Wednesday, June 19, 2013

মিঠু'স কেমিস্ট্রি ল্যাব

এখন এখানে সামার ভ্যাকেশান চলছে। সামার ভ্যাকেশান ঠিকই, গরমও প্রচন্ড, তবে আম, কাঁঠাল খাওয়ার কোন উপায় নেই, এমনকি শীতল পাটি বিছিয়ে দুপুরে ঘুমাবো, সেই ব্যাপারও নেই। রাম নেই তাই রাম রাজত্ব নেই, মিসিসিপিতে বাঙ্গালী নেই, তাই আম, কা৬ঠাল, শীতল পাটির ব্যাপার নেই। তার উপর আমাকে ওয়ালমার্টের বারোমেসে সেন্টারে চাকরী করতে হয়, উত্তম কুমারকে ভার্সিটিতে সামার ক্লাস নিতে হয়, ছোট মিথীলাকে বেলা বারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটাতে হয়। এইসব বিলাসিতা করবোই বা কখন!

ইদানিং আমার সংসারের রেগুলার রুটিনে বেশ কিছু উলট-পালট হয়ে গেছে। তবে ঘরের রুটিন উলট-পালট হয়ে গেলেও সংসারের কোন কিছুই আমার নজর এড়িয়ে যায়না। খেয়াল করেছি, ইদানিং উত্তম কুমার লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ী আসেনা, আগে আসতো, যখন আমি দুপুরের জন্য পরোটা, লুচী, হাতে গড়া আটার রুটি, সব্জী, চীজ ফিলড ওমলেট,  চিঁড়ের পোলাও, মিঠু'স স্পেশ্যাল নুডুলস বানিয়ে রাখতাম। এখন আমি আর আগের মত সময় পাইনা, তাছাড়া ইদানিং খুব স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গেছি বলে কিছুদিন স্যালাড, ফলমূল, ভুষি মেশানো আটার রুটি বানিয়েছি, এগুলো আবার  উত্তমের দুই চক্ষের বিষ। স্বাস্থ্য সম্মত খাবার এড়াতে সে লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ী আসা বাদ দিয়েছে, সে প্রায়ই দেখি  নিজে নিজে চিকেন গ্রীল করে, চিকেন কিমা দিয়ে ডাল রান্না করে, ভুট্টা গ্রীল করে, দোকান থেকে নানা জাতের রকমারী স্ন্যাক্স কিনে নিয়ে আসে। পুরো শাহীখানা বানিয়ে ফেলেছে আমার কিচেনকে ( কিচেনকে আমি আমার কেমিস্ট্রি ল্যাব বলি) , এই নবাবী খাবারগুলো প্যাকেট করে সাথে নিয়ে যায়। কিছুই আমার নজর এড়ায়না। আমি নাটাইয়ের সূতা ছাড়ছি, দেবো একদিন হ্যাঁচকা টান। বোকাট্টা করে দেবো ঘুড়ি! আমার এত সুন্দর করে গড়ে তোলা কেমিস্ট্রি ল্যাবকে কোনভাবেই নবাব বাড়ীর হেঁশেল বানাতে দেবোনা।

বেশীদিন আগের কথা নয়, সপ্তাহ তিনেক আগে আমাদের বন্ধু শুভাষীষ'দা এবং উনার স্ত্রী রঞ্জনা এসেছিল। কথায় কথায় বললাম, আমাদের বাগান ভাগ্য ভাল না, গাছ তো বড় হয়ইনা, ফসল ফলবার আগেই কাঠবেড়ালী এসে গাছের গোড়া কেটে দিয়ে যায়। একথা শোনার সাথে সাথেই বাগান বিশেষজ্ঞ রঞ্জনা বললো, " ন্যাপথালিন কিনে নিয়ে আসো, বাগানের চারপাশে বা ঘরের চার পাশে ন্যাপথালিন ছড়িয়ে দিলে কাঠবেড়ালীও আসেনা, সাপও আসবেনা। ওরা জানে, আমার সাপ ফোবিয়া আছে। এই প্রাণীটির নাম মুখে বলতে পারিনা, ছড়া ছবির বইয়ে ছবিও দেখতে পারিনা, পরিবারের সকলে যখন টিভি দেখে, তখন এই প্রাণীটির দৃশ্য এলে আমাকে বলতে থাকে, " চোখ বন্ধ করো, চোখ বন্ধ করো"। কাজেই রঞ্জনা যখন পরামর্শটি দিল, পরের দিনই আমি ওয়ালমার্টে গিয়ে এক কেজি ন্যাপথালিন কিনে নিয়ে এলাম।

সেদিন কোন এক কারণে আমার গাড়ীটি অকেজো হয়েছিল বলে উত্তম কুমার আমাকে ওয়ালমার্ট থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। আসার পথে আমি বলি,
-এই শোন, ন্যাপথালিন এক কেজিতে কিছু হবেনা, আরেক কেজি আনবো, বাড়ীর চারদিকে ছড়িয়ে দেবো। কাঠবেড়ালী আসুক কি না আসুক, ঐ প্রাণীটার আসা বন্ধ করতে হবে।
সে বলে, ন্যাপথালিন দিলে সাপ আসা বন্ধ হয় কে বললো?
-এই, প্রাণীটার নাম বলবেনা, আসা বন্ধ হবে, রঞ্জনা বলেছে, কারন ন্যাপথালিনে 'কার্বলিক এসিড' আছে। এইজন্য আসবেনা।
-ন্যাপথালিনে কার্বলিক এসিড আছে? বলো কী, কেমিস্ট্রিতে ডিগ্রী নিয়ে বলছো, ন্যাপথালিনে 'কার্বলিক এসিড' আছে?
-হ্যাঁ, কার্বলিক এসিডের গন্ধ আছে ন্যাপথালিনের মধ্যে।
-হায় হায় রে! আমি কই যাব রে! ন্যাপথালিনের মধ্যে কার্বলিক এসিডের গন্ধ পায় রে, কেমিস্ট্রির কী দশা! তুমি কী ন্যাপথালিনের স্ট্রাকচার জানো?
-না, এখন ন্যাপথালিনের স্ট্রাকচার মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করিনা, শুধু জানি, বেনজিন এর স্ট্রাকচার। এটুকু মনে রাখলেই যথেষ্ট। তাছাড়া হুবহু মিল হতে হবে কেন? কার্বলিক এসিড বা ন্যাপথালিন, দুইটাই অ্যারোমেটিক কম্পাউন্ড, কাজেই কোন না কোনভাবে যোগসূত্র আছে।
-ভাল, খুব ভাল, কই যাব, কেমিস্ট্রির কী অবস্থা, কে বলবে এই মহিলা কেমিস্ট্রিতে অনার্স, মাস্টার্স করেছে।

-সবাই বলবে আমি  কেমিস্ট্রিতে পাশ করেছি, প্রশ্ন করার আগেই বলে দেবো, পাশ করার ২৫ বছর পরেও, এখনও মনে আছে ওয়াটার, মিথেন, মিথিলিন, ইথেন, ইথিলিন, ইথানল, মিথানল, ফেনল, সালফিউরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, বেনজিন, (হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন), ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, সিঙ্গল বন্ড, ডাবল বন্ড, ট্রিপল বন্ড~~~~~~ আরও বলবো? শুনতে চাও?

-মাফ চাই।
-মাফ করবোনা, তুমি কেমিস্ট্রির জাহাজ হইতে পারো, আমি তো কেমিস্ট্রির 'ডিঙ্গি নাও' হইতে পারি, পারিনা?

-চুপ থাকেন, ন্যাপথালিনকে বলছেন কার্বলিক এসিড, এইটাই আগে হজম করি, নতুন করে কেমিস্ট্রি শিখতে হবে দেখছি।


আমাদের এই ঝগড়া থেমে গেলো গাড়ী বাড়ির গ্যারাজে ঢুকার সাথে সাথে। এবার আমার পালা। গাড়ী থেকে নামতে নামতে বললাম,
-তোমার ল্যাব হচ্ছে ইউনিভার্সিটিতে, গবেষনাই করো আর শিক্ষকতাই করো, পায়ে হেঁটে  টেংরিয়ে টেংরিয়ে ডিপার্টমেন্টে যেতে  হয়, আর আমার ল্যাব আমার নিজের বাড়ীতে। কোথাও যাওয়া লাগেনা, যখন যা এক্সপেরিমেন্ট করতে মন চায়, অ্যাপ্রনটা শুধু গলায় ঝুলায় নিলেই চলে, ইদানিং অ্যাপ্রনও ঝুলাইতে হয়না, চোখের আন্দাজ, আর অভিজ্ঞতা এত বেশী হয়ে গেছে, তাহলে কে বড় কেমিস্ট?

-সারাক্ষণ ফেসবুকে বসে না থেকে মাঝে মাঝে কেমিস্ট্রি বইয়ের পাতা উল্টিও!
-কোন দরকার নাই, অনার্স-মাস্টার্সে যা শিখছি, সেগুলো দিয়ে হাতে কলমে কাজ করছি, এই জন্যই এখন এত বড় বড় কথা বলতেছো। হুহ! আছিলা তো রোগা পটকা, কোন ল্যাবরেটরীর ভাত খেয়ে এমন উত্তম কুমার চেহারা বানিয়েছো, শুনি! 'মিঠু'স কেমিস্ট্রি ল্যাব' ই তো ভরসা।

-আমি এখন নিজেই রান্না করতে জানি, আপনার চেয়ে ভালই জানি।
- কথায় বলে, গাঙ পার হইলে মাঝি শালা। এখন তো বলবেই এই কথা। চিকেন গ্রীল মাস্টার খেতাব পেয়েছো, তা জানতে চাই, চিকেন ম্যারিনেট করা কার কাছে শিখেছো, শুনি! বেগুন দিয়ে করলা ভাজতে শিখেছো, কার কাছ থেকে, শুনি?

-আমি নিজে নিজেই শিখেছি।
-ঠিক আছে, নিজে নিজে শিখলেও তো ঐ কেমিস্ট্রির জ্ঞানকেই কাজে লাগিয়েছো। তা আমিও তো আমার কেমিস্ট্রি জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে 'মিঠু'স কেমিস্ট্রি ল্যাব' প্রতিষ্ঠা করেছি, যেখান থেকে প্রস্তুত হওয়া খাদ্য সামগ্রীর গুণে আজ তোমরা এত পটর পটর করতে শিখেছো।


এরপর নিজের মনে মনেই কিছুক্ষণ গজ গজ করলাম। কোন কুক্ষণে যে কেমিস্ট্রি পড়তে গেছিলাম। আমার পছন্দের বিষয় ছিল সাহিত্য এবং সংগীত। কেমিস্ট্রি না পড়ে যদি বাংলা সাহিত্য পড়তাম, এতদিনে আমার লেখা উপন্যাস/গল্প স্কুল কলেজে পাঠ্য হয়ে যেত, ( আমি এভাবেই স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নই যদি দেখবো, তবে কেন একেবারে উঁচুমাপের স্বপ্ন দেখবোনা)। ম্যাট্রিক পরীক্ষার কয়েক মাস আগে আমার এক শিক্ষক, কনক কান্তি পন্ডিত, আমাকে খুব স্নেহ করতেন, কুমিল্লা 'বার্ডে' চাকরী নিয়ে চলে যাওয়ার আগে আমার উপর বিরক্ত হয়ে ( লেখাপড়ায় ফাঁকী দিতাম)  বলেছিলেন, " তুমি তো ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল, তাইনা? কেমিস্ট্রিতে ফেল করবে তুমি, এই আমি বলে দিলাম"। স্যারের মুখের উপর কিছু বলিনি, ম্যাট্রিকে কেমিস্ট্রিতে ৯০ পেয়ে উনাকে চিঠিতে সেটা জানিয়েছি। এখানেই থামিনি, শুধুমাত্র স্যারের উপর জেদ করে কেমিস্ট্রি অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম। কেমিস্ট্রি মজার সাবজেক্ট, কিন্তু আমার মত ফাঁকীবাজের জন্য বিরক্তিকর এক সাবজেক্ট। তবুও তো ভালভাবেই পাশ করেছি। স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার করেও সময়মত অনার্স, মাস্টার্স কমপ্লীট করেছি, একেবারে তো ফেলনা কথা নয়! অনেক বছর পর কনক কান্তি স্যার পর্যন্ত আমার কাছে স্বীকার করেছেন যে জেদ বটে আমার!

সেদিন উত্তমের সাথে কেমিস্ট্রি নিয়ে তর্কাতর্কির পর ব্যাপারটি নিয়ে সীরিয়াসলী ভেবেছি, আসলেই কী আমি কেমিস্ট্রি পড়ে ভুল করেছি! আমি যখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি, তখন আমার বিয়ে হয়ে যায় কেমিস্ট্রির জাহাজের সাথে। বিয়ের পর আমি অনার্স, মাস্টার্স শেষ করি, এবং  সংসারে ছোট্ট মৌটুসীকে নিয়ে খেলা করি। মৌটুসীকে পেয়ে আমার চাকরী-বাকরী করার কথা মনেই হতোনা। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝেই মনে করিয়ে দিতেন,
" এত যত্ন করে তোরে লেখাপড়া শিখাইলাম, আর তুই এইভাবে জীবনটারে শেষ করতেছস?"
-মুখে মুখে তর্ক করা আমার স্বভাব, সাথে সাথে বলে দিতাম, " শেষ করছি কই? এই যে মেয়েকে মানুষ করছি"।
-মেয়ে মানুষ করতে কেমিস্ট্রি পাশ করার দরকার হয়না, তোর মায় তো কেমিস্ট্রি পাশ করে নাই, ঠিকই তো তোগোরে মানুষ করছে।
-হ, মায় সারাদিন স্কুলে কাটাইতো, আমরা কেউ মা'রে একেবারে কাছে থেকে পাই নাই, সেই দুঃখ মনের মধ্যে আছে, ঐজন্য ঠিক করছি, আমার মেয়েরে আমার কাছে রাখবো।

-মারে, চাকরী কইরাও মেয়ে মানুষ করতে পারবি, বি সি এস দে, প্রফেসারী করবি, মেয়ে মানুষ করবি, কেমিস্ট্রির মত সাবজেক্টে পড়লি, এখন রান্না ঘরে হাঁড়ি ঠেলে জীবন পার করবি?
-বাবা, বি সি এস দিলেও শেষ পর্যন্ত চাকরী পামুনা। আমি ভাইবা দিতে ডরাই, ভাইবা বোর্ডে পরীক্ষকরা আমার চেহারা দেখলেই  উলটা পালটা  কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে,  ভয়ে হাত পা ঘামতে থাকে। তাছাড়া, মৌটুসীর বাবা তো কিছু বলেনা, তোমরা কেন এমন করো?
-তোদের ভালর জন্যই এমন করি। মেধা কাজে লাগা, রান্না তো সবাই করে, আমাদের ঘরের গীতার মা'ও রানতে পারে, রান্নাটা এমন কিছু আহামরী ব্যাপারনা।
-বাবা, আমার কাছে রান্না আহামরী ব্যাপার। হুমায়ুন আহমেদ বলছে, ভাল রান্না খাইয়ে যে কোন পুরুষের মন জয় করা যায়। তাছাড়া, আমার বরটা সারা জীবন এখানে সেখানে থেকে লেখাপড়া করছে, কোনদিন সংসারের ভাত পায় নাই, আমি তার বউ, আমার তো দায়িত্ব তাকে সারা জীবন ভাল ভাল রান্না করে খাওয়ানো।

বাবা বলেন, এই কথা কইয়া দিলি তুই আটকাইয়া। আমি ত অবশ্যই চাই জামাই বাবাজীরে লইয়া সুখে শান্তিতে সংসার কর, তোর যদি মনে হয় প্রফেসারী করতে গেলেও সুখে ভাটা পড়বো, আমি ত বাবা হইয়া সেইটা বলতে পারিনা। তবে অবসরে কেমিস্ট্রি বইয়ের পাতা উল্টাইস, চর্চা রাখিস, ভবিষ্যতে প্রয়োজনে যাতে না ঠেকস।


আমার সেই প্রয়োজন বা সুযোগ, কোনোটাই আর আসেনি।  আমার আরও বেশ কিছু শুভাকাংক্ষী আমাকে বি সি এস পরীক্ষা দিতে বলতো, উত্তম কুমারের বৌদি, হলিক্রস কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন, কেমিস্ট্রি টিচারের অসুস্থতাজনিত কারণে আমাকে কলেজে দেড় মাস লীভ ভ্যাকেন্সীতে অধ্যাপনা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তখন দ্বিতীয় মেয়ে মিশা খুব ছোট। মৌটুসীর চার বছরের ছোট মিশা, জন্মের পর থেকেই মিশা ছিল খুব অসুস্থ, আমি পক্ষীমাতার মত আগলে রাখতাম দুই মেয়েকে। তখন বুঝতে পারতাম, অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে, আমার একটা চাকরীর প্রয়োজন ছিল। বড়দা আমাকে সব সময় নরম স্বরে বুঝাতো, বড়দার অনুরোধে বি সি এস পরীক্ষা দিলাম, লিখিত পরীক্ষা নিয়ে আমার কখনওই চিন্তা ছিলনা, আমি ভাইবা দিতে ভয় পেতাম। বি সি এস পরীক্ষার ভাইবা এগিয়ে এলো, এর মধ্যে মিশা আবার প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়লো। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ভাইবা দেবোনা। বড়দা আমার বাসায় এসে কত কাকুতি মিনতি করলো, আমি বললাম, আমি চাকরী করলে আমার মেয়েরা বাঁচবেনা। এমন কথা বললে কে আর এগোবে! তারপরেও বড়দা লেগেছিল আমার পেছনে, যদি একবার পাঠাতে পারে ভাইবা বোর্ডে। আমি যাইনি।

এত কিছু যে হচ্ছিল আমাকে নিয়ে, আমার উত্তম কুমার কিন্তু কখনও বলেনি কেমিস্ট্রি অনার্স, মাস্টার্স শেষ করতেই হবে, চাকরী করতেই হবে! আমার বাবার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতেই আমি অনার্স, মাস্টার্স শেষ করেছিলাম। এরফলে একটাই লাভ হয়েছে, ভাইয়েরা বিশেষ করে আমার মেজদা, কথায় কথায় খোঁটা দিত, " তোর লজ্জা করেনা, কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স তুই, এমন একজন জ্ঞানী মানুষের স্ত্রী হয়ে ঘরে বসে আছস" অথবা যদি কিছু নিয়ে তর্কাতর্কি হতো, মেজদা বলতো, 'তোর কথা বার্তা শুনলে তো মনে হয়না তুই কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করছস"। আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম। বলতাম, কেমিস্ট্রি পড়েছি বলে গান গাইবোনা, নাচবোনা, হাসবোনা, এমন কথা কোথায় শুনেছো? আমার ইচ্ছা হয়েছে, আমি চাকরী করবোনা, আমার ইচ্ছা হয়েছে, দুই মেয়েকে নিয়ে পুতুল খেলবো, তোমরাও আসতে পার এই খেলায়।
এরপর সংসারে মন দিয়েছি, মেয়েদেরকে একেবারে হাতে-পিঠে করে বড় করেছি। একসময় যখন মেয়েরা ভাল রেজাল্ট করতে শুরু করলো, বাবাকে বলেছি,  " বাবা, দেখো, আমার কেমিস্ট্রি জ্ঞান আমি কোথায় অ্যাপ্লাই করছি। মেয়েগুলোকে মানুষ করতে গিয়ে কেমিস্ট্রি কাজে লাগছে।"
বাবা বলতেন, " তুই যা বুঝাবি, তাই বুঝবো। ঠিক আছে, মেয়ে মানুষ কর, কিন্তু চর্চা রাখিস, বলা তো যায়না, কখন কাজে লাগবে। মেয়েদের জীবন, পায়ের নীচে মাটি শক্ত রাখা দরকার"।

মেয়েরা বড় হয়েছে, উত্তমের পায়ের নীচে মাটি শক্ত হয়েছে, বিয়ের পরেই জেনেছি, আমার উত্তমের ছোটবেলা থেকেই বাইরে বাইরে কেটেছে, (গ্রামে ভাল স্কুল-কলেজ ছিলনা বলে) মনে হয়েছে, আহারে! আমরা মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্নীয়-স্বজন মিলে কত আনন্দে জীবন কাটিয়েছি, আমার উত্তম এগুলো কিছুই পায়নি, আমি চেষ্টা করবো জীবনের না-পাওয়া অংশটুকু পুষিয়ে দিতে, তাই চেষ্টা করেওছি, সংসার জীবনের আনন্দ  সে পূর্ণমাত্রায় পেয়েছে,  রান্না-বান্নায় আমার বরাবর উৎসাহ, হুমায়ুন আহমেদের সেই উক্তিটিকে কাজে লাগিয়েছি, ফল পেয়েছি। উত্তম আমার বশে থেকেছে সারা জীবন।

সেই উত্তম এত বছর বাদে আমাকে কেমিস্ট্রি ডিগ্রী নিয়ে খোঁটা দিল??? অনেক ভেবে চিন্তে বের করলাম কারণ, ফেসবুকে বসে থাকি বলে বাবুর গোসা হয়েছে, আমি যে স্বাস্থ্যগত দিক চিন্তা করে আগের মত চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খাবার রান্না করিনা, সেটা সে বুঝতে পারেনি, ভেবেছে ফেসবুকে ব্যস্ত থাকি বলে রাঁধিনা। সেইজন্য সে নিজে নিজেই রান্না শুরু করে দিয়েছে। লাঞ্চ ব্রেকেও নিজের বানানো খাবার নিয়ে যায়, আমার টনক নড়েছে। আরে! আমার উত্তম তো দেখি বশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটা তো ভালো লক্ষ্মণ নয়। আমাকে আবার কেমিস্ট্রি ল্যাব চালু করতে হবে।

গতকাল জিজ্ঞেস করলাম, " কাল তোমার লাঞ্চ ব্রেক কখন?"
-আমার আবার লাঞ্চ ব্রেক কী? ১টা থেকে ল্যাব শুরু হয়।
-থীওরী ক্লাস শেষ হয় কখন?
-১২টায়।
-তুমি লাঞ্চ খেতে বাসায় এসো।
-নাহ! ১২টা থেকে ১টা , এই এক ঘন্টার জন্য আসবো, খাবার রেডী হতে হতে ল্যাব শুরু হয়ে যাবে।
-বললাম তো, ১২টার সময় আসবে, ১টা বাজার আগেই তুমি ল্যবে ঢুকে যেতে পারবে।

উত্তম কুমার এসেছিল, সোয়া বারোটায়। এর মধ্যেই আমি স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে কম তেলে পরোটা ভেজেছি, চীজ পুর দিয়ে ডিম ওমলেট ভাজা হয়েছে ( ওমলেট অবশ্য মিথীলার হেল্প নিয়েছি), আলু ফুলকপি ভাজা ছিল, এগুলো দিয়ে খেতে দিয়েছি, ওমা! দেখি উত্তম রেফ্রিজারেটার খুলে আরেকটা বাটি বের করেছে, বলে, " চিকেন কিমা দিয়ে ডাল রেঁধেছিলাম সেদিন, পরোটা দিয়ে খেতে ভাল লাগবে, খাই"। আহারে! মনটা হঠাৎ করে মায়ায় ভরে গেলো, বাবা নেই, মা নেই, দিদিরা কেউ বেঁচে নেই, আমি আর তিনটি মেয়েই আছি তার একান্ত আপনার জন হয়ে! বললাম, " খাও, ডাল দিয়েও খাও, ডিম খাও, ফুলকপি ভাজাও খাও"। খেয়েদেয়ে দিব্বি বাবু ১টা বাজার আগেই আবার ডিপার্টমেন্টে চলে গেল।  এরপর থেকে সে আমাকে আর কেমিস্ট্রি ডিগ্রী নিয়ে খোঁটা দিবে বলে মনে হয়না!



Monday, June 17, 2013

ক্লান্ত ইচ্ছে ডানা!!!!



একটানা ছয়দিন অফিস শেষে আজ পেলাম কাঙ্ক্ষিত অফ ডে! অফ ডে মানে দারুণ ব্যাপার। মনে হয় দিনটি হবে শুধুই আমার, যা মন চাইবে তাই করবো। যদি ইচ্ছে করে তাহলে বেলা এগারোটায় ঘুম থেকে উঠবো, যদি ইচ্ছে করে তাহলে হয়তো ঘুম থেকে জাগবো, তবে উঠবোনা। এমন কত ধরণের ইচ্ছে যে করে। ইচ্ছে তো ইচ্ছে, বাস্তবে যা হওয়ার নয়, সেটাই ইচ্ছে হয়ে প্রকাশ পায়। আগে ইচ্ছে করতো, ছুটির দিনে শুধুই ঘুরে বেড়াই, কারো বাড়িতে নয়, সুন্দর কোন জায়গা, লেকের পাড় অথবা তেমনই কিছু একটা। ঝুড়িতে খাবার থাকবে, মাঠে চাদর বিছিয়ে আমি আর আমার স্বামী পাশাপাশি বসে ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে ঢেলে খাব আর গল্প করবো, ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজবে, নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়, আর সেই বড় আকাশের নীচে ছোট্ট মিথীলা দৌড়ে বেড়াবে, মাঝে মাঝে আমাদের কাছাকাছি এসে দেখে যাবে, আমরা আছি, ওকে রেখে কোথাও যাইনি।

অনেক আগে, ৯০-৯৫ সালের দিকে, যখন ঢাকাতে থাকতাম, স্বামী উত্তম কুমার ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আর আমি ছিলাম স্বেচ্ছাগৃহী, সেই সময়গুলোর কথা ভাবি, সপ্তাহের ছয় দিন, দুই মেয়ে মৌটুসী ও মিশাকে নিয়েই কাটিয়ে দিতাম সারা দিন, সারা বেলা। সুন্দর এবং সুখী গৃহকোণ বললে যে ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে, তেমনই এক সময় ছিল আমাদের। আমার এবং আমাদের দুই মেয়ের চাহিদা এবং ইচ্ছেগুলো ছিল খুব ছোট ছোট। ফলে অধ্যাপক স্বামীকে খুব একটা বেগ পোহাতে হতোনা আমাদের ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে। তবে আমার একটু বেগ পোহাতে হতো অধ্যাপককে রাজী করাতে। আমি তো সারা সপ্তাহ ঘরেই থাকতাম, তাই বুঝতেই পারতামনা, ছয় দিন বাইরে কাটিয়ে আসার পর সবার মন ঘরের পানেই ছুটে, উত্তম কুমারেরও খুব ইচ্ছে করতো ছুটির দিনটা আরামে শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিতে। অথচ আমার ইচ্ছে করতো, প্রতি শুক্রবার, ছুটির দিনে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যেতে।

খুব বেশী দূর তো নয়, কাছে-পিঠে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ী। বেচারা স্বামী হয়তো সস্তা দামের সোফাটায় আরাম করে বসে পত্রিকা পড়ছে অথবা কেমিস্ট্রি বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে, অমনি আমার মাথার ভেতরের পোকাগুলো নড়েচড়ে উঠতো। নিজের ইচ্ছে হয়েছে, এমনভাবে ইচ্ছেটাকে প্রকাশ করতামনা, মেয়েদের খুব শখ হয়েছে জ্যেঠুর বাড়ী যাওয়ার, মেয়েদের খুব শখ হয়েছে বড়মামার বাড়ী যাওয়ার, মেয়েদের খুব শখ হয়েছে বাণিজ্যমেলা দেখার, ঠিক এভাবে ইচ্ছেগুলোকে জায়গা বরাবর পেশ করে দিতাম। কাজ হতো, মেয়েদের বাবা আবার ভীষন কন্যাভক্ত ছিলেন, কন্যা জন্মাবার আগে থেকেই কন্যা ভক্ত পিতা উনি। বাল্মিকী মুনি যেমন রাম না জন্মাতেই রামায়ন রচেছিলেন, আমার স্বামীটি বিয়ের আগেই মৌটুসীনামা লিখেছিলেন।

মৌটুসী আমাদের প্রথম সন্তান। বিয়ের পর, প্রতিটি স্বামী-স্ত্রীর মত আমরাও ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বপ্ন দেখতাম, জ্যোতিষীদের গননা অনুযায়ী আমি জানতাম, আমাদের প্রথম সন্তান হবে ছেলে, আর আমার স্বামী নিজের মনেই জানতেন, যার সাথেই বিয়ে হোক, তাদের প্রথম সন্তান হবে মেয়ে, উনি আমার চেয়ে একধাপ এগিয়ে ভবিষ্যত কন্যাটির জন্য নামও ঠিক

করে রেখেছিলেন, মৌটুসী। দুজনের ইচ্ছেগুলো পরস্পরের মধ্যে জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর মৌটুসীর মুখখানা দেখার আগে পর্যন্ত দুজনের ইচ্ছেগুলো একধরণের নীরব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, দেখা যাক, কার ইচ্ছে পূরণ হয়! ভাগ্যবানদের ভাগ্য নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে নেই, ভাগ্যবানদের বৌ ভাগ্য ভাল হয়, ভাগ্যবানদের কন্যাভাগ্য ভাল হয়, ভাগ্যবানদের একটার বদলে তিনটে কন্যা হয়, এভাবেই আমি আমার স্বামীর সাথে রসিকতা করতাম।

আমার উত্তম কুমার মেয়েদের যে কোন আবদার হাসিমুখে মেনে নিত। ফলে প্রায় প্রতি শুক্রবার আমি মেয়েদেরকে উস্কে দিতাম, যা, বাবাকে বল, আজকে আমরা জ্যেঠুর বাসায় বেড়াতে যেতে চাই। সমস্যা হতো মৌটুসীকে নিয়ে, এই মেয়ের কোন বায়নাক্কা ছিলনা, তাই আবদারের ভাষাও জানা ছিলনা। সুবিধা হয়েছে মিশা জন্মাবার পর। এই কুট্টি থাকতেই মিশা বাইরের খোলা আকাশ ভালোবাসতো, রোগা মেয়ে ছিল, অসুখে ভুগতো, কান্নাকাটি করলে একটু ঘরের বাইরে নিয়ে গেলেই চুপ হয়ে যেত। মনে পড়ে, যখন হাতীরপুল ভুতের গলিতে থাকতাম, কোথাও থেকে ফিরে আসার সময় রিক্সা বা বেবী ট্যাক্সী যখনই হাতীর পুলের গলি দিয়ে ঢুকে যেতো, এক বছর বয়সী মিশা কোলের উপর গা মোচরাত আর না না আওয়াজ করতো। আর আমি উত্তমকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম, ইস! এই মেয়েটা একেবারে একটা বেড়ানী হয়েছে। সারা সপ্তাহ ঘরে থাকেতো, তাই বেড়াতে পারলে খুশী। বলেই ছোট্ট মিশাকে ঊদ্দেশ্য করে বলতাম, মিশা, সোনা, এমন করেনা, আজ বাসায় চলো, আবার আগামী শুক্রবার বেড়াতে যাব। তখন বনানী যাব, বড়মামার বাড়ী। উত্তম সবই বুঝতো, জ্ঞানী মানুষ, চোখের ইশারাই যথেষ্ট। মুচকী হাসতো, হাসুক, ধরা পড়ে গিয়েও ধরা না পড়ার ভাণ করতাম।

এরপর সারা জীবনে অনেক বেড়িয়েছি। মেলবোর্ণে যখন ছিলাম, প্রতি উইকএন্ডে আমরা ট্রেনে চেপে কতদূর চলে যেতাম। সমুদ্র আমার প্রিয়, মিশারও প্রিয়। মিশা খুব জেদী মেয়ে, বাপ সোহাগী, ছোটবেলায় বলতো, দিদিসোনা মায়ের পেটে ছিল, আমি বাবার পিঠে ছিলাম। সেই মিশার আবদার অগ্রাহ্য করার কোন ক্ষমতাই ছিলনা ওর বাবার। ছোটবেলায় খুব অসুস্থ থাকতো বলেই মিশার প্রতি আমাদের সবারই প্রশ্রয়সূচক দূর্বলতা আছে। মেলবোর্ণ থেকে ফিরে ঢাকায় ছিলাম চার বছর, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। এই চার বছর আমি ছিলাম আমার ইচ্ছার অধীন। যা ইচ্ছে হতো, সেটাই করতাম। তখন আর উইকএন্ডের আশায় অথবা উত্তম কুমারের অপেক্ষায় থাকতামনা। চাকরীর সুবাদে অফিস থেকে ফুলটাইম পাজেরো জীপ পেয়েছিলাম, পাজেরো জীপ ছিল আমার এবং মিশার ইচ্ছাধীন। কত যে বেড়িয়েছি, ভাল লাগছেনা, মিশা চল, আশুলিয়া ঘুরে আসি, অথবা মিশা চল, গুলশানের বাড়ীগুলো দেখে আসি। ঘন্টা দুই ঘুরে ফেরার পথে উত্তমকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে বাড়ী ফিরতাম। ইচ্ছে হয়েছে দূরে কোথাও যেতে, দুই চারজন প্রিয় মানুষকে সঙ্গী করে চলে গেলাম টাঙ্গাইল, বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর দাঁড়িয়ে, দোতলা বাসে উঠে সেতু ঘুরে আবার ঢাকা ফিরে আসতাম।

একবার ইচ্ছে হয়েছিল, ঢাকা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বসে ক্রিকেট খেলা দেখবো। উঠলো বাই তো কটক যাই অবস্থা আমার। অস্ট্রেলিয়া বনাম ইন্ডিয়া খেলার টিকেট কাটিয়েছি, আমার খুব প্রিয় কয়েকজনকে নিয়ে স্টেডিয়ামের সাধারণ গ্যালারীতে বসে পুরো খেলা উপভোগ করে রাত বারোটায় বাড়ী ফিরেছি। কী দারুণ অভিজ্ঞতা, সাধারণ দর্শক গ্যালারীতে, সাধারণ দর্শক হয়ে, সবার সাথে গলা ফাটিয়ে শচীন শচীন করার মধ্যে যে কী আনন্দ ছিল, তা যে না জানে, তাকে জানানো যাবেনা।

মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে। যাযাবর জীবনের অবসান হয়েছে, ব্যাঙ্ক থেকে ডলার ঋণ করে ছোট্ট একটা বাড়ী কেনা হয়েছে, সেই বাড়ীর পেছনের ফাঁকা জায়গায় শখের বাগান করা হয়েছে। সেখানে নানা জাতের সব্জী চাষ করার চেষ্টা করছি, কিছু হয়, কিছু হয়না। এখানে আমাদের গাড়ী আছে, কিন্তু গাড়ীচালক ক্লান্ত। আমার ইচ্ছের সঙ্গী মিশা নিজেই এখন একা একা দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ায়, বায়নাক্কাহীন মৌটুসী ঘুরে বেড়ায় আমেরিকার নামী-দামী স্থান, ছোট মিথীলাকে নিয়ে আমার আর কোথাও যাওয়া হয়না। আমার সেই যাযাবর ইচ্ছেগুলোও কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, সেই যাযাবর ইচ্ছের জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে কম্পিউটার কী-বোর্ড! সুযোগ একটু পেলেই হয়, সারাক্ষণ চলে খটাখট খটাখট।

তারপরেও খুব মাঝে মধ্যে পুরানো ইচ্ছেগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। অফিসে ছুটি চাই, নিজের মনে পরিকল্পনা করি, ছুটি পেয়েই দূরে কোথাও চলে যাব। সমুদ্র আমার অতি প্রিয়, কতবার যে সমুদ্রের কাছে গিয়েছি, সাঁতার জানিনা, সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কা খেয়ে এদিক থেকে সেদিকে চলে গেছি, আহা, কী আনন্দ! বুঝি, এই যাযাবর ইচ্ছেটা পেয়েছি দিদিমা ও মায়ের কাছ থেকে। আমার আগেই এই দুই নারী যাযাবর ইচ্ছে নিয়ে পৃথিবীতে কিছুদিন কাটিয়ে গেছেন। উনারাও ছিলেন ইচ্ছে স্বাধীন, স্বামীরা উনাদের সঙ্গী হতেন না ঠিকই, কিন্তু তাঁদের ইচ্ছেগুলোকে বাধা দিতেননা। ঠিক আমিও পেয়েছি তেমনই একজনকে, যিনি যাযাবর জীবনে ক্লান্ত হয়ে ইদানিং আমার সাথে আর পা ফেলেন না, তবে একসময় পা ফেলেছেন, আমার ইচ্ছেগুলোও ডানা মেলেছিল। এখনও আমার অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে, তবে বাস্তবে নয়, কল্পনায়!

অসারের তর্জন গর্জন সার!!

আজ সকাল থেকে মনটা শুধুই 'বিদ্রোহী' হয়ে উঠতে চাইছিল। মনে হচ্ছিল, " আজ আমি রাঁধবোনা, চুল বাঁধবোনা, ওয়ালমার্টে যাবোনা, চাকরী করবোনা~~~~" । কারণ আজ ছিল  রবিবার, তার উপর 'বাবা দিবস', এমন দিনে ঘুম ভেঙ্গে যায় সকাল নয়টায়? দুই চোখের পাতা টেনে খুলতে পারছিলামনা, অথচ মাথায় ঠিক ঘুরছিল, আজ শুধু আমাকেই কাজে যেতে হবে, পৃথিবীর আর কেউ কাজে যাবেনা, শুধু আমি ছাড়া। গতকালকেই জেনেছি, আমার ডিপার্টমেন্টে আজ দু'জন মাত্র এসোসিয়েট কাজ করবে, বাকীরা 'ফাদার'স ডে'র ছুটি কাটাবে। দু'জনের একজন হচ্ছি আমি। বিদ্রোহের দানা তখন থেকেই বাঁধতে শুরু করে। ভাবলাম, ফোন করে জানিয়ে দেই, " আমি আজ কাজে আসবোনা"। একফাঁকে ফোনটা হাতে তুলেও নিয়েছিলাম, কী মনে করে যেন রেখে দিলাম।

মনে পড়ে গেলো, গত দু'দিন আগেই ভাবতে শুরু করেছিলাম, ওয়ালমার্টের ম্যানেজারদেরকে একটু ঢিট দিলে কেমন হয়, বেটারা ঘুঘু দেখছে, ফাঁদের কথা ভুলেই গেছে। একটানা তিনদিন 'সীক কল' দিয়ে দিলে কেমন হয়! বুঝবে মজা ।  কত বড় সাহস, মাদার'স ডে এবং ফাদার'স ডে, দুই ডে'তেই আমাকে কাজে আটকে দিয়েছে, সবাইকে ছুটি, শুধু আমাকে কাজ। ওরা ধরেই নিয়েছে, আমার এত বছরের পুরানো সংসার যখন, স্বামী-সন্তানও নিশ্চয়ই পুরানো হয়ে গেছে, পান থেকে চুন-সুপারী খসে পড়লেও ভয়ের কিছু নেই, স্বামী যেটা আছে, সেটাই থেকে যাবে অনন্তকাল। আমেরিকানদের সমস্যা, পানের পাতায় টোকা লাগলেও তাদের ঝগড়া লেগে যেতে পারে, ছুটিছাটা না  পেলে ডিভোর্সও হয়ে যেতে পারে, কী দরকার এইসব ঝামেলার মধ্যে গিয়ে। তারচেয়ে বরং রীটা আর টেরেসাকে ওয়ার্কিং স্কেজিউল দেয়া হোক, রীটার পুরানো সংসার আর টেরেসার তো সংসার বা বয়ফ্রেন্ড এর বালাই নেই, তাই এই দুজনের  নিশ্চয়ই  আলাদা করে  আনন্দ-উচ্ছ্বাস করার মত কিছু থাকতে নেই।

এত পরিকল্পনা করে শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছি, শনি এবং রবি, এই দুই দিন  দেরী করে কাজে যাব। কিন্তু পারিনি, দেরী করে কাজে যাওয়া মানে আমারই লোকসান, তিন দিন দেরী করা মানে এক দিনের অনুপস্থিতির শামিল। এটা করবোনা, তাহলে আর কী উপায়ে ওদেরকে শিক্ষা দেয়া যায়? ঠিক আছে, লাঞ্চ ব্রেকে যখন বাড়ী আসবো, আর ফিরে যাবো না। এটাই ভাল, দেখি, কাকে দিয়ে ক্লোজিং করায়, বেটাদের নিজেকেই আসতে হবে ক্লোজিং করার জন্য। তখন বুঝবে মজা, কাজ তো জানেনা একটাও, খালি প্যান্টের পেছনের পকেটে ওয়াকী টকি নিয়ে অযথা ব্যস্ততার ভাণ দেখিয়ে ছুটোছুটী করতে থাকে।


সকাল দশটার দিকে ফেসবুক ওপেন করে সেখানে আটকে গেছি, সিদ্ধান্ত তো আগেই নেয়া ছিল, দুপুরে এই বাড়ীর 'বাবা' টির জন্য সরষে ফুলের বড়া, কুমড়ো ফুলের বড়া ভাজবো, পরোটা বানাবো, ডিমের অমলেট করে দেবো, মজার 'বাবা দিবস' হবে। বেলা ১১টার দিকে কিচেন থেকে খুট খুট আওয়াজ আসছে শুনে কম্পিউটার ছেড়ে কীচেনে গেলাম, দেখি বাড়ীর 'বাবা' হাতে প্লেট নিয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের সামনে দাঁড়ানো। প্লেটে সাজানো আছে তার নিজের হাতে গ্রীল করা চিকেন, ভুট্টা, চিকেন ডাল এবং কিছু পচা ভাত। ভাতগুলো যে পচে গেছে, তা ভাতের চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। বললাম, " এত তাড়াতাড়ি খাবে, আমি তো ভেবে রেখেছিলাম, সর্ষে ফুলের বড়া ভাজবো"। সে বলে, " তুমি যা ভেবে রেখেছো সেভাবেই এগিয়ে যাও, আমি আমার ভাবনা মতো কাজ করি"।
বললাম, এখন সকাল এগারোটা বাজে, এখন লাঞ্চের সময় না, একটু অপেক্ষা করো, ফুলগুলো  তোমার জন্যই রেখেছি"।
-এখন সকাল ১১টা নয়, বলো, বেলা ১১টা বেজে গেছে, আমার ক্ষিদে পেয়েছে, আমি খেয়ে নিচ্ছি। তুমি বড়া ভাজো, পরে খাওয়া যাবে।"
এতদিন একটু একটু করে সরষে ফুল জমিয়েছিলাম, আর আজ বলে কিনা, "ভাজো, পরে খাওয়া যাবে"। ভাবতে শুরু করেছি, বিদ্রোহটা  ঘর থেকেই শুরু করে ফেলবো নাকি, দেই ছুঁড়ে ফুলের পাপড়ি ডাস্টবিনের মধ্যে, নিকুচী করেছি সরষে ফুলের বড়ার। ভাজবোনা বড়া, যার জন্য করি চুরী, সেই বুকে হানলো ছুরী!!! ঠিক আছে, আর কোনদিন গাছ থেকে ফুল-ফল তুলে আনবোনা, বুঝবে তখন 'বাগান করার' মজা। ঘড়িতে বাজে সাড়ে এগারোটা, মাথাটা এলোমেলো লাগছে, কাজে ফোন করে নাহয় বলে দেই, আজ আমি দুই ঘন্টা পরে আসবো। আবার ভাবি, ফোন করার প্রয়োজন কি, ফোন করলে তো আর ওদেরকে শিক্ষা দেয়া যাবেনা, ওরা তো জেনেই যাবে আমি দুই ঘন্টা পরে হলেও ঠিকই কাজে উপস্থিত থাকবো। ফাদার'স ডে বলে কথা,  জোড়াতালি দিয়ে দুই ঘন্টা পার করা যাবে। আর আমি যদি কিছুই না জানাই, তাহলে ওরা অনিশ্চিতের অপেক্ষায় কাটাবে, যেটা আমি চাইছিলাম।

বড়া ভাজা শেষ করে কাঁটায় কাঁটায় ১২টায় ঘর থেকে বের হলাম। কাজে পৌঁছুলাম ১২টা বেজে ১০ মিনিটে। ওয়ালমার্টে পৌঁছে দেখি, চারদিকে শুধু 'হ্যাপী ফাদার'স ডে' গন্ধ, আর আমার ঘরে 'আনহ্যাপী ফাদার' কে দেখে এলাম। বাড়ীতে মিথীলাকে ফোনে বললাম, " আজ পাপাকে নিয়ে সন্ধ্যায় বাইরে গিয়ে খেয়ে আসবে"। মিথীলার তো খুশী আর ধরেনা। সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ী গিয়ে আর ফিরবোনা। যেমন ভাবা, তেমন প্রচার। প্রচার করতে লাগলাম, আজ আমি লাঞ্চ ব্রেক থেকে ফিরবোনা। টেরেসা জিজ্ঞেস করে, -তাহলে কে ক্লোজ করবে? আমার উত্তর, যার মন চাইবে সেই ক্লোজ করবে। আমার মন চেয়েছে, আমি আজ আর ফিরিবোনা।


লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ী ফিরে দেখি, বাপ-বেটি ঘরে নেই, সিনেমা দেখতে গেছে। বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করলো, সবার 'বাবা দিবস' আছে, শুধু আমার বাবা দিবস নেই। থাকবোনা বাসায়, ফিরে যাব ওয়ালমার্টে,  যাওয়ার আগে শুধু মচমচে করে আলু ভাজলাম আর পেঁয়াজ সম্বার দিয়ে মুসুরীর ডাল রাঁধলাম, আমি এসেছিলাম সেই চিহ্ন রেখে গেলাম, অপরাধবোধে ভুগুক সবাই, বুঝুক আমার কন্যার বাপ, কন্যার মা'কে ফেলে শুধু কন্যাকে সাথে নিয়ে সিনেমা দেখার মজা!  আধ ঘন্টা সময় বেশী থাকলাম, চলে গেলাম কাজে।  ফ্লোরে ঢুকতেই  ডেভিডের সাথে দেখা, দুই হাত উপরে তুলে নাচতে নাচতে আসছে। কাছে এসেই বললো, " তুমি এসেছো? শুনলাম, তুমি নাকি আজ আর ফিরবেনা"! বললাম, " তেমনই বলেছিলাম"। সে বলে, " কী মজা, থ্যাঙ্কস গড!  তুমি ফিরে এসেছো, এদিকে এতক্ষণ আমার দম বের হচ্ছিল কাস্টমারদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে। তুমি বাঁচালে।" মনে মনে খুশী হলাম, প্রাথমিক জয় হয়েছে, ম্যানেজারের দম বের হওয়ার যোগার হয়েছে তাহলে!!

ফ্লোরে যেতেই শুনি, একজন ফোন চুক্তি করার জন্য এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষায় আছে। তাকিয়ে দেখি ঢ্যাঙা লম্বা এক ছেলে ঊদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে দেখতে পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে জানালো, সে হাতে করে ফোন নিয়ে এসেছে, নতুন  চুক্তি সই করে পুরানো ফোনকে অ্যাক্টিভেট করবে। বেকুবটার কথা আর শেষ করতে দিলামনা, বললাম, " তোমার ক্রেডিট রেকর্ড চেক করা হবে, যদি রেকর্ড ভালো হয়, তাহলে বিনা ডিপোজিটে তুমি কন্ট্র্যাক্ট করতে পারবে, আর যদি খারাপ হয় তাহলে টাকা ডিপোজিট রাখতে হবে। আর  আমাদের কাছ থেকে নতুন ফোন পাবে।"
"না, আমি এই পুরানো ফোনই ব্যবহার করবো।"
-তা করো, কিন্তু আমাদের কাছ থেকে তুমি নতুন ফোন পাবে।
- আমার মা আমাকে এই ফোনটা দিয়েছে, সেটা মায়ের নামে কন্ট্র্যাক্ট,  আমি লাইন ক্যানসেল করে চলে এলাম, নিজের নামে নতুন লাইন নেবো। যদি আমার ক্রেডিট ভালো না হয়--------
-ক্রেডিট ভালো না থাকলে অনেক টাকা ডিপোজিট দিতে হবে।
-আচ্ছা আমি দেবো, তুমি চেক করো।

ভাল পাগলের পাল্লায় পড়েছি, কেন যে আবার ফিরতে গেলাম, বাসায় ছিলাম, সেই ভালো ছিল। ক্রেডিট চেক করে বললাম, তোমাকে ৫০০ ডলার ডিপোজিট রাখতে হবে।
 বলে, কোন সমস্যা নাই, ৫০০ ডলার ডিপোজিট দেবো, আর আমার পুরানো ফোনটাকেই রাখতে চাই।
- রাখো তোমার ফোন তোমার কাছে, তোমার ফোন আমরা নেবোনা, আমরা বরং তোমাকে আরেকটি ফোন দেবো।
-আচ্ছা তাহলে একই রকম আরেকটি ফোন দাও।
-কেন, একটা ফোন তো আছেই, এখন অন্য মডেল নাও।
-না, আমি স্যামসাং গ্যালাক্সী থ্রী চাই এবং লাল রঙই চাই।

কী আশ্চর্য্য! এই ছেলের সমস্যা আছে, হাতে ধরা আছে লাল রঙের স্যামসাং গ্যালাক্সী, আবার ডুপ্লীকেট ফোন চাইছে, কে জানে,  ফোন অ্যাক্টিভেট করার পরে আবার বলবেনাতো, টাকা নেই?  মাঝে মাঝে এমন ঘটনা ঘটে, তখন খুব অসুবিধা হয়, কন্ট্র্যাক্ট ক্যানসেল করতে হয়,  ব্র্যান্ড নিউ ফোন পাঠাতে হয় ক্লেইম ডিপার্টমেন্টে, অনেক ঝামেলা, তার উপর আজ রবিবার।  বললাম, আচ্ছা, তোমার হাতে একটা লাল ফোন আছে, তুমি এবার নাহয় নীল নাও, অথবা সাদা গ্যালাক্সী নাও।
-না, লাল রঙ আমার পছন্দের, তাই দুইটা লাল গ্যালাক্সী থাকবে।

কথা না বাড়িয়ে ফোন অ্যাক্টিভেট করে যখন বললাম, ৫৮২ ডলার দিতে হবে, সে পকেট থেকে চেকবই বের করে চেক ছিঁড়ে দিল। তখনই আমার মনের মধ্যে খচ করে উঠেছে, এই চেক না জানি বাতিল হয়ে যায়। চেক স্ক্যানারে দিতে 'ডিনাইড' হয়ে গেল। যা ভেবেছিলাম, তাই। ঐ সময়টাতেই কী কারণে যেন ম্যানেজার ডেভিড আমার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। সে লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা, আমি ছেলেটিকে বললাম, চেক ডিনাইড, এখন কীভাবে দাম দিবে?
সে দেখি নির্বিকারভাবে বলে, ওহ তাই, চেক ডিনাইড হয়ে গেলো? তাহলে তো আর ফোন নিতে পারছিনা।

আমার মাথায় আগুন ধরে গেল, স্বভাবের বাইরে গিয়ে বললাম, - তোমাকে তো আগেই বলেছিলাম, অনেক টাকা লাগবে, তাছাড়া একবার ফোন অ্যাক্টিভেটেড হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকবেনা। তুমি আমার কথা শুনতে চাইলেনা।
সে বলে, " আমি কী জানি?  আমার চেক  অ্যাকাউন্টে মনে হয় টাকা নেই।
( মনে মনে বলি, আমার আগেই মনে হয়েছিল, তু্মি একটা  বিশাল যন্ত্রণা )
 ডেভিড বলে, তুমি তোমার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করো।
-মনে হয় ঐটাতেও টাকা নেই, থাক, আমার ফোন লাগবেনা।
-ডেভিড বলে, তবুও দেখোনা একবার, যদি কার্ডে টাকা থাকে!
আমি গুনগুন করে বললাম, কার্ডে কিছুই নেই।
ডেভিড বলল, বুঝতেই পারছি।

ছেলেটি আবার বললো, থাক আমার ফোন লাগবেনা!
-
বলি, ফোন লাগবেনা বললেতো চলবেনা, তোমাকে কতভাবে বুঝিয়ে বলেছি, তারপরেও আমাকে দিয়ে এত দামী ফোন অ্যাক্টিভেট করিয়েছ, এখন বলছো নিবেনা, এটা তো ঠিক কাজ হচ্ছেনা।

ডেভিডের হতাশভাবে  আস্তে করে শুধু বলল, ওয়ার্থলেস!
আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা 'ওয়ার্থলেস'কে বললাম, দাঁড়িয়ে আছ কেন, আমাদের সাথে তোমার আর কোন কাজ তো নেই।

আমি কী তাহলে যেতে পারি?

একবার ইচ্ছে হচ্ছিল, দুইটা চড় দিতে, কী ঝামেলা বাড়িয়ে দিয়ে গেলো আমার, রবিবার সব ছুটি থাকে, কর্পোরেট অফিস বন্ধ হয়ে যায় অনেক আগে, হট লাইনে ফোন করতে হবে এই চুক্তি বাতিল করার জন্য। কোন কুক্ষণে যে লাঞ্চ ব্রেক থেকে ফিরে এলাম। মূর্তিমানের দিকে তাকিয়ে বললাম, " তুমি এবার যেতে পারো, বাকী কাজ আমাকে সারতে হবে।

ডেভিড বলে, কী ঝামেলা বেঁধে গেল!
-এইজন্যই আমি বলে গেছিলাম, আজ আর ফিরবোনা, আমি জানতাম, আজকের দিনটা একটা বাজে দিন।
-মন খারাপ করোনা, বুঝতে পারছি, মেজাজ খারাপ হওয়ারই কথা, সমস্যা হলে আমাকে পেইজ করো, যদিও আমি কিছুই জানিনা কন্ট্র্যাক্ট বাতিলের  নিয়ম কানুন, তবুও পেইজ করো।

-ধন্যবাদ তোমাকে, প্রয়োজন হলে জানাবো।

*** অন্যদিন হলে এই কন্ট্র্যাক্ট বাতিল করতে ২০  মিনিট লাগতো, আজকে লেগেছে ৪০ মিনিট, জানতাম, এমনই হবে, সকাল থেকে মন বিদ্রোহ করেছিল, না আসলেই পারতাম, কাজের প্রতি বেশী সিনসিয়ারিটি দেখাতে গিয়েই এভাবে  ধরা খেলাম।

Sunday, June 16, 2013

একটি 'বাবাময়' সন্ধ্যা!

আজ সন্ধ্যায় আমাদের নেমন্তন্ন ছিল হক ভাইয়ের বাড়ীতে। হক ভাই  মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে  ফুড সায়েন্স-এর জাঁদরেল প্রফেসার, আন্তর্জাতিকভাবেও উনার খ্যাতি আছে।  উনার  বাড়ী স্টার্কভিল নামক এক শহরে, স্টার্কভিল আমাদের বাড়ী থেকে ২৫ মাইল দূর। গাড়ী করে যেতে ২৫ মিনিটের বেশী লাগেনা। আমরা আজ সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ঐ বাড়ীতেই কাটিয়ে এলাম।

হক ভাইকে আমি উনার অনুরোধে 'দাদা' বলে ডাকি। আমার স্বামী ও ছোট মিথীলা ছাড়া ধারে কাছে আপনজন বলতে কেউ নেই, বাকী দুই মেয়ে থাকে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে। হক ভাইয়ের এক মেয়ে থাকে বাবার কাছে, পরিবারের আর বাকীরা সকলেই যার যার কর্মস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। ফলে আমরা  ও আমার দাদা, সুযোগ পেলেই নিজেদের মধ্যে আড্ডা দেই, খাওয়া-দাওয়া, গল্প-গুজব, গান-বাজনা করে কিছুটা সময় আনন্দে কাটাই। অবশ্য 'গান-বাজনা' কথাটির মধ্যে একটু অতিরঞ্জন আছে, দাদা বা আমার উত্তম কুমার, কারো গলা দিয়েই 'সা' অথবা 'পা' বের হয়না, বাজনা বাজাবে কী! বাকী থাকি আমি, আমি 'সা'-পা-সা ভালই বুঝি কিন্তু ভাল করে  গাইতে পারিনা, গলা উঁচুতে উঠাতে গেলেই ধরা পড়ে যাই। তারপরেও আমার দাদা আমাকে খুব করে বলেন, 'মিঠু, গাও, ঐ গানটা গাও"! আফসোস হয়, কী সোনালী দিন ছিল যখন অনায়াসে কত সাবলীলভাবে গান করতাম, সময় কাউকে ছাড়েনা, ক্ষয় করে দেয়।

সোমা এবং দীপালোক মিসিসিপি স্টেট এর ছাত্র, ওরা স্বামী-স্ত্রী  দুজনেই হক দাদার অধীনে গবেষনা করে। সোমার ও দীপালোকের ছয় বছর বয়সী মেয়েটির নাম সাঁঝবাতি। গত পরশুদিন দেশ থেকে সাঁঝবাতির দাদুরা এসেছেন, একজন দীপের বাবা, আরেকজন সোমার বাবা। দুই বেয়াই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে এসেছেন। দীপালোকের বাবা এর আগেও দু'বার এসেছেন, পেশায় ভদ্রলোক একজন শিশু চিকিৎসক, আর সোমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। উনারা দুজন এসেছেন, এই উপলক্ষ্যে হক দাদা আজ সন্ধ্যাতে উনাদেরকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করেছেন। দাদার সাথে উত্তমের খুবই ভাল সম্পর্ক। দু'জনে একসাথে কোথাও বসলে গল্প আর শেষ হয়না। দাদা দুই দিন আগেই উত্তমকে ফোনে নেমন্তন্ন করেছেন। উত্তম বলেছে, " হক ভাই, মিঠুকে জিজ্ঞেস করে নেই"!
আমাকে জিজ্ঞেস করতেই বললাম, " হবেনা, আমাকে ফাদার'স ডে নিয়ে লেখা তৈরী করতে হবে, সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত আমার চাকুরী, বাড়ী ফিরে কখন কী করবো"! বলেই ওয়ালমার্টে চলে গেছি। ওয়ালমার্টে পৌঁছার আগেই উত্তমকে ফোন ব্যাক করলাম, বললাম, " ঠিক আছে, দাদাকে বলে দাও, আমরা যাব, তবে কাজ থেকে ফিরে ওখানে জেটে দেরী হয়ে যাবে"। আমি কল্পনাতেই দেখতে পাচ্ছিলাম উত্তমের 'মুখভার' ভাব কেটে গিয়ে সারা চেহারায় খুশীর ঝলক দেখা দিয়েছে।

আজ কাজের স্কেজিউল ছিল সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যে ৭টা পর্যন্ত। ঘুম থেকে উঠে হাতে সময় পেয়েছি আধ ঘন্টা, ফেসবুকে গিয়েই পেয়ে গেলাম বন্ধুর মেসেজ, আওয়ামীপ্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয়, মনটা ভার হয়ে গেল। যতই বলি, দেশের মানুষ যা চায়, তাই হবে, তাই বলে দেশের মানুষ বুঝে না বুঝেই আগুনে ঝাঁপ দিতে চাইলে সেটা কী সহজে মেনে নেয়া যায়! ঝট করে দুই একটা স্ট্যাটাস লিখে কাজে চলে গেলাম। এক ঘন্টার লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ী ফিরেছিলাম, সকালের স্ট্যাটাসে দুই একটা উলটো প্লাট মন্তব্য দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, আবার আরেকটি স্ট্যাটাস দিয়ে কাজে ফিরে গেলাম। আমার উত্তম কিন্তু  আমার এইসব কান্ড কারখানার কোন সংবাদ রাখেনা, অথবা হয়তো রাখে। আমার অবস্থা হয়েছে আওয়ামীলীগের নেতাদের মত, জনগণ নিজ থেকেই সব বুঝে নেবে ভেবে নাকে তেল দিয়ে ঘুরে বেড়াই, আর তলে তলে ইঁদুরে সব কিছুর গোড়া কেটে দিয়েছে। আমিও ভাবি উত্তম জানেনা, দেখা যাবে অনেক ইঁদূর উত্তমের কাছে ঠিক সময়ে খবর পৌঁছে দিচ্ছে। তবে এতটুকু বাঁচোয়া, উত্তম আমার উপর কখনওই কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়না।

লাঞ্চ শেষে কাজে ফিরে গিয়ে মনে হলো, আজ বাংলাদেশে ফাদার'স ডে, কাল সকালে হক দাদা আমেরিকার বাইরে যাচ্ছেন, উনার জন্য একটা উপহার নিয়ে গেলে কেমন হয়! উত্তমের জন্য আর হক দাদার জন্য দুটি 'হ্যাপী ফাদার'স ডে' কার্ড কিনলাম, সাথে গিফট কার্ড। গিফট কার্ড মিথীলাকে দিয়ে দেওয়াবো। হক দাদা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছেন, বাংলা গড়গড়িয়ে পড়তে পারেন কিনা জানিনা, তবে পড়তে সময় লাগে। অথচ উনি আমার লেখালেখির সমস্ত খবর রাখেন। একদিন বলেছিলেন, লেখাগুলো যেন উনাকে দেই। বাংলা পড়তে জানেনা মানুষের জন্য বাংলা প্রিন্ট করে দিয়েই বা কী লাভ, এই ভেবে কাজটি করিনি। আগামী ঈদসংখ্যা'র জন্য একটি গল্প লিখেছি, আজ মনে হলো, গল্পটি দাদার জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে যাই। আমার প্রিন্টারে কালি নেই, দাদাকে ফোন করলাম, জানলাম, উনাদের প্রিন্টার নষ্ট। এত সহজে দমবার পাত্রী নই, বাড়ী ফিরেই উত্তমকে বললাম, " আমার রেডী হতে যতটুকু সময় লাগবে, তুমি তোমার ডিপার্টমেন্টে গিয়ে আমার গল্পটি প্রিন্ট করে এনে দাও। ঘর থেকে গল্পটি উত্তমকে ই-মেইল করে দিয়ে ফেসবুকে কিছুক্ষণ থাকলাম, মন মেজাজ ভীষন খারাপ। বাংলাদেশের মানুষের উন্নতি হবেনা, যে জাতি ধর্ম'কে বর্ম করে বসে থাকে, সেই আদি যুগের বাস্তবতা থেকে বের হতে পারেনা, সেই জাতির উন্নতি হবেনা, কোনদিনও না। অথচ আমি সেই জাতির পতাকাবাহী।

নীচে নেমে আসলাম, বাগানে গেলাম, যে গ্লাডিওলার মূল দুই বছর আগে লাগিয়েছিলাম, সেগুলো এখন দারুণভাবে ফুটতে শুরু করেছে। খেয়াল হলো, এই গ্লাডিওলার স্টিক কেন নিয়ে যাচ্ছিনা দাদার জন্য! ব্যস! গ্লাডিওলার স্টিক নিলাম, ফাদার'স ডে কার্ড নিলাম আর নিলাম আমার লেখা গল্প। দাদার বাড়ী পৌঁছেই আমি আর মিথীলা একসাথে দাদাকে শুভেচ্ছা জানালাম। দাদা তো মহাখুশী, কীভাবে সেটা প্রকাশ করলে বেশী ভাল দেখায়, সেটা ঠিক করতে করতে পাঁচ মিনিট লেগে গেল। এদিকে আমি বারবার বললাম, আমার লেখা গল্পটা আপনি অবশ্যই পড়বেন, নাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে"। হুমকী শুনে দাদাকে মোটেও বিচলিত মনে হলোনা। বুঝলাম, উনার দ্বারা পড়া সম্ভবনা। তারপরেও থেকে থেকে বলতে লাগলাম গল্পটা যেন পড়ে, উনিও থেকে থেকে মুচকী হাসছিলেন।

সোমার বাবা ও দীপালোকের বাবাকে নিয়ে ওরা স্বামী স্ত্রী সাড়ে আটটা নাগাদ এসে পৌঁছেছে। খেয়াল করলাম, আজকের সন্ধ্যায় ঘরখানি 'বাবাময়' হয়ে উঠেছে। আমার তিন কন্যার বাবা, নাদিয়ার বাবা [দাদা], দীপালোকের বাবা, সোমার বাবা, সাঁঝবাতির বাবা মিলে পুরা পরিবেশ বাবাময় করে ফেলেছে। আমার বুকের কোথায় যেন সূক্ষ্ম ব্যথা বোধ হলো। এখানে কতজনের বাবা আছে, শুধু আমার বাবা নেই, আমার বাবা বাংলাদেশের সেই পুরানো ঘরের খাটটির মধ্যে চুপটি করে বসে সারা জীবনের হিসেব মিলাচ্ছেন। আমার কান্না পাচ্ছিল, ভাবছিলাম, আচ্ছা, আমার বাবা ইদানিং কী ভাবেন? মৃত্যুর কথা? কয়েকমাস আগে গত হওয়া স্ত্রীর কথা? কী ভাবেন উনি? আমাদের কথা ভাবেন? আমি বলে ফেললাম,
" তোমাদের কত মজা, দুজনের বাবা এসেছে, আমার জীবনে এই আনন্দ আসেনি, আর আসবেওনা।" দাদা  আমাকে খুব স্নেহ করেন, আমার কথাটি উনি খেয়াল করেছেন, শুধু বললেন ,' আহারে! মিঠু, কী বললা! আহ!"

দাদা সকলকে খাবার সার্ভ করলেন।  দাদা সব সময় বলেন, " লেডী'জ ফার্স্ট"। কাজেই আমাকে উঠতেই হলো। দাদা নিজে হাতে অনেক কিছু রেঁধেছেন। খাবারতা নেয়ার আগে চট করে  পাশের ঘরে চলে গেলাম, ফোনের বাটন টিপে বাবাকে ফোন দিলাম। ফোন তুলে বাবা 'হ্যালো' বলতেই বুকটা হাহাকার করে উঠলো। বললাম, " বাবা, আজকে বাবা দিবস। আমার প্রণাম নিও। তুমি কেমন আছো?"
"এই তো ভালো-মন্দে মিলিয়ে আছি আর কি!
" বাবা, মন্দ কেন আছো?"
" শরীরটা ভাল লাগেনা, কেমন জ্বর জ্বর লাগে, ম্যাজ ম্যাজ করে"
" তোমাকে এক ধরনের প্যারাসিটামল দিয়েছিলাম, রাতে খাবে একটা , ঘুমও হবে, ব্যথাও থাকবেনা।
" খাই, এক রাত পর পর"
"প্রয়োজন না থাকলে এক রাত পর পর খাবে কেন?
" একটু আরাম পাই,এইজন্য খাই।
" বাবা, আজকে আমার লেখা পড়ছো?
" চিনি গো চিনি তোমারে? শেষাংশ পড়লাম"
"আচ্ছা বাবা, একটা প্রশ্ন করি, এই যে পত্রিকা খুলে আমার লেখা দেখতে পাও, কেমন লাগে তোমার?
" ভাল লাগে, তুই কী শুনতে চাস? আমি কী নিজের মেয়ের কথা ঢেঁড়া পিটায়ে বলবো?
" কাউকে বলতে বলিনা, অন্যেরা এসে তোমাকে বলবে, সেইটা কথা না, তোমার কী অনুভূতি হয়, তাই জানতে চাইছি।
"ভাল লাগে, আমি প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুঁজে দেখি, তোর কোন লেখা আছে নাকি"
" প্রতিদিন থাকবে কীভাবে, বাংলাদেশে কত নামী-দামী লেখক আছে, আমি তো সাধারণ,  এত কম্পিটিশান দেশে, এত দূর থেকে লেখা পাঠাই, আমার কোন মামা-চাচার জোর নাই।
" হ, সাধারণই ভাল, সাধারণই তো হবি, কত অসাধারণ আইলো গেলো, কতকিছু দেখলা,"
" বাবা, একবারও কী মনে হয়, আমার সম্পর্কে যে কইতা, " এই মাইয়া মাইনষের জাতই না! পাজীর পা-ঝাড়া মাইয়া। লেখাপড়ায় মন নাই, চাকরী বাকরী করলোনা---সেই মাইয়ার লেখা পত্রিকার পাতায় দেখো, তুমি কী ভাবতে পার যে এতদিন পড়তে অন্যের লেখা, আর আজ পড়তেছ নিজের মেয়ের লেখা"
" হ রে মা, এত কথা কইতে নাই, মনে মনে রাখতে হয় কিছু কথা।
"না বাবা! সব কথা মনে রাখতে নাই, কিছু কথা কইতেও হয়, আজকে যদি তোমারে এই প্রশ্ন না করতাম, পরে আফসোস থাকতো।
" ভাল করিস, লেখালেখি ভাল কাজ, তোর তো সময়টাও কাটে, পয়সার কথা চিন্তা করিসনা, লেখালেখি কইরা আর কয় পয়সাইবা পাবি, তার চেয়ে পয়সার চিন্তা না কইরা  নিজের মেধা ছড়িয়ে দিবি, ন্যায়ের পক্ষে থাকবি।
" বাবা আশীর্বাদ কইরো, না বাবা, পয়সার কথা মাথায় আসেনা, তবে একদিন না একদিন এই লেখা দিয়াই পয়সাও আসবে। তখন আর চাকরী করবোনা, শু্ধু লিখবো, ততদিন তুমি সুসভাবে বাঁইচা থাইকো বাবা। এবার রাখি, নিমন্ত্রণ খেতে আসছি, খেতে ডাকছে।
"আচ্ছা ভালো থাকিস, আমিও ভালো থাকবো"।


মনের ভেতর কী যে অশান্তি লাগে, মনে পড়ে গেলো, গত বছর বাবা দিবসের দিন কলকাতায় ছিলাম মেজো মেয়েকে নিয়ে। ছয়দিনের সফরে গেছিলাম, অনেক কিছু দেখে আসছি, রবীন্দ্রনাথের বাড়ীতেও গেলাম। নিজের বাবার কাছে থাকতে পারি নাই, তার আগের বছরও পারি নাই, এই বছরও পারলামনা। তখন মনে হইত, আমার বাবা -মা অমর, অজর। মা অমর হলো আর কই, বাবাও বাঁচবেনা, মন বলছে কুকথা, জানিনা, আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। মাকে আনতে পারলামনা এই দেশে, বাবাকেও না, সবার বাবা-মা বিদেশে আসে, আমার বাবা-মা এলোনা।

খাওয়া-দাওয়া করলাম,  এরপর দাদা এক কাজ করলেন, আমার লেখা গল্পটি সোমাকে বললেন পড়ে শোনাতে। আমি খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম, আমার কোন লেখা আমি দ্বিতীয়বার পড়িনা, ভুল ধরা পড়বে ভয়ে পড়িনা। এখন এই গল্পের মান কেমন হয়েছে, সেটাও প্রকাশ হয়ে পড়তে যাচ্ছে। দীপালোকের বাবা ডাঃ মুখার্জী নিজ থেকে গল্পটি পড়ে শোনাতে চাইলেন।

মুখার্জী'দা পড়া শুরু করলেন। মুখার্জী'দার গানের গলা দারুণ, গায়ও দারুণ, লেখাটি পড়তে শুরু করলেন। সবাই শুনছে, একসময় আমি খেয়াল করলাম, আমার আর ভয় বা লজ্জা, কোনটিই করছেনা। লেখা ভাল হয়েছে। গল্পের নাম 'দ্য বেনিয়ান ট্রি"। গল্প পড়া শেষ হলে সকলে হাততালি দিয়ে মুখার্জীদাকে সম্মান জানালো।  হক দাদাকে দেখলা চোখ মুছছেন, মুখার্জী'দা এবং সোমার বাবা বলছেন, 'চমৎকার"! মুখ রক্ষা কথা হলেও ক্ষতি নেই, আজ ভাল কথা শুনতেই মন চাইছিল, সকাল থেকে মনটা ভারী হয়ে আছে। রাত বারোটার দিকে সকলেই হক দাদার বাড়ী থেকে বের হয়ে এলাম। গাড়ীতে উঠেই মিথীলাকে বললাম, " মিথীলা, পাপাকে হ্যাপী উইশ করলিনা?" মিথীলা বলে, "উপস! কখন টুয়েলভ হয়ে গেল?"  বললাম, মোনা আর মিয়া, ওদের তরফ থেকেও তুই হ্যাপী উইশ করে দে। মিথীলা বড় দুই দিদির তরফ থেকে পাপাকে হ্যাপী উইশ করলো।

Tuesday, June 11, 2013

পেঁচা রুটিন, অ্যালার্ম ক্লক এবং অসমাপ্ত আত্মজীবনী!!



ইদানিং আমার মধ্যে বাদুড় বা পেঁচার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। পেঁচা যেমন গাছের ডালে বসে চোখ গোল করে তাকিয়ে থেকে কাটিয়ে দেয় সারা রাত, আমিও তেমনই কম্পিউটারের দিকে চোখ গোল করে তাকিয়ে কাটিয়ে দেই সারারাত। বাংলাদেশ থেকে আমার মেয়ে প্রায়ই আমাকে হুস হুস! যাহ! যাহ! করে তাড়াতে চেষ্টা করে, জবাবে আমি শুধু ডানা ঝাপটাই। ভোর পাঁচটার দিকে ঘুম দেই, সকাল নয়টা বা দশটায় ঘুম ভাঙ্গে। তারপর তো দিনের শুরু, ঘর-দোর ঝাঁটপাট, টুকীটাকি রান্না সেরে টিফিনের কৌটা হাতে চলি ওয়ালমার্টের দিকে। ওয়ালমার্টে যেতে ইচ্ছে করেনা, মনে হয় একটু ঘুমাতে পারতাম। পেঁচারাও দিনের আলোয় ঘুমায়, আমি ঘুমাইনা। মন মেজাজ খারাপ করে কাটিয়ে আসি দিন ও সন্ধ্যারাত মিলিয়ে আট/নয় ঘন্টা।কারণ আমার কাজের শিডিউল থাকে বেলা ১২ টা থেকে রাত নয়টা। আমার মত পেঁচার জন্য ভাল, তাই এই একতরফা শিডিউল নিয়ে কখনও আপত্তি করিনা।

তারপরেও কী করে যেন ওয়ালমার্ট কম্পিউটার আমার আজকের শিডিউলে গন্ডগোল করে ফেলেছে, টাইম দিয়েছে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা। গতকাল ছিল অফ ডে, সারাদিন ঘুমাতে পারতাম, কিন্তু একদিনের রাণী সাজার শখ হয়নি। গতকাল সন্ধ্যায় উত্তম কুমারকে দফায় দফায় অনুরোধ করে রেখেছি, সকাল ৭টায় যেন আমাকে ডেকে দেয়। উত্তমের এটা বাধ্যতামূলক চাকুরী, আমি যদি হই পেঁচা, উত্তম হচ্ছে অ্যালার্ম ক্লক। যার যখন প্রয়োজন, অ্যালার্ম ক্লককে জানিয়ে রাখলেই চলে। তবে এই অ্যালার্ম ক্লক খুবই অভিজাত ক্লক, একবার বা দুইবারের বেশী বাজেনা। সেদিন শুনছিলাম, উত্তম তার বন্ধুকে বলছে,  সে নাকি বাংলাদেশে ফোন করেছে মেয়ের ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য, কারণ মেয়ে নাকি এসএমএস পাঠিয়ে অ্যালার্ম দিয়েছে।

আজ সকাল সাতটায় অ্যালার্ম ক্লক একবারই বেজেছে, এক লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছি। তখনও বুঝতে পারছিলামনা, আমি কেন সাতটায় উঠলাম! পরে খেয়াল হলো, আরে, আজ আর কাল তো সকাল আটটায় কাজ। ঝটপট রেডী হয়ে গেলাম, উত্তম ক্লাসে চলে গেছে, মিথীলা ঘুমে। আগে ওয়ালমার্ট যাওয়ার সময় ব্যাগে করে মোটা মোটা গল্পের বই নিয়ে যেতাম। লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ী ফিরতামনা, ওখানেই বসে গল্পের বই পড়তাম। তখন ওয়ালমার্টের পরিবেশ ভাল লাগতো, কাজেও আনন্দ পেতাম। এই বছরই সব কেমন পানসে ও বিরক্তিকর হয়ে গেছে। কত রকমের মানুষ আসে, আগে তাদের সাথে কত রকমের গল্প করতাম, ইদানিং মুখ ভোঁতা করে থাকি, যদিও কাজে ফাঁকী দেইনা, গ্রাহক সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে আমি খুবই নীতি মেনে চলি। যাই হোক, আজ মনে হলো, গত বছর বাংলাদেশ থেকে 'শেখ মুজিবুর রহমান' রচিত " অসমাপ্ত আত্মজীবনী" কিনে নিয়ে এসেছিলাম। ধীরে ধীরে পড়বো বলে সময় নিচ্ছিলাম, হঠাৎ করে মা মরে গেল, আমিও আউলা হয়ে গেলাম। এক বছর বইটার খবরও নিলামনা।

আজ সকালটা অন্যরকম ছিল, যে সকালে আমার ঘুমানোর কথা, সে সকালে কাজে যাচ্ছি, অন্যরকম সকাল তো বটেই। অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইটির কথা মনে পড়তেই চট করে বুকসেলফ থেকে বইটি নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ওয়ালমার্টে পৌঁছে  'ক্লক ইন' করে টী রুমে হাতের ব্যাগ রাখতে গিয়ে দেখি, বই সাথে নেই। মেজাজটা খারাপ হওয়ার কথা, কিন্তু বেশী খারাপ হওয়ার সুযোগ পেলো না। আমাকে ডিপার্টমেন্ট ওপেন করতে হবে, বই নিয়ে ঘ্যাজর ঘ্যাজর করে লাভ নেই। আমেরিকায় কাজের সময় কাজ, কাজের সাথে কোন কম্প্রোমাইজ নেই। আমাদের ফোন সার্ভিস ওপেন হয় সকাল নয়টায়, আটটা থেকে গোছগাছ শুরু হয়, তাই করছিলাম,  সাড়ে আটটায় ফোন বাজতে শুরু করলো। ফোন তুলতেই নন আমেরিকান অ্যাকসেন্টে  এক মহিলা কন্ঠ বললো,
-হ্যালো, মে আই তক তু ফোন লেদী?
-হ্যাঁ বলছি, তোমাকে  কীভাবে হেল্প করতে পারি?
-আই হ্যাভ 'তি-মোবিল' ফোন, বাত, নো সিম কার্দ। হাউ  কুদ আই  ইউস মাই ফোন এগেইন?

তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানালাম, ফোন রেখে ভাবলাম, আমি যাই বঙ্গে, আমার কপাল যায় সঙ্গে। সকালে এলেও এরা আমাকে খুঁজে বের করে, বিকেলে এলেও এরা আমাকে খুঁজে বের করে।  ত্রিশ মিনিটও পার হয়নি, এক সুন্দরী বুড়ী ফোন সেন্টারে এসে উপস্থিত। তার গলায় ঝুলছে বড় দানার অদ্ভুত সুন্দর মুক্তোর মালা, মাথার চুল সাদা শোন পাপড়ির মত,  হাসি দিতেই ধবধবে সাদা সাজানো পাটির দাঁত দেখলাম। বুঝলাম ইনিই সেই ফোনের লেডী যখন উনি বললেন,
" ইত ওয়াজ মী। আই কলদ ইউ। সী, আই হ্যাফ মেনি ফোনস, বাত, নো ওয়ান ওয়ার্কস। উদ ইউ হেলফ মি তু ফাইন্দ আউত এ গুড ফোন। নত এক্সপেনসিভ, আই হ্যাফ হোম ফোন, দিস ফোন ফর ত্র্যাবেলিং'।
 

বুঝলাম, কী ধরনের ফোন তার প্রয়োজন, ফোন দেখালাম, ফোন কার্ড ঠিক করে দিলাম, পরে দেখি বুড়ি আব্দারি কন্ঠে বলে, উদ ইউ সেত দ্য ফোন ফর মি, প্লিজ!!
-ঠিক আছে, দিচ্ছি। তুমি কী অনেক ট্র্যাভেল করো? কোথায় কোথায় যাও?
-আই ত্র্যাবেল এ লত। আই ত্র্যাবেলদ কানাদা, মেক্সিকো, লনদন, গ্রীস~~~
-তুমি তো আমেরিকান নও, কোথায় তোমার জন্মস্থান?
-গ্রীস।
ও আচ্ছা, ফোন অ্যাক্টিভেট করতে তোমার নাম এবং জন্মতারিখ লাগবে।
-মাই নেম ইস দেইজি পোরোস (Daisy Poros), বার্থ দেইত, তেনথ মার্স, তুয়েন্তি এইত ( 10th March, 1928)।
জানালো, আমেরিকায় আছে ৪৫ বছর ধরে! আরও কথা হলো, যাওয়ার সময় বললো, থ্যাঙ্ক ইউ রিতা, ইউ আর সো কাইন্দ, সো নাইস, সো হেলফফুল!!!
আরেক দম্পতি অপেক্ষা করছিল, নাহলে আরও কিছুক্ষণ এই বুড়ীমার সাথে কথা বলতাম। নিজে কিছু বলতাম না, বুড়িমাকে দিয়ে বলাতাম। কী যে মিষ্টি লাগছিল বুড়ীমার কথা শুনতে। ৪৫ বছর ধরে আমেরিকায় আছে, কিন্তু গ্রীক অ্যাকসেন্ট রয়ে গেছে পুরোপুরি। আমাদের সাথে কোথায় যেন মিল খুঁজে পেলাম। আমরা কথা বললেও আমেরিকানরা বলে, ভারী  অ্যাকসেন্টে কথা বলি। অবশ্য তাতে কিছুই যায় আসেনা, আমরা তো তবুও কথা বলি, আমেরিকানরা তো নিজেদের দেশ ছাড় আআর কিছুই চিনেনা। বুড়ীমা'কে বিদায় জানিয়ে অপেক্ষমান দম্পতীর দিকে মনোযোগ দিলাম।

এই দম্পতীর দুজনেই বিশালদেহী, কালো আমেরিকান, মহিলা বসে আছে হুইল কার্টে, ভদ্রলোক মহিলার পাশে দাঁড়ানো। উনারাও এসেছেন, পুরানো ফোন হাতে করে। ফোন ডি-অ্যাক্টিভেটেড হয়ে আছে, খেয়াল করেনি, আমার কাছে এসেছে যদি রি-অ্যাক্টিভেট করে দেই। আমরা সব সময় নতুন নাম্বার অ্যাক্টিভেট করি, পুরানোগুলো করিনা, তারপরেও কিছু কিছু মানুষের জন্য নিয়মের বাইরে গিয়ে সাহায্য করি, কারণ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। কী আর করা, ভাবি, আমি যদি কোন বিপদে পড়ি, কেউ যদি আমাকে হেল্প না করে, তখন কেমন লাগবে! যাই হোক, এই দুই বিশালদেহীকে বললাম, " আমাদের তো নিয়ম নেই পুরানো ফোন রিঅ্যাক্টিভেট করার"। ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে গেল, অসহায় দেখা গেল, তাছাড়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওরা দেখেছে আমি বুড়ীমা'কে হেল্প করেছি, তারা তো জানেনা, বুড়ীমা নতুন ফোন নিয়েছে, মায়া লাগলো, বললাম,
"ঠিক আছে, দাও, চেষ্টা করে দেখি।"
ফোন রিঅ্যাক্টিভেট করে দিলাম। দুজনেই খুব খুশী। বিশালদেহী ভদ্রলোক বলে,
-তোমাকে একটা হাগ দিতে পারলে খুশী হতাম।
ওয়ালমার্টে চাকুরী করে যত নতুন জিনিস শিখেছি, তার মধ্যে 'হাগ দেয়া ( জড়িয়ে ধরা) অন্যতম। হাগ দিতে সম্পর্ক বিচার করার কিছু নেই। হাগ দিয়ে পারস্পরিক কৃতজ্ঞতা, সহানুভূতি, আনন্দ, সুখবর, ধন্যবাদ, সান্ত্বনা জাতীয় যে কোন অনুভূতি শেয়ার করা হয়। আমি বাংলাদেশে বড় হয়েছি, খুব বেশী হলে মহিলাদেরকে 'হাগ' দিতে পারি, কোন পুরুষকে তো 'হাগ' দিতে পারবোনা। কিন্তু যস্মিন দেশে যদাচার! ওরা তো আর জানেনা 'বিন্দুতেই' আমাদের জাত যায়, সতীত্ব যায়, ধর্ম যায়, কূল যায়, মান যায়!!  তাই রেজিস্টারের এই পাশ থেকে দুই হাত দিয়ে 'হাগ' দেয়ার ভঙ্গী করে বললাম, থ্যাঙ্ক ইউ। ভদ্রলোক এবং ভদ্র মহিলা একসাথে বললেন, " তুমি আমাদের বাঁচালে। আমরা ফোনের কিছুই বুঝিনা, অথচ নাতিকে ফোন করতে হবে, তাই ফোন দরকার ছিল। গড ব্লেস ইউ!!

বুঝলাম, আজ গড আমাকে শুধুই ব্লেস করবে।  অলরেডী দুটো ভাল কাজ করে ফেলেছি। গেলাম রেস্টরুমে, সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছি, আয়নায় নিজেকে দেখছি, গুনগুন করছি
"তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা"
 

একটি ছোট বাচ্চা মেয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। তাকিয়ে দেখি, ওর সাথে আর কেউ আসেনি। পাবলিক বাথরুম, এক সারিতে অনেকগুলো বেসিন, বাচ্চাটা সাবানের কেইস নাগাল পাচ্ছেনা। হেসে দিলাম, বাচ্চাটা ইশারায় আমাকে বললো, সাবানের কেইস থেকে ওকে সাবানের ফোম দিতে। আমি বাচ্চাদের খুবই ভালোবাসি, বাচ্চাদের সাথে এক মুহূর্তে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আমি সাবানের কেইসে চাপ দিতেই সাবানের ফেনা মেয়েটির কনুইয়ের কাছাকাছি গিয়ে পড়লো। আবার চাপ দিলাম, একই কান্ড, মেয়েটির হাত টান দিয়ে আরেকটু সামনে এনে কেইসে চাপ দিলাম, এবার হাতের তালুর কাছাকাছি পড়েছে। দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠলাম। বললাম,
" ভাল করে সাবান ঘষো, এভাবে করো, আঙ্গুল ঘষো, আঙ্গুল ঘষো,~~~
মেয়েটি সমানে আঙ্গুল ঘষে চলেছে, তবুও আমি বলেই চলেছি, " আহা! আঙ্গুল ঘষতে বলছি"
মেয়েটি এবার পূর্ণ চোখে আমার দিকে তাকালো, আমি নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। আমি বলতে চাইছিলাম, নখ গুলো পরিষ্কার করো, কিন্তু বার বার আঙ্গুল ঘষো বলছিলাম বলে ও বুঝতে পারছিল না কেন বার বার আঙ্গুল ঘষার কথা বলছি। এত বড় জিভ বের করে বললাম, " ঊপস!! সরি!" ( এভাবেই বাচ্চারা এখানে কথা বলে)
মেয়েটি খিলখিল করে হাসলো। নাম জিজ্ঞেস করলাম, বললো, ' ম্যাকাইয়া'। বললাম, ' ম্যাকাইয়া, এখানে আয় তো সোনা, তোর হাত গুলো এয়ার ড্রাই করে দেই। তুই কার সাথে এসেছিস?"
'মায়ের সাথে এসেছি"।
 

ম্যাকাইয়ার হাত শুকিয়ে দেই আর ভাবি, এই বাচ্চাটির মা নিজেই হয়তো এখনও কিশোরীকাল পার করেনি, তাই বুঝতেই পারেনা, বাচ্চাকে নিজে হাতে আদর যতন করে বড় করার মধ্যে কী আনন্দ। আহারে! ম্যাকাইয়াও জানেনা, বাংলাদেশে থাকলে আজকে ওর মা বাইরে দাঁড়িয়ে বয় ফ্রেন্ডের সাথে ফোনে' হি হি ' না করে ওর সাথে বাথরুমে আসতো। ওমা! আজকের দিনটাই দেখি অন্যরকম, ছোট্ট ম্যাকাইয়াও আমাকে 'থ্যাঙ্ক ইউ বলে"! উত্তরে বললাম, " ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম গুডুলী বুডুলী'। ম্যাকাইয়া তো জানেনা, 'গুডুলী বুডুলী'র মানে কী? দুই চোখ সরু করে আমাকে একটু দেখে [ পাগল ভেবেছে বোধ হয়] হি হি করে হেসে বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল।

যেইমাত্র আমার জায়গায় ফিরেছি, দেখি বোবা লোকটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। এই বোবা লোকটি প্রায়ই আসে ওয়ালমার্টে, তবে আমার সাথে কখনও কথা হয়নি। ওর বন্ধু [ সেও বোবা'] সব সময় সরাসরি আমার কাছে আসে, আমার সাথে আকারে ইঙ্গিতে গল্প করে। বন্ধুটিকে নিয়ে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম। যাই হোক,  লোকটি এসে এক টুকরো কাগজ ধরিয়ে দিল আমার হাতে। কাগজে লেখা, " ডিলিট আইটেমস"।  লোকটির দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললাম, " কী ডিলিট করবো"? মুখে অবোধ্য আওয়াজ তুলে সে আমাকে বুঝিয়ে দিল, তার স্ক্রীন থেকে মিসড কল এবং পুরানো কল থেকে আসা নাম্বারগুলো ডিলিট করে দিতে। আমি ওকে বললাম, " আমি কীভাবে করছি, লক্ষ্য করো, নেক্সট টাইম এভাবেই ডিলিট করে দিবে"। এত সহজ একটি কাজ সে এতদিন জানতো না!!! এমন ভঙ্গী করে সে মাথা চাপড়াতে লাগলো কিছুক্ষণ। এরপর নিজের কালো হাত দুটো আমার হাতের দিকে এগিয়ে দিল, আমি হ্যান্ড শেক করে ওকে আশ্বস্ত করলাম, " আমরা আছি, সমস্যা হলে এসো"।

বিকেল ৫টা বাজতেই মন নেচে উঠলো, কখন আমার এই অভিজ্ঞতার গল্প লিখবো, হায় হায়, বাসায় ফিরেই তো রান্না করতে হবে। ওয়ালমার্ট থেকে বের হয়ে গাড়ীতে উঠে পাশের সীটে নজর পড়তেই দেখলাম, যুবক বয়সের বঙ্গবন্ধু মুখ টিপে হাসছেন 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'র কভার পেজে। বইটা সীটের মধ্যেই পড়েছিল সারাদিন। গাড়ী স্টার্ট দেয়ার আগে বইটি হাতে নিলাম, বইয়ের পেছনে তাকালাম, বঙ্গবন্ধু বলছেন, " কামাল তার হাচু আপাকে বলছে, আপা আমি তোমার আব্বুকে একটু আব্বু ডাকি"? আমার খুব কান্না পেয়ে গেল। মানুষের জীবন কত অনিশ্চিতে ভরা। যে কুট্টি ছেলেটি জ্ঞান হয়ে তার আব্বুকে দেখেনি, যে ছোট্ট ছেলেটি অনেকদিন পর্যন্ত জানতো, এই মানুষটি শুধুই হাসু আপার আব্বু, যার আব্বু সারাজীবন জেলে কাটিয়েছে, যার আব্বু একটি দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, সেই আব্বুর সাথে স্বাধীন দেশে যখন ছেলেটি বসবাস শুরু করলো, ঠিক তখনই একদল বিশ্বাসঘাতকের বুলেটের আঘাতে সেই আব্বুর সাথেই তার এবং পরিবারের সকলের  প্রাণ বেরিয়ে গেল! এমনকী আব্বুর আগেই ওরা তার প্রাণটি কেড়ে নিল। বীভৎস মানুষ, বীভৎস তার রুচী! কী যে পাপে ধরেছিল এই দেশটাকে, পাপের ঘরা ভারী হতেই থাকলো!

Sunday, June 2, 2013

সারপ্রাইজিং উইশ!!--পর্ব এক

আমরা আমেরিকায় এসেছি ২০০১ সালে, প্রথম বসত করেছি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া নামক পাহাড় ঘেরা রাজ্যে। এত সুন্দর  রাজ্য ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, যে সৌন্দর্য্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।  বর্তমান মিসিসিপি রাজ্যে চলে আসার আগে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে তিন বছর ছিলাম। যদিও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া নামের সাথে অনেকেই 'ভার্জিনিয়া'কে গুলিয়ে ফেলে। দুটি আলাদা আলাদা রাজ্য, কিন্তু পাশাপাশি।

যাই হোক, প্লেন থেকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মাটিতে পা দিতেই বুকের মধ্যে মেঘের গুরু গুরু শুনতে পেয়েছিলাম! চারদিক ফাঁকা, নীরব, শুনসান চারিধার! কোথাও কোন জনবসতি না দেখে আমার মাথাটা বেশ কিছুদিনের জন্য এলোমেলো হয়ে গেছিল। বাঙালী খুঁজে খুঁজে হয়রান আমরা, বাঙালীর দেখা তো পাচ্ছিলামই না, এমনকী গুজরাটী বা তেলেগুভাষী কাউকেও পাচ্ছিলাম না। কানাডাতে অবস্থানরত বড়দা ফোন করে, আমি ফোনের মধ্যেই হাপুস নয়নে কাঁদি। বড়দার মন এমনিতেই নরম, তার উপর একমাত্র বোন হওয়ার কিছু বাড়তি সুবিধা যোগ হয়েছে বলেই বড়দা ক্যালিফোর্ণিয়া থেকে শুরু করে তার পরিচিত যে যেখানে আছে, সবার কাছে খোঁজ নিতে শুরু করে দিল, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কোথাও কী কোন বাঙালী পরিবার আছে কিনা! মিশন সাকসেসফুল! এর মারফৎ, ওর মারফৎ ঘুরে ঘুরে সংবাদ পাওয়া গেলো, আমাদের ক্লার্কসবার্গ শহরেই যে হাসপাতাল আছে, সেখানে চিন্ময় দত্ত নামে একজন বাঙালী ডাক্তার আছেন। স্বামী-স্ত্রী, দুই মেয়ে নিয়ে উনার সংসার।

ফোন বুক থেকে নাম ধরে ধরে বের করা হলো নাম, ডঃ  ড্যাটা নামে একজন আছেন। কিশোরী মৌটুসীকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম চিন্ময় দত্তের খোঁজ বের করার জন্য। ওতো জানেনা, 'দত্ত'কে ড্যাটা বলে এখানে! আমিই বললাম, ড্যাটা হোক বা ডাটা হোক, ইনাকেই আমরা খুঁজছি।  বললাম, " ফোন করো মামনি, আমি তো ইংলিশ মিংলিশ ভালো বুঝবোনা, তুমিই প্রথমে কথা বলো।" মৌটুসী ডায়াল করে ভয়েস মেসেজ অপশানে গিয়ে আমার শেখানো বুলি আওড়ে বললো, " আমরা এখানে এসেছি দশ দিন হয়ে গেছে, কোন বাঙালী খুঁজে পাইনি, আপনাদের সাথে পরিচিত হতে চাই"।

ঘন্টা তিনেক পরেই একটা কল পেলাম, " আমি ডঃ  ড্যাটা বলছি। কিচ্ছু অসুবিধা নেই, আমরা এখানে আছি গত ২৭ বছর ধরে, একমাত্র বাঙালী ফ্যামিলি। প্রতিদিন আমার স্ত্রী শুভ্রা মুরগীর ঝোল রাঁধে, আমি ভাত খাই। আমার দুটো মেয়ে আছে, অনেক দূরে থাকে। " এমন মজার কথা শুনে আমার খুব ভাল লাগলো, কিন্তু উনার স্ত্রীকে বেশ ব্যক্তিত্বময়ী মনে হলো, তবে কথা-বার্তায় উনিও বেশ আন্তরিক ছিলেন।
প্রথম পরিচয়েই উনারা এত আপন করে কথা বলছিলেন যে ভালোলাগায়, আনন্দে, বল -ভরসায় মনটা ভরে গিয়েছিল। আমাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠতে বড়জোর দুই দিন লেগেছিল। এরপর থেকে  আমি আর আমার উত্তম ডঃ ড্যাটাকে 'দাদা' বলে ডাকতাম,আমার মেয়েরা ডাকতো 'আংকেল'। উনার স্ত্রীকে ডাকতাম বৌদি। এভাবেই প্রথম বছর কেটে গেল। দাদা এবং শুভ্রা বৌদিকে আমাদের পাশে পেয়ে আমরা সবদিক থেকে ভাল থাকতে শুরু করলাম।

কথায় কথায় জেনেছিলাম, ২৪শে মে, ১৯৬৯ সালে উনাদের বিয়ে হয়েছিল। সেই হিসেবে  ২৪শে মে, ২০০৩ সালে উনাদের বিয়ের বয়স দাঁড়ায় ৩৪ বছর। এই দাদা বৌদির ভালোবাসায় আমরা সিক্ত ছিলাম, শুধুই পেয়েছি উনাদের কাছ থেকে। মিলিয়নিয়ার দাদা, আমাদের মত অতি সাধারণ মানুষের পক্ষে টাকা খরচ করে উনাদের ভালোবাসার প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা বৃথা! তাছাড়া ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব দান-প্রতিদানের জিনিস না। আমি ১৬ই মে তারিখে দত্ত বৌদিকে ফোন করে বলেছি, ২৪শে মে তারিখে আমাদের বাসায় যেন ডিনার করেন। ৩০ বছর ধরে আমেরিকায় থাকতে থাকতে উনারা দৈনন্দিন জীবনে আমেরিকান হয়ে গেছিলেন, শুধু বাংলা ভাষাটুকু ভুলে যাননি, এটুকুই ভরসার কথা। বৌদি তো মহাখুশী, ২৪ তারিখ বিকেলেই চলে আসবেন উনারা, এমনটাই ঠিক হলো। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছিলাম, ঐদিন যেন বৌদি শাড়ী পড়ে আসে।

আমাদের বাড়ীর ব্যাক ইয়ার্ডে গোলাপের ঝোপ ছিল, সেখানে ঐ সময়টাতেই গাছ ঝাঁপিয়ে গোলাপ ফুটেছিল। দুইদিন আগেই আমি মাত্র দুই ডলার খরচ করে খুব সুন্দর মুঘল কাজ করা ছোট একটা ফুলদানী কিনে এনেছিলাম। ২৪ তারিখ দুপুরে ঝোপ থেকে কাঁচি দিয়ে ৩৪টি গোলাপ কেটে নিয়ে এসেছি, দুই হাতের চামড়া গোলাপের কাঁটার আঁচরে ক্ষত-বিক্ষত, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ ছিল ্না আমার, ৩৪ গোলাপসহ মুঘল কাজের ফুলদানী রেডী করলাম, পোলাও মাংস রান্না করেছি, কেক বেক করেছি যেখানে লেখা ছিল, " হ্যাপী ৩৪তম শুভ বিবাহ বার্ষিকী!" আসমানীর কুঁড়েঘর যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে মিলিয়নিয়ার দাদা-বৌদির জন্য রেডী করে রেখেছিলাম।

যথাসময়ে দত্ত দাদা এবং দত্ত বৌদি বিশাল গাড়ী থেকে নেমে এলেন। কত বছর পর বৌদি শাড়ী পড়েছে কে জানে! দারুণ সুন্দর বটল গ্রীন বেনারসী পড়ে এসেছেন। উনাদের দুজনকেই ঘরে এনে বসিয়েছি, একটু স্থিতিশীল হতে দিয়েছি,  মেয়ে মিশাকে ক্যামেরা রেডী রাখতে বলেছিলাম আগেই। সব যখন প্রস্তুত,  ৩৪ গোলাপসহ ফুলদানী এবং হ্যাপী ম্যারেজ অ্যানিভার্সারী কার্ড ছোট্ট মিথীলার হাত দিয়েই উনাদের দুজনকে দিলাম।

দুজনেই হতভম্ব! দুই কী ছয় সেকেন্ড, বৌদি দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করেছেন। দত্ত দাদা কেমন যেন ক্যাবলা ক্যাবলা হাসি দিচ্ছেন। উনাদের দুজনের প্রতিক্রিয়া দেখে আমরা হতভম্ব। শুভেচ্ছা পেয়ে কাউকে কাঁদতে দেখিনি এর আগে! কয়েক মিনিট পর বৌদি হেঁচকী তুলতে তুলতে কোনরকমে বললো,
" এমন ভালোবাসা আমি কোনদিন পাইনি, আমার ম্যারেজ অ্যানিভার্সারী আমারই মনে থাকেনা, মিঠুন তুমি মনে রেখেছো, গুনে গুনে ৩৪ গোলাপ যোগার করেছো, আজ তুমি যে আনন্দ আমাকে দিলে, জীবনেও ভুলবো না।"
বৌদির দেখা দেখি দত্ত দাদাও বলছে,
" ইয়া, মিঠুন তুমি করেছো কি? আমিই তো ভুলে গেছিলাম আমাদের বিয়ে ৩৪ বছর হয়ে গেছে। কী ব্যাপার, তুমি কী করে মনে রাখলে"?
দাদা-বৌদিকে খুব আদর-যত্ন করে খাওয়ার টেবিলে এনে বসালাম। ৩০ বছরের উপর উনারা আমেরিকায় আছেন, আমেরিকান খাবারেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। লাউঘন্ট, মোচার ঘন্ট, রুই মাছের কালিয়ার স্বাদও মনে হয় ভুলে গেছেন। আমাদের ওখানে রুই মাছ পাওয়া যায়নি, কিন্তু স্যালমন মাছ দিয়েই কালিয়া বানিয়েছি, ক্যানের মোচা দিয়ে ঘন্ট বানিয়েছি, চিংড়ি মালাইকারী, চিকেন কারী, পোলাও রেঁধেছিলাম। উনারা খেয়েছেন পাখীর আহারের মত, কিন্তু খুব খুশী হয়েছেন আয়োজন দেখে। সব শেষে উনাদের জন্য আরেকটু চমক ছিল, মিশার হাতে বানানো কেক। বারো বছরের মিশা এত সুন্দর করে কেক বেক করেছে, আংকেল আন্টি তো মহাখুশী। বৌদি তো বার বার শুধু চোখই মুছে গেলো, আর দাদাও কেমন যেন লজ্জা মেশানো হাসিতে মুখ ভরিয়ে রাখলো। আমার খুব ভালো লেগেছে উনাদেরকে অমন সারপ্রাইজ উইশ করতে পেরে।



২০০৪ সালে আমরা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ছেড়ে চলে আসি মিসিসিপিতে। মাঝে মাঝেই শুভ দিনগুলো মনে পড়ে, দিন ধরে ফোন করি, শুভ বিবাহবার্ষিকী অথবা শুভ জন্মদিন বলি। অদর্শনে মানুষ অনেক কিছুই ভুলে যায়, অনেককেও ভুলে যায়। আমরাও অনেক কিছু ভুলে গেছি, অনেকের কথা সব সময় মনেও আসে না। দত্ত দাদা এবং দত্ত বৌদিকে ভুলে যাওয়ার কোন কারণই নেই, তারপরেও ভুলে থাকতে হয়। জীবনের বাস্তবতাই আমাদের সকলকে, উভয়পক্ষকে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ২০০৩ সালের পর কয়েকবারই ২৪শে মে তারিখে আমি দাদা-বৌদিকে হ্যাপী উইশ করেছি ফোনে।

২০১৩ সালের ২৪শে মে তারিখের সন্ধ্যেবেলা আবার দত্তদাদার ফোনে কল দিলাম। ফোন তুলে হ্যালো বলতেই বললাম,
" হ্যাপী ৪৪তম শুভ বিবাহবার্ষিকী দাদা! আপনারা দু'জন শতায়ু হোন"!
দাদার সেই একই ভঙ্গীতে উত্তর, " কী ব্যাপার মিঠুন বলোতো, তুমি কী আমাদের বিয়ের মন্ত্র পড়িয়েছিলে নাকি? কী করে মনে রাখো এত? এই নাও, তোমার বৌদিকে দিচ্ছি। শুভ্রা দেখো কে, মিঠুন, কী অসম্ভব ব্যাপার!"
বৌদি হ্যালো বলতেই বললাম, " বৌদি, অনেক দূরে চলে এসেছি, তারপরেও ২৪শে মে ভুলিনি। শুভ ৪৪তম বিবাহবার্ষিকী, আপনাদের শতায়ু কামনা করছি"।
"থ্যাঙ্ক ইউ মিঠুন, তোমার ফোন পেয়ে অবাক হয়ে যাই, কী করে মনে রেখেছো ৪৪ বছর বিয়ে হয়েছে আমাদের? "
"বৌদি, আপনাদের কথা যদি ভুলে যাই, তাহলে কী করে চলে! আপনাদের মত সুখী দম্পতীকে উইশ করতে পারছি, আমারও আনন্দ হচ্ছে। মানুষকে অবাক হতে দেখলে আমার খুব ভাল লাগে। এ পর্যন্ত যতবার আপনাদেরকে ফোন করে উইশ করেছি, আপনারা সত্যি সত্যি খুব অবাক হয়েছেন। মনে হয় যেন আমার কন্ঠস্বর শুনেও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না!"
-মিঠুন, তুমি আমাকে অনেকভাবে অবাক করেছো। ১৫ নভেম্বার আমার জন্মদিনেও তুমি নিজের বাড়ীতে আমাকে দিয়ে 'সারপ্রাইজ কেক' কাটিয়েছিলে। কিছুই ভুলিনি, ভালোবাসা কেউ ভুলতে পারেনা! তুমি সত্যি সত্যি একটা আস্ত পাগলী। আমরা এখন ফ্লোরিডাতে, মেয়েদেরকে সাথে করে রেস্টুরেন্টে এসেছি।"

-তাহলে এনজয় করুণ বাকী সময়, আবার পরে কথা হবে।


২) সারপ্রাইজিং উইশ

Thursday, May 30, 2013

প্রতিদান!

আজ বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই মিথীলার শখ হয়েছে রাতে বাইরে কোন রেস্টুরেন্টে খাবে। আমার রাতের রান্না কমপ্লীট, লেখালেখি টানছে, আমার কিছুতেই ইচ্ছে করছিল না বাইরে যেতে। আমি অনেক বদলে গেছি, সংসারে মনোযোগ দিচ্ছি না, রান্না-বান্নাও জোড়াতালি দিয়ে চলছে। নানা কারণে মন মেজাজ ভালো থাকে না, পরিবারের সকলেই এর জন্য ফেসবুককে দায়ী করছে। করুক দায়ী, কিন্তু আমি তো জানি, ফেসবুকের কল্যানেই আমি অনেক না-দেখা জীবনও দেখছি, না-জানা মানুষকে জানছি।
মানুষ আমায় বরাবর টানে, মানুষের টানেই আমি ফেসবুকে সময় দেই। ফেসবুকের সূত্র ধরেই ব্লগ, ব্লগের সূত্র ধরেই রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি, ব্লগের সূত্র ধরেই গল্প-উপন্যাসের জগতে প্রবেশ! কিন্তু সেটা আমি বুঝি, মিথীলার বুঝবার কথা নয়, তাই সে কোনভাবেই মানছিল না যখন বলেছি,
” বাবলুসোনা, আজ নয়, আরেকদিন যাব বাইরে খেতে”।
মিথীলা বলে, ” যদি আজ বাইরে খেতে যাও, তাহলে আমি ১০ মিনিটের মধ্যে স্নান সেরে ফেলবো, ১০ মিনিটের মধ্যে পূজা সেরে ফেলবো, নয়া গেলে এক ঘন্টা লাগাবো”।
বাচ্চা মানুষ, কী বাচ্চামানুষী আলটিমেটাম দিয়েছে আমাকে, মিথীলা খুব ধীরগতির বালিকা, আরও অনেক বেশী চটপটে হতে হবে ওকে, দিনরাত এই মন্ত্র ওর কানের কাছে জপে যাই, এটা বুঝেই আমাকে ও ১০ মিনিটের আলটিমেটাম দিয়েছে। আমি মনে মনে হাসি, সবাই খালি আলটিমেটাম দেয়, কিছুদিন আগে ৪ঠা মে তারিখেই বোধ হয়, বেগম জিয়াও ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। আল্টিমেটামের খবর মিথীলা জানে না, এর পরিনতিও জানে না। ভাবলাম, থাক! ছোট মানুষ, আলটিমেটাম তত্ব বুঝে কাজ নেই।
বললাম, ঠিক আছে, যাব। বাইরেই খাব, রেডী হও।
আমি বাদে পরিবারের সকলেই মোটামুটি সব ধরণের খাবারে অভ্যস্ত। জাপানীজ সুশী যে ওরা কী করে খায়, তা ওরাই জানে। মেক্সিকান ফুডও আমার কাছে একঘেয়ে লাগে বলাতে মিথীলা বলে, ” আমরা যে রোজ ডাল-ভাত খাই, সেটাও তো তাহলে একঘেয়ে”। এটা বলার জন্য কী ওকে একটা চড় দেয়া উচিত ছিল? ছিলনা, কারণ যুক্তির কথা বলেছে, যুক্তির কাছে আমি হার মানতে লজ্জা পাই না, কিন্তু অযৌক্তিক এবং ঠ্যাটা মারা কথা শুনলে মাথাটা গরম হয়ে যায়! ইদানিং কিছু বন্ধু ‘আমেরিকাবাসী’ বলে নানাভাবে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে, দেশে গিয়ে ‘ফাল’ পারতে উপদেশ দেয়। কিছুদিন আগে তো এক ভদ্রলোক বলেই বসলেন যে আমি নাকি আমেরিকার নাগরিকত্ব ভিক্ষা করে নিয়েছি, এখানে নাকি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি আর নির্লজ্জের মত আমেরিকার জয়গান করে যাচ্ছি। এসব কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না, নাহলে বলতাম, আমরা কোটি কোটি প্রবাসী যদি দেশের টানে পাগল হয়ে গাতটি বোঁচকা বগলে করে দেশে গিয়ে উপস্থিত হই, আপনাদের মুখের চেহারা তখন কী হবে? ১৩ দফা দাবী নিয়ে ৫ই মে তারিখে যখন দেশে অবস্থিত ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগণের পায়ের চাপে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছিল, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? ভয়ের চোটে তো ঘরের দরজায় খিল এঁটে বসেছিলেন, ঢাকাকে শংকামুক্ত করতে সরকারকে কেন ১৫ মিনিটের ” গণহত্যা” [ বিরোধী নেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী] চালাতে হয়েছিল! আমাদেরকে দেশে ডাকার আগে আরেকবার ভেবে দেখুন, আমাদের পদভারের চাপ সামলাতে পারবেন তো???????
যাই হোক, আমি ইদানিং বাইরে খাওয়া-দাওয়া করিই না। আমাদের শহরে বাংলা ক্যুজিন তো দূরের কথা, ইন্ডিয়ান ক্যুজিনও নেই, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমেরিকান স্যান্ডুইচই নানা নামে, নানা ঢঙে পাওয়া যায়, নাহলে চায়নীজ অথবা জাপানীজ রেস্ট্যুরেন্ট আছে, আর আছে মেক্সিকান, থাই, ইটালিয়ান। সব খাওয়া হয়ে গেছে, নতুনত্ব নেই। আমিই বললাম, চায়নীজ রেস্টুরেন্টে যেতে পারি, আমি মঙ্গোলিয়ান গ্রীল ( সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের পছন্দমত আইটেম উত্তপ্ত লোহার বড় প্লেটে ভাজা ভাজা করে নেয়া যায়) খাব। ওরা রাজী, মিথীলা, ওর বাবা আর আমি চলে গেলাম ওখানে। বলে রাখা ভাল, মিথীলা কিন্তু ঠিকই ১০ মিনিট এবং আরও ১০ মিনিটে ওর করণীয় কাজ সেরে ফেলেছে। তার মানে, ইচ্ছে করলেই ও দ্রুত কাজ করতে পারে, কিন্তু করে না, বাংলাদেশে জন্মানোর কারণেই বোধ হয় এই ঢিলেমীপনা, কে জানে!
রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে গেছে, ঢুকে দেখি মালিক আর কর্মচারী ছাড়া আর কেউ নেই। মালিক ছেলেটি আমাকে চিনতে পেরেছে, ফোন কিনতে যায় তো, তাই সে বেশ আন্তরিকভাবে আমাদেরকে ডেকে ভেতরে নিয়ে বসিয়েছে। এই রেস্টুরেন্টে রাতের বেলাতেও বাফে সিস্টেম (ব্যুফে) চালু আছে। মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, মঙ্গোলিয়ান গ্রীল কী আজ বন্ধ রেখেছো? সে বললো, ” না, আমি করে দিচ্ছি”। মিথীলা পাশ থেকে ফোড়ন কাটলো,
” মা, এখানে এটাকে মঙ্গোলিয়ান গ্রীল বলে না, হিবাচি গ্রীল বলে”।
বললাম, ” চুপ থাক, সব জায়গায় গিয়ে মাতব্বরী করবি না। সাউদার্ণ ইংলিশ শিখাস ঠিক আছে, এখন নাক বোচাদের সাথেও এত ভেবে কথা বলতে হলেতো আমার বিপদ!”
মিথীলা চুপ হয়ে গেছে, ও আমাকে ঘাঁটাতে চাইলো না, কে জানে, কত সাধ্য সাধনা করে মা’কে বাইরে আনা হয়েছে, এরপরে যদি মা সটান বেরিয়ে যায়!
মালিক ছেলেটি এর মধ্যেই লোহার প্লেট অন করে দিয়েছে। আমি একটি প্লেটে কাঁচা চিংড়ি, চিকেন ফিলে তুলে ছেলেটার হাতে দিয়ে বললাম, একেবারে কড়কড়ে করে ভেজে দাও, কোথাও যেন কাঁচা না থাকে, আরেকটি প্লেটে দিলাম মাশরুম, ব্রকলী, পেঁয়াজ, জুকিনি ( ঝিঙ্গা ধরনের সবজি), মরিচের সস, রসুনের কুচি আর দুটো ডিম।
ছেলেটি বলল, ভাত বা নুডলস দিবে না?
বললাম, নাহ! শুধু এগুলোই দাও, ভাত লাগবে না, শুধু খেয়াল রাখবে যেন কাঁচা না থাকে।
ছেলেটি সব প্লেটে ছেড়ে দিয়ে ক্যাশ বাক্সের কাছে চলে গেলো, বললো, সে সব ঠিকমত করে দেবে।
আমি একটি বাটিতে এগড্রপ স্যুপ নিচ্ছিলাম, খেয়াল করে দেখলাম, অন্য একটা কর্মচারী সেই গরম লোহার প্লেটের কাছে গিয়ে নাড়াচাড়া করছে, ক্যাশবাক্স থেকে ছেলেটি এক দৌড়ে চলে গেলো চুলার কাছে, কর্মচারীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই আবার কুক করতে লাগলো। ছোট একটি ব্যাপার, আমার নজর এড়ায়নি, খুব ভালো লেগেছে। একে বলে ‘প্রতিদান’। এই ছেলেটিকে আমি ফোন কেনার সময় অনেক সাহায্য করেছিলাম, ওটা ছিল আমার দায়িত্ব, আমার সহকর্মী কৃষনাঙ্গ মেয়েগুলো খুবই অপেশাদারী আচরণ করে ভিনদেশী বা স্বদেশী বৃদ্ধদের সাথে। তাই ভিনদেশীরা আমাকে খুঁজে বের করে, আমি ওদের সমস্যা বুঝি, নিজের জীবন দিয়েই ওদের সমস্যা উপলব্ধি করি। আজ তার প্রতিদান পাচ্ছি, সে এত বড় ব্যবসার মালিক, তার সামনেই আছে তার কর্মচারী, তবুও এই সম্মানটুকু সে আমাকে দিয়েছে। ভাবলাম, পৃথিবী থেকে এখনও ভালোমানুষী বিদায় নেয় নি।
আমরা খাচ্ছিলাম, আধা পথে সেই মালিক ছেলেটি দুই হাতে করে মঙ্গোলিয়ান গ্রীলের প্লেট ( সরি, হিবাচি গ্রিল) এনে আমাদের টেবিলে রেখে গেলো, খাবার এনজয় করতে বললো। আমরা ছাড়া আর মাত্র দুজন বাইরের লোক ছিল, বুধবার রাত সাড়ে আটটার সময় আমেরিকানরা বেডে থাকে, রেস্টুরেন্টে থাকার কথাও না। আমার পাশেই বসেছিল উত্তম কুমার, সে দেখালো, আমাদের থেকে একটু দূরে কোণাকুণি দুই টেবিলে খেতে বসা কিছু চায়নীজ ছেলে মেয়েকে! বললো, “ওরা বোধ হয় কর্মচারী, কাজ শেষে এখন খাচ্ছে”।
আমার সাইড থেকে ভালই দেখা যাচ্ছিল, প্লেট ভর্তি সাদা রঙের আঠা ভাত, আর একটা কিছু তরকারী, সামনে বাটি থেকে গরম ধোঁয়া উঠছে। স্যুপ কিনা কে জানে! চার পাঁচটি ছেলে মেয়ে আঙ্গুলে কাঠি ধরে কপাকপ করে সাদা আঠা ভাত খাচ্ছে। বুঝা যাচ্ছে, এগুলো ওদের জন্য আলাদা রান্না করা হয়েছে। আমার আর খেতে ভাল লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, কেইস ভর্তি এত হরেক রকম খাবার আর ওরা খাচ্ছে শুধু ভাত আর পাতলা স্যুপ। আমাদের দেশে কিছু ধনী ব্যক্তির বাড়ীর রান্নাঘরে দুই রকমের চাল মজুত থাকে। নিজেদের জন্য রান্না হয় দিনাজপুরের ‘কাটারীভোগ’, আর গৃহভৃত্যদের জন্য মোটা ‘ইরিচাল’। আমার নিজের চোখে দেখা জিনিস, কখনওই মেনে নিতে পারিনি। কৈফিয়ত হিসেবে উত্তর পেয়েছি,
“ওরা তো অনেক ভাত খায়, কাটারীভোগ দিয়ে পোষাবে না, তাই ওদের জন্য মোটা চাল”।
বুঝলাম মোটামুটি যুক্তি আছে ধরে নিলাম, কিন্তু রুইমাছ বা কই মাছ নয় কেন ওদের জন্য?
উত্তরে শুনেছি, ওরা মরিচ পোড়া আর আলু ভর্তাতেই বেশী খুশী থাকে।
হতে পারে সত্যি কথা, কিন্তু আমার বাসার বুয়ারা আমার চেয়ে বেশী ভাত খেতো না, আলু ভর্তা নিজের বাড়ীতে খেতো বলেই মাছের টুকরা দুই একটা বেশী পেলে বাটিতে ঢাকা দিয়ে বাসায় নিয়ে যেত। আমার কাছে কতটুকু আদর পেত আমার বুয়ারা জানিনা, কিন্তু যতদিন থেকেছে, আমাকে আগলে রেখেছে বুয়া। প্রতিদান দিয়েছে, আমার মা’কে দাওয়াত দিয়ে বস্তিতে নিয়ে গেছিল, মা’কে নিজের বিছানায় বসিয়ে ‘চা’ বানিয়ে খাইয়েছে। সারা বস্তির মানুষ এসে নাকি জড়ো হয়েছিল, ‘মাসী’কে দেখতে। আমার যখন তৃতীয় সন্তান (মিথীলা) হবে, বুয়া মানত করেছিল, ‘দিদির একটা ছেইলে হইলে মিল্লাদ পড়ামু”!!!
ছেইলের বদলে মেয়ে হয়েছে দেখে বুয়া একটুও অখুশী হয় নি, মিথীলাকে কত যত্ন করে সে লালন-পালন করেছে, বুয়ার কাছে মিথীলাকে রেখে আমি বিএড কমপ্লীট করেছিলাম, বুয়ার কাছে দেড় বছরের মিথীলাকে রেখে আমি তিনদিনের জন্য ‘দুবাই’ বেড়াতে গেছিলাম!
২০০১ সালের নির্বাচনের সময় আমি বুয়াকে দিয়ে ‘নৌকা’ মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য প্রচার চালিয়েছিলাম। বুয়াকে বলেছিলাম, ” বুয়া, আমি দেশে থাকলে নৌকা মার্কা হাইরা যায়, ‘৯১ সালেও হারছিল, ‘৯৬ তে আমি ছিলাম না দেশে, নৌকা জিতছিল, এইবার দেশে আছি, এইবারও না জানি নৌকা হাইরা যাইব, তুমি এক কাজ করো, তোমাদের বস্তিতে কত মানুষ, আমারে তো সবাই চিনে, তাগোরে গিয়া কও, নৌকায় যেন ভোট দেয়, নৌকা জিতলে আমি তাগোরে একদিন খাওয়ামু”।
আগের রাতে বুয়া এসে বলে গেছে, ” দিদি, অবস্থা বেগতিক, বিপক্ষের লোক আইসা সবতেরে টেকা দিয়া গেছে, আমার আনোয়ারের বাপেরেও সাধছিল টেকা, আনোয়ারের বাপে লয় নাই, কইছে না, টেকা নিমুনা, ভোট যারে খুশী দিমু।”
একে বলে প্রতিদান! বুয়াকে ভালোবাসছি, বুয়া তার প্রতিদান দিতে চেয়েছে। আমাদের ড্রাইভার মোকসেদ আলীকে তার স্যার যে কতভাবে সাহায্য করতো, ঠিক ঠিকানা নাই। হুমায়ুন আহমেদের নাটক ‘বহুব্রিহীতে’ রহিমার মা’কে সবার সাথে টেবিলে বসিয়ে খেতে দেয়া হয়েছিল বলে দর্শকদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছিল। ওটাতো নাটকে দেখিয়েছে, আর বাস্তবে আমার উত্তম কুমার মোকসেদ আলীকে পাশে বসিয়ে কতদিন যে ভাত খেয়েছে, তার হিসেব নেই।
মোকসেদ আলী আমাকে নিয়ে যখনই নারায়ণগঞ্জে যেত, আমার বাবা সোফা থেকে উঠে মোকসেদকে বসতে দিতেন। মোকসেদ খুব লজ্জা পেত, বাবা তার পিঠে হাত বুলিয়ে বসাতেন। আমি সামনে থাকতাম না, কারণ আমাকে দেখলেই মোকসেদ উঠে দাঁড়িয়ে থাকতো, যত বলতাম, মোকসেদ, আপনি আমার বাবার বাড়ীতে অতিথি, এখানে আমার সামনে আপনাকে লজ্জা পেতে হবে না, কিন্তু শত হলেও বসের স্ত্রী আমি, অতটা সমাজতন্ত্র তো দেশে আসেনি! আমরা আমেরিকা চলে আসার পরেও মোকসেদ আলী নারায়ণগঞ্জে মাঝে মাঝে যেত মা-বাবাকে সালাম জানাতে, নিজের বাড়ির গাছের পাকা পেঁপে দিয়ে আসতো, একে বলে ভালোবাসার প্রতিদান! যাই হোক, নির্বাচনের আগে আমি মোকসেদের মতি গতি বুঝতে পারতাম না, তবে মোকসেদ আমার মতিগতি ভাল বুঝতো, নির্বাচনের আগের দুই একদিন মোকসেদ বলেছিল নিজের থেকে, ” আপা, নিশানা ভাল বুঝা যায় না, আহসান উল্লাহ মাস্টাররে হারানোর জন্য একদল লোক টাকা লইয়া ঘুরতাছে!”
বললাম, ” আপনি কী নৌকা মার্কার লোক?”
মোকসেদ বলে, ” হ, নৌকার লোক, তবে আহসানউল্লাহ মাস্টারের জন্য জান কোরবান”।
নির্বাচনের ফলাফল যেদিন বের হয়েছে, এখন মনে পড়লে হাসিও পায়, বুয়া এসে গালে হাত দিয়ে আমার ঘরের দরজায় বসেছে, আমি খাটে শুয়ে আছি চুপ করে, পাথর হয়ে গেছি অপমানে, কেন যে এত অপমান লেগেছিল, কে জানে! বুয়া বলে, ” দিদি, কইছিলাম না আপনেরে, প্রচুর টেকা ঢালছে বস্তিতে, এইবার দেখলেন ত,”
আমি বলি, ” যাক বুয়া, তোমাদের দোষ নাই, গরীব মানুষ, যে টাকা দিবে তার কথাই শুনতে হবে, নাহলে বস্তি জ্বালিয়ে দিলে তোমরা কই যাবে?”
বুয়া বলে, ” আমারে বুঝানো লাগবে না, আপনে বুঝলেই হয়। সক্কাল থিকা মরার মত পইড়া রইছেন, নৌকা হারছে ত কী হইছে, একবার হারছে, পরের বার জিতব। এখন শোক কইরা লাভ আছে? উঠেন শোয়া থাইক্কা, চউক্কে মুখে পানি দেন। আপনের সমস্যা কী, আপনে ত যাইতাছেন গা আমরিকা, সমস্যা হইব আমার। বিরুধী দলের লোকে আমার চেহারা চিন্যা রাখছে, এইবার আমারে ধরবো”।
আমি বলি, ” হায় হায়, এইটা কী কও বুয়া, তোমার বস্তির বাড়ীওলারে গিয়া আমার কথা কইও, দরকার হইলে আমারে লইয়া যাইও একদিন, আমি বুঝায়া বলবো নে, কিছু বলবে না তোমারে”।
” হেই বেবস্থা আমি কইরা থুইছি, চিন্তা নাইক্কা, হেগোরে কইছি, আমি ধানের শীষে ভোট দিছি, না দিলে ধানের শীষ জিতছে কেমনে? বস্তির ভোট গইন্না দেহেন, তাইলেই টের পাইবেন”।
বুয়ার কথায় আমি চমৎকৃত না হয়ে পারিনি। ছোট্টখাট্ট মানুষ, যেদিন আমার বাসায় প্রথম আসে, কী লজ্জা লজ্জা মুখ, চার বছরে কত স্মার্ট হয়ে গেছে, বুয়া আমার কাছে থেকে কী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, দেখে আমি খুব খুশী হয়েছি। এরপর আমেরিকা থেকে যতবার দেশে গিয়েছি, বুয়ার খোঁজ নিতেই বুয়া অন্য বাড়ীর কাজ কমিয়ে দিয়ে আমার কাছে দুই মাস থেকেছে। অন্য বাড়ীতে বলে এসেছে, “দুই মাস আমারে একটু ক্ষমা করতেই হইব, আমেরিকা থিকা আমার দিদি আসছে, দিদি না থাকলে আমার ত এইখানে থাকাই হইত না, গাট্টি বোচকা লইয়া বাড়ীতে যাওন লাগতো।” আমি বুয়ার জন্য কী করেছি তা আমার মনে নেই, কিন্তু বুয়া মনে রেখেছে!
এই হচ্ছে প্রতিদান! প্রায়ই শুনি, কাজের বুয়াকে মারধোরের সংবাদ, খারাপ লাগে, আবার বুঝি, দুই পক্ষেই দোষ আছে, গৃহকর্তার যেমন দোষ আছে, গৃহভৃত্যদেরও দোষ থাকে। তারপরেও যতটুকু সম্ভব বৈষম্যনীতি পরিহার করে চললে মনের দিক থেকে স্বস্তি পাওয়া যায়। কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে এসেছি। রেস্টুরেন্টে বসে চায়নীজদের কথা বলছিলাম, সেখানেই শেষ করতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশের বুয়া ঢুকে গেছে গল্পের মাঝে। তবে বুয়া ঢুকে পড়াতে একটা উপকার হয়েছে, লেখার যবনিকা টানতে সুবিধা হয়েছে এই বলে যে,
শ্রেণী বৈষম্য সব দেশে, সব জাতিতেই বিদ্যমান আছে, কোথাও কম, কোথাও বেশী। তেমনি প্রতিদানের চেষ্টাও সব দেশের সব মানুষের মাঝেই আছে, এটাই মানবচরিত্রের ভাল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য!

Wednesday, May 29, 2013

'ধানী মরিচে'র জন্মদিনে!

আজ ২৯শে মে, আমার ছোট ভাই, 'ধানী মরিচে'র শুভ জন্মদিন। মা' কে ছাড়া প্রথম জন্মদিন। তাই মায়ের দেয়া নামেই আজ ওকে সম্বোধন করছি।   কাল রাত থেকেই আমি অপেক্ষা করছিলাম, আমাদের দুপুর একটা, বাংলাদেশ সময় রাত বারোটা বাজার সাথে সাথে আমি ধানী মরিচকে ফোন করে বার্থডে উইশ করবো। সকাল এগারোটায় অফিস গিয়েছি, দুপুর একটায় ওর নাম্বারে কল দিয়েছি, শুনি 'এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না"! জানতাম, এমনটাই হবে। 'ধানী মরিচ'  ছোটবেলা থেকেই এরকম স্বভাবের। সন্ধ্যারাতেই কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমালে নাকি স্বাস্থ্য ভাল থাকে, তাই রাত দশটা বাজতেই ধানী মরিচ ঘুমিয়ে পড়ে, শীত, গ্রীষ্ম বারোমাস।

ছোটবেলায় আমি, মেজদা আর ছোটভাই, একসাথে পড়তে বসতাম। একটা তক্তপোশে ( আমরা বলতাম 'চকি') তিন ভাইবোন গোল হয়ে বসে পড়াশোনা করতাম। রান্নাঘরে  মা হয়তো রাতের খাবারের জন্য রুটি  তৈরী করছেন, বাবা হয়তোবা তখনও রাতের অফিস সেরে বাসায় ফিরেননি। রাত আটটা বাজার সাথে সাথে  ছোটভাই বইখাতা মুড়ে রেখে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়তো। ওর  একটা সবুজ রঙের গায়ের চাদর ছিল, চাদরের পাড়ে ছিল ছোট ছোট প্রজাপতি ছাপ। খুবই সস্তা দামের চাদর, শীতের সকালে গ্রামদেশে বাচ্চারা এই চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমার ভাইটাও এই চাদরটাকে আশেপাশেই রেখে দিত। রাত আটটার মধ্যে যদি মায়ের রুটি বানানো শেষ না হতো, তাহলে ভাই সবুজ রঙের চাদরে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে পড়তো। শুয়ে পড়ার আগে অবশ্য মা'কে ডেকে বলতো, " মা, আমার পেটের মধ্যে জ্বর আইছে, আমি ঘুমায় থাকি"। এই বলে আর মুহূর্ত দেরী করতো না, কারণ দেরী হলেই বাবার চলে আসার সম্ভাবনা। বাবা বাসায় ফিরে আসা মানেই ইংলিশ বই নিয়ে পড়তে বসা। ও বেশী পড়াশুনা করতে চাইতো না। ঘরে সবার ছোট বলে আহ্লাদটা একটু বেশী পেত। আমার বা মেজদার সাহসে কুলাতো না বাবা বাসায় ফেরার আগে অমন করে সটান শুয়ে পড়তে। মায়ের পক্ষপাতিত্ব ছিল ছোট ছেলের প্রতি। বাবা বাসায় ফিরে ওর কথা জিজ্ঞেস করলেই মা  হেসে হেসে বলতো, " ওর নাকি পেটের মধ্যে জ্বর আসছে", অথচ আমার আর মেজদার নামে মা প্রতিদিন বাবার কাছে বিচার দিত, বিশেষ করে মেজদার নামে, আর বাবার হাতে উত্তম মধ্যম খেতাম আমরা। আমার ভাই টাইম সম্পর্কে সচেতন সেই ছোটবেলা থেকেই। আমার দাদু ঘড়ির আন্দাজ করতেন ভাইয়ের শুয়ে পড়া থেকে। রাত 'আটটা'র একচুলও এদিক সেদিক হতো না। ওর স্বাস্থ্য খুবই হালকা পাতলা ছিল বলে ও বলতো, ' আগে আগে শুয়ে পড়লে স্বাস্থ্য ভাল হয়'!

ছোটভাই সন্ধ্যারাতে ঘুমিয়ে পড়ার ফল ভোগ করেছিল একবার। তখন অবশ্য ও  ক্লাস এইটে পড়ে, হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় 'হিন্দুধর্মশিক্ষা'য় ১৩ পেয়েছিল। প্রগ্রেস রিপোর্ট দেখে মায়ের তো মাথায় হাত। আমরা সবাই ক্লাসে ফার্স্ট হতাম আর ছোট ভাই পরীক্ষায় এক সাব্জেক্টে ফেল! তাও আবার আমার মায়ের মত এমন ধর্ম বিশেষজ্ঞের ছেলে হয়ে! আমার মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা, সাধারণ গনিত, সমাজ বিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি হিন্দুধর্মও পড়াতেন। সেই মায়ের ছেলে হয়ে সে ধর্মের মত এত সহজ সাবজেক্টে ১৩ পায়!!! এরপর কয়েকদিন মা ছেলের পাশে বসে থেকে ধর্ম বই পড়িয়ে ছেলেকে ধর্মে মোটামুটি পন্ডিত বানিয়ে ছেড়েছেন। বার্ষিক পরীক্ষায় সে খুবই ভাল ফল করেছে, ১৩ থেকে এক লাফে ৭৬ পেয়েছে, ক্লাসে ফার্স্টও হয়েছে। বাবারও অনেক দূর্বলতা ছিল এই ছেলের প্রতি। আমাদের মধ্যে কেউ যদি কোন বিষয়ে সর্বোচ্চ নাম্বার না পেতাম, বাবার কাছে কৈফিয়ত দিতে দিতে জান বেরিয়ে যেত। আর ছোটছেলের বেলায় বাবা খুব আহ্লাদ করে বলতো,

" থাক গিয়ে, ওরা তো ডাক্তার -ইঞ্জিনীয়ার হইবো, বড়লোক হইয়া আমারে পাত্তা দিবনা, বুড়া বয়সে আমারে কে দেখবো? আমার এই ছোটছেলের তো পড়াশুনা বেশীদূর আগাইবো না, ওরে  সাথে নিয়া আমি একটা তেলেভাজার দোকান খুলবো। বাপ বেটাতে মিলে দোকান চালাবো।"
[*** বাবার একটি আশা পূরণ হয়েছে, বাবা-মা উনাদের অবসর জীবন থেকে এখন পর্যন্ত ছোট ছেলের সাথেই আছেন। ছোট ছেলে আর তার বউ, বাবা-মাকে মাথায় করে রেখেছে। কিন্তু বাবার তেলেভাজার দোকান খোলার স্বপ্ন আর পূরণ হয় নি। বাবার ছোট ছেলে, যাকে বাবা খুব ছোটবেলায় 'সাহেব' নামে ডাকতো, একটু বড় হওয়ার পরে 'ডুলাঝাড়া' বলতো, আরও একটু বড় হওয়ার পর তেলেভাজার ব্যবসার ভবিষ্যত সহকারী  ভাবতো, সেই ছেলে ম্যাট্রিকে কমার্স গ্রুপে দ্বাদশ স্থান পেয়েছে, উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগ, হিসাব বিজ্ঞান অনার্সে প্রথম শ্রেনী, মাস্টার্সে প্রথম শ্রেনী পেয়ে বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলেও ২৯তম স্থান পেয়েছিল। সে এখন সরকারী কলেজে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সর্বজনপ্রিয় অধ্যাপক!***]



আমাদের ছোটভাইটির কিন্তু অনেকগুলো নাম আছে, খুব ছোটবেলায় ও দেখতে খুবই সুন্দর ছিল, তাই বাবা, মা থেকে শুরু করে আত্মীয় -স্বজনদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ নিজের দেয়া নামে ওকে ডাকতো। গায়ের রঙ ছিল ধবধবে ফর্সা, তাই বাবা ডাকতো  'সাহেব', ওর পোশাকী নাম মা রেখেছিলেন, সেই নামে ও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত। মায়ের কোলপোঁছা ছেলে ছিলেন বলে মা তাঁর কোলপোঁছাকে আরও বহু বিচিত্র নামে ডাকলেও উনার দেয়া 'ধানী মরিচ' নামটিই তার স্বভাব ও চরিত্রের সাথে মানিয়ে গেছে। ছোটবেলায় যে ছেলে খুব বেশী রকম কোমল -সুন্দর ছিল, বড় হতে হতে সেই ছেলেই কী করে যেন 'কাঠখোট্টা আদর্শবান' হয়ে গেছে। নীতির বাইরে চলে না, নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে না, আমাদের কারো কোন অন্যায় আবদারে সাড়া দেয় না, উলটো আরও কঠিন কথা শুনিয়ে দেয়, ওর এমন পরিনতি দেখে শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই ওকে আড়ালে ধানী মরিচ ডাকতে শুরু করেছি। নামটা মা নিজে দিয়েছে, মা অবশ্য 'ধাইন্যা মরিচ' ডাকতো, সেটাও ওর আড়ালে। সামনাসামনি ডাকতো না। আমাদের পরিবারের অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোন একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, আমাদের সকলের মিলিত মতামতে কিছুই যাবে আসবে না, যতক্ষণ 'ধানী মরিচ' মতের পক্ষে সমর্থণ না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ শান্তি পাই না। ধানী মরিচের সমর্থণ মানে নৈতিক সমর্থণের মত। অধ্যাপনা করে তো, তার উপর আবার 'হিসাব বিজ্ঞান' পড়ায়, ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্য বিচার করে চলা মানুষ, সে 'হ্যাঁ' বলা মানেই যুদ্ধ না করে যুদ্ধজয়ের মত ব্যাপার! খুবই টেনশানে থাকি, নিজেদের মধ্যে কথা বলি, একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করি, 'প্রফেসার কী বলে? প্রফেসার হ্যাঁ না করা পর্যন্ত তো 'বিল' পাস হবে না। তার উপর এই প্রফেসার হচ্ছে 'একগুঁয়ে', যাকে আমরা রাগের চোটে 'ঘাউরা' ডাকি, নাহলে বলি, 'ঘাড় ত্যাড়া' পোলা একটা।

আমি ব্লগে লেখালেখি করি, এইনিয়েও ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকি। আমার বড়দা তো সরল মানুষ, আমার সব লেখাতেই 'হ্যাঁ' বলে, মেজদাকেও 'হ্যাঁ' বলতেই হয়, নাহলে আমার হাতে 'মাইর' খাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়, কিন্তু 'প্রফেসার' কে নিয়ে সমস্যা। সে বাবার কাছে নালিশ করেছিল একদিন, বাবা আমাকে ফোন করে এমন ধ্যাতানী দিয়েছিল যে অভিমানে আমি দুই মাস কারো সাথে কথা বলিনি। এতে করে হয়তো প্রফেসারের মনটাও কিছুটা ভিজেছে, হয়তো মনে পড়েছে ছোটবেলায় এই ফুলদি'র কোলে চড়ে বেড়িয়েছে, এই ফুলদি'কে সে 'তুতু' ডাকতো, সেই ছোটবেলার 'তুতু'র সাথে এত কঠিন হওয়া বোধ হয় ঠিক না, তার উপর মা'ও চলে গেলো, সবেধন নীলমনি একটাই বোন, সেও যদি এমন গাল ফুলিয়ে থাকে , তাহলে চলে কী করে! তাই হয়তো আর কখনও বাবার কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেনি। আমিও সবদিক বিবেচনা করে, ভেবে চিনতে লেখালেখি শুরু করেছি। ভয়ে ভয়ে ওকে ফোন নয়া করে ওর বউকে ফোন করে ওর কুশল জানি, তবুও ধানী মরিচকে ফোন করি না। মাঝে মাঝে ছোটমাসীকে ফোন করে ধানী মরিচের কথা জিজ্ঞেস করি, মাসীও উত্তর দেয়, " মাগো মা, ওর কথা কইতে পারবো না, এই নীতিবাগীশ যখন মুখ খুলে, ভয়ে বুক কাঁপে"। এই যখন অবস্থা, তখন তাকে ধানী মরিচ নয়া দেকে করবো কী! ভালো কথা, যে বা যারা ধানী মরিচ সম্পর্কে কিছুই জানে নয়া, তাদের জন্য বলে রাখি, ধানী মরিচ দেখতে খুব ছোট হয়, কিন্তু এর ঝাল হয় আকাশ ছোঁয়া!

ছোট ভাইটাকে নিয়ে অনেক রসিকতা করলাম, কারণ আমার ভাইটি কঠিন নীতিবাগীশ হলেও  দারুণ রসিক, ওর হিউমার সেন্স খুবই ভাল। স্মৃতিশক্তিও খুব প্রখর, এতদিন ভেবেছি,  মায়ের প্রখর স্মৃতিশক্তি বোধ হয় আমার এবং মেজদার মধ্যেই আছে, কিন্তু এখন বুঝেছি, ধানী মরিচের স্মৃতিশক্তি খুবই প্রখর। সে কথা কম বলে, তাই তাকে সব সময় পরিমাপ করা যায় না। ছোটবেলার স্মৃতিকথা নিয়ে গল্প করতে আমি আর মেজদা বরাবরই ভালোবাসি, মায়ের সাথে বসে আমরা অনেক গল্প করতাম। ধানী মরিচকে গল্পের আসরে ডাকতাম না,  ভাবতাম, একেতো ও আমাদের চেয়ে অনেক ছোট, কিছুই মনে থাকার কথা না, তার উপর আবার পেশাগত জীবনে 'হিসাববিজ্ঞানের' অধ্যাপক, হিসেবের বাইরে কথা বলে না, কিন্তু ধারণা ভুল। ছোটবেলার অনেক কথা ওর মনে আছে। ওর মনে আছে, আমাদের ছোটবেলা কেটেছে খুবই সাধারণভাবে, একটি সাধারণ মধ্যবিত্তের সংসারে যতটুকু মেপেজুখে চলা সম্ভব, তার চেয়েও বেশী অর্থনৈতিক চাপাচাপির মধ্যে আমরা বড় হয়েছি। আমার এই ভাইটি অধ্যাপনা শুরু করার সাথে সাথে আমার মা-বাবার সংসারে স্বচ্ছলতা আসুক আর নাই আসুক, রান্নাঘরে প্রতিবেলাতে পাঁচ -ছয় পদের কম আইটেম রান্না হয় না। মা মাছ খেতে ভালোবাসতেন বলে মায়ের কোলপোঁছা ছেলে বাজারের সেরা মাছ এনে বারান্দা ভরে ফেলতো। অধ্যাপকের বউটিও হয়েছে ভারী লক্ষ্মী। স্বামীর এই সকল হুজ্জোতেপনা হাসিমুখেই মেনে নেয়। অধ্যাপক হয়তো বা বিকেলে কোথাও ঘুরতে বেরিয়েছে, ফেরার পথে দেখতে পেলো, টাটকা মাছের ঝুড়ি নিয়ে জেলে বসে আছে, অধ্যাপক সাথে সাথে কিনে ফেলবে সেই মাছ। বাড়ী নিয়ে আসবে, অধ্যাপকের মা বাজার দেখে আহ্লাদে মুখ গদগদ করে হাসি দিবে, ছেলের প্রশংসায় গলে গলে পড়বে, এটাই ছিল আমাদের বাসার পরিচিত দৃশ্য।

এ বছর দৃশ্যপট বদলে গেছে। মা নেই, চলে গেলো গত অক্টোবার মাসে, অধ্যাপক ছেলে এখনও বাজার থেকে রাশি রাশি মাছ কিনে আনে, মায়ের ছবির কাছে গিয়ে হয়তো মনে মনে বলে, " মা, তুমি এভাবে চলে গেলা, এখন বারান্দা ভরে মাছেরা খেলা করে, মাগুর, শিং, কই মাছ লাফালাফি করে, কাছে থেকে তো দেখতে পাও না, দূর থেকেই দেখো, তুমি না দেখা পর্যন্ত আমার শান্তি লাগে না"! মা হয়তো কোন না কোনভাবে উনার ছেলের মনের আকুতি বুঝতে পারেন, নাহলে তো আবার সমস্যা আছে, ' ধাইন্যা মরিচ' হয়তো রেগে গিয়ে বাজার করাই বন্ধ করে দিবে।

আর কিছু লিখতে চাই না। আমার ভাইগুলি একেকটি রত্ন, যাকে নিয়েই লিখতে শুরু করি, হাত ব্যথা হয়ে যায়, লেখা শেষ হয় না। কত কথা বলতে পারতাম আমার এই ছোট ভাইকে নিয়ে। কলেজে ছাত্রছাত্রী-সহকর্মীদের মধ্যে কী যে জনপ্রিয়তা, হবে নাই বা কেন, আমার ভাইটা তো আর একালের ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি নিয়ে ছাত্র পড়ায় না! ও একজন আদর্শ শিক্ষক! যে কলেজেই ওর পোস্টিং হোক, সেখানেই কিছু গরীব ছাত্র ছাত্রীকে ও বিনে পয়সায় পড়ায়! সংসারেও ও খুব দায়িত্ববান, বাবা-মা, স্ত্রী, দুই ছেলেকে যথেষ্ট সময় দেয়, টিউশনী নামক যান্ত্রিক পেশায় নিজেকে জড়ায় নি। কখনও ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেনি, পড়ানোতে ফাঁকী দেয় না, সিলেবাস বাকী রাখে না, এমন একটি ভাইকে নিয়ে রসিকতা করতে 'সাহস' লাগে। আর কারো সেই সাহস নেই, আমার সাহস আছে বলেই এত কথা লিখলাম। 'সাহস' কী আছে? একটু আগেই তো ওকে ফোন করে বললাম,
" তোকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করেছি, ওয়ালে পোস্ট করবো? রাগ করবি না তো"!
আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলে, " রাগ করবো কেন, তুমি দাও। ব্লগে লেখা নিয়ে একবারই রাগ করেছিলাম, তখন পরিস্থিতি কারো অনুকূলে ছিল না, সেইজন্য। এখনতো আর কিছু বলি না।"

সকালে ওকে ফোন করেছিলাম, ফোন তখনও বন্ধ। বাবার নাম্বারে কল দিলাম, বললাম, " বাবা, আজকে তো রানুর জন্মদিন।" বেচারা বাবা অবাক হয়ে গিয়ে উলটো প্রশ্ন করেছে আমাকে, " আজকে রানুর জন্মদিন? কই, আমি জানিনা তো"! বললাম, " যিনি জানাতেন, উনি তো এখন আর নাই, তাই তুমি জানো না, অসুবিধা নাই, আমিই তো এখন মায়ের দায়িত্ব নিয়েছি, তোমাকে জানালাম। তুমি ওকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করো।" ফেসবুকে দেখি, অনেক আগেই বড়দা ওকে বার্থডে উইশ করেছে, মেজদাও করেছে, মেজ বৌদি করবে, সুনামগঞ্জ থেকে মাসী করবে, হবিগঞ্জ থেকে মিত্রা ফোন করবে, ওর ছাত্র ছাত্রীরা করবে, আদরের ভাগ্নী মিশা করবে!!! সবাই করবে, শুধু এই বছর ওর জন্য কালীবাড়ীতে কেউ পূজা পাঠাবে না, সেই মানুষটা তাঁর 'ধাইন্যা মরিচ'কে স্বর্গ থেকে আশীর্বাদ করবে। মায়ের বৌমা নিশ্চয়ই তার প্রফেসার স্বামীকে আমাদের  সকলের আগে 'হ্যাপী বার্থ ডে' বলেছে, আদরের টুকরা নাতি 'অতনু' বলেছে ' হ্যাপী বার্থডে বাবা', আরেক নাতি যীশু নিশ্চয়ই তার বাবার কাঁধে চড়ে বসে আছে!

শুভ জন্মদিন রানু, আমরা তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি! কঠিন আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখলেও তোর অন্তরের স্বচ্ছতা আমাদের কারো নজর এড়ায় না!!

Wednesday, May 22, 2013

অপমানের ক্ষত শুকোলেই আবার ব্লগে লিখবো!

না-দেখা একটি মেয়ে, নাম দিলাম 'আফসানা', থাকে আমেরিকার কোন একটি স্টেটে, তিন বছর হলো, এদেশে এসেছে। তরুণ স্বামীর সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখবে বলে মেয়েটি ধনুক ভাঙ্গা পণ করেছে। তাই স্বামী যেভাবে বলে, আফসানা সেভাবেই চলতে পছন্দ করে। স্বামী চায় না আফসানা 'ফেসবুক' করুক, আফসানা ফেসবুক করেনা। স্বামী চায় না তার লক্ষ্মী বৌটা বাঙ্গালীদের সাথে মেলামেশা করুক, আফসানা কারো সাথে মেলামেশা করেনা। স্বামী সুযোগ পেলেই আফসানাকে নিয়ে বেড়াতে যায়, রেস্টুরেন্টে খায়, একসাথে টিভি দেখে, কিন্তু যখন স্বামীর সে সুযোগ হয় না, যখন স্বামী কাজে ব্যস্ত থাকে, তখন একাকী আফসানার সময় কী করে কাটে, সেদিকে অবশ্য স্বামীর খেয়াল নেই। স্বামীকে তো আর একা থাকতে হয় না, অফিসে গেলে সহকর্মী, বাড়ীতে ফিরলে আফসানাকে পায়। তাই একাকী আফসানা কম্পিউটারে বসে, এটাতে ক্লিক করে, ওটাতে ক্লিক করে শেষ পর্যন্ত বাংলা ব্লগ খুঁজে পায়।  বাংলা ব্লগে নানারকম লেখা পড়ে  সে  সময় কাটায়। এভাবেই আফসানার একাকী মুহূর্তগুলো কাটে।

একদিন 'প্রিয় ব্লগে' বিশ্বজিতের উপর একটি লেখাতে আফসানার নজর আটকে যায়। লেখাটি ওপেন করে পড়তে থাকে, একটু পরেই খেয়াল করে ওর দুগাল চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে। বিশ্বজিতকে আফসানা খুব ভাল করে চেনে, শরীয়তপুরে আফসানাদের প্রতিবেশী ওরা। পূজা-পার্বণে, ঈদে-রোজায় সকলে মিলে কতই আনন্দ করেছে। সেই বিশ্বজিতের করুণ মৃত্যুতে আফসানার তরুণ হৃদয় কষ্টে নীল হয়েছিল। ও ভেবেছিল, ওর মত করে আর কেউ বোধ হয় ভাবছে না, আর কেউ তো বিশ্বজিতের মা-বাবাকে চেনে না, তাই জানেনা, ছেলে হারিয়ে পাশের বাড়ীর কাকীমার কত কষ্ট হচ্ছে। প্রিয় ব্লগে রীতা রায় মিঠুর লেখা পড়ে ও জানতে পারলো, বিশ্বজিতের জন্য এই লেখকের মনও তাহলে ওর মত করেই কেঁদেছে। ও যেমন করে পুত্রহারা  'কাকীমা' (বিশ্বজিতের মা)র কথা ভাবছে, এই লেখিকাও তো দেখি তেমন করেই ভাবছে, লেখিকাকে  ওর খুব ভাল লেগে গেল। ও লেখিকার অন্যান্য লেখাগুলোও পড়তে শুরু করলো। বেশীর ভাগ লেখাতেই পেল পারিবারিক গল্প, মায়ের অনুভূতি, মেয়েদের জন্য আলাদা মমতা, ছেলেদের জন্য কিছু স্নেহমাখা কথা। আফসানা এই লেখিকার লেখার মধ্যে নিজের মা'কে খুঁজতে শুরু করে দিল। লেখিকার সাথে যোগাযোগ করতে ইচ্ছে হলো, নাম-ঠিকানা জানা নেই, তাতে কী হয়েছে, বুদ্ধিমতী আফসানা লেখিকার কোন একটি লেখার সূত্র ধরে লেখিকার কর্মস্থলের ফোন নাম্বার যোগার করে ফেললো। ফোন নাম্বার যোগার করার সাথে সাথেই সে ফোনও করে ফেললো। আফসানার ভাগ্য ভালই ছিল, সেদিন রীতা রায় মিঠু কাজে এসেছিল, তাই তার সাথে সরাসরি কথা বলতে পেরেছে। লেখিকা তার ফোন নাম্বার চাওয়াতে আফসানা বিপদে পরে যায়, প্রথম আলাপেই ও লেখিকাকে জানাতে চায় নি পারিবারিক সমস্যার কথা। তাই ভদ্রতাবশতঃ ফোন নাম্বার দিয়েও ছোট করে বলে দিয়েছে, প্রয়োজনে ও নিজেই ফোন করবে লেখিকাকে, লেখিকা যেন ওকে ফোন না করে।

আফসানা খেয়াল করে, লেখিকা ওকে ফোন করছে না, তরুণী মনে কিছুটা অভিমান জন্মায়,  লেখিকাকে  সে 'আন্টি' ডেকেছে, মায়ের সম্মান দিয়েছে, তবুও আন্টি তাকে ফোন করলো না, অথচ আন্টিটাকে নিষ্ঠুরও মনে হচ্ছে না, আন্টির লেখা পড়ে তা মনেও হয় না্‌, সাত পাঁচ ভেবে আফসানা আরেকদিন আন্টির ফোনে কল দেয়, আন্টি ফোন ধরেনা, আফসানা মেসেজ রাখে," আন্টি, আপনি কী আমার উপর রাগ করেছেন? যদি রাগ করে থাকেন, তাহলে আর কল দেবো না্‌, আপনি কেন আমাকে কল দেন না, আমি কিন্তু আপনার লেখাগুলো খুব ভালোবেসে পড়ি"। মেসেজ দেয়াতে কাজ হয়েছে, আন্টি কল ব্যাক করেছে, " আফসানা, মামনি, তুমি তো আমাকে সময় বেঁধে দিয়েছো, আমি বুঝতে পেরেছি তোমাকে হয়ত কিছু সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে, তাই না জেনে কল দিয়ে তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি। তোমাকে বরং আমার নিজের ব্লগের লিঙ্ক দেই, ওখানে তুমি আমার সব ধরনের লেখা পড়তে পারবে। পারিবারিক, সামাজিক, আমেরিকান সংস্কৃতি নিয়ে লেখাও আছে। কারেন্ট ইস্যু নিয়ে লিখি, ওখান থেকেও আমার সংবাদ জানতে পারবে।" আফসানা খুশী হয়, খুবই খুশী।

এভাবে কয়েকমাস কেটে যায়। আফসানা তার আন্টির লেখার ভেতর দিয়েই আন্টিকে পায়, তার আম্মুকে পায়, আর আমি টের পাই আফসানা নামের এক একনিষ্ঠ ভক্তের উপস্থিতি। দুই মাস আগে আফসানা আবার মেসেজ রাখে, " আন্টি, আপনি খুব ভাল করেছেন, শয়তানদের বিরুদ্ধে লিখেছেন। এগুলি শয়তান, দেশটাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছে"। আফসানার মেসেজ পেয়ে আমি বিশাল বড় এক ধাক্কা খাই। আমি বেশ কিছুদিন প্রজন্ম মঞ্চ, গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে অনেক লেখা লিখেছিলাম। ব্লগে, স্বদেশখবর নামক সাপ্তাহিকে।  আমি জানতাম না এই সব ছোটখাটো লেখা, বাদ-প্রতিবাদ  চব্বিশ বছর বয়সী আফসানাদের নজর এড়ায় না।  অনুপ্রাণিত হয়ে আরও বেশী করে লিখতে শুরু করি। কারো উপকারে না আসুক, নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকি।

গত পরশুদিন আফসানা আবার ফোন করেছিল, আমাকে পায়নি, মেসেজ রেখেছে,
আন্টি, আপনি কেমন আছেন? অনেকদিন আপনার কোন লেখা পড়ি না। আপনাকে বলেছিলাম, এখানে আমি খুব একা, আমার হাজব্যান্ড একটু অন্যরকম, আমাকে ফেসবুক করতে দেয় না, আমার ই-মেইল অ্যাকাউন্ট নেই, এখানে বাঙালীদের সাথে মিশতে দেয় না। আমি ব্লগে গিয়ে আপনার লেখা পড়তাম,  আমার অনেক ভাল লাগতো। এখন আর কোথাও আপনার লেখা পাই না। এমন কী আপনার নিজের ব্লগেও কোন নতুন লেখা নেই। আপনি কী লেখালেখি ছেড়েই দিলেন? একেবারেই ছেড়ে দিলেন আন্টি?  আন্টি, জানি, ব্লগারদের নিয়ে দেশে অনেক গন্ডগোল হচ্ছে, কিন্তু আপনি তো কত ভাল ভাল লেখা লিখেন, কারো নামে তো বদনাম লিখেন না, তাহলে ব্লগে লিখছেন নয়া কেন? আমাকে ফোন দিবেন আন্টি।  আপনার বাগানের ফুলের ছবি দেখেছি 'আমার ব্লগ' এ। অনেক সুন্দর লেগেছে। আপনি অনেক ভালো থাকেন আন্টি, আপনার লেখায় আম্মুকে খুঁজে পাই।"

আফসানা ঠিকই বলেছে, আমি এখন বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, ব্লগে লিখিনা। আগে লিখতাম, প্রতিদিন একটা না একটা কিছু লিখে ব্লগে পোস্ট করতাম। আফসানা আমার লেখার একজন গুণমুগ্ধ পাঠক। যে লেখা পড়ে অনেকেই ছাইপাশ বলে ট্র্যাশ ক্যানে ফেলে দেয়, সেই লেখাতেও আফসানা ভালোবাসা খুঁজে পায়, সুদূর বাংলাদেশে থাকা আম্মুকে খুঁজে পায়! আমার জন্য এ তো বিশাল পাওয়া! আফসানার মত এমন লক্ষ্মী পাঠকের প্রতি লেখকের অনেক দায় থেকে যায়। ওতো শুধু আমার লেখা পড়েই না, লেখার ভেতর দিয়েই ও আমার হালহকিকত সম্পর্কে সচেতন থাকে। আমি যে ইদানিং ব্লগে লিখছিনা, তা ও খেয়াল করেছে, চিন্তিত হয়েছে আমার শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে। আমাকে পালটা ফোন করে বলতে হয়েছে, আমার শরীর ভালই আছে, মনটা ভাল নেই। মন খারাপের কারণেই ব্লগে লিখিনা। 

 'ব্লগ ও ব্লগার' কে বাংলাদেশের মানুষ এখন গালি হিসেবে ব্যবহার করে। একেবারে মাদ্রাসার কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নামকরা কলামিস্ট,  'বঙ্গবীর' খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সহ অনেকেই 'ব্লগার এবং ব্লগ' শুনলে ' ওয়াক থুঃ' বলে মুখ বিকৃত করে ফেলে। দেশের 'অযুত নিযুত' সংখ্যক বুদ্ধিজীবি  সকল ব্লগারদেরকে সকালের নাস্তার টেবিলে বসে একবার গালি দেয়, বিকেলের টিভি চ্যনেলের টকশো টেবিলে বসে আরেকবার গালি দেয়। এই সকল গালিগালাজ শুনে মনটাতে একধরণের নির্লিপ্তি এসে গেছে। খুব বেশী অপমানিত হয়েছি যেদিন আন্দালিব রহমান পার্থ নামক এক সাংসদ টকশো টেবিলে রসিয়ে রসিয়ে বলেছে, সে নাকি সকল ব্লগারদের কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে, সকল ব্লগারকে দিয়ে নাকে খত দেয়াবে। কী কারণে? কারণ, ব্লগাররা সবাই 'নাস্তিক'। আন্দালিব পার্থ একজন সাংসদ, অর্ধ ব্যারিস্টার ( 'ডাঃ আইজু নামের সুপরিচিত ব্লগার 'আন্দালিব পার্থের 'ব্যারিস্টার' উপাধীর খোঁজ খবর নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ' আন্ডা তুই আর ফুটলি না' নামে। সেখানেই বলা আছে, পার্থ ব্যারিস্টারী পড়া কমপ্লীট না করেই দেশে চলে আসে) সাংসদ হচ্ছে আমাদের দেশের আই্নপ্রণেতাদের একজন। সেই আইনপ্রণেতা যদি মনে করে, বাংলাদেশে 'নাস্তিক'দের ঠাঁই নেই, তাহলে আর বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে লেখার কোন অধিকারই তো  কোন ব্লগা্রের  নেই। তাহলে আর ব্লগে লিখে কী হবে! ব্লগারদেরকে যারা নিয়মিত গালি দিয়ে নাস্তা শুরু করেন, তারাও তো কই একবারও এই অর্ধ ব্যারিস্টারকে ডেকে বললো না, " খোকা, ব্লগাররা নাস্তিক হতে পারে কিন্তু কেউ অর্ধ শিক্ষিত নয়, অর্ধ ডিগ্রীধারীও নয়, তাদের কান ধরতে বলেছো কোন আক্কেলে, 'সরি' বলো"।" সেজন্যই অপমান ও অভিমানে  ব্লগে লেখালেখি থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি।



আমি নিয়মিত বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা পড়ি। অনেক পুরানো অভ্যাস। কিন্তু ব্লগে লেখালেখির অভ্যাস খুব বেশীদিনের নয়। আফসানার মত আমিও অনেকটা একাকী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। মেয়েরা বড় হয়ে গেছে, বিভিন্ন স্টেটে পড়াশুনা করছে, সামাজিক কুটকচালিতে আমি কখনওই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিনা বলে কোন গসিপেও থাকিনা, অথচ বিদেশ বিভুঁইয়ে সময় কাটাতে তো হবে। একাকীত্ব কাটাতেই লেখালেখি শুরু। আহামরি কিছুই না, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে গল্পের ছলে কিছু লিখে যাওয়া, যদি কারও কোন উপকারে লাগে! সেই ভেবেই লিখতাম, এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা। আমি রাজনীতি বুঝিনা, কিন্তু রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ।  'মানবিক রাজনীতির সপক্ষে থাকি, ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পছন্দ করিনা। আমি মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ, তাই মুক্তবুদ্ধির সপক্ষে কথা বলি। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে  ব্লগে আমার লেখার ধরণ পালটে যেতে থাকে, যেমন পালটে যেতে থাকে 'ব্লগ ও ব্লগার' নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তা ভাবনাগুলো।


একজন মানুষ, যে নিজের নামের বানানটাও শুদ্ধ করে লিখতে পারেনা, যে নিজের নামের বাংলা অর্থ জানেনা, যে জানেইনা, ব্লগ কী জিনিস, তাদের মত মানুষেরাই হঠাৎ করে 'ব্লগ ও ব্লগার' নিয়ে হইচই শুরু করে দেয়। একটি ছোট উদাহরণ দেই, মোটামুটি শিক্ষিতজনের সকলেই জানে,  'রেখা' একটি গাণিতিক শব্দ, যার অর্থ 'পথ', 'রেখা'র কোন হিন্দু/মুসলমান নেই। সালমা রেখা নামের একটি মেয়ের সাথে আমি বোন ' সম্পর্ক পাতিয়েছি, ওকে আমি ফেসবুকে 'বোন' হিসেবে পরিচয় দেই। সম্প্রতি একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক ফেসবুকে প্রশ্ন রেখেছে সালমা রেখা কী করে রীতা রায়ের বোন হয়?,  রীতা রায় হিন্দু,  আর সালমা রেখার সালমা হচ্ছে মুসলিম নাম, রেখা হচ্ছে হিন্দু নাম, এর ভেতর  কী কোন রহস্য আছে?   আমি নিশ্চিত, এই ভদ্রলোকও সেই দলের যারা 'ব্লগার' মানে নাস্তিক ভাবে। যারা জানেই না, 'নাস্তিকতা' একটি বিশ্বাস। আস্তিকতা যেমন একটি বিশ্বাস, নাস্তিকতাও বিশ্বাস। এই পৃথিবীতে 'আস্তিকের যদি বেঁচে থাকার অধিকার থাকে, 'নাস্তিকের'ও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কেউ মরণের পরেও জীবন আছে বিশ্বাস করে, কেউ মরণেই সব শেষ বলে বিশ্বাস করে। যারা মৃত্যুর পরে ঈশ্বর-আল্লাহ, স্বর্গ-নরক, বেহেশত-দোজখে বিশ্বাস করে, তাদেরকেই 'আস্তিক' বলে, যারা ঈশ্বর, স্বর্গ-নরক বিশ্বাস করেনা, তাদেরকেই 'নাস্তিক' বলে। আমার ধারণা, বুদ্ধিজীবিগণের সকলেই 'আস্তিক-নাস্তিক' এর তফাত জানেন, তারপরেও তারা 'ব্লগ, ব্লগার, আস্তিক, নাস্তিক' ঝড়ে দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলেছেন।  যে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ না করেও নামের আগে ব্যারিস্টার লাগায়, সেও যখন ব্লগারদের কান ধরিয়ে রাখবে বলে বেআইনী হুমকী দেয়, যারা ক্ষমতার লোভে, খ্যাতির লোভে, সস্তা পরিচিতির লোভে, জনপ্রিয়তালাভের আকাংক্ষায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কোমলমনে উগ্রতার বীজ বুনে দেন, কোমলমতি সাধারণ জনগণের অন্তরে ক্রোধের আগুন জ্বেলে দেন, তখন একজন সচেতন মানুষ হিসেবে, জন্ম এবং বেড়ে উঠার সূত্র ধরে মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আপাতত ব্লগে লেখালেখি বন্ধ রেখেছি।

লেখালেখির নেশাতে যাকে একবার পেয়ে বসে, তাকে যখন কলম বন্ধ করে বসে থাকতে হয়, সুদিনের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তার মনের গভীরের কষ্ট কী কেউ জানে! প্রবাসের একঘেঁয়ে জীবনের একাকীত্ব  কাটিয়ে তুলতে ব্লগে প্রবেশ করেছিলাম।  লেখালেখির জন্য  ব্লগ আমার কাছে খুবই প্রিয় একটি মাধ্যম। নিজের মনের কথা, নিজস্ব চিন্তা চেতনার কথা খোলাখুলি প্রকাশ করা যায়, শব্দ ব্যবহারে সীমারেখা থাকেনা। ব্লগে ঢুকে কতজনের সাথে পরিচয় হয়েছে, কী তুখোড়, মেধাবী তরুণ সব, যারা লেখালেখি করতে পছন্দ করেন,  লিখেন বা অন্যের লেখাগুলো পড়েন। কেউ কেউ আছেন, নিজে লিখেন ্না, তবে অন্যের লেখার উপর মন্তব্য করেন, সেই মন্তব্যগুলোও খুবই উপভোগ্য। মন্তব্য থেকেও বর্তমান প্রজন্মের মন মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ব্লগে তো শুধু আওয়ামী ঘরাণার পাঠকই থাকেনা, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, নির্দলীয়, গৃহিনী, চাকুরীজীবি, বেকার থেকে শুরু করে কত পাঠক নিয়মিত ব্লগ পড়ে। ব্লগে প্রগতিশীল এবং চরম প্রতিক্রিয়াশীল, দু ধরণের লেখক ও পাঠক বর্তমান। আধুনিক মানসিকতাসম্পন্ন তরুণ লেখকদের বিশ্লেষণধর্মী লেখা, যে কোন বিখ্যাত  কলামিস্টদের কাছে চিন্তার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। একেকটি লেখা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিছু কিছু ব্লগার প্রচুর পড়াশোনা করে, গবেষনা করে একেকটি লেখা তৈরী করে। 

লেখালেখি করা নেশার মতো।  ব্লগে লেখালেখি করে কোন রকম আয়-উপার্জন হয় না। ভালো লাগা থেকে লিখে সবাই, প্রত্যেকেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র, অনেকেই পেশাজীবি, আমার মত কেউ কেউ মাঝ বয়সীও আছে, যারা শখের বশে লিখে থাকে। আমিও  দু বছর ধরে শখের বশে লিখি। কোন পয়সা পাইনা, সংসারে কাজের ক্ষতি হয়, সামাজিকতা রক্ষা করতে পারি না, তবুও লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ব্লগে লেখালেখির সূত্র ধরেই দু' একটি পত্র পত্রিকাতেও লেখালেখির সুযোগ পেয়েছি। দায়িত্ব নিয়ে লিখতে গেলে প্রচুর পড়াশুনো করতে হয়, একটি বিষয়ের উপর পড়াশুনো করতে গিয়ে কাছাকাছি আরও অনেক বিষয় সম্পর্কে অবহিত হতে হয়। যারা মনে করে, ব্লগে লেখালেখি করা পাপ কাজের শামিল, তারা কেউ ব্লগ সম্পর্কে ধারণা রাখে না। তারা নিজেদেরকে সর্বজ্ঞানী ভাবে, তারা ধরেই নেয়, তাদের চেয়ে বেশী জ্ঞান আর কারও নেই, বা থাকতে পারে ্না। তারা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে বলে 'গন্ডগোলের' বছর, তাদের অনেকেই বলে, মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পরে যুদ্ধাপরাধী বলে কিছু থাকা উচিত নয়, যা হয়ে গেছে, তা পেছনে চলে গেছে। এখানেই বিপত্তি বেঁধেছে, ব্যক্ত্বিত্বের সংঘাত, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সিংহ ভাগই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সচেতন, তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু আধুনিক টেকনোলজী ব্যবহার করে , নানা তথ্য উপাত্ত ঘাঁটাঘাঁটি করে অনেক অজানা তথ্য সম্পর্কে জেনেছে, তারাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের রিসার্চলব্ধ তথ্য উপাত্ত ব্লগে প্রকাশ করে দিয়ে সকল পাঠকের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছেন। 

ব্লগাররা সব সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সোচ্চার ছিল, তারাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমাদের সকলেরই দায়বদ্ধ থাকার কথা, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বলেই আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের বিজ্ঞজনেরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করতে ভালোবাসে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গভীরতা নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ স্বীকার করে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের রূপকারকে স্বীকার করে না। এভাবেই বাংলাদেশে আমাদের প্রজন্ম, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় একেবারেই শিশু ছিলাম, যাদের বেড়ে উঠা ছিল সীমিত সুযোগের ভেতরে, আধুনিক টেকনোলজীর সাথে পরিচয় ছিল না, তারা মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের জীবনে তার গুরুত্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাইনি। ফলে আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক বিষয়েই ধোঁয়াশা নিয়ে বড় হয়েছি, নানাভাবে বিভ্রান্ত হয়েছি। এর জন্য যারা দায়ী, তারাই  ব্লগারদের উত্থানে  ভয় পেয়েছে, তারাই পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে সারাদেশে 'আস্তিক-নাস্তিক' ঝড় তুলে মেধাবী কিছু ছেলেমেয়ের জীবনকে হুমকীর মুখে ঠেলে দিয়েছে। তারাই অরাজনৈতিক চেতনায় গড়ে উঠা 'শাহবাগ মঞ্চ'কে বিতর্কিত করেছে, তারাই টিভিতে প্রচারিত টকশোতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে যে শাহবাগ মঞ্চ একটি  সরকারী ছায়ায় প্রতিপালিত মঞ্চ। তারাই সকল ব্লগারকে 'নাস্তিক' আখ্যা দিয়েছে। তাদের কারণেই হেফাজত মঞ্চ তৈরী হয়েছে। তাদের দাবীর মুখে মেধাবী তরুণদের হাতে 'হাতকড়া' পরেছে, তাদের কারণেই হেফাজতীরা ব্লগারদের ফাঁসীর দাবী তুলেছে। তারাই সকল মেধাবী ব্লগারদের অপমান করেছে, তারা দলবেঁধে একজন অপরাধী ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের মুক্তি চায়, অথচ তারা চারজন  মেধাবী ব্লগারের হাতে হাতকড়া দেখে উল্লসিত হয়! তাদের ক্রমাগত উস্কানীমূলক আক্রমনের শিকার হয়েছে 'গণজাগরণ মঞ্চ'। ব্লগাররাই একটি ছোট্ট গাঁথুণীর উপর তৈরী করেছিল মানুষের বিশাল আস্থার মঞ্চ, কতিপয় নোংরা স্বার্থান্বেষীদের রোষানলে পড়েই ভেঙ্গে গেল 'শাহবাগ মঞ্চের 'গণজাগরণ চেতনা'। সরকারে আদেশে ভেঙ্গে দেয়া হলো ব্লগারদের তৈরী মঞ্চ।


এই বুদ্ধিজীবিরা কতভাবে ব্লগারদের অপমান করেছে। তাদের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ প্রথম সারির দৈনিকে 'প্রজন্ম মঞ্চ' কে কটাক্ষ করে নোংরা গল্প লিখেছে, টাকা পেয়ে ফরমায়েশী গল্পে তারা প্রতিবাদী নারীকে 'পতিতা' বানিয়েছে,  প্রতিবাদী তরুণকে 'পতিতার দালাল' বানিয়েছে, তারাই একটি '৫ই মে' র জন্ম দিয়েছে। তাদের অনেকেই গলা ফাটিয়ে বলেছে, ৫ই মে ঢাকা শহরে 'গণহত্যা' হয়েছে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের' 'বঙ্গবীর', যিনি গণহত্যার ভয়াল রূপ দেখেছেন, সেই তিনিও শাপলা চত্বরে ১০ মিনিটে 'গণহত্যা' হয়েছে বলে দাবী করেছেন, 'গণহত্যা'র পরবর্তী ১৮ দল আয়োজিত গায়েবানা জানাজায় অংশ নিয়েছে্ন।  এখানেই তিনি থামেননি, যখন খেয়াল করেছেন, সরকার শাপলা চত্বর ইস্যুকে কিছুটা ঠান্ডা করে এনেছেন, সেই ঠান্ডাকে আবার চাঙ্গা করে তোলার জন্য ১৪ই মে এবং ২১শে মে'র ' বাংলাদেশ প্রতিদিন' পত্রিকায় পর পর দুটি উস্কাণীমূলক মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন। জানিনা, এতে উনার কতটুকু লাভ হয়েছে, তবে আমাদের মত প্রগতীশীলদের জন্য অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। উনার মত একজন প্রথিতযশা বীর মুক্তিযোদ্ধাকে এই প্রথম অবিশ্বাস করতে শুরু করেছি। এই প্রথম মনে সন্দেহ জাগছে, উনি কোন আদর্শে উদ্বুদ্ব হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন! যে স্যেকুলার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উনারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, কোথায় হারিয়ে গেলো সেই চেতনা! কেন বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের লেখা একটি উক্তি, " একজন মুক্তিযোদ্ধা সব সময় মুক্তিযোদ্ধা থাকেনা"। এগুলো ভাবতে চাই না, কিন্তু ভাবনাগুলো পিছু ছাড়ে না, শুধু তো বঙ্গবীরই নন, আরও কত ডাকসাইটে মুক্তিযোদ্ধারা আজ অন্য সুরে কথা বলছে! স্যেকুলারিজমের পরিবর্তে তারা আজ আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কে দেশকে  নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে!

এখন কথায় কথায় মানুষের লাশ পড়ে, কথায় কথায় গাড়ীতে , বাসে বোমা পড়ে, যাত্রী মারা যায়, পথচারী মারা যায়, পুলিশ মারা যায়, পুলিশের গুলীতে নিরপরাধ মানুষ মারা যায়, ধর্মীয় জিহাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে আসা উত্তাল জনতার মধ্যেও কতজন মারা গেলো! আহারে! মানুষের প্রাণ, যার যায়, সেই শুধু বুঝতে পারে, কী হারিয়ে গেলো, কে হারিয়ে গেলো! অথচ এগুলো কিছুই হতো না যদি একটি দৈনিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক  পত্রিকা জুড়ে 'ব্লগারদের' সম্পর্কে কুৎসিত রটনাগুলো না প্রচার করতেন, এসব কিছুই হতো না যদি সেই 'উত্তরা ষড়যন্ত্রের নায়ককে' 'বঙ্গবীর' সহ  কতিপয় বুদ্ধিজীবি সমর্থণ না জানাতেন, এর কিছুই হতো না যদি একদল রাজনীতিবিদ তড়িঘড়ি করে  ক্ষমতায় না যেতে চাইতেন, এর কিছুই ঘটতো না যদি একদল কলামিস্ট  নিজ আদর্শের বাইরে গিয়ে ফরমায়েশী উস্কাণিমূলক লেখা না লিখতেন, এর কিছুই ঘটতো না যদি সরকার সময়মত বিচক্ষনতার পরিচয় দিতেন। আজ আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, ভবন ধ্বসে বারো'শ প্রাণ বেরিয়ে গেছে, ধর্মীয় জিগির থেকে সৃষ্ট টর্ণেডোতে কত নিরীহ প্রাণ ঝরে গেছে, মাইকিং ঘোষণায় কত প্রাণ ঝরে গেছে, মহাসেন সাইক্লোনে কত ক্ষতি হয়েছে,   বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে সবচেয়ে সফল গার্মেন্টস শিল্পে ধ্বস নেমেছে, এসবের কিছুই হতো না যদি ক্ষমতালোভী মানুষগুলো একটু ধৈর্য্যশীল, সহনশীল এবং পারস্পরিক সহানুভূতিশীল হতেন।

আমাকে আফসানা ছাড়াও বেশ কিছু পাঠক ফেসবুকে মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি কেন আর ব্লগে লেখালেখি করি না, কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন আমি কেন আর বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় লিখিনা, দু'জন জানিয়েছেন, গত দুটি সংখ্যায় তারা 'স্বদেশখবর' এ আমার লেখা পান নি! আমি নিয়মিত লেখক নই, এই লেখার শুরুতেই বলেছি আমার অতি সম্প্রতি লেখক হওয়ার কারণ সম্পর্কে! তবে খুব অল্প সময় ধরে লিখলেও লেখালেখির প্রতি এক ধরণের নেশা বোধ করি। হাতে গোনা কয়েকজন আমার লেখা পড়তে ভালোবাসেন, তাই তারা আমার অনুপস্থিতিতে চিন্তিত হয়েছেন, তারা আমার লেখার ভক্ত পাঠক, আমার মত অতি সাধারণ এক লেখকের জন্য তাদের উদ্বেগ আমাকে আশান্বিত করেছে, আস্থাহীন মনে আস্থার বীজ বপন করেছে। তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাদের কাছে আমি ভালোবাসার দায়ে আবদ্ধ হয়ে গেছি, সেজন্যই আজকের এই কৈফিয়ত! ব্লগে লিখবো, পত্রিকাতেও আবার লিখবো, অপমানের ক্ষত শুকোতে যতটুকু সময় লাগে, ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা, আসলে আমি সুদিনের অপেক্ষায় আছি!