে ফেলতে পারে! 'বিদেশে একা' শিরোণামে! কত কিছুই ভাবছিলাম!


গাড়ী পাহাড়ী রাস্তা ধরে এঁকে বেঁকে একসময় ব্রুসের বাড়ীর আঙিনায় এসে পৌঁছালো। ব্রুসের বৌ নোরা সবার আগে আমাদের গাড়ী দেখতে পেয়েই দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নোরা খুব সুন্দরী, লম্বা স্কার্ট পড়েছে, মাথার কোঁকড়া চুলগুলো পিঠের উপর ছড়ানো, ফুল শ্লীভ শার্ট গায়ে নোরাকে দেখতে রাশিয়ান গল্পের বইয়ে আঁকা মেয়েদের মত লাগছিল। নোরা এগিয়ে এসে আমাকে 'হাগ' দিল, বাচ্চাদেরকে হেল্লো বললো, ছোট মেয়ের গাল দুটো টিপে দিল। প্রথমেই নোরা আমাদের মন জয় করে ফেললো। বাড়ীর ভেতর ঢুকে দেখি চারদিকে শুনশান নিরবতা। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় ইংরেজীতে সব সময় খুব ভাল নাম্বার পেয়েছি, ভাবতাম ইংলিশে কথাও বলতে পারবো ফটর ফটর করে। বাস্তবে দেখলাম, মুখ থেকে 'ইয়েস' 'নো' 'ভেরী গুড' 'থ্যাঙ্কস' ছাড়া একটাও কথা বের হচ্ছে না। স্বামীর পিঠে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করি,

-আমরা কী ভুল সময়ে এসে পড়লাম? ডিনার বলেছে, আর আমরা এসেছি দুপুরে!

-আরে! ব্রুস নিজে টাইম দিয়েছে বেলা বারোটা।

-তাহলে রান্নার কোন গন্ধ পাচ্ছি না তো! টার্কী রোস্ট করলে, মাংসের গন্ধে চারদিক ম ম করার কথা। তাছাড়া আর কোন লোকজনও দেখছি না।

এবার মেজোমেয়ে একটু বিরক্ত হয়ে গেলো মায়ের উপর। বলল, -মা, ওদের বাড়ীটা ত অনেক বড়, কিচেন মনে হয় অনেক দূরে, সেজন্যই রান্নার গন্ধ পাচ্ছ না। আর কেউ না থাকে তো ভালই হয়েছে, টার্কী রোস্ট শুধু আমরাই খাব। আমাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই ব্রুসকে নিয়ে নোরা ফিরে আসলো। ব্রুস এসেই হই হই করে কথা বলা শুরু করলো। আমি তখনও জানতাম না, ওরা নিঃসন্তান। আর কাউকে না দেখে আমি জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,

-বাড়ীতে আর কেউ নেই?

-নোরা বললো, আমরা তিনজনই থাকি এই বাড়ীতে। আমি, ব্রুস আর রাসটি। বলেই রাসটি কে নাম ধরে ডাকতেই ইয়া বিশাল এক কুকুর এসে হাজির। কুকুরের গলায় আদর করতে করতে নোরা বললো, এই যে আমাদের একমাত্র সন্তান 'রাসটি'।

-বললাম, আর কেউ কি আসবে?

-নাহ! শুধু তোমরা আর আমরা। থ্যাঙ্কস গিভিং ডিনারে আমরা প্রতি বছর একজন বন্ধুকে ডাকি। এ বছর ব্রুসের সাথে তোমার হাজব্যান্ডের খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়েছে। তাই এ বছর তোমাদের ডেকেছি।

কিছুক্ষণ গল্প করে আমাদেরকে নিয়ে ওরা সরাসরি খাওয়ার টেবিলে চলে গেলো। ছিমছাম সাজানো সংসার। সোভিয়েত রুপকথা পড়ার সময় এমন একটা বাড়ির ছবিই আমি সব সময় কল্পনায় দেখতাম। ছয়জন বসতে পারে এমন একখানি টেবিলে ধবধবে সাদা চাদর বিছানো, ছ'খানা কাঠের চেয়ারও পাতা আছে। আমার ছোট মেয়েটির জন্য এক্সট্রা টুল এনে পেতে দিয়েছে নোরা। প্রতিটি জিনিসে সুক্ষ্ম রুচীর ছাপ লেগে আছে।  ঘরের দেয়ালে দুটি ছবি টাঙানো আছে। একটি ছবিতে 'টার্কী মহারাজ' পেখম তুলে দাঁড়িয়ে আছে, আরেকটি ছবিতে শুধুই  গাছপালার সারি। টার্কীর ছবি দেখে মনে হচ্ছিল যেনো একটি ময়ুর পেখম তুলে দাঁড়িয়ে আছে।  এসব ছাপিয়ে আমি চারদিকে চোখ বুলাতে লাগলাম। এক কোণে দেখি লম্বা ডিজাইনের একখানা বেঞ্চের উপর কয়েকটি খাবারের পট ঢাকা দেয়া আছে।  মনে মনে নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। ব্রুস চলে গেলো ভেতরের ঘরে। নোরা আমাদের বসতে বলে নিজেও একখানা চেয়ার টেনে বসে গেলো। আমরা বসতে না বসতেই বাড়ীর হোস্ট, ডঃ ব্রুস ভেতরের ঘর থেকে বিরাট বড় একটা ট্রে হাতে এসে ঢুকলো। ট্রের মধ্যেই বসানো আছে আমাদের সেই পরম আকাংক্ষিত 'টার্কী মহারাজ'।

সবাই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলাম! কেন দাঁড়িয়ে পড়লাম তা বলতে পারছি না। উনারা আমাদের জন্য এত আন্তরিকতা দেখাচ্ছে, তার প্রতি সম্মান জানাতেই বোধ হয় দাঁড়িয়েছি, আমার দেখাদেখি আমার মেয়েরা। টার্কীর সাইজ দেখে মনের ভেতর গুড় গুড় আওয়াজ টের পাচ্ছিলাম, এ তো কোনভাবেই আমার দেখা সেই 'গলাছোলা মুরগী বা তিতির' হতে পারে না! এ তো দেখি সাইজে সত্যিই ময়ুরের মত। এত বড় পাখীটাকে আস্ত রোস্ট করা, খুব সোজা কথা তো নয়! আমাদের সকলের হাতেই ছুরী আর কাঁটা চামচ ধরিয়ে দিয়ে সকলের আগে ব্রুস এগিয়ে গেল। রোস্টেড টার্কী কাটার নিয়ম আছে, শুধু কেটে নিলেই হবে না, টার্কী খাওয়ারও কিছু নিয়ম আছে। ব্রুস বলে চলেছে তার কথা, আর আমি মনে মনে হিসেব কষছি অন্যভাবে। টার্কীর শরীরে শুধুই চামড়ার আস্তরণ। কোথাও কোন মশলার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে  না, বাতাসে  মশলার কোন গন্ধও ভাসছে না! কিভাবে টার্কীটা রোস্ট করলো, সে সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসও পাচ্ছি না! আমেরিকান সাহেবের সাথে ইংলিশে বাতচিত করার মত হিম্মত তখনও আমার ছিল না। সবার সামনে স্বামীকেও কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল না। ভাবলাম, দেখি সবাই কী করে! আমিও তাই করবো।

ব্রুস টার্কীর পেটের ভেতর থেকে চামচে করে আটার দলার মত জিনিস কুরিয়ে কুরিয়ে বের করতে লাগলো। পেটের ভেতরের জিনিসে বাদাম, কিসমিস, শুকনো ক্র্যানবেরী মেশানো দেখা যাচ্ছে। ব্রুসের কাছেই জানলাম, পেটের ভেতরের এই পদার্থকে বলে 'স্টাফিন'। পাউরুটির গুঁড়োর (ব্রেড ক্রাম্ব) সাথে শুকনো ফল, নানা রকম সস মিশিয়ে মেখে টার্কীর পেটের ভেতর ভরে দিয়ে টার্কীটাকে আভেনে ঢুকিয়ে দিতে হয়। টার্কীর পেটের মধ্যে থেকেই ওটা সেদ্ধ হয়ে যায়, বাইরে থেকে জল মেশাতে হয় না, টার্কীর বডি থেকে যে জুস বেরিয়ে আসে, তাতেই সমস্ত স্টাফিং রান্না হয়ে যায়। রান্না-বান্নার প্রতি ইন্টারেস্ট আমার ছোটবেলা থেকেই। জিজ্ঞেস করলাম, টার্কী রোস্ট কিভাবে করতে হয়। ব্রুস পেশায় শিক্ষক, কথা বলার সময় শিক্ষকসুলভ ভঙ্গী চলে আসে। ব্রুসের কথা বলার স্টাইলটি আমার কাছে নতুন কিছু মনে হয় নি। নিজে সংসার করি শিক্ষকের সাথে, সারা গুষ্ঠীতে শিক্ষকের ছড়াছড়ি। তাই ব্রুসের লেকচার শুনতে ভাল লাগছিল।

একটি গোটা টার্কীকে আগের রাতে ম্যারিনেট করতে হয়। ম্যারিনেট করার ব্যাপারটি ব্যক্তি পছন্দের উপর নির্ভর করে। যার যেভাবে খুশী, সে সেভাবেই তা করতে পারে। ব্রুস আগের রাতে টার্কীটাকে ভিনিগার, সয়াসস, গোল মরিচের গুঁড়ো আর অল্প লবন দিয়ে মেখে রেখেছিল। আজ সকালে ওটাকে সে প্রথমে বেকিং ট্রেতে বসিয়ে আগে থেকে তৈরী করে রাখা ব্রেডক্রাম্বের মন্ড টার্কীর পেটের ভেতর ঢুকিয়ে পেটের মুখটা সুঁই সূতোয় সেলাই করে দিয়েছে যেন রান্নার সময় কিছুই বের হয়ে না আসে। এবার বড় একখানা কুকিং টাবে টার্কীটাকে বসিয়ে টাবটি আভেনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। টেম্পারেচার মেইনটেইন করার জন্য বেকিং থার্মোমিটারও একটা টার্কীর বডিতে ফিট করা হয়েছে। আভেন আগে থেকেই প্রিহিটেড করা ছিল। আভেনের তাপমাত্রা সেট করা হয়েছে ৩৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লেগেছে টার্কী পুরোপুরি সেদ্ধ হতে। একটা ছোট বাটিতে একখানা ডিম আর অলিভ অয়েল একসাথে ফেটিয়ে রাখা ছিল। আভেনে বেকিং হওয়ার ফাঁকে  কিছুক্ষণ পর পর অলিভ অয়েল -ডিম মিক্সচারে ব্রাশ চুবিয়ে নিয়ে সেই ব্রাশটি  টার্কীর বডিতে বুলিয়ে দিয়েছে। তাতে করে উপরের এই সোনালী রঙ তৈরী হয়েছে।

টার্কী রোস্টের পদ্ধতি শুনে মনে মনে বেশ একটা নিশ্চিন্ত বোধ করেছি। একটাই খুঁতখুঁতি ছিল, রন্ধন প্রনালীর কোথাও আদা, রসুন, পেঁয়াজের কথা উল্লেখ করেনি বলে। ব্রুসের দেখাদেখি আমরা সকলেই ছুরী দিয়ে টার্কীর একপাশ থেকে কেটে কেটে নিতে শুরু করলাম। আমার একটা সমস্যা আছে। আমি খুব একটা ভোজন রসিক না হলেও আমার মধ্যে দৃষ্টিক্ষুধা আছে, এটা আমার কথা না, আমার মা আর আমার স্বামী, দুজনেরই অভিমত। সেই দৃষ্টিক্ষুধার কারণেই আমি প্রথম সুযোগেই চার পাঁচ স্লাইস টার্কী নিয়ে ফেলেছি। পাশে থেকে আমার পতি দেবতা একটু আস্তে করে বলেছে, ' আগেই এতটা নিয়েছ, যদি ভাল না লাগে"! পতির কথা শুনে রাগে শরীর জ্বলে গেছে। সব সময় তালে থাকে, কখন আমার প্লেটের দিকে নজর লাগানো যায়! যত্তসব!

প্লেটে টার্কী নিলে সাথে ক্র্যানবেরী সস নিতে হয়। টার্কী খাওয়ার এটাই নিয়ম। লাল টুকটুকে ক্র্যানবেরী সস দেখেই দৃষ্টি জুড়িয়ে যায়। নিলাম, ক্র্যানবেরী সসও নিলাম, পাশে নিলাম গ্রীন বীনস ( ছোট সাইজের বরবটি সেদ্ধ), ম্যাশড পটেটো ( আলু ভর্তা), এবং স্মোকড বিনস ( লাল রঙের বরবটির বীচি বারবিকিউ সসে রান্না করা)। প্লেট উপচানো খাবার নিয়ে টেবিলে এসে বসতেই ব্রুস প্রেয়ারে মন দিল। খাওয়া শুরু আগে ঈশ্বর বন্দনার এই রীতিটি সম্পর্কে জেনেছি  আমার বড় মেয়ে যখন ঢাকা ওয়াই ডাব্লিউ সি এ স্কুলে পড়তো, তখন। আমার খুব ভালো লাগে খাওয়ার আগে ঈশ্বরকে বন্দনা করার এই রীতি ( যদিও খাওয়ার আগে আমি কখনওই এই অতি পবিত্র কাজটুকু করি না)। ব্রুসের সাথে সাথে আমরা সবাই 'আমেন' বলে খাওয়া শুরু করলাম। পাণীয় হিসেবে আমাদের সকলকে দেয়া হয়েছে আইসড টি, কোক, মিনারেল ওয়াটারের বোতল, কিন্তু নোরা নিয়েছে গ্লাস ভরে ঠান্ডা দুধ। নোরা জলের বদলে সব সময় দুধ খায়। আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। আমি সব্জী প্রিয় মানুষ হয়েও প্রথমেই টার্কীর টুকরা মুখে পুরে দিয়েছি। প্রথম দফায় টের পাইনি, দ্বিতীয় দফাতেই টার্কীর বোঁটকা গন্ধে সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেলো। একটা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো, ' প্লেটের টার্কী শেষ করবো কী করে"! মুখের স্বাদ পাল্টানোর জন্য দ্বিতীয় ভুল করলাম। চামচে করে 'স্টাফিন' তুলে মুখে পুরে দিলাম! খেয়াল ছিল না, টার্কীর বডি থেকে যে নির্যাস বের হয়েছে, সেই রসেই স্টাফিন সেদ্ধ হয়েছে। কাজেই স্টাফিনের মধ্যে উৎকট গন্ধ আরও বেশীই লাগছিল।  আমার মুখের চেহারাতে কিছু কী ধরা পরেছিল? নাহলে নোরা কেন আমাকে বলল তার বানানো আফ্রিকান ডেজার্ট টেস্ট করতে! আমি ধরা পড়তে রাজী ছিলাম না বলেই একটু দেরী করছিলাম আফ্রিকান ডেজার্ট নিতে। বদলে আমি গোলমরিচের গুঁড়ো চেয়ে নিলাম। এবার টার্কী স্লাইসের উপর ইচ্ছেমত মরিচের গুঁড়ো ছড়াতে লাগলাম দেখে আবার আমার সমস্ত শরীর জ্বালিয়ে দিয়ে আমার স্বামী পিন পিন করে বললো,

 " এটা তো নতুন না, তুমি সব সময় না বুঝেই খাবার দিয়ে প্লেট ভরে ফেলো। খেতে তো পারো না শেষ পর্যন্ত। অল্প অল্প করে নিলেই হয়"!

 জবাবে বললাম, " কই! আমার কাছে তো খারাপ লাগছে না খেতে! খুবই ভাল, শুধু একটু মশলা হলে ভাল হতো। তুমি নিজের খাওয়া বাদ দিয়ে আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছো কেনো"?

স্বামীর জবাব, " বেশ, ভালো লাগলে খাও, কোনই অসুবিধা নেই"।

একজনের বাড়ীতে বেড়াতে এসে তাঁর রান্না করা খাবার যদি  ভালো লাগছে না বলে ট্র্যাশ ক্যানে ফেলে দেই, এর চেয়ে বড় অভদ্রতা আর কী হতে পারে! ( আমেরিকানদের অনেকেই খাবার দাবার ভাল না লাগলে ঝুপ করে ট্র্যাশ ক্যানে ফেলে দেয়) । তাছাড়া একটু আগে মাত্র স্বামীটিকে বলেছি, টার্কী খেতে আমার  খুব একটা খারাপ লাগছে না। কাজেই প্লেটের সমস্ত খাবার আমাকে খেয়ে শেষ করতেই হবে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম, আর কোনদিন এভাবে না বুঝে প্লেট ভরে খাবার নেবো না, নেবো না।  নোরার কথামত সেই আফ্রিকান ডেজার্ট প্লেটে তুলে নিয়ে আসলাম। দারুণ সুবাস বের হচ্ছে ডেজার্ট থেকে।  মিষ্টি আলু আর ব্রাউন সুগার, সাথে প্রচুর বাটার দিয়ে রান্না করা ডেজার্টটির উপরে রাশি রাশি পিকান (কাঠবাদাম বোধ হয়), কাজুবাদাম, কিশমিশ ছড়ানো। একটু মুখে দিয়ে দেখি, খাবার তো নয়, এ যেনো অমৃত! মন ঠিক করে ফেলেছি, নাক বন্ধ করে ঐ টার্কীর ঝামেলা শেষ করে ফেলবো। তারপরেই খাবো আফ্রিকান অমৃত!

অসুবিধা তো কিছু নেই, নাক দিয়ে বাতাস টানবো না, তাহলে আর বোঁটকা গন্ধ নাকে লাগবে না ভেবে গোল মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে শেষ পর্যন্ত টার্কীর স্লাইসগুলো আমি খেয়ে ফেলেছিলাম। স্টাফিনে ক্র্যানবেরী সস মিশিয়ে স্বাদটুকু আচারের মত করে ফেলেছিলাম। সেভাবেই স্টাফিনটাও শেষ করেছি। সব্জী আমার খুব প্রিয়, তাই গ্রীন বিন, স্মোকড বিন আর ম্যাশড পটেটো সবার শেষে খেয়েছি। কথায় বলে যার শেষ ভাল, তার সবই ভাল।  সেদিনের খাবার শেষ করেছি এক প্লেট আফ্রিকান অমৃত খেয়ে। আমার স্বামী যত কিছুই বলুক না কেনো, প্লেটে খাবার আমি আমাপা কিছু নেইনা। একজন  পূর্ণ বয়স্ক বাঙ্গালী এক স্কুপ ম্যাশড পটেটো, কিছু বরবটি সেদ্ধ, একটু বীন সেদ্ধ, আর এক স্কুপ স্টাফিন, সাথে চার স্লাইস টার্কী, খুব বেশী হয়ে গেলো?? আমার স্বামী আমার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি দেখতে পায়! ঠিক এমনটা ভেবে মনে সাহস সঞ্চয় করছিলাম যেনো আরেকবার উঠে গিয়ে আফ্রিকান ডেজার্টে প্লেট ভরে ফেলতে পারি।  ভাগ্যিস নোরা এই খাবারটি রান্না করেছিল, সেজন্যই সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছি। এরপরে গত দশ বছরে আমি আর কোনদিন টার্কীর মাংস স্পর্শও করিনি। বলতে গেলে আমি এখন ভেজিটেরিয়ান হয়ে যাওয়ার চেষ্টায় আছি। কারণ এখনও আমরা আমাদের আশে পাশে কোন বাঙ্গালী পরিবার দেখি না, বাংলাদেশী গ্রোসারী শপ নেই, খুব মাঝে মাঝে আটলান্টা, হিউস্টন নামের বড় শহরে কেউ গেলে, তাদের সাথে বাংলাদেশের মাছ আনিয়ে, সেই মাছই রসিয়ে রসিয়ে সারা বছর খাই। আর নিজের মনেই নিজের দেশী খাবারের গুনকীর্তণ করতে থাকি। বাজারে যা কিছু পাই, চেষ্টা করি দেশী স্টাইলে রান্না করতে।  নিজেরা খাই, আমেরিকান বন্ধুদেরকেও খাওয়াই!

Monday, December 10, 2012

যে ছবি কথা বলছে, যে ছবি কথা বলবে!

অনলাইনে সংবাদপত্র পড়া আমার অনেক দিনের পুরাণো একটি নেশা। শত ব্যস্ততার মধ্যেও একটু সময় বের করে, আর কিছু না হোক, খবরের শিরোণামগুলো দেখে রাখি। খুঁটিনাটি পড়িনা , কারণ পত্রিকার আট পাতা জুড়ে থাকে দূর্নীতি, অপহরণ, দূর্ঘটনা, চুরী, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী পাচার, বিদেশ থেকে শ্রমিক ফেরত, পদ্মা সেতু নিয়ে দূর্ণীতি, দুদক, বিশ্বব্যাঙ্ক, অর্থমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী, রেল মন্ত্রী, কালো বিড়াল, সাদা বিড়ালের গল্প। প্রথম পাতা, শেষ পাতায় তো এ সমস্ত খবর থাকেই, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, জেলা সংবাদেও একই বিষয় নিয়েই নাড়াচাড়া হয়ে থাকে। এতদিনে আমি পাকা রাঁধুণী হয়ে গেছি, হাঁড়ির ভেতরের একটি ভাতে টিপ দিয়েই বুঝে ফেলি, অন্য ভাতের কী অবস্থা!
তবে ডিসেম্বার মাসে খবরাখবরে মাঝে মাঝে একটু আধটু চমকও থাকে। এ বছরের ডিসেম্বারে চমক যেনো অন্যবারের তুলণায় বেশীই মনে হচ্ছে। চমকও বেশী, তাই হই হই রই রইও বেশী। যদিও যুদ্ধাপরাধী বিচারের ইস্যুকে ঘিরে বাংলাদেশের পরিস্থিতি হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, অবশ্য দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলার চেয়ে, উত্তপ্ত করা হচ্ছে বলা ভাল। তার পরেও ভাল খবরও এ মাসেই শোনা যাচ্ছে। যেমন ক্রিকেটের কথাই ধরি না কেন, ডিসেম্বারেই তো বাংলাদেশ টীম ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ জিতে ক্রীড়াঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করে দিল। ব্যাপারটিতে উত্তাপ না থাকলেও দারুণ উত্তেজনা তো আছে। শোনা যাচ্ছে, এই মাসেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় বের হবে, এই নিয়েও সারাদেশে নয় শুধু, পৃথিবীর সর্বত্রই, যেখানেই বাংলাদেশীদের বসবাস, সেখানেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কারো গায়ে লাগছে শীতের উষ্ণতা, আর কারো শরীর জ্বলছে গ্রীষ্মের দাবদাহে।


যাদের শরীর গ্রীষ্মের দাবদাহে জ্বলছে, তারাই গতকালকে সারাদেশে অবরোধ ডেকেছে। কাকে অবরোধ, কেনই বা অবরোধ, তা একমাত্র অবরোধকারী পক্ষ এবং অবরুদ্ধ পক্ষের মানুষের জানার কথা। একইরকমভাবে একই কায়দায়, অবরোধকে প্রতিরোধ করার নামে আরেক দল তৈরী হয়েছে। আমজনতার এই সমস্ত অবরোধ-প্রতিরোধ নিয়ে চিন্তা করবার সুযোগ কম। আর সেই জন্যই পুরাণো ঢাকার বিশ্বজিত তার দর্জিব্যবসার 'লক্ষ্মীরূপী' গ্রাহকের ডাকে সাড়া দিতে পায়ে হেঁটে দোকানের দিকে যাচ্ছিল। তরুণ ব্যবসায়ীর মাথায় ব্যবসা সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা থাকার কথা, অবরোধ, হরতালের জোস থাকার কথা না। অবরোধ আর প্রতিরোধের জোসে যারা উত্তপ্ত হয়েছিল, দর্জি দোকানে যাওয়ার পথে 'বোকা দর্জি' ঐ উত্তপ্তদের মধ্যিখানে আটকা পড়ে গেছিল। বোকাদেরও প্রাণের ভয় থাকে, তাদেরও বাঁচার অধিকার থাকে, আর তাই প্রাণের ভয়ে বিশ্বজিত দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল। অবরোধ-প্রতিরোধ বাহিণীর গলায় ছিল 'হা রে রে রে' গর্জন, হাতে ছিল দা, চাপাতি, যে দর্জির হাতে থাকে সুঁই-সূতো, সে তো চাপাতি, দা, বটি হাতে মানুষকে প্রকাশ্য রাস্তায় দেখলে ভয় পাবেই। ভয় পেয়েই সে ঐ বিপদ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। পারেনি বাঁচতে, পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি বলে দিচ্ছে, বিশ্বজিতের মরণ হয়েছে। মরণ হয়েছে অবরোধ প্রতিরোধ বাহিণীর কর্তা ব্যক্তিদের হাতে। আরও পরিষ্কারভাবে, সংবাদ পত্রের বরাত দিয়ে বললে বলতে হয়, সরকারী ছাত্র সংগঠন, ছাত্রলীগের কিছু ' কাপুরুষের' হাতে বিশ্বজিতের মরণ হয়েছে।


দেশের মাঝরাত, আমেরিকার মধ্যদুপুরে অনলাইনে গিয়ে সংবাদের শিরোণাম দেখছিলাম, পত্রিকার হোম পেজে বিশ্বজিতের যে ছবিটি ছাপা হয়েছে, তা দেখে একটুক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিলাম। ছবিটি দেখে বুঝতে পারছিলাম না, কোনজন বিশ্বজিৎ! একদল ছেলে একসাথে দাঁড়ানো, দেখে মনে হয়, পাড়ার পরিচিত ছেলের দল, কিছু একটা নিয়ে বচসা করছে। এরমাঝেই যে একজন বিশ্বজিত, যে কিনা এর কিছুক্ষণ পরেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে, ঠিক বলিনি, এদের মধ্যেই একজন ছিল বিশ্বজিত, যাকে কাপুরুষেরা কুপিয়ে কুপিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে, তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। পত্রিকার বর্ণনানুসারে যার পরণে কালো ডোরা শার্ট, ভেতরে লাল গেঞ্জী, সে-ই বিশ্বজিৎ। ছবিতে কালো ডোরা শার্টে একজনকেই দেখা যাচ্ছিল, যার চোখে মুখে কিছুটা ভয় ও বিস্ময় ছিল। ভয় ছিল কারণ কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে তাকেই কেনো সবাই জাপটে ধরলো, এবং বিস্ময়ও একই কারণে। এগুলো বিশ্বজিৎ আমাকে বলে নি, বিশ্বজিতের ছবি বলছে যে! তবে পত্রিকার ছবিটি খুব বেশী ভয়ংকর দেখাচ্ছিল না, কারণ বচসা করছে মনে হলেও ছবিতে বিশ্বজিৎকে তরতাজা প্রাণের যুবকের মতই দেখা যাচ্ছিল, সেখানে মৃত্যুর গন্ধ ছিল না। বয়স কতই বা হবে, আমার সন্তানের বয়সী হবে। এই ছবি দেখে কোনভাবেই আন্দাজ করা যাবে না, সদ্য যুবকটিকে সবাই চারদিক থেকে ধরে রেখেছে যেন কোথাও পালাতে না পারে! এই ছবিটির দিকে তাকালে বিশ্বাসই হতে চায় না যে একটু পরেই এই কালো ডোরাকাটা শার্ট পরিহিত ছেলেটি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে না, রক্তাক্ত নিথর দেহ নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে!


বিশ্বজিত দেশে মায়ের কাছে যায়নি অনেকদিন। তার মা শরীয়তপুরে পূজা কাটিয়েছে ছোট ছেলেকে ছাড়াই। তবুও মায়ের মনে হয়তো সান্ত্বণা ছিল, ছেলে পূজা আর ঈদে কাজের অর্ডার পেয়েছে প্রচুর, অর্ডার ঠিকমত সাপ্লাই দিতে পারলে সংসারের আয় উন্নতি হবে, গৃহ উপচে উঠবে ধানে-ধনে! আহারে! মায়ের মন রে! বাকী জীবন পত্রিকার পাতায় ছেলেকে দেখতে পাবে, জীবন্ত ছেলে, শার্ট-প্যান্ট পড়ে দোকানের পথে যাচ্ছিল, এই ছবিটাই মনে গেঁথে থাকবে। এই ছবিই কথা বলবে, মাত্র চব্বিশ বছরেই ছেলে তার পেশার প্রতি যত্নশীল, গ্রাহকের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছিল, এই ছবিই বলে দিবে, দা চাপাতি নিয়ে শুধু ইসলামী ছাত্র শিবিরের পান্ডারাই ঘোরে না, ছাত্রলীগের আতি পাতি নেতাদের হাতেও দা-চাপাতি থাকে! এই ছবিই বলে দিবে, দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করার কাপুরুষতা শুধু একাত্তরের রাজাকার আল-বদরেরাই করেনি, শুধু ছাত্র শিবিরের বীর পুরুষেরাই করে না, ছাত্রলীগের ছেলেরাও করে! এই ছবিই বলে দিবে, এককালের তুখোড় ছাত্র সৈনিকের উত্তরসুরীরা আজ দা, চাপাতি দিয়ে খেটে খাওয়া যুবককে রাস্তার উপর কুপিয়ে মারে!
এ ছবিই বলে দিবে, এ দেশকে অন্ধকার যুগের দিকে টেনে নেয়া হচ্ছে। এমনতো হওয়ার কথা ছিল না। একচল্লিশ বছর আগেও দেশের অবস্থা এমন ছিল না। একত্রিশ বছর আগেও দেশের অবস্থা এমন ছিল না, এমনকি একুশ বছর আগেও এমন অনাচার ছিল না দেশে, দেশে গণতন্ত্র আসার সাথে সাথে সবাই গণতন্ত্রী হয়ে গেলো!


ডিসেম্বার মাস আমাদের মহান বিজয়ের মাস! এ মাসে কিসের অবরোধ! কার বিরুদ্ধে অবরোধ! এ মাসে কিসেরই বা প্রতিরোধ, কার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ! বছরের এগারো মাসই তো রাজনৈতিক হানাহানি, রাজনৈতিক চুলোচুলি, দূর্ণীতির কিসসা চলছেই, এই একটা মাত্র মাস, যে মাসে আমাদের দেশটির আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম হয়েছে, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিজয় এসেছে, এ মাস তো আমাদের বিজয়ের মাস! তার সম্মান রক্ষার্থেও কী আমরা পারতাম না, অবরোধ, প্রতিরোধ, হরতালের এই বিশ্রী খেলা বাদ দিতে? রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের সকলেরই সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনী আছে, তাঁদের মনে কী একবারও বিশ্বজিৎ নামের অতি সাধারণ কিন্তু স্বাবলম্বী ছেলের ভয়ার্ত, করুণ মুখের ছবি ভেসে উঠবে না? বিশ্বজিতের মায়ের বুকফাটা আর্তণাদ যদি অভিশাপ হয়ে বর্ষায়, সকল রাজনীতিবিদের উপর, সেই ভয়ও কী তাদের মনে জাগে না!


বিশ্বজিতের মায়ের প্রতিঃ মাগো! আমিও সন্তানের মা, সন্তানের গায়ের উত্তাপ একটু বাড়লেই আমি কাতর হয়ে পড়ি, ফোন করে দূরে থাকা সন্তানের গলার আওয়াজ না শুনতে পেলে পাগল হয়ে যাই, তারপরেও আপনার ব্যথা পরিমাপ করার সাধ্য আমার নেই। আপনার ছেলেটিকে, আপনার তরতাজা ছেলেটিকে অহেতুক, বিনা কারণে, বিনা দোষে কিছু 'বীরপুরুষ' দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে!! মাগো, আপনার বুকে যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, যতক্ষণ তার তাপ আমাদের কারো গায়ে না লাগবে, ততদিন আমরা আপনার কষ্ট বুঝবো না। আমরা নিজেদেরকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবো, আমাদের মত নিরুত্তাপ প্রাণীদেরকে আপনি ক্ষমা করুণ। আপনি কাঁদুন মা, হাহাকার করে কাঁদুন, বুক চাপড়ে কাঁদুন, যাদের কারণে, যাদের দ্বারা আপনার জীবনের এই চরম সর্বনাশ ঘটে গেছে, আপনার কান্না, আপনার দীর্ঘশ্বাস যেনো ঐ সকল অকাল কুষ্মান্ডের গায়ে অভিশাপ হয়ে নেমে আসে। আমি ঈশ্বরের কাছে এটাই প্রার্থণা করি।

Sunday, December 9, 2012

যে ছবি কথা বলে!

একটি ছবি, মায়ের সাথে আমার। ছবিটি কোন আনন্দঘন মুহূর্তে তোলা নয়, তবে আমার জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তোলা ছবি।  ক্লিনিকের বেডে অচেতন অবস্থায় আমার মা চোখ বুজে শোয়া, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, মায়ের বালিশের এককোণে আমি মাথা রেখে শুয়ে আছি।  ছবিটি দেখে বুঝা যায়, ঐ মুহূর্তে আমি মায়েতেই মগ্ন ছিলাম। আমার ঐ মুহূর্তের পৃথিবী জুড়ে ছিল আমার মা, আর কেউ না। ঘন্টা তিনেক আগেই মা'কে হাসপাতাল থেকে নিয়ে চলে এসেছি। হাসপাতালে মা ছিল লাইফ সাপোর্টে, কিন্তু সজ্ঞানেই ছিল। খুবই কষ্ট পাচ্ছিল মা, মুখের ভেতর দুই তিনটি নল ঢুকানো, আদরের ছেলে মেয়েদের চোখের সামনে দেখেও কথা বলতে পারছিলেন না, অসহায়ভাবে দুই চোখের কোন দিয়ে কেঁদে চলেছিলেন। ডাক্তারের পরামর্শে লাইফ সাপোর্ট খুলে দিতেই মুখের ভেতর থেকে নলগুলো বের হয়ে আসে। এরপর প্রায় ঘন্টা ছয়েক মায়ের দেহে প্রাণ ছিল, কিন্তু চেতনা ছিল না। তবে শেষের ঐ পাঁচ ছয় ঘন্টা মা আমাদের ছায়ায় থেকেছিলেন। কথা বলার ক্ষমতা ছিল না, তবে তাঁর অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে মুখের যতটুকু দেখা যাচ্ছিল, বুঝা যাচ্ছিল, অচেতনেও মা অনেক নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত আছেন। মায়ের অমন শান্তিময় মুখখানির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কখন যেনো আমি নিজের মাথাটি মায়ের বালিশে পেতে দিয়েছিলাম।  সেই ছবিটিই আমার হাতে এসেছে, ছবিটি কে তুলেছে, আমার জানা নেই। ঠিক কখন তুলেছে, সেটাও জানা নেই। ছবিখানি আমার মেইলিং এডরেসে আসার পরেই আমি দেখতে পেয়েছি।


আজ ৮ই ডিসেম্বার। মাত্র দুই মাস আগে ঠিক এমনই এক ৮ তারিখের বিকেলে আমার মা, আমাদের সকলকে বিরাট এক ঝাঁকুনি দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে দূরে কোথাও চলে গেছেন। যখন মা চলে গেলেন, তখনও বুঝিনি, এই যাওয়া তাঁর শেষ যাওয়া। আর কোথাও তাঁকে পাব না। মায়ের মৃত্যুর পর, 
প্রথমদিকে আমার ব্যবহারে কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না অথবা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছি, সেটাই ছিল অস্বাভাবিক। মৃত্যুর ঠিক আট দিন পর আমি আমেরিকা ফিরে আসি।  আমেরিকা ফিরে আসার পর থেকে একটু একটু করে যেন মায়ের অভাব টের পেতে শুরু করি। আমাদের ভাইবোনদের অভ্যাসই ছিল, পান থেকে চুন খসাতে হলেও মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে নেয়া। মা যদি অনুমতি দেয়, তবেই পান থেকে চুন খসাতে পারবো। তা আমেরিকা ফিরে এসে কতবারই আমার পান থেকে চুন খসানোর কথা মনে হয়েছে, সাথে সাথে মায়ের 'ওয়ারিদ'এর নাম্বারে কল করতে গিয়ে থমকে গেছি। এখান থেকেই শুরু আমার মানসিক বিপর্যয়!

কী যেন মনে হলো, ভাবলাম আমার কষ্টগুলো মনে চেপে না রেখে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেই! আকাশে বাতাসে ছড়াতে গিয়ে ফেসবুকের শরণাপন্ন হয়েছি, দুইদিন পর পর কান্নাগুলোকে একসাথে জড়ো করে বন্ধুদের মাঝে ভাগ করে দিয়েছি। আমার অনেক বন্ধু আমার কান্নার ভাগ মাথা পেতে নিয়েছে। আমার সাথে সাথে তারাও কেঁদেছে। তাদের প্রতি আমি সারাজীবন এক ধরণের কৃতজ্ঞতা বোধ করে যাব।

আমার আরেক বন্ধু এবং বড় ভাই, তাঁর ক্যামেরাতেই আলোচ্য ছবির  দারুণ মুহূর্তটুকু বন্দী হয়েছিল। সেদিন কতক্ষণ আমি জীবনের শেষবারের মত মায়ের পাশটিতে শুয়েছিলাম, তা জানিনা। এমনকি আমি আদৌ মায়ের পাশে মাথা রেখেছিলাম কিনা তা জানতেও পারতাম না, যদি না আমার দাদাটির ক্যামেরায় অমূল্য এই মুহূর্তটি বন্দী হতো।  দাদার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো,  কারণ  বন্ধু দাদা ছবিটি আমাকে পাঠিয়ে দিতেই আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে সাড়া পড়ে গেলো। মনে পড়ে গেলো, স্কুল জীবনে প্রতি রবিবারের দুপুরে আমার মা হাতে গল্পের বই নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেন। পাশে শুয়ে থাকতাম আমি। দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস আমার ছিল না। মায়ের ভেজা কোঁকড়ানো চুলগুলো বালিশের চারধারে ছড়াণো থাকতো। মায়ের পাশে শুয়ে তাঁর চুলগুলো নিয়ে আমার মাথায় জড়াতাম। আমার বাবা আমাকে সব সময় চুলে 'বেবী কাট' দেওয়াতো বলে চুল কখনওই লম্বা হতে পারতো না। আমার ইচ্ছে করতো আমার মাথার চুল লম্বা হলে আমাকে কেমন দেখা যাবে, তা পরখ করার। রবিবারের দুপুরে মায়ের পাশে শোয়ার আগে সাথে আয়না নিয়ে আসতাম। মায়ের মাথার চুলগুলোকে নিজের কাঁধ থেকে টেনে এনে সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতাম। আয়নায় দেখতাম, আমাকে সুন্দর লাগছে কিনা।

আমি যখন মায়ের চুল ধরে টানাটানি করতাম, মা কিছুই বলতো না, শুধু একটু জোরে টান পড়ে গেলে মুখে 'উহু!' শব্দটুকুই করতো। মা'র মন পড়ে থাকতো বইয়ের পাতায়, আর আমার মন পড়ে থাকতো মায়ের অসম্ভব সুন্দর কোঁকড়াণো চুলের দিকে।এমনও হয়েছে, মা আকাশবাণী কলিকাতা থেকে সম্প্রচারিত নাটক শুনছেন মনোযোগ দিয়ে, আর আমি মায়ের চুল নিয়ে নিজেকে সাজাচ্ছি। গল্পের বই  এবং নাটক, এই দুটি বিষয়ের প্রতি ছিল মায়ের তীব্র আকর্ষণ। আমি যেদিন ঢাকা ছেড়ে চলে আসি, আমার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা, ডঃ শান্তি নারায়ণ ঘোষ, আমার কাছে মায়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন। এই দাদা ছিল মায়ের ভাগিনা এবং বন্ধু। আমার দাদা মায়ের জন্য নতুন বই জোগাড় করে আনতো, ভালো কোন নাটক বা সিনেমার খোঁজও দাদা এনে দিত। আমার কৈশোরে রবিবারের দুপুরগুলোর সাথে দাদার স্মৃতিচারণে খুব মিল পেয়ে গেলাম।

এরপর বড় হয়ে গেছি, কৈশোর পেরোতেই মায়ের পাশে আর শোয়ার সুযোগ ছিল না, অথবা নিজের ব্যাক্তিত্ব তৈরী হওয়ার সময়টাতে কোন ছেলেমেয়েই মায়ের আঁচলের নীচে থাকাটাকে কৃতিত্বর বলে মনে করে না। আমিও করি নি। এরপর নিজের সংসার হয়েছে, আমার মেয়েদের মা হয়ে গেছি, অলস দুপুরে আমার মেয়েরা আমার পাশে শুয়েছে। ব্যস! জীবনের চক্র তো এভাবেই ঘোরে।

এত বছর পরে, আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আমাকে আবার সেই কিশোরীবেলার মত নিজের পাশে মাথা রেখে শোয়ার সুযোগ দিয়েছেন, আমি ধন্য হয়েছি। ধন্যবাদ আধুনিক প্রযুক্তিকে, ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এই ছবিটির ভেতর দিয়েই আমি আরেকবার ছুঁতে পারলাম আমার শৈশব, শত কান্নার ভেতরেও সান্ত্বণা হয়ে থাকবে এই ছবিটি, এখনও আমি একা থাকলেই কাঁদি, বিশ্বাস করতে পারিনা কোনভাবেই, ওয়ারিদের নাম্বারে ডায়াল করে আর কখনওই শুনতে পাবো না, " এই মিঠু, অমুকের মাইয়া বিয়া, কিছু সাহায্য করতে হইব, অথবা তুই আসার সময় তোর মাইয়ার পুরাণ জামাকাপড় লইয়া আইয়িছ, কত গরীব দুঃখী কাপড়ের জন্য কান্নাকাটি করে, অথবা ঐদিন নন্দা মেথরের বউ আইছিল, বিছানার চাদরের লাইগা কান্নাকাটি করছে, তুই যে আরেকবার দিয়া গেছিলি, ঐ চাদরই দিয়া দিলাম, চাদর পাইয়া বেটি কী খুশী! অথবা শোন, ডাইলের বড়ি দিয়া রাখছি, কেউ তগো ঐখানে গেলে পাঠায় দিতে পারতাম, অথবা সারাটা সময় খালি আলেং ফালেং কইরা কাটাস, সংসারের দিকে কোন মন নাই তোর"। এই ছবিটিই আমাকে সান্ত্বণা দিবে, শেষ মুহূর্তে কোন এক অমোঘ টানে আমি আমার মায়ের পাশে মাথা রেখেছিলাম, ঠিক কৈশোরের রবিবারের দুপুর বেলার মত।

সবশেষে আমার সেই বন্ধু এবং দাদাকে অশেষ ধন্যবাদ মুহূর্তটিকে ক্যামেরায় ধরার জন্য এবং ছবিটি আমাকে মেইল করে দেয়ার জন্য!



Saturday, December 1, 2012

কত রকমের মানুষ, তাদের কত রকমের গল্পঃ ব্যান্ড দল 'মুম্বাই মাশালা'

ভারতীয় চেহারার কয়েকটি ছেলেকে মাঝে মাঝেই আমাদের ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্টের আশেপাশে দেখা যায়। প্রথম প্রথম, যে কোন জায়গায় ভারতীয় চেহারার কাউকে দেখলেই আগ বাড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করতাম। চারদিকে সাদা আর কালোদের মাঝে ভারতীয় চেহারার কাউকে দেখলে মনে হতো, খুব আপন কাউকে দেখছি। সময়ের সাথে সাথে আমার সেই আদিখ্যেতা কমে আসে। এখন আমি অনেক বেশী প্রফেশন্যাল হয়ে গেছি। আমাদের ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারের সকলেই আমেরিকান, ব্যতিক্রম আমি (একমাত্র বাংলাদেশী),  দুই জন ফিলিপিনো এবং একজন জাপানী এসোসিয়েট, ভারতীয় একজন মেয়ে ছিল, সে চলে গেছে কয়েক বছর আগেই। অবশ্য আরও বিশদভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, এই শহরে আমরা একমাত্র বাঙ্গালী পরিবার, যে কয়েকজন ফিলিপিনো, জাপানী মহিলার কথা বললাম, তাদের স্বামীরা আফ্রিকান আমেরিকান। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় চেহারার লোকজন দেখলে  অনেক আপন মনে হয়।

এ বছর থ্যাঙ্কস গিভিং সেল 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে'র আগের দিন দুইজন ভারতীয় আমাকে ফোন সেন্টারে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে হিন্দীতে 'নমস্তে' জানায়। প্রতি উত্তরে আমিও 'নমস্তে' বলেই ইংলিশে কথাবার্তা বলা শুরু করলাম। কথাবার্তা বলতে যা বুঝায়, তোমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি' জাতীয় মামুলী কথা। দুই জনের মধ্যে একজন বয়সে বড়, আরেকজন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী যুবক। ধরে নেই, যুবকের নাম অমিত।  অমিতের বেশভূষা খুবই সাধারণ, একটু ভারী শরীর, মিষ্টি, বিনয়ী চেহারা, আর সাথের ব্যক্তিটিকে প্রায়ই দেখি ওয়ালমার্টে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে ঘোরে, পরণের পোশাকেও চাকচিক্য নেই, পান খেয়ে মুখ লাল হয়ে থাকে। অমিত আমার কাছে জানতে চাইল, আমি হিন্দী বলতে পারি কিনা। বললাম, আমি তো বাংলাদেশের মেয়ে, হিন্দী বুঝি, কিনতু বলতে পারিনা। তুমি হিন্দীতে প্রশ্ন করো, আমি ইংলিশে উত্তর দেবো। খুব সোজা প্রশ্নে সে জানতে চাইলো, ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে  একটা 'আই ফোন' একটা 'স্যামসাং গ্যালাক্সী এস ৩ ফোন' আর একটা ল্যাপটপ কিনতে হলে ঠিক কী করতে হবে! বললাম, তোমাকে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে তিন আইটেম তিন জায়গা থেকে বিক্রী হবে, কাজেই তিন আইটেম পেতে হলে সাথে আরও তিনজনকে নিয়ে আসতে হবে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য। রাত দশটায় যে সেল শুরু হবে, তার জন্য কখন এসে লাইনে দাঁড়াতে হবে! বললাম, দেখো, তুমি এখানে নতুন, আমি এখানে আছি আট বছর হয়ে গেলো, আজ পর্যন্ত ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে আমি কিছুই কিনতে পারিনি। দশটার সেল থেকে জিনিস পেতে গেলে বিকেল পাঁচটায় যদি লাইনে দাঁড়াতে পারো, সম্ভাবনা শতকরা আশিভাগ। তবে পাঁচ ঘন্টা লাইনে দাঁড়াতে পারবে কিনা, সেটা ভেবে দেখো।

অমিত জানালো, সে একজন ব্যান্ড শিল্পী। ছয় মাস আগে আমেরিকায় এসেছে ব্যান্ড দলে কী-বোর্ড বাদক হিসেবে, কন্ট্র্যাক্ট শেষ, এবার দেশে ফেরার পালা। তাই পরিবারের জন্য এই জিনিসগুলো উপহার হিসেবে নিতে চাইছে। বললাম, তাহলে একবার চেষ্টা করেই দেখো। কিছুই হয়তো পাবে না, কিন্তু একটা অভিজ্ঞতা তো হবে, দেখে যাও, এখানেও মানুষ কত ক্রেজী! হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি দেখে তোমার মজাই লাগবে। চলে এসো বিকেল পাঁচটায়। কাজের কথা বলা শেষ। এবার শুরু করলাম 'আজাইরা প্যাচাল'। এ ধরণের 'আজাইরা প্যাচাল' আমি অনেকের সাথেই করি,  এটা আমার  অনেককালের অভ্যাস।

আজাইরা প্যাচালের চৌম্বক অংশঃ

অমিত তুমি কবে এসেছ এই দেশে, কোন ভিসায় এসেছ?

-আমি ছয় মাস আগে এসেছি 'মুম্বাই মাশালা' ব্যান্ড দলের সাথে। ব্যান্ড দলে আমি কী-বোর্ড বাজাই। আমরা এসেছি ট্যুরিস্ট ভিসায়। টেক্সাসে ভীরু ভাই আছেন, উনি আমাদের এনেছেন। সারা আমেরিকায় আমরা যাই, বলিউডের গান করি। ছয় মাস থেকে দেশে ফিরে যাই, আবার চলে আসি।

-তোমাদের একটা গ্রুপকে মাঝে মাঝেই ওয়ালমার্টে আসতে দেখি, এরা সকলেই কি মুম্বাই মাশালার সদস্য?
জী হাঁ, আমরা সদস্য, আর উনি ( সাথের ব্যক্তি) আমাদের ম্যানেজার। (এতক্ষনে বুঝলাম উনার মুখে কেন খোঁচা খোঁচা দাড়ি দেখা যায়। ম্যানেজারদের খোঁচা দাড়িতেই মানায় ভাল)।

-আচ্ছা অমিত, এতদূর থেকে তোমরা এদেশে আসো, তোমাদের আসা-যাওয়ার খরচ কে বহন করে? তোমরা ফাংশান করে অনেক টাকা পাও?

-ভীরু ভাই  আমাদের যাতায়াত খরচ দেয়। এই যে আমরা এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে যাই, আমরা কানাডাতেও গেছি, ভীরু ভাইয়ের সাথে সব স্টেটের নেতাদের কথা ঠিক করা থাকে, আমরা যাই, কয়েকটা স্টেজ শো করি, তারপর আবার আরেক জায়গায় ডাক পড়ে যায়, তখন চলে যাই।

-যদি কিছু মনে না করো, ব্যক্তিগতভাবে নিও না,  একটা কথা জানতে চাইছি,  এই ধরণের স্টেজ শো-তে সাধারণত কীরকম পয়সা দেয়া হয়?

এবার ম্যানেজার সাহেব উত্তর দিলেন, আমাদেরকে একেক স্টেজ শোতে ৩,০০০ ডলার দেয়া হয়। ছয় মাসে আমরা কমপক্ষে পঞ্চাশ থেকে সত্তরটা স্টেজ শো করি।

-মাই গড! মাত্র ছয় মাসে তোমরা দুই লক্ষ ডলার উপার্জন করো?? বেশী শো হলে আরও বেশী? তোমরা নিশ্চয়ই অনেক নামকরা ব্যান্ড দল!

ম্যানেজার খুব বিনয়ের সাথে বললো, কোথায় আর বেশী? এতো খুবই অল্প!

-অমিত অবশ্য টাকার গল্পে গেলো না, বললো, মুম্বাইয়ে আমাদের ব্যান্ড দল অনেক নামী। ভীরু ভাই বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। অনেক ব্যান্ড দল এপ্লাই করেছিল, আমাদের সবার ইন্টারভিউ হয়েছে, অডিশান হয়েছে, ভীরু ভাই নিজে গিয়ে সব করেছেন। আমাদেরকে উনি সিলেক্ট করেছেন।

-অমিত, তোমার কাছ থেকে এত সুন্দর গল্প  শুনে আমার খুব ইচ্ছে করছে, একদিন তোমাদের স্টেজ পারফরম্যান্স দেখার। আমি খুব গান পাগল, সারারাত বসে গান শুনতে পারি।

-এবার আমাদের প্রোগ্রাম শেষ, দেশে গিয়ে আবার ভিসা নিয়ে আসতে হবে। পরেরবার যখন আসবো, তখন তোমার জন্য পাস দিয়ে যাব। ফুল ফ্যামিলি নিয়ে আসবে আমাদের প্রোগ্রাম দেখতে।

-ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আমি হেসে দিলাম, বললাম, ম্যানেজার সাহেব কী আমাদেরকে ফ্রী গান শুনতে দিবেন?

খুবই সহজ, সরল সঙ্গীত প্রিয় ম্যানেজার সাহেব পান খাওয়া মুখে হাসি ছড়িয়ে বললো, অবশ্যই দেবো। আপনি আমাদের বোন, বোনের জন্য সব কিছু ফ্রী।
এবার আমার কথার পালা শেষ, অমিতকে আবার মনে করিয়ে দিলাম, বিকেল পাঁচটায় যেনো চলে আসে ওয়ালমার্টে, ল্যাপটপের সেল শুরু হবে রাত দশটায়, কাজেই শুভস্য শীঘ্রম!  সঙ্গীতশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী অমিত কুমার সারা মুখে শিশু সুলভ হাসি ছড়িয়ে আবার আসবে বলে তখনকার মত বিদায় নিল।

Wednesday, November 28, 2012

দুইজন 'Other Mother' এর গল্প

থ্যাঙ্কস গিভিং উপলক্ষে ওয়ালমার্টে নানা ধরণের প্রমোশনাল সেল চলছে। আমাদের ফোন ডিপার্টমেন্টে চলছে আকর্ষণীয় ডীল। কেউ যদি দুই বছরের চুক্তিতে ফোন সার্ভিস নেয়, তাহলে তাকে ৫৫০ ডলার দামের গ্যালাক্সী এস ২ ফোন দেওয়া হবে ১ ডলার মূল্যে, সাথে ১০০ ডলারের ওয়ালমার্ট গিফট কার্ড।  ৬০০ ডলার দামের গ্যালাক্সী এস ৩ পাওয়া যাচ্ছে ১৪৮ ডলার দামে। একমাত্র আই ফোন বাদে যে কোন স্মার্ট ফোনের সাথে বোনাস হিসেবে গ্রাহককে ১০০ ডলার দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছর থ্যাঙ্কস গিভিং উপলক্ষে এই ধরণের ডীল থাকে। আগামী ১লা ডিসেম্বার পর্যন্ত এই প্রমোশন চলবে।

এমন আকর্ষণীয় প্রমোশনাল ডীল পাওয়ার জন্য অনেক গ্রাহক থ্যাঙ্কস গিভিং পর্যন্ত অপেক্ষা করে। যাদের ফোন কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করার সময় হয়ে গেছে, তারাও এই সীজনে চুক্তি নবায়ন করে এবং ১০০ ডলারের গিফট কার্ড পেয়ে যায়। আমি নিজে একবার তিনটি ফোন নবায়ন করে ৩০০ ডলার পেয়েছিলাম, আরেকবার পেয়েছিলাম ১৫০ ডলার।
অনেকেই ফোন সার্ভিস নবায়ন করে গেছে। আজ আমার কাছে এক ভদ্রমহিলা এসেছিল, সাথে তার কিশোরী মেয়েকে নিয়ে। ভদ্রমহিলা আমার সাথে চুক্তি নবায়ন নিয়ে যখন কথা বলছিল, কিশোরী তার মায়ের সাথে চুপ করে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। ভদ্র মহিলার সাথে কথা বললেও আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল কিশোরীটির দিকে। এই বয়সের মেয়েরা সব সময় মেকাপ করে থাকতে ভালোবাসে। এই মেয়েটিও মেকাপ করে এসেছে। মেকাপের কারণেই কিনা জানিনা, মেয়েটির চোখ দুটি এমন সুন্দর লাগছিল যে বার বার আমার নজর ওর চোখে আটকে যাচ্ছিল। পূর্বে আমার ধারণা ছিল, টিন এজ ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলা অনেক কঠিন। কিনতু দিনে দিনে আমার সে ধারণা পাল্টেছে। টিন এজ ছেলেমেয়ের সাথে সুন্দর করে কথা বললে ওরা দারুণভাবে সাড়া দেয়।

মেয়েটিকে খুশী করার জন্য প্রথমেই বললাম,
-তোমার চোখ দুটি কী সুন্দর! চোখের মেকাপও দারুণ সুন্দর হয়েছে! কে করে দিয়েছে মেকাপ?
-দারুণ মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে ও বলল, আমি নিজেই করেছি।
-কতক্ষণ লেগেছে আই মেকাপ করতে?
-পাঁচ মিনিট।
পাঁচ মিনিটে তুমি অমন সুন্দর মেকাপ করেছো! আসলে তোমার চোখ দুটিই সুন্দর, মেকাপ না করলেও সুন্দর, মেকাপ করলেও সুন্দর--বলে এবার আমি হেসেছি।
পাশ থেকে মেয়েটির মা ( তাই হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু মায়ের সাথে মেয়ের চেহারায় কোনই মিল নেই) বললো, --দেখতে হবে না, বয়সটা চিন্তা করো, টিন এজ, পাঁচ মিনিটেই মেকাপ শেষ হয়ে যায় এদের।
ভদ্রমহিলা দেখতে আকর্ষণীয়া নয়, কিন্তু তার মেয়ে এমন সুন্দর, চোখ দুটো নিশচয়ই ওর বাবার কাছ থেকে পেয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, উনি তোমার কে হন?
 মেয়েটি বললো, মা' এর মত।
মা' এর মত মানে  কি? উনি তোমার মা নন, কিন্তু তোমাকে মায়ের মত ভালোবাসেন, তাই তো? তোমাকে দেখে আমারও তো দেখছি 'মায়ের মত' হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে!
 এবার ভদ্রমহিলা বললেন, আমি হচ্ছি, আদার মাদার।
-আদার মাদার?
-হ্যাঁ, আমি ওকে এডপ্ট করেছি।

এখানে অনেক পরিবার আছে, যারা বিভিন্ন দেশ থেকে, চার্চ থেকে, হসপিটাল থেকে অসহায় শিশুদের দত্তক নেয়।  অনেক ধনী পরিবার আছে, যারা নিজেদের সম্পত্তি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয়ে  কৃতী স্টুডেন্টদের জন্য স্কলারশীপ হিসেবে দেওয়ার জন্য দান করে দেয়। তবে বাচ্চা দত্তক নেয়ার ব্যাপারটা ধনী-দরিদ্র ম্যাটার করে না। অনেককেই দেখি, নিজের বাচ্চাদের সাথে আরও দুই একজন বাচ্চাকে লালন পালন করে। কিছু কিছু পরিবার হয়তো বা সরকারী অনুদান পায় এই বাবদ, তবে অধিকাংশ পরিবার মানবিক দৃষ্টিতে এই কাজটি করে থাকেন। অথচ, আমাদের দেশে কত নিঃসন্তান বাবা-মা কে দেখেছি, নিঃসন্তান থাকতে রাজী আছে, কিন্তু অন্যের সন্তান দত্তক নেয়াকে খুবই হীন কাজ মনে করে।


তবে, অনেক বছর আগে, আমরা তখন ভুতের গলিতে থাকতাম, কোন এক পরিচয়ের সুবাদে এক ভদ্রমহিলা আমাদের বাড়ীতে এসেছিল। মহিলার সাথে কয়েকবারই দেখা হয়েছে, উনার তিন ছেলে, একমেয়ে। ৯৫ সালের কথা বলছি, পরিবার পরিকল্পনা অফিসে বড় অফিসার পদে উনি কর্মরত ছিলেন। নামগোত্রহীন বাচ্চাদের কথা উঠতেই উনি নিজের মেয়ের কথা বললেন। তখনই জানলাম, উনার তিন ছেলে, মেয়েটিকে উনি দত্তক নিয়েছেন।  আট নয় বছর আগে, একদিন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকেই নাম গোত্রহীন এক মেয়ে শিশুকে পাওয়া যায়, কেউ ফেলে রেখে চলে গেছে, কয়েক মাস বয়সী শিশুটিকে নিয়ে সকলেই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়,  উনি তখন এগিয়ে আসেন, শিশুটিকে  আইনসম্মতভাবে দত্তক নেন। শিশুটিকে বাড়ীতে নিয়ে উনার ছেলেদের কাছে তুলে দেন, ছোট বোন হিসেবে।  উনার স্বামী বোধ হয় একটু আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু উনার সাহসী সিদ্ধান্তের কাছে চুপ করে থাকেন। উনার ছেলে তিনটি নাকি নতুন শিশুটিকে অনেক যত্ন করতো। কখনও বুঝতে দেয়নি ও অন্য কোথাও থেকে এসেছে। তিন ছেলেই বাইরে গেলে, বাড়ী ফেরার সময় বোনের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। বন্ধুদের কাছে পরিচয় দিত, 'আমাদের ছোট্ট বোন' বলে।

আমার সাথে যখন ভদ্রমহিলার পরিচয় হয়েছিল, তখন উনার বড় ছেলে আমেরিকাতে থাকে,  বাকী দুই ছেলে কলেজে পড়ে, মেয়েটির বয়স নয় বছর, আমেরিকা থেকে ছেলে সবার জন্য গিফট পাঠায়, সবচেয়ে দামী গিফটটি পাঠায় তাদের কুড়িয়ে পাওয়া বোনটির জন্য। উনি বলেছিলেন, বাচ্চাটি দেখতে রোগা প্যাকাটি ছিল, ধীরে ধীরে নাকি গোলাপের পাপড়ির মত রঙ হয়েছে, মাথাভর্তি কালো কোঁকড়া চুল, এমন বর্ণনা শুনে আমি মেয়েটির ছবি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করি। পরের বার যখন উনার সাথে দেখা হয়, উনি সাথে করে নিয়ে আসা বাচ্চাটির ছবি  দেখান। সাত আট বছরের এক বালিকা, সুন্দর জামাকাপড় পড়ে তার আম্মুর গলা জড়িয়ে আছে। সুন্দর ফুটফুটে এক বাচ্চা। ভদ্রমহিলা কিন্তু দেখতে খুবই সাধারণ, আটপৌরে চেহারা, অথচ হৃদয়টা কী বড়! আমাকে জানালেন, মেয়েটিকে উনি সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেওয়াবেন, সম্ভব হলে ডাক্তারী পড়াবেন, বিয়ের বয়স হলে মেয়েটির জন্ম বৃত্তান্ত প্রকাশ করেই বিয়ে দিবেন। জন্মের ইতিহাস শুনে কেউ বিয়ে করতে চাইলে, সেই ছেলেকে উনি রাজা বানিয়ে দিবেন! এমন চমৎকার আম্মুটাকে আমারও জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল। কী চমৎকার হৃদয়ের এক মহিলার সাথে আমার দেখা হয়েছে, ভাবলেই নিজেকে গর্বিত মনে হয়। এই গল্প আমি মনের কোঠায় ধরে রেখেছিলাম, আজ তা প্রকাশ করলাম।

কতকাল পরে, সেদিনের সেই মহিলাটিকে যেনো আবার আমার চোখের সামনে দেখতে পেলাম, অন্যরূপে। এই 'আদার মাদার' টিও দেখতে খুবই সাধারণ,  কিনতু মেয়েটি দেখতে গোলাপের মত সুন্দর! এমন ফুটফুটে বাচ্চা কে কোন মায়ের প্রাণে ধরে ছেড়ে দিতে মন চাইল! আমি ভদ্রমহিলার ফোন সার্ভিস চুক্তি নবায়ন করতে করতেই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম,

-তোমার নাম কী গো ?
-আলিশা
-আলিশা, তোমার বয়স কত? কোন গ্রেডে পড়ো তুমি?
-১৭ বছর বয়স, সিনিয়ার ক্লাসে পড়ি।
-তুমি টুয়েলভথ গ্রেডে পড়ো!  আমি ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো নাইনথ গ্রেডে পড়ো।

-ভদ্রমহিলা বললেন, ও ডাবল প্রমোশান পেয়েছে, পড়াশুনায় খুব ভালো।

বাহ! ভবিষ্যতে কোন লাইনে পড়তে চাও?
-নার্সিং পড়বো।
-তুমি  যদি নার্সিং পড়ো, তুমি হবে অতি চমৎকার একজন নার্স, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে রোগী অর্ধেক সুস্থ হয়ে যাবে!
ভদ্রমহিলা বললো, আমার বড় মেয়েও নার্সিং পড়ে।

তোমার আরেকটি মেয়ে আছে? এই মেয়েকেও এডপ্ট করেছো?
-নাহ, বড় মেয়েকে ঈশ্বর দিয়েছে। আমার এই মেয়েটার জন্য প্রার্থণা করো, ও যেন নার্সিং পড়তে পারে। পড়াশোনায় মেয়েটা খুব ভালো।

আমি ভদ্রমহিলাকে আন্তরিকভাবেই বললাম, তোমার ইচ্ছে পূরণ হবেই। এমন মমতাময়ী মায়ের ইচ্ছে পূরণ না হয়ে পারে! তবে তোমার ' আদার মাদার' টার্মটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে! তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখে একবারও মনে হয় না, মাদার কখনও 'আদার' হতে পারে! মাদার ইজ অলওয়েজ মাদার।

এবার আলিশা মুখ খুললো, তুমিও নিশ্চয়ই খুব ভালো মা। এইজন্যই তুমি আমাকে এত বেশীবার সুন্দর বলছো, এমন মজা করে কথা বলছো।

বললাম, ভাল মা কিনা জানি না, তবে আমারও তিনটি মেয়ে আছে। ওরাও তোমার মতই লক্ষ্মী। লক্ষ্মী মেয়েদের দিকে আমার নজর অটোমেটিকভাবে চলে যায়! তুমি ভালোভাবে পড়াশোনা করো, নার্সিং খুব ভাল প্রফেশান, অনেক নার্স খ্যাটর খ্যাটর মার্কা হয়, কিন্তু তুমি হবে অন্যরকম। অনেক মায়াবতী, অনেক শান্ত। ভালো থেকো।

[ ** আলিশা যদি শেষ পর্যন্ত নার্সিং পড়তে পারে, মেয়েটি আসলেই খুব চমৎকার একজন নার্স হবে, ওর চেহারার মধ্যে  সে সম্ভাবনা আছে।  আমার মা যখন আইসিইউ তে ছিলেন, একদিন দেখি, মায়ের মাথার বালিশ ভিজে একশা হয়ে আছে। ডিউটিরত নার্সকে বলতেই সে জবাব দিল, ' এইটা ঘামে ভিজা। সাকশান পাম্প চললে রুগী অস্থির হইয়া যায়, তখন ঘামে। বললাম, তা তো হবেই, কিন্তু বালিশের ওয়্যারটা পালটিয়ে দিন।  মেয়েটি কোন কথা না বলে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। আমি থাকা পর্যন্ত নার্স মেয়েটি বালিশের ওয়্যার পালটায় নি। আমি নিজেই কয়েকটি টিস্যু পেপার নিয়ে মায়ের ঘাড়ের নীচে দিয়ে রেখেছিলাম। আমার আর বলার ইচ্ছে হয় নি, তোমাকে এখানে রাখা হয়েছে রুগীর সেবা করার জন্য, বিছানায় শয্যাশায়ী বলেই কী একজন মানুষকে এমন অবহেলা করতে হবে? আমি ঠিক জানিনা, বাংলাদেশে  ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে কী ধরনের ইনটেনসিভ কেয়ার নেওয়া হয়!

পরের দিন মায়ের মুখ থেকে লালা বের হয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছিল, ডিউটিরত নার্স মেয়েটিকে ডেকে দেখালাম, এই মেয়েটি কিন্তু গতদিনের নার্সের মত 'অমানবিক' ব্যবহার করেনি, সে আরেকটি শুকনো বালিশ এনে মায়ের ভেজা বালিশটি পালটিয়ে দিয়েছিল। তবে বালিশ পাল্টানোর সময় মায়ের মাথা উঁচু করার সময় খুব বিরক্তি নিয়ে বলেছিল, " আপনের মা শরীরটারে শক্ত কইরা রাখে, সহজে নড়ানো যায় না"। বলেছিলাম, মায়ের শরীর শক্ত হয়ে গেছে, ইচ্ছে করে শক্ত করে রাখেনা বোন"।

সেদিন দুই নার্সের রুগীর প্রতি দুই রকম ব্যবহার দেখে আমার খুব কষ্ট লেগেছিল মনে, খুব আফসোস হয়েছিল, প্রফেসারের উপর রাগ করে আমি প্রায় সমাপ্ত নার্সিং পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। যখনই ক্লিনিক্যাল ক্লাসে হসপিটালে যেতাম, আমি নিজের অস্ত্বিত্ব ভুলে যেতাম, রুগীদের  রোগ যন্ত্রণায় যতটুকু সম্ভব আরাম দেয়ার চেষ্টা করতাম।  পড়া ছেড়ে চলে আসার অনেক পরেও কিছু কিছু রোগী ওয়ালমার্টে এসে আমাকে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করতো, আমি কোন হসপিটালে আছি। জবাবে বলতাম, আমি ভলান্টিয়ার নার্স ছিলাম। আমি যদি নার্সিং পড়া শেষ করতাম, আমিও নাকি খুব চমৎকার নার্স হতাম, এই কথা কয়টি বলেছিল নার্সিং কলেজের দুই প্রফেসার। বাস্তবতা হচ্ছে, সারা জীবনে আমি কিছুই হইনি।]

Tuesday, November 27, 2012

আগামীকাল ওয়ালমার্টের সকলের জন্য পাঠাচ্ছি 'সারপ্রাইজ কেক"!!

ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারের স্টাফদের মাঝে প্রচলিত একটি রীতি হচ্ছে, সহকর্মীদের যে কারোর খুব নিকটজন কেউ মারা গেলে, স্টোরের পক্ষ থেকে সমবেদনা কার্ড তৈরী করে শোকে মুহ্যমান সহকর্মীটিকে দেয়া হয়। কার্ডের ভেতরে থাকে সকলের স্বাক্ষর, সাথে ডলার। স্বাক্ষর করার সময় যার যেমন খুশী, ডলার ভরে দেয় খামের ভেতর
। এরপরে আর কিছু আমি জানিনা। আমিও চেনা-অচেনা যে কারো কার্ডে স্বাক্ষর করে ডলার ভরে দিয়েছি খামে, অনেকবার। জানতেও চাইনি, এই ডলার কেনো দেয়া হয়? ভেবে নিয়েছি, হয়তো কফিনে ফুল দেয়ার জন্যই টাকা দেয়া হয়। যদিও ধরেই নিয়েছি, নিয়মটি শুধুই আমেরিকানদের জন্য প্রযোজ্য, কিনতু শুরু থেকেই এই রীতিটি আমার খুব ভালো লাগে। আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনেও সকলেই আমার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে, কারো কারো সমবেদনা ছিল কর্তব্য করার মতো, অধিকাংশের সমবেদনার ভাষা ছিল হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার মত। সময়মত কাজে যোগদান করেছি, সকলেই মৌখিক সমবেদনা জানিয়েছে, ধরেই নিয়েছি ব্যাপারটি ওখানেই শেষ হয়ে গেছে।

দশ দিন আগে আমার সুপারভাইজার আমার হাতে একখানি 'সমবেদনা কার্ড' ধরিয়ে দিয়ে বিরাট এক 'হাগ' দিয়েছে। এমন ঘটনায় আমি এতটাই 'সারপ্রাইজড' হয়েছি যে মুখে কোন কথা সরছিল না, দু চোখ বেয়ে শুধুই অশ্রু ঝরছিল। এই প্রথমবার আমি আমেরিকানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলাম। কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি এই ভেবে, আমাকেও ওরা ওদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে! আমেরিকান সহকর্মীদের এই কৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হলাম।

আমাকে এমন মমতা , সমবেদনা দেখিয়ে যেভাবে ওরা চমকে দিয়েছে, আমিও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর উপায় খুঁজছিলাম। আজকেই একমাস পূর্ণ হলো আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মুহূর্তের মধ্যেই মাথায় আইডিয়া চলে এসেছে, চলে গেলাম বেকারী সেকশানে। আমার পরম শুভাকাংক্ষী ডেবী (বেকারীর ম্যানেজার) কাছে আসতেই তাকে বললাম, " ডেবী, আমি ওয়ালমার্টের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, আমার কষ্টের সময়ে আমার পাশে থাকার জন্য। তোমার হেল্প চাই। আমাকে সবচেয়ে বড় সাইজের, সবচেয়ে সুস্বাদু একখানা কেক বানিয়ে দাও। কেকের রঙ হবে ধবধবে সাদা, এককোনে থাকবে হলুদ গোলাপ, লেখা থাকবে , থ্যাঙ্কস এভরিবডি ফর বিয়িং উইদ মি। কেকটা চাই আগামী শুক্রবার, যেদিন মোটামুটি সকলেই উপস্থিত থাকবে। আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি, একখানা ধন্যবাদ কার্ড বানিয়ে দিতে। আমার প্রতি যে ভালোবাসা তোমরা দেখিয়েছো, তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর আর অন্য কোন উপায় খুঁজে পেলাম না"।

আমার প্রস্তাব শুনে ডেবী বেশ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে, তারপরেই আমাকে জড়িয়ে ধরে শুধু বললো, " তুমি স্পেশ্যাল, তুমি শুদ্ধ আত্মার এক মানুষ, তোমাকে আমি কী পরিমান ভালোবাসি তা তুমি আন্দাজ করতে পারবেনা। আমি অনেক যত্ন করে কেক বানিয়ে দেবো। তোমার এই প্রস্তাবে আমি অবাক হয়েছি, এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারেনা। ২২ বছর হয়ে গেলো আমি ওয়ালমার্টে চাকুরী করছি, তুমিই প্রথম, যে সিমপ্যাথী কার্ডের বিপরীতে এভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাইছো। সবাই খুশী হবে, সকলেই সম্মানিত বোধ করবে। আই ফিল প্রাউড ফর ইউ"!

(ডেবীর বয়স ৬৫ বছর, বি এ পাশ, সময় কাটানোর জন্য চাকুরী করে, অবসরে আমার মতো সেও গল্পের বই সামনে নিয়ে বসে থাকে, চার সন্তানের সকলেই আর্মীতে চাকুরী করে, স্বামী-স্ত্রী সুখে সংসার করে)

সারপ্রাইজ কেকের অসমাপ্ত গল্প!

নভেম্বারের ৮ তারিখে আমার ওয়ালে  "আগামীকাল ওয়ালমার্টের সকলের জন্য পাঠাচ্ছি 'সারপ্রাইজ কেক"!! শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, শুক্রবারে ওয়ালমার্টের সকল সহকর্মীর ঊদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা কেক পাঠাবো। এরপর আরও দুই তিন শুক্রবার পার হয়ে গেছে, কেক পাঠানোর গল্প বলার সুযোগ আর হয়ে উঠেনি। আজ ছবির এলবাম ঘাঁটতে গিয়ে সেদিনের সেই 'সারপ্রাইজ কেকের' ছবি দেখে মনে পড়ে গেলো, সারপ্রাইজ কেকের গল্পটি তো শেষ করা হয় নি! 

আমি বেকারী ম্যানেজার ডেবী'র কাছে কেকের অর্ডার দিয়ে চলে এসেছিলাম। পরেরদিন বৃহস্পতিবার আমার ডে অফ ছিল, শুক্রবার বেলা ১২ টায় ছিল আমার শিফট। পৌণে বারোটার দিকেই আমি ওয়ালমার্টে পৌঁছে যাই। আগের দিন উত্তম কুমারকে দিয়ে একখানা সুন্দর 'থ্যাঙ্কস কার্ড' তৈরী করিয়েছিলাম। সেই কার্ডটি সাথে করেই আমি সরাসরি বেকারী ডিপার্টমেন্টে চলে যাই। গিয়েই ডেবীর খোঁজ করি, ডেবী'কে না পেয়ে টিনার কাছে যাই। টিনা আমাকে জানায়, কেক প্রায় রেডী, ডেকোরেশান চলছে। মাথা উঁচু করে দেখি, একটি মেয়ে ধবধবে সাদা কেকের উপর হলুদ গোলাপ বসাচ্ছে। ওদের বলে আসলাম, কেক রেডী হয়ে গেলে আমাকে জানাতে, আমি কার্ডসহ কেক টি ব্রেক রুমে রাখবো। ওদের কাছ থেকে রিসিট নিয়ে ক্যাশ রেজিস্টারে গিয়ে দাম মিটিয়ে দিলাম। এরপর  আমি ক্লক ইন করে হাতের বই, ব্যাগ ভেতরে রাখতে গিয়ে দেখি, টি-রুমের টেবিলে বিরাট এক কেক সার্ভ করা আছে। কেউ কেউ কেক কেটে খাচ্ছেও।  কেক দেখে আমি ভীষন চমকে গেছি। কালচে বাদামী 'স্পাইডার ম্যান' কেক কোথা থেকে আসলো! জানতে পারলাম,  স্পাইডার ম্যানের নতুন ডিভিডি রিলিজ উপলক্ষে ওয়ালমার্ট কর্তৃপক্ষ সকলের জন্য কেকের ব্যবস্থা করেছে। আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো, একটু পরেই আসবে আমার তরফ থেকে কেক, কার এতো দায় পড়েছে, এক কেক শেষ হতে না হতেই আরেক কেক খাবে! 

মন খারাপ নিয়েই আমার সময়মতো আমি আমার ডিপার্টমেন্টে চলে গেলাম। ঘন্টা দুই পরেই ডেবী ( কোন কারণ ছাড়াই এই মহিলা আমাকে দারুণ ভালোবাসে) আমার ডিপার্টমেন্টে এসে সংবাদ দেয়, কেক রেডী। আমি আমার রেজিষ্টার ছেড়ে বের হতেই দেখি, ডেবীর দুই সহকর্মীর হাতে বিশাল সাইজের কেকের ট্রে ধরা। কেকের চেহারা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। আমার মুগ্ধতা ডেবীর ইশারায় ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি ওদের পিছু নিলাম, পৌঁছে গেলাম টি-ব্রেক রুমে। ওরা খুব যত্ন করে কেকটি সেই 'স্পাইডার ম্যান' কেকের পাশে বসিয়ে দিল। আমি থ্যাঙ্কস কার্ড কেকের পাশে রেখে উপস্থিত কর্মীদের ঊদ্দেশ্যে ছোট্ট করে বললাম, আমি যখন মায়ের মৃত্যুশোকে কাতর, আমার ওয়ালমার্ট বন্ধুরা আমার পাশে দাঁড়িয়ে যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা দেখিয়েছে, তোমাদের সেই ভালোবাসার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবো না, কিন্তু আমার পাশে থাকার জন্য তোমাদের সবাইকে ছোট্ট ধন্যবাদ জানাতে চাই। 

কেক ও কার্ড রেখে আমি কাজে ফিরে আসি। ঘন্টা দুই পরে গিয়ে দেখি, কেকের এক চতুর্থাংশ খাওয়া হয়েছে। পাশের কালচে খয়েরী কেকটাকে ইচ্ছে করছিল এক ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেই। আরও পরে একজন একজন করে আমার কাছে আসতে লাগলো, আমাকে 'হাগ' করে দ্বিতীয়বার সহানুভূতি জানিয়ে গেল, সাথে এটা যোগ করতে ভুললো না, " এই কেকের আইডিয়া খুব ভালো হয়েছে, কেকটা দেখতে ভারী সুন্দর হয়েছে, আর খেতেও হয়েছে অতি চমৎকার"। নীতিগতভাবেই আমি কেক খাইনি, তবে কেকের চেহারা দেখেই বুঝেছি, এই কেক সুস্বাদু না হয়ে যায় না। এক ফাঁকে আমি আবার বেকারী ডিপার্টমেন্টে গিয়ে  ডেবী, টিনা আর ডেকোরেটার ভ্যালেরী'কে স্পেশ্যাল ধন্যবাদ দিয়ে এসেছি।

সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পর আমি লাঞ্চ ব্রেকে যাই ( ওয়ালমার্টে এক ঘন্টার ব্রেককে লাঞ্চ ব্রেক বলে, দিন বা রাত্রি কোন ম্যাটার করে না), এবার সত্যিকার অর্থেই বিস্মিত হই। কেকের এক চতুর্থাংশ অবশিষ্ট আছে, পাশে স্পাইডার ম্যান তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।  শুরুতে স্পাইডার ম্যানকে দেখে আমি মন খারাপ করেছিলাম, ভেবেছিলাম আমার সারপ্রাইজ কেক কেউ খাবে না। এখন স্পাইডার ম্যানকে মনে মনে স্যালুট করলাম। তার কালচে খয়েরী রঙের পাশে দুধসাদা সারপ্রাইজ কেককে দেখতে স্নো হোয়াইটের মত লাগছিল। এই জন্যই সকলে স্নো হোয়াইটের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। টি রুমে আমাকে সকলেই ধন্যবাদ জানাচ্ছিল। আমার মনে আর কোন দুঃখ ছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম, আমার মা মানুষকে খাওয়াতে খুব পছন্দ করতেন, এই জন্যই বোধ হয় উনার ঊদ্দেশ্যে দেশে বা এখানে যখনই যা কিছু আয়োজন করেছি, সব সময় সফল হয়েছি।

পরের দিন আমি যখন কাজে গেছি, ফিলিস নামের এক সহকর্মী আমাকে জানালো, " রীটা, আমি কালকে ব্রেক রুমে এসে কেক পাই নি।  আমি রাত আটটায় টি ব্রেকে এসে দেখি কেক শেষ!  যাক গিয়ে, কেকটি নিশ্চয়ই খুব ভাল হয়েছিল, আমি জানতাম না, তুমি কেকটি পাঠিয়েছো। তবে তোমার শুভেচ্ছা কার্ডটি পড়েছি। কার্ড টি পড়ে আমি অভিভূত হয়েছি। খুবই চমৎকার কার্ড। শোন, একটা কথা বলি, তোমার মা, আমাদের সকলের মা,  নিজেকে কখনও একা ভাববেনা, তুমি একা নও, আমরা সকলেই তোমার পাশে আছি। মন খারাপ হলেই আমাদের কাছে চলে আসবে, আমরা গল্প করবো, নিজেদের ফিলিংস শেয়ার করবো।  তোমার চেহারা অনেক খারাপ হয়ে গেছে, স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে, এটা ভাল কথা না। সকলকেই একদিন পৃথিবী ছাড়তে হবে, তোমার কষ্ট বুঝি, মা-বাবা কতদূরে থাকে, মন  চাইলেও যেতে পারো না, কষ্টতো থাকবেই। তবুও তুমি অনেক লাকী, মায়ের মৃত্যুশয্যায় পাশে ছিলে, অনেকের সেই ভাগ্য হয় না, কাছে থেকেও হয় না।  চীয়ার আপ বেবী, উই আর উইদ ইউ, প্রমিস"!  

ফিলিস এ বছর ৬০ বছর পূর্ণ করবে, ক্যাশ রেজিস্টারে কাজ করে, ২০ বছর হয়ে গেলো, ওয়ালমার্টে চাকুরী করছে। ফিলিসের সাথে দেখা হয় টি-রুমে, আফ্রিকান-আমেরিকান এই মহিলাকে আমি দূর থেকে দেখি, তার গল্প বলার স্টাইল আমাকে মুগ্ধ করে, অতি ছোট জিনিস দেখেও সে বিস্মিত হয়, ফিলিস জানেনা, আমি তাকে কত পছন্দ করি, অথবা হয়তো জানে, নাহলে সে আমাকে অমন স্নেহ করতো না। ফিলিসের গল্প আরেক দিন বলবো, শুধু এতটুকুই বলি, ফিলিসের বয়স যখন ২০, তার বাম পাশের ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। বানদিকের ফুসফুস কেটে বাদ দিতে হয়েছে, ডানপাশের ফুসফুস নিয়েই ফিলিস বেঁচে আছে, এখন পর্যন্ত।

Monday, November 26, 2012

বিব্রতকর! বিব্রতকর! বিব্রতকর!

নিজের গল্প দিয়ে শুরু করি। আমার ছোটবেলা কেটেছে গোমড়া মুখে, কারো সাথেই নাকি কথা বলতে চাইতাম না। এই নিয়ে আমার বিরুদ্ধে আমার মায়ের একটু অভিযোগ সব সময়ই ছিল। সেই গোমড়ামুখো আমি ক্লাস নাইন এ প্রমোশন পাওয়ার সাথে সাথে মুখে খই ফুটাতে শুরু করেছিলাম। পরিচিত-অপরিচিত সকলের সাথে যেচে যেচে কথা বলতাম। এমন কি পরীক্ষার হলে পর্যন্ত পটর পটর করতাম। পেছন থেকে কেউ কোন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ইশারা ইঙ্গিতে উত্তর বলে দিতাম। ফলে বন্ধুদের মাঝে আমি খুব প্রিয়তা অর্জন করে ফেলি। এই বদ অভ্যাসের কারণে ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময়, আমি বহিষ্কৃত হওয়ার সম্মুখীন হয়েছিলাম। ঘটনা ঘটেছিল কেমিস্ট্রি পরীক্ষার দিন। অন্য স্কুলে সীট পড়েছে, ইনভিজিলেটার স্যারকে চিনি না, আমার আশেপাশে যাদের সীট পড়েছে, তাদের কাউকেই চিনি না, সব অপরিচিতের মাঝে বসে ভালো লাগছিল না, কিন্তু কেমিস্ট্রি প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই আমি খুশী। সব কমন পড়েছে, দুই ঘন্টায় পরীক্ষা শেষ, ইতি উতি তাকিয়ে দেখি, অনেকের মুখ শুকনো, হয়তো কমন পড়েনি। মনটা খারাপ হয়ে গেলো, আমার দুই সীট পেছনে বসা এক পরীক্ষার্থী স্যারকে ডেকে কাঁদো কাঁদো গলায় একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছিল। স্যার ছিলেন বাংলার শিক্ষক, উনার তো কেমিস্ট্রি জানার কথা নয়, কিন্তু মেয়েটির মুখের চেহারা দেখে আমার মায়া লেগে যায়, স্থান-কাল ভুলে আমি বলে ফেলি, " এইটা পারো না? আমি বলে দেই" বলেই জোরে জোরে প্রশ্নের উত্তর বলতে শুরু করি। সাথে সাথে সেই অপরিচিত স্যার এসে খপ করে আমার খাতা ধরে ফেলেন। আমি থতমত খেয়ে যাই। চিবিয়ে চিবিয়ে স্যার বলতে থাকেন, " খুব বেশী বিজ্ঞ হইয়া গেছো? মাতব্বরী করতেছো? এখন যদি তোমারে এক্সপেল কইরা দেই! দিমু এক্সপেল কইরা"?  হলভর্তি পরীক্ষার্থীর সামনে আমার এহেন হেনস্থাতে আমি খুব বিব্রত বোধ করছিলাম। ফার্স্ট গার্ল বা ফার্স্ট বয়দের মনে সব সময় কিছু অহংকার কাজ করে, সেই অহংকারেই চরম আঘাত লেগেছে আমার, তখনও মাথায় আসেনি, ওটা ম্যাট্রিক পরীক্ষার হল, নিজেদের স্কুলের পরীক্ষা নয়। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ স্যার বললেন, " তুমি শংকরীদি'র মেয়ে না"?  প্রশ্ন শুনে কেঁদে ফেলার যোগার হয়েছে। কেমিস্ট্রি পরীক্ষায় ৯৫ পাওয়ার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হওয়ার আগ মুহূর্তে শুধুমাত্র ' শংকরী'দির মেয়ে হিসেবে ছাড়া পেয়ে গেলাম। খাতা জমা দিয়ে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে গেলাম। এই ঘটনা বাসায় বলার প্রশ্নই উঠেনা, আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি সেদিনের ঘটনা।

১৯৮৩ সালের ঘটনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রি অনার্স, প্রথম বর্ষের ছাত্রী আমি। একটিমাত্র ছাত্রী হোস্টেল (নুয়াব ফয়জুন্নেসা হল)  থেকে কেমিস্ট্রি বিল্ডিং এর দূরত্ব এক মাইল বা তার কিছু বেশী হতে পারে, সঠিক জানা ছিল না। টাইমের বাসে চড়ে যাতায়াত করতাম। বেশী কথা বলার স্বভাব তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চলার পথে অপরিচিত কারো সাথে যেচে দুটো কথা বলতে ভালো লাগতো। একদিন জাহাঙ্গীরনগরের বাসে চড়ে ঢাকা যাচ্ছিলাম। বাস  'বিশ মাইল' ঘোরার সময় লম্বামত এক মেয়ে বাসে উঠে আমার পাশেই বসে। মেয়েটিকে আমাদের হোস্টেলে কখনও দেখিনি। ভেবেছি আমার মতই ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। আমার পাশে বসেছে বলেই যেচে জিজ্ঞেস করলাম, " তুমি কোন ডিপার্টমেন্টে আছো"?  উত্তর দিল গোমড়া মুখে, " বাংলা"। ভেবেছিলাম মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করবে, আমি কোন ডিপার্টমেন্টে আছি। ১৫ মিনিটেও মেয়েটি আমার সাথে একটিও কথা বললো না দেখে আমি একটু লজ্জা পেলাম। সাভার বাসস্ট্যান্ডে মেয়েটি নেমে যায়, কিনতু নেমে যাওয়ার সময় আশেপাশের সকলকে শুনিয়ে বলে, " এই মেয়ে, তুমি কোন সাহসে আমাকে 'তুমি' তুমি' করে কথা বলছিলে? আমি মাস্টার্সের ছাত্রী, বেয়াদবী করার জায়গা পাও না" বলেই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বাস থেকে নেমে গেল। এতগুলো স্টুডেন্টের সামনে আমাকে 'বেয়াদব' ডেকেছে বলে আমার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিনতু পেছনের সীট থেকে আরেকটি মেয়ে আমাকে জানালো, " এই মেয়ে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের হেডমাস্টারের মেয়ে, সব সময় খ্যাঁক খ্যাঁক করে কথা বলে। তুমি মন খারাপ করোনা"। মন না হয় খারাপ করলাম না, কিনতু মাস্টার্সে পড়ে মেয়েকে কী হিসেবে আমি ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে ভাবলাম, সেটা বোধগম্য হলো না। এই ঘটনার কথা অবশ্য মা'কে বলেছিলাম। মা তখন বলেছিলেন," অপরিচিতকে শুরুতে 'আপনি' সম্বোধণ করাই উচিত, এই ঘটনা থেকে একটা শিক্ষা পেয়ে গেলি"।

বিব্রত আরেকবারঃ
অনার্স প্রথম বর্ষে আমার রুমমেট ছিল অরুণা। অরুণা ফরিদপুরের মেয়ে, স্বভাবে আমার বিপরীত। আমি হই হুল্লোড় করতে ভালোবাসতাম, আর অরুণা কেমিস্ট্রি বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালোবাসতো। ও একটু রাগী স্বভাবের ছিল বলে আমি ওকে একটু ভয়ও পেতাম। একরাতে ডাইনিং হলে গেছি দুজনে একসাথে। হলের কিচেনে  নেট লাগানো দুটি মিটসেফ ছিল। সেই মিটসেফে বাটিতে বাটিতে মাছ অথবা মাংস সাজানো থাকতো। ডাইনিং টেবিলে বড় বড় গামলা ভর্তি ভাত, আর গামলা ভরে পাতলা ডাল সাজিয়ে রাখা হতো। প্রথম দিকে হোস্টেলের 'আও বাও' কিছুই বুঝতাম না। জানতামই না, দুই মিটসেফের একটিতে থাকতো গরুর মাংসের বাটি, আরেকটিতে থাকতো খাসীর মাংসের বাটি। আমি অরুণাকে নিয়ে প্রথম মিটসেফের ভেতর থেকে দুটি মাংসের বাটি বের করে  ডাইনিং টেবিলে চলে এসেছিলাম।  ছোটবেলা থেকে আমার স্বভাব হচ্ছে ডিমের কুসুম, মাংসের টুকরা বা মাছের টুকরা প্লেটের পাশে জমিয়ে রাখা, ঝোল মেখে ভাত খেয়ে সবার শেষে আরাম করে মাংস বা মাছ খেতাম। সেদিনও আলু আর ঝোল দিয়ে ভাত মেখে মুখের কাছে নিতেই অন্যরকম একটা গন্ধ লাগলো।  অবশ্য অরুণা মাংস খায় না, কিন্তু নতুন বলে জানতেও পারিনি, মাংস না খেলে ডিম রেঁধে দেয়া হয়। ততক্ষণে অরুণা মাংস ছাড়াই দুই গ্রাস ভাত খেয়ে ফেলেছে। যাই হোক, আমার  কেমন যেন সন্দেহ হলো,  ভাত মুখে না দিয়ে আমি প্লেটের কোণায় জমিয়ে রাখা মাংসের টুকরা ভাঙ্গতে গিয়ে দেখি, মোটা মোটা আঁশ। এক দৌড়ে বেসিনে গিয়ে হাতের ভাত ফেলে দিয়ে কল ছেড়ে কুলকুচি করতে শুরু করেছি। আমার দেখাদেখি অরুণাও উঠে এসেছে, আমি শুধু বলেছি, " অরুণা, খাবার ফেলে দাও, এটা মনে হয় গরুর মাংস"। অরুণার মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে। ও সেখান থেকেই দৌড়ে চলে এসেছে রুমে। আমাদের দিকে তাকিয়ে অনেকেই আঁচ করেছে, সামথিং রং!  আমি খুব শক্ত মনের মেয়ে, কাউকেই কিছু বুঝতে না দিয়ে বাইরে চলে এসেছি। নিজের বুদ্ধিতেই বুঝেছি,  ওটা একটা দূর্ঘটনা মাত্র, পৃথিবী উলটে যাওয়ার মত কিছু না। কিন্তু আমাদের তিন বছরের সিনিয়র স্মৃতি'দি, ইংলিশ অনার্সের ছাত্রী, আমার কাছে এসে বললো, " রীতা, কী হয়েছে, আমাকে বলো"। বললাম, " কিছুই হয় নি, ভুল মিটসেফ থেকে মাংসের বাটি তুলেছি। উনি বললেন, " তোমরা ফার্স্ট ইয়ার, তোমাদের কিছুই জানার কথা নয়, খালারা কেন বলে দেয় নি, দাঁড়াও, আমি গিয়ে এখনই খালাদের ধরছি"। স্মৃতি'দি খালাদের গিয়ে বকবে, ভাবতেই আমি খুব বিব্রত বোধ করছিলাম।  আমি ঘুরে বললাম, না , মাত্র ভাতের দলা মুখের কাছে নিয়েছিলাম, খাইনি, ফেলে দিয়েছি। দিদি, খালাদের কোন দোষ নেই। এখন এগুলো নিয়ে কথা বললে সুপার আপার কানে যাবে, সুপার আপা খালাদের বকবে"। স্মৃতি'দি অবশ্য খালাদের বকেনি, বুঝিয়ে বলেছে, নতুন মেয়েদের সব কিছু বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিল খালাদের। রাশিদা খালা আমাদের রুমে এসে খুব লজ্জিত ভঙ্গীতে বার বার মাফ চাইছিল। আমি আর অরুণা পড়ে গেছিলাম বিব্রতকর অবস্থায়। খালাকে বললাম, "খালা শুনেন, আমরা ভাত খাইনি, মুখ থেকে ফেলে দিয়েছি। আপনার কোনই দোষ নেই, পাঁচ দিন পর মাংসের ঝোল দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। খপ করে হাতের সামনে যেটা পেয়েছি, সেটাই নিয়েছি। বলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি! আমার হাসি দেখে অরুণার সে কী রাগ! 

সবচেয়ে মজার ঘটনাঃ

আজ মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা আমাদের কাউন্টারে এসে দাঁড়িয়েছে।  গায়ের রঙ কালো, বেশ সম্ভ্রান্ত চেহারা, পোশাকও দামী। আমি তখন ফোনে কথা বলছিলাম ( আমার কাজিনের সাথে)। ভদ্রমহিলাকে দেখে ফোনালাপ সমাপ্ত করে বললাম, " তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি!" মহিলা হাতে ধরা 'ব্ল্যাকবেরী' ফোন দেখিয়ে বললো, " তোমাদের কাছে মিডিয়া কার্ড আছে? পিকচার সেভ করবো"। বললাম, " তুমি বোধ হয় মেমরী কার্ডের কথা বলছো, মাইক্রো এস ডি কার্ড আছে। কোনটা চাও বলো"।

উনি বললেন, " যেইটা বেশী ভাল, সেইটা দাও।
-এখানে ভালো মন্দের কিছু নেই। বেশী মেমরী চাইলে দাম একটু বেশী, কম মেমরীর দাম একটু কম।

তুমি কী আমার পিকচার গুলো ট্র্যান্সফার করে দিতে পারবে?

আজ্ঞে না, আমি তোমার ফোনে মেমরী কার্ড ইনসার্ট করে দিতে পারবো, কিনতু পিকচার ট্র্যান্সফার করবো না। পিকচার তোমাদের পারসোন্যাল সম্পদ, আমরা  কারো পারসোন্যাল কিছু নিয়ে কাজ করি না।

আচ্ছা, তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, যে এই কাজটা করে দেবে?

এই কথা শুনে একটু বিরক্ত হলাম, কিন্তু বিরক্তি চাপিয়ে বললাম, সরি, আমাকেই বলতে হবে। আমি ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ নেই। বলে মেমরী কার্ড তার ফোনের ভেতর ইনসার্ট করছিলাম। মহিলা জিজ্ঞেস করলো,

তুমি কতদিন ধরে এই ডিপার্টমেন্টে আছো?

ছয় বছর-

বলো কি? তোমাকে কখনও দেখিনি কেন?

তুমি যেদিন এসেছো, সেদিন হয়তো আমার অফ ছিল।

এক ফাঁকে আমার সহকর্মী রেজিনা টি ব্রেক থেকে ফিরে আসতেই ভদ্রমহিলা আমাকে ডিঙ্গিয়ে রেজিনাকে বললো,

দেখো তো আমার পিকচারগুলো মিডিয়া কার্ডে ট্র্যান্সফার করতে পারো কিনা? ওই মেয়ে তো করবেনা বলে দিল।

আমার আবার রাগ হলো, আমি তাকে বললাম পার্সোন্যাল জিনিস নিয়ে আমরা কাজ করিনা। যাই হোক, রেজিনা বললো,
ব্ল্যাকবেরী ফোন আমি লাইক করিনা। খুব ভেজাল ছবি ট্র্যান্সফার করা।

মহিলা এতক্ষণে বলল, এইটা আমার ছেলের ফোন। আমি স্মার্ট ফোনের কিছুই বুঝি না। ছেলে আমাকে তার ফোন দিয়ে দিয়েছে। এখানে আমার ভাইপো'র ছবি আছে, সেই ছবিটা বের করতে হবে। ওটা এই মিডিয়া কার্ডে সেইভ করতে হবে।
রেজিনা এই ধরণের উটকো ঝামেলা পছন্দ করেনা, তারপরেও কাস্টমারের সন্তুষ্টির জন্য মাঝে মাঝে অপছন্দের কাজ করতে হয়। মুখ কালো করে রেজিনা ফোনের 'পিকচার' অপশনে গিয়ে সিলেক্ট টিপতেই ফটো গ্যালারী বের হয়ে আসলো। ফটো গ্যালারী মেয়েদের ন্যুড ছবিতে ভর্তি। রেজিনা অন্য সময় খুবই ভদ্র, আজ হঠাৎ করেই ওর মাথা গরম হয়ে গেছে। ফোন মহিলার সামনে মেলে ধরে জানতে চেয়েছে, কোন ছবি উনি কপি করতে চায়? মহিলা তো ছবির দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছে, " ও মাই গড!! এগুলো কী সমস্ত ছবি! বন্ধ করে দাও, বন্ধ করে দাও। থাক , আমার ছেলেকেই বলবো, ছবি কপি করে দিতে।

রেজিনা আমার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে নির্লিপ্তমুখে বললো, দাঁড়াও দেখি, তোমার ভাইপো'র ছবি বের করা যায় কিনা। আমি স্ক্রল ডাউন করে যাই, ভাইপো'র ছবি দেখলেই আমাকে থামতে বলো, বলে স্ক্রল ডাউন করছে আর একটা একটা করে অত্যন্ত আপত্তিকর ছবি বেরিয়ে আসছে। আমার তো মনটা খুশীতে নেচে উঠেছে। মনে মনে বলি,  "এখন বুঝো ঠ্যালা, না করেছিলাম তখন, বুড়ীর মন উঠেনি, আমার চেয়েও বেশী কে জানে খোঁজ করেছিলা, এখন দেখো ছবি ভাল করে"।
এবার মহিলা আরও জোরে বলে উঠলো, " প্লীজ বন্ধ করো, উঠতি বয়সের ছেলে, দেখো কী কান্ড করে রেখেছে। ফোন দিয়ে দাও, আমার ছেলের কাছেই নিয়ে যাব, ওর জিনিস ওই ভালো বুঝবে। ছেলেপেলের কান্ড"।

আমি বললাম, ফোনটা দিয়েছে তোমাকে ব্যবহার করার জন্য, দেয়ার আগে তোমার ছেলের উচিৎ ছিল সব ছবি ডিলিট করে দেয়া, তাহলেই তোমাকে এমন বিব্রত হতে হতো না।

এবার রেজিনা ফোনটা মহিলার হাতে দিয়ে বললো,  আমার কলিগ বলেছিল, আমরা এই সকল পারসোন্যাল জিনিসে হস্তক্ষেপ করি না, অথচ তুমি আমার সহকর্মীর কথা বিশ্বাস করোনি।

মহিলা তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেলো, তবে যাওয়ার আগে আমাকে 'সরি' বলে গেলো না। মহিলা চলে যাওয়ার সাথে সাথে রেজিনা ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের ডেকে এই ঘটনা বলতে শুরু করে দিল। ঘটনা  যে শুনে, সে-ই হাসে। তবে সবচেয়ে বেশী হেসেছি আমি।

Wednesday, November 21, 2012

থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’- দিনটি হোক সকলের, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা, পৃথিবী হয়ে উঠুক সকলের জন্য বাসযোগ্য!!




সারা উত্তর আমেরিকায় আজ ধুমধামের সাথে পালিত হচ্ছে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং’ উৎসব। দিনটি সরকারী ছুটির দিন। নভেম্বার মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার থ্যাংকস গিভিং উদযাপিত হয়, সে হিসেবে এ বছরের ২২শে নভেম্বার, বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে থ্যাঙ্কস গিভিং ডে।

থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র মূল ঊদ্দেশ্য, পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবসহ সকলে একত্রিত হয়ে প্রত্যেকের জীবনের প্রতিটি সাফল্যের জন্য, দেশ ও জাতির সাফল্যের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানো। যদিও আমেরিকানদের অনেকেই জানেনা থ্যাঙ্কস গিভিং কবে থেকে শুরু, কেনই বা উৎসবটির নাম থ্যাঙ্কস গিভিং ডে হলো, কাকেই বা এমন ঘটা করে থ্যাঙ্কস জানানো হচ্ছে! তারা জানে, থ্যাঙ্কস গিভিং মানেই পার্টি, বিশাল ভোজ আয়োজন, পারিবারিক মিলনমেলা। ভুরিভোজনের তালিকায় থাকে টার্কী রোস্ট, ক্র্যানবেরী সস, মিষ্টি আলুর ক্যান্ডি, স্টাফিং, ম্যাশড পটেটো এবং ঐতিহ্যবাহী পামকিন পাই। আর কিছু না হোক, অতি সাধারণ আয়োজনেও টার্কী রোস্ট উইদ ক্র্যানবেরী সস এবং পামকিন পাই থাকবেই। অর্থাৎ থ্যাঙ্কস গিভিং মানেই টার্কী। ( টার্কীঃ ময়ুরের মত বড় সাইজের বনমোরগ জাতীয় পাখী)।

আমেরিকাতে নভেম্বারের চতুর্থ বৃহস্পতিবার থ্যাঙ্কস গিভিং উদযাপিত হলেও কানাডাতে থ্যাঙ্কস গিভিং হয় অক্টোবারের দ্বিতীয় সোমবার। তারিখ ভিন্ন হলেও উৎসব উদযাপনের নিয়ম রীতি একই রকমভাবে পালিত হয়। কেউই থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র ভাবার্থ বা ঊদ্দেশ্য নিয়ে মাথা ঘামায় না। অতি গুরুত্বপূর্ণ ছুটির দিনটি পরিবারের সকলে মিলেই কাটায়, একসাথে খাওয়া দাওয়া করে, টিভিতে ফুটবল গেইম দেখে অথবা থ্যাঙ্কস গিভিং প্যারেড দেখে। থ্যাঙ্কস গিভিং প্যারেডে পিলগ্রিম (ব্রিটিশ অরিজিন, যারা ধর্মযাজক হিসেবে অজানার ঊদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেছিল এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে আমেরিকার মেসাচুসেটসে  প্লীমথ কলোনীতে তাদের সন্ধান পাওয়া যায়), আমেরিকান ইন্ডিয়ান ( আদি আমেরিকান)দের ডিস্পলে দেখানো হয়ে থাকে। থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র সারাদিন আনন্দে কাটিয়ে সকলেই প্রস্তুত হয় পরেরদিন ‘থ্যাঙ্কস গিভিং সেল’ এর জন্য। প্রতি বছর, আমেরিকায় থ্যাঙ্কস গিভিং সেল এর রমরমা ব্যবসা দেশটির অর্থনীতির সূচককাঁটা ঘুরিয়ে দেয়। ফলে থায়ঙ্কস গিভিং ডে’র ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য অপেক্ষা বাণিজ্যিক দিকটাই বেশী প্রকাশিত হয়ে পরে।

থ্যাঙ্ক গিভিং ডে উৎসবের সূচনাঃ

১৬২০ সালের আগস্ট মাসে ‘মে ফ্লাওয়ার’ নামের ১০৮ টনের এক জাহাজ ইংল্যান্ডের সাউথ হ্যাম্পটন থেকে যাত্রা করে। জাহাজে ছিল ১০২ জন যাত্রী, ইংল্যান্ডে বসবাসকালীন সময়ে স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা করায় তাদের অনেক বাধা ছিল, তাই স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা করার ঊদ্দেশ্যে ‘মে ফ্লাওয়ারে’ চেপে ইংল্যান্ড ছেড়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয়। দুই তিন মাস বাদে তারা আমেরিকার মেসাচুসেটস বে তে এসে পৌঁছে। ততদিনে যাত্রীদের অনেকেই অর্ধাহারে, অনাহারে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিছু যাত্রীর মৃত্যু হয়। নতুন স্থানে পৌঁছে অনেকেই শীতের তীব্রতায় অসুস্থ ও দূর্বল হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা মেসাচুসেটসেই যাত্রা বিরতি করে। যারা সুস্থ ছিলো, জাহাজ থেকে তীরে এসে নামে। যদিও তাদের গন্তব্য ছিল ভার্জিনিয়া কোস্ট, যেখানে আরও অন্যান্য পিলগ্রিমদের বসবাস ছিল, সেখানে পৌঁছাতে না পেরে মেসাচুসেটসেই তাদের প্লীমথ কলোনী গড়ে তোলে। শুরু হয় মুক্ত স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার উদ্যোগ। তবে শুরুতেই তাদের অনেক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। নতুন দেশ, নতুন আবহাওয়া, শীতের তীব্রতায় প্রতিদিনই দুই একজনের জীবন সংকট দেখা দিতে থাকে। কেউ কেউ মারাও যায়।

শীত পেরিয়ে যখন বসন্তের আগমন ঘটে, বেঁচে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা দেয়। তারা ধীরে ধীরে ঘর-বাড়ি বানাতে শুরু করে, আশেপাশের স্থাণীয় ইন্ডিয়ান উপজাতিদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা, উপজাতিদের সাহায্যে চাষ-বাস করাসহ বেঁচে থাকার তাগিদে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে দেয়। উপজাতিদের সাথে উৎপাদিত দ্রব্য বিনিময় প্রথা চালু হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে প্লীমথ কলোনী বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে।


১৬২১ সালের নভেম্বার মাসে প্লিমথবাসী প্রথমবারের মত নিজেদের উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলে। ফসলের মধ্যে ভুট্টার ফলন এত বেশী ভালো হয়েছিল যে তৎকালীন গভর্নর উইলিয়াম ব্র্যাডফোর্ড এই উপলক্ষে সমস্ত ইন্ডিয়ান উপজাতি এবং প্লি্মথ কলোনিবাসীদের সৌজন্যে ‘ফিস্টি’ আয়োজন করেন। ফিস্টির দিনটিকে সকলে ঈশ্বরের নামে উৎসর্গ করে। সকলেই কৃতজ্ঞ চিত্তে ঈশ্বরকে স্মরণ করে, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায়, কারন ঈশ্বরের কৃপায় তারা বেঁচে আছে, প্রভুর দয়ায় তাদের সকলের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠেছে, পতিত বন্যভূমিকে সকলে মিলে বাসযোগ্য কলোনি হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছে, ঈশ্বর কৃপা করেছে বলেই উৎপাদিত ফসলে তাদের গোলা ভরে উঠেছে, ফসলের ফলন এত বেশী হয়েছে যে আগামী শীত কেটে যাবে কোন খাদ্য ঘাটতি ছাড়া। ঈশ্বরের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন শেষে নিজেদের মধ্যে ধন্যবাদ বিনিময় হয়, খাওয়া দাওয়া হয়, সকলে মিলে আনন্দ-ফূর্তিতে কাটিয়ে দেয় একটি দিন। সেই থেকে অনুষ্ঠানটি আমেরিকার সর্ব প্রথম ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্লীমথ কলোনিবাসীর দেখাদেখি থ্যাঙ্কস গিভিং ডে উদযাপনের এই রীতি অন্যান্য কলোনিবাসীদের মাঝে প্রচলিত হতে থাকে। তবে বছরের নির্দিষ্ট দিনে তা পালিত হতো না। কলোনিবাসীদের নিজেদের সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী তারা বছরের একটি দিন থ্যাঙ্কস গিভিং ডে উদযাপন করতো।



সরকারীভাবে সর্ব প্রথম ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ উদযাপিত হয়েছিল নিউইয়র্কে, ১৮১৭ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর অন্যান্য স্টেটেও উৎসবটি পালিত হতে থাকে। নিউইয়র্ক এবং অন্যান্য স্টেটে দিনটি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত ছিল। পরবর্তীতে সকল স্টেট থেকে থ্যাঙ্কসগিভিং ডে’কে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করার পক্ষে জোর দাবী উঠতে থাকে।  ১৮২৭ সালে বিখ্যাত নার্সারী রাইম ‘মেরি হ্যাড আ লিটল ল্যাম্ব’ রচয়িতা সারাহ যোসেফা উদ্যোগ নেন, দীর্ঘ ৩৬ বছর তিনি একটানা আর্টিক্যাল, এডিটোরিয়েল লিখাসহ এই আবেদনের সপক্ষে প্রচুর চিঠিপত্র গভর্নর, সিনেটর, প্রেসিডেন্ট, রাজনীতিবিদদের কাছে পাঠিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৬৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, সারাহ যোসেফের আবেদন খুব গুরুত্ব সহকারে গ্রহন করেন এবং ‘সিভিল ওয়ার’ চলাকালীন সময়েই জনগনের উদ্দেশ্যে আবেদনমূলক ঘোষনা দেন, সকলেই যেন পরম করুনাময় ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা জানায়, “হে ঈশ্বর! তোমার স্নেহের পরশ, অপার করুণা তুমি তাদের উপর বর্ষন করো, যারা সিভিল ওয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যে নারী স্বামী হারিয়েছে, যে সন্তান পিতৃহারা হয়েছে, যা ক্ষতি সমস্ত জাতির হয়েছে, সমস্ত ক্ষতি যেনো দ্রুত সারিয়ে তোলা যায়। জীবিত সকলের যেন মঙ্গল হয়’। একই বছর প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন নভেম্বার মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ হিসেবে সরকারী ছুটির দিন ঘোষনা করেন।
পরবর্তীতে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা শুরু হয়। ‘গ্রেট ডিপ্রেশান’ হিসেবে পরিচিত অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে ১৯৩৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট রিটেল সেল বাড়ানোর ঊদ্দেশ্যে এই ছুটি এক সপ্তাহ এগিয়ে আনা্র ঘোষনা দেন, এবং সেই থেকে শেষ বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে নভেম্বার মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ পালিত হয়।

যদিও বর্তমানে অধিকাংশ আমেরিকাবাসীর কাছেই থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র ঐতিহাসিক গুরুত্ব বা তাৎপর্য্য খুবই কম, বাণিজ্যিক জৌলুসটাই সকলের নজরে আসে, তারপরেও শুধু আমেরিকা বা কানাডাতে দিনটি উদযাপিত না হয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও তা পালিত হতে পারে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তো প্রতি নিয়তই দেয়া উচিত এমন সুন্দর এক পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন বলে, ধন্যবাদ দেয়া উচিত, এই সুন্দর পৃথিবীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য আমাদের সৃষ্টি করেছেন বলে, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য পৃথিবীটাকে নানা ধনসম্পদে ভরিয়ে রেখেছেন বলে। আমাদের সকলেরই তো সপ্তদশ শতাব্দীর জাহাজ ‘মে ফ্লাওয়ার’ থেকে নেমে আসা পিলগ্রিমদের মতই পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর কথা, শত্রু নয় বন্ধু নীতিতে চলার কথা, তা না করে আধুনিক বিশ্বে মানুষ হয়ে উঠছে স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, অমানবিক। প্রতিদিন নিষ্ঠুর গোলার আঘাতে হত্যা করে চলেছে অসহায় নারী, পুরুষ, শিশু। যে আমেরিকাতে থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ উৎসবের শুরু, সেই আমেরিকাই এখন সারা বিশ্বে যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ শুধুমাত্র প্রতীকী দিবস হিসেবে পালিত না হয়ে, আক্ষরিক অর্থেই পারস্পরিক বন্ধুত্ব, ভালো কাজের স্বীকৃতি, পারস্পরিক সহযোগীতা, সহমর্মিতা ও উদারতায় পরিপূর্ণ হোক। মানুষ যুদ্ধ বিগ্রহ ভুলে, হানাহানি, মারামারি বন্ধ করে, প্রতিবেশী, প্রতিবেশী দেশ তথা সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সাথে বন্ধুত্ব অথবা সন্ধি করার কথা ভাবুক, তবেই  ঈশ্বরও আমাদের জীবনে তাঁর করুণা বর্ষণ করবেন। ঈশ্বরের করুণায় সিক্ত হয়ে আমরাও প্রতিদিন অথবা প্রতি মাস অথবা বছরের একটি দিন, ঈশ্বরের জয়গান করতে পারি, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে পারি আমাদের প্রতি অবারিত করুণা বর্ষনের জন্য।

আজকের দিনটি হোক ঈশ্বর বন্দণায় নিবেদিত! থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’- দিনটি হোক সকলের, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা, পৃথিবী হয়ে উঠুক বাসযোগ্য!!


Sunday, November 18, 2012

প্রিয় মৌটুসী

মামনি,
বছর ঘুরে চলে এলো ১৮ই নভেম্বার, তোমার শুভ জন্মদিন। কততম জন্মদিন, বলো তো! আমার হিসেবে মিলছে না। বার বার চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে ঢাকা ইবনে সিনা ক্লিনিকের সেই সন্ধ্যার দৃশ্য। মঙ্গলবার ছিল, বিকেল সাড়ে তিনটায় আমাকে অপারেশান থিয়েটারে নিয়ে গেল, কেউ পাশে ছিল না। ডাক্তারের নির্দেশে তোমার বাবা গেছিলেন নীচে ফার্মেসীতে, তোমার দিদা, মানে আমার মা কেবিনে গেলেন আমার জন্য কিছু একটা নিয়ে আসতে। এই ফাঁকেই আমাকে নার্সেরা ধরে নিয়ে গেল ওটিতে। সেই মুহূর্তে আমার মনে 'মা' হওয়ার  কোন আবেগ ছিল না,  মনে হচ্ছিল, আমাকে ওরা সবাই মিলে এমনভাবে নিয়ে গেছিল, যে বার বার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি আমার শেষ যাত্রা। আর ফিরবো না। অথচ গর্ভকালীন নয়টি মাস কত কিছুই কল্পনা করতাম! আমি তো জানতাম, আমার একটি ছেলে হবে, নানাজনে আমাকে দেখে তেমন কথাই বলতো।

সন্ধ্যাবেলা আমার যখন প্রকৃত জ্ঞান ফিরে আসে, আমার কানে ওঁয়াও ওঁয়াও  কান্নার শব্দ আসছিল। সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা, গলাতে ব্যথা, হাতে স্যালাইনের সুঁই ফোটানো ছিল, সেই ব্যথা, ব্যথায় অস্থির আমি চোখ মেলে তাকাতেই তোমার বাবা আমাকে বললো, " আমাদের  একটা কুটুকুটু মেয়ে হয়েছে। নাম রাখা নিয়ে আর ভাবতে হবেনা, মৌটুসীই থেকে গেল। আমি চেতন-অচেতনের মাঝে থেকেও একটু অবাক হয়েছিলাম। মেয়ে হয়েছে বলছে কেন, আমার তো ছেলে হওয়ার কথা ছিল। কেউ হাত দেখতে জানে শুনলেই আমি হাত সামনে মেলে ধরতাম, তারাই বলেছিল, আমার প্রথম সন্তান হবে ছেলে। তোমার নিশ্চয়ই হাসি পাচ্ছে, কেমিস্ট্রি অনার্সের ছাত্রীও কী রকম ভাগ্য গননায় বিশ্বাস করে বসে থাকে! আমি এরকমই, সব কথা বিশ্বাস করি, সবাইকে বিশ্বাস করি। যে কথা বলছিলাম, মাথা ঘুরিয়ে দেখি, পাশের বেডে আমার মা ছোট্ট একটা বিড়াল ছানাকে নিয়ে বসে আছে। বিড়াল ছানার গায়ের রঙ দেখলাম ধবধবে সাদা, সরু সরু হাত -পা নাড়ছে, আর কাঁদছে। আমার মায়ের প্রথম নাতণী, মা'কে কখনও বাচ্চা-কাচ্চা কোলে নিতে দেখিনি, তুমিই প্রথম ভাগ্যবতী, যে আমার মায়ের কোলে চড়েছো। কান্না থামাতে পারছিলনা বলে 'কমলা' নামের একজন নার্স এসে মায়ের কোল থেকে তোমাকে নিয়ে তোয়ালে, কাঁথা দিয়ে খুব দক্ষতার সাথে তোমাকে পেঁচিয়ে দিতেই তোমার কান্না থেমে গেছিল। ডাক্তারের পরামর্শে তোমার জন্য 'এস ২০' নামে ইনফ্যান্ট মিল্ক আনা হয়েছিল, তোমার বাবা, তোমার বড়মামা একটু পর পর দুধ গুলে আমার মায়ের কাছে নিয়ে আসে, আমার মা চামচ দিয়ে তোমাকে একটু একটু করে দিলেই তুমি তা মুখ থেকে ফেলে দিচ্ছিলে। তোমার দিদা বলেছিল, " হুম! তেজ আছে তো দেখি। আসলে হওয়ার কথা ছিল ছেলে, হইছে মেয়ে, কিনতু ছেলেদের জেদ লইয়া জন্মাইছে তোর মাইয়া"। আমি ছেলের প্রত্যাশায় ছিলাম, মায়ের মুখে তোমার নিন্দা শুনে সাথে সাথে বলেছিলাম, " ভাল হইছে তেজ হইছে, তুমি খাওয়াতে পার না, সেইটা দেখনা, শুধু শুধু ওর দোষ দিতেছ"। হা হা হা হা ! দেখো, এই হচ্ছে মা আর সন্তানের সম্পর্ক।

মামনি, তোমার মৌটুসী নাম তোমার বাবা অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন।  কানাডাতে থাকার সময় বোধ হয় কোথাও কারো নাম মৌটুসী শুনেছে, তখন থেকেই নাকি সে জানতো, তার প্রথম সন্তান হবে মেয়ে, এবং মেয়ের নাম হবে মৌটুসী। আমি যখন ছেলের স্বপ্নে বিভোর, সে কিনতু আমার কথায় কোন মন্তব্য করতোনা। এবার বুঝে দেখো, বাবার হৃদয়ের কোথায় তুমি বসে আছো। তোমার বাবার আরও দুই একটা কথা বলি, তোমার যখন দুই বছর বয়স, তোমাকে কোলে নিয়ে তোমার বাবা হাঁটছিল আর কথা বলছিল। কথা আর কি, ওই সব 'কিনু মিনু, কাটুস পুটুস টাইপ' কথা। তা এক সময় একটি গাছের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তোমাকে বললো, " মামনি, এই গাছটাতে কী নেই, বলোতো"? তুমি তখন কম কথা বলতে, কিনতু যাই বলতে, স্পস্ট করে বলতে। তুমি বলেছিলে, " পাতা নেই, পাতা নেই"। আমার এখনও গায়ে কাটা দিচ্ছে। তোমার বাবা এবং আমি তোমার জবাব শুনে টাসকি লেগে গেছিলাম। সত্যিই গাছে একটিও পাতা ছিল না, তোমার বাবা বলেছিল, " আমার মামনি  টা তো অনেক বুদ্ধিমতী হয়েছে, ওতো অনেক বড় বিজ্ঞানী হবে"। আমি তো জানতামই তুমি বড় হয়ে অনেক বড় কিছু হবে। তোমাকে আমি কত যত্ন করে ছড়া শেখাতাম, আড়াই বছর বয়সেই তুমি অনেক কিছু শিখে ফেলেছিলে। আসলে প্রথম সন্তান নিয়ে সব মা আদিখ্যেতা করে, আমিও এর বাইরে ছিলাম না। তোমাকে নিয়ে দাদুর বাড়ী যেতাম, ওখানে তোমার মামারা, দাদু, দিদা সবাই মিলে তোমাকে ঘিরে থাকতো। তুমি ছিলে আমার বাধ্যগত, আমি যদি বলতাম, এখানে সারাদিন বসে থাকো, তুমি তাই করতে। মামারা ডাকলে বলতে, " মামনি বলেছে এখানে বসে থাকতে"। তোমার মেজোমামা বলতো, " মায়ের চামচা হইছে"। হা হা হা হা !! তোমার হয়তো কিছুই মনে পড়ে না। আমার বাবাকে বলেছিলাম, " বাবা আমার মেয়ে দেখবা ঢাকা বোর্ডে ম্যাট্রিকে ফার্স্ট হইব"। বাবা বলেছিল, " এত আগ বাড়াইয়া কথা না কইয়া মেয়েরে যত্ন কইরা বড় করিস"। আমার মা বোধ হয় টের পেয়েছিল, ছেলে হয় নি বলে আমার আশা ভং হয়েছে। মা বারবার বলতো, " এমন লক্ষ্মী মেয়ে হইলে, পাঁচটা মেয়ে হইলেও বাপ মায়ের চিন্তা নাই"। তুমি ছিলে দিদার কলিজার টুকরা। কোনদিন তোমাকে একটা ধমক দেয় নি দিদা।

তুমি আসলেই অনেক লক্ষ্মী একটা মেয়ে হয়েছ, কেউ জানেনা, কাউকে বলিনি, আমার সৌভাগ্যের কথা। আমি যেমন চেয়েছিলাম, তুমি তেমনই হয়েছ। আমি তো শুধু একাডেমিক দিক নিয়ে ভাবতাম, তাই তুমি একাডেমিক দিক দিয়ে আমাদের অনেক শান্তি দিয়েছ। একটা টাকা খরচ করতে হয়নি তোমার পেছনে। দেশে থাকতে করেছি, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো অর্থ পিশাচ, ওরা ছাত্র ছাত্রীকে স্কলারশীপ দেয়ার কথা ভাবতে পারেনা। অস্ট্রেলিয়াতে যখন ক্লাস থ্রীতে ভর্তি হয়েছিলে, তোমার কী মনে পড়ে, ক্লাস টিচার আমাকে বলেছিল, " তোমার মেয়ে অন্যরকম, সব সময় কোন একটা চিন্তায় ডুবে থাকে। দেখলেই মনে হয়, ও স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। ওর চোখগুলো দেখেই বুঝা যায়, ও আলাদা"। আমি খুব গর্ব বোধ করেছিলাম, আমি তো জানতাম, তুমি একটু আলাদা। তুমি মায়ের কথা হুবহু মেনে চলো, মায়ের তো আনন্দ হবেই। তোমার বাবার শখ হয়েছিল, তোমাকে আর্ট ক্লাসে ভর্তি করবে। চার বছর বয়সে তোমাকে ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলের আর্ট ক্লাসে দিয়েছিলাম। তৃতীয়দিনে গিয়ে দেখি টীচার একটু বড় বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত, তুমি বেঞ্চের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছ। আমার এমন রাগ উঠেছে, সেই যে তোমাকে নিয়ে এলাম, আর পাঠালাম না। কিনতু মনের ভেতর খচখচানি ছিল, আহারে, মেয়ের বাবার কত শখ ছিল। তোমাকে আমি সব সময় এই কথা বলতাম, তোমাকে আরেকটা কথা বলেছিলাম। তোমার বাবার খুব শখ, তার একতা মেয়ে ডাক্তারী পড়ুক। তোমার ছোট দুই বোন থাকার পরেও আমি তোমাকেই বলেছিলাম কথাটা। একদিন দেখি, তুমি স্কুল থেকে দারুন সুন্দর পেইন্টিং হাতে করে বাড়ী ফিরেছ। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসে ক্লাস টেনে ভর্তি হয়েছিলে। আমেরিকাতে স্কুলে কত প্রাচুর্য্য, রঙ, তুলি, ক্যানভাস, সব ফ্রী। তুমি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছো। মাত্র দুই বছরে তুমি এমন সব পেইন্টিং করেছো, যা অনেকে চার বছর আর্ট কলেজে পড়েও করেনা। তোমার আর্ট কত কম্পিটিশানে পাঠিয়েছো এবং অবধারিতভাবে সেগুলো ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে। তোমার একটা আর্ট , আমেরিকার ন্যাশনাল পর্যায়ের কম্পিটিশানে গেছিল এবং সেকেন্ড পজিশান পেয়েছে। এরপর থেকে দেখি তুমি সব কিছুতেই তুলির টানে ডিজাইন করে রাখতে ভালোবাসতে। ঘরের টেলিফোনটাও বাদ পড়েনি। সায়েন্স কমপিটিশান, সোশাল স্টাডিজ কমপিটিশান, বক্তৃতা কমপিটিশান, কতকিছুতেই অংশগ্রহণ করেছো, সব কিছুতেই প্রথম স্থান। এত বেশী  'ট্রফি' আর সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছো যে সবগুলো এখন আমার এটিকের ছাদে বস্তায় ভরে রেখে দিতে হয়েছে। কী করবো, একটা দুটা হলে মূল্য বুঝা যায়, এত এত পুরস্কার রাখার জায়গা কোথায়!

স্কুল গ্র্যাজুয়েশান করলে 'আউটস্ট্যান্ডিং' রেজাল্টসহ, কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে টপ স্কোর থাকার পরেও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কোন স্কলারশীপ পেলেনা, কারন আমাদের ভিসা স্ট্যাটাস ছিল এইচ ফোর, কিছুই বুঝিনা আমেরিকার নিয়ম। আমার মাথা গরম হয়ে গেছিল, আমার মেয়ের এমন দূর্দান্ত রেজাল্ট নিয়েও মেয়ে স্কলারশীপ না পেলে মেয়েকে পড়াবো কিভাবে, এই চিন্তায় অস্থির হয়েছিলাম। তুমি কিনতু একটুও বিচলিত হওনি, ভার্জিনিয়া প্রাইভেট কলেজে একটা সুযোগ পেলে। স্কলারশীপ পেতে হলে ইন্টারভিউ দিতে হবে, দুই দিনব্যাপী ইন্টারভিউ, আমেরিকার কত স্টেট থেকে মেয়েরা এসেছে, এত লম্বা লম্বা, ফর্সা সব মেয়ের সামনে তোমাকে ছোট্ট একটা বাচ্চার মত লাগছিল। তোমার কি মনে আছে, তুমি আমার হাতের ডিজাইন করা লম্বা ঝুলওয়ালা লাল জামা পড়ে ইন্টারভিউ দিতে গেছিলে। তিনদিন পরেই ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট বাসায় ফোন করলো, আমি ছিলাম বাসায়, ফোন ধরে আমি আর কথা কিছুই বুঝিনা। কী বলে, তোমার নাম বলছে, ফুল স্কলারশীপ পেয়েছো বলছে, মাত্র পাঁচজন পেয়েছে, তাদের মধ্যে তুমি একজন। কথা স্পস্ট, অথচ আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, কেঁদে ফেলেছিলাম, প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম, প্রেসিডেন্ট বুঝতে পেরেছিল, আমার খুশীর পরিমান, বলেছিল, তুমি খুব লাকী মাম।

আবার আউটস্ট্যান্ডিং রেজাল্ট করে আন্ডারগ্র্যাড কম্পলীট করলে, ডাক্তারী পড়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সবই ঠিকমত করলে, ইন্টারভিউ দিলে, শেষ পর্যন্ত আমাদের মিসিসিপি স্টেটে এসে ভর্তি হলে। এখান থেকেই শুরু হলো আমার বিপর্যয়। আমি মনে প্রাণে চেয়েছিলাম, তুমি যেন মিসিসিপিতে পড়ো, আর তুমি চার বছর আমাদের থেকে দূরে থেকে অনেক বেশী স্বাবলম্বী হয়ে গেছিলে। আরও বড় কোন শহরে যেতে চেয়েছিলে, কিনতু মায়ের আকাঙ্ক্ষার কাছে আর সব কিছু ম্লান হয়ে গেছে। সেই ১৬ বছর বয়সে আমাদের কাছছাড়া তুমি, কত কেঁদেছি, জীবনের বাস্তবতায় ক্ষত বিক্ষত হয়েছি, আবার ভেবেছি, বাবাকে বলেছিলাম, মৌটুসী ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করবে, আমেরিকাতে স্ট্যান্ড করাতে পারলেই আমার কথা ঠিক থাকবে। কিনতু তুমি মিসিসিপিতে এসেই মন খারাপ করে ফেললে। ভার্জিনিয়া থেকে মিসিসিপিতে এলে, তোমার মত বয়সী ছেলে মেয়েদের খারাপ লাগবেই, তার উপর আবার ডাক্তারী পড়ার মত কঠিন একটা বিষয় নিয়ে থাকতে হবে। তুমি ধীরে ধীরে ডিপ্রেসড হতে শুরু করলে। তুমি ছিলে বিনয়ী, শান্ত, স্পষ্টভাষী, সেই তুমিই হয়ে গেলে অসহিষ্ণু, মলিন। আগে কত আর্ট করতে, নাচ করতে, ভার্জিনিয়াতে থাকতে কত কালচার‌্যাল প্রোগ্রাম অর্গ্যানাইজ করেছো, কত রকম সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছো, সেই মেয়েটি মিসিসিপির আবহাওয়াতে এসে থমকে গেল! আমি কত কেঁদেছি তোমার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে। অথচ মিসিসিপি মেডিক্যাল কলেজে তুমি পেয়েছিলে 'ফুল স্কলারশীপ"। আমেরিকার মত দেশে ডাক্তারী পড়তে গেলে সকলকেই ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে পড়তে হয়, সেখানে তুমি পেয়েছিলে ফুল স্কলারশীপ।

তুমি একদিন আমাকে ফোন করেছিলে, তোমার গলার আওয়াজ শুনেই আমি বলেছিলাম, " মামনি, তোমার গলার আওয়াজ এমন শোনা যাচ্ছে কেনো? কী হয়েছে?" তুমি কেঁদে ফেলেছিলে, বলেছিলে " মামনি, আমার এখানে একটুও ভাল লাগেনা, আমি কিছুই পড়তে পারিনা, বই নিয়ে বসে থাকি, কিছুই পড়িনা। আজকে একটা পরীক্ষায় ফেল করেছি"। আমি খুবই শকড হয়েছিলাম কিনতু তোমাকে বুঝতে দেইনি। আমি তোমাকে খুব নরমভাবে বুঝিয়েছিলাম, ডাক্তারী পরীক্ষায় পাশ মার্ক হচ্ছে ৭০, তুমি পেয়েছো ৬৮। আরও পরীক্ষা আছে, কোন চিন্তা করোনা, সেগুলো দিয়ে কভার করে ফেলো। তুমি তো একা ফেল করোনি, আরও অনেকে করেছে, ডাক্তারী যারা পড়তে যায়, তারা সকলেই মেধাবী, তোমাদের হাতে মানুষের জীবন মরণ নির্ভর করে, তোমাদেরতো ভালোভাবে শিখতে হবেই। প্রথম প্রথম একটু আধটু ফেল করার ব্যবস্থা হয়তো এরাই করে রাখে।  এক পরীক্ষায় ফেল করেছো, ভালোই হয়েছে, পাশ করার জন্য আরও অনেক বেশী পড়বে, তাহলে অনেক বেশী শিখবে। আমার কথা শুনে তোমার কান্না থেমেছে। কিনতু তোমার বাবা যখন শুনেছে, তুমি কেঁদেছো, তোমাকে ফোন করলো, মনে আছে তোমার? তোমার বাবা ফোনের উপরেই কী কান্না! আমি অবাক হয়ে গেছিলাম, তুমিও অবাক হয়ে গেছিলে। তোমার বাবাকে আমি একবার মাত্র কাঁদতে দেখেছিলাম, তোমার তিন বছর বয়সে একবার খুব অসুস্থ হয়েছিলে, ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল তোমার শরীর, তোমার বাবা তোমার শিয়রে বসে নীরবে কাঁদছিলেন। সেবার আমি শক্তহাতে হাল ধরেছিলাম, ডাক্তারের পরামর্শে সব কাজ ফেলে রেখে তোমাকে ড্রপারে করে এক ফোঁটা দুধ, এক ফোঁটা জল, এক বিন্দু মধু দিয়ে যাচ্ছিলাম। পাঁচ ঘন্টা পর তুমি উঠে বসেছিলে। এত বছর পরে আবার তোমার বাবা কাঁদতেই জিজ্ঞেস করলাম, কান্নার কারন, সে বললো, পড়ালেখা জীবনের সব নয়। মরে গিয়েও পড়তে হবে, এটা আমি মানিনা। মামণি যেন সুইসাইড টাইড না করে বসে। এই বয়সে এত চাপ সহ্য করতে পারেন অনেকেই। তোমার বাবার কথা শুনে আমি তোমাকে আড়ালে বুঝিয়েছিলাম, তুমিও আমার কথা বুঝতে পেরেছিলে। আরেকদিনের কথা বলি, তোমাদের কলেজের সামার ভ্যাকেশান চলছিল, তুমি রয়ে গেছিলে তোমার এপার্টমেন্টে। আমি তোমাকে ফোন করি, ফোন করি, কেউ ফোন ধরে না। সকাল থেকে ফোন শুরু করেছি, দুপুর দুইটায় যখন ফোন ধরছিলে না, আমার টেনশান শুরু হয়ে গেল। তোমার বাবা কে বললাম, " মামনি ফোন ধরেনা কেন? মনের দুঃখে কিছু করে ফেলেনি তো! এমনও তো হতে পারে, ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে একা ঘরে, কেউ তো জানবেও না। শীগগীর চলো, আমরা যাই, অন্তঃত মেয়েটাকে উদ্ধার করি"। মামনি তুমি বুঝতে পারছো, এত সুন্দর করে আমি কথাগুলো বলিনি। আরও ভয়াবহ করেই বলেছি। তোমার বাবা আমাদের নিয়ে গাড়ী ছুটিয়েছে, একঘন্টা চলার পর তুমি ফোন ব্যাল করে বললে, একটা সেমিনার ছিল, ফোন সাথে নাওনি। তোমাকে বকবো কী? তুমি যে বেঁচে আছ, এটা জেনেই আমরা খুশী। এই হলাম আমি। তোমার অবশ্য এখন আরও অনেক কথাই মনে পড়বে, তুমি যখন ভার্জিনিয়া হলিন্স ইউনিভার্সিটিতে ছিলে, প্রতিদিন পাঁচবার ফোন করতাম তোমাকে। আর আমি এত ফোন করি বলেই বোধ হয় তুমি নিজে থেকে আমাকে ফোন করতে না। একদিন রাতে ফোন করে তোমাকে না পেয়ে তোমাদের অফিসে ফোন করেছি, সেখানে কেউ ধরেনা, কি করে যেন আর কারো ফোন নাম্বার যোগার করে তাকে ফোন করেছি রাত দুইটায়। সে বলেছে তুমি কোন একটা প্রোগ্রামে আছ, ফিরতে রাত হবে। হা হা হা ! এমন পাগলামী কত করেছি, তাইনা? কেন করেছি? আমার এত দামী একটা মেয়ে, এত আদরের সন্তান আমার, আমি চিন্তা করবো না তো কে করবে?

আরেকবার তুমি যেদিন বললে, তুমি ডাক্তারী পড়তে চাও না, অন্য কিছু পড়বে, সেদিন আমি তোমাকে বলেছিলাম, " ঠিক আছে, ডাক্তারী পড়তে হবে না।" তুমি বাসা থেকে গাড়ী চালিয়ে তিন ঘন্টা ড্রাইভ করে হোস্টেলে যাবে, আমি তোমার দিকে ফিরেও তাকালাম না। কী যে কষ্ট পাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমার সকল স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। কারন , তুমি খুব স্পষ্টভাবে কথা বলো, তোমার কথাবার্তায় কখনও কোন অস্বচ্ছতা থাকেনা। তুমি যখন বলেছ, পড়া ছেড়ে দিবে, তাহলে তা তুমি করবেই। চার ঘন্টা পরে তুমি আমাকে ফোন করেছিলে, " মামনি, আমি ঠিক করেছি, ডাক্তারী পড়া শেষ করবো। আর কখনও পড়া ছেড়ে দেয়ার কথা বলবো না। তুমি মন খারাপ করো না, বাবিকেও বলো, আমাকে নিয়ে চিন্তা না করতে"। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, জানতে চাইলাম, হঠাৎ মত পরিবর্তন কেন? তুমি বলেছিলে, " তুমি ঠিকই বলেছ, কোন কিছুই সহজ না, ডাক্তারী পড়া ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছু পড়বো, সেটাও যদি ভালো না লাগে, তাহলে তো সবই যাবে। তার চেয়ে ডাক্তারী পড়া শেষ করি"। তোমার সেদিনের কথা শুনে আমি আবার কেঁদেছি, আনন্দে, আমার মৌটুসীর মন থেকে সব দ্বিধা চলে গেছে, ও যখন বলেছে, পড়া শেষ করবে, তাহলে তা হবেই হবে। তুমি তা করেছো। খুব ভালোভাবেই করেছো। কত বড় শহরে তুমি এখন রেসিডেন্সী করতে গেছো। এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

এই বছর তোমার কাছে আরেকটি কারনে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে চাই। সেটা হচ্ছে, তোমার বিয়েটা দেশে আয়োজন করিয়েছো বলে। মামনি, আমি সব সময় বলতাম, আমার মেয়েদের বিয়ে বাংলাদেশে হবে। কথাটি তোমার অবচেতণ মনে ছিল। যখন তোমার বিয়ের কথা হচ্ছে, তখন তোমার বাবা মিসিসিপিতেই তা আয়োজন করতে চেয়েছে। এখন আমার একটু বয়স হয়েছে, তোমার বাবার কথার উপর বেশী কথা বলিনা, কারন তোমার বাবা তো কখনও খারাপ কিছু বলেনা। আমেরিকা থেকে দেশে গিয়ে মেয়ে বিয়ের আয়োজন করার মত শক্তি বা ক্ষমতা তোমার বাবার ছিল না। কিনতু তুমি বার বার বলেছিলে, বিয়ে করলে দেশে গিয়ে সবার মাঝে করতে চাও। আমি মনে মনে খুশী হয়েছিলাম এবং চাইছিলাম তুমি তোমার কথায় স্থির থাকো। তা তুমি ছিলে, তুমি বলেছিলে, দেশে গিয়ে বিয়ের আয়োজন না করলে তুমি মিসিসিপিতে কোন আনুষ্ঠানিকতা করতে দিবেনা। বলেছিলে, মিসিসিপিতে তুমি শুধু রেজিস্ট্রেশান করেই বিয়ে সেরে ফেলবে। মনীশ নামের যে চমৎকার ছেলেটিকে তুমি খুঁজে পেয়েছো, এই ছেলে তো শুরুতেই তোমার বশ হয়ে আছে। তুমি যদি বলেছো, বাংলাদেশে বিয়ে হবে, মনীশও বলে , ঠিক ঠিক। তুমি যদি বলেছো, আমেরিকাতে বিয়ে হলে কোন অনুষ্ঠান হবেনা, মনীশও বলে, হাঁ হাঁ ঠিক ঠিক। হা হা হা হা!! মামনি, তুমি ভাল ছেলে পেয়েছো।

তোমার বাবার কাছে তোমার আব্দারই শেষ কথা। তোমার বাবা দেশেই বিয়ের ব্যবস্থা করলেন, তোমার দিদা, দাদু, মামারাসহ সকল আত্মীয়স্বজন এসেছিল। তোমার দিদা শুধুমাত্র তোমার বিয়েতে যেন কোন বাধা না পরে, সেইজন্য নিজের দেহের যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখেছিল। আমার মা কোনদিন কারো বিয়ের আসরে থাকেনি, এই প্রথম তোমার বিয়ে একেবারে আসরে থেকে, তোমার সাতপাঁকে ঘোরা থেকে শুরু করে প্রতিটি মাঙ্গলিক কাজ নিজে থেকে করেছে। মামনি, কথাগুলো লিখতে গিয়ে আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। তোমার বিয়ের পরে সবাই চলে আসলাম, আমার মা ডাক্তারের কাছে গেলেন, ক্যানসার ধরা পড়লো, মা'কে জানানো হয়নি, অপারেশান হলো, অপারেশানের পর মা খুশী, মিশাকে বললো, ওর বিয়েতেও থাকবে, ততদিনে ক্যান্সার সারা দেহে ছড়িয়ে গিয়ে মাত্র দুই মাসের ভেতর মা মারা গেলেন। কিনতু তোমাকে দিয়ে গেলেন শ্রেষ্ঠ উপহার। একমাত্র তোমার বিয়েতে দিদা কে পেলে, আর কারো বিয়েতে দিদা থাকবেনা। দিদা শুধু তোমার হয়ে থাকলো। তোমাকে কখনও বকেনি, কারো কোন অসুবিধা হলেই তোমাকে জিজ্ঞেস করতো কী করতে হবে, তোমার চিকিৎসা সেবা পায়নি ঠিকই, কিনতু তুমি ডাক্তারী পাশ করার পর কী যে খুশী হয়েছে। দিদা কত গরীব দুঃখীকে সাহায্য করতো, দিদার মৃত্যুর পর দুনিয়ার মানুষ এসেছে দিদাকে দেখতে। প্রত্যেকেই বলেছে, দিদার কাছ থেকে কে কত সাহায্য পেয়েছে। আমার বুক ভরে গেছে, এমন মায়ের মেয়ে হিসেবে।

মামনি, তুমিও আমার মনের আশা পূর্ণ করেছো। যখন যে বলেছি, মাথায় রেখেছো, তা কাজে করে দেখিয়েছো। তোমার কি মনে আছে, আমি বলেছিলাম, রোজগার যখন করবে, দুইজন গরীব ছেলেমেয়েকে পড়ার খরচ দিবে! চুক্তি করে নিবে, তোমার টাকায় পড়ালেখা করে যে মানুষ হবে, সে যেনো তার সাহায্যের হাত আরেক জনের দিকে বাড়িয়ে দেয়, তা হোক নিজের পরিবার অথবা অন্য কেউ! আমার মা করে গেছেন পরের উপকার, আমি কতটুকু করতে পারছি জানিনা, বাকীটুকু তুমি করো। তুমিতো নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করো, তাহলে দিদার পদাঙ্ক অনুসরণ করো, দিদার আত্মা শান্তি পাবে। শুভ স্পেশ্যাল জন্মদিন মামনি। মনীশকে নিয়ে তোমার প্রথম জন্মদিন এটা, অবশ্যই স্পেশ্যাল!!