Monday, February 18, 2013

কলমযোদ্ধা ' নাস্তিক (??)-এর মৃত্যুতে কাপুরুষ 'আস্তিক( !!)দের চরিত্র উন্মুক্ত হয়ে গেল!

আমার মা মারা গেছেন কয়েক মাস আগে। মৃত্যুকালে উনার বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর বছর। পঁচাত্তর বছর বয়সী এক নারী সাধারণতঃ খুব ধর্মভীরু হয়ে থাকেন, হিন্দু নারী প্রতিনিয়ত 'গুরুর নাম' জপ করেন, মুসলিম নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং তসবীহ জপেন। কিন্তু আমার মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এর কোনটাই করেন নি।
এমনকি কোন গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন নি। মায়ের সমবয়সী মহিলারা মাঝে মাঝেই ঠারেঠোরে মা'কে বিদ্রূপ করতেন, মা কেন পূজো আর্চ্চা নিয়ে ভাবতেন না, ইহকাল-পরকাল নিয়ে ভাবতেন না, সে বিষয়েও কৌতূহল দেখাতেন। মাসী-পিসী সম্পর্কীয়ারা মাঝে মাঝে হয়তো আমাকে উকিল ধরতেন, মা'কে বুঝিয়ে বলার জন্য।
মায়ের বয়সী 'মাসী-পিসীদের প্রশ্নবানে জর্জড়িত হয়ে এক সময় মা'কে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
" মা, সব মাসী পিসীদের দেখি নিয়মিত পূজো আচ্চা করেন, তোমাকে কেন কখনও দেখিনা, একটুক্ষণের জন্য আসন বিছিয়ে বসে একমনে ঠাকুরের নাম নিতে"!
মা বলেছিলেন, " ধর্ম হচ্ছে যার যার বিশ্বাসে। আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে, সদা সত্য কথা বলিবে, ন্যায়ের পথে চলিবে, অন্যের উপকার করতে পারলে ভালো, কিন্তু কোনভাবেই অপকার না করতে, চুরী না করতে, কারো ভালো দেখে ঈর্ষা না করতে। পিতা-মাতা সহ সকল গুরুস্থাণীয়দের সম্মান করতে, স্নেহভাজনদের প্রতি স্নেহশীল হতে, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, সহকর্মীর প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে। আর্তের সেবা করতে, দেশের মান বজায় রাখতে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আমার নিজ ধর্ম পালন করে যেতে। জানিনা কতটুকু পেরেছি।
বললাম, তোমার কোন শত্রু নেই?
মায়ের জবাব ছিল, হয়তো আছে। তবে মাথা ঘামাই না তাদের কথা ভেবে। কারো যদি আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকে, আমার সামনে এসে বলতে হবে, যুদ্ধ হয় সমানে সমানে। যুদ্ধ হয় সামনা সামনি। আড়ালে থেকে যারা টীকা টিপ্পনী কাটে, তারা কাপুরুষ। কাপুরুষতাকে আমি ঘৃণা করি। কাপুরুষরা পেছন থেকে ছুরী হানে, তারা ঘুম থেকে উঠে গঙ্গা স্নানে যায়, গঙ্গায় ডুব দিয়ে মনে করে পাপ স্খালন হয়ে গেছে। মনের আনন্দে নতুন করে পাপ করা শুরু করে।
-মা, গঙ্গা স্নান করলে কী সত্যি সত্যিই পাপ ধুয়ে মুছে যায়?
-কে জানে! হয়ত যায়, নাহলে লাখ লাখ মানুষ নিত্যদিন গংগাস্নান করতো না! তবে যারা পাপ করে, তাদেরই গংগাস্নানের দরকার হয়।
-মা, তোমার কথা মানলাম, কিন্তু সমাজে বাস করতে গেলে সমাজের অন্য সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলার একটা ব্যাপারও তো আছে! (মনে মনে আমিও কিছুটা ভয় পেতাম ধর্মীয় আচার পালনের প্রতি মায়ের এমন নিস্পৃহতা বা নির্লিপ্ততা দেখে। ভাবতাম, তবে কী আমার মা আসলেই একজন নাস্তিক? তাই বা কী করে হয়, যে মানুষটিকে কখনও পবিত্র 'গীতা' পাঠ করতে দেখিনি, সেই মানুষটি তো ঠিকই গড়গড় করে গীতার শ্লোক, মহাভারত, রামায়ণের গল্প করে যেতেন, এমনকি স্কুলের সহকর্মী ধর্মীয় শিক্ষকদের কাছ থেকে বাইবেল, কোরাণও শিখে আসতেন"।
-হা হা হা! শোন, সবাই যদি পূণ্য করে তো পাপ করার লোকও তো লাগবে। সবাই যদি স্বর্গে যায় নরকে যাবে কে? আমিই না হয় নরকে যাব।
*** আমার মায়ের মত এমন জ্ঞাণী, পড়ুয়া মা আমি খুব কম দেখেছি। আমার মায়ের ট্রাঙ্কে ছিল সাধারণ তাঁতের শাড়ী, আর বুকসেলফ ভর্তি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের বই, মাস্টার দা, প্রীতিলতা, অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম'সহ রবীন্দ্র, নজরুল, সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা বই! বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দোপাধ্যায় এর লেখা বই! মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার মা নিজের ভান্ডারের চাল, ডাল থেকে শুরু করে যা কিছু হাতের কাছে পেয়েছিলেন, সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষক মানুষটির সহকর্মীদের মাঝে কী যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, সব ধর্মের প্রতি ছিল উনার শ্রদ্ধাবোধ। উনি কখনও 'অতি ধার্মিক' বা 'বক ধার্মিক' দের পছন্দ করতেন না। নিজেকে উনি 'নাস্তিক' হিসেবেই পরিচয় দিতেন। নির্ভীক, সৎ, নির্লোভ, অসাম্প্রদায়িক এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুর পরে দেখা গেছে, আমার 'নাস্তিক' মা কত বেশী ধর্মের কাজ করে গেছিলেন! কত গরীব দুঃখীরা যে এসে উঠোনে শুয়ে পড়ে কেঁদেছে, দেখে হতবাক হয়েছি।
*** সতীর্থ ব্লগার রাজীব হায়দারের করুণ মৃত্যুতে আমার সমস্ত চিন্তা চেতনা এলোমেলো হয়ে গেছে। আহ! ভাবতে পারছি না, যে যোদ্ধা কলম চালিয়ে যুদ্ধ করছিল, কাউকে শারীরিক আক্রমণ করার মত নীচতা দেখায় নি, যে ছিল নির্ভীক, নির্দ্বিধায় যে অন্ধকার রাতে পায়ে হেঁটে বাড়ী ফিরছিল, নিরস্ত্র এই কলম যোদ্ধাকে অমন নিষ্ঠুরভাবে কী করে 'ওরা' মারতে পারলো? মানুষ কী করে অমন নিষ্ঠুর হতে পারে! হত্যা প্রক্রিয়ারও তো একটা মানবিক দিক থাকে, কতটা অমানবিক, কতটা পশু, কতটা কাপুরুষ হলে তবেই কেউ এভাবে মনের আক্রোশ মিটিয়ে নিরস্ত্র, একাকী চলা কাউকে হত্যা করতে পারে! এরাই আবার ধর্মের বড়াই করে! তবে কী 'ধার্মিক' মাত্রেই কাপুরুষ, নাকি 'কাপুরুষ' মাত্রেই 'বকধার্মিক'? একজন নিরস্ত্র তরুণ খুন হয়েছে, এমন সচিত্র সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বুকে ধাক্কা লাগার কথা, আমাদের বুকে ধাক্কা লেগেছে। কিন্তু তারপরেও কিছু কিছু 'ধার্মিক'এর মনে লেগেছে পৈশাচিক আনন্দের উচ্ছ্বাস! তারা সাথে সাথে " কুত্তা নাস্তিক', " বেটা নাস্তিকের উচিত শিক্ষা হইছে" স্ট্যাটাস দিতে শুরু করেছে। আমি নিজেও অবাক হয়ে গেছি, দুই দিন আগেও আমার এই ফেসবুক বন্ধুদেরকে ভালো জানতাম, কিন্তু রাজীবের মৃত্যুতে মানুষের চরিত্রের কত দিক উন্মুক্ত হয়ে গেলো! ধর্ম কী এমন হতে শেখায়? ব্লগার রাজীব যদি 'নাস্তিক' হয়েও থাকে, তার 'নাস্তিকতা তো কারো উপর চাপিয়ে দিতে চায় নি! তার ধর্ম বিশ্বাস তার কাছেই ছিল। সে লড়েছে ন্যায়ের পক্ষে, সে লড়েছে তরুণ প্রজন্মের মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে, সে লড়েছে দেশের মঙ্গলের স্বার্থে, সে তো তার লড়াইয়ের মধ্যে ধর্ম-অধর্মকে টেনে আনে নি। সে তো কোথাও বলে নি, তোমরা কেউ ধর্মীয় আচার পালন কর না! তারপরেও কেন এমন পেছন থেকে তাকে আক্রমণ করা হলো? এই কী ধর্মের শিক্ষা? তাহলে তো এই সমস্ত গুটিকয়েক ভীরু, কাপুরুষ 'আস্তিক', এই সমস্ত 'ধার্মিক' দের চেয়ে স্বচ্ছবুদ্ধির, সুবিবেচক, পরোপকারী, মেধাবী 'নাস্তিক'ই অনেক ভাল!
থুঃ থুঃ থুঃ দেই এই ধরণের সকল 'কাপুরুষে'র গায়ে!

Thursday, February 14, 2013

স্মৃতিময় ১৪ই ফেব্রুয়ারী!!

১৪ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ আমার জন্য খুব বেশীঘটনাবহুল হয়ে গেছে। আর দশজনের কাছে ১৪ই ফেব্রুয়ারী শুধুমাত্র ভ্যালেন্টাইন'স ডে, অন্যান্যবার আমার কাছেও ভ্যালেনটাইন'স ডে ছাড়া আর নতুন কিছু মনে হয় না। তাও  গত কয়েক বছর আবার ভ্যালেনটাইন'স ডে পুরোপুরিভাবে কার্যকর হতো না। দুটো কারণ; প্রথম কারণ হচ্ছে আমরা মিসিসিপির মত 'ম্যান্দা মারা' জায়গায় বছরের পর বছর ধরে বাস করতে করতে নিজেরাও 'ম্যান্দা' মেরে গেছি। বিশেষ করে আমার উত্তম কুমার তো সারাদিন রাত লিভিং রুমের এক কোনে থাকা আরাম কেদারায় এমন আরাম করে বসে থাকেন যে তার বোধ হয় ইচ্ছে করে না এক ফাঁকে ওয়ালমার্ট ঘুরে এক গুচ্ছ গোলাপ কিনে আনতে। আমি অবশ্য প্রতি বছর উত্তমের জন্য দারুণ সুন্দর সুন্দর কার্ড কিনে নিয়ে আসি। দুই নাম্বার কারণ হচ্ছে আমার কাজের স্কেজিউল। এদেশের জাতীয় ছুটির দিন গুলোতে আমার অফ ডে থাকে না। কারণ, আমার মাথায় শুধু  ২১শে ফেব্রুয়ারী, ২৬শে মার্চ, ১৪ই এপ্রিল আর ১৬ই ডিসেম্বারের কথা মনে থাকে। এদেশের কোন ছুটির দিন তারিখ মাথায় থাকেও না, আগে থেকে ছুটিও চাওয়া হয় না।

আমার অনেক সৌভাগ্য বলতে হবে, এ বছরের ১৪ই ফেব্রুয়ারী আমার ডে অফ ছিল। আমার এমনই অভ্যাস হয়ে গেছে যে খেয়ালেই ছিল না, আমার ডে অফ পড়েছে ভ্যালেনটাইন'স ডে তে।  গত সপ্তাহে কেউ একজন ফেসবুকে লিখেছে এবার সরস্বতী পূজো আর ভ্যালেন্টাইন'স ডে একই দিনে পড়েছে। ভ্যালেনটাইন'স ডে নিয়ে আমার অত তাড়া ছিল না, আমি জানি, দুনিয়ায় ঝড় বয়ে গেলেও আমি আমার উত্তমের জন্য সুন্দর দেখে কার্ড কিনে আনবো। খুশী ছিলাম এই ভেবে যে এ বছর সরস্বতী পূজো নিষ্ঠান্ডাভাবে করতে পারবো। বিদ্যার দেবী সরস্বতী, আমার স্বামী, কন্যারা পড়াশুনার সাথে জড়িত, এ বছর থেকে আমি নিজেও লেখালেখির সাথে জড়িয়ে গেছি, আমাকে তো বাগ দেবীর অর্চ্চনা করতেই হবে!

আমি গতকাল কাজ থেকে ফেরার সময় পূজোর জন্য যাবতীয় বাজার করে এনেছি। ছোটবেলায় শিখেছি, সরস্বতী পূজোর দিন বই খুলতে হয় না, যদিও আমার বাবা বলতেন " শোন, আজ সরস্বতী মা পূজা নিতে আসবে, আজকেই তো বেশী করে পড়ালেখা করা উচিত।  দেবী সরাসরি বিদ্যা দান করবে।" আমরা যদি গাঁইগুঁই করতাম তাহলে বাংলার আশুতোষ রায়ের কথা বলতেন, আশুতোষ রায় নাকি সরস্বতী পূজার দিন বেশী করে পড়তেন। কে শোনে কার কথা,  আশুতোষ রায় কী করতেন না করতেন, সেটা ধরে থাকলেই হবে? একদিন ফাঁকী দিতে পেরে আনন্দে আটখানা হয়ে যেতাম। সেই ছোটবেলার সংস্কারের কথা মাথায় ছিল বলেই রাত দুইটা পর্যন্ত লেখালেখি চালিয়ে ঘুমাতে গেছি। জানিতো, সারাদিন পূজোতে আটকে থাকবো, লেখালেখি করতে পারবো না। কিন্তু ঘুম ভেঙ্গেছে সকাল সাড়ে আটটায়। আমার এমন আলসেমী লাগছিল যে বিছানা থেকে নামতেই ইচ্ছে করছিল না। মনে মনে ফাঁক খুঁজছিলাম, এমন কী হতে পারে যে আজকে সরস্বতী পূজো না, হয়তো কালকে পূজো। ঠিক ঐ মুহূর্তেই আমার কাছে দেশ থেকে এক বন্ধুর এসএমএস এলো। আমাকে সুপ্রভাত জানিয়ে জানতে চেয়েছে, আমার আজকের দিনের কর্মসূচী সম্পর্কে। বলেছি, আজ সরস্বতী পূজো করবো। এরপরেরটুকু জানিনা। বন্ধু জানালো, " আমাদের দেশে আগামীকাল সরস্বতী পূজো। আপনারা বারো ঘন্টা পেছনে থেকেও কী করে আজ পূজো করেন?" বন্ধুর কাছ থেকে আমার আকাংক্ষিত সংবাদ পেয়ে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে গেলাম। হুররে!!! সারাটা দিন হাতে পেলাম,  আমি বরং একটা লেখা শেষ করে ফেলি। আগামীকাল না হয় পূজো দেবো। দেশে ছোটমাসীকে ফোন করে তিথি এবং লগ্ন সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে ফেসবুক খুললাম। একই সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম, পূজো আজ বিকেলে করবো, তাহলে আমার উত্তম আর মিথীলা পুষ্পাঞ্জলী দিতে পারবে।

ফেসবুক খুলতেই দেখি এক তরুণ বন্ধু মোমবাতির ছবি সহ পোস্টার আমাকে ট্যাগ করেছে। সেখানে বলা আছে, সন্ধ্যে সাতটায় দেশে সবাই একসাথে মোমবাতি প্রজ্বলণ করবে। আমিও যেনো ছবিটা দশ মিনিটের জন্য হলেও প্রোফাইল পিকচার করি। আরে! এমন একটি আবেদনে সাড়া না দিয়ে থাকা যায়! দেশে থাকলে তো আমার শাহবাগেই থাকার কথা ছিল। সকাল সাড়ে নয়টায় সেই মোমবাতির ছবিটি প্রোফাইল পিকচার করে ফেললাম। ইদানিং টিভি দেখি খুব কম। আজ টিভি অন করে চ্যানেল আই ধরলাম, বাংলা খবর হচ্ছে। খবরে সন্ধ্যে সাতটায় শাহবাগসহ সারা দেশে যে মোমবাতি প্রজ্বলণ করা হয়েছিল, সেই আবেগময় ছবি দেখাচ্ছিল। আমার খুব ভালো লাগছিল। কম্পিউটারে বসে টাইপ করি আর খবরে শাহবাগ দেখি। দারুণ মজা।

সকাল সাড়ে দশটার খবরে আরও ডিটেলসে সব দেখাচ্ছিল। শাহবাগ, সংসদ ভবন, ঢাকার রাস্তাঘাটে মানুষ আর মানুষ, হাতে মোমবাতি ধরা, চোখে মুখে কী শান্তি, কী তৃপ্তি, সব পাওয়ার আনন্দ! আমার বুক মুচড়ে উঠলো। মায়ের কথা মনে পড়লো। মায়ের কথা মনে হলেই আমি আর স্থির থাকতে পারি না। খুব কাঁদলাম, মা আর দেশ তো সমার্থক। কান্না তো আসবেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে শোবার ঘরে গিয়ে মায়ের ছবিটা হাতে নিয়ে প্রাণ ভরে কেঁদে নিলাম। বিদেশ বিভুঁইয়ে একাকী জীবন টেনে নিয়ে যাওয়া, আর ভালো লাগে না। মনটা দেশে পড়ে থাকে। বৃদ্ধ বাবার জন্য বুকে হু হু করে। চোখ মুখ মুছে আবার এসে কম্পিউটারে বসলাম। লিখি আর ভাবি, দুপুরের জন্য কী রান্না করবো। আমি তো খাব না, কিন্তু উত্তম কুমার আসবে ক্লাস থেকে, বিকেলে মিথীলা আসবে স্কুল থেকে। ওরা জানে আমি পূজো করে ওদের জন্য প্রসাদ রেখে দেবো। তার উপর আজকে আবার ভ্যালেন্টাইন'স ডে। মিথীলার ধারণা, আজ হেভী খানা হবে। তবে মিথীলা সদ্য টিন এজে পা রেখেছে তো, তাই খুব স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গেছে। আগের মত উলটো পালটা খায় না।

দুপুরে নুডুলস বানিয়েছি। বেলা আড়াইটার দিকে আমার পিসী ফোন করেছে। কেমন আছি, কী করছি খোঁজ খবর নেয়ার জন্যই ফোন করেছে। পিসীর সাথে কথা বলছিলাম, এমন সময় উত্তম কুমার বাড়ী ফিরেছেন। একটু আগেই পিসীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভ্যালেন্টাইন'স ডে তে উনার ভ্যালেন্টাইন উনাকে কী উপহার দিলো? আমার পিসী খুব হিউমার জানে, বললেন, " ভ্যালেনটাইন'স ডে নামে কোন দিন আছে , তাই তো জানিনা। তোর পিসেমশায় এত রোমান্টিকও না। বরং তুইই বল, তোরে তোর উত্তম কুমার কী দিল"!
বললাম, " পিসী শোন, আমার উত্তম কুমারও  আমাকে আর ভালোবাসেনা। সে আমাকে উপহার দিবে কি? আমি যে কাল রাত বারোটার সময় খুব সুন্দর একখানা কার্ড তার শিয়রের পাশের টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম, সে তো সেটাও খেয়াল করে দেখেনি। এবার বুঝে দেখো অবস্থা!"

পিসী জানতে চাইলো, " এত কার্ড কার্ড করছিস, কী এমন মধু লেখা আছে কার্ডে? একটা ফুল না কিছু না, শুকনা একটা কার্ড নজরে পড়বে কিভাবে"?

বললাম, পিসী, তুমি জানো, আমি এখন একজন ফুলটাইম লেখিকা, আমার পছন্দ করা কার্ডকে অত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করো না। ফুল ঠিক আছে, কিন্তু ফুলের মধ্যে মনের কথা লেখা থাকে না। কার্ডের মধ্যে মনের কথা লেখা থাকে"।

" তোর কার্ডে কী মনের কথা লেখা আছে ক তো, দেখি আমার মনের কথার সাথে মিলে কিনা!"

"অন্য বছরেরটা মিললেও মিলতে পারতো, কিন্তু এ বছরেরটা মিলবে না। এ বছরের কার্ডে কী লেখা আছে শোন,

 ইট'স ভ্যালেন্টাইন'স ডে অ্যান্ড আই মাস্ট রাইট এ পোয়েম, অ্যাবাউট দ্য নাইট, উই ফেল ইন লাভ"!!

-বাবারে! অনেক তত্বকথা। বেশী হাই থটের কথা। ঠিকই বলছস, আমার সাথে মিলবো না।



আমি যখন কথাগুলো বলছিলাম, উত্তম কুমার তখনই ঘরে ঢুকেছে, সে হাঁটে বেড়ালের মত, খুব আলতো করে, আমার মত হাড়ুম দুড়ুম করে বাড়ি কাঁপিয়ে হাঁটে না। ফলে তার পায়ের আওয়াজ শুনিনি। নুডুলস খেয়ে সে বললো যে সে একটু ক্ষণের জন্য বাইরে বের হচ্ছে। আমার সাথে পিসীর কথাও শেষ হয়ে গেলো। আমি আবার অসমাপ্ত লেখাতে হাত দিলাম। চারটে বাজতেই মিথীলা চলে এলো। নুডুলস দেখে খুব খুশী। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, পাপা কোথায়? বললাম, বাইরে গেছে জানি, কোথায় গেছে জানিনা। এরপর মিথীলাকে তাড়া লাগালাম, " মিথীলা, বাবলু সোনা, শোন, খেয়েদেয়ে স্নান করে নাও, আমার সাথে পূজো দিবে।" মিথীলার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। মাত্র স্কুল থেকে ফিরেছে আর মা বলে কিনা স্নান করে পূজো দিতে হবে! বললাম, " মনা শোন, সরস্বতী দেবী কিন্তু বিদ্যার দেবী, তোমার সামনেই সায়েন্স ফেয়ার আছে, পূজোতে আমাকে হেল্প করো, তাহলে সরস্বতী মা খুশী হবে"। মিথীলার বাবা এর মধ্যে চলে এলো।

উপরে উঠে মিথীলা বললো, " মা, তুমি একটু নিচে যাও তো, কী যেন একটা জিনিস আছে, দেখে আসো তো"। বললাম, " জিনিস টা কী তোমার পাপা নিয়ে এসেছে"? মিথীলা বলে, " আরে না! অন্য একটা জিনিস"।
" কী এনেছে তোমার পাপা'/ মিথীলা আর পারলো না অভিনয় করতে। আমার এই গুণটা মিথীলা পায় নি, বাপের মত স্বচ্ছ স্বভাব পেয়েছে। বলল, " তুমি কী করে বুঝলে, পাপা কিছু এনেছে"? তোমার কথা বলার ভঙ্গী দেখে। নীচে থেকেই যদি ডাকতে আর বলতে, মা একটু আসো, আমার একটু হেল্প লাগবে", তাহলে আমি নীচে যেতাম। হাহাহাহহাহাহা!


একটু পর উত্তমই উপরে উঠে এলো, হাতে এক গুচ্ছ তাজা গোলাপ। তিন ধরণের রঙ, সাথে ক্যান্ডি বার। "হ্যাপী ভ্যালেন্টাইন'স ডে' উইশ করে ফুল আমার হাতে দিল। ফুল খুবই আনন্দের সাথে গ্রহণ করলাম, আর বললাম, " এত দাম দিয়ে গোলাপ আনতে গেলে কেন? আচ্ছা যাও, গোলাপগুলো একটা ফুলদানীতে জলে ভিজিয়ে রাখো"। কথাটা বলেই মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। এইরে! এখনই হয়তো বলবে, " সব সময় এত এত দামী এত দামী করো কেন? তোমার স্বভাবটা একটুও পাল্টালো না"। কিন্তু উত্তম কুমার তো, তাই এমন সুন্দর মুহূর্তে আর কঠিন কিছু বললো না। মুচকী হাসি দিয়ে নীচে নেমে গেল। এবার আমাকে উঠতেই হয়। সন্ধ্যে ছয়টা বাজে, এখনও যদি টেবিল না ছাড়ি, রান্না করবো কখন, পূজোই বা দিব কখন। নীচে গিয়ে দেখি, কিচেনের কাউন্টার টেবিলের উপর দুই বাক্স গ্রিলড চিকেন। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, মটরশুঁটি দিয়ে ভুনা খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, গ্রিলড চিকেন আর আনারসের চাটনি। ভ্যালেনটাইন'স ডে কাম সরস্বতী পূজোর খাওয়া। ঝটপট রান্না বসিয়ে দিলাম, খিঁচুড়ি চাপিয়ে স্নানে চলে গেলাম। মা আর মেয়ে একসাথে বসে গেলাম পূজোর আয়োজন করতে। মিথীলা কবে থেকে যে এত কাজের হয়ে গেলো, জানতেই পারলাম না। অনেক হেল্প করেছে আমাকে। পূজো শেষে পুষ্পাঞ্জলী দিতে ডাকলাম দু'জনকে। বাপ আর মেয়ে আমার পাশে খুব ভক্তি নিয়ে বসেছে। উত্তমের ইদানিং মেঝেতে বসতে খুব কষ্ট হয়। তবুও মেঝেতে কোমড় বাঁকিয়ে বসে পুষ্পাঞ্জলী দিল। অঞ্জলী শেষে যখন সে আবার তার আরাম কেদারায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত, বললাম,

" অ্যাই শোন না, বেগুন কেটে হলুদ আর লবন মাখিয়ে রেখেছিলাম, আমার আরও কিছুটা সময় লেগে যাবে এদিকটা শেষ করতে, তুমি নন স্টিক প্যানে অল্প তেলে বেগুন গুলো ভেজে ফেলো না গো"!

উত্তম কুমার একটু চমকে উঠেছে। বুঝলাম না, চমকালো কেনো? বেগুন ভাজতে বলেছি বলে, নাকি অনেক অনেক দিন পর অমন আহ্লাদী সুরে কথা বলেছি বলে। আমি অনেকদিন হয়ে গেলো, অমন ঢং করে কথা বলা ভুলেই গিয়েছি। যাক, ভ্যালেন্টাইন'স ডে বলে কথা। আমরা দুজনেই দু'জনের ভ্যালেনটাইন, কাজেই রেডি করে রাখা বেগুন ভাজতে আর কষ্ট কী! উপরে বসে থেকেই কড়াই-খুন্তির টুং টুং আওয়াজ পাচ্ছিলাম। যাক! নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো। এবার আমি নিশ্চিন্ত মনে দেবী সরস্বতীর কাছে আরেকটু বিদ্যে -বুদ্ধি চাওয়ার চেষ্টা করলাম। নিজের জন্য চাইলাম, উত্তমের জন্য চাইলাম, তিন কন্যার জন্য চাইলাম, আত্মীয়-পরিজনের জন্য চাইলাম, ব্লগারদের জন্য চাইলাম, সকল বন্ধুর জন্য চাইলাম, সর্বোপরী বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের জন্য চাইলাম, এদের হাতেই তো দেশের ভবিষ্যত, বিদ্যার্জণ না হলে দেশ চালাবে কী করে!

ব্যাঙের ছাতা সমাচার!

আজ দুপুরের খাওয়ার মেন্যু হচ্ছে ভেজিটেবল নুডলস! আমার কিচেন লিস্টে সেটাই দেখিয়েছে, বৃহস্পতিবার লাঞ্চ মেন্যুতে ভেজিটেবল নুডুলস, একটি আপেল ও একটি কমলা। নুডুলসে ডিম দেই, তবে ডিমকে ভেজিটেবলের মধ্যেই রেখেছি। বেলা সাড়ে বারোটার সময় কিচেনে ঢুকেছি নুডুলস রান্না করবো বলে। নুডুলস রান্না করতে কতক্ষণই বা লাগে! বড় জোর পনের মিনিট। সাধারণতঃ আমার ছুটির দিনে নুডুলস রান্না করতে হলে ঘন্টা পার করে দেই। চিকেন 'থ করতে হয়, চিংড়ি মাছ পরিষ্কার করতে হয়, ঝামেলা তো কম না! তা আজকেও আমার ছুটি ছিল, কিন্তু সমস্যা হয়েছে, আজ আবার সরস্বতী পূজা। পূজার দিনে মাছ বা মাংস খেতে নেই, তাই নুডুলসে চিংড়ি বা চিকেন দেয়া যাবে না। সেটাও খুব একটা চিন্তার ব্যাপার হতো না যদি রেফ্রিজারেটার খুলে সব্জী শূণ্য চেম্বার না দেখতাম। সত্যিই এমন সব্জী শূণ্য রেফ্রিজারেটার দেখে আমি নিজেই স্তম্ভিত হয়ে গেছি। একবার এ ড্রয়ার টানি, আরেকবার ও ড্রয়ার টানি, শেষ পর্যন্ত একটি ফোমের বাক্সে সাত আটটি 'মাশরুম' পড়ে আছে দেখলাম। মাশরুমের চেহারা খুব করুণ। দুধ সাদা রঙের পরিবর্তে গাঢ় বাদামী বর্ণ ধারণ করেছে। অন্য সময় এই মাশরুমের জায়গা হতো ট্র্যাশ ক্যানে। কিন্তু আজ বিধি বাম! গাজর, বাঁধাকপি নেই, এমনকি ফ্রোজেন মিক্সড ভেজিটেবলের একটা প্যাকেটও নেই। ডীপ ফ্রীজার চেক করা হয়ে গেছে, ফ্রোজেন ব্রকলীর একটা প্যাকেট পেয়েছি। কী আর করা, বাদামী  বর্ণের ভেজা মাশরুম আর ফ্রোজেন ব্রকলী দিয়েই নুডুলস রান্না করে ফেললাম।

নুডুলস খেতে কেমন হয়েছে জানার উপায় নেই। বিকেলবেলা সরস্বতী পূজো করবো বলে একটু দুধ সিরীয়াল দিয়েই লাঞ্চ শেষ করেছি। তবে রান্নার পর নুডুলসের যা চেহারা হয়েছে, ঝরঝরে নুডুলসের ফাঁকে ফাঁকে কালো মাশরুমের টুকরো দেখা যাচ্ছে! অবশ্য সবুজ ব্রকলী থাকাতে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে টকটকে লাল রঙা চিলি সস মিশিয়ে দিয়েছি। খেতে হয়তো খুব একটা খারাপ লাগবে না। আফসোস হচ্ছে, মাশরুমগুলো অনেক দাম দিয়ে কিনেছিলাম, ফ্রীজের ড্রয়ারে থেকে এমন কুৎসিত আকার ধারণ করেছে, খুব খারাপ লাগছিল।


মাশরুম আমাদের পরিবারে সবার প্রিয়। পরিবার বলতে আমার নিজের পরিবারের কথা বুঝিয়েছি। স্বামী-স্ত্রী, তিন কন্যার পরিবারে মাশরুম অতি পছন্দের একটি নাম। মাশরুমের সাথে আমার পরিচয় টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে। অনেক আগে বিটিভিতে শাইখ সিরাজের উপস্থাপণায় 'মাটি ও মানুষ' নামে যে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠানেই মাশরুমের চাষ দেখিয়েছিল। এখন হয়তো সারা দেশেই মাশরুম পাওয়া যায়, তবে তখন পাওয়া যেত না। তখন 'আগোরা' নামের দোকানটিও চালু হয় নি। '৯৫ সালে তো অস্ট্রেলিয়া চলে গেলাম। সেখানের বাজারে 'মাশরুম' দেখলাম প্রথম, একেবারে চাক্ষুসভাবে দেখা যাকে বলে। ধবধবে দুধসাদা বড় বড় মাশরুম দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেছিল। একবারও মনে পড়ে নি, ছোটবেলায় ইঁটের ফাঁক ফোঁকর থেকে গজিয়ে ওঠা 'ব্যাঙের ছাতা'র কথা! ইস! পাড়া গাঁয়ের উঠোনের সর্বত্র দেখা যেত 'ব্যাঙের ছাতা' গজিয়ে আছে। মা আর ঠাকুমা আগেই সাবধান করে দিত, ভুলেও যেন ঐ ব্যাঙের ছাতায় পা না লাগাই। ব্যাঙের ছাতায় পা লাগলে উপায় থাকে  না, পা চুলকে লাল হয়ে ফুলে যায়, ভীষণ ব্যথা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় একে বলে 'পায়ে লাল লাগা'। আমার ভাইদের পায়ে প্রায়ই 'লাল লাগতো'। তখন তো কথায় কথায় অ্যান্টি হিস্টামিন খাওয়ার কথা ভাবা হতো না, তাই পায়ের যন্ত্রণা কমতে সময় লাগতো। এই সব ছোট ছোট ধারণা নিয়েই আমরা বড় হয়েছি। তাই 'ব্যাঙের ছাতার' আধুনিক নাম মাশরুম, সেটা জানতে সময় লেগেছে। আর সত্যিকারের মাশরুমের চেহারা যে 'ব্যাঙের ছাতার' মত নয়, সেটাও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে গিয়ে দেখেছি। যে তিন বছর অস্ট্রেলিয়া ছিলাম, ইচ্ছেমত মাশরুম খেয়েছি।



২০০১ সালের মার্চ মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে আমার উত্তম কুমারের সাথে দুবাই বেড়াতে গেছিলাম, তিন দিনের জন্য। ব্যক্তিগত ভ্রমণ ছিল না ওটা, ওষুধ শিল্প মালিক সমিতি থেকে আয়োজিত এক সফর ছিল ওটা। আমার উত্তম তার কর্মস্থল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিল ঐ ট্যুরে। ঐ সময়টাতে উত্তম খুব রোম্যান্টিক ছিল, তার বৌটা শুধু বেড়াতে ভালোবাসে বলে বৌকে নিয়ে অনেক বেড়িয়েছে। দুবাই যাওয়ার সুযোগ আসাতে সে নিজের টাকায় আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছে। নিজের টাকায় বৌ নিয়ে যাবে, এটাতে সমিতির আপত্তি করার কিছু ছিল না। তাছাড়া সমিতির দলনেতা নিজেই তার স্ত্রী, পুত্র,  স্ত্রীর বাজারের ব্যাগ বহনকারী একজনকে সাথে নিয়ে গেছিল।


দুবাই গিয়ে তিনদিন থেকেছিলাম, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে, অনেক কিছু শিখেছি। ভাল দেখেছি, মন্দ দেখেছি। এক রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশী যুবক সালামকে কাজ করতে দেখেছি, রাস্তার ধারে বাড়ীঘরের ঝুল বারান্দা  থেকে শাড়ী, লুঙ্গী  ঝুলতেও দেখেছি। তিন দিনে  চরম ধনীদের চেহারা দেখলাম,  দুই একজন ধনীর মানসিক ক্ষুদ্রতা দেখলাম। মাশরুম নিয়ে লিখতে চাইছিলাম,  মাশরুমের কথা আনতে গিয়ে কিছু কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা চলে আসতে চাইছে। ডিজিটাল ক্যামেরা আর ক্রেডিট কার্ড দেখলাম দুবাইয়ের শপিং সেন্টারে গিয়ে। এখন আমার ঘরে চারটা পাঁচটা ডিজিট্যাল ক্যামেরা গড়াগড়ি খায়, আর তখন দলের এক সদস্যের হাতে ডিজিট্যাল ক্যামেরা দেখে আমার উত্তমকে খুব আগ্রহী হতে দেখেছি। ক্যামেরার দাম জিজ্ঞেস করতেই সেই সদস্য ভদ্রলোক জানালেন, ৫০০ ইউএস ডলার!  উত্তম বলেছিল, সে একখানা ডিজিট্যাল ক্যামেরা কিনতে চায়, তবে দাম শুনে ওখানেই ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখে। আমি তখনও ডলারকে টাকায় কনভার্ট করা রপ্ত করিনি। ধরেই নিয়েছি, ওগুলো বড়লোকের শখ।  দুবাইয়ের স্বর্ণ বাজার পৃথিবী বিখ্যাত। শপিং কম্পলেক্সে গিয়ে চোখে শুধু সোনালী ঝলক দেখছিলাম। এত বড় শপিং কম্পলেক্সের পুরোটাই যেনো সোনায় মোড়ানো। স্বর্ণালংকারের প্রতি নারীর দূর্বলতা চিরকালের! দুবাই এসে স্বর্ণালংকার না কিনে দেশে ফেরত গেলে মানুষের কাছে মুখ দেখাবো কী করে! সেই ভয়ে আমিও টুকিটাকী গয়না কিনেছি, উত্তম বলেছিল, একবার যখন দুবাই আসা হয়েছে, বেশ কিছু গয়না কিনে ফেলার জন্য। আমি নারী হলেও স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি আমার কখনওই কোন দূর্বলতা ছিল না। তাছাড়া এমনিতেই আমার এয়ার টিকিটের জন্য উত্তমকে ৫০,০০০ টাকা গুণতে হয়েছে! চোখের পর্দা আমার খুব ভারী, একবার বন্ধ হলে আর খুলতেই পারি না। দুই দিন বেশ ভালোই কেটেছে। দুবাইয়ে তখন কোন উৎসব চলছিল। একজিবেশান ছিল, ওয়াটার স্ক্রীণে মুভী দেখলাম, নতুন অভিজ্ঞতা! ব্রেকফাস্ট খাই হোটেলের ডাইনিং হলে, সবার জন্য ফ্রী ব্রেকফাস্ট, এটাও নতুন অভিজ্ঞতা। হোটেলে ব্রেকফাস্ট ফ্রী। দুপুরে আর রাতে স্বামী -স্ত্রী নিজেদের মত করে ঘুরেছি আর খাওয়া দাওয়া করেছি।

তৃতীয় দিনে আমাদের দেশে ফেরার পালা। আর তৃতীয় দিনেই ওষুধ শিল্প সমিতি টীমের বোধ হয় দুবাইয়ের ওষুধ শিল্প সমিতির সাথে মূল এবং গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। সকাল বেলাতেই আমাকে প্রেসিডেন্টের বউয়ের জিম্মায় দিয়ে উত্তম কুমার ওদের সাথে বেরিয়ে গেল। উত্তমের বোধ হয় জানা ছিল না, লাঞ্চের আগে ফেরা হবে নাকি সন্ধ্যায় ফেরা হবে। আমাকে বলেছিল, ভাবীর সাথে গিয়ে শপিং করতে , দুপুরে নাকি  সবাইকে নিয়ে নৌভ্রমণের প্রোগ্রাম আছে!  ভাবীও বললেন, দুপুরে ওরা ফিরে আসবে। তাই আমি খুশী মনে ভাবীর সাথে বেড়িয়ে পড়লাম। ভাবীর সাথে তিন দিনে আমার আলাপ ভালই হয়েছে। বগুড়া বা রংপুরের মেয়ে উনি। খুব জাঁদরেল চেহারা, বিরাট বড়লোকের মেয়ে, উনার স্বামী বোধ হয় ভাবীর বাবার ফার্মাসিউটিক্যালের মালিকানা পেয়েছেন। ভাবীর ব্যবহারে সব সময় মালিক সুলভ আচরণ দেখেছি। উনার স্বামীর দীর্ঘ দেহ স্ত্রীর সামনে কিছুটা ঝুঁকে থাকতে দেখেছি। ভাবীর সাথে আসা ছেলেকে দেখেছি মায়ের আঁচল ধরে ঘুরতে।

ভাবীর বাজারের ব্যাগ বহণকারীকে প্রথমবার দেখে মনে হয়নি যে সে বাজারের ব্যাগ বহণ করার জন্য এসেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, এই লোকও বোধ হয় কোন ছোটখাটো ফার্মাসিউটিক্যালের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছে। ভুল ভেঙ্গেছে শাড়ীর মার্কেটে গিয়ে। সঙ্গে আসা লোকটির নাম ছিল কামাল। আমি কামালকে 'ভাই' বলে সম্বোধণ করেছি। দুবাই শাড়ীর মার্কেটে যাওয়ার সময় দুই মহিলার সাথে কামাল ভাইকে আসতে দেখে মনে মনে একটু সাহস পেয়েছিলাম। বাংলাদেশের মেয়ে হিসেবে একজন পুরুষ সঙ্গী ছাড়া অজানা অচেনা জায়গায় ঘোরাফেরা করতে ভয় লাগারই কথা। কামাল ভাই আমাদের সাথে একই অটোতে উঠেছিল। মার্কেটে নেমে কামাল ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, " আপনি আজকের ট্যুরে গেলেন না যে!" সে আমতা আমতা করে বললো, " স্যার বলেছে, আমাকে ম্যাডামের সাথে থাকতে"। এরপর শুরু হলো শাড়ী কেনার বহর। আমি যদি কিনি একটা, ভাবী কিনে পাঁচটা। কিনে আর কামাল ভাইকে ডেকে বলে, " এই কামাল মিয়া, ধরেন, শাড়ী ব্যাগে ভরেন"। ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি গ্রুপে কামাল ভাইয়ের ভূমিকা কি।


শাড়ী কেনা শেষ হতেই ভাবী গিয়ে ঢুকলো কাঁচা বাজারের দোকানে। আমিও ঢুকলাম। ঘুরে ঘুরে দেখছি, হঠাৎ চোখ পড়লো এক জায়গায় প্যাকেটে থাকা মাশরুমের দিকে। এত বড় বড় ধবধবে সাদা মাশরুম আমি অস্ট্রেলিয়াতেও দেখিনি। কোথাও দেখিনি। ভাবী যেন কী কী কিনছে, আমি চট করে ছয় বাক্স মাশরুম কিনে ফেললাম। আমি জানি, মাশরুম দেখে আমার দুই মেয়ে খুশীতে নেচে উঠবে। ভাবী আমার মাশরুম কেনা দেখে নাক মুখ কুঁচকে বললেন,

" বৌদি, আপনি দুবাই এসে এই  ব্যাঙের ছাতা কিনছেন ব্যাগ ভরে? এত ভালোবাসেন"?

আমি তো হীরে জহরতের সন্ধান পেয়েছি এমন ভাব করে বললাম, " ভাবী, এতক্ষণে আমার মনে হচ্ছে, আমি খুব ভালো কিছু খুঁজে পেলাম"।

-মাগো! আমি মরে গেলেও এই ব্যাঙের ছাতা খাব না। আমি দুবাই এসেছি গোল্ড কিনতে। কিনলাম বৌদি, ত্রিশ ভরির গয়না কিনে ফেলছি। ক্রেডিট কার্ড সাথে নিয়েই আসছিলাম, আমার সাহেব তো এখনও জানে না, ক্রেডিট কার্ডের বিল পেলে কাউ কাউ করবে। বৌদি, আপনি গেছিলেন গোল্ড মার্কেটে?"

-হ্যাঁ গেছিলাম, কিনেছি অল্প স্বল্প, আমার তো গোল্ডের প্রতি কোন নেশা নেই, আমি ম্যাচিং গয়না বেশী পছন্দ করি। মাটির গয়না, অক্সিডাইজড গয়না, সূতা, কড়ি, স্টোনের গয়না বেশী পছন্দ আমার"।

-না, বৌদি, মেয়েদের গোল্ড কেনা উচিত। হাতের সম্বল।

-ঠিক আছে, নেক্সট টাইম কিনবো। চলেন এবার হোটেলে ফিরে যাই।





শাড়ী  আর মাশরুম কেনা হয়ে গেলে আমরা আবার হোটেলে ফিরে গেলাম। ততক্ষণে বেলা বেড়েছে, ক্ষিদে পেয়েছে। ভাবীর ছেলেটা হোটেলেই ছিল, তার তো ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। ভাবী তার আজ্ঞাবহকে জিজ্ঞেস করলেন,

" অই কামাল মিয়া, তোমার স্যার কী বলে গেছে? তারা আসবে কখন? আমাদের লাঞ্চের কিছু ব্যবস্থা করে গেছে?"

কামাল মিয়া বললো, " ম্যাডাম, আমি তো কিছু জানিনা।"

ছেলের ঘ্যানঘ্যানানীতে বিরক্ত হয়ে ভাবী বললেন, " বৌদি চলেন তো, আমরা হোটেলের রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করে ফেলি। উনারা কই কই ঘুরছে ঘুরুক, আর কতক্ষণ বসে থাকবো।


এখানে ভাবীই আমার মালিক, উনার জিম্মায় আমাকে রেখে গেছে উত্তম কুমার। তাছাড়া ভাবী দুবাই আরও অনেকবার এসেছে, উনারা নিজেরাই একটি ফার্মাসিউটিক্যালের মালিক। ধনী মানুষের কথার মধ্যে সব সময় কমান্ডিং ভাব থাকে। ধনী বলেই তারা চারিপাশের সবকিছুই নিজেদের কন্ট্রোলে রাখার কায়দা জানে। সেই কায়দা দিয়েই ভাবীও আমাকে বগলদাবা করে হোটেলের রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। রেস্টুরেন্ট ফাঁকা ছিল, একটা টেবিল দখল করে বসে পড়েছি। ভাবী, তার ছেলে, আমি আর কামাল ভাই। আমাদেরকে টেবিলে বসতে দেখেই রেস্টুরেন্টের কর্মচারী এগিয়ে এলেন, সে কী বাঙ্গালী নাকি কেরালার মানুষ বুঝার উপায় ছিল না। ইংলিশেই খাবারের অর্ডার দিচ্ছিলাম। কর্মচারী নিজের পরিচয় দিলেন বাংলাদেশের ছেলে বলে, নাম সালাম। আমাদেরকে কাছে পেয়ে খুব খুশী। আমি শুধু ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন কারী নিয়েছি, ভাবীর ছেলে নিয়েছে চার আইটেম, ভাবী তিন আইটেম, কামাল মিয়া আমার মতই দুই আইটেম। খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই ভাবী সালামকে বললেন, বিল উনার স্বামীর নামে করতে। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল ভাবীর সিদ্ধান্ত শুনে। আমি সবিনয়ে বললাম, " ভাবী, আমার কাছে টাকা আছে, আমিই দিয়ে দেই বিল?"

-রাখেন তো, উনাদের উচিত ছিল, আমরা দুইজন মহিলা রয়ে গেছি, সাথে আমার ছেলে, কামাল মিয়া, সবার খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে যাওয়া। আপনার ভাই এই দলের হেড, উনার নামেই বিল করেছি। উনারা আনন্দ ফূর্তি করতেছে আর আমরা এইখানে পেট শুকিয়ে বসে থাকবো, তা কি সম্ভব?"




বিকেলের দিকে উনারা ফিরে এসেছেন। উত্তম আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, দুপুরে কী খেলাম। ঘটনা বললাম, শুনে উত্তম বললেন, " তুমি বিল দিয়ে দিলেই ভালো করতে। থাক! ভাবী যা ভালো বুঝেছে তাই করেছে। তুমি তো একা ছিলে, উনারা তো তিন জন ছিল। কাজেই অসুবিধা নেই। চল, এবার গুছিয়ে নিতে হবে। আর এক ঘন্টার মধ্যে বের হতে হবে।"

আমি আগেই সব কিছু গুছিয়ে রেখেছিলাম। বললাম, " আমাদেরকে নিয়ে নৌভ্রমণে যাবে বলেছিলে। বাদ হয়ে গেল?"

-" আরে! এদের কর্ম কান্ড বুঝিও না। সবাইকে নিয়ে যাবে বলেই তো জানতাম। এত দূরে চলে গেছি, আমি একবার '---' ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি দেখি আর বেশী উৎসাহ দেখালেন না।"

-উনাদের তো উচিত ছিল, ফোন করে জানিয়ে দেয়া।


সব মালামাল গোছগাছ করে হোটেলের লাউঞ্জে এসে জড়ো হয়েছি সবাই। বিশাল দেহ নিয়ে দলপতিও এসেছেন। ভাবী তখনও এসে পৌঁছাতে পারেন নি। দলপতিকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। দলের একজন জানতে চাইলো, " ভাবী কোথায় '---' ভাই?

দলপতি জবাবে বললেন, " আরে! ভাবী আসবে, দেরী হবে। দুপুরে হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে ইচ্ছেমত খেয়েছে, বিছানা ছাড়তে সময় লাগছে।"

-আমি হেসে বললাম, '---' ভাই, ঠিক বললেন না, ভাবী খুবই অল্প খেয়েছেন, আসলে আজকে অনেক হেঁটেছেন, সেইজন্যই বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

আমাকে অবাক করে দিয়ে দলপতি বললেন, " খাইছেন তো আপনারা, বিলটা তো আমার নামে করছেন। চাইর জন মানুষের খাওয়ার বিল আমার নামে কইরা বইসা রইছে। হোটেলে ফিরা আসতেই রেস্টুরেন্ট থিকা আমার কাছে বিল পাঠায় দিছে। বিল দেইখা আমার মেজাজ গরম হইয়া গেছে"।

আমার মনে হচ্ছিল, ধরণী দ্বিধা হও, আমার বাড়ীতে কত মানুষ খায়, আমাদের সাথে কেউ  বেড়াতে বের হলে তার পুরো দিনকে আনন্দময় করে তুলতে আমি আর আমার উত্তম, দুজনেই হাত খুলে খরচ করি। আর এই লোকটা এতগুলো ভদ্রলোকের সামনে খাওয়া নিয়ে এমন খোঁটা দিচ্ছে!!! বললাম, " আমিই খাওয়ার বিল দিতে চেয়েছিলাম, ভাবীই আমাকে আটকালো। বললো, আপনারা আমাদের কথা ভাবেন নি, আমরা আপনাদের সাথে এসেছি, এখানে কাউকে চিনিনা, বাইরে কোথায় গিয়ে খাব তাও জানিনা। ভাবী অনেকটা রাগ করেই বোধ হয় আপনার নামে বিল করেছে। বললে এখনও আমি বিল দিয়ে দিতে পারি।"

- খুব গম্ভীর স্বরে বললেন, নাহ, আর দরকার নেই। আমি বিল শোধ করে দিয়ে আসছি।


বাকী সময় আমার মনটা খারাপ হয়ে ছিল। রাত আটটায় এয়ারপোর্টে যাওয়ার বাসে চড়লাম।





Wednesday, February 13, 2013

ভালোবাসার সাত রঙ!!



আজ ১৪ ফেব্রুয়ারী, ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবস। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সৌহার্দ্য বিনিময়ের জন্য আজকের দিনটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। আজই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশীবার বলা কথা, “ আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার দিন। এমনকি শত্রুর প্রতিও ঘৃণার বদলে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়ার দিন। দিনটি বছরের অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা। যদিও ভালোবাসার কথা বা অনুভূতি আমরা প্রতিনিয়তই প্রকাশ করে থাকি, সেই প্রকাশের মধ্যে কোন ঘটা-পটা থাকে না, এ শুধুই একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ‘ভালোবাসা দিবসে’ ভালোবাসা প্রকাশ ব্যক্তি গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ‘ভালোবাসি’ অনুভূতি্টুকু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার মধ্যেই দিবসটি পালনের সার্থকতা নিহিত থাকে।

 

‘ভালোবাসি’ কথাটি মুখে বলেও প্রকাশ করা যায়, তবে ভালোবাসা নান্দনিক হয়ে উঠে যদি ছোট্ট কোন উপহারের মাধ্যমে তা জানানো যায়! ভালোবাসা মাখানো উপহার দিয়ে প্রিয়জনকে আরেকবার জানান দেয়া, “ আমি তোমাকে ভালোবাসি”। উপহার মহার্ঘ্য হয়ে উঠে ভালোবাসার প্রলেপে। দামী দোকানে কাঁচের শোকেসে সাজিয়ে রাখা মূল্যবান হীরে জহরত থেকে শুরু করে বাগানের সদ্য প্রস্ফূটিত গোলাপটিও হতে পারে ‘ভালোবাসা দিবসের’ উপহার! তবে সবচেয়ে কাব্যিক এবং মর্য্যাদাপূর্ণ উপহার হচ্ছে রঙীন খামে চিঠি’ অথবা ‘বাগানের সদ্য প্রস্ফুটিত ফুল’। আর সে ফুল যদি হয় বাগানের তাজা গোলাপ, তাহলে তো কথাই নেই।

 

গোলাপ ঈশ্বরের এক অপরূপ সৃষ্টি, ফুলের রাণী গোলাপ, কত রঙের গোলাপই আছে এই পৃথিবীতে! লাল, হলুদ, গোলাপী, কমলা, বেগুণী, সাদা, কালো, পীচ এবং আরও আরও কত রঙ। কতই না রঙের বাহার! প্রকৃতির এই অনাবিল সৌন্দর্য্যময় সৃষ্টির প্রতিটি রঙেই থাকে ভালোবাসার কথা! প্রতিটি রঙের আলাদা আলাদা অর্থ থাকলেও মূল সুর হচ্ছে ‘ ভালোবাসি’। এ যেন ‘ভালোবাসার সাত রঙ’।

এজন্যই ভালোবাসার উপহার হিসেবে এক গুচ্ছ গোলাপের গ্রহণযোগ্যতা সব কিছুর ঊর্ধ্বে। এ তো নিছক ফুলই নয়, এ যে প্রেরক এবং প্রাপকের মধ্যে যোগাযোগের মেলবন্ধন, হৃদয়ের গভীরের উষ্ণ বার্তা বহনকারী মাধ্যম! প্রথম ভালোবাসা জানাতে, হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার গৌরব ফিরিয়ে আনতে, গভীর ভালোবাসাকে আরও গভীরে পৌঁছে দিতে, কাউকে ভালোবাসা মিশ্রিত শ্রদ্ধা জানাতে, শত্রুর মন জয় করতে, বন্ধুর আনন্দের অংশীদার হতে, শোকার্তকে সহানুভূতিপূর্ণ ভালোবাসা জানাতে একগুচ্ছ গোলাপই যথেষ্ট। গোলাপের প্রতিটি রঙেই যেনো মিশে আছে ‘ভালোবাসা’র কথা।

  

সাদা গোলাপ

সাদা গোলাপ বিশুদ্ধতা এবং পবিত্রতার প্রতীক।  এক গুচ্ছ সাদা গোলাপ উপহার দেয়ার ভেতর নিহিত থাকে অন্তরের শুভ ইচ্ছার কথা, ভালোবাসার পবিত্রতার কথা। একের প্রতি অপরের একনিষ্ঠতা, অঙ্গীকার এবং নির্ভরতার কথা।

 

গোলাপী গোলাপ

গোলাপ থেকেই গোলাপী। গোলাপী গোলাপের গ্রহণযোগ্যতা সর্বকালের, সর্বযুগের! আভিজাত্য এবং অন্তরের স্নিগ্ধতা প্রকাশ পেয়ে থাকে গোলাপী গোলাপ উপহারের মাঝে। হালকা গোলাপী রঙের গোলাপ সুখ, রোম্যান্স, আনন্দ প্রকাশের প্রতীক এবং গাঢ় গোলাপী গোলাপ প্রাপকের প্রতি প্রেরকের ভালোবাসার স্বীকৃতি, হৃদয়ের স্নিগ্ধ ভালোবাসার প্রকাশ।


Meaning of the Color of Roses. Colour: Red, Pink, White, Coral, Lavender, Blue, Black, Yellow
Meaning of the Color of Roses. Colour: Red, Pink, White, Coral, Lavender, Blue, Black, Yellow

হলুদ গোলাপ

হলুদ গোলাপ অপরকে স্বাগত জানাতে, বন্ধুত্বের প্রতীক,  পরম নির্ভরতা, আনন্দ-উচ্ছাস, ভালোবাসার প্রতীক। অপরকে স্বাগত জানাতে, নতুনকে আবাহন করতে, নতুন মা, নতুন গ্র্যাজুয়েট অথবা বাগদান বা বিয়ের আশীর্বাদ হয়ে যাওয়া পাত্র পাত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে হলুদ গোলাপের জুড়ি মেলা ভার! হলুদ গোলাপ নতুন জীবন শুরুর আনন্দ ও ভালোবাসার প্রতীক।

পীচ রঙের গোলাপ

পীচ ফল রঙা (হলদে কমলা) গোলাপ মানুষের মনের সৌন্দর্য্য ও নমনীয় ব্যাক্তিত্ব প্রকাশ করে। অপরের উন্নতিতে প্রশংসা করতে অথবা প্রিয় মানুষটির প্রতি মনের গভীর অনুভূতি বা আকুলতা প্রকাশ করতে পীচ রঙা গোলাপ হচ্ছে একমাত্র উপহার! কারো প্রতি সহানুভূতি প্রকাশেও পীচ গোলাপের জুড়ি নেই।

কমলা রঙ গোলাপ

কমলা গোলাপ নিয়ে আসে অহংকার, উচ্ছ্বাস, আকাংক্ষার বার্তা! উজ্জ্বল কমলা রঙের গোলাপ প্রিয়জনকে জানিয়ে দেয় প্রেরকের মনের উষ্ণ, উদ্দীপনামূলক ভালোবাসার বার্তা, জানিয়ে দেয় প্রিয়জনকে কাছে পেতে চাওয়ার পরম আকাংক্ষার কথা! পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপের অর্থ, “ আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত”! কোমল ও বিষন্ন কমলা রঙের গোলাপ গুচ্ছ প্রেরকের স্বভাবের কোমলতা ও নমনীয়তাকে প্রকাশ করে।


ল্যাভেন্ডার গোলাপ
‘প্রথম দর্শণেই প্রেম’ প্রকাশের অন্যতম উপহার হচ্ছে এক গুচ্ছ ল্যাভেন্ডার গোলাপ। ল্যাভেন্ডার বা হালকা বেগুণী রঙ একজনের প্রতি আরেকজনের গভীর ভালোবাসা বর্ণনা করে। প্রিয়জনকে ভালোবাসার গভীরতা বুঝাতে ল্যাভেন্ডার গোলাপের জুড়ি নেই।



কালো গোলাপ

ভালোবাসার মৃত্যু নেই, পারস্পরিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও সম্পর্ক জোড়া দিতে কালো গোলাপ উপহারের জুড়ি নেই। কালচে লাল বা কালচে মেরুন গোলাপকেই ‘কালো গোলাপ’ বলা হয়।  কালো গোলাপ মানে হচ্ছে পুণর্জন্ম, অথবা নতুন করে শুরু। অর্থাৎ ভালোবাসায় পরাজয় বলে কিছু নেই, হেরে যাওয়া জীবনে কালো গোলাপ ‘ আবার শুরু করি’ বার্তা বহন করে।  

নীল গোলাপ

ভালোবাসার সমপর্কে নীল গোলাপের স্থাণ নেই। তাই পৃথিবীতে নীল গোলাপের অস্তিত্বও নেই। রঙ হিসেবে ‘নীল’ অনেকেরই প্রিয়, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে উপহার দেয়ার জন্য, কৃত্রিম ‘নীল গোলাপ’ও দেয়া উচিৎ নয়।

 

ভালোবাসার ‘লাল গোলাপ’

সব রঙের গোলাপেই ভালোবাসার কথা লেখা আছে, তবে ‘লাল গোলাপ’ ভালোবাসার নিরবচ্ছিন্ন প্রতীক। লাল মানে উষ্ণতা, লাল মানেই রোম্যান্স, লাল মানে সাহস! প্রিয় মানুষটিকে যদি এক গুচ্ছ লাল গোলাপ অথবা বাগান থেকে তুলে নিয়ে আসা একটি তাজা গোলাপ দেয়া যায়, যার অর্থ “ আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ”, স্বর্গীয় ভালোবাসা পৃথিবীতেই মূর্ত হয়ে উঠে!



লাল গোলাপ মানেই ভালোবাসা, লাল গোলাপ মানেই প্রেম, লাল গোলাপের শুভেচ্ছা মানেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আকাংক্ষার বহিঃপ্রকাশ।

লাল গোলাপের উৎপত্তিঃ
ভালোবাসার চলমান লাল গোলাপ প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল সুদূর চীনদেশে, ১৮০০ শতাব্দীতে। যদিও গবেষণা থেকে জানা যায়, লাল গোলাপের অস্ত্বিত্ব ৩৫ মিলিয়ন বছর আগেও ছিল।

লাল গোলাপের জনপ্রিয়তা সর্ব যুগে, সর্বদেশে। রোমান যুগ থেকেই লাল গোলাপের জনপ্রিয়তা ছিল অবিসংবাদিত। কারণ রোমান্স ছাড়াও লাল গোলাপের ব্যবহার হতো সুগন্ধী ও ভেষজ ওষুধ প্রস্তুতিতে, গোলাপের ব্যবহার হতো ঘর সাজানোর কাজে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে গ্রেট ব্রিটেনে ‘গোলাপ যুদ্ধে’ লাল গোলাপের প্রধান ভূমিকা ছিল, লাল গোলাপকে হাউজ অব ল্যাঙ্কাস্টারের প্রতীক ধরা হতো।

শুধু কী তাই, সাহিত্যেও লাল গোলাপ তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করেছে। রবার্ট বার্ণের কবিতা ‘দ্য রেড রোজ’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের সাড়া জাগানো ছবি ‘আমেরিকান বিউটি’ গোলাপ বন্দনায় কাব্যময় হয়ে উঠেছে।

লাল গোলাপের মহিমাঃ
লাল গোলাপ অনেক জিনিসের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রধান অর্থ হচ্ছে ‘প্রেমময় ভালোবাসা’। লাল গোলাপ উচ্চারণের ভেতর জড়িয়ে থাকে আবেগ আর উষ্ণতা মাখানো রোম্যান্স। হয়তো এ কারণেই লাল গোলাপের আরেক নাম ‘প্রেমিকের গোলাপ”।
লাল গোলাপকে সৌনদর্য্যের প্রতীকও বলা হয়ে থাকে। শতকের পর শতক, দেশের বাইরে আরও দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, সর্বত্র লাল গোলাপ তার বর্ণ, রূপ এবং সৌরভ ধরে রেখেছে।
লাল গোলাপ শুধুমাত্র প্রেমিক যুগলের মাঝে দেয়া নেয়া হয়, ভাবা ভুল। বিয়ে, জন্মদিন, বিশেষ কাউকে শুভেচ্ছা বার্তা “শুধু তোমার জন্য” পাঠানো থেকে শুরু করে বিবাহবার্ষিকী, ক্রীসমাস, ভ্যালেন্টাইন’স ডে তেও লাল গোলাপ একচ্ছত্র বিস্তার লাভ করে।
প্রস্ফুটিত গোলাপের ন্যায় অ্প্রস্ফুটিত গোলাপেরও নানারকম অর্থ আছে। যেমন লাল গোলাপ কুঁড়ির মানে হচ্ছে, প্রেমের প্রথম ধাপ। অর্থাৎ দুটি মানুষের মধ্যে প্রণয়ের প্রাথমিক ধাপকে গোলাপের না ফোটা কুঁড়ির সাথে তুলনা করা হয়, আর দল মেলে প্রস্ফুটিত গোলাপকে মনে করা হয় দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার সম্পর্ক। লাল গোলাপে ক্ষমতা, শক্তি এবং সৃজনশীলতাকে বুঝানো হয়।
ভ্যালেন্টাইন’স ডে মানেই লাল গোলাপ!
লাল গোলাপের সুবিশাল গ্রহণযোগ্যতাই গোলাপকে ভালোবাসা বা রোম্যান্সের প্রতীকি মর্য্যাদা দিয়েছে। আর এ কারণেই ভ্যালেন্টাইন’স ডে তে লাল গোলাপের বিপুল চাহিদা দেখা দেয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে একই ছবি দেখা যায়। ভালোবাসার রঙ এক বলেই ভালোবাসার উপহারও একই হয়। উপহার নানা আঙ্গিকে দেয়া হয়ে থাকে। কখনও ব্যুকে, কখনও এক গুচ্ছ গোলাপ সুদৃশ্য কাগজে মুড়িয়ে, অথবা কখনও আলাদা একটি গোলাপ শুধু ‘আলাদা একটি মানুষের জন্য’ দেয়া হয়ে থাকে। কখনওবা গোলাপের তাজা পাপড়ি সুদৃশ্য বাটিতে করেও উপহার হিসেবে দেয়া হয়। খোলা পাপড়ি থেকে স্বর্গীয় প্রেমের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এজন্যই লাল গোলাপ যিনি দিবেন, তিনি তার খুব বিশেষ কাউকেই দিবেন, সবাইকেই ‘লাল গোলাপ’ দেয়া যায় না।
টকটকে লাল যেহেতু ভালোবাসার প্রতীক, তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের ভাষাতেই ভালোবাসার একটাই রূপ, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। লালের সাথে যদি সাদা গোলাপ মিশিয়ে দেয়া হয়, তাহলে ভালোবাসার সাথে যোগ হয়ে যায় আত্ম নিবেদন, অর্থাৎ ‘আমি তোমার জন্য নিবেদিত প্রাণ”! ‘ভালোবাসা’ প্রকাশের জন্য আলাদা উপলক্ষ্যের প্রয়োজন হয় না, যে কোন সময় ,যে কোন মুহূর্তে একগুচ্ছ অথবা একখানা লাল গোলাপ নিয়ে প্রিয় মানুষটির সামনে দাঁড়ালেই হলো, হাতের গোলাপই বলে দিবে, মনের কথা।

সর্বকালের ভ্যালেন্টাইন
পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গোলাপ কেনার ব্যাপারে পুরুষ অনেক এগিয়ে আছে। ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে যত গোলাপ বিক্রী হয়ে থাকে, শতকরা ৬৫ ভাগ ক্রেতা হচ্ছেন পুরুষ। নারী আর ফুল সমার্থক, নারীর কোমল হাতে ফুল মানায় ভালো, কবি-সাহিত্যিকদের কাব্য সৃষ্টিতে ‘নারী ও কুসুম’ সৌন্দর্য্যের প্রতীক হিসেবে পাশাপাশি অবস্থান করে। তাই বলেই কী বিশেষ দিনে বিশেষ মানুষটি একগুচ্ছ গোলাপ হাতে প্রিয় নারীর সামনে হাজির হয়! বলে, “আমার একদিকে শুধু তুমি, পৃথিবী অন্যদিকে, আমি তোমারই দিকটা নিলাম”।

কত রকমের মানুষ, তাদের কত রকমের গল্প-১১

তিন  মজনু'র গল্প


মজনু একঃ

সেদিন এক মা এলেন সাথে মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে। উনাদের দুই বছরের ফোন চুক্তি নবায়ন করতে। এতদিন উনাদের দুই ফোন লাইনের ফ্যামিলি প্ল্যান ছিল, এবার আরেকটি লাইন যোগ করতে চাইলেন। মায়ের সাথে প্রয়োজনীয় কথা সারছিলাম, লক্ষ্য করছিলাম, সাথে আসা মেয়েটি তার ছোট ভাইকে কিছু একটা বলে কনভিন্স করতে চাইছে। তখনও বুঝি নি, ওরা কী নিয়ে গুজুর গুজুর করছিল। দুই লাইনের সাথে যখন তৃতীয় লাইনটি অ্যাড করছিলাম, সঙ্গত কারণেই তাদেরকে 'কত মিনিট প্ল্যান' চাই, জিজ্ঞেস করতে হয়েছে। এবার দেখি বোন বেশ জোরে জোরেই ভাইকে বলছে,

" ভাই, শোন, যে প্ল্যান মা নিচ্ছে, সেই প্ল্যানে তুমি গ্লোরিয়ার সাথে রাত নয়টার পর থেকে সারা রাত কথা বলতে পারবে। তাছাড়া, আনলিমিটেড টেক্সট মেসেজ তো আছেই। তুমি ওকে টেক্সট করবে"।

ছেলেটি বলছে, না, আমার আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যান চাই। রাত নয়টার পরে কেন, আমি সারাদিনই ওর সাথে কথা বলতে চাই।

ভাই-বোনের কথাবার্তা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম! মা'কে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলে কার সাথে সারাদিন কথা বলতে চাইছে।
মুখে একগাল হাসি ছড়িয়ে মা বললেন, " ওর গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে"।

ছেলের বয়স কত?

-বারো পূর্ণ হলো। মেয়ের বয়স আঠারো।
-তোমার বারো বছর বয়সী ছেলের গার্ল ফ্রেন্ড আছে, তার সাথে কথা বলার জন্য সে এত দামের আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যান চাইছে, তুমি মানা করতে পারছো না?

-টিন এজ, টিন এজ! টিন এজের ছেলেপেলে মায়েদের কথা শুনলে তো! বাড়িতেই বুঝিয়েছি, কিছুতেই মানবে না।

আমি ডাকলাম ছেলেটিকে, বললাম, " বাবু, শোন, আমি তোমাকে অনেক সুন্দর প্ল্যান পছন্দ করে দিচ্ছি। আগে বলো, তোমার গার্ল ফ্রেন্ড কোন ফোন ব্যবহার করে?"

-আমার গার্ল ফ্রেন্ডের আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যান আছে, ওরা এটিএন্ডটি সার্ভিস ব্যবহার করে।
 -ভালো কথা, মা যেই প্ল্যান নিতে বলছে, সেটা নিলেও তুমি গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে রাতদিন কথা বলতে পারবে। 'মোবাইল টু মোবাইল' ফ্রী তো।

-কিন্তু আমার গার্ল ফ্রেন্ডের আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যান।  ওকে আমি বলেছি, আমারও আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যান আছে, এখন আমার আনলিমিটেড প্ল্যান চাই।

তার বোন এবার ফোঁস করে উঠলো, ইস রে! তোমার বান্ধবীর সাথে গল্প করার জন্য যদি আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যানের দরকার হয়, আমাকেও তাহলে আনলিমিটেড ওয়েব অ্যাকসেস প্ল্যান দিতে হবে।

-ওয়েব অ্যাকসেস তো তোমার আছেই। তুমি যখন তোমার বন্ধুর সাথে টেক্সট চালাচালি করতে চেয়েছিলে, তখনতো মাম্মি তোমাকে আনলিমিটেড টেক্সট দিয়েছিল, এখন আমাকেও দিতে হবে। আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না।

ভাই বোনের ঝগড়া দেখে মা খুব খুশী। আমার দিকে চোখ টিপে হাসছে আর ইশারায় বুঝাতে চাইছে, দেখো কী কান্ড!
আমার ছোট মেয়ের বয়সী 'মজনু'র কান্ড দেখে আমার যত না মজা লাগছিল, তার চেয়ে বেশী বিরক্ত লাগছিল মাত্র ১২ বছরের ছেলের প্রেম-পীরিতি নিয়ে তার মা'কে আহ্লাদ করতে দেখে। এক সময় শিক্ষকতা করেছিলাম, শিক্ষকসুলভ ভাব এখনও মাথার ভেতর রয়ে গেছে , মাঝে মাঝেই তা জেগে উঠে বলেই 'মজনু'কে কাছে ডেকে বললাম,

- বাবু, শোন, একই কথাই তো! তোমার বান্ধবীর মত তোমারও আনলিমিটেড মোবাইল টু মোবাইল প্ল্যান আছে!  এটা দিয়েই তুমি ওর সাথে সারাদিন-রাত কথা বলতে পারবে। তাছাড়া সারাদিন কানে ফোন লাগিয়ে রাখা তো ভালো নয়। কয়েক বছর পর তোমাদের দুজনেরই কান নষ্ট হয়ে যাবে! তুমি তো জানো না, আমরা ফোন বিক্রী করি, আমরা জানি, সারাদিন ফোন কানে লাগিয়ে রাখতে নেই। তারচেয়ে তুমি আনলিমিটেড টেক্সট ব্যবহার করো, সুন্দর সুন্দর কথা লিখবে, বানান শুদ্ধ হয়ে যাবে, স্পেলিং টেস্টে হানড্রেড পাবে!

আমার এই কথা শুনে বারো বছরের মজনু কালো মুখে দুধসাদা দাঁত বের করে এমন এক হাসি দিয়েছে, দেখে আমারও হাসি পেয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত রফা হয়েছে, লিমিটেড মিনিট প্ল্যানই নিবে, তবে ফোনটি হতে হবে 'আই ফোন'। মা'কে চোখ ইশারায় বললাম, " মেনে নাও! আই ফোন ৪ মাত্র এক ডলারে পাবে, ওটাই ছেলেকে দাও। ছেলের দিকটাও তো দেখতে হবে, 'লাইলীর কাছে মজনু'র একটা মান সম্মানের ব্যাপার আছে তো"!

আই ফোন ৪ হাতে পেয়ে বারো বছরের মজনু খুশী মনে মা আর বোনের হাত ধরে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

মজনু  দুইঃ

মজনু এক ছিল কালো। মজনু দুই হচ্ছে দুধসাদা বরণ। সেও এসেছে তার মাম্মি'কে নিয়ে। দুধবরণ মজনু আবার খুব হাইটেক' বালক।  আধুনিক ফোনের কলাকৌশল সম্পর্কে বিশেষ বিজ্ঞ, মানে বিশেষজ্ঞ। এদিন সে নিজের জন্য আসেনি, মায়ের জন্য ফোন পছন্দ করে দিতে এসেছে। তার মা নতুন 'বয়ফ্রেন্ডের' সাথে কথা বলার জন্য কোন ফোনটি ব্যবহার করতে পারে, তা চিনিয়ে দেয়ার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এসেছে সে। আমি তাদেরকে আমার তরফ থেকে যতটুকু ইনফর্মেশান দেয়ার, দিলাম। তবে বুঝলাম, অণর্থক প্যাঁচাল পেরেছি।  'মজনু' বাবু ঠিক করেই এসেছে মায়ের জন্য 'আই ফোন ফোর এস' কিনবে।

আমি যখন আইফোন ফোর এবং আই ফোন ফোর এস' এর দামের পার্থক্য বললাম, মা তখন একটু সময়ের জন্য থমকালেন। মা'কে থমকাতে দেখে 'মজনু'ও থমকে গেছে। তবে মজনু'র থমকানোটা ' কী আশ্চর্য্য! বাড়ী থেকে কী বলে নিয়ে আসলাম' ধরনের। সে আগেই তার মা'কে বলেছে, আই ফোন ফোরে কিন্তু 'সিরি' নেই, ফোর এস' এ আছে। আমার মত মজনু'র মায়েরও ধারণা নেই, 'সিরি' দিয়ে কী করতে হয়!

মা বললো, সিরি দিয়ে আমি কী করবো? আমি শুধু জর্ডানের সাথে কথা বলবো, তার জন্য তো হাই টেক ফোনের প্রয়োজন নেই বাবা!

মজনু তার মা'কে বুঝালো,

" মাম্মি, তোমাকে কিছুই করতে হবে না। তুমি শুধু আই ফোন ফোর এস' সাথে রাখবে। জর্ডান'এর কাছে তোমার ইজ্জত বেড়ে যাবে! আমি দেখেছি সেদিন, মিঃ জর্ডান 'আই ফোন থ্রী' ব্যবহার করে। হাহ! আই ফোন থ্রী এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উনি বোধ হয় জানেন না। তোমার হাতে নতুন মডেলের ফোন দেখলে তার মাথা ঘুরাবে। হা হা হা!

-ছি ছি!! এ কেমন কথা তোর! জর্ডান খুব ভালো মানুষ। তার মাথা  ঘুরিয়ে দেয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই। তুই কী অ্যামান্ডা'র মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার জন্যই গ্যালাক্সী থ্রী কিনেছিস?

-ওয়েল! তুমি আমাকে ভালই চেনো। আমি তোমার ভালোর জন্যই কথাটা বলেছিলাম।

মা আর ছেলের কথোপকথন শুনে অবাক হইনি। অনেক দেখে শিখেছি, এদেশে ছেলে-মেয়েরা খুব ছোটবেলা থেকেই প্রেমের পাঠ নিতে শুরু করে। নিজেদের বাবা-মায়ের সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হয় বলে বাবা বা মায়ের নতুন জুটিকে নির্দ্বিধায় স্বাগত জানায়। এভাবেই জুটি ভাঙ্গা-গড়ার খেলা দেখতে দেখতে ওরা ছোট্টবেলা থেকেই 'লাইলী' বা 'মজনু' হতে শিখে যায়। তবে, দ্বিতীয় মজনু'র মাম্মি বোধ হয় এখনও ছেলের উপর সব কিছু ছেড়ে দেয় নি, তাই নিজের মতকে প্রাধান্য দিয়ে মাত্র এক ডলার মূল্যে 'আই ফোন ফোর' নিয়ে বাড়ী ফিরেছেন।


মজনু তিনঃ

আমি একফাঁকে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। যতগুলো কন্ট্র্যাক্ট সাইন করিয়েছি, সেগুলোর ডাটা লগবুকে এন্ট্রি করছিলাম। পেছন থেকে বাচ্চা কন্ঠে কেউ ডাকলো, অ্যাই মাম!!
খেয়ালে ছিল না আমি আমেরিকান স্টোরে আছি, ডাক শুনে মনে হলো আমার ছোট মেয়ে বুঝি ডাকছে! মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো, " কী হলো!"
রেজিস্টারের দিকে তাকিয়ে দেখি এক কালো বালক শিশু দাঁড়িয়ে! নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে সামলে নিলাম। ওর বয়সী ব্ল্যাক ছেলেদের দেখলেই আমার আদর করতে ইচ্ছে করে! মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়া চুল, মুখে অনিন্দ্য সুন্দর হাসি, আদর না করে পারা যায়! আমার মেয়েরা আমাকে সব সময় 'রেসিস্ট' বলে আনন্দ পায়। কারণ, আমি  অধিকাংশ ব্ল্যাক মহিলাদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষন করি না।  ওদের  আচরণে ঝগড়াটে ভাব দেখে ভয় পাই, তাই সব সময় ওদের কাছ থেকে শত হস্ত দূরে থাকার চেষ্টা করি। আমার এই মনোভাব মেয়েদের কাছে খুবই নিন্দনীয়! আমি অবশ্য মানুষের প্রতি মেয়েদের এই অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করি। আমার বড় দুই মেয়েই কিছুটা নারীবাদী। এ কারণেও ওরা আমার উপর ক্ষ্যাপা! আমি যখন অতি ভাল কালো মহিলাদের সম্পর্কে জয়গান করি, সেগুলো ওরা আমলে নেয় না, কালো ছেলেদের ব্যাপারে আমি খুব নমণীয়, কালো ছেলেদের ব্যবহারে সরলতা থাকে, ওরা ঝগড়ুটে স্বভাবের হয় না, সারাক্ষণ নাচ-গানের ছন্দে চলাফেরা করে। এমন কথা শুনলেই আমার মেয়েরা রেগে যায়, বলে, আমি নাকি পুরুষদের হয়ে সাফাই গাই, মেয়ে হয়েও মেয়েদের বিরুদ্ধে কথা বলি! তা বলুক ওরা, ওদের কথার মধ্যেও  যুক্তি আছে! থাকুক যুক্তি, তাই বলে তো আর অনিন্দ্য সুন্দর কালো বালক বা কিশোর ছেলের প্রতি আমার যুক্তিহীন ভালোবাসার কিছু কমতি হবে না!

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণ কিশোরকে জিজ্ঞেস করলাম,

-কী হলো তোর! তোর জন্য কী সাহায্য করতে পারি, বলতো সোনা!
-আমি একটা ফোন কার্ড কিনতে চাই। এই যে টাকা নিয়ে এসেছি।
-দাঁড়া, আগেই টাকা বের করছিস কেন? এত উতলা হয়েছিস কেন? কী, গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করতে হবে?
-দারুণ লজ্জা পেয়ে সে বললো, আরে নাহ! আমার মায়ের জন্য কার্ড কিনতে এসেছি।
-ওহ আচ্ছা, আয় আমি তোর জন্য কার্ড খুঁজে দেই। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, তোরও একখানা কার্ড দরকার আছে, তাইনা?
-লজ্জা মাখা মুখে, আমার তো ফোন নেই।
-সে কী রে!! তোর ফোন নেই?? হায় হায়! তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে তো!!!!!

আমাকে অবাক করে দিয়ে সে 'হ্যাঁ' সূচক মাথা নাড়ালো। আমি ওর সাথে মজা করছিলাম, এত ছোট ছেলের আবার গার্ল ফ্রেন্ড থাকে নাকি? সাইজ দেখে মনে হচ্ছিল আট বছর হবে বয়স। কিন্তু গার্ল ফ্রেন্ডের কথা বলতেই অমন করে লজ্জা পেলো কেনো! ব্যস! শুরু হয়ে গেলো আমার দুষ্টামী! বললাম,

-সোনাবাবু, তোর বয়স কতরে!
-বারো বছর!
-বলিস কী!! বারো বছর তোর, অথচ তোর ফোন নেই?
-না, আমার মা আমাকে ফোন কিনে দেয় নি। যদি ভেঙ্গে ফেলি, সেই জন্য ফোন দেয় নি।
-কেন, ফোন ভেঙ্গে ফেলার কথা মনে হচ্ছে কেনো? তুমি কী মায়ের অনেক দামী জিনিস ভেঙ্গে ফেলেছো?
-না, অনেক জিনিস ভাঙ্গিনি, তবে আমার হাত থেকে অনেক জিনিস পড়ে যায়। ফোনও যদি পড়ে যায়, তাহলে ভেঙ্গে যাবে, মায়ের হাতে তাহলে পিটানি খেতে হবে!
-তাহলে তো তোর অনেক সমস্যা! গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে যোগাযোগ করিস কীভাবে?
-স্কুলে গেলেই তো ওর সাথে দেখা হয়!
-তাও তো বটে! তা তোর গার্ল ফ্রেন্ডের ফোন আছে?
-হ্যাঁ, ওর ফোন আছে।
-ও কী তোকে কখনও ওর ফোন ব্যবহার করতে দেয়?
-না, ওর ফোন আমাকে ব্যবহার করতে দেয় না। তাছাড়া আমিও ওর ফোন ব্যবহার করতে চাই না।
-এটা খুবই ভালো কথা। তোর আত্মসম্মান বোধ দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। আচ্ছা, এই বয়সেই প্রেম করছিস, লেখাপড়া করিস না?
-করি। লেখাপড়াও করি।
-হুম! খুব ভালো। এতক্ষণ ধরে তোর সাথে কথা বলছি, তোর নামই জানা হলো না। তোর নাম কি বাবা?
-কুইন্টেরিয়াস!
-অনেক কঠিন নাম, কিন্তু খুব সুন্দর নাম। আর তোর গার্ল ফ্রেন্ডের নাম কি?
-এটা বলা যাবে না!
-কেনো, বলা যাবে না কেনো?
-ও চায় না, ওর কথা অন্য কেউ জানুক।
-বাহ! তোর গার্ল ফ্রেন্ডটা তো দারুণ বুদ্ধিমতী! কিন্তু আমার যে খুব ইচ্ছে করছে অমন একটা বুদ্ধিমতী মেয়ের নাম শুনতে!

আবার ওর মুখে লজ্জা এসে ভর করলো, বললো, তোমাকে শুধু বলি, কাউকে বলে দিও না, ওর নাম অ্যাঞ্জেলিনা!
-ওরে! খুব সুন্দর নাম। তোদের দুজনকেই আমার পছন্দ হয়ে গেছে। অ্যাঞ্জেলিনাকে না দেখেই পছন্দ হয়ে গেছে। তোর মত এমন লক্ষ্মী একটা ছেলের সাথে ও ফ্রেন্ডশীপ করেছে, ও তো অনেক লাকী। কুইন্টেরিয়াস, তোর কাছে তো পয়সা নেই, ভ্যালেন্টাইন'স ডে'তে অ্যাঞ্জেলিনা কে কী উপহার দিবি?

-ভাবতে হবে!

-বেশী ভাবতে হবে না। ওর জন্য একটা কবিতা লিখবি, আর বাগান থেকে একটা সুন্দর গোলাপ তুলে কবিতার সাথে আটকে দিয়ে অ্যাঞ্জেলিনাকে প্রেজেন্ট করবি। দেখবি অ্যানজেলিনা তোর দিকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির মত হাসি দিবে!
-হেই ম্যাম! তুমি কী যে বলো! অনেক মজা করে কথা বলো। হা হা হা হা! আমার হাসি পাচ্ছে।

-হুম! এতক্ষণ মজা করে কথা বলেছি, তোমার সাথে গল্প করে আমার খুব ভালো লেগেছে। তুমি ভাল করে লেখাপড়া করো, বড় হয়ে যেন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারো, তাহলে তোমার অ্যাঞ্জেলিনা জোলিও খুশী হবে, তোমার মাও খুশী হবে।

-হি হি হি হি!! ওকে, ঠিক আছে। বাই!
-বাই বলতে হয় না, সী ইউ বাচ্চা, ভালো থেকো।





দিস ইজ আমেরিকা! ট্যাক্স রিটার্ণ শুরু হতেই ডলারের ডানা গজিয়েছে!

আজ থেকে আমেরিকার বাতাসে ডলারেরা ডানা মেলে উড়তে শুরু করেছে। কারণ সারা বছর দেয় ট্যাক্স রিটার্ন শুরু হয়েছে। আমেরিকার সাধারণ জনগণ বছরের এই সময়টির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ট্যাক্স রিটার্ন থেকে এক থোকে বেশ অনেকটা টাকা হাতে আসে বলেই তাদের এই অপেক্ষা! ধনীদের কথা বাদ দিলাম,  কারণ ধনী মানেই ধনী, সাধারণের চেয়ে অনেক উপরে তাদের অবস্থান। তবে এদেশের ধনীদের সাথে আমাদের দেশের ধনীদের অনেক পার্থক্য থাকলেও মূল পার্থক্য হচ্ছে, এদেশের ধনী ব্যক্তিরা প্রচুর দান-ধ্যান করেন, যেখানে আমাদের দেশের ধনীরা বাড়ীর মালী থেকে শুরু করে গৃহভৃত্যকেও পারলে শোষন করেন। আর এদেশের সাধারণ জনগনের সাথে আমাদের দেশের সাধারণ জনগনের অনেক বেশী পার্থক্য থাকলেও মূল পার্থক্য হচ্ছে, এদেশের সাধারণ মানুষ সরকার থেকে নানারকম সুবিধা পেয়ে থাকে, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ নুন ভাত খেতে গিয়েও চোখে সর্ষে ফুল দেখে।

আমেরিকার  স্বল্প আয়ের জনগণের গল্প বলি। আমি থাকি মিসিসিপিতে। মিসিসিপি হচ্ছে আমেরিকা নামক ধনী দেশটির সবচেয়ে গরীব রাজ্য। এই রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ সরকারী অনুদান গ্রহণ করে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর শতকরা নব্বই ভাগ লোক 'ফুড স্ট্যাম্প' ব্যবহার করে থাকে। ফুডস্ট্যাম্প হচ্ছে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অনুদান। মিসিসিপিতে কিশোরী মায়ের সংখ্যা প্রচুর। সরকার থেকে কিশোরী মায়েরা তাদের বাচ্চার লালন-পালন বাবদ ভাতা পেয়ে থাকে। বাচ্চার খাবার তো ফ্রী আছেই। স্কুল, কলেজে অবৈতনিক শিক্ষা  ব্যবস্থা চালু আছে, গরীবদের জন্য ন্যায্যমূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।

তবে ধনী আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক জায়গায় মিল আছে, উভয় পক্ষকেই  প্রতি পদে পদে রাজ্য সরকার এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ট্যাক্স জমা দিতে হয়। ট্যাক্স ফাঁকী দেয়ার কোন সুযোগ নেই। দোকান থেকে একখানা বিস্কুট কিনলেও যেমন ট্যাক্স দিতে হয়, সাততলা দালান তুলতেও ট্যাক্স দিতে হয়। ধনীরা বছর শেষে দেয় ট্যাক্স থেকে কতটুকু রিটার্ণ পায়, জানিনা ( আমি দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে থেকেও ট্যাক্স রিটার্ণ থেকে খুব বেশী কিছু পাই না, এই নিয়ে আমার মনে চাপা কষ্ট আছে), তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী মনে হয় পুরোটাই ফেরত পায়। আমার পরিচিত জনেরা তো তাই বলে।

আমি লেখাটি শুরু করতে চেয়েছিলাম খুবই হালকা মেজাজে, কিন্তু লেখা শুরু করার পর লেখার গতি কেমন যেন খটমট হয়ে যাচ্ছে।  আর কঠিন কথার চাষ করে লাভ নেই। মূল গল্পে চলে আসি। আজ ওয়ালমার্টে আমার কাজের স্কেজিউল ছিল বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। শর্ট আওয়ার স্কেজিউল বলে এটাকে। বাড়ীতে সারাদিন বেশ আয়েস করে কাটালাম, এরপরে ধীরে সুস্থে ওয়ালমার্টে পৌঁছে দেখি, গাড়ী পার্ক করার জায়গা নেই। এত বেশী গাড়ী ছিল পার্কিং লটে যে আমাকে গাড়ী রাখতে হয়েছে মূল বিল্ডিং থেকে অনেকটা দূরে। বৃষ্টি পড়ছিল অঝোরে, সাথে পিলে চমকানো বজ্রপাত। ছাতা মেলে দিয়ে জোরে পা চালিয়ে ঢুকে গেছি ওয়ালমার্টের ভেতর। দেখি, স্টোরের ভেতর কাস্টমারের ভীড়। এদেশে আবহাওয়া একটু খারাপ হলেই মানুষজন পিলপিল করে ওয়ালমার্টে চলে আসে। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। আমি চট করে  নেম ব্যাজসহ আমার ডিপার্টমেন্টে পৌঁছে দেখি, মানুষজন লাইন দিয়ে টিভি কিনছে। ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্ট আমাদের অয়্যারলেস ডিপার্টমেন্টের পাশাপাশি বলেই মানুষজনের আনাগোনা বেশী নজরে আসে। আজ কেন এত মানুষ, সেটা বুঝতে পারিনি। এক ভদ্রমহিলা হাতে টুকিটাকী জিনিস নিয়ে আমার রেজিস্টারের কাছে এসে খুব বিনয়ের সাথেই জিজ্ঞেস করলো,

" আমি খুব অল্প দুই একটা জিনিস হাতে নিয়ে ঘুরছি, দাম দিতে গেলে বিরাট লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, তুমি কী দয়া করে তোমার এখানে আমার এই কয়েকটি জিনিস চেক আউট করতে দিবে?

-অবশ্যই করে দিচ্ছি। আজকে এত ভীড় কেন? কোন উপলক্ষ্য আছে?
-ট্যাক্স রিটার্ন শুরু হয়েছে।  এরা সবাই আজ এক থোকে  কিছু  টাকা পেয়েছে। এখনই খরচ না করতে পারলে শান্তি লাগছে না মনে!
-টাকাটা তো পেয়েছে যে কোন সময় খরচ করার জন্য। আজ এমন বৃষ্টির মধ্যে কেউ টিভি, সেল ফোন, ডিভিডি প্লেয়ার কিনতে আসে?

-" মিসিসিপিবাসীর ডলারে পাখা গজিয়েছে, এখন ডানা মেলে উড়ছে!  শুধু কী বৃষ্টি! কী জোরে জোরে বজ্রপাত হচ্ছে"!

-তাইতো দেখছি, আজ কত ফোন যে বিক্রী হলো, তার হিসেব নেই!

-হুম!  নিত্য নতুন ফোন কিনবে, গাড়ী ড্রাইভ করার সময় টেক্সট করায় ব্যস্ত থাকবে আর দিবে একটা অ্যাকসিডেন্ট বাঁধিয়ে! এইসব ফ্যান্সী জিনিস প্রতিদিনই মডেল চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে, এমন প্রতিযোগীতা করে কেনার দরকারটা কী বাপু!

-হা হা হা! তুমি তো দেখছি আমার মত করে কথা বলছো। আমি তো খুব হিসেবী, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাউকে খরচ করতে দেখলে কেমন যেনো অস্বস্তি লাগে!

-দিস ইজ আমেরিকা! এখানে বেহিসেবী জীবন-যাপনেই মানুষ আনন্দ পায়। তুমি হিসেবী আছ, ভালো আছো। আমি অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছি, তাই প্রয়োজনের বাইরে খরচ করিনা। আমার ছেলেও আজ ট্যাক্স রিটার্ণের টাকা হাতে পেয়েছে, সে তখনই টাকা খরচ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। দিয়েছি এক ধমক, বলেছি, টাকা পালিয়ে যাবে না, টাকা হাতে রাখো, জমে থাকা বকেয়া বিল শোধ করে দিবে এই টাকায়।

-বাহ! খুব ভালো কথা বলেছো। ঠিক আছে, আবার দেখা হবে তোমার সাথে।

মহিলা বিদায় নেয়ার আগেই আমার রেজিস্টারের ফোন বেজে উঠলো। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেয়েলী কন্ঠে জানতে চাইল,

" আচ্ছা শোন, আমি কয়েকদিন আগে তোমাদের স্টোর থেকে ফোন সার্ভিস নিয়েছিলাম। তখন আমি এলজি অপটিমাস এল৯ নিয়েছি। ফোনে লেখা ছিল ৪জি নেটওয়ার্ক, কিন্তু আসলে এটা ২জি নেটওয়ার্ক। আমি দুই দিন ধরে একবার স্টার্কভিল যাচ্ছি, আরেকবার ওয়েস্ট পয়েন্ট যাচ্ছি, কিন্তু কারো কাছে গ্যালাক্সী ২ বা গ্যালাক্সী ৩ পাচ্ছি না।"

এত বেশী কর্কশ আর হড়বড় করে কথাগুলো বলছিল মেয়েটি যে আমি কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবুও আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লাম, আমাদের স্টোরে গ্যালাক্সী ২ এবং থ্রী দুটোই আছে।

-আছে? তোমাদের কাছে গ্যালাক্সী থ্রী আছে? আমি এখনই রওনা হচ্ছি।

-আজ  না এলে হয় না? বাইরে তো খুব বৃষ্টি হচ্ছে।

-না, আমি আজকেই চাই ফোন।

অপেক্ষা করতে থাকলাম সেই কর্কশকন্ঠী'র জন্য। এক ফাঁকে খেয়াল করলাম, এতটুকু সময়ের মধ্যেই ৫৫-৬০ ইঞ্চি স্ক্রিণ সাইজের পাঁচখানা টিভি বিক্রী হয়ে গেলো! একেকটা জিনিসের কী দাম! কিন্তু এরা দেখি পকেট থেকে ডলারের গোছা বের করছে আর দাম দিচ্ছে। কর্কশকন্ঠী এসে পৌঁছার আগেই এক মা এলেন তার কিশোরী কন্যাকে নিয়ে। কন্যা একটি 'আইপ্যাড' কিনতে চাইছে, সাথে ২০০ ডলার দামের 'হেডফোন' ও কিনতে চাইছে। ৭৯৯ ডলার দামের 'আইপ্যাড' আর ২০০ ডলার দামের 'হেডফোন হাতে পেয়ে কন্যার মুখে হাসি ফুটতে দেখে আমি মনে মনে প্রমাদ গুনছিলাম। ভাবছিলাম, মেয়েদের তো এদেশে এনে বড় করছি, দু'জন বড় হয়ে গেছে, কিন্তু ছোটজন তো এখন বড় হচ্ছে। কোনদিন না জানি আমার কাছেও এসে আবদার করে , " আমার সব বন্ধুদের সবকিছু আছে, আমারই শুধু নেই"!

মা'কে জিজ্ঞেস করলাম, " আচ্ছা, ওতো এখনও অনেক ছোট, এখনই ওকে এত দামের জিনিস কিনে দিচ্ছ কেন!

-ওর অনেক শখ ছিল, ওর অন্য কাজিনের আছে আইপ্যাড, তাই ওকেও দিলাম কিনে।


হন্তদন্ত হয়ে সেই কর্কশকন্ঠী এসে উপস্থিত। গলার স্বর আর রূঢ় আচরণের সাথে মেয়েটির চেহারার কোন মিল নেই। চেহারাখানি ভারী মিষ্টি। সে কোলে করে এনেছে বছর খানেকের এক বাচ্চা, আর পাশে করে নিয়ে এসেছে ১০-১২ বছরের বালিকা। তার উপস্থিতিতে বুঝতে পেরেছি, সে কয়েকদিন আগে  ৩৫০ ডলার দামের এলজি অপটিমাস পেয়েছিল মাত্র ৯৭ পয়সায়। আর আজ সে সেই ফোন পালটে ৬০০ ডলার মূল্যের স্যামসাং গ্যালাক্সী থ্রী কিনতে চাইছে ৯৮ ডলারে। তা কোন রঙ পছন্দ, জানতে চাইলে সে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। একবার বলে , গ্যালাক্সী থ্রী দাও, আবার বলে গ্যালাক্সী টু দাও। আগের ফোনে সমস্যা  হলো, ওটা নাকি টু জি ফোন।  ইন্টারনেট নাকি চলেই না। তাই এখন ও ফোর জী ফোন চায়। ওকে আশ্বস্ত করে আমার কাজ শুরু করতে যাব, কর্কশকন্ঠী তার মত পালটে এবার 'স্যামসাং গ্যালাক্সী নোট ২  ৪জি কিনতে চাইলো। ৭০০ ডলার দামের ফোন ২৭৮ ডলারের বিনিময়ে। অথচ মেয়েটির চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল না যে সে আদৌ এত দামী ফোনের উপযুক্ত! শুধুমাত্র তার হাতে টাকা আছে এবং এই ফোনটিই সবচেয়ে দামী, শুধু সেজন্য সে এই ফোন কিনতে চাইছে। আমি যখন ফোন অ্যাক্টিভেট করছিলাম, কর্কশকন্ঠী তার সাথে আসা বালিকার সাথে কথা কাটাকাটি করছিল। বালিকা জানতে চেয়েছে,

" এতগুলো টাকা দিয়ে তুমি এই ফোন কেন কিনছ?"
-এগুলো আমার টাকা, আমি ট্যাক্স রিটার্ণে পেয়েছি, তাই আমি কিনছি।
-অন্যটা কেনো, আরও কম দামের ফোন আছে তো!
-না, আমি এটাই কিনবো। আমার টাকা আমি নিজের ইচ্ছেমত খরচ করবো।
-কিন্তু তুমি তো একটার দাম দিয়ে দুইটা ফোন কিনতে পারো। আমাকেও একটা দাও।
-আরে যা যা!! আমার অনেক শখ ছিল, জেনেটার মত আইফোন কেনার, এখন আমি আইফোনের চেয়েও দামী ফোন কিনে ফেলেছি।

ওদের দু'জনের কথোপকথন শুনে মনটা কেন যে ভারী হয়ে এলো! আমি সব সময় খেয়াল করেছি, অনেকেই ফোন কিনে ঝোঁকের মাথায়। হাই টেকনোলজীর ফোন দিয়ে ওরা কী করে! যে সকল ফোন শুধুমাত্র প্রফেশনালদের জন্য প্রযোজ্য, সেই ফোন যদি ম্যাকডোনাল্ড'স এর 'বার্গার ভাজুনীর' হাতে শোভা পায়, ভালো লাগে? আমার সামনে দাঁড়ানো কর্কশকন্ঠী এই গ্যালাক্সী নোট দিয়ে কী করবে, তা ঈশ্বরই জানেন। কতগুলো পয়সা ফেলে দিয়ে যাচ্ছে, হাতে রেখে দিলে কোলের বাচ্চাটার জন্য জমিয়ে রাখতে পারতো! কখন কোন প্রয়োজনে লাগে, তার ঠিক আছে?


ফোন হাতে ওরা বিদেয় হয়ে গেলো, ততক্ষণে ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টে আরও কয়েকটি টিভি, এক্সবক্স ৩৬০, ব্লু রে ডিভিডি প্লেয়ার, আইপ্যাড, আইপড, নুক সহ বেশ কিছু প্রচন্ড দামী আইটেম বিক্রি হয়ে গেছে। কাস্টমারের ভীড় একটু কমতেই পাশের সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম,

" আচ্ছা, ট্যাক্স রিটার্নে যে টাকা পাওয়া যায়, এটা তো নিজেরই টাকা, আকাশ থেকে তো আর ঝরে পড়ছে না, নিজের টাকা এভাবে হামলে পড়ে খরচ করার কী দরকার বলো তো! টাকাগুলো জমিয়ে রাখলে পরবর্তীতে কত কাজে লাগতে পারে!

সহকর্মীর উত্তরঃ " দিস  ইজ  আমেরিকা!  এদেশে বর্তমানটুকুই  সত্যি,  বাকী  সব  মিথ্যে!

Monday, February 11, 2013

এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে!!

এতদিনে বিএনপি মুখ খুলেছে! আর মুখ খুলেই শুরু করেছে প্রজন্ম চত্বরকে ঘিরে নানা সমালোচনা! শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনে যখন দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত দেশপ্রেমিক বাঙ্গালী উজ্জীবিত, যে মুহূর্তে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সূচিত শাহবাগ আন্দোলনের মাত্রা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে –কানাচে, ব্লগে-ফেসবুকে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি নতুন ধুঁয়া তুলেছে এই বলে যে, শাহবাগ আন্দোলন ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক সাজানো নাটক! পত্রিকান্তরে এমন সংবাদ পাঠ করে হাসি পেয়েছে!

রাজনীতি করলে বুঝি এমন বক্তব্যই দিতে হয়! বলিহারী যাই! বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীগণ কী পত্রিকা পাঠ করেন না? টিভি সংবাদ দেখেন না? উনারা দেশে বসে থেকেও সঠিক খবর পাচ্ছেন না, আর আমরা প্রবাসে বসেই আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তের সংবাদ পাচ্ছি, আন্দোলনে সংহতি জানাতে গিয়ে তরুণ-তরুণীদের প্রতিবাদের মুখে সরকারী দলের মন্ত্রী, আওয়ামীলীগের নেতাদের শাহবাগ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে, সে সংবাদও সাথে সাথেই পেয়েছি। রাগ আর ক্ষোভে ফেটে পড়া তরুণদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ মন্ত্রীদের দিকে জলের বোতল ছুঁড়ে মেরেছে, অপ্রত্যাশিত রায়ে ক্ষুব্ধ, হতাশ জনগণের এহেন আচরণে কোন মন্ত্রী বা সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ করেননি, নীরবে মাথা নীচু করে সমাবেশ স্থল থেকে বেরিয়ে এসেছেন, এ খবরও ঘরে বসে থেকেই পেয়েছি। একবারের জন্যও মনে হয় নি, এগুলো সরকারের সাজানো নাটক! অথচ বিরোধী দল থেকে ক্রমাগত বলা হচ্ছে, এ সবই সরকারের সাজানো নাটক!

অথচ আন্দোলনরত জনগণ একই কথা বলে যাচ্ছেন, শাহবাগ আন্দোলনের সাথে কোন রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা নেই! এ আন্দোলন যুদ্ধপরাধী, মানবতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে সচেতন তারুণ্যের প্রতিবাদ! প্রতি মুহূর্তে তারা দেশের আপামর জনগণের প্রতি আহবান জানাচ্ছে প্রজন্ম চত্বরে এসে যোগ দেয়ার জন্য। অনলাইন অ্যাকটিভিস্টরা কত নতুন নতুন আইডিয়া উদ্ভাবন করে মানবতা বিরোধীদের বিরূদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে, ব্লগাররা প্রতি মুহূর্তে তাদের ক্ষুরধার বক্তব্য ব্লগে পোস্ট করে চলেছে, আর যুদ্ধাপরাধীদের সকল দায় স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে নিয়ে নিচ্ছে বিএনপি!! বিভিন্ন টক শো, সভা সেমিনারে তারা প্রতিনিয়তই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, যুদ্ধাপরাধীদের আড়াল করে। তাঁরা বুঝতেই পারছেন না অথবা বুঝতে চাইছেনও না, দেশের হাওয়া পালটে গেছে। এখন হাল তরুণদের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের দুই প্রজন্ম পরের তরুণ এরা, চিন্তা চেতনায় অনেক আধুনিক, মন ও মনণে অসাম্প্রদায়িক, তাদের মনের কথা পড়তে জানলে বিএনপির নেতা নেত্রীরা কখনওই শাহবাগ আন্দোলনকে সরকারের ‘সাজানো নাটক’ বলে উপহাস করতে পারতেন না। তারুণ্য কারো কেনা গোলাম হতে চায় না। ’৬৯ এর আন্দোলনকে ছাত্ররাই ’৭১ এ এগিয়ে নিয়ে গেছে, ’৬৯ এর আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতা তোফায়েল আহমেদ এখনও বেঁচে আছেন, উনি বলতে পারবেন শাহবাগ আন্দোলনের তারুণ্য কী চায়! আজকের পত্রিকায় পড়েছি, তোফায়েল আহমেদ আজকের তরুণদের আন্দোলন দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছেন, আবেগাপ্লুত হয়েছেন। উনি বলেছেন, আজকের আন্দোলন দেখে ’৬৯ এর কথা মনে পড়ছে। ’৬৯ এর ছাত্র আন্দোলনের পথ বেয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সেদিনের তরুণ সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তারা সমাজ, সংসারের দিকে ফিরেও তাকায় নি, দেশের জন্য হাসিমুখে প্রাণ উৎসর্গ করেছিল! ’৯০ এর আন্দোলনে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল? তৎকালীণ ছাত্র সমাজ, তৎকালীণ যুবসমাজ। একজন নূর হোসেন বা একজন ডাঃ মিলন, একজন দীপালী সাহা অথবা একজন রাউফুন বসুনিয়া, একজন সেলিম অথবা একজন দেলোয়ার, কেউই সামরিক সরকারের সাজানো নাটকের পাত্র-পাত্রী ছিলেন না! সেদিনের সেই ছাত্র আন্দোলণের পথ বেয়েই আজকের গনতন্ত্র এসেছে। তরুণদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদকে এতদিন পর ‘সাজানো নাটক’ বলার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে!

গত দশদিন চুপটি করে ছিলেন বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ, হয়তো ভেবেছিলেন, দুই তিনদিনের মামলা, চুপসে যাবে এমনিতেই। কিন্তু মামলা গড়িয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে, সরকারের সাজানো নাটকে অভিনেতা অভিনেত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, সাধারণ জনগণ এসে যোগ দিচ্ছে! এখন তো আর চুপ করে থেকে লাভ নেই! তাই মুখ খুলেছে বিএনপি নেতৃবৃন্দ। দল থেকে বলা হয়েছে, শাহবাগের বিক্ষোভরত জনগন নাকি পুলিশী প্রটেকশানে তরুণ-তরুণীদের জমায়েত! আসলেই কী তাই? যদি তাই হয়, তাহলে বিএনপি’র তরুণ-তরুণীরা কেন সরকারের দেয়া এই সুবিধাটুকু গ্রহণ করছে না! সরকারকে নাকানী-চুবানী দেয়ার এই তো বিরাট সুযোগ! প্রজন্ম-মঞ্চে যে কেউ শ্লোগান দিচ্ছে, লাকী, মুক্তা, সবিতা নামের ছাত্রীরা সকলের নয়নমনি হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রজন্ম মঞ্চ, মঞ্চে যে কেউ বক্তব্য রাখতে পারছে, শুধু একটিই শর্ত, মঞ্চে আসার পূর্বে অবশ্যই রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যাজ খুলে আসতে হবে। রাজনৈতিক ব্যাজ খুলে রেখে বিএনপির তরুণ-তরুণীরাও প্রজন্ম মঞ্চে উঠে সকলের সাথে গলা মিলিয়ে শ্লোগান দিক, ‘কাদের মোল্লার ফাঁসী চাই! ‘গোলাম আজমের ফাঁসী চাই’ ‘রাজাকার রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’! তারা এই সুযোগে আরও নতুন নতুন শ্লোগান দিতে পারে, সরকারী কোন ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। এখনই তো সময়, এমন গণজাগরণ কী আর সহসা হবে! বিএনপির তরুণ-তরুণীরা যদি মঞ্চে উঠে সকলের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে, তাহলেই তো সরকার দলীয় সুযোগসন্ধানীর দল পিছু হটে যেতে বাধ্য হবে!

যে কাজ করলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা যায়, এই মুহূর্তে সেই কাজটিই করা উচিত। নিয়ত ভালো থাকলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধা কোথায়! আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো গতকাল সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। উনি দ্বিধাহীন চিত্তে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন,
“ মন চায় শাহবাগে ছুটে যেতে। স্বাধীনতার চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য বার বার বাধার মুখে পড়েছি। কখনও গুলি, কখনও গ্রেনেডের মুখে পড়েছি। কিন্তু কখনও হাল ছাড়িনি। তরুণ প্রজন্ম এখন স্বাধীনতার চেতণায় উদ্বুদ্ব। মানবতা বিরোধী অপরাধী কাদের মোল্লার রায়ে এদেশের তরুণ সমাজ জেগে উঠেছে। সারা দেশে তারা অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি করেছে। তরুণ সমাজ জেগেছে বলেই সারা দেশের মানুষ জেগেছে। সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে, যত বাধা বিপত্তি আসুক, বিচার হবেই। বিচার প্রক্রিয়ায় কোন ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা হবে। সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই হবে। এই জাগ্রত তরুণসমাজকে দেখে আজ মনে হচ্ছে, শান্তিতে মরতে পারবো। এই তরুণরাই দেশের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। শাহবাগ নয়, এই চত্বরের নাম হতে পারে, ‘স্বাধীনতার তরুণ প্রজন্ম স্কয়্যার’”। এমনই আরও আবেগময় বক্তব্য উনি দিয়েছেন যা থেকে দেশ ও দেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে উনার স্পষ্ট ও স্বচ্ছ মতামত পাওয়া যায়।



প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এমনিতেই খুব আবেগপ্রবণ মানুষ, বিরোধী পক্ষ সব সময় শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটু কাটব্য করে থাকেন, ‘বেশী কথা বলেন’ বলে বিদ্রূপ করতেও ছাড়েন না। কিন্তু বেশী কথা বলার একটি ভালো দিক আছে। যিনি বেশী কথা বলেন, তাঁর অন্তরে কিছুই গোপন থাকে না। তাঁকে খুব সহজেই পড়ে ফেলা যায়। গালে আঙুল ঠেকিয়ে ‘স্পীকটি নট’ হয়ে বসে থাকা মানুষকে চেনা বড়ই কঠিন। তবে গত দুইদিনের সংবাদপত্র পাঠ করে এবং আশপাশের সব কিছু দেখে শুনে মনে হচ্ছে, বিরোধী দলের মধ্যেও ‘বেশী কথা বলা’র প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সকলে মিলে অন্তরের যত কথা, সব গলগল করে বলে দিচ্ছেন। টকশো, সভা সেমিনারে তাদের দেয়া বক্তব্য শুনে আমাদেরও সুবিধা হয়েছে, উনাদের নিয়ত পড়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না।

মাত্র একদিন আগেই ব্যক্তি হান্নান শাহ বলেছেন, সরকার শাহবাগের আন্দোলনকারীদের পুলিশী প্রটেকশান দিচ্ছে আর জামায়াতী দেখলে গুলী করার নির্দেশ দিচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার টাকায় নাকি এই নাটক সাজানো হয়েছে। উনি আরও বলেছেন, শাহবাগ চত্বরের মাত্র একশ গজ দূরে ‘গোলাম আযম’ কে রাখা হয়েছে, পঞ্চাশ গজ দূরে ‘পুলিশ কন্ট্রোল রুম’ আছে, দুই পক্ষকেই নাকি নাটক দেখানো হচ্ছে। বিএনপি থেকে দাবী করা হচ্ছে, এ সবই ভারতের কারসাজী, ভারত থেকে সকল কলকাঠি নাড়ানো হচ্ছে! হাসি পায়, মাত্র কিছুদিন আগেই বেগম জিয়া ভারত জয় করে এসেছেন, দেশে ফিরে ভারতের পক্ষে বেশ কথা বলেছেন। আর এখন দেখছি দাবার দান উলটে গেছে! শুরু হয়ে গেছে ‘ভারত জুজুর ভয়’। তা বর্তমান সরকার না হয় ভারতের তাঁবেদার, ‘র’ এর টাকায় এইসব নাটক করছেন, আপনারা কেনো জামায়াতের সৌদি বা পাকিস্তানী অর্থায়নে পাল্টা নাটক সাজাতে পারছেন না! বিএনপির প্রথম সারির এক নেতা বলেছেন, জামায়াত নেতাদের বিচার করার আগে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিচার করতে হবে। উনাদের কাছে নাকি প্রচুর তথ্য প্রমাণ আছে যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীণ সময়ে পাকি সরকারের দোসর ছিলেন! তা আমাদের কথা হচ্ছে, হাতে এত প্রমান, স্বাক্ষ্য নিয়ে বসে আছেন কেন? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে মাত্র, এখনও ইচ্ছে করলেই তথ্য প্রমাণাদিসহ ট্রাইব্যুনালের কাছে হাজির হতেই পারেন। অভিযোগ তো কোন রাম -রহিমের বিরুদ্ধে নয়, দেশের সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে! ট্রাইব্যুনালে কোন সহযোগীতা না পেলে তথ্য প্রমাণ নিয়ে শাহবাগ মঞ্চে হাজির হোন, দেখবেন তরুণেরা আপনাদেরকে মাথায় করে নাচবে!

আরেকজন মানুষ আছেন, একসময় বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে বঙ্গবীর উপাধী দিয়েছিল, সেদিনের সেই বঙ্গবীরও আজকে অচেনা ভাষায় কথা বলেন! উনি ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে। একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য তরুণেরা আজ শাহবাগে মিলিত হয়েছে, তাদের আকাংক্ষার প্রতি ন্যুনতম সম্মান না দেখিয়ে উনি বিপরীত চেতণার পক্ষে কথা বলছেন!! শেম! শেম! মুক্তিযুদ্ধের এক অবিসংবাদিত বীরের মুখে এ কী কথা শুনছি আজ! উনি নিজে শাহবাগের মঞ্চে না গিয়ে দূর থেকে কত কথাই বলে যাচ্ছেন! এখন উনি বলছেন, টাঙ্গাইলে অনেক যুদ্ধাপরাধী আছে, উনি বলছেনই শুধু, নিজে দায়িত্ব নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন নি। উনিও ধরেই নিয়েছেন, এইসব কাজ একা আওয়ামী সরকারকেই করতে হবে। শেখ হাসিনা সরকারকেই যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিতে হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সকল ক্রেডিট আওয়ামীলীগকেই দিতে হবে! গতকাল অনলাইন ভিডিওতে দেখালাম, ’৭১ টিভিতে (ভুলও হতে পারে) অনুষ্ঠিত এক টক শো’তে বিএনপির এক নেতা বলছেন, বঙ্গবন্ধু ২৮ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, বংগবন্ধু বেঁচে থাকলে নাকি প্রজন্ম মঞ্চের আন্দোলন দেখে লজ্জা পেতেন! এই আন্দোলন থামাতে নির্দেশ দিতেন! নোংরামী করারও একটা সীমা থাকে। এই ধরনের টকারদের কেন যে টিভিতে আনা হয়, কে জানে! ব্লগাধিপতি অমি রহমান পিয়াল যখন বললেন, “ এমন একটি নাটক আপনারাও সাজিয়ে দেখান”, এর জবাবে বিএনপি নেতা মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিলেন। ব্যারিষ্টার তানিয়া আমীরের কথার জবাবেও আর কোন কথা উনি বলেননি।

যদিও শাহবাগের চলমান আন্দোলন সম্পর্কে দশদিন পর বিএনপি তাঁদের বক্তব্য দিয়েছেন, যদিও বলেছেন, তরুণদের দাবীর যৌক্তিকতা তাঁরা মানেন, যদিও তাঁরা বলছেন, এই আন্দোলনে ‘নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবী তোলা হোক, যদিও তারা বলছেন, এই আন্দোলনে ‘ফেলানী হত্যার বিচার দাবী করা হোক, যদিও তাঁরা বলছেন, এই আন্দোলনে লগী বৈঠার বিচার দাবী করা হোক, যদিও তারা তাদের উক্ত দাবীগুলোকেও যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য মনে করেন, তারপরেও বলবো, আপনারাও আসুন, প্রজন্ম মঞ্চে এসে যোগ দিন। মঞ্চে দাঁড়িয়েই আপনাদের দাবীর সপক্ষে আওয়াজ তুলুন। তবে সাবধান! জামায়াত বা সমমনা মৌলবাদীদের পক্ষে কিছু বলতে যাবেন না, তাহলে আর তাল সামলাতে পারবেন না। উজ্জীবিত তারুণ্যের জোয়ারে ভেসে যেতে হবে!

Thursday, February 7, 2013

সাত ঘন্টার গল্পসংগ্রহ থেকে!

আমি গত সাত বছর ধরে ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারে চাকুরী করছি, কোন রকম ক্লান্তি বা অবসাদ আমাকে গ্রাস করেনি। ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টার মানেই আলাদা এক পৃথিবী।এই পৃথিবীতে প্রতিদিন কত রকমের মানুষ যে আসে, তার ইয়ত্তা নেই। কেউ ভালো করে খেয়ালও করেনা, কারা আসে, কারা যায়! আমিও খেয়াল করে দেখিনি এতদিন। গত বৃহস্পতিবার  আমার কাজের স্কেজিউল ছিল বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ইদানিং আমার কাজে যেতে আর ভালো লাগে না, একঘেঁয়ে লাগে। আমি চাকুরী করি কানেকশান সেন্টারে। একই কাজ, একই কথা, একই ঊদ্দেশ্যের মানুষজনের আনাগোনা চলে সারাদিন। কাজে নতুনত্ব কিছু নেই।

এই বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ৩১শে জানুয়ারী আমার মনটা খুব ভালো ছিল। তাই কাজে গিয়েছিলাম হালকা মনে। কাজের স্কেজিউল নিয়ে খুব টানাপোড়েন চলছিল, ঘরে উত্তম কুমার বুঝিয়েছে, কোন কিছু নিয়েই অযথা স্ট্রেস না নিতে। কাজকর্ম হালকা মন নিয়ে করলে নাকি কাজ কখনও একঘেঁয়ে মনে হয় না। আমি সেদিন হালকা মন নিয়ে গেছি এবং ঠিক করেছি, সাত ঘন্টায় কী ধরণের মানুষের সাথে আমার ইন্টার‍্যাকশান হয়, তার একটি হিসেব রাখা। এটা ভাবার সাথে সাথে মন খুব চনমনে হয়ে উঠলো। এক্সপেরিমেন্ট শুরু হলো একটি ফোন কলের মাধ্যমেঃ

ইস্যু এক)  মহিলা কন্ঠঃ হ্যালো, আমি  আইফোন এক্সপার্টএর সাথে কথা বলতে চাই।
   আমিঃ আমরা ফোন সার্ভিস বিক্রী করি, ফোন বিক্রী করি, কেউ ফোন এক্সপার্ট নই। তারপরেও শুনি, কী জানতে চাইছো?

মহিলাঃ তোমরা কি আইফোনের 'স্লীম কার্ড' বিক্রী করো?

আমিঃ না, আমরা আলাদা করে সিম কার্ড বিক্রী করি না।

মহিলাঃ আচ্ছা, আমি শুনেছি, যদি ওয়ালমার্ট ক্রেডিট কার্ডের জন্য অ্যাপ্লাই করি, আর অ্যাপ্রুভড হই, তাহলে নাকি আই ফোন একেবারে ফ্রী পাওয়া যাবে?

আমিঃ হোয়াট!!!!!!!!!!!

মহিলাঃ হ্যাঁ, যদি ক্রেডিট কার্ডের জন্য আপ্রুভড হই, তাহলে নাকি আইফোন ফ্রী পাওয়া যাবে।

(ফোনের উপরেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই এক যন্ত্রণা! পাবলিক শুধু 'ফ্রী' ফোনের খোঁজ করে। যত দোষ নন্দ ঘোষ! শুধু বাঙ্গালীদের বদনাম, বাঙ্গালী নাকি 'ফ্রী' পেলে বিষও খেতে চায়! হুঃ আর তোমরা আমেরিকানরা কি? সাধু তোমরা!)

বললাম, ম্যাডাম, তুমি কার কাছ থেকে এই অদ্ভুত তথ্য সংগ্রহ করেছো জানিনা, তবে ৭০০ ডলার দামের ফোন ফ্রী পাওয়া যায়, এটা তোমার কাছে প্রথম শুনলাম।

মহিলাঃ কোন আই ফোনের দাম ৭০০ ডলার?

 আমিঃ আই ফোন ৫

মহিলাঃ আই ফোন ৪ এর দাম কত?

(মনে মনে বলি, দাম যতই হোক, তুমি তো ফ্রী চেয়েছো, এখন এত প্যাঁচাল পারছো কেনো বাপু?)

বললাম, আই ফোন ৪ এর দাম ৪৯৯ ডলার।

আমি যদি ক্রেডিট কার্ড পাই, তাহলে আইফোন ৪ কী ফ্রী পাবো?

(মনে মনে বলি, আরে বেটি, ক্রেডিট কার্ডের জন্য আগে অ্যাপ্লাই কর, দ্যাখ অ্যাপ্রুভড হয় কিনা, তারপরেতো দামের কথা ভাববি, 'গাছে রইছে আম, বাপে পুতে খাম' অবস্থা)

মুখে বললাম, ম্যাডাম শোন, মনোযোগ দিয়ে শোন, আগে তোমাকে আমাদের স্টোরে আসতে হবে, ক্রেডিট কার্ড নিয়ে কাজ করে যারা, তাদের সাথে দেখা করবে। ওখান থেকে অ্যাপ্রুভড লেটার পেলে তবেই আমাদের এখানে আসবে। তোমার ক্রেডিট লিমিটের উপর নির্ভর করবে, ফোনটার জন্য তোমাকে আগাম কত দিতে হবে। বুঝাতে পারছি? ফোন ফ্রী নয়, ফোন ডিস্কাউন্টও প্রাইসেও নয়, রেগুলার প্রাইসে কিনবে, তবে ক্রেডিট স্কোর ভালো হলে বিনা সুদে মাসে মাসে কিস্তিতে শোধ করতে পারবে। নগদ কিছু দিতে হবে না। এটাকেই তুমি ধরে নিয়েছো যে ফোন ফ্রী পাবে। ফ্রী পাবে না,  এক বা দুই বছরের কিস্তিতে শোধ করবে। সবার আগে তোমাকে ক্রেডিট  অ্যাপ্রুভ্যাল সংগ্রহ করতে হবে। এবং ক্রেডিট অ্যাপ্রুভ্যাল ওয়ালমার্ট দেয় না, ক্রেডিট ব্যুরো থেকে আসে। আমি কি বুঝাতে পেরেছি?

মহিলাঃ ক্রেডিট লিমিট কত থাকে?

(আর সহ্য করা যায় না, এই মহিলা কিছুই বুঝে নাই, শুধু ফ্রী 'আই ফোন ' পাওয়া যাবে শুনেই এক লাফ দিয়েছে)। বললাম, ম্যাডাম, আমি তো ক্রেডিট কার্ড সেকশানে কাজ করি না, তাই আমার ধারণা নেই। তুমি স্টোরে আসো, এসে সংশ্লিষ্ট এসোসিয়েটের সাথে কথা বলো। সব কাজ শেষ হলে আমার কাছে এসো, আমি তখন কথা বলবো। এখন রাখি, হ্যাভ এ গুড ডে!




ইস্যু দুইঃ  কাস্টমার মা-মেয়ে। এসেছে 'স্ট্রেইট টক' নামের প্রিপেইড ফোন কিনতে। দুজনকে দেখেই বুঝা যায়, ধনীর দুলালী। মা জানতে চাইলোঃ

আমি 'গ্যালাক্সী এস টু' ফোন কিনতে চাই। সাথে আনলিমিটেড প্ল্যান। ফোনের দাম কত?
- ফোনের দাম ২৯৯ ডলার। প্ল্যান কার্ড ৪৫ ডলার।

-ইয়ে, মানে ফোনটা ভালো হবে তো?
-খুব ভালো।

-না, মানে বলছিলাম কি, খারাপ বলে কী কেউ ফোন রিটার্ণ করে দেয়?

আমার একটু দুষ্টামী করতে ইচ্ছে হলো, বললাম, তা কেউ কেউ তো ফেরৎ দিয়ে যায়।

মহিলার ফর্সা মুখে ভয়ের ছায়া দেখা গেলো। বললো, বেশী মানুষ ফেরত দেয় নাকি কম মানুষ?

-বলা মুশকিল। আমি তো সব সময় ফ্লোরে থাকিনা, তাই সঠিক হিসেব দিতে পারবো না। যেমন ধরো, আমার কাছে দু'জন ফেরত নিয়ে এলো, সেটা আমি জানি, অন্যের কাছে কেউ ফেরত নিয়ে এলে তো আমি জানবো না, তাই ঠিক বলতে পারছিনা।

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মা হতাশ হয়ে স্বগতোক্তি করলো, তাহলে কী হবে!

ঘাবড়ে গেছে, থাক এবার আমার বিক্রেতাসুলভ আচরণ করা উচিৎ।
ওদেরকে খুশী করার জন্য বললাম, এই ফোনের দাম গত সপ্তাহেই  ছিল ৩৪৯ ডলার। তিন দিন আগেই দাম কমে ২৯৯ ডলার হয়েছে।

আমার এই কথায় হিতে বিপরীত হলো। মা বললো,

-ভাল জিনিসের তো দাম কমার কথা নয়! ভালো জিনিসের দাম বাড়ে! তার মানে কি? এই ফোনটার রেপ্যুটেশান কেমন?

এবার আমার বিরক্ত হবার পালা। মনে মনে ঠিকই বিরক্ত হয়েছি, কিন্তু বাইরে থেকে তা বুঝতে দেইনি। বললাম,

- আচ্ছা, তুমি আমার কাছে এসে সরাসরি 'গ্যালাক্সী টু' চেয়েছো কেন? নিশ্চয়ই অন্যের মুখে এই ফোনের সুবিধা সম্পর্কে জেনেই এসেছো। যদি না জানতে, তাহলে আমাকেই জিজ্ঞেস করতে, কোন ফোনটা বেশী ভাল। তাছাড়া এই ফোনটার দাম অন্য সব প্রিপেইড ফোনের চেয়ে অনেক বেশী। কাজেই ভালো না হলে কী এত দাম হতো!

-না দেখো, কিছু মনে করো না, আমি একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের। তাই জানতে চেয়েছিলাম।

(মনে মনে বলি, তুমি অবশ্যই খুঁতখুঁতে টাইপের। চেহারা সুন্দর, বড়লোকের বৌ, খুঁতখুঁতে হবে না তো কী করবে! খেয়েদেয়ে তো আর কোন কাজ নেই তোমার, সব কিছু নিয়ে খুঁতখুঁত করো)। মুখে বললাম,

- দেখো, এত দাম দিয়ে খুব বেশী মানুষ গ্যালাক্সী টু কিনে না। তাই ফেরত দেয়ার প্রশ্নও আসেনা। আরেকটি কথা, আমাদের ঊদ্দেশ্য প্রোডাক্ট সেল করা, আমরা তো চাইবো প্রোডাক্ট সেল করার জন্য সম্ভাব্য সব রকম সুযোগ সুবিধা খুঁজে বের করতে। গ্রাহকের সুবিধার জন্যই ফোনের দাম কমানো হয়েছে। তুমি নিশ্চিন্ত মনে ফোন কিনতে পারো। তাছাড়া, আমাদের রিটার্ণ পলিসিতে আছে, আগামী পনের দিনের মধ্যে যে কোন সময় ফোন ফেরত দিয়ে যেতে পারবে। ব্যবহার করে দেখো।

এতকথা বলার পর বোধ হয় সুন্দরীর মনের ভয় কিছুটা কেটেছে, শেষ পর্যন্ত মা আর মেয়ে, দুজনের জন্য ২৯৯ ডলার দামের দুটি ফোন কিনে বাড়ীর পথে পা বাড়িয়েছে।




ইস্যু তিনঃ এক দম্পতি এসে হাজির। বয়স্ক দম্পতিটি দুই দিন আগেও এসেছিল। উনারা উনাদের বর্তমান কোম্পাণীর ফোন সার্ভিস বাদ দিয়ে অন্য কোম্পাণীর ফোন সার্ভিস কিনতে চাইছিলেন।  সেদিন আমার কাছ থেকেই ফোন কিনে নিয়ে গেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, আগের কোম্পাণীর ফোন নাম্বার রেখে দিতে চাইলে কী করতে হবে? জানিয়েছিলাম, আগের কোম্পাণীর একাউন্ট নাম্বার জানা থাকলেই চলবে। বাকী কাজ নতুন কোম্পাণীর ওরা করে দিবে।

তাহলে আজকে কেন এসেছে আবার?

আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ঘন্টা দুই আগে আমি  সেদিনের কেনা ফোনগুলো ফেরত দিয়ে গেছিলাম। আমি আবার আমার পুরানো কোম্পাণীর সার্ভিস ফিরে পেতে চাই। একই নাম্বারও চাই। ঐ ফোন বক্সের ভেতর আগের কোম্পাণীর একাউন্ট নাম্বারসহ কাগজ রয়ে গেছে। বিশ মাইল গাড়ী চালিয়ে আমাকে আবার আসতে হলো।

আমি পড়ে গেছি বিপদে, আমার আগে যেই মেয়ে ছিল, সে কোথায় নিয়ে রেখেছে ফোন কে জানে? গেলাম স্টোর রুমে, যেখানে ক্লেইমড মালামাল জমা রাখা হয়। খুঁজে পেলাম দুই ফোন। সাথে নিয়ে এসে ফোন খুলে দেখালাম, কিন্তু কোথাও একাউন্ট নাম্বারসহ কোন কাগজ খুঁজে পায় না বুড়ো। আন্দাজের উপর ভর করে এক টুকরো কাগজে ফোনের সিরিয়্যাল লাম্বার কপি করে দিলাম। বললাম, কী কী করতে হবে।

 (মনে মনে বললাম, কী যে ঝামেলা বাধাও! কী দরকার ছিল বার বার ফোন সার্ভিস বদলানোর! আর বদলালেই যদি, একই ফোন নাম্বার বার বার  ফিরে পেতে চাও কেন বাপু? এগুলো কী সোজা কাজ? তাছাড়া এইসব ফালতু কাজের জন্যতো অতিরিক্ত পারিশ্রমিকও পাই না)। বুড়োবুড়ি চলে গেলো।

আধঘন্টা বাদে আবার ফিরে এলো বুড়োবুড়ি। বুড়োবুড়িকে দেখেই আমার ভয় লাগলো, এই ধরণের কাস্টমারকে পাশ কাটানো যায় না, মুখের দিকে তাকালেই নিজের বাবা মায়ের কথা মনে হয়। অথচ এঁরা ফোনের কিছুই বুঝে না, কিন্তু সবকিছু পেতে চায়। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী প্রয়োজন? ফোনের সিরিয়্যাল নাম্বার লিখে দেয়া কাগজ হারিয়ে ফেলেছে। আবার আমাকে ফিরে যেতে হলো স্টোর রুমে, সেখান থেকেই কাগজে নাম্বার টুকে নিয়ে এলাম। বুড়োকে নিজে হাতে তার সাথে নিয়ে আসা ঝোলার ভেতর কাগজের স্লীপ ঢুকিয়ে দিয়ে বিদায় করলাম।


ইস্যু চারঃ  অনেকদিন পর একজনকে দেখলাম, যাকে দেখার সাথে সাথে নিজের তরুণ বয়সের কথা মনে পড়ে গেলো। তরুণ বয়সের ধর্ম যা হয়, অন্যের খুঁত বের করা, অন্যকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা, মানুষকে নিয়ে কৌতুক করা এবং এ সমস্ত বিষয় থেকে নির্দোষ আনন্দ লাভ করা। আমার  উকিল দাদুর কাছে এক মক্কেল আসতো, প্রায়ই আসতো, লোকটিকে দেখতে পেলেই আমরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতাম। হাসাহাসির মূল কারণ, লোকটির চাল-চলণ, বেশ-ভূষা, কথা বলার ঢং। সে মাথায় জবজবে করে তেল মাথতো, মাথার মাঝ বরাবর সিঁথি কাটতো, ঠোঁটের উপরেই ছিল চার্লি চ্যাপলিন মোচ, শার্ট আর প্যান্ট ইন করে পরে ইয়া চওড়া বেল্ট কোমড়ে বাঁধতো। সেই বেল্ট থাকতো অনেকটাই বুকের কাছাকাছি। লোকটির আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই ভালো, তারপরেও তার কথা বলার ধরণে ব্যক্তিত্বের লক্ষ্মণ প্রকাশ পেতো না। কেমন যেনো যাত্রার ঢং-এ কথা বলতো।  অনেক কাল মনে ছিল লোকটির চেহারা, পরবর্তিকালে যে কোন পুরুষকে মাঝ বরাবর সিঁথি কাটতে দেখলেই বলতাম, "দাদুর ক্যাবলা মক্কেল'।

আজ আমার রেজিস্টারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে 'দাদুর ক্যাবলা মক্কেল'। বিনয়ের সাথেই জিজ্ঞেস করলাম, উনার কী প্রয়োজন। আমার চেয়েও অধিক বিনয়ের সাথে 'দাদুর ক্যাবলা মক্কেল' বললো, তার মোবাইল ফোনের মিনিট শেষ হয়ে গেছে। রিচার্জ করতে চায়। যেহেতু আমাদের কাছে কমপক্ষে পনেরো টি বিভিন্ন কোম্পাণীর ফোন এবং ফোনকার্ড মজুদ আছে, তাই জানতে চাইলাম, কোন কোম্পাণীর সার্ভিস সে ব্যবহার করে। লোকটি বিনয়ে গলে গিয়ে বললো, " স্যামসাং ফোন'।
বললাম, স্যামসাং তো ফোনের ব্র্যান্ড, কিন্তু কোন কোম্পাণীর সার্ভিস তুমি ব্যবহার করো?

লোকটি' দাদুর ক্যাবলা মক্কেলের' মতই ক্যাবলা হাসি মুখে ছড়িয়ে বললো, 'স্যামসাং ফোন'।

বুঝলাম, আমাকে অন্যভাবে বুঝতে হবে, মিনিটের পরিমান জিজ্ঞেস করতে হবে অথবা কত টাকা দামের কার্ড সে ব্যবহার করে, ঐ হিসেব ধরেও জানতে চেষ্টা করা যায়। তার আগে আমি একটু শয়তানী করলাম। বললাম,

তুমি কোথায় থাকো?
-আজ্ঞে, এই শহরেই।
-চাকুরী করো?
-আমার বিজনেস আছে।
-তুমি তো অনেক বড়লোক, তাহলে এই সস্তা ফোন কিনছো কেনো? আরও দামী ফোন কেনো।
-এই ফোনটা আমার জন্য না, আমার এক বন্ধুর ফোন, আমি জানিনা, সে কোন সার্ভিস ব্যবহার করে।
-তা এতক্ষণে বলতে হয়? আগে বললেই তো আমাদের ফোন ব্যবহার করে তুমি বন্ধুর কাছ থেকে জেনে নিতে পারতে, সে কোন সার্ভিস ব্যবহার করে"।

(মনে মনে বলি, তুমি একেবারে আমার 'দাদুর ক্যাবলা মক্কেলের' মত দেখতে! একই রকম স্টাইলে চুলে জবজবে তেল বা ক্রিম মেখেছো, মাঝখান বরাবর সিঁথি কেটেছো, প্যান্ট শার্ট ইন করে পড়েছো ঠিকই কিন্তু বেল্ট বেঁধেছো বুকের কাছে, তার উপর আবার এমন নত মুখে কথা বলছো। সব কিছু মিলিয়ে তুমি আমাকে  আটাশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে দিয়েছো। যেহেতু তুমি আমাকে আমার তারুণ্যকাল ফিরিয়ে দিয়েছো, তাই আমি তোমাকে আমার সাধ্যমত সাহায্য করবো)।

আমি খুব নরম স্বরে ভদ্রলোকের সাহায্যে এগিয়ে গেলাম। অনেক চেষ্টা করে তার বন্ধুর ফোন সার্ভিসের নাম বের করেছি। বন্ধুকে ফোন করার কথা বলে নিজেরই মনে হয়েছে, বন্ধুর ফোন তো এই ভদ্রলোক সাথে করে নিয়ে এসেছে। বন্ধুকে পাওয়ার কোন উপায় জানা নেই। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সফল মনোরথ হয়েই ভদ্রলোক আমাদের কাউন্টার থেকে বিদায় নিলো।




ইস্যু পাঁচঃ  ওয়ালমার্টে প্রায়ই ভাল ভাল জিনিসের উপর মূল্য হ্রাস টিকিট লাগানো হয়ে থাকে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, হোম অফিস থেকে অর্ডার আসে, একেক জিনিসের উপর একেক পার্সেন্টেজ ধরে মূল্য হ্রাস করা হয়। মূল্যহ্রাস করার পরে হ্রাসকৃত মূল্যের টিকেট আইটেমের গায়ে লাগিয়ে দিয়ে ডিসপ্লেতে দেয়া থাকে। বেশীর ভাগ সময়েই টিভির উপর মূল্যহ্রাস হয়ে থাকে। সেদিনও আমার এক বন্ধু মূল্যহ্রাসের টিকিট লাগিয়ে টিভিগুলোকে ডিস্পলেতে সাজিয়ে রাখছিল। আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ওর কাজগুলো দেখছিলাম।

এমন সময় আমাদের পাশের ফ্যাব্রিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে ক্রিং ক্রিং ঘন্টা শোনা গেল। অর্থাৎ থান কাপড় কিনতে এসেছে কাস্টমার। আশেপাশে বোধ হয় কাউকে দেখতে পায়নি, তাই বেল বাজিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আবারও ক্রিং ক্রিং শোনা গেল। ঠিক একই সময়ে আমার পেছন দিক থেকে কেউ একজন মুখে আওয়াজ করলো ক্রিং ক্রিং, আইসক্রিম, ক্রিং ক্রিং আইসক্রিম!! চমকে পেছন ফিরে দেখি, এক ভদ্রলোক আর এক ভদ্রমহিলা আমাদের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আমার দিকে চোখাচোখি হতেই ভদ্রলোক আবার বললো, ক্রিং ক্রিং আইসক্রীম! আমাদের ছোটবেলায় এভাবে আইসক্রিমওয়ালা রাস্তা দিয়ে যেত।

সাদা সাহেবের মুখে এমন কথা শুনেতো আমি অবাক! আমাকে অবাক হতে দেখে লোকটি আবার বললো, " বিশ্বাস করো, আমাদের ছেলেবেলায় রাস্তা দিয়ে আইসক্রীমওয়ালা এভাবে ঘন্টি বাজিয়ে যেত, আর আমরা বাচ্চারা তার  পেছন পেছন ছুটতাম!

বললাম, " কোন দেশের গল্প তুমি বলছো? আমেরিকায় তো এমন হতে দেখিনি"

বলল, " সাউথ আফ্রিকায়। আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সাউথ আফ্রিকায়। ওখানে আইসক্রিমওয়ালা রাস্তা দিয়ে আইসক্রীম , আইসক্রীম হাঁক দিয়ে যায়। এখনও যায়, এখনও ছোট ছোট  ছেলেমেয়েরা তার পেছন পেছন দৌড়ায়!

" মাই গড! তুমি তো আমাকে আমার  ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিলে"
"জানি তো, তুমি নিশ্চয়ই ভারতীয়! তোমার চেহারায় তাই বলে। আমাদের ওখানে তো ভারতীয় ভর্তি, লিটল ইন্ডিয়া বলতে পারো।"।

-"আমি মুলতঃ বাংলাদেশের, তবে এখানে আমার দেশের নাম অনেকেই জানেনা, আমাকে ভারতীয় ভাবে, আমরা আলাদা দুটি ভূ-খন্ডের হলেও চেহারা ছবি একই রকম। তাই আমাকে ভারতীয় বলে। হ্যাঁ, আমিও জানি, সাউথ আফ্রিকায় প্রচুর ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বাস। তা সেখানেও একই ভাবে আইসক্রীম বিক্রী হয়? আচ্ছা, সাউথ আফ্রিকা থেকে তুমি এখানে এসেছো কোন সোর্স ধরে? চাকুরী নিয়ে?

" না, এই যে আমার পাশে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলাকে দেখছো, সে আমাকে আমার জন্মভূমি থেকে টেনে নিয়ে চলে এসেছে।"

এবার মেম সাহেব মুখ খুললেন। " হ্যাঁ, আমিই ওকে নিয়ে এসেছি। ও এখানে এসে সাউথ আফ্রিকাকে খুব মিস করছে। দেখলে তো, একটু আগেই কিরকম ক্রিং ক্রিং করছিল।  হা হা হা হা! আচ্ছা, তুমি তো নিশ্চয়ই জানো, এখানে কোথায় ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে"!

" জানি, তবে কেনো? তোমার হাজব্যান্ড কী ইন্ডিয়ান খাবারের সন্ধান করছে নাকি?"

ভদ্রলোক বললেন, " প্লীজ, যদি জানো বলো। আমি অনেকদিন চিকেন কারী খাই না, উম! জিভে জল এসে গেলো। উফ! ওখানে আমরা স্পাইসি খাবার খেতাম, আর এখানে এসে শুধু বিস্বাদের চিকেন ফ্রাই খাই।

বউ হাসতে লাগলো, বললো, দেখো কী কান্ড! অবশ্য আমিও যখন ওখানে ছিলাম, প্রায়ই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে চলে যেতাম। গ্রীন কালারের একটা চিকেন কারী হয়, তুমি কী জানো, কীভাবে রান্না করে?

" ধনে পাতা আর ক্রীম দিয়ে রান্না করে মনে হয়।" তুমি নিজেই তো বাড়ীতে রান্না করতে পারো। নাহলে আবার সাউথ আফ্রিকায় ফিরে যাও"

বউ হাসতে হাসতে বললো, 'মন্দ বলো নি, আমার এই পাগলা কে নিয়ে আবার সাউথ আফ্রিকায় যেতে হবে। দেখি, ওখানেই একটা চাকুরী জুটিয়ে নেবো"।

আর কথা বাড়ালাম না। জেনে নিলাম, ভদ্রমহিলা আর্মিতে আছেন, সেই সূত্রেই সাউথ আফ্রিকা গিয়েছিলেন, অনেক বছর থেকেছিলেন, আলোচ্য ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় ও প্রনয় হওয়ার পর বিয়েটা ওদেশে সেরে স্বামী নিয়ে নিজের দেশে ফিরেছেন। আর স্বামী ভদ্রলোকও এখানেই চাকুরী পেয়েছেন, তবে দেশের জন্য, দেশের খাবারের জন্য, নিজের ছোটবেলার জন্য হা-পিত্যেশ করে মরছেন! আমার সাথে ভীষন মিল পেলাম, মনে শান্তিও পেলাম এই ভেবে যে এ দেশে আমি একা নই, আমার মত আরও কেউ আছে যে প্রতি মুহূর্তে মাতৃভূমিকে মিস করছে!


 ইস্যু ছয়ঃ

আমি একফাঁকে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। যতগুলো কন্ট্র্যাক্ট সাইন করিয়েছি, সেগুলোর ডাটা লগবুকে এন্ট্রি করছিলাম। পেছন থেকে বাচ্চা কন্ঠে কেউ ডাকলো, অ্যাই মাম!!
খেয়ালে ছিল না আমি আমেরিকান স্টোরে আছি, ডাক শুনে মনে হলো আমার ছোট মেয়ে বুঝি ডাকছে! মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো, " কী হলো!"
রেজিস্টারের দিকে তাকিয়ে দেখি এক কালো বালক শিশু দাঁড়িয়ে! নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে সামলে নিলাম। ওর বয়সী ব্ল্যাক ছেলেদের দেখলেই আমার আদর করতে ইচ্ছে করে! মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়া চুল, মুখে অনিন্দ্য সুন্দর হাসি, আদর না করে পারা যায়! আমার মেয়েরা আমাকে সব সময় 'রেসিস্ট' বলে আনন্দ পায়। কারণ, আমি  অধিকাংশ ব্ল্যাক মহিলাদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষন করি না।  ওদের  আচরণে ঝগড়াটে ভাব দেখে ভয় পাই, তাই সব সময় ওদের কাছ থেকে শত হস্ত দূরে থাকার চেষ্টা করি। আমার এই মনোভাব মেয়েদের কাছে খুবই নিন্দনীয়! আমি অবশ্য মানুষের প্রতি মেয়েদের এই অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করি। আমার বড় দুই মেয়েই কিছুটা নারীবাদী। এ কারণেও ওরা আমার উপর ক্ষ্যাপা! আমি যখন অতি ভাল কালো মহিলাদের সম্পর্কে জয়গান করি, সেগুলো ওরা আমলে নেয় না, কালো ছেলেদের ব্যাপারে আমি খুব নমণীয়, কালো ছেলেদের ব্যবহারে সরলতা থাকে, ওরা ঝগড়ুটে স্বভাবের হয় না, সারাক্ষণ নাচ-গানের ছন্দে চলাফেরা করে। এমন কথা শুনলেই আমার মেয়েরা রেগে যায়, বলে, আমি নাকি পুরুষদের হয়ে সাফাই গাই, মেয়ে হয়েও মেয়েদের বিরুদ্ধে কথা বলি! তা বলুক ওরা, ওদের কথার মধ্যেও  যুক্তি আছে! থাকুক যুক্তি, তাই বলে তো আর অনিন্দ্য সুন্দর কালো বালক বা কিশোর ছেলের প্রতি আমার যুক্তিহীন ভালোবাসার কিছু কমতি হবে না!

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণ কিশোরকে জিজ্ঞেস করলাম,

-কী হলো তোর! তোর জন্য কী সাহায্য করতে পারি, বলতো সোনা!
-আমি একটা ফোন কার্ড কিনতে চাই। এই যে টাকা নিয়ে এসেছি।
-দাঁড়া, আগেই টাকা বের করছিস কেন? এত উতলা হয়েছিস কেন? কী, গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করতে হবে?
-দারুণ লজ্জা পেয়ে সে বললো, আরে নাহ! আমার মায়ের জন্য কার্ড কিনতে এসেছি।
-ওহ আচ্ছা, আয় আমি তোর জন্য কার্ড খুঁজে দেই। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, তোরও একখানা কার্ড দরকার আছে, তাইনা?
-লজ্জা মাখা মুখে, আমার তো ফোন নেই।
-সে কী রে!! তোর ফোন নেই?? হায় হায়! তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে তো!!!!!

আমাকে অবাক করে দিয়ে সে 'হ্যাঁ' সূচক মাথা নাড়ালো। আমি ওর সাথে মজা করছিলাম, এত ছোট ছেলের আবার গার্ল ফ্রেন্ড থাকে নাকি? সাইজ দেখে মনে হচ্ছিল আট বছর হবে বয়স। কিন্তু গার্ল ফ্রেন্ডের কথা বলতেই অমন করে লজ্জা পেলো কেনো! ব্যস! শুরু হয়ে গেলো আমার দুষ্টামী! বললাম,

-সোনাবাবু, তোর বয়স কতরে!
-বারো বছর!
-বলিস কী!! বারো বছর তোর, অথচ তোর ফোন নেই?
-না, আমার মা আমাকে ফোন কিনে দেয় নি। যদি ভেঙ্গে ফেলি, সেই জন্য ফোন দেয় নি।
-কেন, ফোন ভেঙ্গে ফেলার কথা মনে হচ্ছে কেনো? তুমি কী মায়ের অনেক দামী জিনিস ভেঙ্গে ফেলেছো?
-না, অনেক জিনিস ভাঙ্গিনি, তবে আমার হাত থেকে অনেক জিনিস পড়ে যায়। ফোনও যদি পড়ে যায়, তাহলে ভেঙ্গে যাবে, মায়ের হাতে তাহলে পিটানি খেতে হবে!
-তাহলে তো তোর অনেক সমস্যা! গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে যোগাযোগ করিস কীভাবে?
-স্কুলে গেলেই তো ওর সাথে দেখা হয়!
-তাও তো বটে! তা তোর গার্ল ফ্রেন্ডের ফোন আছে?
-হ্যাঁ, ওর ফোন আছে।
-ও কী তোকে কখনও ওর ফোন ব্যবহার করতে দেয়?
-না, ওর ফোন আমাকে ব্যবহার করতে দেয় না। তাছাড়া আমিও ওর ফোন ব্যবহার করতে চাই না।
-এটা খুবই ভালো কথা। তোর আত্মসম্মান বোধ দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। আচ্ছা, এই বয়সেই প্রেম করছিস, লেখাপড়া করিস না?
-করি। লেখাপড়াও করি।
-হুম! খুব ভালো। এতক্ষণ ধরে তোর সাথে কথা বলছি, তোর নামই জানা হলো না। তোর নাম কি বাবা?
-কুইন্টেরিয়াস!
-অনেক কঠিন নাম, কিন্তু খুব সুন্দর নাম। আর তোর গার্ল ফ্রেন্ডের নাম কি?
-এটা বলা যাবে না!
-কেনো, বলা যাবে না কেনো?
-ও চায় না, ওর কথা অন্য কেউ জানুক।
-বাহ! তোর গার্ল ফ্রেন্ডটা তো দারুণ বুদ্ধিমতী! কিন্তু আমার যে খুব ইচ্ছে করছে অমন একটা বুদ্ধিমতী মেয়ের নাম শুনতে!

আবার ওর মুখে লজ্জা এসে ভর করলো, বললো, তোমাকে শুধু বলি, কাউকে বলে দিও না, ওর নাম অ্যাঞ্জেলিনা!
-ওরে! খুব সুন্দর নাম। তোদের দুজনকেই আমার পছন্দ হয়ে গেছে। অ্যাঞ্জেলিনাকে না দেখেই পছন্দ হয়ে গেছে। তোর মত এমন লক্ষ্মী একটা ছেলের সাথে ও ফ্রেন্ডশীপ করেছে, ও তো অনেক লাকী। কুইন্টেরিয়াস, তোর কাছে তো পয়সা নেই, ভ্যালেন্টাইন'স ডে'তে অ্যাঞ্জেলিনা কে কী উপহার দিবি?

-ভাবতে হবে!

-বেশী ভাবতে হবে না। ওর জন্য একটা কবিতা লিখবি, আর বাগান থেকে একটা সুন্দর গোলাপ তুলে কবিতার সাথে আটকে দিয়ে অ্যাঞ্জেলিনাকে প্রেজেন্ট করবি। দেখবি অ্যানজেলিনা তোর দিকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির মত হাসি দিবে!
-হেই ম্যাম! তুমি কী যে বলো! অনেক মজা করে কথা বলো। হা হা হা হা! আমার হাসি পাচ্ছে।

-হুম! এতক্ষণ মজা করে কথা বলেছি, তোমার সাথে গল্প করে আমার খুব ভালো লেগেছে। তুমি ভাল করে লেখাপড়া করো, বড় হয়ে যেন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারো, তাহলে তোমার অ্যাঞ্জেলিনা জোলিও খুশী হবে, তোমার মাও খুশী হবে।

-হি হি হি হি!! ওকে, ঠিক আছে। বাই!
-বাই বলতে হয় না, সী ইউ বাচ্চা, ভালো থেকো।


সেদিন এমনি আরও অনেক ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছিল, তবে মনে গেঁথে আছে এই ঘটনাগুলো।

Wednesday, February 6, 2013

কত রকমের মানুষ, তাদের কত রকমের গল্প-১০

 দু'জন  মানুষের  গল্প


দু'জন ভিন্ন মানুষের গল্প বলি। মানুষ দু'জন সব দিক থেকেই ভিন্ন।  তাদের জেন্ডার ভিন্ন, গায়ের চামড়ার রঙ ভিন্ন, আর্থিক ও পারিবারিক  অবস্থাও ভিন্ন। এক জায়গাতে শুধু মিল আছে, সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে তারা বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তকে ওরা এনজয় করছে।

দু'জনের একজন নারী, সাদা চামড়ার আমেরিকান, বয়স ৭৭, আর্থিক দিক থেকে সবল, স্বামী নেই, তবে চারছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার।এই নারীকে শেষ বয়সে এসে তথাকথিত 'ওল্ড হোমে' যেতে হয়নি। আলোচ্য নারীর নাম ক্যারোলিন ম্যাকডোনাল্ডস।

অপর ব্যক্তিটি একজন পুরুষ, বাকশক্তিহীন, কালো চামড়ার আমেরিকান, বয়স ৩৭, গরীব, মা-বাবা, স্ত্রী-সংসার কিছুই নেই। সরকার থেকে ভাতা পান এবং একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে কাজ করে কিছু উপার্জণ করেন। আলোচ্য পুরুষটির নাম, ডেমেড্রিক।


ক্যারোলিন ম্যাকডোনাল্ডসঃ

ক্যারোলিন ম্যাকডোনাল্ডসকে প্রথম দেখি  আমার কাজের জায়গায়। ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাইসহ ওয়ালমার্টে এসেছিল শপিং করতে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা আমার ডিপার্টমেন্টে আসে, জানতে চায় ওদের দুই বছরের কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করতে হলে কী করতে হবে! যখন জানলো যে গত মাসের বকেয়া বিল পরিশোধ করলেই সার্ভিস রিনিউ করা যায়, মেয়ে সাথে সাথে 'মানিগ্রাম সেন্টারে' ছুটে গেলো বিল পরিশোধ করতে। আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল মিস ক্যারোলিন আর তাঁর মেয়ে জামাই। প্রায় বিশ মিনিট অপেক্ষা করার পরও যখন তাঁর মেয়ে ফিরে আসছিল না,  আমি মিস ক্যারোলিনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন ধরণের ফোন তার পছন্দ। উনি 'স্যামসাং রাগবী টু' এর দিকে অঙ্গুলী ইশারা করে বললেন, উনি সিম্পল ফোন ভালোবাসেন। গতমাসে হসপিটালে থাকার সময় নাকি আগের ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে, তাই এখন নতুন ফোন প্রয়োজন। বুড়ীমাকে দেখেই আমার ভাল লেগেছে, 'গল্প বলার ঠাকুরমা' মনে হয়েছে। বুড়ীমা হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন বলে মনেই হচ্ছিল না। ধবধবে সাদা চুল সুন্দর করে পেছন দিকে খোঁপায় বাঁধা, গায়ে সুন্দর প্রিন্টের লম্বা ঝুলওয়ালা জামা, হাতে একখানা লাঠি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক আমার মুখোমুখি। এই তো সময়, মানুষটির সাথে গল্প করার! শুরু হলো আমার গল্পঃ

-গত মাসে তুমি হসপিটালে ছিলে? আর এই মাসে তুমি কী সুন্দর করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছো! বাহ! থ্যাঙ্কস গড!

-হ্যাঁ, গত মাসে কোমড় ভেঙ্গে হসপিটালে পড়েছিলাম। ( হাত দিয়ে  কোমড়ের বাঁ পাশ থেকে উরু পর্যন্ত দেখালো)। অপারেশান করে মেটাল স্টিক বসিয়ে দিয়েছে। এই জন্যই আমি হেঁটে হেঁটে চলাফেরা করতে পারছি।

-আহারে! কোমড় ভাঙ্গলো কী করে! পড়ে গেছিলে বুঝি!

-হ্যাঁ, গত নভেম্বার মাসে আমার 'রেকটাম ক্যানসার' ধরা পড়েছিল। সেই চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে একদিন দেহের ভার সামলাতে না পেরে পড়ে গেছিলাম। সাথে সাথে কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। প্রায় বাইশটা স্ক্রু লাগিয়েছে 'হিপ বোনে'।

-কী বলো! নভেম্বার থেকে ফেব্রুয়ারী, তোমার উপর দিয়ে এত ঝড় গেছে!! এরপরেও তুমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো, মাগো, তোমার মনের জোর দেখে অবাক হচ্ছি। তোমার মানসিক শক্তি থেকে আমাকে কিছু ধার দাও, মা!

- হা হা হা! দিলাম, তোমাকে দিলাম। মনের শক্তিটাই আসল। ডাক্তাররা সবাই বলেছিল, কেমোথেরাপী নিতে, দ্বিতীয় অপশান ছিল ওর‌্যাল রেডিয়াম থেরাপী। আমি দ্বিতীয় অপশান চুজ করেছি। ছয় সপ্তাহের কোর্স, দুই বেলা খেয়েছি। ডাক্তাররা আগেই বলেছিল, আমার মাথার সব চুল পড়ে যাবে। হা হা হা! কিন্তু দেখো, আমার মাথার চুল একটিও পড়ে নি। ঐ সময়টাতেই আছাড় খেলাম, কোমড়টাও ভাঙ্গলো।

-তোমার ক্যানসারের কী অবস্থা এখন?

-ভালো, একেবারে ভালো আছি। চেক করে দেখেছে, আর কোন গ্রোথ নেই। ওরা বলেছিল, অপারেশান করার কথা। আমি রাজী নই। আর কোথাও কোন গ্রোথ নেই, শুধু শুধু অপারেশান করাবো কেনো, বলো!  আমার স্বামীরও ক্যানসার ধরা পড়েছিল, লাং ক্যানসার। অপারেশান করাতে হয়েছিল, বাঁচেনি।

-তোমার স্বামী বেঁচে নেই? তুমি তাহলে একা একা থাকো?

-না, আমার ছোট মেয়ের সাথে থাকি। যে মেয়ে বিল পরিশোধ করতে গেলো, ও আমার ছোট মেয়ে। আর এই যে ফ্লোরে বসে আছে ছেলেটি, ও আমার মেয়ের জামাই। বেচারার লিভার সিরোসিস হয়েছে, লিভারের বেশ খানিকটা কেটে ফেলতে হয়েছে। মনে হয় যন্ত্রণা হচ্ছে, তাই ফ্লোরেই বসে পড়েছে ( আমিও খেয়াল করেছি, বুড়ীমার সাথে আসা ভদ্রলোকটি ফ্লোরের উপর বসে পড়েছে)।

-বাহ! আমাদের দেশের সকলের ধারণা, আমেরিকায় বুড়ো বয়সে সকলের জায়গা হয় 'ওল্ড হোমে'। কথাটি পুরোপুরি সত্যি নয়। আমি আরও অনেক মা'কে দেখেছি, তাঁদের ছেলে মেয়ের সাথে থাকে। অবশ্য 'ব্ল্যাক' পিপলদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন অনেক বেশী জোরালো।

-তুমি ঠিকই বলেছো। এদেশে বুড়োদের স্থাণ ওল্ড হোমেই হয়। তবে এটা কোন খারাপ কিছু না, প্রত্যেকটি বাবা মায়ের উচিত তার ছেলে মেয়েকে নিজের মত করে থাকতে দেয়া। ওল্ড হোমে তো কোন যন্ত্রণা নেই, সমবয়সীদের সাথে থাকা যায়। ছেলেমেয়েরা এসে খোঁজ খবর নেয়, এই তো যথেষ্ট।

-আমিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছি, যদি বুড়ো বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকি, ওল্ড হোমে গিয়ে থাকবো।

-হা হা হা! তোমাকে ওল্ডহোমের গল্প বললাম ঠিকই, কিন্তু নিজে থাকি ছেলেমেয়েদের সাথে। আমার তিন মেয়ে, এক ছেলে, বারোটি নাতিনাতণী। আমি সব সময় আনন্দে থাকতে চাই, তাই ওদের কাছাকাছি থাকি। আমার মেয়ে জামাইগুলোও হয়েছে খুব ভালো, আমাকে মাথায় করে রাখে। ছেলেমেয়েদের সকলেই কাছাকাছি থাকে।

-মাগো, তোমার মত এমন প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষকে সবারই ভালোবাসা উচিত। তোমার পাশাপাশি থাকলে জীবনকে ভালো না বেসে পারা যায়! তুমি ক্যানসারের মত অপশক্তির বিরূদ্ধে লড়াই করে টিকে আছো, তোমার বর্তমান বয়স ৭৭, আমি দুই হাত তুলে প্রার্থণা করি, তুমি আরও বিশ বছর হেসে খেলে বেঁচে থাকো, আশেপাশের সকলকে বাঁচিয়ে রাখো।

বুড়ীমা'র মুখে হাসি ফুটে উঠলো, আমার দিকে তাঁর দুই হাত প্রসারিত করে দিল!



ডেমেড্রিকঃ

ওর নাম ড্রেমেড্রিক, কাগজে যেভাবে বানান করে লিখেছে, সেভাবেই জেনেছি ডেমেড্রিক ওর নাম। কাগজে লিখেছে কারণ ও কথা বলতে পারে না। ৩৭ বছর বয়সী ডেমেড্রিকের সাথে পরিচয় হয়েছে আমার চাকুরীর সূত্রে। বাকশক্তিহীন একজন মানুষেরও ফোন চাই, এবং লেটেস্ট মডেলের ফোন চাই, এই ব্যাপারটিই আমাকে ওর প্রতি কৌতুহলী করে তুলেছে। আমি কোন রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই বাকপ্রতিবন্ধীদের সাথে কথা বলতে পারি, অন্য ভাষাভাষিদের সাথে কথা  বলতে পারি। কোন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ জানিনা, তারপরেও কোন না কোন ভাবে ওদের ভাষা বুঝতে পারি। ঠিক এভাবেই জেনেছি ডেমেড্রিকের জীবন কাহিণী, কিছুটা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কিছুটা কাগজে লেখা নোটস থেকে।

ডেমেড্রিক জানে না তার মা-বাবার খবর। কোথায় তারা থাকে, কেমন আছে, কিছুই জানে না। কারণ, ওরা কেউ ডেমেড্রিকের সংবাদ নেয় না। তার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই, ভাই বোন নেই, সে একা একজন, নিজের জন্যই সে বাঁচে। এরকম একটি অনুভূতির কথাই সে আমাকে বলেছে। বিবাহিত কিনা প্রশ্নের জবাবে মুচকী হেসে জানিয়েছে,

তার একজন গার্ল ফ্রেন্ড ছিল, বেশ কিছুদিন একসাথে তারা থেকেছে, একদিন কিছু না জানিয়ে গার্ল ফ্রেন্ড ওকে ছেড়ে চলে গেছে। এটা নিয়ে অবশ্য তার আফসোস নেই। জানালো, কিছুদিন ধরে সেই গার্ল ফ্রেন্ড তাকে ফোন করে, মেসেজ পাঠায়। তার নাকি কিছু বলার আছে, কী বলার থাকতে পারে, এসব নিয়ে ডেমেড্রিকের কোন আগ্রহ নেই। তার ভেতরে অনেক অভিমান জমেছে, প্রতিবন্ধী বলে বাবা, মা, ভাই বোন, প্রেমিকাসহ অনেকেই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, প্রয়োজনে ওরা আসবে তার কাছে, সে যাবে না। সে তার নিজের জন্য বাঁচে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ডেমেড্রিক সরকারী ভাতা হিসেবে মাসিক ৭০০ ডলার পায়। এতে তার মাস চলে না, তাই 'রয়্যাল চায়না' নামের একখানি চায়নীজ রেস্টুরেন্টে কাজ করে। চায়নীজ রেস্টুরেন্টে কীভাবে কাজ করে?  এখানে সাধারণ চায়নীজরা ইংলিশ বলতে পারেনা, রেস্টুরেন্ট চালাতে হলে 'ইয়েস' 'নো' 'গুড' জানলেই চলে নীতিতে ওরা বিশ্বাস করে। পরে বুঝেছি, চায়নীজদের জন্য বোবা ডেমেড্রিকই যোগ্য লোক। কখনওই  কথা বলবে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না, কম মজুরীতেই সন্তুষ্ট থাকবে,  বাইরে গিয়ে কোন অপপ্রচার চালাতে পারবে না।  ডেমেড্রিক মোটেও সন্তুষ্ট নয় তার চাকুরী নিয়ে। অন্য কোথাও বেটার কোন সুযোগ পেলে সে আজকেই রেস্টুরেন্টের চাকুরীতে লাথি মারবে। লাথি মারার ভঙ্গী করেই সে তার মানসিক অনুভূতি ব্যক্ত করলো। তার অভিযোগ, চায়নীজ রেস্টুরেন্টের চাকুরীতে কোন নিয়ম নীতি মানা হয় না। তাকে বোবা পেয়ে ওরা ঠকায়!  কী রকম অনিয়মের কথা বলছে ডেমেড্রিক!!

চায়নীজ রেস্টুরেন্টে ডেমেড্রিককে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, কিচেনে সারাটা দিন ওকে দিয়ে কাজ করানো হয়। রান্না করা, বাসন-কোসন মাজা ধোওয়া করা থেকে শুরু করে কাঁচা মাংস, পেঁয়াজ রসুন কাটা বাছা সব করতে হয় তাকে। বিনিময়ে তাকে দেয়া হয় ঘন্টায় ৫ ডলার (মিসিসিপির মিনিমাম ওয়েজ বোধ হয় ৭ ডলার)।  কথাটি বলতে গিয়ে ডেমেড্রিকের মুখে চোখে একই সাথে বিদ্রোহ আর বেদনার ছায়া ফুটে উঠেছিল। সে জানালো, পয়সা কম দিয়েও নিস্তার নেই, ঘাড়ের কাছে সারাদিন ওরা চ্যাং ব্যাং করতে থাকে। ওর নাকি মাথা গরম হয়ে যায়, এত ক্যাটর ক্যাটর শুনতে ভালো লাগে না। সে অনেকবার অনুরোধ করেছে, তাকে যেনো ঘন্টায় ৮ ডলার করে দেয়া হয়, কিন্তু ওরা তা দিবে না। খাওয়া -দাওয়া ফ্রী কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছে, খাওয়া ফ্রী, তবে ও খায় না। কেনো, খাও না কেন? উত্তর পেলাম, ওরা খুব বাজে তেলে রান্না করে। যেহেতু সে নিজেই রান্না করে, তাই কিচেনের সকল প্রকার গোপন রহস্য সে জানে। তার খুব খারাপ লাগে, এমন বাজে তেলের রান্না কাস্টমারদের খেতে দেয়া হয় বলে। কিন্তু, তার তো কিছু করার নেই। তাই সে নিজে খায় না, গাঁটের পয়সা খরচ করে বাইরে গিয়ে আমেরিকান খাবার  খেয়ে আসে। আমেরিকান খাবার কী খুব ভালো তেলে রান্না করা হয়? অবশ্যই ভালো তেলে রান্না করা হয়, তাছাড়া একবার ব্যবহার করা তেল আর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু চায়নীজ রেস্টুরেন্টে একবার ব্যবহার করা তেল বহুবার ব্যবহার করা হয়। তেল পুড়ে সেগুলো নিশ্চয়ই বিষাক্ত হয়ে যায়! ডেমেড্রিকের মত বাকশক্তিহীন মানুষের এতখানি অনুভূতি আছে? হ্যাঁ, প্রতিবন্ধীদের অনুভূতি খুবই তীব্র হয়, অভিমান খুব তীব্র হয়, কারণ বৈরী প্রকৃতির সাথে লড়াই করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। ডেমেড্রিকের তীব্র অনুভূতি শক্তির কারণেই সে ঘুরে ঘুরে আমার কাছে আসে। আমার হাতে সময় থাকলে আমি তার গল্প শুনি। যতবার ওকে দেখি, বুকের ভেতর যন্ত্রণা টের পাই। ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই, অযথাই মানুষ বিত্ত বৈভব, টাকা পয়সা নিয়ে অহংকার করে, মারামারি করে! আহারে! পূর্ণাঙ্গ সুস্থ জীবন পাওয়াটাই বড় কথা, টাকা পয়সা তো তুচ্ছ জিনিস!  কোটি কোটি টাকা দিয়ে কী হবে, যদি দেহের একটি ইন্দ্রিয় অকেজো থাকে!

আমাকে ডেমেড্রিক খুব আপনার জন ভাবে। কারণ আমি তার মনে সেই বিশ্বাস অর্জন করেছি একটি ছোটখাটো ঘটনার মধ্যে দিয়ে। প্রথম দিন সে এসেছিল তার এক বন্ধুকে নিয়ে। বন্ধুটির চেহারায় ছিল ধূর্ততার ছাপ। ডেমেড্রিককে ভুলিয়ে ভালিয়ে ওর ক্রেডিট হিস্ট্রি ব্যাবহার করে বন্ধুটি খুবই এক্সপেনসিভ ফোন প্ল্যান কিনতে চেয়েছিল। বলেছিল, মাসে মাসে ফোন বিল সে দিয়ে দিবে। ডেমেড্রিক প্রায় রাজী হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়েছিল বন্ধুর চাতুরী। কৌশলে সেদিন ওদেরকে ফোন ছাড়াই বিদায় করেছিলাম। দুই দিন পরেই ডেমেড্রিক এসে হাজির, আমাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে। সে নিজেও বুঝেছিল, বন্ধু ঠকাতে চাইছে, কিন্তু সে কিছু বলতে পারছিল না। আমি সেদিন তাদেরকে বিদায় করে দিয়ে নাকি তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছি। বাড়ী ফিরে সে বুঝতে পেরেছে, আমি ইচ্ছে করেই ট্রিক করেছি তাদের সাথে। সে জানাতে এসেছিল, এর পরেও যদি সেই বন্ধু আবার তাকে নিয়ে আসে, আমি যেন প্রতিবার 'না' বলে দেই।
আমি হেসে ফেলেছি ওর কথা শুনে, বলেছি, ঠিক আছে, তুমি যেভাবে চাও, সেভাবেই হবে। আরেকদিন আমার এক সহকর্মী তার কাছে 'আনলিমিটেড টক অ্যান্ড টেক্সট' প্ল্যানসহ ফোন সেল করেছে। আমি তখন ফ্লোরে ছিলাম না। যখন ফ্লোরে ফিরেছি, ডেমেড্রিক আমার কাছে নিয়ে এসেছিল তার ফোন। দেখে আমি একটু অবাক হয়েছি। জানতে চেয়েছি, সে কথা বলতে পারে কিনা! জবাবে বলেছে, 'না'। জানতে চাইলাম, টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারে কিনা! ' হ্যাঁ'। এবার আমি তার জন্য শুধু 'আনলিমিটেড টেক্সট প্ল্যান' নির্বাচন করে দিলাম। আগের প্ল্যান পালটে নতুন প্ল্যান দিলাম। খরচ অর্ধেক কমে গেলো। ডেমেড্রিক কী খুশী! বার বার বলছিল, ভাগ্যিস, সে আমাকে দেখতে পেয়েছিল। সেই থেকে শুরু। এরপর থেকে ও ওয়ালমার্টে এলে সরাসরি আমার কাছে চলে আসে। আমি না থাকলে ফিরে যায়। আমার সহকর্মীরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে, বলে তোমার 'কাজিন' লাগে ও।

একদিন ডেমেড্রিক আমার অনামিকার দিকে ইশারা দিয়ে জানতে চায়, আমি বিবাহিত কিনা! বললাম, হ্যাঁ, বিবাহিত। দারুণ ভালো একটি মানুষের সাথে জীবন বাঁধা পড়েছে।  সে চোখ কুচকে ধমক দেয়, বিবাহিত হয়ে অনামিকাতে আংটি পড়িনি কেনো? আঙ্গুলে আংটি না দেখলে নাকি ছেলেরা ভুল বুঝবে। বাড়ী ফিরেই যেনো আংটি পড়ি। বললাম, আংটি পড়লে  আমার আঙ্গুল ফুলে যায়, তাই আংটি পড়ি না। তাছাড়া, আমাকে এই বয়সে কেউ প্রেম নিবেদন করবে না। জানতে চায় আমার বয়স কত? বলি, তুমি আন্দাজ করো। সাথে সাথে বললো, ঊনচল্লিশ। বললাম, ঊনত্রিশ। 'না' বলে এক জোর আওয়াজ তুললো। আমি হাসি, বলি, কেনো, না কেনো? সে বলে, তোমাকে অনেক ইয়াং লাগে, তাই বলে তোমার বয়স ঊনত্রিশ না। তাহলে কত, ঊনষাট? 'না' এটাও ঠিক নয়। ঊনপঞ্চাশ? 'হ্যাঁ' এটা হতে পারে। এবার আমার চীৎকার করে উঠার পালা। হেসে ফেলেছি, বলেছি, তুমি ঠিক,  ঊনপঞ্চাশ না হলেও  কাছাকাছি আছি। তোমার আন্দাজ ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে যাই। এবার সে মুখে নির্মল হাসি ছড়ায়! আমি তার অনুমান শক্তির প্রশংসা করেছি।

ডেমেড্রিক কেমন আছে? কেমন লাগে  তার কাছে এই ভাষাহীন জীবন! ডেমেড্রিক সারা মুখে নির্মল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললো, আমার ভালো লাগে। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। তুমি অনেক সুন্দর। তুমি একজন 'মা'। সবার মা। তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি। তোমার কাছে আসি একটু মমতা পাওয়ার জন্য। আমার মা কোথায় থাকে জানিনা, তোমাকে দেখলে মায়ের কথা মনে পড়ে।