Saturday, October 3, 2015

নয়ন সমুখে তুমি নাই

                                                                 ০৩/১০/১৫

মা,

মিসিসিপিতে এখন রাত বারোটা বেজে বারো মিনিট, বাংলাদেশে অক্টোবারের ৩ তারিখ, বেলা ১১টা বেজে ১২ মিনিট। এখন বাংলাদেশের সাথে মিসিসিপির ১১ ঘন্টা ব্যবধান। তিন বছর আগের এই দিনে আমি তখন হসপিটালের সুবিশাল অট্টালিকা বিল্ডিং এর তিন তলায় আই সি ইউর ওয়েটিং রুমে বসে আছি। এই দিনেই সকালে ঢাকা পৌঁছেছি, আমি একা। হ্যাঁ মা, যে আমি রাস্তায় বেরোলে দিক হারিয়ে ফেলতাম, যে আমি নারায়ণগঞ্জ শহরে বড় হয়েও নারায়ণগঞ্জ ডি আই টি মার্কেট, সান্ত্বনা মার্কেট, শীতল মার্কেট চিনিনা, সে আমি আমেরিকা থেকে একা একা বাংলাদেশে চলে গেছিলাম। কোথাও হারিয়ে যাইনি। এখনও আমি মাঝে মাঝে ভাবি, কি করে একা চলে গেছিলাম?

এরপরেও আমি আরেকবার দেশে গেছি মা, ২০১৪ সালে। বইমেলায় গেলাম, সেবছরই আমার লেখা প্রথম বই ঠাকুরবাড়ির আঁতুড়ঘরে প্রকাশিত হলো। হুম, আমি বই লিখেছি, তোমার ভাষায় ফাজিল মাইয়া, অসভ্য মাইয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর বাড়ির পটভূমিকে সামনে রেখে বিশাল বড় বই লিখে ফেলেছে। এই কথাটুকু লিখতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ২০১২ সালের মে মাসে বাংলাদেশে গেলাম, সবাই মিলে গেলাম। মৌটুসীর বিয়ে হবে দেশের মাটিতে, দাদু দিদার উপস্থিতিতে, তাই নিয়েই মহাব্যস্ত ছিলাম। মহাব্যস্ততো থাকবোই, কন্যার পিতা যদি আলাভোলা হয়, প্লেনে চড়তে ভয় পাওয়া কন্যার পিতাকে যদি ধরে বেঁধে প্লেনে চড়িয়ে দেশে নিয়ে যেতে হয়, দেশে গিয়ে কন্যা বিয়ের আয়োজন যদি কন্যার মাকে দেখভাল করতে হয়, কন্যার মাকে তো মহাব্যস্ত থাকতেই হবে।

মা, আমার বিয়ের সময় কি তুমি মহাব্যস্ত ছিলে? ছিলেনা, কারণ বাবা ছিল ঘোর সংসারী, বাবাই সব কিছু সামাল দিয়েছে। অবশ্য এইসব উৎসব আয়োজনে আমার দাদু ছিলেন যথেষ্ট দায়িত্বশীল।


তুমি তো ছিলে বাবার বিপরীত, মোটেও সংসারী ছিলেনা। সংসার কোথা দিয়ে কিভাবে চালাতে হয় তা নিয়ে ভাবতে হতো না তোমাকে। ধনী পিতার আদুরে সন্তান ছিলে, সাধারণ মধ্যবিত্তের সংসারে তোমায় মানাবে কি করে? তবুও তুমি মানিয়ে নিয়েতোছিলে।

এখনও মনে পড়ে, সন্ধ্যেবেলা বাবা আমাদের ইংরেজী পড়াতো, একই সময় তোমার কাছে বাজার খরচের হিসেব চাইতো। তুমি হিসেব দিতে, বাবা হিসেবের খাতায় তা লিখে রাখতো। হিসেব লিখতে গিয়ে ধরা পড়তো তুমি হিসেবের বাইরে বাজার করিয়েছো। বাবা হিসেব করে টাকা দিত বাজারের জন্য, তুমি হিসেবের বাইরে খরচ করতে।
প্রতিদিন বাবা তোমাকে বকতো অতিরিক্ত খরচের কারণে, তুমি বাবার বকাগুলো এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিতে। তখন বাবার রাগ দেখলে ভয় পেতাম, এখন বুঝতে পারি, তোমাদের এই দৈনন্দিন হৈ চৈ টুকু ডাল ভাত খাওয়ার মত প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছিল। আমি কিন্তু তোমাদের দৈনন্দিন বাজারের হিসেব নিকেশের নাটক দেখে দারুণ শিক্ষা নিয়েছিলাম। নিজের সংসার জীবনে আমার স্বামীর অপছন্দের কাজগুলো করতে যাইনি।
তুমি ছিলে পদ্মপাতার মত, গায়ে জল পড়লে সে জলের ফোঁটা পাতায় লাগতোনা। আমি আবার তা নই, তোমার পেটে জন্মেও পদ্মপাতা হইনি, হয়েছি জলবিছুটি। গায়ে জলের ফোঁটা পড়লে গা চুলকুনি শুরু হয়ে যায়। কাজেই গা চুলকুনি হয় এমন কাজই করিনি।

বাজারের হিসেবে গোলমাল হতো মাছ নিয়ে, তুমি ছিলে মাছের পোকা, প্রতিদিন মাছ ছাড়া তোমার চলতোনা, তেমন আহামরি কোন মাছ নয়, দুই তিন ভাগা কেচকি, অথবা মলাইয়া মাছ। মাছ রান্না করতে এত্তগুলো আলু বেগুন ঝিঙ্গে কুচি মিশিয়ে, আমার মেজাজ গরম হয়ে যেত। এমন সস্তা মাছ খাওয়ার চেয়ে নিরামিষ তরকারী অনেক বেশী ভাল মনে হতো। কিন্তু তুমি মাছের সাথে কোন কমপ্রোমাইজ করতে চাইতেনা। মাছের গন্ধটুকু দিয়েই তোমার ভাত খাওয়া হয়ে যেত।
বাবার পছন্দ ছিল নিরামিষ, বলতো সপ্তাহে দুই দিন নিরামিষ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। তুমি মানতে চাইতেনা, আড়ালে বলতে, তোর বাপে নিজেও মাছ ভালোবাসে, মাছের টুকরা যখন পাতে দেই, কাঁটাটাও চিবিয়ে ছাতু কইরা ফেলে, এদিকে ভাব দেখায় নিরামিষ পছন্দ করে, আসল কারণ নিরামিষে খরচ কম হয়
আমি হয়তো ফোঁস করে উঠতাম, মা, নিরামিষে পয়সা কম খরচ হয় কে বলছে? ঘি, গরম মশলা কিনতে টাকা লাগেনা?
তুমি কথা বদলে ফেলতে, বলতে, কম বয়সে বাবা মারা গেছেতো, সংসারের হাল ধরার কেউ ছিলনা, বিধবা মা নিরামিষ খাইতো, মায়ের সাথে তোর বাপ কাকারাও নিরামিষ খাইতো। তোর বাপে এত হিসাব হিসাব করে কারণ, কষ্টের ভিতরে বড় হইছে, এখন কষ্ট করাই অভ্যাস হয়ে গেছে, টাকা খরচ করতে শিখে নাই।

মা, আসলে বাবারও দোষ ছিলনা, সেই ৭২ থেকে ৭৯ ছিল আমাদের জন্য কঠিন সময়, জিনিসের অগ্নিমূল্য, আমরা চার ভাইবোন স্কুল-কলেজে পড়ি, বাবার একা রোজগার, তার উপর সততা। সাধারণ চাকরির পয়সায় আমাদের লেখাপড়া ঠিকমত চালিয়ে নিয়েছে, তাতেই অনেক শোকরিয়া। তবে তোমারও দোষ দেখিনা, তুমি হিসেবের বাইরে যাকিছু খরচ করতে, আমাদের জন্যই করতে। নলা মাছের মাথা তোমার অতি পছন্দের, কিন্তু মাথা দিতে বাবার পাতে, এরপর ক্রমানুসারে বড়দা, মেজদার পাতে। আমাকে দিতে চাক, নিজে খেতে মাছের লেজ। উফ! নলা মাছ ছিল আমার দুই চোখের বিষ, কাঁটা গিজগিজ করতো। এই কাঁটার মধ্যেই তুমি কত আনন্দ পেতে।

তুমি যখন গল্প করতে, দাদুর মক্কেল বিশাল মাছ নিয়ে আসতো, জেলেরা মাছ ধরে ভাল মাছ পেলেই দাদুকে দিত, দাদু পয়সা দিয়েই কিনতো, তবুও সেরা জিনিসটা পেতে। দিদিমার রান্নার হাততো দ্রৌপদীর মত ছিল, শুনতে শুনতে আমি কল্পনার রাজ্যে চলে যেতাম। বিয়ের আগের সতের বছর বাপের ঘরে কত সুখে ছিলে, বাবা মায়ের প্রথম সন্তান ছিলে তুমি। আমার বাবার হিসেবের সংসারে গিয়ে অনেক কিছুই তোমাকে বাদ দিতে হয়েছিল হয়তো। তবুও তোমার মুখের হাসির কমতি ছিলনা।


মেয়ের বিয়েতে মহাব্যস্ত থাকার কথা বলছিলাম, তখনও দেশে যাওয়ার কিছু দেরী আছে, তোমার সাথে ফোনে কথা বলি, তোমার প্রিয় নাতনীর বিয়ে, অথচ তোমার কন্ঠে উচ্ছ্বাস নেই, সব কিছুতেই বলো, আগে দেশে আয়, দেশে এলেই সব হয়ে যাবে। দাদার কথা বলতে তুমি, শংকর সব দেখবে। আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার শরীর ভালো আছে কিনা। বলেছিলে, ভাল নেই। ডাক্তারের কাছে যেতে বলেছি, বলেছিলে, তুই আয়, তুই আসলে তোর সাথে যাব ডাক্তারের কাছে। আমি বুঝতেই পারিনি তোমার চাওয়াটুকু কতখানি তীব্র ছিল। নিজের জন্য কখনও কিছু চাওনি তোমরা, না তুমি না বাবা। তোমার চাওয়ার তীব্রতা বুঝবো কি করে বলো।

আমি বাংলাদেশে গেছি, মেয়ে বিয়ের বাজার করি, হিসেব নিকেশ করি, ছুটোছুটি করি, একবারও মনে পড়েনি, তুমি বলেছিলে আমার সাথে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। মেয়ে বিয়ে হলো জুন মাসে, মেয়ের বিরহ ভুলতে চলে গেলাম কলকাতা, সাত দিনের জন্য। তখনও মনে পড়েনি, তোমার শরীর খারাপের কথা। আমি ঘুরে এলাম জোড়াসাঁকো, দেশে ফিরে ঈদসংখ্যার জন্য লিখে ফেললাম ঠাকুরবাড়ির আঁতুড়ঘরে। দেশে ফিরেও আরও একমাস ছিলাম, মেয়ে বিরহে পাগল আমি ঘুরে বেড়াই, জাফলং, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, ঢাকা শহর। পার্টিতে যাই, নিজের ঘরে পার্টি করি, ভুলে যাই তুমি বলেছিলে, আমি এলে আমার সাথে ডাক্তার দেখাতে যাবে।

আমার অভিমানী মা তুমি, আমার উপর কী ভীষণ অভিমান হয়েছিল তোমার। আমি যদি জুন মাসে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতাম, হাতে কিছুটা সময় পেতাম চিন্তা ভাবনা করার। মা, কেন আমার উপর অভিমান করেছিলে? কেন মুখ ফুটে বললেনা তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা? আমাকে বিয়ে দেয়ার পর কি তোমার মন-মাথা সুস্থির ছিল? তুমি কি তখন তোমার মায়ের শরীরের সংবাদ নিতে? নিশ্চয়ই ঐ মুহূর্তে এসব কথা মনে পড়েনা। আমারও মনে পড়েনি, মনে যদি পড়তো, আজকে হয়তো এই চিঠি আকাশের ঠিকানায় না লিখে নারায়ণগঞ্জের ঠিকানায় লিখতাম। বড্ড বেহিসেব হয়ে গেছে।

মা, যতবার দেশে যেতাম, তুমি মনোযোগ দিয়ে আমাদের মুখ থেকে যাত্রাপথের বর্ণনা শুনতে, আমি, মৌটুসী, মিশা ৩৬ ঘন্টার জার্নিতে যত মজার কান্ড ঘটতো, সব অভিনয় করে দেখাতাম। কী সুন্দর আড্ডা হতো আমাদের ঘরে, তুমি, ছোট মাসি, মেজদা, রানু, অপু, তোমার দুই বৌমা, মামাবাবু, আমরা একসাথে কী আড্ডাটাই না দিতাম। এত বড় বাড়ির অন্য ভাড়াটে বৌদিরাও যোগ দিত আড্ডায়, আমাকে সবাই মিঠু ঠাকুরঝি, মিঠুদি ডাকে ওরা, আমি দেশে গেলে নারায়ণগঞ্জ বাসার পাড়া প্রতিবেশীরাও খুশী হয়।

ভেবেতোছিলাম, তোমাকে সজ্ঞানে পাব, হাসপাতালে দিনরাত কাটাবো, ক্যান্সারের অসহ্য যন্ত্রণার কথা শুনেছি, কিন্তু যন্ত্রণার ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পারিনা এখনও। ভেবেছিলাম, তোমাকে আমার ২৭ ঘন্টার জার্নির গল্প শুনিয়ে ক্যান্সারের যন্ত্রণা ভুলিয়ে রাখবো। কত মজার গল্প জমেছিল স্টকে, শুনলে তোমার রোগ যন্ত্রণা ভুলে যেতে, একা একা আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ চলে যাওয়া, সোজা কথা? কিন্তু গল্প শোনাবো, তা আর হলো কই? আমি প্লেনে বসে মৌটুসীর বাবার ফোন কল পেলাম, তোমার শারীরিক অবস্থার অবনতির গতি স্লো হয়েছে। আমি গিয়ে না পৌঁছা পর্যন্ত তোমাকে অপারেশান টেবিলে নিবেনা। কপাল আমার, সারা পথ আমি শান্তি মনে এলাম তোমার শরীর স্ট্যাবল আছে শুনে, এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে এলো টুম্পার বাবা, অঞ্জন দা। অঞ্জনদার মুখের চেহারাটাই এমন যে সব সময় হাসে। সেই কাক ডাকা ভোরেও হেসেছি্‌ল, অঞ্জনদার হাসিতে আমি নিশ্চিন্ত বোধ করেছিলাম কিনা জানিনা, কিন্তু কোথাও একটা শূন্যতা অনুভব করছিলাম। মাত্র দুই মাস আগে এই পথেই আমেরিকা ফিরে গেছিলাম, তখন চারদিক প্রাণবন্ত ছিল, দুই মাস পর এয়ারপোর্টের ভেতরেও কেমন নিস্তব্ধতা টের পাচ্ছিলাম। হয়তো সবই স্বাভাবিক ছিল, আমার মনের অবস্থাটাই স্বাভাবিক ছিলনা। লাগেজ বেল্টের সামনে দাঁড়িয়েছি, আমার সামনে দিয়েই আমার স্যুটকেস দুইবার চলে গেলো, আমি চিনেও চিনলামনা।

গাড়িতে উঠেই অঞ্জনদাকে বললাম, আমাকে হসপিটালে নিয়ে চলেন। অঞ্জনদা বললেন, আগে আমাদের বাসায় চলেন। আমি বললাম, না দাদা, স্যুটকেস নিয়ে আমি সরাসরি মায়ের কেবিনে যাব। ওখানেই থাকবো। অঞ্জনদা যখন বলল, মাসীমাতো কেবিনে নেই। আমার কান বন্ধ হয়ে গেলো, কিছু শুনতে পারছিলামনা। তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করলাম, মা কেবিনে নেই মানে কি? মা মরে গেছে?
অঞ্জনদা কায়দা করে কথা বলতে পারেনা, অল্পেই ঘেমে নেয়ে যায়। আমাকে বলল, মাসীমার অপারেশান হয়েছে গত রাতে, এখন আইসি ইউতে আছে, জ্ঞান ফিরেনি। মা, এই কথা শোনার জন্য কি আমি বাংলাদেশে গেছিলাম? মা, তুমি কি জানো, বাংলাদেশে যাব কি যাব না, এই নিয়ে আমি কত ভেবেছি? সেপ্টেম্বার মাসে তোমার অবস্থার অবনতি হচ্ছিলো কিন্তু আমরা বুঝিনি অথবা ভাবিনি যে এটা অবনতি। আমরা শুধু আশার আলো দেখি, ২১শে সেপ্টেম্বার আমার জন্মদিনে তুমি আমার সাথে কত কথা বললে ফোনে। আমি তখনও চিন্তা করিনি তোমাকে দেখতে যাওয়ার কথা। তোমার একটু ভাল নার্সিং দরকার, সেটা ভেবে যেতে চেয়ে তোমাকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা আমি আসবো? মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে তুমি বলেছিলে, কি করবি এসে? এই কয়দিন আগেই এত টাকাপয়সা খরচ কইরা গেলি মাইয়া বিয়ায়, তুই আসলেই কি আমার ব্যথা কমে যাবে?

আমি তখন দোনামোনা করছি, যাব কি যাবনা। ২৫/৩০ হাজার ডলার খরচ করে এসেছি মাত্র দুই মাস আগে, এখন আবার তিন হাজার ডলার খরচ করে গিয়ে কি হবে? ১৫ দিন পরে চলে আসতে হবে, মায়ের শরীর যদি এরপরে খারাপ হয়? অথবা মা যদি সুস্থ হয়ে যায় তাহলে এই তিন হাজার ডলার খরচ অযথা। মা, গরীবের মনটাও গরীব হয়, তাই এমন গরীবী ভাবনা করছিলাম। দেশে ফোন করলে মেজদা বলে, তোর আসার দরকার নাই। আমরাই আছি, মায়ের শরীর ভাল হলেই রেডিও থেরাপী দেয়া হবে।
আমার স্বামী নিজ থেকে কিছু বলছেনা দেখে ভেবেছি, বোধ হয় সেও চাইবেনা এখন আবার এতগুলো টাকা খরচ হোক। মা, ভুল, কী ভুল ধারণা করেছি! আসলে মুখ চাপা মানুষ সম্পর্কে এইজন্যই মানুষ ভুল ধারণা করে। আমি মৌটুসীর বাবাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, আমার কি করা উচিত? মৌটুসীর বাবা এমন তীব্রভাবে আমাকে বলল, আমার মা বা বাবা যদি এমন অসুস্থ হতেন, আমি সব ফেলে চলে যেতাম। আসলে মেয়েদের মনটাই তৈরী হয় ভাবনার দোলাচল দিয়ে। সংসারে মেয়েরা নিজেকে কখনও ডিসিশান মেকার হিসেবে ভাবেওনি, অন্যেরাও মেয়েদের ডিসিশন মেকার হিসেবে কল্পনা করেনি। তাই বিয়ের আগে মেয়ে ডিসিশন চায় বাপ ভাইয়ের কাছে, বিয়ের পর চায় স্বামী, পুত্রের কাছে। আমিও চেয়েছিলাম, প্রথমে বাপ-ভাইয়ের কাছে, পরে স্বামীর কাছে।

মা, মৌটুসীর বাবার এই কথাটুকু আমার নিথর দেহে প্রাণ সঞ্চার করেছিল। ওটা ছিল সেপ্টেমবারের ২৮ বা ২৯ তারিখ। আমি ফেসবুকেও লিখেছিলাম, আমার কি করা উচিত? তখন আমার বন্ধু সংখ্যা ছিল খুব কম, সকলেই বলেছিল দেশে যেতে। দেশ থেকে অবশ্য মেজদা আর রানু বলেছিল, তুমি ভাল আছো। কিন্তু একেবারে শেষের দিকে মেজদা বলেছিল, মিঠু, মা মনে হয় বাঁচবেনা। কিছু খাচ্ছেনা, না খেলে মানুষ বাঁচে?

২৮ তারিখে ওয়ালমার্টে গেলাম, সহকর্মীদের কাছে বললাম মায়ের অবস্থার কথা, সহকর্মীদের সকলে বলল, কালকেই দেশে চলে যেতে। বললাম, মাত্র তিন মাস আগেই আড়াই মাস ছুটি কাতিয়ে এসেছি, হাতে ছুটি নেই। ওরা বলল, আগে বাবা-মা, পরে চাকরী। এই চাকরী চলে গেলে আরও চাকরী পাবে, কিন্তু মা চলে গেলে মা পাবেনা। মা, আমরা আমেরিকানদের সম্পর্কে কত ভুল ধারণা পোষণ করি। আমরা বলি, আমেরিকানরা মা-বাবার খোঁজ নেয়না, ওল্ড হোমে রেখে দেয়। আমেরিকা না এলে আমিও এমনই ভাবতাম। ওয়ালমার্টে দশ বছর চাকরী করে আমার অনেক ধারণাই বদলে গেছে। আমেরিকানরা ওদের বাবা-মাকে অনেক ভালোবাসে, হয়তো আমাদের মত করে নয়, ওদের মত করেই ভালোবাসে। আমেরিকান বাবা মায়েদের খুব কমই আছে যারা বাঙ্গালী বাবা মায়ের মত ছেলেমেয়ে দেখেনা আমাকে বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

হিউম্যান রিসোর্স অফিসে গিয়ে এক মাসের ছুটি চাইলাম। বললাম, মা মৃত্যু শয্যায়। ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়, তুমি যে সত্যিই মৃত্যুশয্যায় তাতো ভাবিনি, শুধু ছুটি পাওয়ার জন্য আমি অতি অভিনয় করে মৃত্যুশয্যায় কথাটা বলেছিলাম। কাজ হয়েছিল এই কথায়, একজন অফিসার আছে , মারিয়া নাম, সে একটা ফরম বের করে সেখানে সব তথ্য ফিল আপ করে আমাকে দিল, বলল বাংলাদেশের ডাক্তারের কাছে ফ্যাক্স করে দিতে, ডাক্তার ওখান থেকে যদি বলে, তোমার মায়ের অবস্থা মরণাপন্ন, তাহলে তুমি এক মাসের ছুটিই পাবে।
আমি বার বার তিনবার জিজ্ঞেস করেছি মারিয়াকে, সত্যুই বলছোতো? আমি এক মাসের ছুটি পাব? তিনবারই মারিয়া বলেছে, পাবে।
আমি বাসায় এসে সেই ফরম মৌটুসীর বাবাকে দিলাম, মৌটুসীর বাবা সাথে সাথে ফ্যাক্স করে অপুকে পাঠালো, অপু নিয়ে গেলো ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার সব ইয়েস করে দিল, অপু ফিরতি ফ্যাক্স পাঠিয়ে দিল। ৩০ তারিখে আমি সেই ফরম নিয়ে আবার গেলাম মারিয়ার কাছে। মারিয়া ফরম জমা রাখলো, বলল, প্লেনের টিকেট কেটে ফেলতে। আমি কাজে ফিরে গেলাম, কাজ থেকেই মৌটুসীর বাবাকে ফোন করে বললাম, টিকেট কিনে ফেলতে।

ঘন্টাখানেক পরেই ওয়ালমার্টের স্টোর ম্যানেজার ডেকে পাঠালো, যাওয়ার পরেই ম্যানেজার বলল, তোমার মায়ের অবস্থা খারাপ জেনেছি, আমিও ব্যথিত। কিন্তু তুমিতো এক মাসের ছুটি পাবেনা। তুমি অলরেডি আড়াই মাস ছুটি কাটিয়েছো, এখন পাবে দেড় সপ্তাহের ছুটি। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি, ওখানেই কাঁদতে শুরু করেছি। আমার কান্না দেখে ম্যানেজার নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে গেছে, বার বার আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে। আমার তখন মানসিক অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গেছে , পারলে আমি ম্যানেজারের পায়ের উপর পড়ে যাই। আমার কান্না দেখে ম্যানেজার বলল, একটু অপেক্ষা করো, আমি এরিয়া সুপারভাইজারের সাথে কথা বলি

আমি আবার ফ্লোরে চলে এলাম, অন্য এসোসিয়েটরা আমাকে বলল, এরিয়া সুপারভাইজারকে সরাসরি ফোন করতে। ওরা ফোন নাম্বার দিল, আমি ফোন করেছি দুইবার, দুইবারেই মেসেজে চলে গেছে। আমি মেসেজ রেখেছি আমাকে কল ব্যাক করার জন্য। কোন কল আসেনি। বাসায় ফিরে আমি কি কান্না, মৌটুসীর বাবা বলল, তুমি যাও। আমি বললাম, ১০ দিনের জন্য গিয়ে আমি কি করব? যাওয়া আসাতেই চলে যাবে চার দিন। ছয়দিনের জন্য যাব? আবার মনের অগোচরে সেই গরীবী হিসেব চলে এলো। একদিনে টিকেট কিনতে লাগবে ২০০০ ডলার, দুই হাজার ডলার খরচ করে মাত্র ৬ দিন থাকবো? মা, গরীবের মনটাও গরীব হয়, তুমি ছিলে ধনীর কন্যা তাই তোমার মন গরীব ছিলনা, আমার বাবা ছিল গরীব হয়ে যাওয়া মায়ের পুত্র, তাই মনটা গরীব ছিল। আমার মনটাও গরীব। মৌটুসীর বাবা আমাকে বলে দিল, পরদিন কাজে গিয়ে যেন যা ছুটি দেয় তাই নিয়ে আসি, সেদিনই টিকেট কেটে ফেলবে।

পরদিন কাজে গেলাম, মনে আশা ছিল, স্টোর ম্যানেজার হয়তো গ্রীন সিগন্যাল দিবে। কো ম্যানেজার এক মহিলা আমাকে ডাকলো পার্সোনেলের অফিসে, সেখানে সেই মারিয়াও ছিল। ম্যানেজার মহিলা আমাকে সরাসরি বলল, তুমি সব মিলিয়ে আট দিনের ছুটি পাবে। এর বেশী সম্ভব নয়। আমার তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, কান্না নয়, কঠিন গলাতেই বললাম, আমার মা মারা যাচ্ছে, দুই দিন আগে মারিয়া আমায় বলেছে, এক মাসের ছুটি পাব, ডাক্তারের কাছ থেকে ফরম সই করিয়ে এনেছি, মারিয়াকে আমি তিন বার জিজ্ঞেস করেছি, সত্যি এক মাস পাব কিনা। মারিয়া বলেছে, তিন সত্যি। এরপরেও স্টোর ম্যানেজার আমায় বলল, এরিয়া সুপারভাইজারের সাথে কথা বলবে, তা যদি নাও হয়, তবুও আমার নিজস্ব ছুটি এখনও দুই সপ্তাহ আছে, এখন তুমি আমাকে ডেকে বলছো আট দিন?

মারিয়া চুপ করে আছে, কো ম্যানেজার বলে, দুই সপ্তাহ কিভাবে হয়? আমার হিসেবে আট দিন হয়।

কো ম্যানেজার মহিলাটি দশ বছর আগে ছিল সাধারণ ক্যাশিয়ার, তা থেকে কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার, তা থেকে সাঁই করে কো ম্যানেজার হয়ে গেছে। কো ম্যানেজার অংকে এত কাঁচা হয় কি করে?

রাগে শরীর আমার কাঁপছিল, আমি ক্যালেন্ডারে হিসেব গুনে দেখাচ্ছিলাম তবুও ম্যানেজার বুঝেনা। এক সময় বলে, আটদিন ছুটি, তুমি নিবে কি নিবেনা তাই বলো।

আমি বললাম, আমার পাওনা ছুটি পনেরো দিন, আমি পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছি, তুমি বুঝতে পারছোনা হিসেব। তুমি আমাকে আট দিনের ছুটি দিলে আটদিনের ছুটিই নেব, কারণ হাতে সময় নেই, আমার মা মরে যাচ্ছে। তবে এখানে স্পষ্টভাবে বলে যাই, তোমরা আমার প্রতি ইনজাস্টিস করছো, তোমরা আমার পাওনা ছুটি দিচ্ছোনা।

এই কথায় ম্যানেজার বিরক্ত হয়ে কাগজপত্র মারিয়ার দিকে ঠেলে দিয়ে বলে, ও কি বলছে আমি বুঝিনা, তুমি বুঝো কিনা দেখো। মারিয়া আমার হিসেব দেরীতে হলেও বুঝেছে এবং বলেছে আমার হিসেবই ঠিক। কো ম্যানেজার নিজেকে পরাজিত ভেবেই কিনা জানিনা, খুব বাজে ভাবে বলল, ১৭ তারিখের মধ্যে তুমি ফিরে না এলে তোমার চাকরি থাকবে তবে পজিশন হারিয়ে যাবে। বললাম, মানে কি? সে বলে, তুমি আর ফুল টাইম থাকবেনা, ফোন ডিপার্টমেন্টেও তোমার পজিশন থাকবেনা। অন্য যে কোন জায়গায় অপেনিং থাকলে সেখানেই কাজ করতে হবে। মহিলাটাকে আমি পছন্দ করতাম, কেমন পুতুল পুতুল ভাব আছে চলাফেরায়। সাদা গায়ের রঙ, সোনালী চুলের সুন্দরীকে দেখে মনে হচ্ছিলো, তুই এত নিষ্ঠুরতা দেখালি আমার সাথে, ভগবান তোকে ক্ষমা করুন



অঞ্জনদা যখন বলল, তুমি আই সি ইউতে, জ্ঞান ফিরেনি ঠিক তখন আমাদের গাড়ির বাম পাশের জানালা দিয়ে দেখলাম, ময়লা রঙের একটা ট্রেন কোথা থেকে যেন ঢাকার দিকে যাচ্ছে। ট্রেন দেখতে আমার কত ভাল লাগে, কিন্তু সেই সকালের ট্রেনটা খুব ময়লা ছিল।

তোমার
মিঠু

Friday, October 2, 2015

নয়ন সমুখে তুমি নাই

                                                                    ০১/১০/১৫


মা,                                            

কেমন আছো তুমি? দেখতে দেখতে তিন বছর পেরিয়ে গেলো, তুমি চলে গেছো দূরে, বহুদূরে। অথবা কোথাও যাওনি, আছো আমাদের সকলের মাঝে অদৃশ্য হয়ে। তোমায় অনুভব করি কিন্তু দেখতে পাইনা। তোমায় চিঠি লিখছি প্রায় দুই বছর পরে, গত দুই বছর কেন লিখিনি জানো?

তুমি মারা গেলে ২০১২ সালের ৮ই অক্টোবার তারিখে, এরপর অনেকদিন আমি ছিলাম ভীষণ এক ঘোরের মধ্যে। সেই ঘোর থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল এক ধরণের উন্মাদনা। আমায় পেয়ে বসেছিল চিঠি লিখার নেশায়। মনে আছে তোমার, তোমার মৃত্যুর পর প্রতি মাসের আট তারিখে আমি আকাশের ঠিকানায় তোমাকে চিঠি লিখতাম। সেই চিঠিগুলো লেখার সময় আমার কমপিউটার টেবিল চোখের জলে ভেসে যেত, অনেক সময় কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠতো। কেন কাঁদতাম জানো, তুমি মারা গেছো এই সত্যিটুকু মানতে পারতামনা। আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখছি অথচ মানতে পারছিনা তুমি আকাশে চলে গেছো। কি এক যন্ত্রণায় কেটেছে সময়টা। চিঠিতে কোনভাবেই তুমি মারা গেছো, তোমার মৃত্যু লিখতে পারতামনা। অথচ তোমার মৃত্যু আমাদের চোখের সামনে হয়েছে। আসলে আমি তখনও ভাবতাম, তোমার মৃত্যু হয়েছে এই কঠিন কথাটি শোনার জন্য তুমি প্রস্তুত ছিলেনা। কারণ তোমারতো মরবারই কথা ছিলনা। আমি এখনও ভাবি, তোমার মরবার কথা ছিলনা, মৃত্যুকে তোমার বরণ করতে হয়েছে। আমি তো জানি, কত জনের কত ভুলে তোমার মৃত্যু হয়েছে, সেই ভুল করনেওয়ালাদের মধ্যে আমি যেমন আছি, আছে ডাক্তারগণ। ধীরে ধীরে সবই লিখবো তোমাকে, তুমি অবাক হয়ে যাবে আমার সহজে বলা সত্যি কথাগুলো শুনে, মনে মনে বলবে, আমার মাইয়াটা এখনও ফাজিল রয়ে গেলো, কেমন করে সহজভাবে আমার মনে জমে থাকা দুঃখের কথাগুলি বলে দিচ্ছে। মানুষ শুনলে বলবে কি? মা, মানুষ কি বলবে তা নিয়ে আমি কি কখনও পরোয়া করেছি? তুমি কি ভাববে এটা নিয়েই কি কখনও পরোয়া করেছি? বাবার পক্ষ নিয়ে তোমার সাথে কত নাক মুখ নাচিয়ে কথা বলেছিনা?

মা, সেসব দিনের কথা মনে পড়লে কেমন জানি লাগে। জানো, সেদিন ফেসবুকে মুন তসলিমা শেখ নামের এক মেয়ের সাথে কথা হলো। মেয়ে নয়, মহিলা, আমারই বয়সী, আর কয়দিন পরেই ওর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে। ওর মা মারা গেছেন এই বছরেই, এপ্রিল মাসে। তসলিমা মুন মেয়েটা দারুণ অন্যরকম, আমার মত ভ্যাবলা নয়, তুখোড় মেয়ে। ফেসবুকে খুব ধারালো স্ট্যাটাস লিখে, ভীষণ সংস্কৃতিমনা। ও সেদিন বলেছিল, সেও নাকি আমার মত চোপাটি ছিল। মায়ের সাথে চোপা করতো, নিজের কাছে যা সঠিক মনে হতো, মাকে সে কথা শুনাতে ছাড়তোনা। আমিও যেমন ভাবিনি, তুমি মরে যাবে, মুনও ভাবেনি ওর মা মারা যাবেন। অথচ দুজনের মা মরে গেলে, এদিকে মেয়ে দুটো কাটা পাঁঠার মত যন্ত্রণায় ছটফট করে। মুন বলেছে, ওর হৃদয়টা নাকি এ ফোঁড় ও ফোঁড় হয়ে যায়।


যাই হোক, যা বলছিলাম, প্রতি মাসের আট তারিখে চিঠি লিখা শুরু করে একটানা এক বছরে দশখানা চিঠি লিখে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। তুমি অংকের শিক্ষক ছিলে, নিশ্চয়ই ভাবছো, প্রতি মাসে যদি একখানা চিঠি লিখে থাকি, বারো মাসে দশখানা চিঠি হয় কেমনে? মনে মনে বলছো, আমেরিকার মত উন্নত দেশে থাইকা দেখি মাইয়ার অংকের ঘিলু নষ্ট হইয়া গেছে। কে বলবে এই মাইয়া মেট্রিকে অংকে ৯৫ পাইছিল? মৌখিক অংকে কত ভাল ছিল মাইয়া, এখন কয়ে বারো মাসে দশ চিঠি?

মা, প্রথম দুই মাস কিছু লিখিনি, তখনতো আমি আমাতেই ছিলামনা। ২০১৩ সালের জানুয়ারীতে তোমায় প্রথম চিঠি লিখেছিলাম, অক্টোবারে শেষ চিঠি, তাহলে দশখানা চিঠিইতো হয়, তাইনা? অক্টোবার মাসে সিদ্ধান্ত নিলাম, যেদিন আমি লিখতে পারবো বা বলতে পারবো, আমার মা মারা গেছেন সেদিন থেকে আবার তোমাকে চিঠি লিখা শুরু করবো। আমার কথা শুনে মন খারাপ করছো? ভাবছো, বাহ! মেয়ে আমার মৃত্যু নিয়ে এখন বেশ ঘটা করে কথা বলছে। মেয়ে তাহলে এতদিনে মাকে ভুলে যেতে শুরু করেছে?

মা, অংকের হিসেব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মজার একটা কথা মনে পড়ে গেলো। এই কয়দিন আগে, ২৮শে সেপ্টেমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন ছিল। ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই উনাকে ৬৮তম হ্যাপী বার্থডে বলে ফেসবুকে উইশ করেছি। ওমা, কয়েক ঘন্টা পরেই একটার পর একটা মেসেজ পাই, দিদি, শেখ হাসিনার ৬৯তম জন্মদিন লিখেছে পত্রিকায়, টিভি নিউজেও বলেছে ৬৯তম জন্মদিন। মা, এখনও সেই একই ভুল করে মানুষ, জন্মদিনের হিসেবে গোলমাল করে ফেলে। সোজা হিসেব বুঝেনা, আমি বললাম, বাচ্চার এক বছর পূর্ণ হলে প্রথম জন্মদিন পালন করো নাকি দ্বিতীয় জন্মদিন? সাধারণ নিয়মে বুঝিয়ে দিয়েছি বয়সের হিসেব, তবুও দেখবে, আগামী বছরও একই ভুল করবে। আমিতো ঠ্যাটা, এখনও ঠ্যাটাই আছি, বলে দিয়েছি, টিভিতে বা পত্রিকায় যে এই হিসেবের ভুল করেছে, সে মানস অংকে আমার চেয়ে কাঁচা।



মা, তিন বছরে আমি আগের চেয়ে সুস্থির হয়েছি, এখন যদিও আঙ্গুল কাঁপছে তুমি মারা গেছো কথা লিখতে, তবুও লিখছিতো, তাইনা? আমি এখন অনেক সুস্থির হয়েছি মা, কথা কম বলি। আগে বেশী কথা বলতাম তাই তুমি আমাকে ফাজিল মাইয়া, অসভ্য মাইয়া বলে কত বকাবকি করতে। আসলে তখন আমাদের জগৎটা ছিল একরকম, তোমার মৃত্যুর পর জগৎ পুরো বদলে গেছে। একজন মানুষের শারীরিক অনুপস্থিতি এমন বদলে দিতে পারে আশপাশ, চারপাশ জানা ছিলোনা। আফসোস লাগে, এখন আমি ভাল হয়ে গেছি তুমি দেখতে পাচ্ছোনা। নাহ! ভুল বলেছি, তুমি দেখতে পাচ্ছো, আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছিনা, কিন্তু অনুভব করি। এই যে তোমাকে চিঠি লিখছি, তুমি কি বুঝতে পারছোনা? সবই বুঝতে পারছো, নিশ্চয়ই ঠোঁট চেপে মুচকী হাসছো। তোমাকে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে মা।


কয়েকদিন আগে হঠাৎ খেয়াল হলো, সোনার গয়নাগুলো গুছিয়ে রাখার কথা। সোনার গয়না কী-ইবা আছে আমার, আমি সোনার গয়নার জন্য কখনও লালায়িত ছিলামনা। তবুও টুকিটাকি যা আছে, সেটিও ফেলনা নয়। আমি এখনও অগোছালোই রয়ে গেছি, তুমি চলে যাওয়ার পর আরও বেশী অগোছালো হয়ে গেছি। সোনার গয়না কোথায় রেখেছি সেটাই মনে করতে পারছিলামনা। একটা ব্যাগে কয়েকটি বাক্স পেলাম, বাক্সে টুকিটাকি গয়না। আমি কি করেছি শোন, আমার বিয়ের গয়নাগুলো তিন মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দিয়েছি। সোনার বালা জোড়া দিয়েছি মৌটুসীকে, মিশাকে দিয়েছি বরের বাড়ি থেকে পাওয়া বৌভাতের গয়না, আর বিয়ের মূল গয়না সব মিথীলার জন্য। মিথীলাকে বেশী দিয়ে দিচ্ছি? দিলে দিয়েছি, বেশ করেছি। মিথীলাতো আমাকে বেশীদিন পাবেনা, মিশা মৌটুসী আমাকে ওর চেয়ে অনেক বেশী দিন পেয়েছে, মিথীলা আমাকে পেলো মাত্র পনেরো বছর, হোস্টেলে চলে গেলো, আরতো আমার কাছে আসবেনা, তাইনা? আমি মরে গেলে মিথীলা আমার গয়নার মাঝেই আমাকে খুঁজবে।

শোন ঘটনা কি হয়েছিল, গয়নার বাক্স ঘাঁটবার সময় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, কেন জানো তো? তোমাকে বলা হয়নি, তোমার বিয়ের নেকলেসটা আছে না? যেটা ছোট বৌকে দিয়েছিলে, সেই নেকলেস গতবছর দেশ থেকে ফেরার সময় তোমার ছোট বৌমা মিথীলাকে উপহার হিসেবে দিয়েছে। অনিতা যখন নেকলেস আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, ফুলদি, মায়ের এই নেকলেসটা মিথীলাকে দিলাম, মায়ের শখের জিনিস, মায়ের চিহ্ন আর কাউকে দিলামনা, মিথীলা খুব গোছানো মেয়ে, মিথীলা যত্নে রাখবে। আমি থতমত খেয়ে বলেছি, সেকি! মা এই নেকলেস তোমাকে দিয়েছে, তুমি কেন মিথীলাকে দিচ্ছো। অনিতা বলল, মিথীলারেই দিলাম, আমি যাইই কোথায় যে নেকলেস পরবো। মিথীলার বিয়েতো দেখতে পারবোনা, ছোট মামা-মামীর তরফ থেকে মিথীলাকে উপহার দিলাম।  একবার বলতে চেয়েছিলাম, অতনুর জন্য রেখে দাও,কিন্তু বলিনি। অনীতা নিশ্চয়ই কষ্ট পেতো। হয়তো মনে মনে বলতো, ফুলদি, জানেনইতো, অতনু আর দশটা ছেলের মত স্বাভাবিক হয়নি, ও যে অটিস্টিক তাতো সকলেই জানে। ও নিজের যতনই করতে পারেনা, নেকলেসের মর্ম বুঝবে কি। থাক, অতনু আমাদের অতনু সোনা হয়েই থাক।

নেকলেস হাতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিলো, তোমার বিয়ের সকল গয়না ভেঙ্গে নতুন গয়না গড়িয়ে আমায় বিয়েতে দিয়েছিলে। নেকলেসটাও ভাঙ্গতে চাইছিলে, তখন দিদিমা তোমাকে বলল, তোর বিয়ের নেকলেসটা ভাঙ্গিসনা, রানুর বৌয়ের জন্য রেখে দে। রানু তোর কত যত্ন করে, সকালে বিকালে চা বানিয়ে খাওয়ায়, যখন যা কস তাই শোনে, নেকলেসটা ওর জন্যই রেখে দে
তুমি নেকলেস ভাঙ্গলেনা। এই নেকলেসটা আমার কাছেও খুব ভাল লাগত, যদিও তোমার গলায় কখনও দেখিনি। তোমার গলায় থাকতো সোনা বাঁধানো ঝিনুকের লকেটসহ চেইন। ঝিনুকের লকেটটা এখনও আমার চোখে ভাসে। লকেটের শেপটা ছিল অসম বাহু চতুষ্কোণা। লকেটের চারধার সোনার লতাপাতায় বাঁধানো, মাঝখানে জোড়া ময়ূর। তখন এই সৌন্দর্য্যের মানে বুঝতামনা, আমার বিয়ের গয়না বানাতে সেই অদ্ভুত সুন্দর ঝিনুক লকেট চেইনটাও ভেঙ্গে ফেললে। বড়লোক বাপের মেয়ের যদি গরীব স্বামীর ঘর করতে হয়, সেই মেয়েটিকে তোমার মত নির্লোভ, উদার, বাসনাহীন হলে মানিয়ে যায়।

আমি তোমার মত নির্লোভ, উদার ছিলামনা। তোমার নেকলেসটার দিকে আমার নজর ছিল। রানুর বিয়ের সময় আমরা অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরেছি, আমার স্বামী ভাল বেতনের চাকরিতে ঢুকেছে, আমি আর গরীব নই। তুমি যখন ছোট বৌকে দেবে বলে নেকলেস আবার সোনা রঙ করাচ্ছো, আমি বললাম, মা, এই নেকলেসের যা ওজন, সেই সমান ওজনের সোনা দিয়ে আরেকটি নেকলেস বানিয়ে দেই, নতুন নেকলেসটা বৌকে দাও, তোমার বিয়ের এই নেকলেসটা আমাকে দিয়ে দাও। পুরনো জিনিসের প্রতি আমার দারুণ আকর্ষণ, শুধু স্মৃতি রক্ষা করতে ভালো লাগে। আমার কথায় তুমি একটু থমকেছিলে, বলেছিলে, তোর দিদিমা কইছিল, রানু আমার এত যত্ন করে, তাই নেকলেসটা রানুর বৌকে দিতে। তোর দিদিমা মারা গেছে কবে, কথাটা রয়ে গেছে
মরীয়া হয়ে আমি বলেছিলাম, মা, আমিতো সমান ওজনের স্বর্ণ দিয়েই নতুন নেকলেস বানিয়ে দেব, বৌয়ের কাছে নেকলেসটাই শাশুড়ির উপহার, এর ইতিহাসতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে থাকলে আমি জানবো, এই নেকলেসটা আমার মায়ের গলায় ছিল, তুমি যখন থাকবেনা তখন নেকলেসের গায়ে তোমার পরশ থাকবে
তুমি বলেছিলে, অপেক্ষা কর, রানুকে জিজ্ঞেস করে দেখি
রানুকে জিজ্ঞেস করতেই রানু বলেছিল, নাহ! মায়ের চিহ্ন শুধু মেয়েই মূল্য দিবে, কেন ছেলে হলে কি মূল্য দিতে পারেনা?

নেকলেস আর পাওয়া হলোনা। তোমার মৃত্যুর পরে আমাদের চার ভাইবোনের জীবনের নামতা উলটাপালটা হয়ে গেছে মা। কতকাল পরে হঠাৎ করে রানু আর অনিতা নেকলেসটা আমাকে দিয়ে দিল, মিথীলাকে দেয়ার জন্য। মা, আমরা কেউই নিজেদের কাছে তোমার নেকলেস রাখলামনা, নেকলেস ছাড়াই তোমার চিহ্ন আমাদের হৃদয়ে রয়ে গেছে।

যে কথা বলছিলাম, সেদিন গয়না গুছাতে গিয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে গেছিলো কারণ তোমার নেকলেসের বাক্স খুঁজে পাচ্ছিলামনা। কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলামনা, অত্যন্ত দামী বলে কি আরও বেশী যত্নে আর কোথাও রেখেছিলাম? সেটাও মনে করতে পারছিলামনা। বার বার মনে পড়ছিল, অনিতার কথা, কত যত্ন আর বিশ্বাসে কলজে ছেঁড়া ধন আমার হাতে তুলে দিয়েছিল, আর আমি কিনা তা খুঁজে পাচ্ছিনা? যখন হাত পা ছেড়ে দেয়ার জোগাড়, তখনই পাঁচবার দেখা হয়ে যাওয়া ব্যাগে ষ্ঠবার হাত দিতে ম্যাজিকের মত নেকলেসের বাক্স হাতে পেলাম। বাক্স খুলে দেখলাম নেকলেসটাকে, হাত রাখলাম নেকলেসের গায়। তোমার ছবির দিকে তাকালাম, ছবিতে তুমি হাসছোনা অথচ আমি স্পষ্ট দেখলাম তুমি হাসছো। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, তোমার কাছে আবার চিঠি লেখা শুরু করব। আজ ১লা অক্টোবার নতুন করে চিঠি লিখতে বসলাম।

তোমার

মিঠু

Saturday, May 31, 2014

যুগের খেলা!

আজ এক বুড়ী মা-কে নিয়ে তাঁর মেয়ে এসেছিল ফোন কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করাতে। বুড়ী মায়ের বয়স ৮০, মেয়ের বয়স ৬২। মা-মেয়েকে দেখেই আমার খুব মনে ধরে গেলো, বিশেষ করে বুড়ী মা'কে। সারাক্ষণ মুখে হাসি, পুরানো মটোরোলা রেজার ফোন পালটে I phone 5c (আই ফোন ৫ সি) কিনতে চাইছে। আমার হাঁ করে থাকার মত অবস্থা, অন্য সময় হলে মনে মনে হতাশ হতাম, কারণ এই বুড়ীমা'কে ধরে ধরে সব শিখিয়ে দিতে গেলে অনেক কষ্ট হয়তো। কিন্তু আজ হতাশ হইনি, মা-মেয়ের এমন অন্তরঙ্গ ভাব দেখে মুগ্ধ হয়েছি। অ্যাক্টিভেশান শেষে হাস্যময়ী বুড়ীমা'কে ফোন ব্যবহারের প্রাথমিক ধাপগুলো শিখিয়ে দিতে চাইলাম। বুড়ীমা শিখবে কি, নীল রঙের পাতলা আই ফোন হাতে নিয়েই সে কি খুশী! আমি যা কিছু বলি, তার কোনটিই তাঁর কান দিইয়ে ঢুকছে বলে মনে হচ্ছিলনা। ভাব দেখে বুঝলাম, বুড়ীমা ফোন হাতে নিয়েই বসে থাকবে।

ফোন কেইস থেকে ব্যবহারবিধি কাগজ দেখিয়ে বলে দিলাম, ভালো করে পড়ে দেখতে। বুড়ীমা শুধুই হাসে, মায়ের হাসি দেখে মেয়েও হাসে। মা'কে খোঁচা দিইয়ে বলে, ' তুমি শিখে নাও কিছুটা'।
বুড়ীমা আমাকে শুধায়, " তোমারও কি আই ফোন?"
বুড়িমা'কে বললাম, '" মাথা খারাপ, আমার মত ডাম্ব আইফোন হাতে নিতেই থরথর করে কাঁপে, আমি স্মার্ট ফোনের কিছুই বুঝিনা"।
বুড়ীমা তেমন করে হাসতে হাসতেই বলে, " তাহলে তুমি কি আমাকে ভুল শেখাচ্ছো?"
বলি, " মাথা খারাপ, তোমার মত এমন স্মার্ট লেডীকে ভুল শেখাবো আমি? আমি এই জীবনে প্রথম দেখলাম মেয়ে ব্যবহার করে স্যামসাং ফ্লিপ ফোন আর ৮০ বছরের তরুণী ব্যবহার করবে আই ফোন ৫ সি!"
বুড়ীমা বলে, " আমি কি পারবো?"

বললাম, " অবশ্যই পারবে। তাছাড়া পারাপারির কিছু নেই, ফোন হাতে নিয়ে তুমি খেলা করবে, স্ক্রীনের প্রতিটি ছবিতে আঙ্গুল ছোঁয়ালেই নতুন স্ক্রীন আসবে, স্ক্রীন পড়ে দেখবে কি কি লেখা আছে। ফোন নষ্ট হওয়ার ভয় নেই, যদি মনে করো স্ক্রীন ভালো লাগছেনা, আবার আগের স্ক্রীনে ফিরে যেতে চাও অথচ ভুলে গেছো কি করে যেতে হয়, তাহলে এই হোম বাটনে চাপ দিলেই হোম স্ক্রীনে চলে যাবে। এভাবেই ফোনে থাকা প্রতিটা ফীচার শিখে যাবে। এই ফোনে অনেক ফীচার আছে, তোমার সময় খুব ভালো কাটবে। শুধু এই ফোনের ছবিওয়ালা ফীচারটা দেখে রাখো, কাউকে কল দিতে হলে এই ছবিতে আঙ্গুল ছোঁইয়াবে, টেলিফোন প্যাড আসবে, নাম্বার ডায়াল করে 'কল' এ আঙ্গুল ছোঁইয়ালেই হবে।"

বুড়ীমা বলে, " তুমি খুব ভালো করে বুঝাতে চেষ্টা করলে, আমার খুব ভালো লেগেছে।"
মেয়ে বলল, " মাদার, তুমি ফোন নিয়ে খেলবে"
বুড়ি বলে, "আধুনিক যুগটা অনেক ভাল, কত মজার জিনিস, আমাদের যৌবনে এগুলো কিছুই ছিলনা, এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক ভাগ্যবান, সব ভালো ভালো জিনিস পাচ্ছে।"

বুড়ীমার এই কথায় বুকটা মুচড়ে উঠলো, বুড়ীমা মনে করিয়ে দিল, সময় হয়েছে যাবার, বিদায় বেলায় কী-ইবা আছে পাবার!

হারিয়ে গেছে যে ছেলে!

জুনায়েদ নামটা শুনলেই বুকে ভীষণ ধাক্কা লাগে। জুনায়েদ নামের না-দেখা যুবক মেডিক্যাল থার্ড ইয়ারে উঠে ডাক্তারী পড়া ছেড়ে থিয়েটারের উপর এক বছরের কোর্স করতে পাকিস্তান থেকে মিসিসিপি চলে এসেছিল, মিশাকে ছোট বোনের মত স্নেহ করতো, মিশার সাথে আমাদের বাড়ী আসবে বলে বায়নাও ধরেছিল। মিশা যখন জুনায়েদের কথা আমাকে বলেছিল, আমি সোজা মানা করেছিলাম, পাকিস্তানী কোন ছেলে আমাদের বাড়ীতে আনা যাবেনা। আমি খুবই মায়াবী ধরণের মানুষ, মা সম্পর্কে এমনটাই আমার মেয়েরা বিশ্বাস করে, তাই আমার 'না' শুনে মিশা খুব আহত হয়েছিল।
পরেরবার মিশা বাড়ী এসে বলল, " জুনায়েদ ভাইয়া পাকিস্তানীদের সাপোর্ট করেনা, বাংলাদেশের পক্ষে, তোমাকে 'মাম্মী' ডেকেছে, তোমার সাথে দেখা করতে আসতে চায়"।
আমার মন গলে গেলো, এর আগে মিশা হোস্টেলে ফেরার সময় বাসা থেকে ঘরে তৈরী বিরিয়ানী, রসমালাই বাক্সে করে নিয়ে যেত, আমি ভাবতাম, ওর নিজের জন্য নিয়ে যায়। পরে একদিন জুনায়েদ আমাকে ফোন করে যখন বলে, " মাম্মী, তোমার পাঠানো রসমালাই খেয়ে মনে হয়েছে আমি আমার মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি, বিরিয়ানী খেয়েও আমার মাম্মীর কথা মনে হয়েছে। আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই"।
সব ভুলে আমি তখনই বলে ফেললাম, " অবশ্যই বাবা, তুমি অবশ্যই আসবে"।
জুনায়েদ আসতে পারেনি, কোর্স শেষ হতেই ওকে পাকিস্তান ফিরে যেতে হয়েছিল। কিন্তু ছেলেটি আমার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ রাখতো, আমার যে কোন ছবিতে স্বরচিত কবিতার ভাষায় কমেন্ট করতো, আমাকে 'মাম্মী' সম্বোধন করলেও উত্তম কুমারকে ডঃ রয় বলে সম্বোধন করতো।
পাকিস্তানের কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকুরী পায়, এক বছরের মধ্যেই ও আন্তর্জাতিক কোন সম্মাননা পুরষ্কার পায়, সে কখনও এগুলো প্রকাশ করতোনা, তার বন্ধুরা যখন তার ওয়ালে কনগ্র্যাচুলেট করতো, তখনই জানতে পারতাম। যদি অনুযোগ করতাম, সাথে সাথে বিনয়ের সাথে বলতো, ওর এগুলো নিয়ে কথা বলতে লজ্জা লাগে।
হঠাৎ একদিন খবর পেলাম, জুনায়েদকে গ্রেফতার করা হয়েছে, গ্রেফতার করে কোথায় নেয়া হয়েছে কেউ জানেনা। এক পত্রিকার কাটিং পড়ে যেটুকু জেনেছি, ক্লাসে লেকচার দেয়ার সময় জুনায়েদ মৌলবাদের বিরুদ্ধে এমন কিছু বলেছিল যা মৌলবাদী ছাত্রছাত্রীদের পছন্দ হয়নি। ক্লাসের সবাই বোধ হয় হই চই করে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা করে ফেলেছিল। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ ছিল, জুনায়েদ নাকি প্রায়ই মৌলবাদ বিরোধী কথাবার্তা বলে, এবার আর তাকে ছাড়া হবেনা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জুনায়েদকে বহিষ্কার করে, জুনায়েদ গ্রেফতার হয়, এরপর চিরতরে হারিয়ে যায় আমার ফেসবুক থেকে।
এরপর থেকে আমি জুনায়েদকে খুঁজি, পাইনা। আমার সব ছবি লক করে দিয়েছি যেখানে আমার এই পুত্রের মায়াবী কমেন্ট ছিল। শুধুই মনে পড়ে, পাকিস্তান ফিরে গিয়ে জুনায়েদ ওর মায়ের কাছে আমার গল্প করেছিল, আমাকে ইনবক্সে কতবার মেসেজ দিয়েছিল, " মাম্মি, আমি আবার আসবো আমেরিকা, তোমার সাথে দেখা করতে হলেও আসবো"।
এখনও সব মনে পড়ে, ভীষণ গ্লানি বোধ করি, অপরাধ বোধ হয়, ছেলেটি আমার কাছে আসতে চেয়েছিল, পাকিস্তানী বলে আমি মিশাকে 'না' করে দিয়েছিলাম, মিশার আহত দুই চোখের দিকে তাকাতে পারিনি। যে রসমালাই খেয়ে ছেলেটি তৃপ্ত হয়েছিল, ভেবেছিল 'মাম্মি পাঠিয়েছে, সেই রসমালাই আসলে আমি পাঠাইনি তো, মিশা নিয়ে গেছিল। তখন মিশা আন্ডারগ্র্যাড করছে, পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়ে সেখানেই জুনায়েদকে দেখেছিল, রুমের মেঝেতে পত্রিকা বিছিয়ে বসে ভাত খাচ্ছে, টমেটো সস দিয়ে মেখে। পরিচয়ের সূচনাতেই মিশার খুব মায়া লেগেছিল, এরপর থেকে যতবার মিশা বাসায় এসেছে, কিছু খাবার প্যাকেট করে নিয়ে গিয়ে সব বন্ধুদের খাইয়েছে, জুনায়েদও খেয়েছে। কেউ মিশার এই ভালোবাসা মনে রেখেছিল কিনা জানিনা, জুনায়েদ মনে রেখেছে।
জুনায়েদ কি বেঁচে আছে? মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কাউকে বাঁচিয়ে রাখে? জুনায়েদের ফেবু অ্যাকাউন্ট তখনই ডিঅ্যাক্টিভেটেড হয়ে গেছে। আমি পারিনি ওর নাম আমার লিস্ট থেকে মুছে দিতে, কোনদিন পারবোও না। আমার একবার মনে হয়, জুনায়েদ বেঁচে আছে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে, আরেকবার মনে হয় নেই। একজন প্রতিভাবান যুবক, প্রতিভাবান কবি, প্রতিভাবান নাট্যকার হারিয়ে গেছে কোথায়! জুনায়েদরা আসলে হারিয়েই যায়, বাংলাদেশে থাকলেও হারিয়েই যেতে হতো। হায়! জুনায়েদ, আজ তোমাকে খুব বেশী মনে পড়ছে!

মঙ্গলময় দিনে কোন এক মঙ্গলের অপেক্ষায়!

আজ শনিবার, ৩১ শে মে, আমাদের ২৯তম "এনগেজমেন্ট বার্ষিকী", সৌভাগ্যক্রমে আজ আমার ছুটির দিন। আরও দশজন পুরুষের ন্যায় আমার স্বামীও আজকের দিনটির কথা মনে রাখেননি। অথচ সকাল থেকেই গ্রিল মেশিন নিয়ে খুটখাট শুরু করে দিয়েছিলেন। ব্যথানাশক এবং নিদ্রাসুখ প্যারাসিটামল খেয়ে ঘুম দিয়েছিলাম বলে বেশ দেরী করেই ঘুম ভেঙ্গেছে আমার। ঘুম ভাঙ্গার পর কনিষ্ঠ দূত মিথীলা সংবাদ দিল, আজ তার পাপা আমাদের জন্য লাঞ্চ তৈরী করবে। দূত মারফত সংবাদ পেয়ে আমি খুশীতে বিগলিত। অপেক্ষায় আছি, কখন খাওয়ার ডাক আসে।

বেলা সাড়ে বারোটায় 'বান্দরের খাঁচা' থেকে উত্তম ডাক পাঠালেন। পৌঁছে দেখি, এলাহী আয়োজন। এবার আর চিকেন গ্রিল নয়, চিকেন বার্গার বানানো হয়েছে, সাথে চিংড়ি, নানা রকমের সব্জী, পেঁয়াজ গ্রিল করে সাজানো, আস্ত আস্ত ভুট্টা গ্রিল করেছে, শসা কেটেছে, পাঁচ মিশেলী বাদাম, এবং টোস্টেড ব্রেড, সাথে পানীয় হিসেবে কোক। পাপাকে সব কাজে সহায়তা করেছে তার কন্যা গুড্ডু।

খেতে বসেছি তিনজন, মিথীলা বলল, " এই প্রথম পাপা শুধু আমাদের ফ্যামিলির জন্য সবকিছু গ্রিল করলো"। আমার কিন্তু খেয়ালে আসেনি বিষয়টা, মিথীলা সবকিছু খুব সূক্ষ্মভাবে নোটিশ করে। আজ কেন জানি আমার ভীষণ ক্ষিদেও পেয়েছিল, উত্তমের অনুমতি নিয়ে সবার আগে আমি খেতে শুরু করেছি। তিনজনেই খাচ্ছি, একসময় আমি উত্তমকে বললাম,

" আজকের দিনে আমাদের এনগেজমেন্ট হয়েছিল, শুভ একটি দিন, এইদিনেই কাকতালীয়ভাবে তুমি আমাকে যত্ন করে খাওয়াচ্ছো, আমি খুবই খুশী হয়েছি যে ২৯ বছর পেরিয়ে গিয়ে তুমি দিনটির কথা স্মরণ করেছো। আমার মনটা ভালো নেই, তবুও তোমার কাছ থেকে এমন আপ্যায়ন পেয়ে আনন্দিত নাহয়ে পারছিনা।"

উত্তম বলে ফেললো, " আমার তো মনে ছিলনা, গতরাতে গুড্ডু আমাকে বলেছে, আজকের দিনের কথা"।

আমার উত্তম এমনই মানুষ, কোন ছল-চাতুরীর মধ্যে নেই, আমার খুশী ধরে রাখতে ইচ্ছে করলে সে বলতে পারতো, " ওমা, দিনটা আমাদের দুজনের, দুজনেরই মনে থাকার কথা, আজ তোমার ছুটি, তাই এই সামান্য আয়োজন করেছি"।

কিন্তু উত্তম ভুলেও তা বলবেনা, এমন সরাসরি উত্তর শুনে আমি যে দুঃখ পেতে পারি, এটাও সে বুঝেনা, এমনই শুদ্ধমনের মানুষ সে। আমিও তাই এখন আর এসব ক্ষুদ্র বিষয়ে দুঃখ পাইনা, বরং এমন শুদ্ধসত্য মানুষের পাশে থাকার সুযোগ পেয়েছি, এতেই খুশী। খাওয়া-দাওয়ার মাঝে এবং শেষে আয়োজককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার পাশ্চাত্য রীতি বরাবর মেনে চলি। রীতি অনুযায়ী আমার মুখোমুখি বসা শুদ্ধতম মানুষটিকে বললাম,

" আজকের দিনে তোমার কাছে একটা ছোট্ট অনুরোধ আছে, আমার চোখে দেখা শুদ্ধতম মানুষের মধ্যে তুমি অন্যতম। তুমি কি তোমার অন্তরের সমস্ত শুদ্ধতাকে জড়ো করে জুনায়েদের জন্য প্রার্থনা করবে?"

আমার এমন অপ্রাসঙ্গিক অনুরোধে উত্তম কুমার এতটুকুও চমকায়নি, ২৯ বছরে সে আমাকে চিনে ফেলেছে। ***আমার মধ্যে অনেক ক্ষুদ্রতা আছে, কখনও কখনও ব্যবহারে নীচতাও প্রকাশ পায়, আমার মধ্যে ঈর্ষা আছে, ক্রোধ আছে, জেদ আছে, একগুঁয়েমী আছে, এতগুলো দোষের মাঝখানে যে দয়ার সমুদ্র আছে, খুব কাছাকাছি থাকার কারণেই সেই দয়ার সমুদ্রের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উত্তমের কাছে পৌঁছে যায়।***
গত তিন দিন ধরে না-দেখা একটি ছেলের জন্য কান্নাকাটি করে চলেছি, ভাল-মন্দ না-বুঝেই ফেসবুকে এর কাছে, তার কাছে, সবার কাছে Raise your voice অনুরোধ করেই চলেছি। বেশীর ভাগ বন্ধু আমার এই ব্যাপারটিকে 'পাগলামী' হিসেবে নিয়েছে, কেউ নিয়েছে আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুযোগ হিসেবে, কেউ কেউ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছে, কেউ নিয়েছে রাজনৈতিকভাবে, আর কেউ কেউ মনে করেছে, আমি তেঁতুল কচলে তেতো বানাচ্ছি, নিজের সম্মান ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছি। একটা বিষয় ভেবে খুব অবাক হচ্ছি,

***আওয়ামীলীগের প্রাক্তন এমপি, বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার নিয়মিত লেখক **একজন কাদের মোল্লার** প্রশস্তি গেয়ে লিখেন, একজন ***দেলোয়ার হোসেন সাইদীর*** জন্য বিশাল প্রশস্তিসূচক লেখা লিখেন এবং হাজার হাজার পাঠক সেই লেখা মুহূর্তের মধ্যে শেয়ার করে, 'লাইক' করে, অথচ একজন নিরপরাধ, প্রতিভাবান, মেধাবী আলোকিত তরুণ অধ্যাপকের মুক্তির জন্য পোস্ট করা আবেদনে 'লাইক' করেনা, উলটো এহেন আবেদনকে নিছক প্যানপ্যানানি বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়****

উত্তম এসবের কিছুই জানেনা, আমি বাইরের সংবাদ উত্তমকে দেইনা। তারপরেও সমুদ্রের ছলাৎ ছলাৎ তো সে শুনতেই পায়। সে এটাও জানে, যখন কোথাও থেকে কোন দিশা পাইনা, আশা পাইনা, শেষমেশ আমি উত্তমের শরণাপন্ন হই। উত্তম যা বলে, সেটাই শেষ উত্তর হিসেবে গ্রহণ করি। আমার অনুরোধটুকু শুনে মাথা হ্যাঁ বোধক দুলিয়ে জানালো, সে অবশ্যই প্রার্থনা করবে অন্ধকার কুঠুরীতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকা আরেকজন শুদ্ধ মানুষের জন্য। উত্তমের সম্মতি পাওয়ার পর আমার মনের মেঘ কেটে যেতে শুরু করেছে, দয়ার সমুদ্রের ছলাৎ ছলাৎ শব্দও ক্ষীণ হয়ে আসছে, সমুদ্র শান্ত হচ্ছে কোন এক মঙ্গলের অপেক্ষায়, কোন এক মঙ্গলের আশায়।

Saturday, November 23, 2013

সুখ এবং সুখী!!



আজ আমার বড়ই সুখের দিন, কারণ আগামী দুইদিন আমার ছুটি। এমন সুখের দিন প্রতিমাসের চতুর্থ সপ্তাহে আসে। আগে এমন ছিলনা, গত দুমাস হলো, স্বার্থ কিছু ছাড় দিয়ে এই সুখ কিনেছি।
ওয়ালমার্টে ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার বাদে আর কারোরই উইকএন্ড ছুটি থাকেনা। সপ্তাহে দুই দিন ছুটি থাকে, তবে সেই দুই দিন সপ্তাহের যে কোন দুই দিন হতে পারে। আমি এইসব নিয়মের গভীরে যাইনা, যা নিয়ম আছে, সেভাবেই মেনে চলি। চাকরীর শুরুতেই জেনেছি, প্রতি শনি বা রবিবার যদি আমি অফ থাকতে চাই, অফ থাকতে পারবো, বিনিময়ে আমার ফুল টাইম আওয়ার কমে যাবে। ফুল টাইম আওয়ার কমে গেলে এক সময় আমি পার্টটাইম স্ট্যাটাসে চলে যাব। পার্ট টাইম এসোসিয়েটদের সুযোগ সুবিধা অনেক কম, ফুল টাইমারদের হেলথ ইনসিওরেন্স থেকে শুরু করে বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। আমার তিন মেয়েকে আমি আমার হেলথ ইন্সিওরেন্স পলিসির মধ্যে রেখেছিলাম (ডাক্তার হওয়ার পর মৌটুসীর নিজের আলাদা ইন্সিওরেন্স হয়ে গেছে), তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ফুলটাইম স্ট্যাটাস মেইনটেইন করে চলেছি।

আমি খুবই পরিবারবৎসল মানুষ। ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা, ভাই, আত্মীয় স্বজন নিয়ে থাকতে ভালোবাসি। আমার বাবা-মা দুজনেই ছিলেন চাকুরীজীবি। প্রতিদিন সকালেই আমরা দলছুট হয়ে যার যার কাজে বেরিয়ে যেতাম, সন্ধ্যায় আবার সবাই একত্র হতাম। স্কুলে পড়ার সময় খারাপ লাগতোনা, মায়ের সাথেই স্কুলে যেতাম, মায়ের সাথেই একই সময়ে ফিরতাম। যেদিন আগে ফিরতাম, রান্নাঘরে ঢুকে দেখতাম, আমার ভাগের ডাল, তরকারী ঢাকা দেয়া আছে, সকালের রান্না করা ভাত ঠান্ডা হয়ে থাকতো, সেই ঠান্ডা ভাতই নিজেকে নিয়ে খেতে হতো। আমার কি খারাপ লাগতো? মাঝে মাঝে খারাপ লাগতো, মনে হতো, ইস! সবার মা ভাত মেখে খাওয়ায়ে দেয়, নাহলে ভাত বেড়ে খেতে দেয়, আমাকে নিজে নিয়ে খেতে হয়। মাঝে মাঝে খারাপ লাগা কেটে যেত যদি খাবারের মেন্যু ভাল থাকতো। আমাদের খাবারের মেন্যুতে কমন দুটি আইটেম ছিল, মুসুরের ডাল, কেচকী মাছ। দুটি আইটেমই আমার দুই চক্ষের বিষ ছিল, কিন্তু মাপা আয়ের সংসারে মায়ের কিছু করার ছিলনা। পাঁচ টাকায় বাজার হতো, চার আনা ভাগার কেচকি মাছ, পাঁচ ভাগা বা ছয় ভাগা আনা হতো। বেগুণ, আলু, ঝিঙ্গে কুচি দিয়ে রান্না করলে এতগুলো হতো। অবশ্য সব দিনই খারাপ যেত না, যেদিন ডাটা দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল রান্না হতো, সাথে ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে পাঁচ মিশালী তরকারী, সেদিন বরফ ঠান্ডা ভাতও দুই মুঠো বেশী খেয়ে ফেলতাম। খেতাম আর মনে হতো, আহ! কি স্বাদ! এই মুহূর্তে আমার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই।
সবাই বলে, যার যার মায়ের হাতের রান্না নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রান্না, আমি কখনও তা বলিনি। আমার মায়ের হাতের সব রান্নাই পৃথিবী শ্রেষ্ঠ ছিলনা, কিন্তু ইলিশ মাছের ঝোল, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে সব্জী, অথবা চ্যাঁপা শুঁটকী ভর্তা, ডাটা, কুমড়ো, ঝিঙ্গে, আলু, বেগুণ, কাঁঠালবীচি দিয়ে চ্যাঁপা শুটকীর তরকারী, কুচো চিংড়ি আর বেগুণ, ঝিঙ্গে দিয়ে ঝাল ঝাল মাখা মাখা রান্না করতো, এই আইটেমগুলো শুধু পৃথিবী শ্রেষ্ঠ বললে ভুল হবে, জগৎ শ্রেষ্ঠ বললেও কম বলা হবে, এই সাধারণ আইটেম রেঁধে মা স্বর্গের রাঁধুণীকেও হার মানাতে পারতো। আমাদের পারিবারিক সুখের দিন ছিল সপ্তাহের রবিবার। সবার ছুটি, বাবা বাজারে যেতো, বাবার নজর খুব ভাল, মাছ খুব ভাল চিনতো, সব্জীও খুব ভাল কিনতো, ইয়া বড় বড় চিংড়ির মাথা কিনে আনতো, বড় মাছ আনতো, সেই মাছের তেলের বড়া আর চিংড়ির মাথা ভাজা, আহাহা! কি সুখের সময় ছিল, আমরা চার ভাই বোন আর বাবা-মা একসাথে মেঝেতে গোল হয়ে খেতে বসতাম। রবিবারের সুখ ছিল একেবারেই অন্যরকম।

খারাপ লাগা শুরু হয়েছে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে। দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে ফাঁকা ঘরে খুব খারাপ লাগতো, খেতে ইচ্ছে করতোনা। বিকেল চারটা বাজলেই মন অপেক্ষা করতো কখন গেট নড়ার আওয়াজ পাব, মা চলে আসলেই পরিবেশ পালটে যেত। এমন নয় যে মা সব সময় খুব সোনা মুখ করে কথা বলতো, কিন্তু মা, বাবা, ভাইয়েরা সবাই ঘরে থাকলেই আমার অন্যরকম ভালো লাগতো। রাতের বেলা সবাই গোল হয়ে বসে রুটি (আমার দুই চক্ষের বিষ)আর তরকারী খেতাম, খারাপ লাগতোনা, কেমন যেনো সুখী সুখী মনে হতো।

ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে পরিবারের জন্য অন্যরকম টান বোধ করতাম। দূরে চলে গেছি বলে মা তার শাসনের মাত্রাও কমিয়ে দিয়েছিল, বরং আমার উপর নির্ভরতা বেড়েছিল। এরশাদ ভ্যাকেশনে বাড়ী এলে সেশান পিছিয়ে যাচ্ছে ভেবে বাবার মাথা গরম হয়ে যেতো, কিন্তু মা খুশী হতো। আমার উপর রান্নার দায়িত্ব দিয়ে মা ধীরে সুস্থে স্কুলে যেতে পারতো। এরশাদ ভ্যাকেশানে আমিও খুশী হতাম, অনেকদিন পর আমরা বাবা-মা, চার ভাইবোন একসাথে হতাম, কি সুখ, কি আনন্দ। আমাদের পাশের ঘরেই থাকতো আমার দাদু দিদিমা, মামা-মাসী। চলতো আমাদের তুমুল আড্ডা। মনে মনে চাইতাম, এরশাদ ভ্যাকেশান যেন অনন্তকাল ধরেই চলে।

বিয়ের পর মাস্টার্স কমপ্লীট করা পর্যন্ত আমার শুক্র-শনি বলতে কিছু ছিলনা। যখন স্বামী-কন্যা নিয়ে সত্যিকারের সংসার শুরু হলো, তখন থেকে আবার নতুন করে ছুটির দিনের সুখ শুরু হলো। আমার উত্তম কুমার দাম্পত্য জীবনের প্রথম পাঁচ বছর এনজিও গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালে চাকুরী করেছেন, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়, উত্তম কুমারের তত্বাবধানে দেশীয় কোম্পাণীতেই ওষুধের কাঁচামাল প্রস্তুত করা শুরু হয়, সেই প্ল্যান্ট তৈরী করার সময়, দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তাকে প্ল্যান্টে থাকতে হতো। শুক্রবারের দুপুরেও তাকে প্ল্যান্টে যেতে হতো। আমার সপ্তাহান্তের সুখ এসেও ফুড়ুৎ করে উড়ে যেত। উত্তমের একটি ব্যাপার খুবই ভাল ছিল, কাজের পরে এক মুহূর্তও সে বাড়ীর বাইরে থাকতোনা। সে জীবনের অনেকটা সময় একা একা কাটিয়েছে বলেই সংসারের নিরবচ্ছিন্ন সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাইতোনা।

পরবর্তী পাঁচ বছর সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে অধ্যাপনা করেছে, ফার্মেসী বিভাগও তখন সবেমাত্র খুলেছে। আমরা ততদিনে ঢাকা চলে এসেছি, উত্তম কুমার ঢাকা টু জাবি যাওয়া আসা করতো। এটা ছিল বড়ই সুখের সময়, টাকাপয়সা ছিলনা, কিন্তু সংসারে সুখ ছিল। উত্তম প্রতিদিন সকালে বের হয়তো, দুপুরে বাড়ী চলে আসতো। উত্তম বাড়ী ফিরলে আমরা একসাথে খেতে বসতাম। আমি চাকুরী করতামনা, মৌটুসী আর মিশাকে নিয়ে থাকতাম, টুকী টুকী করে কত রকমের তরকারী রান্না করতাম, একটা কচু কিনলে, কচু থেকেই চার রকমের তরকারী রেঁধে ফেলতাম। আমি যাই রাঁধতাম, উত্তম তা খুব তৃপ্তি নিয়ে খেত। আমাদের সংসারটা ছিল, অনেকটা গরীব কিষাণের সংসারের মত, সচ্ছলতা নেই, সুখ আছে। প্রায় শুক্রবারেই কারো না কারো বাসায় বেড়াতে যেতাম। উত্তম হয়তো যেতে চাইতোনা, বৃহস্পতিবার এলেই আমার বায়না শুরু হয়ে যেত। সপ্তাহের ছয় দিন ঘরে থেকেছি, কাজেই শুক্রবার ঘরে থাকবোনা।

আমাদের বাড়ীতে মানুষজন বেড়াতে আসতে ভালোবাসতো। আমরা দুজনেই অতিথিপরায়ণ, আমার মেয়েরাও হয়েছে আমাদের মত, সব সময় লোকজন ভালোবাসে। উত্তমের ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের বাসায় আসতো, বিশেষ করে অমিয়, আলী, পিযূষ, খোরশেদ। অমিয়, আলী, পিযূষ থিসিসের কাজ নিয়ে যে কোন সময়ই আসতো, রাত দশতা এগারোটা বেজে যেত ওদের কাজ শেষ হতে। আমার ঘরে ওদের ভাত লেখা থাকতো, ওরাও জানতো, স্যারের বাসায় গেলে বৌদি ভাত খাইয়ে দিবে। তেমন কিছুই থাকতোনা, হয়তো ডাল চচ্চড়ী করতাম, আলু ভাজতাম, নাহয় ঝাল করে আলুর ভর্তা, দুই এক পদের সব্জী, মাছের ঝোল। ওরা কত আগ্রহ করে খেতো, এই দৃশ্য দেখার মধ্যে কি যে সুখ ছিল! নিজকে ভীষণ সুখী মনে হতো। সেদিনের সেই ছেলেমেয়েগুলো আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এখনও তাদের স্যারকে মনে রেখেছে, মাঝে মাঝেই ফোন করে।

অস্ট্রেলিয়া তিন বছর থেকে আবার বাংলাদেশে ফিরেছি। চার বছর উত্তম কুমার দেশের নামকরা ওষুধ কোম্পাণীতে বড় পোস্টে চাকুরী করেছে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, অর্থে, ধনে, জনে, মানে সবদিক দিয়েই সুখ উপচে উপচে পড়তো। তবে কাজের চাপে উত্তমের তখন সপ্তাহের ছয় দিন জান বেরিয়ে যেত। শুক্রবার সে বাড়ীতে থাকতো। আমি সপ্তাহের ছয় দিন গাড়ী নিয়ে টো টো করে বেড়াতাম, কাজেই শুক্রবারে না বেড়ালেও চলতো। শুক্রবারের সকালে ঘুম থেকে দেরী করে উঠতাম, বুয়া চা বানিয়ে আমাকে ডাকতো। গরম চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে দিন শুরু করতাম।

দুই বছর আমি শিক্ষকতা করেছি। সেই সময় বুয়া রান্না করতো। আমার যেদিন মর্জি হয়তো, আমি রান্না করতাম। বুয়া চাইতো শুক্রবারের দিনে দাদা যেহেতু বাড়ীতে থাকে, তাই আমিই যেন রান্না করি। আমিও চাইতাম তা করতে, কিন্তু করা হতোনা। তিন মেয়ে নিয়ে আমি উত্তমের চারপাশে ঘুর ঘুর করতাম। তিন মেয়েকে ঘিরে ছিল তার জীবন। মেয়ে তিনটি এইজন্যই বাবার ন্যাওটা হয়েছে। কারোরই ক্ষিদে পেতোনা, গায়ে গায়ে লেপটে বসে থাকতাম, টিভি দেখতাম, ছোট্ট মিথীলা ওয়াকারে চড়ে ঘুরতো আমাদের সামনে দিয়ে। এক সময় হয়তো বুয়াকে ডেকে বলতাম, বুয়া তুমিই রান্না করে ফেলো। আমি আজকে রান্না করবোনা। বুয়া জানতো, এমনটিই হবে। দুপুর বা সন্ধ্যার দিকে উত্তম যখন কম্পিউটার টেবিলে বসে কাজ করতো, আমি তার চেয়ারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতাম। উত্তমের সেই ধ্যানমগ্ন, মনোযোগী চেহারাটি দেখতে এত ভাল লাগতো, মনে হতো, এই জ্ঞাণী, বিদ্বান পুরুষটি আমার স্বামী,(স্ব+আমি),আমার যাবতীয় আবদার, আহ্লাদ, অভিযোগ, দাবী সবই তার কাছে করতে পারি, আমার চেয়ে সুখী আর কে আছে!


আর যদি আমাদের বাসায় তখন আমার মা, ছোট মাসী থাকতো, তখন তো আর লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে উত্তমের কাছে গিয়ে বসে থাকতে পারতামনা, আমাকে রান্নাঘরে যেতেই হতো। নাহলে স্বামীকে রান্না করে খাওয়াইনা অভিযোগে মায়ের ক্যাটক্যাটানি শুনতে হতো। কাজেই রান্নাঘরে মাসী-বোনঝি মিলে রান্না করতাম, রান্না অবশ্য আমিই করতাম কারণ আমার ছোট মাসী সকল অসাধ্য সাধন করার ক্ষমতা রাখলেও রান্নার মত সহজ কাজটি খুব সহজে করতে পারেনা। রান্না করার সময় মা চেয়ার টেনে বসে নিজের জীবনের রকমারী গল্প শুনিয়ে যেত। ফাঁকে ফাঁকে বুয়া চা বানাতো, আমাদের সবাইকে চা খাওয়াতো। মিথীলার পাপা তখন মিথীলার কান্ড কারখানা দেখতো, আমাদের আসরে এসে শুনিয়ে যেত গুড্ডু (মিথীলা) কি মজার কান্ড করেছে। তেমন দিনে কুটু(মিশা)কে ডাকতো তার মাথা চুলকে দেয়ার জন্য! কোন কোন উইকএন্ডে মেজদাও এসে যোগ দিত। সে এক উৎসব লেগে থাকতো।কখনও কখনও আমরা দল বেঁধে বেড়াতে যেতাম। সারা বাড়ী হই হুল্লোড়ে মেতে থাকতো। কি যে সুখ ছিল, প্রথম জীবনের সুখে টাকার ছোঁয়া ছিলনা, শুধুই নিজেদের মধ্যে শান্তি এবং সুখ ছিল, আমেরিকা আসার আগের চার বছরের সুখে টাকারও ছোঁয়া ছিল, তাই সুখগুলোকে অনেকের মধ্যে ভাগ করে দিতে পেরেছিলাম।


আমেরিকা চলে এসেছি, সুখের কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। শুধু স্বামী-স্ত্রী, তিন কন্যাতে আর কতটুকু সুখী হওয়া যায়, তারপরেও উইকএন্ডগুলো ভালোভাবেই কাটিয়েছি। দুই বছর পর মৌটুসী ভার্জিনিয়া কলেজে চলে গেলো, আমরা মিসিসিপি চলে এলাম, ভেঙ্গে গেলো পাঁচজনের নিরবচ্ছিন্ন সুখের সংসার। নিজেও ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম নার্সিং পড়ার জন্য, বরের টাকায় পড়তে সংকোচ হচ্ছিল বলে নার্সিং পড়তে পড়তেই ওয়ালমার্টে চাকুরী নিলাম। ভাল রেজাল্ট করবো বলে উইকএন্ডেও প্রচুর পড়াশোনা করতাম, রেজাল্ট হতো সব সাবজেক্টে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমী ল্যাবের দরজায় ডঃ বিল পার্কার একখানি নামতালিকা টাঙিয়ে রেখেছেন, কে কোন বছর অ্যানাটমীতে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছে। আমার নামের পাশে সবচেয়ে বেশী স্কোর ৯৮% লেখা আছে। এগুলো করতে গিয়ে সুখ কিছুদিনের জন্য নির্বাসিত হলো। শেষ পর্যন্ত দুই সেমেস্টার বাকী থাকতে প্রফেসরের উপর রাগ করে নার্সিং পড়া ছেড়ে দিলাম। আসলে, তখন তো আমার মনে সুখ ছিলনা, টাকার ছোঁয়া না থাকা সুখ, অথবা টাকার ছোঁয়া থাকা সুখ, কোনটাই ছিলনা, তাই পড়া ছেড়ে দিতে সময় লাগেনি।

ওয়ালমার্টেই ফুলটাইম চাকুরী শুরু করলাম। আমেরিকায় প্রথম চাকুরী, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা কারো কাছেই প্রকাশ করিনা। আমার স্বভাবে সব ব্যাপারেই দ্বিমুখী নীতি কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই আমার ফেরীওয়ালীর জীবন খুব ইন্টারেস্টিং মনে হতো, মাথায় টুকরী নিয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়ায়, কত কিছু দেখে, কত মানুষের সাথে পরিচয় হয়, আমারও ইচ্ছে করতো মাথায় টুকরী নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। লেখাপড়ায় মোটামুটি মেধাবী ছিলাম বলে ইচ্ছের বিরুদ্ধেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার স্বপ্ন দেখতাম। যখন আড়ং; চালু হলো, আড়ং এর সেলস গার্লদের দেখলে নিজেকে তুচ্ছ মনে হতো, মনে হতো, ইস! আমি যদি সেলস গার্লের চাকরী করতে পারতাম। কি সুন্দর করে কথা বলে বলে জিনিস বিক্রী করতাম। আবার ভাবতাম, এত ডিগ্রী নিয়ে সেলসগার্লের চাকুরী করবো? আমি যখন এগুলো ভাবি, ঈশ্বর তখন হাসেন। মাঝ বয়সে এসে পূর্ণ হলো কৈশোরের স্বপ্ন। আমি ওয়ালমার্টে সেলস এসোসিয়েটের কাজ করি, সুখী হওয়ারই কথা। সুখী হই, মাঝে মাঝে দ্বিমুখী মন আমাকে খোঁচা দেয়, কেমিস্ট্রি তে অনার্স, মাস্টার্স, বিএড, নার্সিং(স্থগিত) বিদ্যা নিয়ে রীটা রয় ফোন বিক্রী করে। তখনই মনে হয়, অনেক হয়েছে, আর করবোনা চাকরী।

আমার সেই হারাণো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, বুকের ভেতর কান্নাগুলো ছলকে ছলকে উঠে। কাজে যাই মুখ ব্যাদান করে, বাসায় ফিরি মুখ ব্যাদান করে। আমার ছোট্ট মিথীলা একেবারে একা একা বড় হচ্ছে। আগে তো বাসার পরিবেশ আমি প্রাণবন্ত করে রাখতাম, পাশে ছিল মৌটুসী, মিশা। এখন তো শুধুই উত্তম কুমার, মিথীলা আর আমি। উত্তম কুমার তার লেখাপড়ার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, যে কাজ করতে দশ মিনিট লাগার কথা, সেই কাজ মিথীলা নিজের ঘরে সারা দিনমান লাগিয়ে করে, ক্ষিদে পায় কিনা জানিনা, আমার বাড়ী ফেরার অপেক্ষায় থাকে। আমি ফিরলে আমার সাথে বসে খায়। এ কোন জীবন হলো? প্রায়ই হুমকী ধমকী দেই, ছেড়ে দিব এই চাকরী। কিন্তু হুমকী ধমকী কাকে দেবো? কেউ তো আমাকে বলেনি চাকুরী করতে! আমার হুমকী ধমকী শুনে তিতি বিরক্ত হয়ে উত্তম বলে, ভাল না লাগলে ছেড়ে দাও চাকরী, চাকরী করতেই হবে এমন তো কোন কথা নেই

হঠাৎ মনে হলো, আওয়ার কাটা যায় যাক, পার্ট টাইম হয়ে যাই যাক, আমি সপ্তাহের প্রতি শনিবার পারমানেন্ট অফ ডে করে নেবো। যা ভাবা, সেই কাজ। গত দুই মাস আগেই আমি ম্যানেজারকে দিয়ে শনিবারের ছুটি অ্যাপ্রুভ করিয়েছি। অনেক আগে আমি মাসের চতুর্থ রবিবার অফ রেখেছিলাম। শনিবার অফ হওয়াতে ভেবেছিলাম, আগের রবিবারের ছুটি বোধ হয় বাতিল হয়ে যাবে। দেখলাম, পার্সোনেল ম্যানেজারের চোখে পড়েনি অথবা সে ব্যাপারটি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এখন প্রতি শনিবার এবং মাসের চতুর্থ রবিবার আমার ছুটি থাকে।

মিথীলা খুব ঠান্ডা সুস্থির মেয়ে, আমি বাসায় থাকলে ও খুব হই হই করেনা, আবার শুক্রবার আসলেই জিজ্ঞেস করতে ভুলেনা, মা, তোমার কালকে ছুটি? যখন বলি, হ্যাঁ ছুটি, তাহলে ও বলবে, কাল তাহলে কোথাও যাচ্ছি, নাকি কেউ আসবে আমাদের বাসায়? আমার এত ভালো লাগে! এতো আমারই মেয়ে, আমার স্বভাব পেয়েছে। মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করে, মিআ (মিশা)কবে আসবে? মিশা এলে মিথীলার আনন্দ আর ধরেনা। মিশার খিদমত করে খুব আনন্দ পায়। মৌটুসী আসেনা কতদিন, গত বছর ক্রীসমাসে এসেছিল, এই বছর ক্রীসমাসে আসবে। মৌটুসী এলে মিথীলার আদর বেড়ে যায়। আমার সংসার আবার আগের মতো কলবলিয়ে উঠে। বুঝি, এ সবই সাময়িক। উৎসব শেষে সব পাখী নীড়ে ফিরে যায়।

আমি কাল বেলা বারোটায় ঘুম থেকে উঠবো। আমার আগেই উত্তম কুমার উঠে যাবে, চা বানাবে, নিজের চা খাবে, আমার চায়ের কাপ ঢেকে রাখবে। ঘুম ভেঙ্গে মিথীলা, মনা, বাবলুসোনা, যাও তো আমার চা গরম করে নিয়ে এসো বলে আড়মোড়া ভাঙ্গবো। মিথীলা চা নিয়ে আসবে, সাথে বিস্কুট। আমি বলবো, বিস্কুট খাবোনা। মিথীলা বলবে, খালি পেটে চা খাবে কেন? প্রাণটা জুড়িয়ে যাবে। মা কোথাও নেই, আবার মা যেন সর্বত্রই আছেন। আসলে কাল আমার ঘুম ভেঙ্গে যাবে সকাল ছয়টায়, অন্যদিন তো ঘুম ভেঙ্গে গেলে আবার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। কাল যেহেতু ছুটি, তাই চোখ বন্ধ হবেনা, সাতটার মধ্যে বিছানা ছেড়ে ঘর-দোর পরিষ্কার করে কম্পিউটারে বসে যাব। দেশপ্রেম টপিকের উপর একটি গল্প লিখে শেষ করবো।

আজ ব্রেড কিনে এনেছি, সাথে মকা ব্রেড স্প্রেড এবং এপ্রিকট জেলী এনেছি। ছোটবেলায় জানতাম, বড়লোকেরা পাউরুটিতে মাখন মেখে চিনি ছড়িয়ে খায়। একেবারে স্বপ্নের খাবার মনে হতো। আমরা পাঁউরুটি পেতাম জ্বর হলে পরে। জ্বরমুখে সেই পাঁউরুটি বিস্বাদ লাগতো। যখন স্বপ্নের পাঁউরুটি আর মাখন বাস্তবে ধরা দিল, তখন স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গেছি, বাটার খাইনা। হঠাৎ করেই আজ বেপোরোয়া হয়ে গেলাম, এইসব চকোলেট স্প্রেড অনেক কাল খাইনা, কাল খাবো। গল্প লিখবো আর মিথীলাকে বলবো, মিথ, শোনো, কিচেনে গিয়ে দেখো, পাপা চা করে রেখেছে, চা গরম করে, সাথে দুই পিস ব্রেড মকা স্প্রেড দিয়ে মেখে আনো

দুপুরে কিছু একটা বানিয়ে খেয়ে নেবো। রাতে বন্ধুর বাড়ীতে আমাদের নেমন্তন্ন আছে। উত্তম বলেছে, কিছু একটা খাবার বানিয়ে নিয়ে যেতে। ভাবলাম, এগ ডেভিল বানিয়ে নিয়ে যাব। সে বানাতে আর কতক্ষণইবা লাগবে। নেমন্তন্ন খেয়ে বাড়ীতে যখনই ফিরিনা কেন, তাড়া তো কিছু নেই। পরের দিনও আমার ছুটি। বেলা বারোটায় ঘুম থেকে উঠবো, হাতের কাছেই পাব গরম চায়ের পেয়ালা। আহারে! সুখ কি কোন অচিন পাখী? সুখী হতে এর চেয়ে বেশী আর লাগে কি?

Monday, November 18, 2013

এদিন নতুন মা’ হলাম!





Rita Roy Mithu's photo.
Rita Roy Mithu's photo.
Rita Roy Mithu's photo.





সেদিনের কথা, তখন অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি, জানতে পারলাম আমাদের সংসারে নতুন অতিথি আসছে। নতুন অতিথি আসছে, এতো ভারী খুশীর সংবাদ, কিন্তু তখন আমি এমনই ক্যাবলা ছিলাম যে মা হতে চলেছি কথাটা বলার মধ্যে গর্বের চেয়েও লজ্জা বা সংকোচ পেতাম বেশী, তাই মুখ ফুটে কাউকেই কখনওই বলতে পারিনি মেয়ে থেকে পূর্ণাঙ্গ নারী হয়ে উঠার গৌরবকথা।
লেখাপড়াতে আগেও আমার মনোযোগ ছিলনা, সন্তান আগমনের সংবাদে অনার্স পরীক্ষা দেয়ার কথাও ভুলে গেলাম। পাশে পেয়েছি মহামানব উত্তম কুমারকে, যদি বলি পড়বোনা, সে বলে, ওকে, পড়োনা। পড়ালেখাটাই তো আর জীবনের শেষ কথা হতে পারেনা। যদি বলি, পড়বো, তাহলে বলবে, অবশ্যই পড়বে, একমাত্র লেখাপড়ার মাধ্যমেই মানুষ জীবনকে উপলব্ধি করতে পারে

আমার অবস্থা হয়েছে এমন যে অনার্সের ক্লাস ফাঁকীও দিতে পারিনা, আবার প্রতি পদে পদে আহ্লাদ আর ঢং করা বাদ দিতে পারিনা। মজার কথা হচ্ছে, একই সময়ে আমার ছোট মাসীও প্রথম মা হতে চলেছে। মাসীর শ্বশুরবাড়ী সুনামগঞ্জে, আমার স্বামীর বাসা সাভারের গণস্বাস্থ্যে। মাসী তো দিদিমার ছোট মেয়ে, শুরু থেকেই দিদিমা উনার মেয়েকে নারায়ণগঞ্জে এনে রেখে দিয়েছে। ওদিকে আমি তো ছটফট করি, সব আদর আর আহ্লাদ মাসী একা পাচ্ছে, আর আমি গণস্বাস্থ্যের বাসায় বসে কেমিস্ট্রির রিঅ্যাকশান মুখস্থ করে যাচ্ছি। দিদিমার কাছে যেমন উনার ছোট মেয়ে, আমার মায়ের কাছেও তো আমি একটা মাত্র মেয়ে। আমাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে বাবা যতটা কঠোর ছিলেন, মা ছিলেন ততটাই উদাসীন। কাজেই মা আমাকে নারায়ণগঞ্জে আসতে বললেন। তখন উত্তম কুমার ছিল খুবই ভাল মানুষ, এখনকার মত অত লায়েক হয়ে উঠেনি। আমি যা চাই, তাতেই হ্যাঁ, আমি চেয়েছি মায়ের কাছে যেতে, উত্তম কুমার সাথে সাথে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। উত্তমকে একা ফেলে রেখে, অনার্স ক্লাস বাদ রেখে আমি মায়ের কাছে চলে এলাম।

ছোট মাসী আবার হাত গুণতে জানে, বিয়ের আগেই আমার হাত গুণে বলে দিয়েছে, আমার প্রথম সন্তান ছেলে হবে। এদিকে উত্তম তো আবার রাম না জন্মাতেই রামায়ণ রচনা করে ফেলেছেন। বিয়ের আগে কবে কোথায় কোন এক বাচ্চা মেয়েকে দেখেছে, খুবই টুকটুকী ধরণের, সেই বাচ্চার নাম মৌটুসী। সেদিনই বাল্মিকী মুনির মত উনি ঠিক করে ফেলেছেন, তার প্রথম সন্তান হবে কন্যা, কন্যার নাম হবে মৌটুসী। উত্তমের রামায়ণ শুনে আমি হাসি, মনে মনে বলি, আমার ছোট মাসী সোনার চেন ঘুরিয়ে গণনা করে, সবাইকে ঠিকমত বাচ্চা-কাচ্চার কথা বলে দেয়, গণনা একেবারে সঠিক প্রমানিত হয়েছে। আমাকেও বিয়ের আগেই বলেছে, আমার প্রথম সন্তান হবে ছেলে। উত্তমকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাই ছেলের কথা শুনলে দুঃখ পেতে পারে ভেবে তাকে আর মনের কথা বলিনি। মনে মনে ছেলের নাম খুঁজে বেড়িয়েছি।

নারায়ণগঞ্জে এসে মাসী-বোনঝি খুব গলাগলি ভাব, আবার একটু রেষারেষি ভাব। মাসী জানে, তার মেয়ে হবে, মেয়ে খারাপ নয়, তারপরেও সমাজে সবাই বলে পুত্রের মা ভাগ্যবতী। কাজেই আমার প্রতি তো একটু ঈর্ষা হবেই, উনি নিজেই তো গুণে বলেছেন আমার ছেলে হওয়ার কথা। আর আমিও অহংকার দেখানোর সুযোগ ছাড়বো কেন। আমার চালচলনেই সর্বক্ষণ হাওয়ায় উড়ি ভাব। লাজুকলতা ছিলাম বলে নবাগত অতিথিকে নিয়ে মুখে কিছু বলতামনা,তবে আচারে ব্যবহারে আহ্লাদীপনা বেড়ে গিয়েছিল। ঘরে কোন কাজকর্ম করতে হয়না, মাসী-বোনঝি মিলে এখানে যাই, ওখানে যাই। ভুলেই গেছি, আমার যেখানে সেখানে আছাড় খাওয়ার বাতিক আছে। তখন বাবুটা গর্ভে পাঁচ মাস বয়সের হয়েছে বোধ হয়, মাসীর সাথে হা হা হি হি করে দৌড়ে ঘর থেকে বের হতে গিয়েছি, চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে সোজা দাঁড়ানো থেকে ধপাস করে বারান্দার ফ্লোরে বসে পড়ে গেছি। ভীষণ আওয়াজে সবাই ঘর থেকে বের হয়ে দেখে আমি বারান্দায় বসে আছি, সোজা হয়ে উঠতেই পারছিনা। তারপর নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ালাম, টের পাচ্ছিলাম সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার অনুভূতি! ছোট মাসী বার বার জিজ্ঞেস করে, মিঠু, কীভাবে পড়ে গেলি! কোথায় ব্যথা পাইছস? পেটে ব্যথা পাস নাই তো?
আমি তো তখন বোকার মত হেসে বলি, নাহ! কিছু হয় নাই।
আমার বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, বললেন, ডাক্তার ডাকতে। বাবার কথা শুনে আমি তো লজ্জায় মরে যাই। এমনিতেই আমি বাবা, মা, ভাইদের সামনে দাঁড়াতে লজ্জা পেতাম, তার উপর সেদিন সবাই ভীড় করেছে। মাসী বলল, আমি ওকে নিয়ে ামাদের কৈলাস ডাক্তারের কাছে যাই, আর্নিকা খেতে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। মাসীর সাথে পাড়ার হোমিওপ্যাথী ডাক্তার কৈলাস বাবুর চেম্বারে গেলাম। উনি চিনির গুল্লী খেতে দিলেন। এখন মনে পড়েনা, কৈলাস ডাক্তারই কি বলেছিলেন নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আনার কথা, নাকি মাসী নিজে থেকেই গেছিল, যেটাই হোক, দুজনে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে গেলাম, তাও আবার রিকসায় চড়ে, রাস্তার ভাঙ্গায় ঠোকর খেতে খেতে! এখন ভাবি, ২৭ বছর আগেও আমরা কত বোকা আর অজ্ঞ ছিলাম। না বুঝেই এক ভুল থেকে আরেক ভুল করতাম।

নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল থেকে বলে দিল, সব ঠিক আছে। মনে মনে বলি, ঠিক থাকতেই হবে। এই বাচ্চার তো এতদিনে আমার গর্ভেই থাকার কথা ছিলনা, প্রেগন্যান্সীর প্রথম দিকে কিছুই না জেনে স্কিন অ্যালার্জীর জন্য ডাক্তারের পরামর্শে টেট্রাসাইক্লিন কোর্স কমপ্লীট করেছিলাম। গায়নোকোলোজিস্ট ডাঃ সুফিয়া খাতুন যখন জানতে পেরেছেন, টেট্রাসাইক্লিনের কথা, উনি তো সাথে সাথে এম আর করিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। আমরাও মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, এম আর করিয়ে ফেলবো। আমার মন মানছিলনা, কারণ মাসি বলেছে, আমার ভাগ্যে দুটো বাচ্চা আছে, প্রথম ছেলে, পরে মেয়ে। ছেলেটাকে ফেলে দিতে হবে? যাই হোক, ডাঃ ফিরোজা বেগমের কাছে গেলাম, উনি বললেন, টেট্রাসাইক্লিন তিন মাস প্রেগন্যান্সী থেকে ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। আমার যেহেতু একেবারে শুরু ছিল, তাই ক্ষতি হবেনা। এই তো আমার ছেলেটা গর্ভে রয়ে গেল।

আমার সন্তান যখন আটমাসের গর্ভে, মাসীর কোল জুড়ে এলো মিত্রা। মিত্রাকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে মাসী বাড়ী এলো, দিদিমা তাঁর নাতনীকে কি যে যত্ন করতে লাগলো। আমার মা কি এগুলো লক্ষ্য করতো কিনা কে জানে! আমি জানালা দিয়ে উঁকী দিয়ে সব লক্ষ্য করতাম, আর মনে মনে হিংসা করতাম, ইস! মেয়েকে নিয়ে বুড়ীর কত ঢং, আমার দিকে ফিরেও তাকায়না। আবার মজাও পেতাম। ভাবতাম, মাসীর তো মেয়ে হয়েছে, তাই নিয়েই দিদিমার এত আহ্লাদ, আর আমার যখন ছেলে হবে, তখন মজা বুঝবে।

এদিকে আটমাসের সময় ডাঃ সুফিয়া খাতুন বলে দিলেন, বাচ্চা ব্রিচ পজিশনে আছে, তাই সিজারিয়ান অপারেশান হবে। বাসায় এলাম, এই সময়টাতে উত্তম কুমার প্রতি উইক এন্ডে চলে আসতো। তখন সময়টা ছিল আহ্লাদ-আনন্দে ভরা, চারদিকে শুধুই ভালোবাসার রঙ। সিজারিয়ান অপারেশান করা হবে, তাই ডাক্তার আগে থেকেই দিন,ক্ষণ ঠিক করে দিলেন, ২৬শে নভেম্বার অপারেশান হবে। নভেম্বারের প্রথম সপ্তাহে ছোট মাসী আমার হাতে সোনার চেন ঘুরালো, আমার মনে আছে, চেন উল্টোদিকে ঘুরছিল, অর্থাৎ মেয়ে হবে। মাসী আবার ঘুরালো, আবার উলটো দিকেই ঘুরে। আমরা সবাই হেসে কুটিপাটি, মাসীকে নিয়ে ঠাট্টা করি। তৃতীয়বারে মাসী জোর করেই যেন চেনকে ঠিকভাবে ঘুরিয়ে বলল, কি জানি, আমার আঙ্গুল বোধ হয় ঘামে ভিজে গেছে, তাই চেন ঠিকমত ঘোরেনি। এই তো এখন আবার বলছে, ছেলে হবে। তখনও ছেলের জন্য কোন জুতসই নাম খুঁজে পাইনি।

১৮ই নভেম্বার কি জানি কেন, মনে হলো, আমার শরীর ভালো লাগছেনা। প্রথম অভিজ্ঞতা তো, তাই অল্পেই ঘাবড়ে যাই। হুলুস্থূলু লাগিয়ে দিলাম, মনে ভয় তো আগেই ছিল, টেট্রাসাইক্লিন খেয়েছিলাম, পড়ে গেছিলাম, যদি একটু সময়ের হেরফের হয় ভুল হয়ে যায়, তাহলে আমার ছেলেটা তো মরেই যাবে। সেই ভয়েই মাতামাতি বেশী করছিলাম। অপারেশান হবে জানার পর থেকে বাসার সকলেই আমার প্রতি বেশী মনোযোগী হয়ে পড়েছিল। বড়দা তখন ডকইয়ার্ডে চাকুরী করে, উত্তম কুমার সাভার, মেজদা নারায়ণগঞ্জ সোনালী ব্যাঙ্কে। ব্যাঙ্ক থেকে মেজদাকে আনানো হলো, বড়দাকে আনানো হলো সোনাকান্দা ডকইয়ার্ড থেকে, তখন ফোন সার্ভিস কি বাজে ছিল, মাসী দৌড়ে গিয়ে বাড়ীওয়ালার বাসা থেকে গণস্বাস্থ্যে ফোন করেছিল, ভাগ্য ভাল ছিল, প্রথম সুযোগেই উত্তমের কাছে ফোন পৌঁছে গেল। মা আর বড়দার সাথে ঢাকা ইবনে সিনা ক্লিনিকে পৌঁছে গেলাম। ওদিক থেকে উত্তম কুমারও ক্লিনিকে পৌঁছে গেছে। বিকেল সাড়ে তিনটায় সিজারিয়ান অপারেশানের মাধ্যমে মৌটুসীকে পৃথিবীতে নিয়ে আসা হলো।

অপারেশান করা হয়েছিল ফুল অ্যানেসথিসিয়া দিয়ে, তাই আমি জানতে পারিনি, ছেলে নয়, মৌটুসী এসেছে। কয়েক ঘন্টা পর যখন আমার জ্ঞাণ ফিরেছে, সারা শরীরে কি যন্ত্রণা, গলায় প্রচন্ড যন্ত্রণা, চোখ মেলে দেখি টিউব লাইটের আলো চারদিকে, শিয়রের কাছে দাঁড়ানো বড়দা, ঢাকার বৌদি, আরও কারো কারো কথা শোনা যাচ্ছে, মায়ের গলা পাচ্ছি, বলছে, ওরে বল, রাজনন্দিনী এসেছে। বড়দা বলছে, মিঠু, তোর তো খুব সুন্দর একটা মেয়ে হয়েছে। তোর মেয়ে কিন্তু সবার আগে আমার কোলে উঠেছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলামনা, প্রচন্ড ব্যথায় অস্থির হয়েও খুব খুশী হয়েছি জ্ঞাণ ফিরে এসেছে বলে। আমি ফুল অ্যানেসথেসিয়া দিতে চাইনি, ভয় ছিল, আর যদি জেগে না উঠতে পারি। কাজেই জেগে উঠার আনন্দে ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়েছে, রাজপুত্রের বদলে রাজনন্দিনী হয়েছে, এসব কিছু বুঝতে পারছিলামনা। উত্তম কুমার বলে, আমাদের কাছে ছোট্ট একটা মৌটুসী এসেছে

একটু পরে, পাশের বেডে বসা মায়ের কোলে সাদা তোয়ালে জড়ানো এক বাচ্চা দেখলাম। কাঠি কাঠি হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছে, ধবধবে সাদা গায়ের রঙ। মা বলছে, এই যে দ্যাখ, তোর রাজনন্দিনী মা হাসতে হাসতে কুটিপাটি হয়ে যাচ্ছে, বলে, ঐ যে টেট্রাসাইক্লিন খেয়েছিলি, টেট্রাসাইক্লিনের প্রতিক্রিয়ায় তোর ছেলেটা মেয়ে হয়ে গেছে। আমি তো থ হয়ে গেছি, কি ব্যাপার, মেয়ে হয়েছে বলছে কেন? বাচ্চার দিকে তাকাতেও পারছিলামনা, সিজারিয়ান অপারেশানে যে সারা শরীরে এমন যম যন্ত্রণা হয়, কে জানতো! বাচ্চা ট্যাঁও ট্যাঁও করে কাঁদে, কান্না থামেনা, শাশুড়ী-জামাই কতরকমভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে মৌটুসীর ট্যাঁও ট্যাঁও থামাতে। দুজনের একজনও কোন কাজের না। ইস! এতক্ষণ লাগে একটা বাচ্চার কান্না থামাতে, আমার তো হাত নাড়াবার শক্তিটুকুও নেই, নাহলে অদের শিখিয়ে দিতে পারতাম কি করে বাচ্চাকে দোল দিতে হয়। এদিকে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছিনা, লজ্জা লাগে। সবাই বলবে, কি বেলাজা মেয়ে, বাচ্চা নিয়ে কত আদিখ্যেতা করে দেখো। অথচ বাচ্চাটাকে কোলে নিতে ইচ্ছে করছে। কিছুক্ষণ পরেই আমাদের বৌদি বাচ্চাকে তুলে এনে আমার পাশে শুইয়ে দিল। আমি যে কি পরিমান লজ্জা পাচ্ছিলাম তা বুঝাতে পারবোনা।

প্রতিদিন অতিথির ভীড় লেগেই আছে। দ্বিতীয় দিনে আমাকে বেড থেকে তোলা হলো, ধরে ধরে বিছানা থেকে নামানো হলো, হাঁটতে চেষ্টা করলাম। খাওয়া-দাওয়া নেই, শুধু স্যালাইন দিয়ে রেখেছে আমাকে। স্যালাইন এক জায়গায় বেশীক্ষণ রাখা যাচ্ছেনা, সেখানে ফুলে ব্লকড হয়ে যাচ্ছে, সব মিলিয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। আমি তখনও মা হওয়ার অনুভূতি টের পাচ্ছিলামনা।

পঞ্চম দিনে এলেন হুমায়ুন আহমেদ ও গুলতেকীন আহমেদ, হাতে এক গুচ্ছ ফুল, এবং একটি প্যাকেট। হুমায়ুন আহমেদ আমার হাতে প্যাকেটটি দিলেন, গুলতেকীন ভাবী দিলেন ফুলের গুচ্ছ।


হুমায়ুন আহমেদের হাত থেকে উপহার পেয়ে আমি অভিভূত। সবাই মিলে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। হুমায়ুন আহমেদ বললেন উনার শীলা মেয়ের জন্মের অভিজ্ঞতা। আমেরিকার হাসপাতালে যখন শীলা জন্মালো, গুলতেকীন ভাবী তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীকে আজান দিতে বললেন। আমেরিকার নিয়ম অনুযায়ী স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সন্তান জন্ম দেয়ার পুরো প্রক্রিয়া উনাকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে বলে উনি এতটাই ঘাবড়ে গেছিলেন যে আজান দেয়ার সময় নাকি মনে হয়েছে উনি চীৎকার করছেন। রুগীর স্বামীকে এমন অদ্ভুতভাবে চীৎকার করতে দেখে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স সকলেই হতচকিত হয়ে গেছিল। হুমায়ুন আহমেদ যা বলতেন, যেভাবে বলতেন, শুনতে ভাল লাগতো। গুলতেকীন ভাবী বললেন, বাবা মা দুজনেই সুন্দর, তাই মেয়েও সুন্দর হয়েছে। বলতো মেয়ে কার মতো হয়েছে, জীবেনদার মত নাকি মিঠু ভাবীর মত? হুমায়ুন আহমেদ বললেন, পৃথিবীর সব বাচ্চার চেহারাই আমার কাছে একরকম লাগে

উনারা চলে গেলেন। আমি উপহারের প্যাকেট খুললাম,

প্যাকেটের ভেতর তিনটি বই ছিল,

শঙ্খনীল কারাগার
সৌরভ
অচিনপুর
প্রতিটি বইয়ের পাতা উল্টাতেই দেখতে পেলাম, হুমায়ুন আহমেদের হাতে লেখা,

নতুন মাকে
হুমায়ুন আহমেদ
২৩শে নভেম্বার, ১৯৮৫

আমি বুঝতে পারছিলামনা, নতুন মাটি কে? আমি নাকি মৌটুসী? দুজনেই তো নতুন। পরমুহূর্তেই খেয়াল হলো, আরে! আমিই তো মা, আমিই তো নতুন মা! হুমায়ুন আহমেদের ভাষায় ১৮ই নভেম্বার আমি নতুন মা হলাম।